রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৮
অধরা মিনহা
বিকেল সাড়ে চারটা। চৌধুরী গ্রুপের মিটিং রুমে সবাই বসে আছে। বড় টেবিলটা ঘিরে ইফরাদ, তার পেছনে সাফিন দাড়িয়ে। ইফরাদের পাশে ইফতিন, হেড অফ সেলস, আইটি ম্যানেজার, প্রজেক্ট ম্যানেজার। টেবিলের ওপাশে ইখতিয়ার চৌধুরী, হেড অফ মার্কেটিং, বিজনেস অ্যানালিস্ট, ইভেন্ট ম্যানেজার সহ আরও কয়েকজন। সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ইরাইনা। তার পেছনের বোর্ডের স্ক্রিনে নতুন পারফিউম লঞ্চের ছবি। পাশে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেঘলা। ইরাইনা কোম্পানির সিওও। ইফরাদ ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ইফতিন সিএফও। আর ইখতিয়ার চৌধুরী সিইও।
ইরাইনা টেবিলে দুই হাত রেখে একটু ঝুঁকে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে,
— গ্রাইজ, কালকে আমাদের বেস্টটা দিতে হবে। সব টাইমলাইন যেন আমার পারফিউমই কেড়ে নেয়।
প্রজেক্ট ম্যানেজার হালকা হেসে বলে,
— অলরেডি নিয়ে নিয়েছে। আমাদের টিজার ৫ মিলিয়ন ভিউস পার করেছে।
ইখতিয়ার লজিস্টিকস ম্যানেজারের দিকে তাকায়,
— ডিস্ট্রিবিউশন কনফার্ম?
— হ্যাঁ, ইউরোপ আর এশিয়ার মেইন মার্কেটগুলোতে স্টক চলে গেছে। ঢাকার রিটেইল পার্টনারদের কাছেও কাল সকালে পৌঁছে যাবে।
ইফরাদ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
— অনলাইন স্টোরে যেন কোনো সার্ভার ইস্যু না হয়।
আইটি ম্যানেজার মাথা নেড়ে বলে,
— লোড টেস্ট করা হয়েছে। তারপরও লঞ্চের সময় ১০-১৫ মিনিট মনিটরিং টিম থাকবে।
ইরাইনা আবার বলে,
— রেড কার্পেট ৬টায় ওপেন। ৭টা থেকে গেস্ট আসবে। মেইন লঞ্চ ৮টা ৩০ এর এক মিনিটও এদিক-সেদিক হবে না। কারও জন্য ডিলে হবে না।
ইফতিন জিজ্ঞেস করে,
— মিডিয়া ইন্টারভিউ জোন আলাদা করা হয়েছে তো?
ইভেন্ট ম্যানেজার বলে,
— হ্যাঁ, রেড কার্পেটের পাশেই। গেস্টরা ঢুকেই ইন্টারভিউ দিতে পারবে, পরে ভিড় হবে না।
এবার ইরাইনা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। ঠোঁটে পরিমিত হাসি টেনে বলে,
— ওকে গ্রাইজ, অনেক আলোচনা হয়েছে। আশা করি কাল সবকিছু পারফেক্ট হবে। পারফিউমের সাইটে আমরা ভালো নাম করতে পারব। নাও, দা মিটিং ইজ ক্লোজড।
চেয়ারগুলো একে একে সরে। সবাই উঠে দাঁড়ায়। তারপর ধীরে ধীরে সবাই বাইরে চলে গেল। রুমে আছে শুধু ইফরাদ, ইফতিন, ইখতিয়ার, ইরাইনা, সাফিন আর ইরাইনার অ্যাসিস্ট্যান্ট। ইফতিনও উঠে দাঁড়িয়ে শরীরটা একটু টেনে নেয়। টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিয়ে বলে,
— ওকে এভরিওয়ান, আমিও গেলাম।
ইফরাদও উঠে দাঁড়ায়। তখনি ইরাইনা বলে ওঠে,
— ব্রো, তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে। থেকো।
ইফরাদ থেমে যায়। ইফতিন বেরিয়ে যায়। ইখতিয়ার চৌধুরীও মিটিং রুম থেকে চলে যায়। ইরাইনা তাকায় সাফিনের দিকে। সাফিন বুঝতে পারে, তারও বেরিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু ইফরাদের অনুমতি ছাড়া সে যেতে পারে না। তাই সে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদ চোখের ইশারায় যেতে বলে। সাফিন মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায়। ইরাইনা এবার তার এসিস্ট্যান্টের দিকে তাকাতেই সেও ইরাইনাকে বলে চলে যায়।
ওরা বেরিয়ে যেতেই ইরাইনা সরাসরি বলে,
— তুমি কি আনতারাকে শর্ত দিয়েছো পর্দা ছেড়ে দেওয়ার জন্য?
