Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৬

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৬

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৬
নূরজাহান আক্তার আলো

অ-সময়ের কড়াঘাতে দিন যাচ্ছে দিনের মতোই। এরিমধ্যেই কেটে গেছে আরো দুটো সপ্তাহ। সেদিনের পর থেকে শুদ্ধর সঙ্গে শারাফাত চৌধুরীর দেখা হলেও কোনো কথা হয় নি। বাড়িতে থাকাকালীন চোখাচোখি হলে শুদ্ধ নিঁখুতভাবেই এড়িয়ে গেছে। তবুও শারাফাত চৌধুরী বারবার কিছু একটা বলতে চেয়েছেন কিন্তু সুযোগ পান নি। ছেলের মান ভাঙাতে কথা বলার ছুঁতোয় কোনো কাজ দিলে বিনাবাক্যে করে দিয়েছে শুদ্ধ। কোনো দরকারে সিতারা বেগমের মাধ্যমে তা জানিয়েছে। বাড়ির অন্য সদস্যরা মূল ঘটনা না জানলেও ঠিকই বুঝেছে কিছু একটা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউ কথা বাড়ান নি। এমনকি সবার নজরেই পড়েছে শুদ্ধ
দু’দিনেও বাড়িতে আসে না, ঠিকভাবে মতো খায় না, এমনিতে কথা কম বলে কিন্তু ইদানিং আরো কমে গেছে। তাকে দেখা যাচ্ছে সায়নের পার্টি অফিসে নতুবা আগের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে।

যেখানে সায়নের ছেলেপুলেরা থাকে। এদিকে শুদ্ধ সায়নের নামে পুরো দমে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। সে আর যাই হোক, ভাইয়ের স্বপ্ন এত সহজে ভাঙতে দেবে না। তার বিশ্বাস, সায়ন ফিরবে। অন্যদিকে শীতলের কেসের তদন্ত চলছে। কখনো পুলিশ শুদ্ধকে ডাকে কখনো উনারাই বাড়িতে আসে। বাড়ির সদস্যদের বসিয়ে নানা প্রশ্ন করে নোট করে নিয়ে যান। আশা করা যাচ্ছে সামনে সপ্তাহের মধ্যেই শীতলের শুনানি ঘোষণা করা হবে। এসবের মধ্যে গতকাল দুপুরে নির্বাচন অফিস থেকে একটা চিঠি এসেছে। সায়নের হয়ে কাউকে দেখা করার কথা জানিয়েছে তাই শুদ্ধ আজ নিজে এসেছে কথা বলতে। তার উপস্থিতিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিনয়ীভাবে উনার চেম্বারে ডেকে কুশল বিনিময় করলেন। বাড়ির সবার খোঁজ-খবর নিলেন। সায়নের জন্য খুব আফসোস করলেন। সামনের দিনগুলোতে ভালো কিছু হওয়ার আশ্বাস দিলেন। এভাবে তালে তালে উনি কথার মোড় ঘুরলেন নির্বাচনের দিকে। ধীরে ধীরে মূল টপিকে এলেন। শুদ্ধ বরাবরই জেন্টেলম্যান, সে বলে কম শোনে বেশি। এবং অপরপক্ষকেও বলার সুযোগ দেয়। যেকোনো কথায় না ভেবে পাল্টা জবাব দেওয়া তার স্বভাবে নেই। মুখ তার,জবানও তার। সে সর্বদা চেষ্টা করে তার কথায় যেন পরে তাকেই আফসোস করতে না হয়। এমনটা যেন মনে নাহয়— এটা বললেই হতো! আজকেও ঠিক তাই হলো। অফিসার ঠান্ডা মাথায় বসে থাকা সুদর্শন পুরুষটাকে সময় নিয়ে
কথা দিয়ে বাজিয়ে দেখলেন। তীক্ষ্ণ নজরে দেখে নিলেন শুদ্ধর মুখের ভঙ্গি। সব ইতিবাচক বুঝে এবার মোক্ষম টোপটা ফেলতে বিনয়ীসুরে জানালেন,

