রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৮
অধরা মিনহা
ইফরাদ তার হাতে চুড়ির মুঠোটা আনতারার হাতে পরিয়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠে,
— মারহাবা, মারহাবা! এই চুড়ি বানানোই হয়েছে আপনার জন্য। এই চুড়ির ইজ্জত কমে যাবে, এই হাত ছাড়া অন্য কোনো হাতে গেলে!
কথাটা শুনে আনতারা নিকাবের নিচে হাসতে থাকক। শেষ পর্যন্ত আর হাসি থামাতে না পেরে ইফরাদকে জড়িয়ে ধরে। তারপর ইফরাদের বুকে মুখ লুকিয়ে অনবরত হাসতে লাগল। হাসি কিছুতেই থামছে না।
আনতারা হাসতে হাসতেই বলে,
— থামুন, রাদ। আমি আর পারছি না হাসতে। পেট ব্যথা করছে।
আনতারার কথা শুনে ইফরাদও এবার মজা থামিয়ে দেয়। তারপর আনতারাকে বুকে জড়িয়ে হাসতে থাকে। এদিকে তাদের এমন হাসি-ঠাট্টা দেখে স্টলে থাকা অন্য কাস্টমাররাও মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। স্বামী-স্ত্রীর এমন প্রেম আর খুনসুটি দেখে বেশ কিছুক্ষণ তারা বিষয়টা নিয়ে হাসাহাসি করল। কিছুক্ষণ পর আনতারা আশপাশে তাকিয়ে দেখে, সবাই তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে একটু লজ্জা পেয়ে ইফরাদের কাছ থেকে সরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
ইফরাদও হেসে নিজেকে সামলে নিয়ে আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমার স্কিল তো দেখালাম। এবার তোমার স্কিল দেখাও।
আনতারা ভ্রু কুঁচকে হালকা অবাক হয়ে বলে,
— আমার আবার কিসের স্কিল?
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— মেয়েদের স্কিল! এত এত শপিং করার যে অসাধারণ প্রতিভা, সেটাই তো!
কথাটা শুনে আনতারা হালকা হেসে ফেলে।
— ওসব প্রতিভা আমার নেই। দুঃখিত।
ইফরাদ মুচকি হেসে বলে,
— ওটা আমি জানি। তবে কিছু পছন্দ হলে সেটা তো নেওয়াই যায়।
আনতারা ঝুমকাগুলোর দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়ে।
— হুম, তা করা যায়।
ইফরাদ নরম স্বরে বলে,
— তাহলে সেটাই করো। তোমার-আমার প্রথম মেলার একটা সুন্দর স্মৃতি থাকুক।
আনতারা সামনে থেকে একটার পর একটা ঝুমকা হাতে নিয়ে দেখতে লাগল। এদিকে ইফরাদের চোখে পড়ে একটা নোজপিন। ডায়মন্ড কাট গোলাপি স্টোন বসানো ছোট্ট একটা নাকফুল। ইফরাদ সেটা হাতে তুলে নিয়ে আনতারার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— নাক ফোটালে কি বেশি ব্যথা পাওয়া যায়?
আনতারা তখনও ঝুমকা দেখছিল। ইফরাদের কথা শুনে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
ইফরাদ নাকফুলটার দিকে তাকিয়ে বলে,
— নোজপিনটা খুব সুন্দর লেগেছে। তোমাকে পরলে কেমন লাগবে, দেখতে ইচ্ছে করছে।
কথাটা বলেই ইফরাদ আবার নাকফুলটা আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বলে,
— অবশ্য এসব সস্তা স্টোনের নাকফুল না, তোমাকে ডায়মন্ডের নাকফুল পরাবো।
আনতারা নিকাবের আড়ালে মুচকি হেসে নাকফুলটা আবার হাতে তুলে নিয়ে বলে,
— বিশ্বাস করুন, আপনার দেওয়া কোনো কিছুই আমার কাছে সস্তা না। ওই ডায়মন্ডের চেয়েও আপনার দেওয়া একটা পিতলের নাকফুলও আমার কাছে অনেক বেশি দামি। কারণ, আপনি মানুষটাই আমার কাছে দামি।
ইফরাদ একটু ঝুঁকে আনতারার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলে,
— আর তুমি মানুষটা আমার কাছে অমূল্য।
আনতারা হেসে ফেলে। ইফরাদ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করে,
— তাহলে নাকফুলটা নিয়ে নেবো? নাক ফুটাবে তো?
