Home রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৭

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৭

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৭
নিলুফা নাজমিন নীলা

টানা দুই দিন শয্যাশায়ী থাকার পর আজ আরিয়ান আর আদনান কিছুটা সুস্থ বোধ করছে। গত দুই দিন ডক্টর এসে স্যালাইন দিয়েছে, তাতে শরীরটা এখন ধাতে ফিরেছে। তবে মির্জা বাড়ির সবার মনে একটা ঘোরতর সন্দেহ দানা বেঁধেছে একসাথে দুই ভাইয়ের এমন ‘পেট খারাপের’ মহোৎসব কি শুধুই কাকতালীয়? মিতু আর বড় মা অনেক জেরা করেও যুতসই কোনো জবাব পাননি।
​আদনান বাইকের চাবিটা আঙুলে বনবন করে ঘুরাতে ঘুরাতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল। সিঁড়ির শেষ ধাপে আসতেই আরিয়ানের সাথে তার মুখোমুখি দেখা। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় শুধাল,

“কোথায় যাচ্ছিস?”
​আদনান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “যাচ্ছি ওই বদমাইশ কবিরাজের কাছে।”
​আরিয়ান অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“মানে? তুই আবার ওই ভণ্ডের কাছে যাচ্ছিস? দশ হাজারে শিক্ষা হয়নি?”
“এবার আর ঔষধ আনতে যাচ্ছি না ভাইয়া। এবার ওরে এমন ঔষধ আর ট্রিটমেন্ট দিয়ে আসব যাতে জীবনে আর কোনোদিন কারো সাথে এমন ভণ্ডামি করার সাহস না পায়। ওরে আজ বটের তলা থেকে তুলে না আনলে আমার নামও আদনান না!”
​বলেই আদনান ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। রুমে ঢুকে দেখল চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখন সন্ধ্যা নামছে, আর এই সময়ে বাড়ির বাতি সব নেভানো দেখে আরিয়ান একটু অবাক হলো। সে সুইচ টিপে লাইট জ্বালাতেই দেখল তৃণা বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে আছে।
​আরিয়ান ধীর পায়ে তৃণার পাশে গিয়ে বসল। পরম মমতায় তার কপালে হাত রাখতেই তৃণা একবার চোখ মেলে আরিয়ানকে দেখল, তারপর আবার চোখ বুজে ফেলল। আরিয়ান তৃণার রেশমি চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে শ্যামলিনী? এই অসময়ে শুয়ে আছ যে! শরীর কি খারাপ লাগছে?”
​তৃণা কোনো মৌখিক উত্তর দিল না। তবে সে পাশ ফিরে শুয়ে নিজের মাথাটা আরিয়ানের উরুর ওপর রাখল। আরিয়ান মুচকি হাসল। সে বুঝতে পারল, এটা শরীর খারাপ নয়, বরং তৃণার মুড সুইং।
আরিয়ান মুচকি হেসে তৃণার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। আরিয়ান নরম গলায় বলল,
“আজ বাইরের আবহাওয়াটা কিন্তু খুব সুন্দর। একটু ঘুরতে যাবে?”
​ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে তৃণা বিছানায় উঠে বসল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখল নীল আকাশে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, দূরে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো মিটমিট করছে। তৃণা একটু অবাক হয়ে বলল,
“এই সন্ধ্যার সময় আবার কোথায় যাব?”
​আরিয়ান তৃণার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
“অজানা কোথাও। যেখানে গেলে আমার শ্যামলিনীর এই মেঘলা মনটা একদম রোদেলা হয়ে যাবে।”
​তৃণা এবার আর কোনো যুক্তি না দেখিয়ে আরিয়ানের বুকে মাথা রাখল। একদম ছোট বাচ্চাদের মতো করে ঠোঁট উল্টে বলল,