ইফরাদ একটু অবাক হয়,
— তুমি জানো কীভাবে? তোমাকে কে বলেছে?
ইরাইনা শান্ত গলায় বলে,
— কালকে তোমার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কথা শুনে ফেলি। জানি, কারও পার্সোনাল কথা শোনা ঠিক না। কিন্তু তোমার ওই কথাটা শুনে থামতে পারিনি।
ইফরাদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়ে,
— হ্যাঁ, বলেছিলাম। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, ও যে ধার্মিকের মুখোশ পরে আছে সেটা খুলে যায় কিনা। ওর আসল উদ্দেশ্য, আমাকে বিয়ে করে আমার সম্পত্তি পাওয়া। আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ধর্মকে ব্যবহার করছে। এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম।
ইরাইনা স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে,
— তাহলে প্রমাণ হলো?
ইফরাদ একটু চোখ সরু করে তাকায়। ইরাইনা আবার বলে,
— উল্টোই প্রমাণ হয়েছে। আনতারা সত্যি। ও কোনো ভান করছে না।
ইফরাদ বিদ্রুপ করে বলে,
— এসব ওর চালাকি। ও ভেবেছে এমন বললে আমি ইমপ্রেস হবো।
ইরাইনা অবিচল গলায় বলে,
— ব্রো, যখন ও তোমাকে মানা করে দিয়েছিলো, তুমি রাগের মধ্যে ছিলে। তুমি চাইলে তখনই তালাক দিয়ে দিতে পারতে। এটা আনতারা জানত। তবুও ও ধর্ম নিয়ে একটুও কম্প্রোমাইজ করেনি। এটাতেই বোঝা যায়, আনতারা ভান করছে না।
ইফরাদ কিছুটা থামে। তারপর দৃঢ় কন্ঠে বলে,
— ধরলাম, ও সত্যিই ধার্মিক। কিন্তু তাহলে সেদিন হোটেল রুমে এলো কেন? তোমার কী মনে হয়? ও আমাকে ফাঁসায়নি?
— হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ আনলেই তো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
ইফরাদ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে,
— সাফিনকে পাঠিয়েছিলাম ফুটেজ আনতে। কিন্তু আমার রুমের সামনে ক্যামেরায় কিছুই দেখা যায় না। সব অন্ধকার।
ইরাইনা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?
— আমি থার্ড ফ্লোরে ছিলাম। ওই দিকটা এমনিতেই অন্ধকার ছিল। তার ওপর যে ড্রিম লাইটগুলো ছিল, সেগুলো আমরা নিজেরাই টেনিস বল ছুঁড়ে ভেঙে ফেলেছিলাম।
ইরাইনা অবাক কন্ঠে বলে,
— কেন?
— অনেক ড্রাংক ছিলাম। নেশার মধ্যে ভেঙেছি।
— ব্রো, তুমি যেভাবে পুরো দোষটা আনতারার ওপর দিচ্ছো….. এমনও তো হতে পারে, আনতারা ভুল করে ড্রিংক করে ফেলেছিল। তারপর তোমার সাথে দেখা হয়, আর তুমি নিজের সম্মতিতেই ওকে রুমে নিয়ে গেছো। পরে নেশা কেটে গেলে তোমার মনে নেই।
ইফরাদ থমকে গিয়ে বলে,
— তোমার কি মনে হয় আমি এমন?
ইরাইনা না সূচক মাথা নাড়ে,
— নেশা করলে মানুষ ভেবে কিছু করে? মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে? এই যে তোমরা বল ছুঁড়ে লাইট ভেঙেছো, হুশে থাকলে করতে?
