Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ৫+৬

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৫+৬

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৫+৬
সাইয়্যারা খান

— আমি কি প্রেম করি আপনার সাথে মৃত্ত? কখনো প্রেমে’র আলাপ করেছি? রাত বিরাতে ফোন কল দিয়ে জাগিয়ে রেখেছি নাকি প্রেমিকদের মতো আপনার পেছনে ঘুরঘুর করেছি?
অভিমানে মৃত্তিকা টাইটুম্বুর হলো। শুধু শক্ত করে আঁচলটা খাঁমচে ধরে মাথা নাড়ালো। মানে সেও সম্মতি দিচ্ছে যে পূর্ণ তার সাথে প্রেম করে না। মাথাটা নাড়িয়েই পা ঘুরালো মৃত্তিকা। এখানে আর এক মুহূর্তও না। মোট কথা পূর্ণ ভাই এর সামনেই আসবে না সে। কেন আসবে? কি এমন আবদার করেছে মৃত্তিকা যে এতগুলো কথা তাকে শুনাতে হলো? যাবে না ভালোকথা তাই বলে অপমান’টা কি না করলেই নয়? খুব কি দরকার ছিলো এভাবে কঠিন কথা শুনানোর? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পা ঘুরালেও আর যাওয়া হলো না। কারণ আর কি হবে? ঐ ঘুরেফিরে একই পূর্ণ। মৃত্তিকা যাওয়ার মুহূর্তেই শুনতে পেলো ভারী কন্ঠ,

— যেতে বলেছি আপনাকে মৃত্ত? কথা বলছি না আমি?
মৃত্তিকা গেলো না আবার পূর্ণ’র মুখোমুখি ও হলো না। হাতের ফোনটা নিজের সাদা পাঞ্জাবি’র পকেটে ঢুকিয়ে পূর্ণ নিজেই মৃত্তিকা’র সামনে দাঁড়ালো। পর্যবেক্ষণ করলো গভীর ভাবে। হালকা গোলাপী রঙের শাড়ীতে নিজেকে সাজিয়েছে তার মৃত্ত। আধ খোলা তার চুল। মায়াবী মুখটাতে বিস্তৃত সাজ। উহু খুব বেশি সাজ না। এই তো চোখ ভর্তি কাজল, ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক আর কপালের ঠিক মধ্যিখানে একটা ছোট্ট পাথরের টিপ। অপরুপা বুঝি একেই বলে? সুন্দরী নারী। মোহিত নারী। বিনাশী নারী। মনে মনেই বললো পূর্ণ। বেশ রাগী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— কেন সেজেছেন? কাকে দেখানোর জন্য? এভাবে নিজের রুপ প্রকাশের কারণ কি মৃত্ত?
হঠাৎ কেন পূর্ণ চটে গেল তা বুঝে উঠতে পারছে না মৃত্তিকা। রাগার মতো আবার কি করলো সে? বর্তমান অবস্থান তাদের সেই বটগাছের নীচে। দুপুর গড়িয়েছে বেশ আগেই। পরন্ত বিকেল আসবে আসবে ভাব। পূর্ণ এবার ধমক দিতেই মৃত্তিকা কাঁপা কাঁপা চোখ দুটো তুলে একপলক দেখলো পূর্ণ’কে। সাথে সাথেই নামিয়ে নিলো সেই চোখ। এই চোখে ও তাকাতে পারে না। চাইলেও মন ভরে দেখতে পারে না পূর্ণ’কে। পূর্ণ’র ধমক খেয়েই ভীতু গলায় বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— আপনার জন্য।
কথাটা বলেই জিভ কাঁটলো। কার সামনে কি বললো ও? মাত্রই পূর্ণ ভাই অপমান করলো এটার জন্য আর মৃত্তিকা কি না বললো তার জন্যই এই সাজসজ্জা। একজন্যই ওকে উজ্জ্বল “হাদা” উপাধি দিয়েছে। আসলেই মৃত্তিকা একটা হাদা। সাহস করে আর চোখ তুলা হলো না ওর। পূর্ণ আশ্চর্য হলো সেকেন্ডে’র জন্য পরপরই চেহারা চিলকে উঠলো। তার মৃত্ত তার জন্য সেজেছে। যে কোন পুরুষের কাছেই এটা সুখের। তার নারী তার জন্য সাজবে। সে দেখবে। সবই ভালো কিন্তু অন্য কেউ কেন দেখবে? এক মুহূর্তেই আবার নিজেকে শক্ত করে নিয়ে পূর্ণ বলে উঠলো,
— চলুন আমার সাথে।
একদম বাধ্য বালিকার মতো পূর্ণ’র পিছু গেলো মৃত্তিকা। লেডিস ওয়াসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে মৃত্তিকা’কে ইশারা করে বললো,