“ভালো লাগছে না।”
​তৃণার গলায় এমন কোমল বাচ্চামো ভাব এর আগে আরিয়ান খুব একটা দেখেনি। সে মুগ্ধ হয়ে হাসল। তৃণার মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলল,
“এই তো, এখন আমার লক্ষ্মী বউটার মতো লাগছে। সবসময় এভাবে একটু বাচ্চামি করে কথা বললে কী সমস্যা?”
​তৃণা মুখ তুলে তাকাল। একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
“এটাকে বাচ্চামি বলে না, ন্যাকামো বলে।”
​আরিয়ান তৃণার গালটা টেনে দিয়ে বলল,
“মেয়েরা স্বামীর সাথে ন্যাকামি করবে না তো কার সাথে করবে? পাশের বাড়ির ভাইয়ের সাথে?”
​আরিয়ানের এই রসিকতায় তৃণা না হেসে পারল না। তার মনের ভেতরে থাকা গুমোট মেঘগুলো যেন নিমিষেই কেটে গেল। আরিয়ান আবারও জিজ্ঞেস করল,

“এখন বলো, কী করতে মন চাচ্ছে তোমার?”
​তৃণা কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভাবল। তারপর খুব সিরিয়াস মুখে বলল,
“ইচ্ছে করছে একটা ধবধবে সাদা শাড়ি পরে তেঁতুল গাছের মগডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে!”
​তৃণার এমন অদ্ভুত আর ভৌতিক ইচ্ছার কথা শুনে আরিয়ান হেসেই খুন। সে হাসতে হাসতে তৃণার কপালে একটা শব্দ করে চুমু খেয়ে বলল,
“না বাবা! অত শখ নেই। আমি চাই না আমার সুন্দরী বউটা পেত্নী সাজুক। এমনিতে কি কম ভয় দেখাও তুমি?”
​তৃণা এবার আরিয়ানের বুক থেকে মাথা তুলে তার কালো কুচকুচে দাড়িতে আঙুল বুলাতে লাগল। যেন কোনো প্রিয় খেলনা নিয়ে খেলছে। হঠাৎ আরিয়ানের নাকটা টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“আপনি কিন্তু কিউট আছেন বহুত!”
​আরিয়ান এবার আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। এই মেয়েটা কখন গম্ভীর হয়ে যায়, আর কখন যে পাঁচ বছরের বাচ্চায় রূপ নেয় তা বোঝা বড় দায়! তবে তৃণার এই বাচ্চামো স্বভাবটাই আরিয়ানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।

আদনান আর তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে যখন কবিরাজের ডেরায় হাজির হলো, তখন চারদিকের পরিবেশটা বেশ গুমোট হয়ে আছে। অতগুলো টগবগে যুবক ছেলেকে একসাথে নিজের আস্তানায় ঢুকতে দেখে কবিরাজও থতমত খেয়ে গেল। তবুও পেশাদার ভণ্ডামি বজায় রেখে গলায় যতটা সম্ভব গাম্ভীর্য এনে বলল,
​“কী ব্যাপার বাবারা? এতজন একসাথে? সবারই কি ‘মন-চাঙ্গা’ করার ঔষধ লাগবে?”
​আদনান আর তার গ্যাং কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে এগোলো। সবাই মিলে ঘিরে ধরল কবিরাজকে। আদনান একদম সামনাসামনি জাঁকিয়ে বসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“না বাবা, আজ আমরা ঔষধ নিতে আসিনি। আজ এসেছি তোকে মহৌষধ দিতে।”
​লোকটি আদনানকে দেখে চিনতে পারল। পরশুদিনই তো এই ছেলেটা বড় ভাইকে নিয়ে এসে দশ হাজার টাকা গছিয়ে দিয়ে গেল! আদনান কিছু একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ কুঁচকে তাকিয়ে বড় বড় শ্বাস নিল। একটা উৎকট আর বিশ্রী গন্ধ চারদিকের বাতাসকে ভারী করে তুলেছে। আদনান বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কিসের ঘ্রাণ রে এটা? নাক তো জ্বলে যাচ্ছে!”
​ছেলেরাও ঘ্রাণটা নিল। একজন অভিজ্ঞের মতো নাক টেনে বলে উঠল,
“ভাই আদনান, এটাতো খাঁটি গাঁজার ঘ্রাণ! মালটা একদম কড়া!”
​মুহূর্তেই সবার কাছে ব্যাপারটা পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। এই ভণ্ড কবিরাজ বটের তলায় বসে আধ্যাত্মিকতার নামে এতক্ষণ ধুমসে গাঁজা সেবন করছিল। আদনান আর দেরি করল না, এক ঝটকায় কবিরাজের ঘাড়টা মটকে ধরার মতো করে চেপে ধরল। গর্জে উঠে বলল,
“ওরে শালা ভণ্ড! তুই কবিরাজির নামে মানুষের পেট খারাপ করাস, আবার এখানে বসে গাঁজাও সেবন করিস? তোর তো সাহস কম না!”
​ঘটনার আকস্মিকতায় কবিরাজ কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই আদনানের এক বন্ধু ‘দেখি তো তোর দাড়িটা আসল কি না’ বলে সজোরে এক টান দিল। সাথে সাথে খ্যাক খ্যাক করে দাড়িটা গোড়া সুদ্ধ খুলে হাতে চলে আসল! দেখা গেল ওটা ছিল আঠা দিয়ে লাগানো নকল দাড়ি।
​আদনান চোখ কপালে তুলে বলল,