-‘যদিও কথাটা বলতে আমারও খুব খারাপ লাগছে কিন্তু না বলে পারছি না। সায়ন যেহেতু বর্তমানে নির্বাচন করার অবস্থা নেই তাই তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা উচিত। কারণ ওর সুস্থতা সবার আগে। তাছাড়া বিজয়ী
যেই হোক জনগণের সেবায় হচ্ছে মূখ্য বিষয়, তাই না? এবার প্রত্যাহার করুক সামনেবার নাহয় আবার চেষ্টা করবে৷ ভাগ্যে থাকলে মেয়র হবে।
আর আমরা ভাবছি এখনকার কথা। এখন তো একজনকে দায়িত্ব নিতে হবে। জনগণের পাশেও দাঁড়াতে হবে। একটা শহরের অভিভাবক মেয়র।
জনগণ তাদের সমস্যার কথা মেয়রকে জানায়। এখন মেয়রের পদ যদি
নড়বড়ে থাকে তাহলে কিভাবে হবে, বলুন? তাই বলছিলাম যে, একটা সময় সায়নের সঙ্গে আবু সিদ্দিকে সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। সিদ্দিক ভাই মানুষ হিসেবেও যথেষ্ট ভালো মানুষ। আশা করি মেয়র হিসেবেও খারাপ হবে না।’
এইটুকু বলে উনি থামলেন। শুদ্ধ ঠান্ডা মাথায় উনার কথা শুনল তারপর ধীরলয়ে জবাব দিলো,

_’ আমিও বিশ্বাস করি সিদ্দিক স্যার যথেষ্ট ভালো মানুষ। মেয়র হিসেবে
যোগ্য প্রার্থী। তবুও এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ‘
_’কি প্রশ্ন?’
_’যদিও আমি রাজনীতির মানুষ নই। এসব ব্যাপারে খুব একটা ধারণাও নেই। তবে যতটুকু জানি ব্যালট পেপারে যেহেতু শাহরিয়ার চৌধুরীর নাম ও প্রতীক উঠে গেছে এবং নামে প্রচারণাও চলমান। অর্থাৎ আইনত তিনিই প্রার্থী। তাহলে এ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব?’
শুদ্ধর কথা শুনে অফিসারের ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি দেখা গেল।
আশার আলো জ্বলতে দেখে দরজার দিকে একবার তাকিয়ে বললেন,

_’আপনি চাইলে সব সম্ভব।’
_’যেমন?’
_’যেহেতু আপনার ভাইয়ের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এসব নিয়ে আপনি আদালতের কাছে নির্বাচন স্থগিতের আবেদন করতে পারেন। যদিও বড় কোনো গোলযোগ ছাড়া কমিশন ভোট স্থগিত করতে চায় না। তবুও করেন। আর মেইন পয়েন্ট হচ্ছে আমরা তো আছি, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব যাতে কাজ হয়।’
উনার কথা শুনে শুদ্ধ ভ্রু কুটি করে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে জবাব ছুঁড়ল,
_’কিন্তু আমি তো আবেদন করব না।’
_’কেন?’
_’কারণ আমার ভাইয়ের স্বপ্ন মেয়র পদে নিজেকে দেখা। জনসাধারণের পাশে দাঁড়ানো।’
_’ আহা, তা তো বুঝলাম। কিন্তু সে সুস্থ না, সুস্থ থাকলে নাহয়..!’
_’সুস্থ নেই, তবে মরে যায়নি। যতক্ষণ না কাফনে মুড়িয়ে আমি আমার ভাইকে কবরে শোয়াব ততক্ষণে পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত হবে না! না মানে, না! এবার বোঝাতে পারলাম?’
সামনে বসা ছেলেটাকে স্মার্টলি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে দেখে অফিসার
দমে গেলেন। এরপর কিছু একটা ভেবে দ্বিতীয় টোপটা ফেললেন। গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

