Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৫৯

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৫৯

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৫৯
নূরজাহান আক্তার আলো

-‘তুমি আজও আমার পাশে দাঁড়ালে না বাবা! আজও না! অথচ তুমিই আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে শীতলকে আমার হাতে তুলে দিবে। শুধু তোমার কথার ভিত্তিতে আমি বাংলাদেশে ফিরেছিলাম। দিনের পর দিন পড়েওছিলাম তোমার কথা বিশ্বাস করে। তুমি আজও আমায় ঠকালে।
সব জেনেবুঝে আমাকে কষ্টের সাগরে ডুবালে। তুমি থাকতে আজ আমি আবারও হেরে গেলাম। ওরা আমাকে আবার হারিয়ে দিলো। তুমি প্রমিস রাখতে পারো না বাবা। ইউ আর লায়্যার বাবা..ইউ আর লায়্যার,,,আই জাস্ট হেট ইউ বাবা! আই জাস্ট হেট ইউ!
ইয়াসিরের চিৎকার করে বলা কথাগুলো শুনে সকলে হতবাক। উপস্থিত সকলে একে অপরকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে। ইয়াসির কাকে বাবা বলছে? কে তার বাবা? এখানে বাইরের কেউ নেই, তাহলে? এদিকে তার কথা শুনে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছেন শারাফাত চৌধুরী। আপাতত বাকহারা তিনি। উনাকে এভাবে তাকাতে দেখে ইয়াসির পুনরায় ডাকল,

-‘পুনরায় নিজের রক্তকে জিতিয়ে দিলে? একবার কি আমাকে জিতাতে পারতে না? চৌধুরীদের রক্ত নই বলে এত অবহেলা? আমার মম বেঁচে থাকলে একাজ করতে পারতে?’
একথা শুনে শারাফাত চৌধুরী চোখ বন্ধ করে নিলেন। এ ডাকটা শোনার জন্য একটা সময় অনেক অপেক্ষা করতেন। কতবার ছেলেটাকে কাছে ডেকেছেন বাবা ডাকা শোনার জন্য। একটু আদর করার জন্য। কিন্তু এই
ছেলে উনাকে দেখতে পারত না। উনার উপস্থিতিও সে সহ্য করতে পারত না। যদিও এর বিশেষ কারণ রয়েছে। ইলিয়ানা মানে ইয়াসিরের আপন মায়ের সঙ্গে একদা এক সময় সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। তখন তিনি সবে নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। কাজের সূত্রে নানান দেশে যেতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সেবার ব্যবসায়ী কাজে সুইডেনে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল ইলিয়ানা খান নামের এক অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী বিদেশীনির সাথে। সে বিদেশী ছিল মুসলিম এবং খান বংশের মেয়ে। তার মামাবাড়ি বাংলাদেশে হলেও আগ্রহ করেও বাংলাদেশে আসে নি কখনো। ইলিয়ানা পেশায় বিজনেস উইমেন। তার স্মার্টনেস, কথার ভঙ্গি, চাল-চলন, বুদ্ধিমত্তা নজরে পড়ার মতো। ইয়াসিরের মতো সেও ছিল নীল চোখের অধিকারী। এই চোখের মোহে তিনিও পড়েছিলেন। যদিও তখন তিনি টগবগে সুদর্শন এক যুবক। এটিটিউড ছিল শুদ্ধর মতো নজরে পড়ার মতো। তবে তিনি শুদ্ধর মতো এত রুড কখনো ছিলেন না। জেদী ছিলেন না। রাগের দিক থেকেও শুদ্ধ এগিয়ে। তো ইলিয়ানার সঙ্গে একেক প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে করতেই মেয়েটা কখন যেন উনার মনে জায়গা করে নিয়েছিল। ভালোলাগা এক পর্যায়ে ভালোবাসার রুপ নেয়। অনেক ভেবে উনি একথাটা ইলিয়ানাকে
জানানোর পর জানা যায়, ইলিয়ানা ডিভোর্সি। এক ছেলের মা সে। তার ছেলের নাম ইয়াসির খান। ছেলের বয়স বারো কী তেরো।

