রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৮
ফারহানা চৌধুরী
অরুর রাগ এবার পাহাড় ডিঙালো,
-‘আপনি আমাকে সবার সামনে অপমান করেছেন। আপনার এতে কোনো যায় আসে না? এভাবে কারোর সাথে থাকা যায়? সিরিয়াসলি শুভ্র?’
শুভ্র বিশেষ ভাবাবেগ দেখালো না। নির্লিপ্ত থেকে বলল,
-‘না থাকতে পারলে থেকো না। চলে যাও।’
অরু অবিশ্বাস্য চোখে চাইলো,
-‘কি?’
-‘লিভ ফ্রম মাই হাউজ। গো এহেএএড।’
অরু শ্বাস গলায় আঁটকে এলো। সে চুপচাপ দেখে গেলো সামনে বসা লোকটাকে। কথাগুলো মস্তিষ্কে চরমভাবে আঘাত করতেই সে হনহনিয়ে হেঁটে নিজের ঘরে গেল। শুভ্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। এই মেয়ের অকাত তার জানা আছে। বেশি হলে আর কিই বা করবে? কাঁদবে। ব্যস এটুকুই। সে উঠে গিয়ে নিজের ঘরে এলো। দরজা আটকে বিছানায় শুয়ে পড়লো। মেয়েটাকে প্যারা লাগছে। আবার অদ্ভুতও লাগছে। মেয়েটাকে সহ্য হচ্ছে না, আবার এড়িয়েও চলতে পারছে না। অরু সামনে এলে অতীত স্মরণ হচ্ছে, দূরে গেলে অদ্ভুত রকমের অসহায় লাগছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
নিজের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে জড়াতে ক্লান্ত শুভ্র। একটু রিফ্রেশমেন্টের দরকার। ঘুম দরকার। ঘুম আসছে না। সে মাথার নিচে এক হাত রেখে উপরে ছাদের দিকে চেয়ে রইল। সে কি খুব বেশিই রুড বিহেভিয়ার করছে অরুর সাথে? বেশি বেশিই করছে? শুভ্রর অদ্ভুত লাগছে। বড্ড অদ্ভুত।
অরু রুমে এসে নিজের লাগেজ নামালো। চেইন খুলে ফোনটা হাতে নিলো। মেরিনার নাম্বারে ডায়াল করে পাশে রাখল। রিং হচ্ছে, শোনা যাচ্ছে। অরু ওয়্যারড্রব খুলে একে একে নিজের জামা-কাপড় বের করে এনে বিছানায় স্তুপ করে রাখলো। একটা একটা কাপড় ভাঁজ করে ব্যাগে ভরতে লাগল৷ ফাঁকে ফোনের দিকে চেয়ে দেখল কল রিসিভ হয়েছে। ওপাশ থেকে মেরিনার গলাও শোনা গেল,
-‘হ্যালো? অরু?’
অরু ফোন নিয়ে কানে ঠেকালো। বলল,
-‘আমি এখানে থাকবো না আন্টি।’
মেরিনা অবাক হলো,
-‘কেন? কি হয়েছে? কি করেছে ও?’
-‘কি করেনি আন্টি? উঠতে-বসতে শুভ্র আমাকে অপমান করছে। আজকে প্রথম দিনেই অফিসে গাধার খাটুনি খাটিয়য়েছে। যা-তা লোকের সামনে বলছে। ইনফ্যাক্ট এখন, আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছে। তারপরেও বলবে কি করেছে?’
মেরিনা তাজ্জব বনে গেলো ছেলের ব্যাপারে অভিযোগ শুনে। অসম্ভব বিস্ময় নিয়ে বলল,
-‘শুভ্র এসব বলেছে? ও তো এমন না অরু। ও, এমন কেন করতে যাবে?’
-‘সেটা আমি কিভাবে বলবো? সবকিছুতে আমার পিছনে পড়ে থাকে। আন্টি আমি এটা বুঝতে পারছি না, তোমরা কেন আমাকে শুভ্রর ঘাড়ে গছিয়ে দিয়েছো?’
মেরিনা মৃদু ধমকে বলল,
-‘অরু! কিসব বলিস? শুভ্র তোর স্বামী হয়, এখানে ‘ঘাড়ে গছিয়ে’ দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?’