আনতারা ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটিয়ে বলে,
— ইনশাআল্লাহ।
ইফরাদ নাকফুলটা আর আনতারার পছন্দ করা এক জোড়া সিলভার ঝুমকা কিনে নেয়। বিল পেমেন্ট করে জিনিসগুলো নিয়ে স্টল থেকে বেরিয়ে এল। তারপর ঝুমকা আর নাকফুলের ছোট্ট প্যাকেটটা নিজের পকেটে রেখে দিল। সামনে এগোতেই ইফরাদের চোখে পড়ে, এক লোক হাতে অনেকগুলো ঝিলমিল করা বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইফরাদ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিলমিল বেলুনগুলোর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আনতারাকে জিজ্ঞেস করে,
— বেলুন নিবে?
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— আমি বেলুন দিয়ে কী করবো?
ইফরাদ হালকা হাসি নিয়ে বলে,
— এখন যদি আমাদের একটা বেবি থাকতো, তাহলে দূর থেকেই বেলুন দেখে বায়না শুরু করে দিতো।
ইফরাদের কথা শুনে আনতারা একবার ইফরাদের দিকে তাকায়। তারপর নিকাবের আড়ালে নিঃশব্দে হাসে। ইফরাদও ঠোঁট চেপে মুচকি হেসে আড়চোখে আনতারার দিকে তাকায়। কথাটা সে বেখেয়ালে বলেনি কিংবা কথার ছলেও বলেনি। ইচ্ছে করেই বলেছে, শুধু আনতারাকে একটু লজ্জা দেওয়ার জন্য। হাসতে হাসতেই আনতারার চোখ গিয়ে পড়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পথশিশুর দিকে। তিন-চার বছর বয়স হবে তাদের। মোট চারজন শিশু মানুষের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা চাইছে।
ওদের দিকে তাকিয়েই আনতারা ইফরাদকে জিজ্ঞেস করে,
— কিন্তু এখন যেহেতু আল্লাহ আমাদের সন্তান দেননি, তাহলে বেলুনগুলো কী করা যায়?
ইফরাদ এক মুহূর্তও না ভেবে বলে,
— এখন আমাদের বেলুনগুলো নিয়ে যাওয়া উচিত। তারপর বেলুনগুলোর মালিককে দুনিয়ায় আনা উচিত।
কথাটা শুনে আনতারা চমকে ঘাড় তুলে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি। মুখে অবশ্য একদম স্বাভাবিক ভাব। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ঠিকই হাসছে, আনতারাকে টিজ করে। আনতারা আবার মাথা নিচু করে হাসে। তারপর আঙুল তুলে পথশিশুগুলোর দিকে দেখিয়ে বলে,
— এখন আমাদের বেলুনগুলো ওই বাচ্চাগুলোকে দেওয়া উচিত। নিজের বাচ্চা না হোক, পরের বাচ্চা হলেও তো খুশি হবে।
ইফরাদ একটু ঝুঁকে আনতারার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
— আমার ঘরের বউ খুশি হবে?
তারপর একটু মুখ সরিয়ে মুচকি হেসে বলে,
— তাহলে দিতে পারি।
আনতারা হাসিমুখেই বলে,
— ভীষণ খুশি হবে।
ইফরাদ দুষ্টু হেসে বলে,
— ভীষণ খুশি? খুশিতে গালে টুস করে একটা চুমু দিয়ে দেবে?
লজ্জায় আনতারা সঙ্গে সঙ্গে ইফরাদের হাত চেপে ধরে মিনমিনে গলায় বলে,
— কিসব বলেন আপনি!
ইফরাদ হেসে উঠে।
— আচ্ছা, চল।
দুজন এগিয়ে গিয়ে বেলুনওয়ালার সামনে দাঁড়ায়। ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— সবগুলো বেলুন কত?
