Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯ (২)
অধরা মিনহা

ইফরাদের চোখজোড়া রাগে লাল হয়ে উঠে। চোখেমুখে কঠোরতা ফুটে উঠে। লাল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
— তুমি ভালোবাসার প্রমাণ চাও? আনতারাকে ডিভোর্স দিলে তুমি বুঝবে আমি তোমাকে ভালোবাসি?
কথাটা শুনে আনতারা হঠাৎ পাথর হয়ে গেল। চমকে উঠে মাথা তুলে। ইফরাদ কী বলছে? মুহূর্তেই তার বুকটা ধক করে উঠে। ভয় যেন শরীরের প্রতিটি শিরায় ছড়িয়ে পড়ে।অন্যদিকে ইফরাদের কথায় শার্লিন ইমরোজের মনে নতুন করে আশার আলো জ্বলে উঠে। ওনার মনে হলো, ছেলে অবশেষে ওনার কথায় আসছে। তিনি খুশিতে মাথা নেড়ে বলেন,

— হ্যাঁ! তুমি এই মেয়েকে ডিভোর্স দিলে মাম্মা বুঝব, তুমি মাম্মাকে ভালোবাসো। মাম্মা তোমার কাছে প্রমাণ চাইছি। তুমি মাম্মাকে প্রমাণ দিয়ে দাও, বেটা?
আনতারার ভয়ে পুরো শরীর অবশ হয়ে আসতে লাগল। বুকের ভেতরটা কাঁপছে। সে অসহায় চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল। ইফরাদ জোরে একটা শ্বাস নেয়। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— ওকে, ফাইন! তোমাকে প্রমাণ দিচ্ছি আমার ভালোবাসার!
কথাটা বলেই ইফরাদ আনতারার হাত ছেড়ে দেয়। তারপর দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ইফরাদকে এভাবে চলে যেতে দেখে শার্লিন ইমরোজের মুখে ফুটে উঠে কুটিল হাসি। আনতারার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলেন,

— শুধু বের করেছিলাম বাড়ি থেকে। ভালো লাগেনি। এখন তালাক নিয়ে বের হবি, ছোটলোকের বাচ্চা।
এদিকে আনতারার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। ইফরাদ তাকে ফেলে উপরে গেল কেন? সে কী করতে যাচ্ছে? আর ইফরাদ একটু আগেই বা কী বলল? সে প্রমাণ দেবে? কীসের প্রমাণ? ভয়ে আনতারার হাত পা কাঁপতে থাকে। মাথার ভেতর একের পর এক ভয়ংকর চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি বেয়ে আবার নিচে নামার শব্দ হলো। আনতারা তাকিয়ে দেখে, ইফরাদ নিচে নেমে আসছে। তার হাতে একটা কালো বোরখা।
ইফরাদ আনতারার কাছে এসে বোরখাটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

— নাও, এটা তাড়াতাড়ি পড়ে নাও।
আনতারা অবাক হয়ে বোরখাটার দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— বোরখা কেন পড়বো?
ইফরাদ কাঠকাঠ কণ্ঠে বলে,
— আমি পড়তে বলেছি, তাই।
ইফরাদের কথার বিপরীতে আর কিছু বলার সাহস আনতারার হলো না। চুপচাপ ইফরাদের হাত থেকে বোরখাটা নিয়ে পরতে শুরু করে আনতারা। বোরখা পরার পর খিমারসহ ভালোভাবে পড়ে নেয় আনতারা। বোরখা পরা শেষ হতেই ইফরাদ আবার আনতারার হাত ধরে বলে,
— চলো।
বলেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে না। আনতারাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। পেছন থেকে শার্লিন ইমরোজ কুটিল হাসি হেসে বলেন,

— ফিরে এসে মাম্মাকে গুড নিউজটা দিও। সাবধানে যেও।
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। আনতারা ইফরাদের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে এল। গাড়ির কাছে এসে ইফরাদ ব্যাক সিটের দরজা খুলে আনতারাকে পেছনে বসতে ইশারা করল। আনতারা চুপচাপ গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসে।ইফরাদ আনতারার দিকের দরজাটা বন্ধ করে গাড়ির অপর পাশে গেল। ড্রাইভারকে গন্তব্যের লোকেশন বলে নিজেও গাড়িতে উঠে বসে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। ইফরাদ পকেট থেকে ফোন বের করে। দ্রুত সাফিনকে মেসেজে কিছু একটা পাঠায়। তারপর ফোনটা আবার পকেটে রেখে দেয়। এরপর হঠাৎ ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ধমকের সুরে বলে উঠে,