ইফরাদ আর কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। তবে এমন না যে সে ইরাইনার কথা মেনে নিয়েছে। সে এখনও সেই রাতের জন্য আনতারাকেই দায়ী মনে করে। তার মতে আনতারা সবাইকে বোকা বানাচ্ছে, নিজের মতো করে ফাঁদ পেতেছে।
ইফরাদকে চুপ থাকতে দেখে ইরাইনা একটু কাছে এসে মুখোমুখি দাঁড়ায়,
— আনতারা খারাপ মেয়ে না। আমার মনে হয়, তুমি যদি পুরনো সবকিছু ছেড়ে ওকে একটা সুযোগ দাও, তুমি ভালো থাকবে। মেয়েটা তোমাকে ভালো রাখবে।
ইফরাদ চোখ তুলে তাকায়। এই কথাটা এড়িয়ে যায়। বলে,
— বাসায় যাবে আমার সাথে? নাকি আমি একাই যাই?
ইরাইনা সংক্ষেপে বলে,
— যাবো।
— ওকে। আমি নিচে যাচ্ছি, তুমি এসো।
বলেই ইফরাদ বেরিয়ে যায়। ইরাইনাও কিছুক্ষণ পর বের হয়। তাদের অফিসটা পুরো ১১ তলা বিল্ডিং জুড়ে। একতলা থেকে এগারো তলা, সবটাই চৌধুরী গ্রুপের। ইরাইনা করিডোরে এসে দাঁড়াতেই দেখে, ইফরাদ লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু দেখছে। লিফট নিচ থেকে ওপরে উঠছে। লিফট এসে থামলে দুজনই ভেতরে ঢুকে নিচে নেমে যায়।
মাগরিবের আযান পড়তে আর বেশি দেরি নেই, বড়জোর পাঁচ মিনিট। আনতারা চুপচাপ বসে তসবিহ পড়ছে। ইফতারের আগে দোয়া-দুরুদ পড়া তার অভ্যাস। শাহনারা হয়ত এখনই খাবার নিয়ে আসবে। ইফরাদ বাসায় নেই। সকাল আটটায় ঘুম থেকে উঠে, রেডি হয়ে নয়টার মধ্যেই বেরিয়ে গিয়েছিল। তারপর আর ফেরেনি। হঠাৎ দরজায় নক পড়ে। আনতারা ভাবে, নিশ্চয়ই শাহনারা এসেছে। কিন্তু আনতারা দরজা খুলে দেখে, না শাহনারা না, অন্য এক মেইড দাঁড়িয়ে আছে।
মেইড বলে,
— ম্যাম, আপনার জন্য নিচে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আনতারা একটু অবাক হয়,
— নিচে?
— জি। আপনি আসেন। আমি যাচ্ছি।
মেইড চলে যেতে নিলে আনতারা পেছন থেকে ডাক দেয়,
— শাহনারা আপু কোথায়?
— নিচেই।
— ওহ। আসলে নিচে তো অনেক পুরুষ মানুষ থাকে। আমি তো তাদের সামনে যাই না। যদি রুমে খাবারটা দিয়ে দিতেন, ভালো হতো।
— এখন বাড়িতে যেসব পুরুষ কাজ করে, তারা কেউ নেই। আপনি আসতে পারেন ম্যাম।
আনতারা একটু ভেবে বলে,
— আচ্ছা, আসছি।
মেইড চলে যায়। আনতারা আবার রুমে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। হিজাবটা ঠিক করে নেয়, যেন কোথাও কিছু বোঝা না যায়, শরীর ঢেকে থাকে ঠিকভাবে। আনতারার হিজাব ঠিক করার মাঝেই দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে ইফরাদ। আনতারা তাকিয়ে সালাম দেয়। ইফরাদ কোনো জবাব দেয় না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ আগের ইরাইনার কথা মাথায় ভেসে ওঠে। তবে মুহূর্তেই সেগুলো ঝেড়ে ফেলে। সালামের উত্তর না পেয়ে আনতারার মনটা একটু খারাপ হয়। তবুও কিছু বলে না।
ইফরাদ এগিয়ে এসে কোটটা বেডের ওপর রেখে দেয়।
তারপর এগিয়ে গিয়ে সাইড টেবিলের কাছ থেকে এসির রিমোটটা নিয়ে এসি চালু করে দেয়। রুমে এসি বন্ধ ছিল। আনতারার এসি খুব একটা ভালো লাগে না। সে ভোগবিলাসিতাও পছন্দ করে না। তার জীবন একেবারেই সাদামাটা, সহজ-সরল।