“ওরে বাটপার! দাড়িটাও নকল? তুই তো দেখি আস্ত এক মাকাল ফল!”
সবার চোখ তো চড়কগাছ! এই ভণ্ডটা শুধু তুকতাকই ভুয়া করে না, এর দাড়িটাও যে আঠা দিয়ে লাগানো নকল তা কেউ কল্পনাও করেনি। দাড়ি খুলতেই বেরিয়ে এল বছর তিরিশের এক জোয়ান যুবক। বেগতিক দেখে সেই তথাকথিত কবিরাজ যখনই পালানোর জন্য এক দৌড় দিতে চাইল, আদনান অমনি ক্ষিপ্র হাতে লোকটির পরনের লাল লুঙ্গি টেনে ধরল। বেচারা যাবে কোথায়! ল্যাজেগোবরে অবস্থা হয়ে সেখানেই থমকে দাঁড়াল। লোকটি এবার হাতজোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
​“মাফ করো ভাই! আর কোনোদিন এরকম করব না। এবারের মতো ছেড়ে দাও ভাই!”
​আদনান আর তার বন্ধুমহল তো আজ ছেড়ে দেওয়ার মুডে নেই। তারা চারপাশ থেকে ছেঁকে ধরল তাকে। এরপর চার বন্ধু মিলে লোকটিকে আস্ত চেংদোলা করে শূন্যে ভাসিয়ে নিল। দুইজন হাত ধরল আর দুইজন ধরল পা। এরপর শুরু হলো আসল ট্রিটমেন্ট। দুইজন মিলে কবিরাজের পেটে আর বগলে এমন সুড়সুড়ি দিতে লাগল যে, বেচারা হাসতে হাসতে প্রায় পাগল হওয়ার দশা। হাসি না এলেও যেন শরীরের স্নায়ুগুলো বিদ্রোহ করছে হি হি করে হাসতে হাসতে তার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম।
​বেশ কিছুক্ষণ এই সুড়সুড়ি থেরাপি চালানোর পর আদনান হাত তুলে ইশারা করল, “থাম!”