বেলুনওয়ালা উত্তর দেয়।
— ৬৬ টা বেলুন এখানে, ছয় হাজার টাকা।
আনতারা অবাক হয়ে বলে,
— সবগুলো বেলুন কেন?
ইফরাদ আনতারাকে বলে,
— বলছি।
এরপর বেলুনওয়ালার দিকে তাকিয়ে বলে,
— সবগুলো বেলুন দেন।
কথা শেষ করেই পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে। বেলুনওয়ালা সবগুলো বেলুন এনে ইফরাদের হাতে দেয়। ইফরাদ বেলুনগুলো নিয়ে আনতারার হাতে ধরিয়ে দেয়। পুরো ছেষট্টিটা বেলুন। আনতারা বাঁ হাতে সবগুলো বেলুন একসঙ্গে ধরে রাখে। ইফরাদ মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে বিল পেমেন্ট করে দেয়। আনতারা আবারও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— রাদ, এতগুলো বেলুন কেন?
ইফরাদ বলে,
— বাচ্চাদের দিয়ে যেগুলো থাকবে, সেগুলো তোমার।
আনতারা ভ্রু কুঁচকে বলে,
— আমি বেলুন দিয়ে কী করবো?
ইফরাদ শান্ত গলায় উত্তর দেয়।
— স্বামীর সঙ্গে প্রথমবার মেলায় এসেছো। হাত ফাঁকা থাকবে কেন?
কথাটা বলেই ইফরাদ পথশিশুগুলোকে হাত ইশারা করে ডাকে। চারজন শিশু দৌড়ে কাছে চলে এলো। আনতারা নিজের হাতে ধরা বিশাল বেলুনের ঝাঁক থেকে প্রত্যেককে দুইটা করে বেলুন দেয়। বেলুন পেয়ে বাচ্চাগুলোর আনন্দ যেন আর ধরে না। মুহূর্তেই ওরা খুশিতে খিলখিল করে হাসতে থাকে। সেই হাসিতে আনতারাও হেসে উঠে নিকাবের নিচে।
সেই শিশুদের দেখে মেলায় ঘুরতে আসা আরো কয়েকজন ছোট্ট শিশু বেলুনের জন্য নিজেদের মা-বাবার কাছে বায়না শুরু করে দেয়। তা দেখে আনতারা নিজের হাতের কিছু বেলুন ইফরাদের হাতে দিয়ে বলে,
— এই নিন। ওদিকের বাচ্চাগুলো বেলুনের জন্য কান্না করছে। ওদের দিয়ে আসুন।
ইফরাদও বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ে। তারপর হাতে নেওয়া বেলুনগুলো একে একে শিশুদের দিতে শুরু করে।সুপারস্টার ইফরাদ রিদান চৌধুরী, যাকে একনজর দেখার জন্য মানুষ অপেক্ষা করে, সেই মানুষটাই আজ মেলার একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ঘুরে ঘুরে বাচ্চাদের হাতে বেলুন তুলে দিচ্ছে। তবু তার মুখে বিরক্তির লেশমাত্র নেই।বরং সে খুশি। কারণ, এতে আনতারা খুশি। সব বেলুন বিলিয়ে দেওয়ার পরও আনতারার হাতে আরো চল্লিশটা বেলুন রয়ে গেল।
ইফরাদ ফিরে এসে বলে,
— এবার চল? কিছু খাই আমরা?
আনতারা তখন বেলুনগুলো হাতে ধরে দাড়িয়ে ছিলো। সে আঙুল তুলে দূরের একটা স্টলের দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— ওখানে কী বিক্রি করছে, রাদ?
ইফরাদ সেদিকে তাকায়। অনেক মানুষের ভিড়। কারও কারও হাতে বড় বড় চিংড়ি ফ্রাই দেখা যাচ্ছে। ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে বলে,
— মনে হচ্ছে চিংড়ি ফ্রাই। খাবে তুমি?