আনতারা আর কিছু বলে না। কারণ সে জানে ইফরাদ উত্তর দেবে না, আর দিলেও হয়তো খারাপ ব্যবহারই করবে। ইফরাদ এমনটাই করে আসছে। আনতারার কথার বিপরীতে বাজে ব্যবহারটা নিত্যদিনের হয়ে গেছে। তাই আনতারা আর চায় না ইফরাদকে আওড়াতে। আনতারা হিজাব ঠিক করে, ইফরাদকে পাশ কাটিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। লিভিং রুম পার হয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে শার্লিন ইমরোজ আর শাহনারা। শাহনারা ভয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আনতারাকে দেখতেই শার্লিন ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— কী ব্যাপার? রোজ তোমাকে রুমে গিয়ে খাবার দিয়ে আসতে হবে কেন? নিচে এসে ডাইনিং টেবিলে খেতে পারো না?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আসলে বাসায় অনেক পুরুষ কাজ করে। আমি তো তাদের সামনে যাই না, তাই নিচে আসা হয় না।
শার্লিন ইমরোজ মুখটা বেঁকিয়ে কিচেনের দিকে চলে যান। ঠিক তখনি চারদিক থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসে।
শাহনারা দ্রুত বলে ওঠে,
— ম্যাম, আজান হয়ে গেছে। বসুন, পানি খেয়ে রোজা ভাঙুন।
আনতারা হালকা মাথা নেড়ে চেয়ারে বসে। সামনে তাকিয়ে দেখে টেবিলে ভাত, মুরগির মাংস, গরুর তরকারি আর পানি রাখা। সে দুহাত তুলে মোনাজাত ধরে। ইফতারের আগে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়, এই বিশ্বাস থেকেই ছোট করে আল্লাহর কাছে চেয়ে নেয়। তারপর মোনাজাত শেষ করে টেবিলটায় একবার চোখ বুলিয়ে বলে,
— খেজুর নেই? খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা সুন্নত।
শাহনারা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
— না, বাসায় খেজুর শেষ।
আনতারা ধীর গলায় বলে,
— ওহ।
তারপর বিসমিল্লাহ বলে পানি খেয়ে রোজা ভাঙে। শাহনারা এগিয়ে এসে প্লেটে ভাত তুলে দেয়। তরকারি দিতে যাবে, এমন সময় পেছন থেকে শার্লিন ইমরোজের কণ্ঠ ভেসে আসে,
— যাও, প্লেটটা নিয়ে ওকে দাও।
আনতারা আর শাহনারা দুজনেই তাকায়। একটা মেইড এসে আনতারার সামনের প্লেটটা সরিয়ে আরেকটা প্লেট রাখে। সেখানে শুধু পানিভাত আর একটা কাঁচা মরিচ।
শার্লিন ইমরোজ ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলেন,
— এই নাও, তোমার জন্য বেস্ট ইফতার।
তারপর শাহনারাকে বলেন,
— প্লেটে তরকারির ঝোল দে।
শাহনারা থমকে যায়। কী করবে বুঝতে পারে না। শার্লিন এবার ধমকে উঠেন,
— কী হলো? কথা শুনছিস না?
ভয়ে শাহনারা দ্রুত ঝোল দিতে শুরু করে। চার চামচ দিতেই শার্লিন থামিয়ে দেন,
— হয়েছে, থামো।
শাহনারা থেমে যায়। শার্লিন আবার আনতারার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেন,
— তোমার জন্য পানিভাত আর ঝোলই যথেষ্ট। সমস্যা হওয়ার কথা না। ইটভাটা ব্যবসায়ীর সন্তানরা তো এসব খেয়েই বড় হয়, তাই না?
