Home রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৬

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৬

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৬
নিলুফা নাজমিন নীলা

ড্রেসিংটেবিলের জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে রাখছিল নৌশি, আর আপনমনে গুনগুন করে গান গাইছিল। হঠাৎ ওর নজর আটকে গেল পাশে থাকা মাটির পুতুলটার ওপর। পুতুলটা একবার ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু আদনান সেটা পরম যত্নে মেরামত করে আবারও ওকে উপহার দিয়েছে।
​নৌশি মুচকি হেসে পুতুলটা হাতে তুলে নিল। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এটার সঙ্গে! আদনান যখন পুতুলটা দিয়েছিল, নৌশি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। সেদিন ও যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছিল! কিন্তু পরক্ষণেই নৌশির মুখের হাসি ম্লান হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল আদনান অন্য কাউকে ভালোবাসে। কথাটা মনে আসতেই হাজারো বিষাদ এসে ভিড় করল মনে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নৌশি পুতুলটা আবারও আগের জায়গায় রেখে দিল।
​হঠাৎ বাইরে থেকে একটা চড়া গলা ভেসে এল,

“নাদানের বাচ্চা কই রে?”
​নৌশিকে আর রুম থেকে বের হতে হলো না, তার আগেই আদনান ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল। নৌশির চোখ প্রথমেই আটকে গেল আদনানের হাতের দিকে সেখানে একটা টকটকে লাল গোলাপ। নৌশির মনে সুপ্ত আশার আলো জেগে উঠল। আদনান কি তবে গোলাপটা তাকেই দেওয়ার জন্য এনেছে?
​আদনান ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল,
“কী করিস?’’
নৌশি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কিছু না। আজ ভার্সিটি গিয়েছিলি?”
“হুম, এই তো মাত্রই আসলাম।”
​নৌশি এবার আদনানের হাতের দিকে ইঙ্গিত করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“গোলাপটা কার জন্য?”

আদনান রহস্যময় হেসে উত্তর দিল,
“কার জন্য আবার! কারো জন্য না।”
​নৌশি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কিনলি কেন?”
”কিনি নি তো, আমাকে দিয়েছে।” আদনানের কণ্ঠে এক ধরণের তৃপ্তির সুর।
​নৌশি অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। গলায় অবিশ্বাসের রেশ নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“কে দিয়েছে?”
আদনান বেশ চঞ্চল ভঙ্গিতে নিজের শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বলল,
“সব পার্সোনাল কথা তোকে বলা যাবে না।”
​নৌশির চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। অভিমান চেপে একটু কড়া গলাতেই ও বলল,

“আগে তো সব বলতি!”
“হ্যাঁ, আগে বলতাম কারণ আগে তুই হিংসা করতি না। কিন্তু ইদানীং খেয়াল করছি, তুই আমায় নিয়ে খুব হিংসা করছিস।”
​নৌশি যেন আকাশ থেকে পড়ল,
“হিংসা!”
“হুম, হিংসাই তো। আর হিংসা করাটাই স্বাভাবিক। তোর জায়গায় আমি থাকলেও হয়তো সেটাই করতাম। আমি প্রেম করছি অথচ তুই এখনো সিঙ্গেল, এতটুকু হিংসা তো হওয়ারই কথা, তাই না?”
​নৌশি ঠোঁটের কোণে বাঁকা একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,

“বাহ! এত বছরে তো আমাকে খুব ভালোই চিনেছিস।”
​আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সহসা হাতের গোলাপটি নৌশির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এই নে, ধর।”
নৌশি মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি কেন ধরব?”
“আরে নাদানের বাচ্চা, আমি এই গোলাপ দিয়ে কী করব? তার চেয়ে বরং তোর কাছেই রেখে দে।চ”
​নৌশি নিতে না চাইলেও আদনান জোর করে ওর হাতে ফুলটা গুঁজে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আদনান আড়াল হতেই নৌশি হাতের ফুলটা সজোরে বিছানায় ছুঁড়ে মারল।