আনতারা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বলে,
— জি, এটাই করেন।
ইফরাদ হেসে বলে,
— আচ্ছা, চল ওদিকে।
ইফরাদ হাঁটা শুরু করতে যাবে, এমন সময় আনতারা তাকে থামিয়ে বলে,
— শুনুন?
ইফরাদ থেমে ফিরে তাকায়।
— হুম?
আনতারা একটু জড়তা নিয়ে পথশিশুগুলোর দিকে ইশারা করে বলে,
— ওদের… জন্যও…?
কথাটা বলতে গিয়েও আনতারার কণ্ঠে দ্বিধা ছিল। যদি ইফরাদ বিরক্ত হয়? কিন্তু ইফরাদ বিপরীতে শুধু মুচকি হেসে বলে,
— আচ্ছা।
মুহূর্তেই আনতারার মুখে হাসি ফুটে উঠে। সে বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে,
— চল, ওদিকে চল। আঙ্কেল তোমাদের মজা কিনে দেবে।
বাচ্চাগুলো আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাদের সঙ্গে হাঁটতে লাগল। স্টলের সামনে এসে দেখে, সেখানে বড় বড় চিংড়ি ফ্রাই বিক্রি হচ্ছে। ইফরাদ স্টলের মালিককে বাচ্চাদের জন্য চিংড়ি দিতে বলে। স্টলের স্টাফ একে একে চারজন শিশুর হাতে চিংড়ি তুলে দেয়। খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাচ্চাগুলো ইফরাদ আর আনতারাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আনতারা আর ইফরাদ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। যে চিংড়িগুলো আগে থেকেই ভাজা ছিল, সেগুলো বাচ্চাদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এখন তাদের জন্য নতুন করে চিংড়ি ভাজা হচ্ছে।
অপেক্ষা করতে করতে ইফরাদ একটু ঝুঁকে আনতারাকে জিজ্ঞেস করে,
— পার্সেল নেব? গাড়িতে গিয়ে খেয়ে নেব? তুমি তো এখানে খাবে না।
আনতারা মাথা নেড়ে বলে,
— জি।
ইফরাদ স্টলের লোকদের খাবারগুলো পার্সেল করে দিতে বলে। খাবার পার্সেল করে দেওয়া হলে ইফরাদ বিল পে করে। তারপর আনতারাকে সঙ্গে নিয়ে মেলা থেকে বেরিয়ে এল। ইফরাদের ডান হাতে খাবারের পার্সেল, আর বাঁ হাতে ধরা আনতারার হাত। ইফরাদ আনতারার হাতটা এমনভাবে ধরে আছে, যেন আনতারা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে, হাতটা ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাবে। আনতারার অবস্থাও ঠিক উল্টো। তার ডান হাত ইফরাদের হাতে ধরা, আর বাঁ হাতে ধরা চল্লিশটা বেলুন।
মেলা থেকে বের হওয়ার মুখেই আনতারার চোখ পড়ে গেটের পাশে বসে থাকা এক ফুলওয়ালার দিকে। একটা বালতিতে সাজিয়ে রাখা লাল টকটকে দশ-পনেরোটা গোলাপ বিক্রি করছে লোকটা। হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ আনতারা থেমে গেল। গোলাপগুলো আনতারার মনে, স্বামী নামক পুরুষটার কাছ থেকে একটা গোলাপ পাওয়ার ইচ্ছা জাগিয়ে দেয়। ইফরাদ সামনে পা বাড়াতে গিয়ে বাধা পায়। হাতে টান লাগতেই ফিরে তাকায়। আনতারা দাড়িয়ে আছে, দৃষ্টি অন্যদিকে। ইফরাদ আনতারার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেদিকে তাকায়। দেখে, আনতারা একদৃষ্টিতে গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।
আনতারা ধীরস্বরে বলে,
— একটা গোলাপ দিবেন?
— মাত্র একটা?
আনতারা কথাটা শুনে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদের ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি। তা দেখে আনতারা ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
— তাহলে পুরো বাগান চাওয়া উচিত?