একথা জানার পরও উনার কোনো আপত্তি ছিল না। কারণ উনি জীবনে সৎ জীবনসঙ্গী চেয়েছিলেন। যার মাঝে নিজের ভালোব থাকা খুঁজে নিতে পারবেন। সব পরিস্থিতিতে যে উনাকে শক্তি, সাহস জোগাতে পারবে। কিন্তু সব জেনে
ইলিয়ানা নিজেই তার প্রস্তাব নাকচ করে। ফিরিয়ে দেন উনাকে। তবুও উনি হাল না ছেড়ে বোঝাতে থাকে ইলিয়ানাকে। এমনকি দেশে ফিরেও সরাসরি নিজের বাবা- মাকে জানান। সব জেনে উনারা অমত করেন। কারণ উনারা কিছুতেই একজন ডিভোর্সি মেয়েকে পুত্রবধূ করবেন না। এই নিয়ে নিবাসে অনেক দ্বন্দ হয়। উনিও অফিস যাওয়া বন্ধ করে দেন।

নিজেকে রুমবন্দী করে ফেলেন। পরে একদিন ভাবেন ইলিয়ানা কাছেই চলে যাবে আর দেশে ফিরবেন না। কিন্তু রেডি হয়ে হন্ন হয়ে খুঁজেও উনি উনার পাসপোর্ট ভিসা খুঁজে পান না। পার্সপোস উনার মা লুকিয়ে রাখায় উনি দেশের বাইরে যেতেও পারছিলেন না। তবে ইলিয়ানার সঙ্গে উনার যোগাযোগ হতো। মাঝে মাঝে একটু আধটু কথা হতো। এভাবে কিছুদিন
যাওয়ার পর, হঠাৎ উনার মা পাসপোর্ট ও ভিসা স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে দেয়।
নিজের মুখে বলেন ইলিয়ানার কাছে চলে যেতে। একথা শুনে উনি এক আকাশ সমান খুশি বুকে নিয়ে ইলিয়ানার কাছে সুইডেনে যান। তবে যে ইলিয়ানাকে লাস্টবার দেখেছিলেন সেই ইলিয়ানা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। যে চোখের সামনে আছে সে ছিল ক্যান্সারের পেশেন্ট মাত্র। যার জীবন আয়ু তখন নিভু নিভু পর্যায়। দেহের অবস্থাও ছিল বড়ই নাজুক।

সেদিন উনি ইলিয়ানার হাত ধরে ছোটো বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিল। আর ইলিয়ানা ছলছল চোখে তাকিয়ে হেসেছিল। কেন যে হেসেছিল কে জানে। হবে হয়তো তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাওয়ার ধান্দা সফল হচ্ছে দেখে। সেদিন ইলিয়ানার অবস্থা দেখে বুঝেছিলেন, উনাদের
যোগাযোগ হলেও ইলিয়ানা কখনো ভিডিও কলে কথা বলতো না। উনি জোর করলে বলতো দেখতে নাকি কষ্ট বাড়বে।বেঁচে থাকা কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। একথা শুনে উনিও কিছুই বলতেন না শুধু ছুটে যাওয়ার জন্য দিন গুনতেন। এলেনও ঠিকই তবে স্বপ্নগুলো তখন মলিন। তবে যাওয়ার পর উনি ইলিয়ানার সঙ্গেই থাকতেন। কারণ ইলিয়ানা চেয়েছিল উনার শেষ মুহূর্তে যেন উনিই পাশে থাকেন। কিন্তু এটা ইয়াসির পছন্দ করত না। সে উনাকে দেখতেই পারত না। দেখতে না পারার কারণ ইলিয়ানার মা কেন জানি উনার নামে ইয়াসিরকে ভুলভাল বোঝাত। সেসব শুনে ইয়াসিরও প্রচন্ড রেগে থাকত। সুযোগ পেলে উনাকে এটা ওটা দিয়ে আঘাত করত। তবুও উনি কিছু মনে করতে না বরং তাকে আদর করে কাছে ডাকতেন। এভাবে দিন যেতে যেতে ইলিয়ানার অবস্থা খারায় হয়ে গেল। হসপিটালে এডমিট করলে ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিলেন। মারা যাওয়ার আগের দিন রাতে, ইলিয়ানা হঠাৎ আবদার করল উনাকে বিয়ে করার জন্য। উনিও রাজি হয়ে গেলেন। রুগ্ন প্রেয়শীর কথা রাখতে বিয়েটাও হলো উনাদের।