তৃণা রান্নাঘরে কাজ করছে। সাথে রাহি বেগম ও ফারহানা বেগমও রয়েছেন। মিতুর গত দুদিন ধরে বেশ জ্বর, তাই তাকে রান্নাঘরের কোনো কাজে হাত দিতে দেওয়া হচ্ছে না। ইদানীং মিতুর শরীরটা প্রায়ই খারাপ যাচ্ছে।
​হঠাৎ বাইরে থেকে নুসরাতের কণ্ঠ শোনা গেল। তৃণা উঁকি দিয়ে দেখল নুসরাত আর নির্জন এসেছে। সাথে ছয়-সাত বছর বয়সী একটা ছোট্ট মেয়েও আছে। ওদের দেখে তৃণা হাসল। নুসরাত রান্নাঘরে ঢুকে তৃণাকে দেখেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
“ভালো আছো, তৃণা?”

“হ্যাঁ, ভালো। তুমি ভালো আছো তো?”
নুসরাত হেসে বলল, “হ্যাঁ, বেশ ভালো।”
​নুসরাতের হাসিখুশি মুখটা দেখে তৃণা মনে মনে খুব খুশি হলো। এই বাড়িতে আসার পর গত চার মাসে ও নুসরাতকে একদিনও এভাবে হাসতে দেখেনি। নির্জন যে একজন ভীষণ যত্নশীল স্বামী, সেটা অবশ্য সবাই জানে। তৃণা কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“বৈবাহিক জীবন কেমন কাটছে, নুসরাত?”
​নুসরাত ড্রয়িংরুমে বসে থাকা নির্জনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“জীবনে একজন বাদামওয়ালা থাকলে আর কী লাগে! মানুষটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত।”
​তৃণা অবাক হয়ে জানতে চাইল,

“বাদামওয়ালা মানে?”
নুসরাত রহস্য করে হাসল,
“তোমার সাথে এই বিষয়ে পরে অন্য সময় কথা বলব।”
​তৃণা মাথা নেড়ে সায় দিল। এর মাঝেই আরিয়ান এসে নির্জনের পাশে বসেছে। নুসরাত এবার তৃণার দিকে ফিরে নিচু স্বরে বলল,
“তোমার আর আরিয়ানের মাঝের সব ঝামেলা মিটেছে তো?”
তৃণা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“বাদ দাও তো ওসব কথা।”
​নুসরাত এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“এটা ঠিক না, তৃণা। আরিয়ান কিন্তু তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে। তোমার জন্য ও কত মানুষের মন ভেঙেছে জানো?”
তৃণা অবাক চোখে তাকাল,

“কত মানুষ মানে?”
​নুসরাত হেসে বলল,
“কত মেয়ে যে আরিয়ানের জন্য পাগল ছিল! কিন্তু ও যে তোমাকে এক নজর দেখে পাগল হলো, তারপর আর কাউকে মনে ধরল না। তাই বলছি ওকে আর কষ্ট দিও না, স্বামী তো তোমারই।”
তৃণা কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। ড্রয়িংরুমে তখন ফারহানা বেগম ও রাহি বেগমরা নির্জনের সাথে গল্পে মেতে উঠেছেন।
রান্নাঘরে একমনে আলু ভাজি করছিল তৃণা। হঠাৎ করেই নিজের শরীরে কারো স্পর্শ অনুভব করতেই সে থরথর করে কেঁপে উঠল। পেছন থেকে আরিয়ান ওকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছে। তৃণার এই আকস্মিক ও তীব্র কম্পন আরিয়ানের নজর এড়াল না। সে কিছুটা অবাকই হলো এই মেয়েটা সামান্য স্পর্শে এত ভয় পায় কেন?
​তৃণা নিজের শরীরের কাঁপুনি সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলল,