অরু নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
-‘এছাড়া আর কোনো শব্দ এসবের সাথে যায় না। শুভ্রর আচরণে আমি এতটুকু তো বুঝে গিয়েছি, সে আমাকে এখানে মোটেও চায় না। জোর করে সম্পর্ক বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর কিচ্ছু না।’
মেরিনা অরুকে শান্ত করার তাগিদে বলল,
-‘অরু, থাম মা। শান্ত হ একটু। আমি শুভ্রর সাথে কথা বলবো এই নিয়ে। তুই রাগ কমা একটু।’
অরু তপ্ত শ্বাস ফেললো। শান্ত গলায় বলল,
-‘আমি এখানে থাকবো না। ওনার মতো মানুষের সাথে আমি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। ভালো মতো থাকতে চেয়েছি। এই সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ অবধি দিতে চেয়েছি। তবে শুভ্র তো শুভ্রই। তার এমন ব্যবহারে এখন তাকে মেনে নেওয়ার বা সুযোগ দেওয়ার আর কোনো প্রশ্নই আসে না।’
মেরিনা হতভম্ব হয়ে গেলো,
-‘অরু, মাথা ঠান্ডা করো। ভুলভাল কোনো ডিসিশন নিও না। পরে তুমিই রিগ্রেট করবে।’
অরু তাচ্ছিল্য করে হাসলো। ফোন কেটে দিল তৎক্ষনাৎ। ওপাশ থেকে মেরিনা তখনও কথা বলছেন৷ অরুর প্রচন্ড অদ্ভুত লাগছে। সে জামা-কাপড়গুলো লাগেজে ভরে চেইন আটকালো। গিয়ে ঘরের দরজা খুললো। ফোন এক হাতে নিয়ে, আরেক হাতে ব্যাগ নিয়ে বের হলো ঘর ছেড়ে। সবদিকে নজর বুলিয়েও শুভ্রকে নজরে এলো না। অরুর রাগে কপালের ভাজ টানটান হয়ে এলো। বিশ্রি রকমের অনূভুতিরা বাসা বাঁধলো মনে, মস্তিষ্কে। চোখ জলে টইটম্বুর তখন। বক্ষপিঞ্জরে অদ্ভুত রকমের তিক্ত ব্যথা। কন্ঠনালী রোধ হয়ে আসছে কান্না আটকানোর তাগিদে। অরু ব্যাগ টেনে দরজা খোলে। এরপর বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।
ফোন বাজার শব্দে ঘুম ভাঙলো শুভ্রর। তখন ঠিক ক’টা বাজে তা খেয়ালে নেই। ফোন বাজতে বাজতেই কেটে গিয়েছে। মস্তিষ্ক থিতিয়ে আছে সদ্য ঘুম ভাঙায়। তৎক্ষনাৎ সে বুঝলো না কিছুই। চোখ পিটপিট করে খুলে চাইলো। উপরে ছাদের দিকে তাকালো। আশেপাশের সব বুঝতে সময় নিলো। তখনই আবারও বেজে উঠল ফোন। শুভ্র চমকে উঠে আশে পাশে তাকালো৷ বিছানা এদিক সেদিক হাতড়ে ফোন পেলো হাতে। তড়িঘড়ি করে ফোন সামনে নিয়ে দেখলো মায়ের ফোন। শুভ্র বালিশে ফের মাথা ঠেকিয়ে শুলো। সময় নিয়ে গলা পরিষ্কার করে ফোন রিসিভ করলো। চোখ কুঁচকে তার উপর কনুই রেখে ফোন কানে গুঁজল। ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলল,
-‘হ্যাঁ মা?’
মেরিনার দুশ্চিন্তাগ্রস্থ স্বর শোনা গেল,
-‘শুভ্র? কোথায় তুই এখন?’
শুভ্র তার গলা শুনে চোখ থেকে হাত সরালো। ভ্রু কুঁচকে বলল,
-‘কোথায় থাকবো? ফ্ল্যাটেই আছি। কেন? কিছু হয়েছে?’
-‘অরু কোথায়?’
-‘কোথায় থাকবে? ওর রুমেই হয়তো।’
-‘হয়তো?’
শুভ্র অপ্রস্তুত বোধ করলো মায়ের কথার ভঙ্গিতে। কপাল আঙুলে চেপে ধরলো বিরক্তিতে। সময় নিয়ে বলল,
-‘কি হয়েছে বলবে?’
-‘কি হয়নি শুভ্র? কি হয়নি? অরুকে কি বলেছো তুমি? টেল মি। আই নিড দ্য এক্সপ্ল্যানেশন। অরুকে আমি তোমার দায়িত্বে ওখানে রেখে এসেছি কি এসবের জন্য? তোমার ওকে পছন্দ না হলে বলে দিতে আমাদের, উই উড টেইক হার ব্যাক টু দ্য বাংলাদেশ। তবে এসব কি ধরনের আচরণ?’
মেরিনার কন্ঠে প্রচন্ড অসন্তোষ প্রকাশ পেল। শুভ্র মাত্রাতিরিক্ত বিস্ময় নিয়ে বলল,
-‘কিসব বলছো? আমি কি বলবো অরুকে? আমি কি করেছি?’
-‘তুমি জানো না কি করেছো? আবার জিজ্ঞেস করছো কেন?’
-‘অরু তোমার কাছে কমপ্লেইন করেছে আমার ব্যাপারে?’
শুভ্রর গলার স্বর কেমন গম্ভীর হয়ে এলো এই পর্যায়ে। মেরিনা তার সেই প্রশ্নের ধারও ধারলো না। ব্যগ্র কন্ঠে বলল,
-‘অরু কোথায় এখন? তুমি ওর ঘরে যাও। দেখ ও আছে কি না।’
-‘কেন থাকবে না মা? ফর গড সেক্, শুধু শুধু কেন এমন করছো? কি হয়েছে বলো তো?’