সেদিন ইলিয়ানা ইয়াসিরকে কাছে ডেকে খুব করে বোঝাল যে, ‘আজ থেকে শারাফাত তোমার বাবা। মাই সান, আমার জানবাচ্ছা, আমি মারা গেলে বাবা তোমাকে ভালোবাসবে, বুকে আগলে রাখবে। তুমি বাবাকে কখনো কষ্ট দিও না। যদি কখনো দেখো তোমার জন্য তোমার বাবা কষ্ট পাচ্ছে তাহলে বাবার কষ্ট কমানোর চেষ্টা করব। নিজে কষ্ট পেলেও তা বুঝতে দেবে না, বাবার সুখের সংসারে কাঁটা হবে না।’ একথা বলার পর সেদিন ইয়াসির বলেছিল, ‘উনাকে আমি বাবা মানি না মম। বাবারা হয় সেলফিশ। আমার এক বাবা আমাকে ছুঁড়ে ফেলেছে। সমাজের চোখে তোমাকে ডিভোর্সি বানিয়েছে।

হয়তো আমার জন্য তুমি বিয়েটা করলে যাতে আমি অভিভাবক পায়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে উনিও একদিন আমার কষ্টের কারণ হবে। উনিও একদিন আমাকে হার্ট করবে। আমি ততদিন উনাকে বাবা ডাকব না সেদিন আমার কথা মিলে যাবে। আমি সত্যি সত্যি হার্ট হবো সেদিন উনাকে বাবা বলে ডাকব। তুমি থাকো বা না থাকো ওই মানুষটাকে কথাটা মিলিয়ে নিতে বোলো।’
ছেলের কথা শুনে রুগ্ন ইলিয়ানা সেদিন শারাফাতের হাতে ধরে অসহায় সুরে কেঁদেছিল। ইয়াসিরকে দেখে রাখার জন্য কত অনুরোধ করেছিল। বিয়ে করে নতুন সংসার করার জন্য অনুমতি দিয়েছিল। এরপর সপ্তাহ খানিক পর উনি মারা যান। উনার হাত আঁকড়ে ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ইলিয়ানা। ইয়াসির প্রাণহীন চোখে দেখতে থাকে মায়ের শেষ যাত্রা।

এরপর ইলিয়ানা মারা যাওয়ার পর শারাফাত চৌধুরী ইয়াসিরকে দেশে আনতে চেয়েছিল। নিজের ছেলের কাছে নিজের শিক্ষায় বড় করতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু ইলিযানার মা আসতে দেয় নি। কোনোভাবেই রাজি করানো সম্ভব হয় নি। বরং তিনি ইয়াসিরকে উস্কে দিয়েছিল যাতে উনি কোনো যোগাযোগ রাখার চেষ্টা না করে। মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিল মা নেই সম্পর্কও শেষ। এরপর বাধ্য হয়েই উনি একাই দেশে ফিরে আসেন কিন্তু ইয়াসির বোঝান যেন যোগাযোগ রাখে। কিন্তু সে তা করে নি। ইচ্ছে করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ইলিয়ানার মা ইয়াসিরকে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। পরে শারাফাত হন্ন হয়ে খুঁজে কোনোভাবেই তাদের হদিস পান না। যারা চেনা পরিচিত ছিল তারাও কিছু বলতে পারে না। এভাবে হঠাৎ ইয়াসির ইচ্ছে করে হারিয়ে যায় উনার কাছে থেকে।