— সাইকেল চালাচ্ছো নাকি? জোরে চালাও গাড়ি!
ইফরাদের ধমকে পাশে বসে থাকা আনতারাও কেঁপে উঠে। এমনিতেই ভয়ে তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ইফরাদ এতটাই রেগে আছে যে কাউকে কিছু বলার সুযোগই দিচ্ছে না। কিন্তু আনতারাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সে? ডিভোর্স দিতে? কথাটা মনে আসতেই আনতারার পুরো শরীর শিউরে উঠে। সে দ্রুত মাথা নাড়ে। মনে মনে নিজেকেই বোঝাতে থাকে,
— না, না। আমার আল্লাহ আমার সঙ্গে আছেন। আমার সঙ্গে এমন হতে পারে না। আল্লাহ, আপনি আমাকে সহায়তা করুন।
আনতারা নিজের ভেতরের ভয়টা সামলাতে না পেরে ভয়ে ভয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়। তার ঠোঁট কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকে,
— রা….দ…?
সঙ্গে সঙ্গেই ইফরাদ কঠোর কণ্ঠে বলে উঠে,
— চুপ করে বসে থাকো।

ব্যস। ইফরাদের সেই কঠিন কণ্ঠ শুনে আনতারার আর কিছু বলার সাহস হলো না। সে চুপচাপ গাড়ির সিটে বসে হাত কচলাতে লাগল। বুকের ভেতর অজানা এক ভয় ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে। যে আশঙ্কাটা বারবার মনে আসছে, সেটা যেন সত্যি না হয়, এই দোয়াই করতে থাকে আনতারা। কিছুক্ষণ পর গাড়ি থামে। ইফরাদ গাড়ি থেকে নেমে গেল। সেখানে সাফিন আগে থেকেই দাঁড়িয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ইফরাদ গাড়ি থেকে নামতেই সাফিন এগিয়ে এসে বলে,
— স্যার, সব রেডি।
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। সে গাড়ির অপর পাশে গিয়ে আনতারার দরজাটা খুলে দেয়। তারপর কঠিন কণ্ঠে বলে,
— নামো, তাড়াতাড়ি।

আনতারা ধীরে গাড়ি থেকে নামে। তার বুক তখনো ভয়ে কাঁপছে। শরীরে যেন কোনো শক্তি নেই। ভয় তাকে একেবারে কাবু করে ফেলেছে। গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই ইফরাদ আনতারার হাত ধরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। ইফরাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে আনতারার ডানে বামে তাকানোরও সুযোগ হলো না। সে শুধু ইফরাদের সঙ্গে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ইফরাদ আনতারাকে নিয়ে একটা বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে।নিচতলার একটা রুমে গিয়ে প্রবেশ করে তারা।
রুমটা বেশ পরিপাটি, আধুনিক একটা কেবিন। সামনে একটা চেয়ারে একজন লোক বসে আছেন। পরনে স্যুট। দেখলেই বোঝা যায়, তিনি একজন উকিল। তার সামনে রাখা টেবিলের ওপর একটি নামের প্লেট—আসাদ আহমেদ। আসাদ আহমেদ ইফরাদের পারিবারিক উকিল।
লোকটা ইফরাদকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন। কিন্তু আজ ইফরাদ সালামের কোনো উত্তর দেয় না।
আসাদ আহমেদ আবার বলেন,

— স্যার, বলুন।
ইফরাদ গিয়ে আনতারাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজেও আনতারার পাশে বসে। সাফিন তাদের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে রইল। ইফরাদ আসাদ আহমেদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— সব কাগজ রেডি?
আসাদ আহমেদ বলেন,
— জি, স্যার। জাস্ট সাইনটা করবেন।
ইফরাদ সংক্ষেপে বলে,
— ওকে।
এদিকে আনতারা ভয়ে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে গেছে।উকিলের উপস্থিতি, কাগজপত্রের কথা, সবকিছু মিলিয়ে আনতারা বুঝে গেল, ইফরাদ তাকে তালাক দেওয়ার জন্যই এখানে নিয়ে এসেছে। তাহলে সত্যিই ইফরাদ তার মাকলভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে তাকে তালাক দিচ্ছে? কথাটা মনে হতেই আনতারার গলা শুকিয়ে গেল।সে একবার ইফরাদের দিকে তাকাশ। ইফরাদের মুখে তখনো রাগের ছাপ স্পষ্ট।
এদিকে আসাদ আহমেদ একটা কাগজ ইফরাদের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সঙ্গে একটা কলমও এগিয়ে দিয়ে বলেন,