“ছাড়ুন, যে কেউ চলে আসতে পারে।”
​কিন্তু আরিয়ান ওকে ছাড়ল না। বরং তৃণার কাঁধের ওপর রাখা চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে এত দূরে সরিয়ে রাখো কেন? আমি চাইলেই তো তোমার ওপর জোর খাটাতে পারি। তাই নয় কি?”
​তৃণা নিজেকে আরিয়ানের শক্ত বাঁধন থেকে জোর করেই ছাড়িয়ে নিল। তারপর কিছুটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আপনি পুরুষ মানুষ,জোর তো আপনারাই খাটাতে পারেন। ওটা তো আপনাদেরই জন্মগত অধিকার।”
​আরিয়ান এবার আর কথা বাড়াল না। সে আবারও তৃণার কাছে গিয়ে ওর পিঠময় ছড়িয়ে থাকা লম্বা চুলগুলো বেঁধে দিতে চাইল। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতে সেই রেশমি চুলের রাশি সামলানো তার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াল। তৃণা কোনো প্রতিবাদ না করে মূর্তির মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আরিয়ান শেষমেশ অনেকটা আনাড়ির মতো করে দড়ির পাকের মতো প্যাঁচ দিয়ে ওর চুলগুলো কোনোমতে বেঁধে দিল।

​আরিয়ানের এই ব্যর্থ চেষ্টা দেখে তৃণা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“যে মানুষটা ঠিকঠাক চুল পর্যন্ত বাঁধতে পারে না, সে এসেছে জোর ফলাতে!”
​কথাটা শুনে আরিয়ান কিছুটা অপমানিত বোধ করল। সে থমথমে গলায় বলল,
“শিখে নেব। একদিন খুব ভালো করে চুল বেঁধে দিয়ে প্রমাণ করব।”
​তৃণা আর কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও চুলায় চড়ানো রান্নায় মন দিল।

বাইরে তখন বিকেলের ম্লান আলো ঘনিয়ে এসেছে। মিতু বিছানায় নির্জীবের মতো শুয়ে আছে, আর রোহান পরম মমতায় ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রোহানের হাতের প্রতিটি স্পর্শে ছিল আগলে রাখার আকুলতা। মিতু একসময় শান্ত গলায় বলল,
“কতক্ষণ ধরে এভাবে হাত বোলাচ্ছো? এবার থামো, আর লাগবে না।”
​রোহান হাত না থামিয়েই আধো স্বরে বলল,
“এত কথা কবে থেকে শিখেছ? চুপচাপ শুয়ে থাকো তো।”
​মিতু একটু পাশ ফিরে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখো, আমার গায়ে এখন আর একদম জ্বর নেই। অথচ তুমি সকাল থেকে আমাকে বিছানা ছাড়তে দিচ্ছ না। এটা কি ঠিক হচ্ছে?”
​রোহান ম্লান হেসে উত্তর দিল,
“তোমাকে একবার উঠতে দিলেই তো আবার সংসারের কাজে লেগে যাবে। শরীরটাকে তো একটু জিরোতে দিতে হয়।”
​মিতুর দৃষ্টি জানালার ওপাশে স্থির হলো। বিষণ্ণ স্বরে সে বলল,

“কাজ না করলে এখন আর ভালো লাগে না। তুমি যখন বিদেশে ছিলে, তখন একাকিত্ব আর সব কষ্ট ভুলে থাকার জন্য নিজেকে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনিতে ব্যস্ত রাখতাম।”
​মিতুর কথাগুলো তীরের মতো রোহানের বুকে বিঁধল। সে যন্ত্রণায় চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। মানুষ নিজেকে কতটা নিঃসঙ্গ আর অসহায় ভাবলে দিনরাত কাজের মাঝে আশ্রয় খোঁজে, তা ভেবে রোহানের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে মিতুকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের খুব কাছে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল। মিতু আবারও পুরনো স্মৃতি হাতড়ে বলল,

