Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৮

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৮

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৮
রুহানিয়া ইমরোজ

অন্ধকারাচ্ছন্ন রজনী। ঘড়ির কাঁটা সবে আটটা পেরিয়েছে। তার টিক টিক শব্দে অর্ধ অচেতন ফারজানার কপাল কুঁচকে যায়। আস্তে-ধীরে সময় নিয়ে পিটপিটিয়ে চোখ মেলে তাকায়।
বেডের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল ইশতিরাজ এবং নার্স। ফারজানার বিষয়ে কথা বলছিল তারা। এরমধ্যে তার জ্ঞান ফিরতে দেখে ইশতিরাজ বিড়বিড়িয়ে বলল,
–” কাম সারছে রেএএ। আমার ইজ্জত অপহরণ হওয়া থেকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না..
অথচ তেমন কিছুই হলো না। ফারজানা নির্জীব চোখে চেয়ে রইল তাদের দিকে। ওমন অবস্থা দেখে সন্দিহান কন্ঠে শুধাল ইশতিরাজ,

–” মিস জানা? ক্যান ইয়্যু হেয়ার মি?
ফারজানা উত্তর দিলো না শুধু চোখ তুলে তাকাল। ফলস্বরূপ সন্দেহ আরও গাঢ় হলো ইশতিরাজের। হাত বাড়িয়ে ফারজানার বডি টেম্পারেচার চেক করতে নিলে খিঁচিয়ে চোখমুখ বন্ধ করে নেয় সে।
ইশতিরাজ চট করে হাত সরিয়ে নেয়। স্যারেন্ডার করার ভঙ্গিতে হাত তুলে কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বলে,
–” রিল্যাক্স। টাচ করব না আমি আপনাকে। দেখুন এই যে.. দূরে সরে গেছি আমি।
ফারজানা তখনও ভয়ে জুবুথুবু। ইশতিরাজ চোখের ইশারায় নার্সকে কিছু একটা ইশারা করে। রাজের ইন্সট্রাকশন বুঝে নার্সটি গিয়ে ফারজানাকে জড়িয়ে ধরে। দুর্বল মেয়েটা কাঁপা হাতে আঁকড়ে ধরে তাকে। বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে,

–” আ আমার লাড্ডুকে ড্ ডকো..
নার্সটা ফারজানার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বলল,
–” অবশ্যই ডাকব তাকে। আপনি শান্ত হোন আগে। এভাবে ভয় পাচ্ছেন কেনো? উনি আপনার ডক্টর। শুধুমাত্র চেকআপ করতে…
কথাটা শেষ করতে পারল না নার্স। তার আগেই মৃদু স্বরে আর্তনাদ করে ভয়ার্ত কন্ঠে ফারজানা বলে উঠল,
–” কিচ্ছু লাগবে না আমার.. উন্ না কে এক্ষুনি চলে যেতে বলো। নয় তো.. আমায় ছুঁয়ে দিবে। নোংরা হয়ে যাব আমি। সব্ সবাই খারাপ মেয়ে বলবে। সুযোগ নিতে চাইবে…
ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে ফারজানা। নার্সের পক্ষে সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না তাকে। ইশতিরাজ গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল। সবটা পর্যবেক্ষণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেচারা৷ যেটার ভয় ছিলো সেটাই হয়েছে। সিচুয়েশন আউট অব কন্ট্রোল।

