শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩২
অনামিকা তাহসিন রোজা
মস্তিষ্ক আপাতত কোনো কিছুতেই নেই ধারার। সে আগ্রহ নিয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছে বারবার। শহরে এলেও কখনো ঘোরা হয়নি তার। শ্রাবণও তো কখনো তাকে বাইরে নিয়ে যায়নি। তাই এত সুন্দর সুন্দর, রাস্তা, বিল্ডিং ধারা দেখেনি। এই মুহুর্তে শ্রাবণ বিমানের মত গাড়িটা চালিয়ে কোন রাস্তায়, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেসবে পাত্তা না দিয়ে বরং ধারা আশেপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে ব্যস্ত সে। শ্রাবণ একবার তাকাল ধারার দিকে। কি যেন মনে করে নিজের পকেট থেকে ফোন বের করে টুপ করে লুকিয়ে ধারার একটা ছবিও তুলে নিল। মুগ্ধতায় ছেঁয়ে যাচ্ছে মনটা। এত সুন্দর একটা রত্নকে সে এতদিন দেখেনি কেন? কেন লক্ষ্য করেনি তার উজ্জ্বলতা? হাসি পেল শ্রাবণের। নিজের বোকামির প্রতি ভীষণ আফসোস হলো। যদি সে প্রথমেই একটু মনের চোখ দিয়ে নিজের বউটাকে বউ মনে করে দেখত, তাহলে আজ তাদের কত সুন্দর একটা সংসার হতো! এতদিনে হয়তো বাচ্চাও হয়ে যেত? নাকি হতো না? কথাটা ভেবে হাসি আটকাতে পারল না সে। ফিক করে হেসেই দিল।
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকাল শ্রাবণের দিকে। লোকটা এভাবে হাসছে কেন? পাগল-টাগল হয়ে গেল না তো! ধারার দৃষ্টি দেখে দমে গেল শ্রাবণ। গলা খাঁকারি দিয়ে গাড়ি সাইড করল। চলে এসেছে তারা। ধারা এবারে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল একটা বিশাল বড় রেস্টুরেন্টে এনেছে শ্রাবণ। ধারা সংকুচিত হয়ে নিজের দিকে তাকাল। আগে জানলে একটু ভালো করে গুছিয়ে আসা যেত। শ্রাবণ বিষয়টা খেয়াল করল, কিছু না বলে গাড়ি থেকে নেমে ঘুরে এসে ধারার দিকের দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়াল। উম, জেন্টেলম্যান হওয়ার চেষ্টা?
ধারা আবারো চোখ পিটপিট করে তাকাল। ভাবলো লোকটা কিছু চাচ্ছে। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—” ক-কী?’
শ্রাবণ আবারো হাতের দিকে ইশারা করল। ধারা বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে বলল,
—” কী চাইছেন?”
—” তোমার হাত। ”
ধারার ভ্রু শিথিল হলো। অন্যদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আবারো তাকাল শ্রাবণের হাতের দিকে। মনে মনে একটু মন চাইলেও পাত্তা দিল না মেয়েটা। শ্রাবণের বাড়িয়ে দেয়া হাত উপেক্ষা করে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। শ্রাবণ আহাম্মকের মত তাকিয়ে রইল। এসব কে শিখিয়েছে তার বউকে? কোন সিনেমা দেখে এসব শিখল মেয়েটা? কি সাংঘাতিক!
ধারা গাড়ি থেকে নেমে এক পা এগিয়ে আবার থেমে গেল। সামনে কাঁচে মোড়া বিশাল বিল্ডিং। প্রবেশপথের দুই পাশে বড় বড় টবভর্তি গাছ, ছাদের নিচে নরম হলুদ আলো, কাঁচের ভেতর দেখা যাচ্ছে মানুষজন বসে খাচ্ছে। কারো হাতে কফির কাপ, কেউ ছবি তুলছে। ধারার কেমন যেন অস্বস্তি লাগল। সে নিজের দিকে তাকাল। সাধারণ একটা আকাশীরঙা চুড়িদার। সাজগোজ নেই। কোনো প্রস্তুতিও ছিল না। এমনিতে তার তেমন সমস্যা না হলেও শ্রাবণের পাশে এভাবে…দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধারা। ধীরে বলল,
—” এত বড় রেস্টুরেন্টে না আসলেও তো হতো।”
শ্রাবণ দরজা লক করতে করতে তাকাল,
—” কেন?”
ধারা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
—” এমনি।”
শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল। বুঝল। খুব ভালো করেই বুঝল। ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল।
—” তুমি আগে আমায় এটা বলোতো, তোমাকে কি কেও বলেনি স্বামীকে ইগনোর করলে পাপ হয়? তোমাকে এসব শিখিয়েছে কে? ওই ছাগলের জাত নীল?”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
—” আবারো বলছি, আপনি নীল ভাইকে নিয়ে একটাও বাজে কথা বলবেন না। ”
—” এত দরদ?”
—” জ্বি এতই দরদ। ”
শ্রাবণ মাথা কাত করল,
—” এই দরদ টা আমার প্রতিও তো দেখাতে পারো।”
ধারা আর তাকাল না। কিছু বললও না। শ্রাবণও কিছু বলল না। শুধু হুট করে হাত বাড়িয়ে দিল। ধারা সাথে সাথে এক ধাপ সরে গেল।
—” কী করছেন?”