_’ আবেগ দিয়ে জীবন চলবে না মি. শোয়াইব। আপনি বুঝদার, শিক্ষিত ছেলে। আপনি নিজেও জানেন, আপনার ভাইয়ের যা অবস্থা রিকোভার করবে কী না সন্দেহ। এরচেয়ে উত্তম যা খরচ হয়েছে স্থগিত করলে তার থেকেও ডাবল পেয়ে গেলেন। আপনি আবেগে পড়ে স্থগিত করলেন না আবার দেখা গেল ভাইটাও মারা গেল। তখন ‘আমও গেল ছালাও গেল’ ওইরকম হয়ে যাবে না?’
_’গেলে যাক। তবে আমার ভাই বেঁচে থাকুক বা না থাকুক আপনি আপাতত মুখ বন্ধ রাখুন। মরা-টরার কথা উচ্চারণ করার থেকেও বিরত থাকুন। সত্যি বলতে, আপনার কথা শুনতেও ইচ্ছে করছে না আমার৷ আসলে হয়েছে কী, আমি দেখতে ভদ্রলোক হলেও আসলে কিন্তু তা নই। প্রমাণ দেই?’
একথা বলে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে লাউডে দিয়ে বলল,
-‘এটা তো আপনার কন্ঠস্বর, তাই না?এই মাত্রই টাকার অফার করলেন, নাকি? ওমা, তাই তো! তা সিদ্দিক সাহেবের মাধ্যমে অফারটা এসেছে বুঝি? উনাকে বলে দিবেন এগুলো ওল্ড প্ল্যান নতুন কিছু যেন ট্রাই করে।’
শুদ্ধর কথা এবং কাজে অফিসার থেমে গেছে। উনি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় তাকিয়ে আছেন। শুদ্ধ ধীরে-সুস্থে বসা থেকে পেছনে ঘুরতেই উনি হঠাৎ বলে বসলেন,

_’সুবহানা চৌধুরী আপনার ওয়াইফ তাই না? খুনের দায়ে জেল খাটছে।’
উনার কটাক্ষ করা কথায় থমকে দাঁড়িয়ে গেল শুদ্ধ। ঘুরে ঠোঁটের কোণে হাসি এঁটে ঠান্ডা স্বরে জবাব দিলো,
_’জি।’
_’ ভাইকে নিয়ে এত বেশি ভাবছেন এবার বউটাকে নিয়েও ভাবা উচিত!’
-‘ ভাবি তো। ভাবি বলেই বউয়ের জন্য বুক ফুলিয়ে গর্ব করি। কেন করব না, বলুন? আমার বউ তার বড় ভাইকে বাঁচাতে খুন করেছে, খারাপ কী!
এখন খুনের দায়ে যদি তার জেল/ ফাঁসি যেটাই হোক আমার আফসোস নেই। বরং আফসোস তখন হতো, যাকে মেরেছে সে যদি বেঁচে থাকত!’
একথা বলে শুদ্ধ মুচকি হেসে বেরিয়ে গিয়ে কি ভেবে যেন ফিরে এলো।
তারপর দরজা বরাবর দাঁড়িয়ে বলল,