“জানো, তখন আমার খুব কষ্ট হতো। মাঝে মাঝে মনে হতো, এই যন্ত্রণার চেয়ে মরে যাওয়াও বোধহয় ভালো।”
​রোহান আর শুনতে পারল না। মিতুর ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরে তীব্র আকুলতায় বাধা দিল,
“খবরদার মিতু! এই মরার কথা আর কখনো মুখে আনবে না।”
​মিতুর চোখ তখনো বন্ধ ছিল। হঠাৎ মিতু নিজের গালে একটা তপ্ত জলের স্পর্শ অনুভব করল। রোহানের চোখ বেয়ে তখন অশ্রু ঝরছে অবিরাম। মিতু চমকে উঠে তড়িৎগতিতে চোখ মেলল। রোহান তখন মুখ ফিরিয়ে নিজের চোখের জল আড়াল করতে ব্যস্ত। মিতু ধড়ফড় করে উঠে বসল। রোহানের দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু নিজ হাতে মুছে দিয়ে হাসি মুখে বলল,

“ওমা!কাঁদছো কেন পাগল? এই তো আমি তোমার সামনেই আছি।”
​রোহান কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু মিতুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ওর বুক চিরে কান্না আসছে, গলায় দলা পাকিয়ে আছে এক আকাশ অপরাধবোধ। মুখ দিয়ে কথা সরছে না, ক্ষমা চাওয়ার ভাষাটুকুও যেন হারিয়ে গেছে। লোকে বলে পুরুষ মানুষের কান্না নাকি শোভা পায় না, অথচ মিতুর কাছে তার এই প্রেমিক পুরুষটিকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় এক শিশুর মতো লাগছে। মিতু পরম আদরে রোহানের মুখটা দুই হাতের আঁজলায় তুলে ধরল। মিতু ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,

“অতীতের সেসব কথা থাক না। ওসব নিয়ে এখন আর একটুও কষ্ট পাই না, সত্যি বলছি। তুমি আমাকে অতীতে যতটুকু দুঃখ দিয়েছিলে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সুখ এখন দিচ্ছ। শুধু সারা জীবন এভাবেই পাশে থেকো, আর কিচ্ছু চাই না। এবার আর মুখটা মলিন করে থেকো না।”
​রোহান মিতুর চোখের দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় আবদার করল,
“তাহলে একটা চুমু দাও।”
​এমন থমথমে আর আবেগঘন মুহূর্তে এমন অভাবনীয় কথা শুনে মিতু অবাক হয়ে হো হো করে হেসে উঠল। ওর খিলখিল হাসিতে ঘরের বিষণ্ণতা নিমেষেই কেটে গেল। মিতু হাসতে হাসতেই বলল,
“তুমি আসলেই একটা আস্ত চুমুখোর!”

তৃণা ধীরপায়ে রুমে ঢুকতেই দেখল আরিয়ান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। লোকটা কিছুক্ষণ আগেই বলছিল তার ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। আরিয়ানের ‘ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার’( Intermittent Explosive Disorder) এর তীব্রতা এখন আগের মতো নেই ঠিকই, কিন্তু এর রেশটুকু মাঝেমধ্যেই তাকে কাবু করে ফেলে। কয়েক দিন পরপরই শুরু হয় সেই অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক মাথাব্যথা। তৃণা লক্ষ্য করেছে, যন্ত্রণা যখন চরমে ওঠে, তখন আরিয়ানের কপালের দুপাশের রগগুলো নীল হয়ে ফুলে ওঠে। লোকটার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তৃণার এক পলক মায়া হলো।