-‘তুমি যাবে শুভ্র?’
শুভ্র তিতিবিরক্ত হয়ে কম্ফোর্টার সরালো কোমড় থেকে। বিছানা ছেড়ে নেমে স্লিপার্সে পা গলিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তস্ত্র পায়ে হেঁটে গিয়ে অরুর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো সেকেন্ডের ব্যবধানে। দরজা ভেজানো ভেতর থেকে। শুভ্র দরজায় নক করলো। গলা বাড়িয়ে ডাকল,
-‘অরু?’
সাড়া এলো না। শুভ্র ফের ডাকল,
-‘অরু? বাইরে এসো একটু।’
এবারও সাড়া না পেলো শুভ্র দরজা খুলতে বাধ্য হলো এক প্রকার। খুলে মাথা ঢোকালো এক ফাঁকে। ডাকল,
-‘অরু?’
সারা ঘরে চোখ বুলিয়েও যখন অরুকে দেখলো না, তখন শুভ্র ব্যগ্র হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। আশেপাশে চাইলো তস্ত্র চোখে। উৎকন্ঠিত হয়ে সারা ঘর খুঁজে চললো মেয়েটাকে। মনে হলো বুকটা কেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। বিচিত্র ধর্মী বিশ্রি অনূভুতিতে ভেতরটা পুরে গেল। শুভ্রর কানে গুঁজে রাখা ফোন থেকে তখনও মেরিনার গলা আসছে,
-‘শুভ্র? কি রে, পেলি মেয়েটাকে? কই ও?’
শুভ্র কান থেকে ফোন নামালো। নৈঃশব্দ্যে কেটে দিল কল। ছুটে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো৷ সারা বাড়ি ময় খুঁজে চললো অরুকে। দুশ্চিন্তারা গ্রাস করে নিচ্ছে তাকে। অরু কি তার কথাকে খুব বেশিই গুরুত্ব দিয়ে ভেবে নিয়েছে? সত্যি সত্যিই কি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে? শিট! শিট! শিট! শুভ্র নিজের চুল খামচে ধরলো নিজের প্রতি তীব্র আক্রোশে। অরু এখানের রাস্তা-ঘাট মোটামুটি চিনলেও তেমন একটা তো চেনে না। যদি কিছু হয়ে যায়? এতো রাতে একা কোথায় যাবে মেয়েটা? এতোটা বোকার মতো কাজ সে কি করে করলো?
শুভ্রর মনে কু ডাকছে। সে দৌড়ে বাড়ি ছেড়ে বের হলো৷ জুতো পর্যন্ত পাল্টালো না। লিফটে ওঠার কথাও ভুলে বসলো প্রায়। সেই অবস্থাতেই নিচে নামলো দৌড়ে। এপার্টমেন্ট ছেড়ে বেড়িয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই মুখে হাত দিলো। এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলো উদ্বিগ্নতা নিয়ে৷ নিভৃতে খুঁজে চলল তাকে। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা বাতাস। গায়ে লাগলে গা শিরশির করে উঠছে, থরথর করে কেঁপে উঠছে। শুভ্রর গায়ে একটা টি-শার্ট রয়েছে। শীতেও তার সেদিকে খেয়াল নেই। এক রাশ
বিশ্রি রকমের চিন্তারা উঁকি দিচ্ছে মনে৷ তারউপর আবার স্নো ফল হচ্ছে। এই শীতের মধ্যে, এতো রাতে অরু কোথায় যাবে; ভেবেই সে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লো।
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৭
বাবা-মাকে, অরুর বাবা-মাকে কি জবাব দেবে সে? মেয়েটা তো তার ভরসাতেই এখানে ছিলো, সে এমন বোকামো না করলে এমন পরিস্থিতিও হতো না নিশ্চয়ই? এত এত সব চিন্তা নিয়ে যখন আশেপাশে তাকাচ্ছিলো শুভ্র, তখনই চোখ পড়লো কিছুটা দূরে ব্রাউন ওভারকোট চাপিয়ে ফোন কানে গুঁজে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে থাকা একটা মেয়ের দিকে। তাকে দেখতেই মনে হলো বুক থেকে ভারি পাথর নামিয়ে দিয়েছে কেউ। সে আবার শ্বাস নিতে পারছে নির্বিঘ্নে। শুভ্র বুকে হাত রেখে শ্বাস ফেলল। ঠোঁট ছড়িয়ে পড়লো হাসির ছটা। তস্ত্র পায়ে হেঁটে গিয়ে মেয়েটার সামনে দাঁড়াতেই অরু নামক মেয়েটা চমকে উঠে তাকালো তার দিকে। পরক্ষণেই তেতো মুখে কিছু বলার আগেই শুভ্র আচমকা সকল বাঁধ ভেঙে তাকে জড়িয়ে ধরলো। অরু আকস্মিক ঘটনায় কেবল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