_’আমার পেছনে লোক লাগিয়ে ফোন চুরি/ডাকাতি করার প্ল্যান করেও লাভ হবে না। আপনার বলা কথা রেকর্ড হয়ে অলরেডি দশ জনের কাছে ফরওয়ার্ড হয়ে গেছে। আমার ফোন হারালেও আরো দশটা ফোনে কিন্তু প্রমাণ রয়ে গেছে। তাই বলছি, শুধু শুধু কষ্ট করে সময় নষ্ট করবেন না,
দিলখোলা মানুষ আমি তাই বারণ করলাম তারপরেও দেখেন যা ভালো মনে করেন। তবে হ্যাঁ, নিজের ভালোটাও বুঝে নিয়েন আর আমাকেও ভালো থাকতে দিয়েন। সঙ্গে এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছি আমাকে ঘাটালে আমি কিন্তু সব ঘেঁটে ‘ঘ’ করে ছাড়ব বলে দিলাম।’
কথা শেষ করে আপনমনে হাঁটা ধরল শুদ্ধ। আর অফিসার এই ছেলের বুদ্ধিমত্তা দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। উনি সত্যি সত্যি ভাবছিলেন, লোক লাগিয়ে শুদ্ধর ফোন হাতাতে যাতে প্রমাণ লোপাট করতে পারে।
কিন্তু কি হলো এটা? এখন এই প্রমাণের জন্য উনাকে না খেসারত দিতে হয়। ধুর! এটা কোনো কাজ হলো? ছেলেটাকে বাঁশ গেলাতে ডেকে এনে
কথার জালে ফেঁসে নিজের পেছনে বাঁশ নিয়ে নিতে হলো!

ঘড়িতে তখন দুপুর একটা বেজে বায়ান্ন মিনিট,
স্বর্ণকে জোর করে দু’লোকমা খাইয়ে রান্নাঘরে এসে দাঁড়ালেন সিমিন।
হাতের এঁটো প্লেটের দিকে তাকাতে চোখ থেকে ঝরঝর করে নোনাজল গড়িয়ে গেল। প্লেটের এক কোণে পড়ে আছে বড় ইলিশ মাছের দু’টুকরো
ডিম। সায়ন, শীতল ইলিশের ডিম কী যে পছন্দ করে। তারা যদি থাকত এতক্ষণে চেঁচামেচি করে কাড়াকাড়ি করে হলেও খেতো। স্বর্ন এমনিতেই
খেতে পারে না, গন্ধ লাগে, শুধু ভাত পানি দিয়ে গিলে খেলেও বমি করে।
দিনকে দিন মেয়েটা এত শুকিয়ে যাচ্ছে। দেখলে বুক ফেটে কান্না আসে।
ভেবেছিলেন মাছের ডিমটা যদি একটু খায় কিন্তু কোনোভাবে খাওয়াতে পারেন নি। মেয়েটা শুধু নীরবে চেয়ে ছিল ডিমটার দিকে। তারপর মলিন স্বরে হঠাৎ বলে বসল,
_’জেলে ইলিশের ডিম টিম কিছু দেয়, আম্মু? আমার বোনটা, আমার তোতাপাখিটা ভালো-মন্দ কিছু খেতে পায়? এই খাব না, সেই খাব না করলে কেউ কী তোমার মতো বকতে বকতেই ডিম ভেজে দেই? ভাজা ডিম পেয়ে পাগলিটা গাল ফুলিয়ে খায় তো, নাকি? নাকি ডিম না পেয়ে কাঁদতে বসে? আমিও তো নেই মনমতো কিছু না পেলে এখন কার কাছে অভিযোগ করে?’
উনি জবাব দিতে পারেন নি। কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে কন্ঠস্বর চেপে আসছিল। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু না, বাহুকষ্টে কান্না আঁটকে কোনোমতে বলেছেন,