এদিকে তখন ছেলের অবস্থা দেখে শারাফাত চৌধুরীর বাবা- মা পাত্রী খুঁজতে শুরু করেন। পরিকল্পনা ছিল বিয়ে দিয়ে ছেলেকে ঘরমুখী করে ফেলবেন। কিন্তু শারাফাত চৌধুরী মেয়ে দেখতে গেলে বলে দিতেন উনি বিবাহিত। উনার একটা ছেলে আছে এবং প্রথম স্ত্রী মারা গেছে। একথা শুনে বিয়ে ভেঙে যেতো। একথা রটেও গিয়েছিল যে শারাফাত চৌধুরী বিধুর( বউ মরা)। কিন্তু কে সেই বউ ছিল কেউ জানতে পারে নি বিধায় শারাফাত চৌধুরীর বাবা একটু চালাকি করে রটিয়েছিলেন; ছেলে বিয়ে করতে চায় না তাই মিথ্যা বলে। বউ বাচ্চা দেখতে না পেয়ে সবাই সেটা বিশ্বাসও করেছিল। এরপর বছর খানিক পর সিঁতারার সঙ্গে বিয়ে হয়। সিঁতারাকেও উনি নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করেন। সেসব দিন অনেক আগেই অতীতের নামে দলিল হয়েছে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি সেটা না চাইতে অনেক কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। পূর্বের স্মৃতিকথা স্মরণ করে উনি এবার তাকালেন সিঁতারার দিকে। নিশ্চুপ হয়ে সিঁতারাও তাকিয়েই আছেন স্বামীর মুখের দিকে। মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরকার ঝড়। তবে ইয়াসিরের কথা শুনে উনি এক পা দু পা করে এগিয়ে এলেন।

মন দিয়ে দেখলেন ইয়াসিরের মুখের গড়ন। ইলিয়ানার মুখের সাথে বেশ মিল আছে। উনি এবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন,
-‘ তোমার আবদার মেটানো সম্ভব নয় ইয়াসির। যাকে চাও সে কিছুক্ষণ আগে চৌধুরী বাড়িরই পুত্রবধূ হয়েছে। ওর দিকে চোখ তুলে তাকানোও তোমার জন্য হারাম। এখন কী চাও তুমি? শারাফাত চৌধুরীর ছেলের স্বকৃতি নাকি অন্যকিছু?’

-‘ স্বকৃতি ছাড়াও বেঁচে আছি! সম্পত্তি কি আমার কম আছে? আপনার স্বামীর থেকে জীবনে প্রথমবার যেটা চেয়েছি সেটা দিতে পারে নি। উনি বুঝিয়ে দিয়েছেন আমি পর। মুখে যতই ছেলে, ছেলে করে দরদ দেখাক।
দিনশেষে আমি পর! সারাজীবন পরই থাকব। এজন্যই তো আশা ভরসা দেখিয়ে আপন ছেলেকে জিতিয়ে দিয়েছে। প্রাপ্তি তুলে দিয়েছে নিজের ছেলের হাতে। অথচ ক’মাস আগে যখন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আমাদের যোগাযোগ হলো, আমাকে বলেছিলেন মাফিয়াগিরি, মেয়েবাজি ছাড়ি তবে আমাকে চৌধুরী বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ফুলটা দেবে। সেই আশাতে আমিও ভেবেছিলাম ফুলটা আমার..! স্বর্ণের দোহায় দিয়ে সব কমিয়ে দিয়েছিলাম। আর স্বর্ণ ছিল তো অজুহাত মাত্র চৌধুরীর আরেক পুত্রকে খেলানোর মাধ্যম। অনেস্টলি বলছি, শুরু থেকেই শীতলকে,, শীতলের প্রতি দূর্বল ছিলাম আমি। নয়তো প্রথমবার কিডন্যাপের সময়ই তাকে শেষ করে দিতাম।’
অনেকক্ষণ ধরে ইয়াসিরের আবোল-তাবোল কথা শুনে সায়ন এবার ফুঁসে উঠল। এসব আবালতামি কথাবার্তা সহ্য হচ্ছে না তার। সে বাবার দিকে একবার তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল,