এতক্ষণ আনতারা মাথা নিচু করে ছিল। সে বুঝতে পেরেছে তাকে নিচে নিয়ে আসা হয়েছেই অপমান করার জন্য। এবার আনতারা মাথা তুলে তাকায়। চেহারা একদম শান্ত তবে কথার ধরণ ছিলো তীক্ষ্ণ,
— কোনো সমস্যা হবে না। আমি সব খাবারই খেতে পারি। তবে এই জন্য না যে আমরা এসব খেয়ে বড় হয়েছি। আমার আব্বু আমাদের তার সামর্থ্য অনুযায়ী, আল্লাহর রহমতে, ভালোই খাইয়েছেন। এছাড়া সব খাবারই খাওয়া উচিত।
শার্লিন ইমরোজ বলেন,
— যেহেতু সব খাওয়া উচিত, তাহলে সুন্দর করে খেয়ে নাও।
আনতারা আর কিছু বলে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাত বাড়িয়ে প্লেটের পানিভাতটা ঝোলের সাথে মেখে নেয়। তারপর বিসমিল্লাহ বলে এক লোকমা মুখে তোলার জন্য হাত উঠায়, ঠিক তখনি একটা শক্ত পুরুষালি হাত তার হাত চেপে ধরে। সবাই তাকায়। দেখে, ইফরাদ দাঁড়িয়ে আছে। এখনও বাইরের পোশাকেই। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, শার্টের প্রথম তিনটা বোতাম খোলা।
ইফরাদ কঠিন গলায় বলে,
— ভাত রাখো। খেতে হবে না। রুমে আসো।
বলেই আনতারার হাত থেকে ভাতের লোকমাটা ঝেড়ে প্লেটে ফেলে দেয়। তারপর হাত ধরে টেনে তোলে,
— কী হয়েছে? উঠতে বলেছি।
আনতারা কিছু বলার আগেই তাকে টেনে দাঁড় করায়।তারপর হাত ধরেই নিয়ে যায়। ইফরাদ আনতারাকে নিজের রুমে এনে ছেড়ে দিয়ে বলে,
— যাও, ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে আসো।
আনতারা কিছুক্ষণ ইফরাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে অভিমান স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছিল। কিন্তু কিছু বলে না আনতারা। চোখ সরিয়ে নেয়। চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে যায় হাত ধুতে। আনতারা হাত ধুয়ে বেরিয়ে এসে রুমে দাঁড়ায় না। সোজা বেলকনিতে চলে যায়। ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে আনতারার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
বেলকনিতে গিয়ে আনতারা মাটিতে বসে পড়ে। দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে মাথা রাখে হাঁটুতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আনতারার চোখ থেকে টুপটাপ করে জল পড়তে শুরু করে। তার খুব কান্না পাচ্ছে। আনতারা ঠোঁট কামড়ে ধরে, শ্বাস আটকে রাখে। কান্না করতে চায় না সে। তবুও চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আজকের এই ঘটনাটা আনতারার মনে আগের কষ্টগুলোর চেয়ে গভীরভাবে বিঁধেছে।
শার্লিন ইমরোজের কথাগুলো সে কোনোভাবে সহ্য করতে পারত। কিন্তু ইফরাদ? সে কী করল? তার হাত থেকে খাবার ফেলে দিয়ে তাকে তুলে আনল? সে সারাদিন রোজা রেখেছিল। স্ত্রী হিসেবে না হোক, অন্তত একজন মানুষ হিসেবে তো তাকে ভাবতে পারত! কিন্তু না, ইফরাদ তো তাকে মানুষ বলেই মনে করেনি। মা নিজে হাতে তাকে পানিভাত খেতে দিয়েছিল, আর সেই ভাতটুকুও ছেলে তার কাছ থেকে কেড়ে নিল।
আনতারার মনে পড়ে বিয়ের আগের কথা। তখনও অনেক সময় সে ইফতার করতে পারত না। তার বাবা ব্যবসার কাজে বাড়ির বাইরে থাকলে সৎ মা তাকে ঠিকমতো খেতে দিত না। সারাদিন রোজা রেখে বাড়ির কাজ শেষ করে যখন ইফতার করতে যেত, তখন সৎ মা সব খাবার ফ্রিজে রেখে তালা দিয়ে দিত। ক্ষুধার জ্বালায় সে ছটফট করত, দোয়া-দুরুদ পড়ত। এখন এখানে এসেও তার কপালে খাবারের কষ্ট জুটেছে। তাহলে হয়তো তার কপালে ক্ষুধার জ্বালা আজীবনই লেখা আছে। আনতারা চুপচাপ কাঁদতেই থাকে। তার চোখ থেকে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। আনতারা এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। পেটের ভেতরে তীব্র ক্ষুধা মোচড় দিচ্ছে।
ইফরাদ আনতারা চলে যেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গাড়ি ফুল স্পিডে চালাতে থাকে। পথেই একটা রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ে তার। সে গাড়ি সাইডে দাঁড় করায়, মাস্ক পরে নেয়। তারপর গাড়ি থেকে নেমে রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে হাতে কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে। এরপর আবার গাড়িতে উঠে বসে, গাড়ি স্টার্ট দেয়। দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে আসে।
বাড়িতে ফিরে প্যাকেটগুলো হাতে নিয়ে রুমে ঢুকতেই দেখে রুম এখনো খালি। বুঝতে পারে আনতারা এখনো রুমে আসেনি। ইফরাদ জোরে জোরে শ্বাস নেয়। সারাদিন অফিসের প্রচণ্ড কাজের চাপ ছিল, তারপর আবার বাইরে যাওয়া-আসার ধকল মিলিয়ে সে বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একটু রেস্ট নেওয়ার সময় পায়নি সারাদিন।
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা।
ইফরাদ সবেমাত্র শার্ট খুলে বিছানায় রাখে, তখনি তার ফোনে কল আসে। ইফরাদ ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত থাকে, এমন সময় কোনো নক না করেই রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে ইরাইনা। ঢুকেই সোজাসুজি বলে,
— কথা আছে ব্রো।
ইফরাদ কপালে ভাঁজ ফেলে ফোনে বলে,
— পরে কল দিচ্ছি আমি।
বলেই কল কেটে দেয়। তখনি ইরাইনা কোনো অপেক্ষা না করেই বলে ওঠে,
— তুমি এখানে ফোনে কথা বলছো আর নিচে তোমার বউকে মাম্মা কথা শুনাচ্ছে!