​সামনেই একটা শ্যাওলা ধরা পচা পুকুর দেখা যাচ্ছে। আদনানরা চেংদোলা করেই লোকটিকে সেই পুকুরের পাড়ের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। কবিরাজ এবার চিৎকার করে কাঁদতে লাগল,
“ছেড়ে দাও ভাই! আর এসব ভণ্ডামি করব না, পা ধরছি তোমাদের!”
​আদনান এবার তপ্ত স্বরে বলল,
“তোর ওই মিষ্টির জন্য দুই দিন আমরা বিছানায় পড়ে ছিলাম রে হারামজাদা! সারাদিন টয়লেটের চৌকাঠে বসে পার করতে হয়েছে জীবন। আজ এর একটা ফয়সালা হবেই।”
​আদনান পকেট থেকে নিজের মোবাইল বের করে ভিডিও অন করে লোকটির মুখের সামনে ধরল। গম্ভীর গলায় বলল,

“তোর সব অপকর্মের কথা এই মুহূর্তে স্বীকার করবি। ক্যামেরার সামনে সব সত্যি বলবি, তা না হলে এই ময়লা পুকুরে তোকে এক ধাক্কায় ছুড়ে মারব। এখন বল!”
​পুকুরের সেই পচা গন্ধ আর আদনানদের মেজাজ দেখে লোকটির কলিজা শুকিয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে স্বীকারোক্তি দিতে শুরু করল,
“আমি আসলে কোনো কবিরাজি কায়দা-কানুন জানি না। আমার আসল উদ্দেশ্য ছিল লোক ঠকিয়ে টাকা কামানো। আর এই কবিরাজির আড়ালে আমি এখানে নেশাজাতীয় দ্রব্য আর গাঁজা বিক্রি করতাম। আমি দোষী ভাই, এবার আমাকে দয়া করে ছেড়ে দাও!”
​লোকটি ভেবেছিল সব সত্যি বললে বুঝি নিস্তার পাবে। আদনান ভিডিওটা সেভ করে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ছেড়ে তো দেবই, তবে আমার হাতে না। পুলিশ আসছে, ওরাই তোকে নিয়ে যাবে। ওখানেই বাকি সত্যগুলো উগড়ে দিস।”
​ঠিক কিছুক্ষণ পরই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের জিপ এসে হাজির হলো। ভণ্ড কবিরাজকে হাতকড়া পরিয়ে যখন গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, তখন আদনানের মনে হলো তার দশ হাজার টাকার শোকটা অন্তত কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছে।

সন্ধ্যার মায়াবী আলোয় মির্জা বাড়ির এই চড়ুইভাতি যেন এক অনন্য রূপ নিয়েছে। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ সুউচ্চ সব অট্টালিকা, তার মাঝখান দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে মসৃণ পিচঢালা রাস্তা। রাস্তার ধার দিয়ে ফুটে থাকা হরেক রকম ফুলের সুবাস বাতাসে ভাসছে। এই রাস্তায় রিকশা আর বাইকের টুংটাং শব্দ ছাড়া বড় কোনো গাড়ির আওয়াজ নেই, তাই শান্তিতে হাঁটা যাচ্ছে।
​তৃণা আর আরিয়ান একা আসেনি। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে নৌশি-আদনান এবং মিতু-রোহান। নুসরাত আর নির্জনকেও কল করে আনা হয়েছে, কারণ তাদের বাড়ি খুব একটা দূরে নয়। চার সই তৃণা, নুসরাত, নৌশি আর মিতু একদম সামনের সারিতে খিলখিল করে হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছে। তাদের গল্প আর হাসিতে পুরো রাস্তাটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
​আর পেছনে পেছনে এক বিচিত্র দৃশ্য তৈরি করে হেঁটে আসছে স্বামী নামক চারজন পুরুষ। দৃশ্যটা বেশ হাস্যকর! চারজনের হাতেই তাদের প্রিয়তমা স্ত্রীদের জুতো। তৃণার হিল জুতো পরে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল দেখে আরিয়ান জোরাজুরি করে জুতোজোড়া খুলে নিজের হাতে নিয়েছে। আরিয়ানকে এই মজনু রূপে দেখে বাকি তিন পুরুষও যেন আদর্শ স্বামীর প্রমাণ দিতে চিবুক উঁচিয়ে নিজেদের বউদের জুতো জোড়া বগলদাবা করল। এখন তারা চারজন জুতো হাতে নিয়ে বীরদর্পে হাঁটছে!

​হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আদনানের নজর গেল রাস্তার পাশের একটি রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে। কৃষ্ণচূড়া ফুল দেখবে আর আদনান তার নাদানের বাচ্চা বউ নৌশির জন্য সেটা ছিঁড়বে না তা কি হয়?
​আদনান ঝটপট গাছের তলায় গিয়ে লাফাতে শুরু করল। গাছটা বেশ উঁচু, আদনানের হাত নাগালে পৌঁছাচ্ছে না। সে বারবার লাফিয়ে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করছে আর তার এই কসরত দেখে পেছনের তিনজনসহ সামনের চার রমণীও থেমে গেল। আদনানের এই বাঁদরনাচ দেখে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল।
হাসতে হাসতে তারাও আদনানের চারপাশে এসে জড়ো হলো। নৌশি তখন মুচকি হাসলেও আদনানকে জ্বালানোর সুযোগ হাতছাড়া করল না। সে ডালটার দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল,

“কী রে, এত লাফাচ্ছিস কেন? ফুল পেড়ে দিতে না পারলে আজ তোর কপালে শনি আছে বলে দিলাম!”
​নৌশির মুখ থেকে ‘তুই’ ডাক শুনে নুসরাত এবার একটু শাসনের সুরে বলে উঠল,
“তোরা কি এখনো এভাবেই কথা বলিস? আদনান তো তোর স্বামী, এখন তো ওকে ‘তুমি’ করে ডাকা উচিত।”
​নৌশি গাল দুটো একটু ফুলিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলল, “ওকে তুমি করে ডাকলে কেমন জানি শরম করে!”
​নৌশির এই অকপট স্বীকারোক্তিতে রাস্তার মাঝখানে হাসির রোল পড়ে গেল। আদনান বেচারা যখন লাফিয়ে কোনোভাবেই ডালটার নাগাল পেল না, তখন আরিয়ান এগিয়ে এল। সে বেশ গম্ভীর মুখে একটা বুদ্ধি দিল,
“আদনান, লাফিয়ে সময় নষ্ট না করে বরং তুই গাছেই উঠে পড়।”
​বড় ভাইয়ের এমন ডিরেক্ট বুদ্ধি শুনে আদনান যেন প্রাণ ফিরে পেল। সে একগাল হেসে বলল,
“এই তো, কাজের মতো কাজ হবে এবার!”
​এরপর তিন জন মিলে আদনানকে নিচ থেকে ঠেলে, ধাক্কিয়ে আর ভর দিয়ে কোনোমতে গাছের নিচু ডালটার কাছে তুলে দিল। আদনানও বেশ কায়দা করে চড়ে বসল গাছে। সেখান থেকে সে যত্ন করে ছোট ছোট চারটা কৃষ্ণচূড়ার ডাল ভেঙে নিয়ে নিচে নেমে এল।