ইফরাদ হেসে বলে,
— ইফরাদ রিদান চৌধুরীর বউ যেহেতু, সেহেতু পুরো বাগানই চাওয়া উচিত।
আনতারা মৃদু হেসে বলে,
— চাইলে কী হবে? দিবেন?
ইফরাদ চোখে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলে,
— কে বলতে পারে? দিতেও পারি। তোমার রাদের প্রতি একটু আস্থা রাখতে পারো, মাই জানা।
আনতারা মাথা নেড়ে হেসে বলে,
— বাগান লাগবে না আমার। একটা গোলাপ দিন। শুধু একটা।
ইফরাদ ভ্রু তুলে আবারও জিজ্ঞেস করে,
— শুধু একটা?
— হুম।
— চল।
ইফরাদ তার হাত ধরে ফুলওয়ালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর লোকটাকে বলে,
— সবগুলো গোলাপ দেন।
কথাটা শুনেই আনতারা আলতো করে ইফরাদের হাত চেপে ধরে। তারপর ইফরাদের একেবারে কাছে, পাশে এসে খুব আস্তে করে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,
— শুধু একটা। এতগুলো না।
আনতারা এতটাই নিচু স্বরে বলে, যেন ফুলওয়ালা লোকটা কিছুতেই শুনতে না পায়। নিজের কণ্ঠেরও পর্দা আছে। পরপুরুষের সামনে আনতারা নিজের কণ্ঠও অযথা উন্মুক্ত করতে চায় না।
ইফরাদ এবার লোকটাকে বলে,
— আচ্ছা, একটা গোলাপ দিন।
লোকটা একটা গোলাপ তুলে সরাসরি আনতারার দিকে বাড়িয়ে দেয়। ফুলওয়ালা ফুলটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিতেই ইফরাদের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আচমকাই ফুলওয়ালার কলার চেপে ধরে রেগে বলে,
— ফুল ওর দিকে বাড়ালি কেন?
ফুলওয়ালা ভয়ে বলে ওঠে,
— স্যার, ফুলটা ম্যাডামের হাতে দিতেছিলাম…
ইফরাদ চক্ষু লাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— তোকে ফুল দিতে বলেছি, তুই আমার হাতে দিবি। আমার বউয়ের হাতে তুই ফুল দিবি কেন? আমার বউয়ের হাতে ফুল দেওয়ার অধিকার একমাত্র আমার আছে।
ইফরাদের আচমকা এমন কাজে আনতারা ভয় পেয়ে যায়। ইফরাদের বাহু ধরে আস্তে করে বলে,
— কি করছেন রাদ! ছাড়ুন। ছাড়ুন না।
ইফরাদ আনতারার কথায় একটু শান্ত হয়, কিন্তু কলার ছাড়ে না। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
— নেক্সট টাইম কোনো স্বামী-স্ত্রী ফুল নিতে এলে ফুল স্বামীর হাতে দিবি। স্ত্রীকে ফুল দেওয়ার অধিকার একমাত্র স্বামীর।
ফুলওয়ালা ভয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে,
— আচ্ছা স্যার, ভুল হয়ে গেছে। আর করবো না।
ইফরাদ এবার কলারটা ছেড়ে দেয়। তারপর লোকটার হাত থেকে ফুলটা নিয়ে টাকা দিয়ে সেখান থেকে ফিরে আসতে আসতে আনতারার দিকে ফুলটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— নাও।
এদিকে আনতারা ভয়ে চুপসে আছে। আস্তে করে ফুলটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— রেগে আছেন?
ইফরাদ থেমে দাড়িয়ে যায়। আনতারাও ইফরাদকে দাড়িয়ে যেতে দেখে দাড়িয়ে যায়। ইফরাদ হাত বাড়িয়ে আনতারাকে জড়িয়ে নিজের কাছে এনে আদর করে বলে,
— তোমার উপর না।
আনতারা একটু আশ্বস্ত হয়। ইফরাদের এমন রাগ দেখে সে সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। যদিও তার কাছে ইফরাদের এভাবে রেগে যাওয়াটা অন্যায় লাগে না। অন্য কারো হাত থেকে গোলাপ নেওয়াটা তারও অস্বস্তিকর লাগত। হোক সে ফুলওয়ালাই। গোলাপ যদি নিতেই হয়, তবে সে নেবে তার নিজের মানুষটার হাত থেকেই। ভয়টা কেটে যাওয়ার পর ইফরাদের এই জেলাসি দেখে আনতারার ভালোই লাগে। তবে তার কাছে এটা জেলাসি না বরং গায়রত। মনে মনে খুশি হয়, তার রাদ গায়রতওয়ালা পুরুষ। এসবই মনে মনে ভাবছিল আনতারা। তখনই ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,
— কি? চুপ যে? ভয় পেয়েছো?