ইফরাদ বিরক্ত হয়ে বলে,
— তোমাকে তো বলেছি ঐ মেয়েকে আমি বউ মানি না। আর কতবার তোমাদের বললে কথাটা মাথায় ঢুকবে? ঐ মেয়ের সাথে মম যা ইচ্ছে তাই করুক! আমার কিছু যায় আসে না।
ইরাইনা চোখমুখ শক্ত করে বলে,
— সারাদিন রোজা ছিলো। এখন খেতে বসেছে মম মুখের সামনে থেকে কেড়ে নিয়ে বাসি পানি ভাত দিয়েছে! তোমার খারাপ লাগছে না?
ইফরাদ ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয়,
— তোমার যদি এতোই কষ্ট লাগে, তাহলে মাম্মাকে বাধা দিতে!
ইরাইনা ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— আমি বাধা দিলেই বা কি হবে? যদি মেয়েটার হাসবেন্ডই প্রতিবাদ না করে? আমি আজ বাধা দিলে কাল আবার করবে মাম্মা এমন! কিন্তু যদি একবার ওর হাসবেন্ড পাশে থাকে, প্রতিবাদ করে তাহলে দ্বিতীয়বার ওকে কেউ অপমান করার আগে কয়েকবার ভাববে! হয়ত পরিণাম ভেবে অপমান করার সাহসও পাবে না।
বলেই ইরাইনা রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ইফরাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকা শার্টের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ করে শার্ট তুলে গায়ে জড়িয়ে নেয়। তারপর বোতাম লাগাতে লাগাতে রুম থেকে বের হয়।
নিচে নেমে ডাইনিং স্পেসে আসতেই দেখে ইরাইনা ভুল বলেনি। আনতারার সামনে পানিভাত আর ঝোল রাখা। আনতারা চুপচাপ ভাত মাখাচ্ছে। এটা দেখেই ইফরাদ আনতারাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে।
বর্তমান,
ইফরাদ দরজা বন্ধ করে বেলকনির দিকে যায়। সেখানে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা আনতারার দিকে তাকিয়ে ডাকে,
— এই মেয়ে?
আনতারা ইফরাদের ডাক কানে যেতেই দ্রুত চোখের জল মুছে ফেলে। তারপর ধীরে ধীরে তাকায় ইফরাদের দিকে।
বেলকনিটা অন্ধকার থাকায় ইফরাদ দেখতে পারে না আনতারা কাঁদছে। শুধু অন্ধকারে সে বুঝতে পারে আনতারা তার দিকে মাথা তুলে তাকিয়েছে।
ইফরাদ আবার বলে,
— রুমে এসো তাড়াতাড়ি।
বলেই ইফরাদ ভেতরের দিকে চলে আসে এবং অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পার হয়ে গেলেও আনতারা না আসায় সে আবার বেলকনির দিকে পা বাড়ায়। ঠিক তখনই আনতারা রুমে ঢুকে পড়ে। সে বেলকনির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে,
— ডেকেছেন?