— এখনই মুখ, ঠোঁট, চোখ ধুয়ে আসবেন।
হতভম্ব হয়ে গেল মৃত্তিকা। এত কষ্ট করে সকাল সকাল সাজলো এখন কি না ধুয়ে ফেলবে? মৃত্তিকা’কে ঠাই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পূর্ণ এগিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালো। দুই আঙুল দিয়ে আস্তে করে ওর কপাল থেকে টিপটা ফেলে দিয়ে কিছুটা রাগী কন্ঠে পূর্ণ বললো,
— আপনি বড্ড অবাধ্য মৃত্ত। এসব টিপ কপালে যেন আর না দেখি।
মৃত্তিকা দাঁড়ালো না। সোজা হেটে চলে গেল। বেসিনের সামনে ডলে ডলে চোখ, মুখ, ঠোঁট সব ধুয়ে ফেললো। হঠাৎ ওর কান্না পেলো। মেয়েটা কেঁদেও ফেললো। কার পাল্লায় পরলো ও? এই পূর্ণ ভাই ওকে ভালোবাসে কি না তা এখনও আবছাই ওর কাছে। শ্যামা মুখটা লাল হয়ে উঠলো। ঐ দিনের কথা ভাবতেই লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে হয় মৃত্তিকার।
ঐদিন পূর্ণ যখন ওর কাছে আবদার করে গুনাহ করার তখন ভীষণ ভয় পেয়েছিলো মৃত্তিকা। ওর চোখের আর মুখের ভাষা পড়তে পূর্ণ’র সময় লাগে নি। তাই তো পূর্ণ কিছুটা তাচ্ছিল্য’র স্বরে বলেছিলো,

” আপনি আমাকে চিনতে পারলেন না মৃত্ত অথচ আপনার চোখের ভাষা ও আমিও পড়তে পারি। তাহলে বলা চলে নারী থেকে পুরুষের অনুভূতি প্রগাঢ়”।
সেই কথা মনে পড়তেই মৃত্তিকা নিজের ভাবনাকে গালি দিলো একটা। পূর্ণ ভাই কখনো খারাপ উদ্দেশ্য করে তাকে কিছু বলে না। না ই কোন অন্যায় আবদার থাকে তার। দোষটা দিনশেষে নিজেকেই দিলো মৃত্তিকা। বুঝা উচিত ছিলো এটা আর কেউ নয় স্বয়ং পূর্ণ ভাই নিজে।

আশেপাশে সবাইকে কাশফুল দেখে মৃত্তিকা’র মন চেয়েছিলো সেখানে যেতে। সবাই যেমন জোট ধরে যায় সেরকম আকাঙ্খা জেগেছিলো মৃত্তিকা’র। তাই তো সকাল সকাল এত কষ্ট করে শাড়ী পড়ে এলো। সাজলো। ক্লাস শেষে যখন পূর্ণ’র সাথে দেখা করে তখনই ওকে দেখা মাত্র ভ্রু কুচকেছিলো পূর্ণ। এক বুক আশা নিয়ে মৃত্তিকা নীচু করে আবদার করেছিলো,
— আজকে কাশফুল দেখতে চলবেন?
সেই কথার প্রেক্ষিতেই পূর্ণ তাকে উপরের কথাটা বলেছিলো। সোজা জানিয়েছে সে মৃত্তিকা’র প্রেমিক না৷ আসলেই তো পূর্ণ কখনো প্রেমে’র প্রস্তাব দেয় নি তাকে। জানিয়েছিলো সোজা বিয়ে করবে। রোজ যে দেখা করে পূর্ণ শুধু ওর হালহকিকত আর লেখাপড়া ই জিজ্ঞেস করে।
হঠাৎ একটা মেয়ে এসে মৃত্তিকা’কে বললো,

— বাইরে পূর্ণ ভাই ডাকে।
মৃত্তিকা তারাহুরো করে মুখ মুছে বের হলো। সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত যেন এক নেতাই দাঁড়িয়েই আছে। মৃত্তিকা গিয়ে পাশে দাঁড়াতেই পূর্ণ রাশভারী গলায় বললো,
— পঁচিশ মিনিট লাগার মতো কোন কাজ তো করতে পাঠাই নি আপনাকে? আর চোখ এমন কেন? কেঁদেছেন কেন মৃত্ত?
মৃত্তিকা মাঝেমধ্যে একটু বেশিই অবাক হয়। পূর্ণ কিভাবে ওর চোখ বুঝে? নত মস্তিষ্কেই জবাবে মৃত্তিকা বললো,
— বাসায় যাই এখন?
— এটা আমার উত্তর না৷ আচ্ছা বাদ দিলাম। বাসায় এখন কিভাবে যাবেন? নিশ্চয়ই বলে এসেছেন আজ লেট হবে?
মৃত্তিকা বুঝলো পূর্ণ ওকে টন্ট করছে তাই মাথা তুলে অন্য দিকে তাকিয়ে বললো,
— একটু ঘুরব তারপর বাসায় যাব।
— কার সাথে?
— একা একা ই।
— আসুন।
বলে সামনে হাটা দিলো পূর্ণ। মৃত্তিকা অবুঝ বালিকার ন্যায় তার পিছু পিছু গেলো।