ইশতিরাজের ধ্যান ভাঙে মনিটরের বিপ বিপ শব্দে। তরতরিয়ে হার্টবিট বাড়ছে মেয়েটার। শ্বাস টানতেও কষ্ট হচ্ছে। চোখমুখ উল্টে ফেলছে। ইশতিরাজ আর দেরি করল না। দ্রুত ইনজেকশন রেডি করে এগিয়ে গেল বেডের দিকে। তাকে আগাতে দেখে ফারজানা আরও সিঁটিয়ে যায় নার্সের দিকে। ভয়ে পাগলের মতো ছুটোছুটি করতে থাকে।
ইশতিরাজ নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত রাখে ফারজানার বাহুতে। মেয়েটা সজোরে চিল্লিয়ে উঠে। তার বীভৎস আহাজারিতে স্বয়ং ইশতিরাজ কেঁপে উঠে৷ নার্সের হাত খামচে ধরে ফারজানা হড়বড়িয়ে বলে উঠে,
–” ধ্বংস করে দিবে ওরা আমায়। কেড়ে নিবে আমার ইজ্জত। প্লিজ বাঁচাও আমায়…
ফারজানার আক্রমণে নার্সটি হতভম্ব হয়ে ছিটকে সরে যায়। ফারজানা উবু হয়ে পড়ে যেতে নিলে ইশতিরাজ তার হাত টেনে ধরে নিজের কাছে আনে। ফারজানা দ্বিগুণ তেজে ছটফটিয়ে উঠে তবে রাজ এর পুরুষালী শক্তির কাছে সেসব নস্যি। মুহূর্তের মধ্যে তাকে ধরাশায়ী করে ইনজেকশন পুশ করে দেয় ইশতিরাজ।
মিনিট দশেক ছুটোছুটি করে অবশেষে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায় ফারজানা। পুরো সময়টা তাকে নিজের বাহুবন্ধনীতে আবদ্ধ রেখেছিল ইশতিরাজ। উদ্ভ্রান্ত মেয়েটার মাঝে খুঁজছিল খুব প্রিয় কারও প্রতিচ্ছবি। সবটা মিলে যায় পার্থক্য শুধু সত্তার।

একরাশ অস্থিরতা নিয়ে ইশতিরাজের কেবিনে অপেক্ষা করছে প্রিমা। তার অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হলো না। মিনিট দুয়েক পরেই কেবিনে আসলো ইশতিরাজ।
প্রিমা দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ইশতিরাজ নরম গলায় বলল,
–” প্লিজ বি সিটেড।
প্রিমা বসল। ইশতিরাজ নিজের আসন গ্রহণ করে বড্ড শান্ত গলায় বলল,
–” আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাইছি না। যা বলার সরাসরি বলব। ভেঙে পড়বেন না প্লিজ।
কথাটা শুনে বুক ধড়ফড়িয়ে উঠল প্রিমার। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
–” জ্বী বলুন।
ইশতিরাজ ভণিতা ছাড়াই বলতে শুরু করল,
–” মিস জানা ভয়ংকর ভাবে ট্রমাটাইজড। উনার মাথায় এই বিষয়টা সেট হয়ে গেছে যে ডক্টর মানেই রেপিস্ট বা সুযোগ-সন্ধানী লোকবল। দ্বিতীয়ত উনি খুব বেশি নাজুক হয়ে পড়েছেন। এমতবস্থায় কোনো ট্রিটমেন্ট দেওয়া অসম্ভব ব্যপার।
প্রিমা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

–” এখন উপায়?
ইশতিরাজ শুকনো ঢোক গিলে বলল,
–” ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল এন্ড অভিনয়।
প্রিমা অবুঝ কন্ঠে বলল,
–” মানে?
ইশতিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,
–” নিজের প্রতি ঘৃণা তৈরী হয়ে গেছে উনার। যার ফল স্বরূপ জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। উনি বাঁচতেই চান না এখন। এই সমস্যাটা দূর করতে হবে আপনাকে।
প্রিমা হতবাক কন্ঠে শুধায়,
–” কীভাবে?
ইশতিরাজ সরল গলায় উত্তর দেয়,
–” ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করে। উনাকে বোঝান হাও মাচ ইম্পোর্ট্যান্ট শী ইজ। এটা করতে পারলে একটুখানি ধাতস্থ হবেন উনি। উনার মধ্যে বাঁচার আগ্রহ তৈরী হলে পরবর্তী ধাপে কাউন্সিলিং করব।
প্রিমা প্রশ্নাত্মক চোখে চেয়ে শুধাল,

–” কাউন্সিলিং করাতে আদৌ রাজি হবে বুবু?
ইশতিরাজ শান্ত গলায় উত্তর দিল,
–” উনি জানবেও না যে কাউন্সিলিং হচ্ছে।
প্রিমা অবাক কন্ঠে শুধায়,
–” মানে?
ইশতিরাজ স্বাভাবিক গলায় উত্তর দেয়,
–” মানে এটাই যে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকবেন যিনি সমস্ত কিছু হ্যান্ডেল করবেন এবং আমি তার নির্দেশনা অনুযায়ী মিস জানার কাউন্সিলিং করব। উনি টেরও পাবে না বিষয়টা।
প্রিমা প্রশ্নাত্মক কন্ঠে শুধাল,