আনতারা মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না। চলুন? বাসায় যাই?
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— হুম, চল।
ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে।এবার বাড়ি ফেরার পালা। কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ আনতারা হোঁচট খায়। মুহূর্তের মধ্যেই আনতারা সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ইফরাদ দ্রুত আনতারাকে ধরে ফেলে। আনতারা পড়ে না গেলেও তার জুতার একটা হিল ছিটকে একটু দূরে গিয়ে পড়ে। ইফরাদ আনতারাকে শক্ত করে ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— ঠিক আছো? ব্যথা পাওনি তো?
আনতারা দুই দিকে মাথা নেড়ে বলে,
— না। কিন্তু আমার জুতা…..
ইফরাদ এবার আনতারার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখে, জুতার একটা হিল ভেঙে গেছে। খুব বেশি উঁচু হিল না, প্রায় দুই ইঞ্চির মতো ছিল। আনতারা মন খারাপ করে ভাঙা জুতাটার দিকে তাকিয়ে বলে,
— জুতাটা তো ভেঙে গেল। আমি হাঁটব কীভাবে?
ইফরাদ নিজের হাতে থাকা খাবারের পার্সেলটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— ধরো এটা।
আনতারা পার্সেলটা নিয়ে নেয়। ইফরাদ হেসে বলে,
— আমার জুতা তোমাকে দিয়ে দেব, এতটা রোমান্টিক আমি না।
কথাটা বলেই এক মুহূর্ত দেরি না করে ইফরাদ আনতারাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নেয়। তারপর মুচকি হেসে বলে,
— বরং তোমাকে কোলে নিয়ে হাঁটব, এতটা রোমান্টিক আমি।
আচমকা কোলে তুলে নেওয়ায় আনতারা ভয় পেয়ে গেল।রাস্তার মাঝখানে নিজেকে ইফরাদের কোলে দেখে আনতারা বিস্ময়ে চারপাশে তাকায়। আশপাশের দুই-তিনজন মানুষ তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। এমনকি দুইজন হাসছেও। হয়তো রাস্তার মাঝে তাদের এমন ভালোবাসার দৃশ্য দেখে। লজ্জায় আনতারা ইফরাদের বুক আঁকড়ে ধরে বলে,
— কী করছেন? রাস্তায় আমরা।
ইফরাদ একদম স্বাভাবিক গলায় বলে,
— তো কী হয়েছে?
আনতারা আরো লজ্জা পেয়ে বলে,
— আশপাশের মানুষ তাকিয়ে আছে।
ইফরাদ হালকা হেসে বলে,
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৭ (৩)
— আমি আমার বউকে কোলে নিয়েছি, আর তুমি তোমার স্বামীর কোলে উঠেছো। এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? তাছাড়া গাড়িটাও তো বেশি দূরে না। এখনই আমরা গাড়িতে উঠে যাব।
কথা শেষ করেই ইফরাদ আনতারাকে কোলে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। আনতারার এক হাতে চল্লিশটা বেলুন। অন্য হাতে একটা গোলাপ আর খাবারের পার্সেল। সবকিছু আঁকড়ে ধরে সে ইফরাদের বুকে মুখ লুকিয়ে রইল। আর ইফরাদ আনতারাকে বুকে আগলে নিয়ে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। লজ্জায়, ভালোবাসায় আর নিরাপদ এক অনুভূতিতে আনতারা আরো গভীরভাবে মিশে যেতে লাগল ইফরাদের বুকে।