ক্লাস শেষ অথচ হিমু বসে বসে লাইব্রেরিতে নোট করতে ব্যাস্ত। নিজের নোট তার আগেই শেষ। এখন সে নোট করছে তার একমাত্র আবেগের অর্থাৎ রুপা’র জন্য। রুপা যদিও তাকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না। আশে পাশে দেখলেই ধমকি হুমকির মধ্যে রাখে। কাল হিমু’কে ডেকে আদেশের স্বরে রুপা বলেছিলো,
— কি জনাব হিমু কিছু কাজ কাম আছে নাকি সারাদিন ই বইতে মুখ গুজে রাখেন।
হিমু আমতা আমতা করে বলেছিলো,
— জ্বি না মানে দুটো টিউশন করাই।
— ওও। শুনো আমাদের ক্লাসের সিআর থেকে আজকের ক্লাসের সব নোট করে কালকে আমাকক দিবে। এই নাও খাতা।

কথাটা বলেই খাতা দিয়ে চলে যায় রুপা। হিমুর মুখে উপচে পড়া হাসি। মনে হচ্ছে তাকে কেউ খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়ে গেলো। এতটা যে ওকে হেও করলো তাতে ওর যায় আসে না। রুপা তাকে কাজ দিয়েছে তাতেই সে খুশি। একটু বেশিই খুশি। সবাই তাকে খেঁপায়। বারবার নানা কথা বলে। রুপা’কে নিয়ে ভাবে বলে উজ্জ্বল কত খিল্লি উড়ায় কিন্তু হিমু দমে না। তার বিশ্বাস একটা ভালোবাসা ভিন্ন হবেই। রুপা এই হিমুর হবেই। শারীরিক গড়নের উপর ভিত্তি করে নিশ্চিত কেউ ই ভালেবাসে না।

খোলা মাঠ। চারিদিকে সাদায় সাদায় ভরা। আকাশের মেঘ গুলো একদম ফুলা ফুলা। সেই সাথে বয়ে চলছে শারদীয় বাতাস। শরৎ কাল বলে কথা। কাশফুলে ভরা চারদিক। সেই সাথে পালা দিয়ে তার সৌন্দর্য বর্ধনে যোগ দিয়েছে পানিতে টাইটুম্বুর বিল। পুরোটাই পরিষ্কার স্বচ্ছ পানিতে ভরা। তার মধ্যে পরন্ত বিকেল। আর কি চাই মানসিক শান্তি’র জন্য?

এমন একটা সুন্দর মাখোমাখো ভালোওয়ালা সময়ে মৃত্তিকা’র মোটেও মন চাইছে রিক্সায় বসে থাকতে। যদিও তার খারাপ লাগছে না বরং কেমন উলোট পালোট অনুভব হচ্ছে কারণ একটাই তার পাশেই রিক্সায় বসা পূর্ণ। এতটুকু রিক্সা তারমধ্যে বসেছে দুইজন। লম্বা চওড়া পূর্ণ সাদা পাঞ্জাবি পড়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে তার পাশেই ছোট্ট চড়ুই পাখির মতো বসে আছে মৃত্তিকা। এ যেন উট পাখির সাথে চড়ুই পাখি। নিজেকে এমন উদ্ভব ভাবে চিন্তা করে নিজের উপর কেমন বিরক্ত হলো মৃত্তিকা। এমন একটা পরিবেশ সাথে আছে পূর্ণ ভাই এরমধ্যে নিশ্চিত এমন আজগুবি চিন্তাভাবনার মানেই হয় না। একসাথে বসলেও পূর্ণ ভাই যথেষ্ট সামলে বসেছেন। দেখলেই বুঝা যাবে উনি অন্য জনের বউকে নিয়ে বসেছেন। একটা পুরুষ এতটা সামলে কিভাবে চলে? এই যে এখন ভুলেও মৃত্তিকার গায়ে লাগছে না পূর্ণ। একটা ধারণা মৃত্তিকা’র বদলালো বটে। সব রাজনীতিবীদ’রা খারাপ না। সবার চরিত্রে দোষ থাকে না। কেউ কেউ পবিত্র হয়। পবিত্র পুরুষ। যেমন পূর্ণ। নিজের সাথে কাউকে ঘেঁষতে দেয় না সে। কতটা হায়া থাকলে একজন তাগড়া যুবক এভাবে চলাচল করে? মৃত্তিকা মনে মনে বলে উঠলো, “পবিত্র পুরুষ। চরিত্রবান পুরুষ।”
হঠাৎ রিক্সা থামলো। এক লাফে পূর্ণ নেমে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটা বের করে ভাড়া দিলো। মৃত্তিকা’কে বসে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