-‘ও কি বলছে? তুমি ওর বাবা?’
শারাফাত চৌধুরী অস্বস্তিতেও পড়লেন না। মুখ কাঁচুমাচুও করলেন না। বরং সকলের সামনে দৃঢ় কন্ঠে বললেন,
-‘হ্যাঁ, আমি ওর বাবা। ও হচ্ছে এক বিশেষ মানুষের দেওয়া আমানত।’
শুদ্ধ, সায়ন বাক হারিয়ে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। এই ঘটনা জানত না তারা। শুধু জানত তাদের বাবা কাউকে খুব ভালোবাসত। সে অসুখে মারা গেছে। কিন্তু না, তাদের বাবারও অতীত ছিল? সে ঘরে সন্তান তবে ইয়াসির খান? শুদ্ধ নিবার্ক থাকলেও কেন জানি সায়ন সেটা মানতেই পারল না। সে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
-‘মশকরা মারাও আমাদের সাথে? এতবছর পর আরেকটা ছেলে উদয় হলো কোথা থেকে? মানে বুড়ো বয়সে ভীমরতি? আর করলেই আমরা মানব কেন? কে না কে তাকে নাকি…!’

সায়ন ওর কথা শেষ করার আগে সিঁতারা ছেলের গালে আচমকা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। আরেকদফা চমকে উঠল সবাই। কারণ চৌধুরী নিবাসে কেউ কোনো সন্তানের গায়ে এভাবে হাত তোলে না। সিমিন মাঝে মাঝে শীতলকে মারলেও সিঁতারা কখনো এমন করেন না। আজ উনিই মারল দেখে সিরাত এগিয়ে এসে সিঁতারাকে সরাতে গেল। কিন্তু সিঁতারা নড়ল না বরং আঙুল তুলে সায়নকে কড়া কন্ঠে জবাব দিলো,
-‘খবরদার ওই মানুষটার সঙ্গে উঁচু কন্ঠে কথা বলবি না। শুনতে পেলি? ভুলেও আঙুল তুলবি না। নয়তো আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।’

সায়ন মাথা নিঁচু করে নিলো। সায়নের মাথা নিঁচু দেখে স্বর্ণ এসে দাঁড়াল তার পাশে।মুখে কিছু না বললেও অপলক তাকিয়ে রইল সায়নের মুখের দিকে। সিঁতারা বলে সামনের মানুষটা বেঁচে গেল নয়তো অন্যকেউ হলে সেও পাল্টা আঘাত করতে দু’বার ভাবত না। তখন শুদ্ধ এগিয়ে এলো।সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল সিঁতারার দিকে,
-‘ আমরা কেউ উঁচু কন্ঠে কথা বলব না? আঙুল তুলব না? প্রশ্নও করব না? তাহলে যেটা হচ্ছে হতে দেবো? কিন্তু সেটা মানা আমাদের পক্ষেও সম্ভব না। তাহলে এখন আমাদের ত্যজ্য করবে? যাকে গর্ব করে ছেলের পরিচয় দেওয়া হচ্ছে এতদিন কেন দিলো না? এতদিন কী তোমাদের বিবেকবোধ জাগ্রত ছিল না? উনার সো কল্ড ছেলেই বা কেন এতদিন আমাদের চোখের ঘুম হারাম করেছে? কুকুর মতো দৌড় করিয়েছে তার পেছনে? কেন বার বার আমাদের পরিবার ভাঙার চেষ্টা করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর কে দিবে তাহলে?’