— স্যার, এখানে সাইন করুন।
ইফরাদ কলমটা হাতে নিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করতে যাবে, ঠিক তখনি আনতারা আচমকা ইফরাদের হাত টেনে থামিয়ে দেয়। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলে,
— রাদ, আপনি কেন রাগের মাথায় এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? রাদ, তালাক জিনিসটা ছোট না। আমাদের তালাক হয়ে গেলে আর আমরা এক হতে পারব না। আপনি তো বলেছিলেন, আপনি সবসময় আমার পাশে থাকবেন। তাহলে এখন কেন এমন করছেন? দয়া করে সাক্ষর করবেন না।
কথাগুলো শুনে আসাদ আহমেদ একবার ইফরাদের দিকে তাকান। ইফরাদ গভীরভাবে একটা শ্বাস নেয়। তারপর অন্য হাত দিয়ে আনতারার হাতটা নিজের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

— রাগের মাথায় হলেও সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি।
আনতারা কান্নাভেজা চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমাকে তালাক দিয়ে দেওয়াটাই আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত? আমার অপরাধ কী? কোন দোষে আপনি আমাকে তালাক দিচ্ছেন? শুধু আপনার মা বলেছে বলে?
ইফরাদ আনতারার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ কঠিন গলায় বলে,
— তোমার কোনো অপরাধ নেই। কিন্তু আমি যেটা করছি, সেটা মানতে তুমি বাধ্য।
কথাটা বলেই ইফরাদ কাগজটায় স্বাক্ষর করে দেয়। আনতারা থ মেরে তাকিয়ে থাকে সাক্ষরটার দিকে। ইফরাদ সেই কাগজটা আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কলম এগিয়ে দিয়ে বলে,
— নাও, সাইন করো। দ্রুত।
আনতারা কাগজটার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
— না, আমি এই তালাকনামায় সাক্ষর করব না।
ইফরাদ এবার আরো গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
— সাইন করো। তাড়াতাড়ি।
আনতারা এবার আগের চেয়েও বেশি ভেঙে পড়ে। কান্নায় আনতারার পুরো শরীর কেঁপে উঠছে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,

— রাদ, আমি তালাক চাই না। আমি আপনার সঙ্গে সংসার করতে চাই। আমি এই তালাকনামায় সাক্ষর করব না।
ইফরাদ কঠোর স্বরে বলে উঠে,
— সাইন করতে বলেছি!
ইফরাদের ধমকে আনতারা ভয়ে কেঁপে উঠে। খিঁচুনি দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাঁপা হাতে কলমটা তুলে নেয় আনতারা। তারপর আরেকবার অসহায় চোখে ইফরাদের দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে ছিল শেষ আশাটুকু, হয়তো ইফরাদ তার কান্না দেখবে, তার কথা শুনবে, হয়তো শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলবে। কিন্তু ইফরাদ তার সেই দৃষ্টির দিকে কোনো পাত্তাই দেয় না। বরং ইশারায় বুঝিয়ে দেয়, সাইন করতে। আনতারার চোখ থেকে টুপ করে এক ফোঁটা পানি কাগজের ওপর পড়ে গেল। কাঁপা হাতে আনতারা শেষ পর্যন্ত কাগজটাতে স্বাক্ষর করে দেয়।
স্বাক্ষর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আনতারা কান্নায় ভেঙে পড়ে সামনের দিকে নুইয়ে গেল। তার হাত থেকে কলমটা ছুটে মেঝেতে পড়ে গেল। শরীরের সমস্ত শক্তি এক মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে গেছে।
আসাদ আহমেদ সামনে থেকে কাগজটা নিয়ে নিলেন। তারপর বলেন,

— জি, হয়ে গেছে।
তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— এখন আর আপনার কোনো অধিকার নেই এর ওপর।
কথাটা আনতারার কানে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ‘এখন আর আপনার কোনো অধিকার নেই।’ আর কোনো অধিকার নেই। সব অধিকার শেষ। সব অধিকার মুছে গেল। এক মুহূর্ত আগেও যে মানুষটা ছিল তার স্বামী, যার ওপর তার অধিকার ছিল, যার সঙ্গে একটা সংসার, একটা ভবিষ্যৎ আর অসংখ্য স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল, এখন সেই মানুষটার ওপর তার আর কোনো অধিকার নেই। এখন সে একজন তালাকপ্রাপ্ত নারী। রাদের ওপর আর তার কোনো অধিকার নেই। রাদকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার অধিকারও আর নেই। এখন এসব গুনাহ!

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯

তাদের আর কখনো একসঙ্গে থাকা হবে না। আর কখনো তাদের সেই মিষ্টি মুহূর্তগুলো ফিরে আসবে না। যে মানুষটাকে ঘিরে এত স্বপ্ন দেখেছিল আনতারা, সেই মানুষটাই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় হারানো মানুষ।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৯ (৩)