— নামবেন নাকি বাসায় যাবেন?
মৃত্তিকা নিজের অযাচিত জল্পনা কল্পনা সব বাদ দিলো৷ আস্তে ধীরে শাড়ী সামলে নেমে গেলো। আশে পাশের জায়গা দেখতে দেখতে যেন ওর চোখ জুড়িয়ে গেলো। এত কাশফুল একসাথে কখনো দেখে নি ও। বাবা’র সাথে অনেক ঘুরেছে এই জায়গাটা ভিন্ন। আলাদা শান্তি ময় স্থান। একা একাই হাটতে লাগলো মৃত্তিকা। আশে পাশে অনেক মানুষই এসেছে। কেউ কেউ তো গুড়া গুঁড়া বাচ্চা ও নিয়ে এসেছে। মৃত্তিকা’র এসব দেখেই খুশি লাগে। নিজের বাচ্চাদের ও সে নিয়ে এখানে আসবে মনে মনে ভেবে রাখলো। পূর্ণ হঠাৎ সাইডে তাকাতেই দেখলো মৃত্তিকা নেই। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালেও পেলো না। বিরক্তি সূচক শব্দ করলো মুখে। তখনই চিনা পরিচিত হাসির শব্দ পেলো। খেয়াল করলো মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা ওর সামনে হাসে না। হাসবে তো দূর কথাই গুনে গুনে বলে। এখন হাসছে কিভাবে। কয়েকটা বাচ্চার সাথে মিলে কাশফুল নিয়ে টানাটানি করছে।

দেখতে সুন্দর হলেও কাশফুল ছিড়াটা একটু কষ্টসাধ্য। সহজে ছেঁড়া যায় না। গোড়াটা তুলনামূলক শক্ত। মৃত্তিকা বাচ্চাগুলোকে কোনমতে ছিঁড়ে দিলেও নিজের জন্য আর নিতে পারলো না। হাত লাল হয়ে এসেছে তার। লম্বা লম্বা দাগ পড়েছে। মুখটা বোঁচা করে মৃত্তিকা পূর্ণের দিকে গেলো। পূর্ণ যেন দেখেও দেখলো না। গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— ঘুরা হয়েছে? এবার বাসায় চলুন।
মৃত্তিকা যেন আকাশ থেকে পড়লো মুখটা ঠিক তেমনই করলো। পূর্ণ’র ভাবভঙ্গি বুঝার কায়দা নেই। সে একটা কালো মাক্স পড়ে আছে। মৃত্তিকা কিছুটা অবাক হওয়ার স্বরে বললো,
— মাত্র না এলাম? এখনই যদি চলে যাই তাহলে আসার কি দরকার ছিলো?
এই প্রথম এতটা উত্তেজিত হলো মৃত্তিকা তাও কি না পূর্ণ’র সামনে। ত্যাঁড়া কন্ঠে পূর্ণ বলে উঠলো,
— তাহলে কি এনে ভুল করলাম আপনাকে মৃত্ত?

মৃত্তিকা দমে গেলো। মাথাটা প্রতিবারের ন্যায় নামিয়ে নিলো। পূর্ণ সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। এই ঝোঁপঝাড় এ ঘুরাঘুরি ওর মোটেও পছন্দ নয়। কলেজ পড়ুয়া এমনকি এখন স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়েরাও এসব জায়গায় এসে ঘুরে বেড়ায়। একটু অন্ধকার নামলেই গাঞ্জাখোড়দের অভাব পড়ে না। পুলিশ যদিও থাকে তবুও লাভের লাভ কিছুই হয় না। আজ পূর্ণ এসেছে শুধু মাত্র মৃত্তিকা’র করা তার কাছে প্রথম আবদার পূরণ করতে। নাহলে কখনোই ওর এসব পছন্দ না।
এখন আবার ঝামেলা করছে তার মৃত্ত। মুখটা একেবারেই ভোঁতা করে রেখেছে। কি আর করার? পূর্ণ সামনে হাটা দিলো। পিছু পিছু তার মৃত্ত আসবে এটা তার আগেরই জানা।
সামনেই ফুচকার স্টল। পূর্ণ সেখানে থামতেই মৃত্তিকা পেছন থেকে বললো,

— আপনি ফুচকা খাবেন?
— না। আমার মৃত্ত খাবে।
কথাটা কিছুটা মুখ ফস্কেই বললো পূর্ণ অথচ গিয়ে লাগলো মৃত্তিকার বুকে। “আমার মৃত্ত” মানে পূর্ণ’র মৃত্ত। ভাবতেই যেন গালদুটো গরম হলো। পূর্ণ এক প্লেট ফুচকা অর্ডার দিয়ে মৃত্তিকা’কে নিয়ে সাইডে গেলো। একটা ছোট্ট পিচ্চি দিয়ে গেলেই মৃত্তিকা পরপর মুখে ভরতে লাগলো। পূর্ণ ওর এমন খাওয়া দেখে কিছুটা ধমকি দিয়ে বললো,
— তালুতে উঠবে তো। এভাবে খাওয়ার কি আছে?
মৃত্তিকা মুখে আরেকটা পুরে বললো,