_’আমি কালই রান্না করে নিয়ে যাব, এখন তুমি খাও।’
_’ একজনকে নাহয় খাওয়াবে কিন্তু আরেকজন? ওকে কি করবে?’
_’সেও সুস্থ হয়ে ফিরুক ওকেও খাওয়াব।’
_’তাহলে ওরা আগে ফিরুক তখন নাহয় একসাথে বসে খাব।’
এভাবে একের পর এক পাল্টা যুক্তিতে না পেরে ফিরে আসতে হয়েছে। স্বর্ণ সাদা ভাত খেয়ে একটু শুয়েছে। কিছুক্ষণ আগের কথা ভেবে উনি দ্রুত চোখ মুছে হাত ধুঁয়ে নিলেন। এঁটো প্লেট ধুয়ে নিজের রুমে এলেন।
মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু একটু করে উনি নিজেকে সামলে নিচ্ছেন। যা গেছে সেটা ফিরে পাবেন না। মেয়ে দুটোর দিকেও তাকাতে হবে, তাদের কথাও ভাবতে হবে। দুটো মেয়েই বাবাভক্ত ছিল। বাবাকে কাছে পেতো না এজন্য বাবার সঙ্গকে স্বর্গসুখ ভাবত। কিন্তু সেই বাবাই তাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। হারিয়ে গেছে চিরতরে। মিশে গেছে শক্ত মাটির সঙ্গে। এখন যদি উনিও ভেঙে পড়েন তাহলে কি হবে? তাদের কে দেখবে? এসব ভেবে নিজে নিজেকে বুঝ দেন কিন্তু পরক্ষণেই অসহায় লাগে। খুব একা লাগে। এখনো কল্পনা করতে পারে না যার হাত ধরে এই বাড়িতে এসেছিলেন, যার সঙ্গে এতগুলো দিন কাটিয়েছিলেন, ছায়ার মতো যিনি পরম যত্নে আগলে রেখেছিলেন সেই মানুষটাই আর নেই। কি অদ্ভুত!

কদিন হলো রুবাব দেশে ফিরেছে। এসেই পরেরদিনই শীতলকে দেখতে ছুটেছিল। রুবাবের সঙ্গে উনিও গিয়েছিলেন। যাওয়ার আগে শুদ্ধ করে বোঝাল শীতলের সামনে না কাঁদতে,কিন্তু পারলেন না। মেয়ের বন্দিদশা দেখে বুক ফেটে, চোখ উপচে, অঝরে পানি ঝরতে লাগল। বিনাকারণে গলা ফাটিয়ে আম্মু, আম্মু ডেকে কান ঝালাপালা করা তোতাপাখি বন্দি হয়ে পড়ে আছে। চারবেলা খেতে বসে যার বায়নার শেষ থাকত না সে কি খাচ্ছে, না খাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছেন না। বিয়ের পরপর শীতলের স্বাস্থ্য একটু ভালো হলেও এখন বেহাল দশা। দুধে আলতা গায়ের রং টা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি। এলোমেলো বেশভূষা। রুবাব নিজেও শীতলকে দেখে কান্না আটকাতে পারে নি। নিজের বাহুতে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলেছে ছেলেটা। এভাবে আরো কিছুক্ষণ টুকটাক কথা বলে ফিরে আসার সময় শীতল মলিন হাসল। তারপর হঠাৎ বলল,

-‘ আম্মু, বাড়িতে কি কিছু হয়েছে?’
-‘ না তো। কি হবে? আমরা সবাই ভালো আছি মা। কিচ্ছু হয় নি। সব ঠিক আছে।’
-‘ তাহলে সেদিন ওর মুখটা শুকনো ছিল কেন? আমার কাছে কী কিছু শুকাচ্ছো ? লুকিও না। আমি জানি মানুষটা ভালো নেই, সবাই যদি চাপ দাও কিভাবে হবে, বলো তো? ও তো খুব কাছের কেউ ছাড়া কারো সঙ্গে তেমন ফ্রি না। বাড়ির সবাই জানে মুখচোরা সে। আর দুই ভাই টম এ্যান্ড জেরির মতো ঝগড়া করলেও একে অপরের ছাড়া থাকত না, থাকতেই পারে না। সেই ভাইটা সুস্থ নেই, ভালো নেই, ডাক্তাররাও হাল ছেড়ে দিতে বলেছে। তার উপরে আমার কাছে আসে, কেস নিয়ে দৌড়াদৌড়া করে,