​তৃণার হাতটি শক্ত করে ধরে রেখেছে নির্জনদের সাথে আসা সেই ছোট্ট মেয়েটি তূর্ণা। তৃণার নামের সাথে মেয়েটির নামের কী চমৎকার এক মিল! তূর্ণা মেয়েটা বড্ড মিশুক, যেন আগে থেকেই চেনা। হঠাৎ খোলা জানালা দিয়ে হুড়মুড় করে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ল। তৃণা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল, আকাশের বুক চিরে কালচে মেঘের ঘনঘটা। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি নামবে। তখনই ওর মনে পড়ল, নিজের কয়েকটা শাড়ি ছাদে শুকাতে দিয়েছিল।
​তৃণা ছাদে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ছোট্ট তূর্ণা আবদার করে বসল,
“আন্টি, আমিও তোমার সাথে যাব।”
​তৃণা আলতো করে বাচ্চাটার নরম গালে হাত বুলিয়ে আদর মাখা স্বরে বলল,
“আচ্ছা সোনা, চলো যাই।”
​সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠতে উঠতে তৃণা সহজভাবে জিজ্ঞেস করল,

“তূর্ণা মামনি, তোমার আম্মুকেও তো সাথে করে নিয়ে আসতে পারতে!”
​মুহূর্তেই ছোট্ট মেয়েটার উজ্জ্বল মুখটা মেঘলা আকাশের মতো কালো হয়ে গেল। সে করুণ স্বরে বলল,
“আমার তো মা নেই আন্টি। আমি কখনো আম্মুকে দেখিনি। আব্বু আকাশের উজ্জ্বল সব তারা দেখিয়ে বলে আমার মা নাকি ওই আকাশেই তারা হয়ে গেছে।”
​তৃণার চলার গতি থমকে গেল। বুকটা এক অজানা ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিজে অন্তত এগারো বছর মায়ের মমতা পেয়েছে, অথচ এই অবুঝ শিশুটি জন্মের পর থেকে মায়ের ছায়াটিও পেল না! তূর্ণা আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“জানো আন্টি, আমার বন্ধুরা যখন তাদের আম্মুদের কাছ থেকে আদর পায়, তখন আমারও খুব আম্মুর আদর পেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আমি তো পাই না। আমার মা খুব পঁচা, তাই না? আমাকে একা রেখে চলে গেছে!”
​তৃণা নিজের চোখের কোণের জলটুকু আড়াল করে হাসার চেষ্টা করল। তারপর নিচু হয়ে তূর্ণার কপালে পরম মমতায় একটি চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“উঁহু, মায়েরা কখনো পঁচা হয় না সোনা। মায়েরা তো এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। দেখো, তুমি আর আমি তো একদম একই রকম। তোমারও মা নেই, আমারও মা নেই। তাই আজ থেকে আমরা দুজন মিলে আমাদের সব কষ্ট ভাগ করে নেব। কেমন?”
​তৃণা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতেই তূর্ণার মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে খুশি মনে বলল,
“আচ্ছা!”

​দুই অসম বয়সী সই মিলে ছাদে পৌঁছাল। ততক্ষণে আকাশের মেঘ আরও কালো হয়ে জমাট বেঁধেছে। তৃণা তাড়াহুড়ো করে কাপড়গুলো আলগা করে হাতে তুলে নিতে লাগল। আকাশের ওই রুদ্রমূর্তি দেখলেই তৃণার বুকটা যেন অজানা আশঙ্কায় দুরুদুরু করে ওঠে। অন্যদিকে, তূর্ণা সেই ভয়হীন শৈশব নিয়ে সারা ছাদময় প্রজাপতির মতো ডানা মেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তূর্ণা ছাদের দরজার কাছে গিয়ে খিলখিল করে হাসল। তারপর দুষ্টুমি ভরা চোখে তৃণার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আন্টি, দরজাটা লাগিয়ে দেব?”
​তৃণা হেসেই উত্তর দিল,
“তুমি পারবে না সোনা, তুমি এখনো অনেক ছোট।”
​তূর্ণা যেন চ্যালেঞ্জ নিল। অভিমানী মুখে বলল,
“আমি ঠিক পারি লাগাতে!”