–আরেক প্লেট খাব।
— উহু। আর একটা ও না।
— কেন টাকা নেই আর আপনার?
কথাটা খাওয়ার তালে তালে বলেই জিভ কাটলো মৃত্তিকা। ভয়ে ভয়ে মাথা তুলতেই দেখলো পূর্ণ’র গম্ভীর চেহারা। পূর্ণ কিছুটা স্বাভাবিক কন্ঠেই বললো,
— আপনাকে কে বললো আমি টাকা দিব?
মৃত্তিকা’র বেশ গায়ে লাগলো কথাটা। মানলো সে নাহয় মুখ ফস্কে বলে ফেলেছে তাই এভাবে অপমান করতে হবে? কোনমতে বাকি তিনটা একসাথে মুখে ভরে প্লেট রাখতে গেলো। ব্যাগে হাত দিয়ে টাকা বের করে দিতে নিলেই লোকটা মানা করে দিলো। মৃত্তিকা জোর করলেও নিলো না। পিচ্চিটাকে টাকা সাধলে সেও নিবে না। লোকটা শুধু বললো,

— আম্মা এই দোকান তো পূর্ণ ভাই ই তুলে দিসে। এক প্লেট ফুচকা’র টাকা নিলে আল্লাহর কাছে কি জবাব দিমু?
মৃত্তিকা আর কিছু বললো না। যা বুঝার বুঝেছে সে। পূর্ণ’র কাছে আসতেই দেখলো তার এক হাত ভর্তি কাশফুল আরেক হাতে গোলাপি, নীল আর বেগুনি রঙের কটন ক্যান্ডি। মৃত্তিকা যেতেই তার হাতে ওগুলো দিয়ে দিলো। মৃত্তিকার মুখ জুড়ে তখন বিস্তর হাসি। পূর্ণ ও বুঝি হাসলো। বুঝলো না মৃত্তিকা। শুনা গেলো পূর্ণ’র কন্ঠ,
— এবার চলুন মৃত্ত। অনেক হয়েছে।
কথাটা বলেই আশে পাশে তাকালো। সামনেই বাইকে বসা অনেকগুলো ছেলে পেলে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে দেখে শক্ত করে মৃত্তিকা’র হাতের কবজিটা ধরে সামনে হাটা দিলো। রোডের দিকেই গাড়ি রাখা। ড্রাইভার ডোর খুলে দিতেই আগে মৃত্তিকা’কে বসিয়ে নিজেও ঢুকে পরলো পূর্ণ। গ্লাস লাগানোর আগে আরেকবার দেখে নিলো বাইরে। বিশ্রী এক হাসি দিলো বাইকে বসা ছেলেটা বিনিময়ে চোখ রাঙালো পূর্ণ।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই পূর্ণ দেখলো মৃত্তিকা খাওয়া শুরু করেছে। মেয়েটা’কে ওর দারুণ লাগে। এক বোতল পানি নিয়ে নিজে একটু খেয়ে মৃত্তিকা’র দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

— খেয়ে নিন।
একটু পরই আবারও গম্ভীর কণ্ঠে পূর্ণ বলে উঠলো,
— আজই শেষ মৃত্ত। আর কখনো এমন আবদার করবেন না। আমার কারণে আপনার কিছু হোক সেটা মানতে পারব না আমি।
মৃত্তিকা কিছুই বুঝলো না। পূর্ণ আবারও বলে উঠলো,
— আর কখনো যাতে ভার্সিটিতে শাড়ী পড়াতে না দেখি। বিয়ের পর পড়বেন সেটা আলাদা। আমি দেখব৷ আমার মৃত্ত’কে অন্য কেউ কেন দেখবে?