ওর ক্লান্ত-নির্ঘুম মুখের দিকে তাকালে আমাকে আর বাড়তি কিছু বলতে হয় না। ঠিকই টের পাই ওর বুকের তোলপাড়। সেদিন এসে চুপ করে শুধু তাকিয়ে ছিল। আমিও ওর অভিমানী চাহনি বুঝেছি; বুঝেছি অভিমানের কারণ। ওর দিকে খেয়াল রেখো আম্মু। মেরে-ধরে হলেও ঠিকমতো খাওয়ানোর চেষ্টা কেরো।’
সেই মুহূর্তে মেয়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন। উনার ছোট্ট শীতল কত বড় হয়ে গেছে! যে ডিমের ভাগ ছাড়তে নারাজ থাকত আজ সে কত সুন্দর করে ভাবতে শিখেছে। বুঝতে শিখেছে। চিনতে শিখেছি।
উনি মেয়ের কথা শুনে সেদিন থেকে যত রাত হোক শুদ্ধর জন্য অপেক্ষা করেন। না ফিরলে কল করে জানান বসে আছেন। তখন তড়িঘড়ি করে পাগলটা আসে, দেরিতে ফিরে উনাকেই বকতে শুরু করে। বকা শুনতে শুনতে খাবার বেড়ে দিলে তাকে খাওয়াতে গিয়েও আরেকদফা কাঁদতে হয়। ওই বেচারা টেবিলে বসে খাবার গিলতে পারে না। একবার সায়নের চেয়ারের দিকে তাকায় তো একবার শীতলের চেয়ারের দিকে। উনার সামনে থেকেও উঠতে পারে না। পানি দিয়ে খাবার গেলার কত যে চেষ্টা তার। এইতো এভাবেই দিনগুলো যাচ্ছে। দেখতে দেখতে আরো কিছুদিন
কেটে গেল। জানা গেল শীতলের কেস তদন্তের কাজ শেষ। শুনানিতে যা রায় হবে সেটাই হবে শীতলের সাজা। তবে শতরুপাসহ সবাই আশাবাদী শীতল জামিন পাবে। কারণ যা ঘটেছে সেটা আত্মরক্ষার জন্য হয়েছিল।

আগামীকাল শীতলের শুনানি। এই নিয়েই চিন্তিত বাড়ির প্রতিটা সদস্য। সেই সঙ্গে আজ শুদ্ধর জীবনেও বিশেষ একটি দিন। দীর্ঘ কয়েক বছর নির্ঘুম রাতের ক্লান্তির ফল হিসেবে তার একটি আবিষ্কার সফল হয়েছে।তার তৈরি করা অ্যালঝেইমার বা পারকিনসনস রোগের ওষুধটি মানবকল্যাণের কাজে লাগবে। তবে ​আবিষ্কার করলেই তা ওষুধ হয়ে যায় না। নিজেরা সাকসেস হয়ে বিশ্বের অন্য বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের কাছে পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিল। উনারা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আজই জানিয়েছে যে এটা প্রকাশিত হবে। আর ​পাবলিকেশন হয়ে যাওয়া মানেই অফিসিয়ালি পৃথিবীর মানুষ জেনে যাওয়া। টিভিতেও এই নিয়ে শিরোনাম হচ্ছে। তবে শুদ্ধ আগ বাড়িয়ে বাড়ির কাউকেই বলে নি টিভির খবর আর আত্মীয়দের ফোন কলে জেনেছে। আসলে যারা এসব নিয়ে মাতামাতি করতো তারাই নেই। শুদ্ধ বেডে বসে চুপ করে দেওয়ালে টানানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। গায়ের হলুদের দিন হাত আঁচলে বেঁধে নিয়ে যাওয়া মুহূর্তটুকু বড় করে টানিয়েছিল শীতল। ছবিটা ভীষণ সুন্দর। যতবার দেখে মন জুড়িয়ে আসে। এদিকে একের পর এক ফোন কল আসছে দেখেও শুদ্ধ রিসিভ করছেনা। এখন কারো অভিনন্দনবার্তা শুনতে ইচ্ছে করছে না। জীবনে যখন সফলতা আসে তখন চেনা-অচেনা শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব হয় না। অথচ খারাপ সময়ে এরাই পাশে থাকে না।
পাশের ফোনটা কল রিসিভ না করলেও হঠাৎ তার আরেকটা ফোনের টোন বেজে উঠতে শুদ্ধ তড়িৎ উঠে বসল। চট করে কল রিসিভ করতেই
একজন মহিলার কন্ঠস্বর কানে লাগল,