এবার ইফরাদের নজরে আসে আনতারার লাল হয়ে যাওয়া কান্নাভেজা মুখটা। সে বুঝতে পারে, আনতারা এতক্ষণ বেলকনিতে বসে কাঁদছিল। কিন্তু কেন? তার মাম্মার কথায়, নাকি ক্ষুধার কারণে, নাকি দুটোই? ইফরাদ এবার শান্ত গলায় বলে,
— কাছে আসা যায় না?
আনতারা নড়ে না। চুপচাপ মাথা নিচু করে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। ইফরাদ এবার নিজেই এগিয়ে আসে। আনতারার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু তবুও আনতারা মাথা তোলে না। ইফরাদের মনে নিজের অজান্তেই ধরে নেয়, আনতারা অভিমান করে আছে। বরফের মতো জমে থাকা অভিমান। একটু ছুঁলেই হয়তো ভেঙে যাবে সেটা। ইফরাদ আস্তে করে হাত তুলে আনতারার ভেজা চোখের পাপড়ি বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতোভাবে মুছে নরম স্বরে বলে,
— এতো কান্না কেন করেছো, আনতারা? চোখগুলো তো ফুলে গেছে।
আনতারা হঠাৎ এমন স্পর্শ আর প্রথমবার নাম ধরে ডাক শুনে দ্রুত চোখ তুলে তাকায়। তার এমন দৃষ্টিতে ইফরাদ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে এবং দ্রুত সরে আসে। আনতারা তখনো অবাক হয়ে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইফরাদ আনতারার থেকে চোখ সরিয়ে দু’পা এগিয়ে গিয়ে টেবিলের ওপর রাখা প্যাকেটগুলো তুলে নেয়। তারপর আনতারার কাছে এসে প্যাকেটগুলো আনতারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
— এটায় বিরিয়ানি আছে। মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নাও।
আনতারা প্যাকেটগুলো ধরে না। সে অবাক হয়ে বলে,
— মানে?
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— মানে সিম্পল। প্যাকেট খুলে বিরিয়ানি খাও।
আনতারা কিছুই বুঝে উঠতে পারে না, তাই শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ইফরাদ এবার নিজেই আনতারার হাতে প্যাকেটটা ধরিয়ে দেয়। ঠিক তখনি একজন মেইড এসে দরজায় নক করে। ইফরাদ গিয়ে দরজা খুলে দেয়। মেইড প্লেট নিয়ে দাড়িয়ে। ইফরাদ তার কাছ থেকে প্লেট নিয়ে আবার দরজা লাগিয়ে ফেলে। তারপর আনতারার হাতে প্লেট দিয়ে বলে,
— এই নাও প্লেট। এখন খাম্বার মতো না দাঁড়িয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি ইফতার করো।
বলেই সে সরে গিয়ে সাইড টেবিল থেকে এসির রিমোট তুলে নেয় এবং এসির তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তারপর পরনে থাকা শার্টটা খুলে বেডে রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে নেয়।
আনতারা এখনো বুঝতে পারছে না সে কী অনুভব করবে। একটু আগেই সে ইফরাদকে ভুল বুঝে কেঁদেছিল। ভাবছিল, ইফরাদ হয়তো তাকে কষ্ট দিতেই খাবার থেকে উঠিয়ে এনেছে। অথচ এখন বুঝতে পারছে, সে ভুল ছিল। ইফরাদ বরং তাকে অপমান থেকে বাঁচিয়ে এনেছে।
ইফরাদ এসির দিকে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আনতারা এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সে ভ্রু কুঁচকে বলে,
— এই মেয়ে, তুমি যাওনি?
আনতারা দ্রুত প্যাকেট আর প্লেট টেবিলে রেখে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে আসে। ফিরে এসে দেখে, ইফরাদ টি-শার্ট পরে বিছানায় বসে ফোনে কথা বলছে।
আনতারা চুপচাপ প্যাকেট থেকে বিরিয়ানি প্লেটে ঢালে। তারপর একটা লোকমা মুখের কাছে নিয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদ তখনো ফোনে ব্যস্ত। আনতারা মনে মনে নিজেকেই দোষ দেয়, সে অকারণে ভুল বুঝেছিল ইফরাদকে। পরক্ষনেই হালকা একটা মুচকি হাসি ফুটে ওঠে আনতারার ঠোঁটে। কেন জানি তার ভীষণ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, এই প্রথম কেউ তার জন্য দাঁড়িয়েছে, তার খেয়াল রেখেছে।
আনতারা আস্তে করে বলে,
— বিসমিল্লাহ।
বলেই সে লোকমাটা মুখে নেয়। কিছুক্ষণ পর হঠাৎই আনতারার মনটা খুচখুচ করে উঠে। ইফরাদকে রেখে খেতে মন মানছে না। সাহস করে আনতারা উঠে দাঁড়ায়। প্লেটটা হাতে নিয়ে ইফরাদের পাশে গিয়ে বসে। তারপর একটা লোকমা তার মুখের সামনে ধরে। ইফরাদ এখনো ফোনে কথা বলছে। হঠাৎ মুখের সামনে লোকমা দেখে সে পাশে তাকায়। দেখে আনতারা বসে আছে, চোখে অপেক্ষা।
আনতারা আস্তে করে বলে,
— খান।
ইফরাদ ফোনে থেকেই মাথা নেড়ে না বলে দেয়। আবার কথায় মন দেয়।
আনতারা আবার নরম গলায় বলে,
— অল্প একটু খান?