ক্লাস শেষ হতেই মৃত্তিকা দৌড় লাগালো। আজ টিচার ঢুকেছে দেড়ীতে। এখন সময় পূর্ণ’র সাথে দেখা করার। সারা দিনে এই এক বারই তো সময় হয়। এরপর মৃত্তিকা শুধু চোখের দেখা দেখে দুই একবার কচিতে। পূর্ণ পড়াশোনা আর রাজনীতি দুটোতেই চর্চিত। মেধাবী একজন ছাত্র এই ভার্সিটির। সব ডিপার্টমেন্টেই তার সুনাম রয়েছে। মৃত্তিকা যদিও এখনও প্রচুর ভয় পেয়ে চলে ওকে কিন্তু মনের কুঠুরির কোন এক কোণায় নিজের অবস্থান ঠিক করে নিয়েছে পূর্ণ। একদম জোড়ালো ভাবে। এই যে আধ ঘন্টা দেড়ী হওয়াতেই কেমন দৌড়ে যাচ্ছে মৃত্তিকা। একটু দেড়ীও যেন সহ্য হয় না অথচ এমনও দিন যায় যে মৃত্তিকা ঘন্টা’র পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। দূর থেকেই মৃত্তিকা খেয়াল করলো হালকা রঙের কটন পাঞ্জাবি পড়ে সুপুরুষ দাঁড়িয়ে আছে বট গাছে হেলান দিয়ে। আশে পাশে কয়েকজন ছেলে পেলে। মৃত্তিকা’কে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখেই গম্ভীর মুখে পূর্ণ সবাই’কে বিদায় জানালো। ওরা যেতেই হেলান দেয়া থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মৃত্তিকা দৌড়ে এসেই হাঁপিয়ে উঠলো। হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাচ্ছে মৃত্তিকা সেটা দেখেই ভ্রু কুচকে তাকালো পূর্ণ। নিজের হাতে থাকা কোকাকোলার আধ খাওয়া বোতলটা নিয়ে এগিয়ে আসতেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো মৃত্তিকা। পূর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে কিছুটা রাগ মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— এভাবে দৌড়ে আসার মানে কি মৃত্ত?
কথাটা রাগী ভাবে বললেও বোতলটা মৃত্তিকা’র হাতে তুলে দিলো। মৃত্তিকা হাতে নিয়ে এক ঢোক খেয়েই বললো,
— কোকাকেলা খাই না আমি। জুস ভালো লাগে।
— আমি জিজ্ঞেস করেছি?
পূর্ণ’র এহেন কথার প্রেক্ষিতে বেশ অপমানিত বোধ করে মৃত্তিকা। এভাবে কথার পৃষ্ঠায় কথাটা বলেছে মৃত্তিকা তাই বলে অপমানটা কি না করলে হতো না? সবসময় কেন এভাবে কথা বলে পূর্ণ ভাই? মৃত্তিকা’র মাটির ন্যায় হৃদয়ে যে আঘাত লাগে সেটা কি পূর্ণ ভাই বুঝে? পূর্ণ আবারও ধমকে জিজ্ঞেস করলো,
— এভাবে দৌড়ানোর মানে কি মৃত্ত? যদি পড়ে যেতেন?
মৃত্তিকা পায়ে দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বললো,
— ক্লাস দেড়ীতে শেষ হলো। আপনি অপেক্ষা করছিলেন তাই…
মৃত্তিকা’র কথাটা এক প্রকার কেঁড়ে নিয়ে পূর্ণ বলে উঠলো,
— তাই বলে এভাবে দৌড়াবেন আপনি? আশে পাশে তাকানো উচিত ছিলো আপনার। এরপর আর…
পূর্ণ’র বাকি কথাগুলো অসম্পূর্ণ রয়ে গেল মৃত্তিকা’র কান্ডে। মৃত্তিকা হাতে’র আধ খাওয়া বোতলটা সজোরে আঁছড়ে মে’রে কিছুটা রেগে গিয়ে বললো,

— কি হয়েছে দৌড়ে আসাতে? এখন কি দৌড়াতেও পারব না আপনার জন্য?
মৃত্তিকা নিজের কাজে নিজেও হতবাক হয়ে গেল। কার সামনে কি বললো। তা ও কি না এভাবে রেগে গিয়ে। ভয়ে ভয়ে তাকাতেই দেখলো পূর্ণ চোখ লাল করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ঢোক গিললো মৃত্তিকা। চোখে পানি চলে এলো। ও মোটেও এভাবে বলতে চায় নি। ন্যাচারাল ভাবেই এমনটা হয়েছে কিন্তু সেটা কি পূর্ণ ভাই বুঝবে? হঠাৎ চাপা গলায় শান্ত বাণী শুনা গেলো,
— উচ্চবাক্য তাও আমার সাথে একদমই পছন্দ নয় আমার মৃত্ত। আজ প্রথম বলে ছেড়ে দিলাম এরপর কি করব সেটা আশা করি বলে বুঝাতে হবে না।
কথা গুলো একদম মৃত্তিকা’র কাণের গোড়ায় এসে বললো। পূর্ণ’র প্রত্যেকটা গরম নিঃশ্বাস গিয়ে পড়লো মৃত্তিকা’র ঘাড়ে। কাঁপন ধরলো তার অঙ্গে। সরে দাঁড়ালো পূর্ণ। ছোট্ট করে বললো,

— এখানে বসুন।
মৃত্তিকা’র নড়চড় হলো না। পূর্ণ এবার রাশভারি গলায় বলে উঠলো,
— হা করুন মৃত্ত। আপনার কলিজাটা কত বড় সেটা দেখব আমি।
মৃত্তিকা ভীতু দৃষ্টিতে চোখ ভরা পানি নিয়ে মাথা তুলতেই পূর্ণ ফিচেল গলায় বললো,
— এতটুকুতেই এই অবস্থা আবার আমার সামনে তেঁজ দেখান? এই তেঁজ আমার সামনে যাতে আর না দেখি মৃত্ত। একদম কলিজা ছিড়ে নিব।
মৃত্তিকা’র চোখে আর পানিগুলো আটকে রইলো না। টপাটপ তা বর্ষিত হচ্ছে। কি এমন করেছে মৃত্তিকা যে তাকে এভাবে বলা হচ্ছে?
পা ফেলে পূর্ণ’র দেখানো জায়গায় একদম গুটিয়ে বসলো সে। পূর্ণ ও বসলো তবে দূরত্ব রেখে। টুকটাক কথা জিজ্ঞেস করতেই মৃত্তিকা কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালালো কিন্তু হায় এই বেহায়া চোখ অশ্রু ঝরাতে এতই পছন্দ করে যে থামতে চাইলো না। কোনমতে পূর্ণ’র প্রশ্নের উত্তরে মৃত্তিকা হু হা করলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পূর্ণ নরম গলায় ডাকলো,