​তৃণা বিষয়টিকে নিছক বাচ্চার দুষ্টুমি ভেবে আর কিছু বলল না। তূর্ণা দরজার ওপাশ থেকে সেটি লাগানোর বৃথা চেষ্টা করছে ভেবে ও নিজের কাজে মন দিল। কাজ শেষে কাপড়গুলো গুছিয়ে নিয়ে তৃণা যখন দরজার কাছে এগিয়ে গেল, তখন ওর চক্ষু চড়কগাছ। দরজা খুলতে গিয়ে দেখল, সেটি ওপাশ থেকে শক্তভাবে আটকে গেছে। তৃণা কয়েকবার সজোরে হ্যাঁচকা টান দিল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না।
​ওর মনে সংশয় জাগল তবে কি ছোট্ট তূর্ণা সত্যিই বাইরে থেকে ছিটকিনি তুলে দিয়েছে? কিন্তু এতটুকু বাচ্চার পক্ষে অত উঁচুতে হাত পাওয়া তো অসম্ভব! ঠিক সেই মুহূর্তে তৃণার মনে পড়ল, ছাদের সিঁড়িতে একটা ছোট টুল রাখা ছিল। পুরো বিষয়টি ওর কাছে এখন আয়নার মতো পরিষ্কার তূর্ণা ওই টুলের ওপর দাঁড়িয়েই দরজার ছিটকিনি আটকে দিয়েছে।

​বাইরে আকাশের মেঘ ক্রমশ ভারী হয়ে জমাট বাঁধছে। চারদিকের গুমোট পরিবেশে তৃণার বুকের ভেতর ভয়ের এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। ও দরজায় সজোরে করাঘাত করে ডাকতে লাগল,
“তূর্ণা! তুমি কি ওখানে আছো? থাকলে জলদি দরজাটা খোলো সোনা। আন্টি খুব ভয় পাচ্ছে!”
​কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। হয়তো খেলার ছলে দরজা আটকে দিয়ে তূর্ণা নিচে চলে গেছে। এই নির্জন সময়ে বাড়ির কেউ এদিকে আসবে না। আরিয়ানও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, নয়তো হয়তো ও এতক্ষণে তৃণার খোঁজে ছাদে চলে আসত।

​হঠাৎ চারদিকের শান্ত বাতাস রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। ঝোড়ো হাওয়ার তান্ডবে মনে হচ্ছে এখনই আকাশের বুক চিরে মহাপ্রলয় নেমে আসবে। আতঙ্কে তৃণার শরীর থরথর করে কাঁপছে, প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে ওর বুক ফেটে যাচ্ছে। ও মরিয়া হয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।
​ঠিক তখনই বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির ঝাপটা গায়ে লাগতেই তৃণার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল অশুভ সব কালো ছায়া মনে হচ্ছে হাজারো কালো হাত ওকে ছিঁড়েখুঁড়ে নিয়ে যেতে চাইছে। তৃণা পাগলের মতো আর্তচিৎকার করে উঠল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা ওর শরীরে যেন ফুটন্ত এসিডের মতো বিঁধছে। তৃণা ছাদের দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়ে দুই হাতে নিজেকে গুটিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করল। যন্ত্রণায় ওর চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৫

​দমবন্ধ করা সেই পরিস্থিতিতে ওর চোখের সামনে বারবার দুটো মুখ ভেসে উঠছে। একটি ওর গর্ভধারিণী মায়ের মুখ, যাকে ও সচরাচর কল্পনা করতে পারে না মুখটা স্পষ্ট চোখে ভাসে না, অথচ আজ এই ঘোর বিপদে মায়ের মুখটি আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে ধরা দিচ্ছে। আর দ্বিতীয় যে মুখটি ওকে বেঁচে থাকার তাগিদ দিচ্ছে, সেটি আরিয়ান। তৃণা বৃষ্টির পানিতে সিক্ত ফ্লোরে ধীরে ধীরে লুটিয়ে পড়ল। ওর চেতনা হারিয়ে গেল এক গভীর অন্ধকারে।মুখ দিয়ে বিরবির করে একটা শব্দ বের হলো,
“আম্মুউ…”

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৭