–” সমস্যা হবে না তো আবার?
ইশতিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–” আশা করছি হবে না তবে ডক্টরদের প্রতি উনার ভয়টা কতটুকু দূর করতে পারব সেটা জানি না৷ তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, উনাকে ভীষণ যত্নে রাখতে হবে। লাইফের কোনো স্টেজে গিয়ে যদি পুনরায় এইসমস্ত ঘটনার স্বীকার হোন তাহলে উনাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে।
প্রিমা ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
–” ভীষণ যত্নে রাখব। কক্ষনোই এমন কিছু হবে না৷ তবে.. আমার কী কী করতে হবে?
ইশতিরাজ স্মিত হেসে বলল,
–” সেটা আমি জানিয়ে দিব। আপাতত পজেটিভ মাইন্ডসেট রাখেন। কালকে সকালে উনাকে ডিসচার্জ দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে আসল কাজ৷ যেভাবেই হোক.. উনাকে সুস্থ করে তুলব আমরা।
প্রিমা কৃতজ্ঞতার চোখে চেয়ে বলল,
–” ইং শা আল্লাহ।

একশটা পুশআপ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তাজরিয়ান। প্রচন্ড হাঁপাচ্ছে সে। ঘামে সিক্ত হয়ে উঠেছে তার সারা শরীর। তাজরিয়ানের অবস্থা দেখে তার দিকে সাদা টাওয়েল বাড়িয়ে দিল তামজিদ। সেটা না নিয়ে সরাসরি পাশে থাকা সুইমিংপুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাজরিয়ান।
কনকনের শীতের রাতে বরফের ন্যায় ঠান্ডা পানিতে তাজরিয়ানকে লম্ফঝম্প করতে দেখে বড্ড দুশ্চিন্তা হলো তামজিদের। সাহস করে বলল,
–” আবহাওয়া খুব একটা ভালো না স্যার। ঠান্ডা লেগে যেতে পারে..
পুলের কার্ণিশে বাহু এলিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তাজরিয়ান বলে উঠল,
–” বয়স তো কম হলো না। আমার যে একটা বউ লাগতে পারে.. এরকম চিন্তা তোমার মাথায় আসলো না কেনো তামা?

তামজিদ পড়ল ফ্যাসাদে। এখন কী জবাব দেবে? তাজরিয়ান চোখমুখ কুঁচকে তার দিকেই চেয়ে আছে৷ বেচারা ভয়ে ফাঁকা ঢোক গিলে শুধাল,
–” কাউকে পছন্দ হয়েছে স্যার?
তাজরিয়ান বিতৃষ্ণা মাখা গলায় বলল,
–” পছন্দ হয়নি ওই একটু সুন্দর লেগেছে আরকি৷
যেই লাউ সেই কদু কিন্তু বেডা তো আর স্বীকার করবে না। তামজিদ তর্কে গেলো না পুনরায় শুধাল,
–” তুলে আনতে হবে নাকি স্যার? আপনি বললে এক্ষুনি..
তাজরিয়ান বাঁকা হেসে বলল,
–” পাখি নিজেই খাঁচায় আসবে তামা৷ তুমি ধড়ফড়িয়ো না..
তামজিদ কনফিউজড হয়ে গেলো। এই সাইকো বলে কী? সত্যি সত্যি বিয়ে টিয়ে করবে নাকি? কে জানে কোন অভাগীর কপাল পুড়ল। বড্ড মন খারাপ হলো তামজিদের। বিবেকের দংশনে টিকতে না পেরে বলল,
–” জোরপূর্বক বিয়ে হয় না স্যার। ওটার জন্য দ্বিপাক্ষিক মতামত থাকা লাগে।
তাজরিয়ান নিরুত্তাপ গলায় বলে,

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৭

–” মত না থাকে মউত কনফার্ম। অফার আমার সিধান্ত তার।
তামজিদ হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
–” কালকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে স্যার৷ ওসব ক্যানসেল করে আমরা শ্রীমঙ্গল কেনো যাচ্ছি?
তাজরিয়ান ভাবলেশহীন গলায় বলল,
–” অমঙ্গল করতে..

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১৯