— মৃত্ত?
মৃত্তিকা চমকালো। এত মাসে আজ দ্বিতীয় বার পূর্ণ এতটা নরম কন্ঠে কথা বললো। মৃত্তিকা একবার তাকিয়ে মাথা নামালো। পূর্ণ যথেষ্ট ঠান্ডা ও শান্ত মেজাজে বললো,
— অভিমান করে লাভ নেই মৃত্ত। আপনার এই অভিমান ভাঙানোর মতো সম্পর্ক তো আমাদের নেই তাই নিজেকে ঠিক করুণ। এত সস্তা চোখের পানি যে ঝরাতেই থাকেন।
মৃত্তিকা হাতের কুনুইয়ের দিকে চোখ ঢলে মুছলো। শ্যামলা মুখটা যথেষ্ট গড়ে রচে আছে। পূর্ণ এক ধ্যানে সেখানে তাকিয়ে রইলো। অপেক্ষা জিনিসটা ভয়ংকর। বেশিই ভয়ংকর। জ্বালাময়ী ভয়ংকর। এখন এত এত বাঁধা না থাকলে সে তার মৃত্ত’কে একটু ছুঁয়ে দিত। কপালে ঘামে লেপ্টে যাওয়া চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দিলো। এতটা কান্না করানোর পর একটা ছোট্ট আদুরে চুমুও দিতো।

উজ্জ্বল বেশ জোড়েই একটা থাপ্পড় মারলো হিমুর পিঠে। চিকন শরীরে এহেন বড় সড় থাবা পড়ায় কিছুটা ছিটকে সরলো হিমু। ছেলেটা রাগে না। পাতলা ঠোঁটে হাসি এনে বললো,
— শ্যালা এখন আমি মা’রি?
— মার। তোর ওই দুই ছটাক শরীরে’র আঘাতে আমার কি হবে উল্টো নিজে ব্যাথা পাবি।
হিমু তবুও একটা কিল মারলো। ব্যাথাটা নিজেই পেলো হাতে। ওর কান্ডে সবাই হাসলো একদফা। ছেলেটা এমনই। কিছু মানুষই থাকে এমন। হিমুর চরিত্রের। এদের যতই খোঁচাও। কটু কথা বলো। মজা নাও। এরা মন খারাপ করবে না বরং তোমার সাথে নিজের উপর নিজেই হাসবে। হিমু’র চরিত্রটা ও ঠিক তেমনই। নরম মনের এক সৎ ছেলে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য সুদূর পাড়ি জমিয়ে এসেছে ঢাকায়। ওদের আড্ডার মাঝেই রুপা হাজির হলো। এসআই দেখলে যেমন হাবিলদার এক পায়ে দাঁড়িয়ে সালাম দেয় ঠিক তেমন ভাবেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল হিমু। রুপা বেশ চওড়া গলায় বললো,

— নোট হয়েছে?
— কি? নোট? ও হ্যাঁ হ্যাঁ।
কিছুটা এলোমেলো ভাবে কথাগুলো বলে ব্যাগ হাতড়ালো হিমু। সুন্দর ফাইলে করে সেটে এনেছে সে। এগিয়ে দিতেই হাসি মুখে কিছু বলতে নিলো হিমু কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে রুপা ফাইলটা নিয়েই চলে গেল। একটা ধন্যবাদ পর্যন্ত দিলো না।উজ্জ্বল চটে যাওয়া গলায় বললো,
–শালী ঢংগী। ছেড়াটাকে কু*ত্তা খাটান খাটিয়ে একটা ধন্যবাদ ও দিলো না।
“শালী” সম্মধোনটা পছন্দ হলো না হিমু’র। নিশ্চিত রুপা ব্যাস্ত। তাই রাগী কন্ঠে বললো,
— ওনার নামে এভাবে বলবি না উজ্জ্বল। আমার ভালো লাগে না।
হিমু বেশ সিরিয়াস ভাবেই বলেছে। শান্তি প্রিয় মানুষ রাগলে ভয়ংকর। ব্যাপারটা সামাল দিতে ইমাদ ছেলেটা বলে উঠলো,

— আরে চিল। উজ্জ্বল তো এমনিতেই বললো। রুপা আপুর বড় বোনকে বিয়ে করবে ও। তাই তাকে শালী ডাকলো।
উজ্জ্বল ত্যাঁড়া কন্ঠে বললো,
— আমারে তো পাগলা কু*ত্তায় কাঁমড়াইসে।
বলেই চলে গেল। এই রুপা হিমু থেকে শুধু স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে অথচ হাঁদারাম হিমু সেটা বঝতেই পারছে না। সারাদিন পা চেটে বেড়ায় রুপার। হিমু’র অনুভূতি গুলো স্বচ্ছ অথচ রুপা যে ওকে নিয়ে খেলছে সেটা সবাই বুঝলেও হিমু মানতে নারাজ।