​রাস্তার হলদে ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে এক রোমান্টিক আবহাওয়া তৈরি হলো। চারজন পুরুষ তাদের ব্যক্তিগত নারীদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। সবার হাতেই তখন রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া।
​আরিয়ান অতি সাবধানে তৃণার অবাধ্য চুলের ভাঁজে ফুলটা গুঁজে দিল। তৃণা শুধু মুগ্ধ হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। একইভাবে রোহান মিতুর চুলে, নির্জন নুসরাতের চুলে আর আদনান নৌশির চুলে ফুলটা স্বযত্নে পরিয়ে দিল।
রাস্তার দুই পাশের ল্যাম্পপোস্টের মায়াবী আলো আর কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা মিলে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। চার জুটি এবার নিজেদের মতো করে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে। আরিয়ানের শক্ত হাতের মুঠোয় তৃণার নরম আঙুলগুলো বন্দি। তৃণা মুগ্ধ হয়ে রাস্তার ধারের বাগান আর রাতের আকাশ দেখছে, কিন্তু আরিয়ানের সমস্ত পৃথিবী যেন ওই একটি মুখেই আটকে আছে। তার দৃষ্টিতে তৃণা আজ বড় বেশি অপরূপা, বড় বেশি স্নিগ্ধ।
​হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ ছন্দপতন। ঝনঝন শব্দে তৃণার পায়ের রুপোলি নূপুরটা খুলে গিয়ে পিচঢালা রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। তৃণা নিচু হয়ে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে নিজের পায়ে আবার পরতে যাচ্ছিল, কিন্তু আরিয়ান তার হাতটা আলতো করে চেপে ধরে থামিয়ে দিল।
​ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরিয়ান রাস্তার মাঝখানেই এক হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে বসে পড়ল। আরিয়ানের মতো গম্ভীর এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষকে এভাবে রাস্তায় বসে পড়তে দেখে তৃণা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল,

“একী! কী করছেন আপনি? উঠুন!”
​আরিয়ান কোনো কথা না বলে তৃণার আলতা রাঙা পা-টা আলতো করে নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিল। তৃণা বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভারসাম্য বজায় রাখতে সে নিজের একটা হাত আরিয়ানের মাথায় রাখল। আরিয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে, অতি সন্তর্পণে নূপুরটা তৃণার পায়ে পরিয়ে দিতে লাগল। নূপুরের ছোট ছোট ঘুঙুরগুলো আরিয়ানের আঙুলের ছোঁয়ায় টুংটাং করে ডেকে উঠছে।
​নূপুর পরানো শেষ করে আরিয়ান নিচ থেকেই তৃণার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল অতল গভীরতা আর ভালোবাসা। সে আবেগী গলায় বলে উঠল,
“ফুলের পায়ে নূপুর! এই যে সন্ধ্যার পাখিরা ঘরে ফিরছে, আকাশে এই যে চাঁদ উঠছে, বাতাস, তারা, সবাই হয়তো আজ আমার শ্যামলিনীকে হিংসে করছে। তারা ভাবছে, এমন স্নিগ্ধ এক পরী কেন স্বর্গ থেকে এই ভুবনমোহিনীতে নেমে এল!”
​আরিয়ানের মুখে এমন প্রশংসা শুনে তৃণা লজ্জায় আরক্তিম হয়ে গেল। সে চোখ নামিয়ে মুচকি হেসে মৃদু স্বরে বলল,
“আপনি কিন্তু আজ বড্ড বেশি বেশি বলছেন!”

​তৃণা আবার হাঁটতে শুরু করল। ঠিক তখনই আরিয়ানের চোখে পড়ল তৃণার শাড়ির আঁচলটা মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে ঝুঁকে আঁচলটা তুলে নিল এবং খুব যত্ন করে নিজের হাতের কবজির সাথে পেঁচিয়ে বেঁধে নিল। তৃণা পেছনে ফিরে এই কাণ্ড দেখে হেসেই ফেলল। সে কৌতুক করে বলল,
“এ কী করছেন? লোকে দেখলে যে আপনাকে বউ পাগল বলবে!”

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৬ (২)

​আরিয়ান তৃণার চোখে চোখ রেখে প্রশান্তির হাসি হাসল। সে ধীরস্থিরভাবে জবাব দিল,
“লোকে যাকে বউ পাগল বলে, প্রকৃত পক্ষে তাকে আদর্শ উত্তম পরুষ বলে।”
​তৃণা হেসে উঠল। সেই হাসিতে যেন মুক্তো ঝরল। আরিয়ান অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার স্ত্রীর সেই মায়াবী হাসির দিকে। তার মনে হলো, এই মুহূর্তটা, এই হাসিটা আর হাতের সাথে বাঁধা ওই আঁচলটুকুই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৮