_’আপনি কি সুবহানার স্বামী মি. শোয়াইব?’
_’জি। কিছু হয়েছে? সুবহানা ঠিক আছে?’
_’আপনি এক্ষুণিই সদর হাসপাতালে চলে আসুন।’
_’ কেন? কি হয়েছে ওর? হ্যলো! হ্যালো, কথা বলছেন না কেন? হ্যালো!’
_’ ওর নাকি পেটে ব্যথা। আপনি আসুন।’
শুদ্ধ আর কিছু বলার আগেই কলটা কেটে গেল। সেও দাঁড়াল না দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হলো। সিমিন স্বর্ণকে নিয়ে গেছে ডাক্তারের কাছে আর সিরাত সাম্য-সৃজনকে নিয়ে গেছে মায়ের বাড়ি। বাকি পুরুষ সদস্যরা যে যার কর্মস্থলে। সিতারা ছাদে গেছে শুকনো কাপড় তুলতে। ছাদে থেকেই শুদ্ধকে গাড়ি নিয়ে বের হতে দেখে সিতারা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। একবার ডাকলেনও তবে শুদ্ধ শুনতে পেল না। তবে গাড়ির গতি বাড়িয়ে ছুটল সদর হাসপাতালের দিকে। এদিকে ​শীতল কয়েকদিন ধরেই পেটে ব্যথায় ভুগছিল। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ডাক্তাররা ভেবেছিলেন সাধারণ সমস্যা, তাই ব্যথা কমানোর মেডিসিন দিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যথার তীব্রতা আর শীতলের শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে তাকে জরুরি ভিত্তিতে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখানে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর ডাক্তাররা যা জানালেন, তা শুনে সবার মাথাতে আকাশ ভেঙে পড়েছে।

এবং তার বাড়ির লোককে কলে জানিয়ে আসার কথা জানানো হয়েছে। জ্যাম পেরিয়ে কয়েক ঘন্টা পর শুদ্ধ হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছাল। অবস্থা জানার জন্য একজন মহিলা পুলিশকে জিজ্ঞাসা করতে গেলে ডাক্তার গম্ভীর মুখে বেরিয়ে এলেন। পেশেন্টের অভিভাবক কে জানতে চাইলে শুদ্ধ এগিয়ে গেল। উনি শুদ্ধকে আপাদমস্তক দেখে বললেন,
_’ পেশেন্ট গর্ভবতী ছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটোপিক প্রেগন্যান্সি। তার ভ্রূণটি ফ্যালোপিয়ান টিউবে এমনভাবে আটকে আছে যে, যেকোনো সময় ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হতে পারে।’
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে শুদ্ধর কাছে খবরটা যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো লাগল। হতবাক হয়ে কিছু বলার আগে ডাক্তার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন,

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৫

-‘বাচ্চাটাকে বাঁচানোর কোনো উপায় নেই। যত দেরি হবে, পেশেন্টের জীবনের ঝুঁকি তত বাড়বে। আমাদের দ্রুত সার্জারিতে যেতে হবে। কি করবেন দ্রুত জানান।’
একথা বলে হাঁক ছেড়ে একজন নার্সকে ডেকে শুদ্ধকে দেখিয়ে বলল,
-‘বন্ডে সাইন নিয়ে নাও।’

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৭

2 COMMENTS

Comments are closed.