ইফরাদ ফোনটা একটু দূরে সরিয়ে বিরক্ত গলায় বলে,
— বললাম তো না!
আনতারার মুখটা মুহূর্তেই নেমে যায়। সে চুপচাপ লোকমাটা প্লেটে রেখে দেয়। এটা দেখে ইফরাদের কেমন যেন লাগে। আনতারা উঠে যেতে নিলে ইফরাদ হঠাৎ আনতারার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। ফোনটা পাশে সরিয়ে রেখে আস্তে করে জিজ্ঞেস করে,
— তুমি হ্যান্ড স্যানিটাইজ করেছো?
আনতারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
— ওয়াশরুম থেকে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত পরিষ্কার করেছি।
ইফরাদ শান্ত গলায় বলে,
— আচ্ছা, দাও।
বলেই সে মুখ খোলে। আনতারা খুশি হয়ে আবার লোকমা তুলে দেয় ইফরাদের মুখে। ইফরাদ খেতে খেতে বলে,
— তোমাকে কিন্তু আমি বউ হিসেবে মেনে নেইনি।উল্টো-পাল্টা কিছু ভেবো না। মানবতার খাতিরে খাচ্ছি।
আনতারা ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে। ইফরাদ চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে। ইফরাদের মুখের খাবার শেষ হতেই আনতারা আবার লোকমা দেয়। ইফরাদ আবার ফোনটা একটু সরিয়ে আস্তে করে বলে,
— ফোনে কথাটা শেষ করে নেই?
আনতারা মাথা নেড়ে আচ্ছা বলে। ইফরাদ আবার ফোনে কথা বলতে থাকে। আনতারা নিজেও না খেয়ে চুপচাপ ইফরাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। বিষয়টা ইফরাদ খেয়াল করে দ্রুত কথাটা শেষ করে নেয়। কল কেটে ফোনটা বেডে রেখে সে আনতারাকে বলে,
— দাও।
বলেই মুখ হা করে। আনতারা আবার লোকমা তুলে দেয়। ইফরাদ খেতে খেতে আনতারার দিকে তাকিয়ে থাকে। মুখটা সবুজ প্রিন্টের জরজেটের ওড়নায় হিজাব বাঁধা। দুধ ফর্সা গায়ের রঙ, গালে মাঝারি সাইজের একটা তিল, সরু নাক, গোলাপি পাতলা ঠোঁট, টানা চোখ আর ঘন পাপড়ি। সব মিলিয়ে আনতারার মুখটা ভীষণ মায়াবী।হিজাবের কারণে সেই মায়া আরও বেড়ে গেছে।
আনতারা আরেকটা লোকমা দিতে গেলে ইফরাদ বলে,
— আর না। এখন তুমি খাও।
আনতারা বলে,
— আরেকটু খান। ওখানে তো আরও আছে।
রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ৭
ইফরাদ আর কিছু বলে না। ভেতরে ভেতরে তারও ভালো লাগছে আনতারার হাতের লোকমা খেতে। জীবনে এই প্রথম সে কারও হাত থেকে খাচ্ছে। আগে কখনোই সে কারও হাতের খাবার খায়নি। অন্যের হাতে খেতে তার ভালো লাগে না। নাক ছিটকানোর মতো স্বভাব তার। কারও হাতের খাবার তার রুচিতে কোলায় না। কিন্তু আনতারার হাতে খেতে তার কোনো অস্বস্তি লাগছে না, খারাপ লাগছে না। উল্টো ভালোই লাগছে।