-‘শুদ্ধ থাম! ‘
-‘ মেরে ধমকে সায়নকে থামাতে পারলেও শুদ্ধকে থামাতে পারবে না তা তুমিও জানো আর আমিও।আর যেখানে শীতলের কথা উঠেছে সেখানে থামার প্রশ্নই আসে না। চেষ্টা করে দেখো থামাতে পারো কী না। তাছাড়া কে কার প্রাক্তন, কে কার ছেলে, এই হিসাব বাড়িতে গিয়ে করো। রংয়ের আলাপ করতে কাউকে ডাকি নি। এটা একটা পেশেন্টের কেবিন কারো পুরনো হিসাব কষাকষির আদালত নয়।’

শুদ্ধ কথা গুলো বলল ঠিকই তবে তার দৃষ্টি ছিল বাবার দিকে। শারাফাত চৌধুরী দুই ছেলের অভিমানী মুখ দেখে মৃদু হাসলেন। ইয়াসির শুধু বাবা বলায় ছোটোদের মতো অভিমান করছে নাকি তারা? এখনো কি বলবে নাকি ‘তুমি শুধু আমাদের বাবা আর কারো বাবা না।’ আর কদিন পরে যারা নিজেরাই বাবা হবে তাদের কাছে এমন অভিমান কি মানায়? তবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে উনি ইয়াসিরকে কিছু বলার আগেই ইয়াসির শীতলের দিকে এগিয়ে গেল। শীতলের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। পুরো কেবিনে ঝড় বয়ে যাচ্ছে আর বাবুই পাখিটা ঘুমাচ্ছে। কী সুন্দর লাগছে দেখতে। পৃথিবী উল্টে যাক তার কাছে ঘুমটাই যেন আগে।
নয়তো এই পরিস্থিতিতে কোনো সুস্থ মানুষ ঘুমাতে পারে? ঘুম ধরা দেয়?

কিছুক্ষণ আগেই শুদ্ধর নামে কবুল পড়ে তাকে অর্ধমৃত করে শান্তির ঘুম ঘুমাচ্ছে পাজিটা। মনে মনে একথা ভেবে সে শীতলের ঘুমন্ত মুখটা ছুঁতে গেলে শুদ্ধ খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলল। বাঁধা পেয়ে ইয়াসিরের হাসি বিলীন হয়ে গেল।শুদ্ধর রাগে থমথম করা মুখের দিকে তাকিয়ে সে
কথা বাড়াল না। শীতলের মুখে দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নিচু করে যাওয়ার জন্য দরজার কাছে যেতেই শারাফাত চৌধুরী বললেন,

-‘বাড়ি চলো। আমাদের কথা এখনো শেষ হয় নি।’
-‘ রুচি নেই।’
-‘ইয়াসির কখা শোনো।’
-‘শারাফাত চৌধুরী আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কখনো ছিল না। আর যা ছিল আজকে তা পুরোপুরি শেষ। তবে বেঁচে থাকলে আপনার লাশ কাঁধে নিতে আমি আবার আসব।’
একথা শুনে সায়ন চোয়াল শক্ত করে তাকাল ইয়াসিরের দিকে। বাবাকে নিজে দুটো কথা বললেও কেউ হাজিবাজি বললে মানতে পারে না সে।
আজও পারল না তাই থমথমে সুরে বলল,
-‘লাস্ট বার বলছি মুখ সামলে কথা বল।’
-‘বলব না।’