মৃত্তিকা গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। বাবা তো বলেছে আজ নিতে আসবে। ফোন দিলেও ধরছে না। ওর পাশেই উজ্জ্বল, হিমু আর ইমাদ দাঁড়িয়ে। সাথে ক্লাসের বেশ কয়েকজন মেয়ে। ওরা একই বাসে যায়। হঠাৎ সোজা পথে যাওয়া একটা প্রাইভেট কার সাইড কেটে একদম সামনে এসে মৃত্তিকা’কে ধাক্কা মে’রে গেলো। ঘটনা এতটাই দ্রুত ঘটলো যে কেউ কিছু বুঝলো না। মৃত্তিকা’র কপাল লাগলো একটা আধ ভাঙা ইটে। মৃত্তিকা সেটা হাতে তুলে সজোরে ছুঁড়ে মারতেই সেটা একদম গাড়িটার ব্যাক গ্লাসে লাগলো। কাঁচ না ভাঙলেও ফাটলো ধরলো কিছুটা। পূর্ণ কোথা থেকে দৌড়ে আসতেই বাকিরাও তারাতাড়ি ওকে ধরে উঠালো। রাগে পূর্ণ’র চোখ টলমল করছে। ওর সামনেই কি না কেউ ওর মৃত্ত’কে এভাবে আঘাত করার সাহস পায়। মৃত্তিকা কপালে পেয়েছে ব্যাথাটা সাথে হাত ছিলে গিয়ে হয়তো পায়ে কিছুটা পেয়েছে। ওকে ধরে পাশে বসাতেই পূর্ণ নিজের রুমাল বের করে পানিতে ভিজিয়ে মৃত্তিকা’র কপালে চেপে ধরে র*ক্ত পরিষ্কার করলো। না বেশি কাটে নি। মৃত্তিকা কাঁদো কাঁদো চোখে তাকিয়ে রইলো। এই লোক আজ এতটা শান্ত কেন? মৃত্তিকা’র এই অবস্থায় তার এমন শান্ত আচরণ সত্যিই ভাবার বিষয়। ভয়ংকর বিষয়। মৃত্তিকার বাবা মেয়েকে রাস্তায় এভাবে দেখে গাড়ি থেকে নেমে হুরতার করে নামলো। মেয়ে’র সামনে গিয়ে একপাশে ধরে আতঙ্ক জনিত কণ্ঠে বললো,

— মা আমার কিভাবে হলো এটা? কপালে কি হয়েছে? কাটলো কিভাবে?
ছোট্ট বাচ্চার মতো মৃত্তিকা নিজের ছিলে যাওয়া হাত, পা দেখালো। ওর বাবা যেন পাগল হয়ে উঠলো। তার কলিজারটুকরো এই মেয়ে। ড্রাইভার’কে ডাক দিতেই পূর্ণ বলে উঠলো,
— বেশি কাটে নি। এনটিসেপটিক ক্রিম লাগালেই হবে।
ততক্ষণে একটা ছেলে ক্রিম নিয়ে ও এলো। পূর্ণ আস্তে করে তা লাগিয়ে দিলো। মৃত্তিকা আদুরে বাচ্চার ন্যায় বাবা’র বুকে ঢুকে আছে। পূর্ণ কিছুটা অবাক হয়ে দেখলো। বুঝলো। তার মৃত্ত একটা আদুরে বাচ্চা। বিড়াল ছানা। ছোট্ট চড়ুই কিভাবে তার বাবা’র বুকে ঢুকে আছে। ভদ্রলোক পূর্ণ’কে ধন্যবাদ জানিয়ে মৃত্তিকা’কে কোলে তুলতে নিলেই মৃত্তিকা জানালো সে হাটতে পারবে। পূর্ণ শুধু পাশ থেকে মৃত্তিকা’র কানে বললো,

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৩+৪

— তান্ডব আমি ঘটাব মৃত্ত। সব জ্বালাব।
মৃত্তিকা’র কানে সেই কথাটাই বাজতে লাগলো। পূর্ণ যে ভয়ংকর কিছু করবে সেটা ভাবতেই ওর মাথা ঘুরায়। এই মারামারি কোন কালেই পছন্দ না মৃত্তিকা’র। ওর চিন্তার মাঝেই ওর বাবা ওকে পাজা কোলে তুলে নিলো। ভদ্রলোক লোক সুপুরুষ। নিশ্চিত তাহলে মৃত্তিকা মায়ের রুপ পেয়েছে। কথাটা ভেবেই পূর্ণ মনে মনে হাসলো। রহস্যময় সেই হাসি। যার পেছনে রয়েছে অতি ভয়ংকর কিছু।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ৭+৮