অনেকক্ষণ ধরে ইয়াসিরের আবোলতাবোল কথা শুনলেও এবার আর ধৈর্য্য রাখতে পারল না সায়ন। তেড়েফুঁড়ে ছুটে গিয়ে মারতে ঘুষি তুলল।
গালিও দিয়ে বসল অভ্যাসবশত। ইয়াসির তখন খপ করে সায়নের হাত
ধরে কয়েক পা এগিয়ে এলো। সায়নের চোখে চোখ রেখে সে মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপর সায়নের শার্টের কলার ঠিকঠাক করে দুই কাঁধ চাপড়ে বলল,
-‘খান রা জানোয়ার হলেও চৌধুরীদের মতো রক্তে বিষ নিয়ে ঘোরে না৷ এতদিন পরিবার-পরিজন ছাড়া একাই বাঁচতে পেরেছি বাকি জীবনও পারব। আর তুই এত লাফালাফি করিস না। তোকে এসব সাজে না।’

-‘কি সাজে না সাজে তুই ঠিক করে দিবি?’
-‘প্রয়োজনে তাই দেবো।’
এইটুকু বলে সে থামল। তারপর নিচু স্বরে সায়নের কানে কানে বলল,
-‘তোদের কিছু না থেকেও তোরা পূর্ন আর আমার সব থেকেও আমি শূন্য। আসি তাহলে।’
একথা বলে যেতে গেলে সায়ন তাকে যেতে বাঁধা দিয়ে বুকের কাছটার কলার খাবলে ধরল। অগ্নিমূর্তি হয়ে আগুন ঝরা কন্ঠে বলল,
-‘কি বললি ঝেড়ে কাশ।’
-‘সহ্য করতে পারবি না। আমি না পেয়ে পেয়ে আমার মাইন্ডে সেট হয়ে গেছে যে আমি কপালপোড়া। আমার মতো তুই সহ্য করতে পারবি না। এরচেয়ে বেশি লাফাস না বেশি লাফালে এর ফল ঃভালো আসবে না।আগাছা হয়ে আছিস চুপচাপ তাই থাক।’
কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে সাফওয়ান চৌধুরী দ্রুত এগিয়ে এলেন। তাদের দুজনকে দুদিকে রেখে তিনি মাঝখানে দাঁড়ালেন। ওদের চুপ করতে বললেন। কিন্তু সায়ন থামলে তো? সে সাফওয়ান চৌধুরীকে সরিয়ে পুনরায় ইয়াসিরের মুখোমুখি দাঁড়াল। শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,

-‘কে আগাছা?’
-‘তুই।’
-‘গাঁজা কি খেয়ে এসেছিলি নাকি গিয়ে খাবি? এত পিনিক পাস কোথা থেকে?’
একথা শুনে ইয়াসির না চাইতেও হেসে ফেলল। হাসির রোগে ধরল নাকি তাকে? আজ এত হাসি পাচ্ছে কেন তার? সায়নের মুখ দেখে হাসি যেন
বেড়ে গেল তার। তাই হাসতে হাসতে বলল,
-‘শাহরিয়ার চৌধুরী তুমিও আমার মতোই পরগাছা। তোমার শরীরেও চৌধুরীদের একফোঁটা রক্ত নেই তাই তোমারও বাড়তি চোপা সাজে না।’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৫৮

এই একটা কথায় কেবিনের সবাইকে পুনরায় স্তব্ধ করে দিলো। সিঁতারা চৌধুরী আগত ঝড় সামাল দিতে সায়নের পাশে দাঁড়ালেন। তবে কিছুই বলার সাহস হলো না নিরুপায় হয়ে ডুঁকরে কেঁদে উঠলেন। অশ্রুচোখে
মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন চোখের চোখের দিকে তাকানোর সাহস হলো না। ইয়াসির আর দাঁড়াল না বরং শেষবার শীতলের দিকে তাকিয়ে
বেরিয়ে গেল। নিজের বুকে আগুন জ্বলছে দেখে বাকিদের বুকেও লাভা ঢেলে দিয়েছে। তাছাড়া সত্যের পাহাড় যখন ধসে গেছে তখন সব সত্যই বেরিয়ে আসুক। বারে আঘাত পাওয়া চাইতে একবারে আঘাত পাওয়া ভালো নয় কি!

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৬০

2 COMMENTS

Comments are closed.