শ্রাবণ নির্লজ্জ ভঙ্গিতে বলল,
—” হাত ধরব।”
—” কেন?”
—” কারণ এটা নিয়ম।”
—” কীসের নিয়ম?”
—” এই রেস্টুরেন্টের।”
ধারা চোখ পিটপিট করে তাকাল,
—” কীহ?”
শ্রাবণ খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে ধারার কানের কাছে এসে বলল,
—” বিশ্বাস না হলে আশেপাশে তাকিয়ে দেখো তো। কাওকে একা একা হাঁটতে দেখতে পাচ্ছো?”
ধারা অবাক হয়ে আসলেই আশেপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। সত্যি সত্যিই তো কেও একা নেই। জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতী হাঁটছে, কথা বলছে, কেও প্রেমও করছে। তবুও খটকা লাগল ধারার। কিছু একটা বলতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই শ্রাবণ খুব গম্ভীর হয়ে বলল,
—” এখন যদি আমরা হাত ধরে না হাঁটি, তাহলে সবাই মনে করবে আমরা নিয়ম জানিনা। আবার এও মনে করতে পারে আমি তোমাকে ফলো করছি, ডিস্টার্ব করছি। তখন গণপিটুনি খাব আমি। তুমি কি চাও আমার সম্মান নষ্ট হোক?”
শেষের কথাটা অনেক মায়া লাগিয়ে বলল শ্রাবণ। যেন তার থেকে নিষ্পাপ এ পৃথিবীতে কেও নেই।
ধারা আঁড়চোখে তাকাল। সে তো বোকা। সত্যি সত্যি ভেবে নিল এই রেস্টুরেন্টে এটা নিয়ম। তাই ধারা দমে গেল। শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ এবারে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। ইশারায় বোঝালো, ধরো। ধারা মুখ কুঁচকে শুকনো ঢোক গিলে আস্তেধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। হাত বাড়াতে সময় লেগেছে, শ্রাবণের খপ করে সেটা ধরতে সময় লাগেনি। এরপর বেশ আনন্দের সাথে রেস্টুরেন্টে দিকে হাঁটতে শুরু করে।
শ্রাবণ ভেতরে ঢুকতেই এমন একটা ভাব নিল যেন এসব তার কাছে নিত্যদিনের ঘটনা। অথচ ভেতরে ভেতরে তার অবস্থা অন্যরকম- শান্ত থাকো শ্রাবণ। আজকের দিনটা ইতিহাসে লেখা থাকবে। প্রথম ডেট। প্রথম হাত ধরা। আর যদি বেশি বাড়াবাড়ি করো তাহলে আবার স্টোররুমে নির্বাসন। ধারা তার পেছন পেছন হাঁটছে। হাত আলতো করে ধরলেও, তেমন ভাবে ছোঁয়নি অবশ্য। তবে হাঁটছে। একজন স্টাফ এসে ভদ্রভাবে হাসল।
—” স্যার, কেবিন রেডি।”
শ্রাবণ মাথা নেড়ে এমন ভাব করল যেন সে এখানে সপ্তাহে চারদিন আসে। ধারা শান্তভাবে হাঁটছিল। কিন্তু কেবিনের সামনে এসে থেমে গেল। দরজা খুলতেই সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ভেতরে একটা মাত্র টেবিল। দুটোচেয়ার। চারপাশে হালকা বেগুনিরঙা আলো। খুব উজ্জ্বল না, আবার অন্ধকারও না। যেন সন্ধ্যার পরের নরম সময়টাকে কাঁচের ঘরে ধরে রাখা হয়েছে। কোণায় ছোট ছোট আলো, ফুলে সাজানো। টেবিলের মাঝখানে কাঁচের ফুলদানিতে সাদা ফুল। বাইরের শব্দও আসছে না। কিন্তু কাঁচের জন্য বাইরের শহর পুরো দেখা যায়। কেবিনটা এত শান্ত যে নিজের নিঃশ্বাসও শোনা যায়। ধারার মনে হলো বাইরে এখন দুপুর না, রাত। সে ধীরে ভেতরে ঢুকল। চোখে অবাক ভাব লুকাল না এবার। শ্রাবণ সেটা দেখে বুক ফুলিয়ে ফেলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। গলা খাঁকারি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে দিয়ে বলল,
—” বসো।”
ধারা কিছু না বলে বসল। শ্রাবণও বসতে গিয়েছিল, কিন্তু আবার উঠে দাঁড়াল।
—” আমি অর্ডার দিয়ে আসি।”
ধারা তাকাল,
—” শুনুন?”
—” হুম?”
—” বেশি কিছু দেবেন না। খাব না।”
শ্রাবণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল,
—” আচ্ছা সেটা পরে দেখা যাবে।”
—” আমি কিন্তু সত্যিই খাব না। খাবার অপচয় হবে।”
—” আমি আছি তো।”
বলেই হেসে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। ধীরে চারপাশে তাকাল। আঙুল দিয়ে টেবিল ছুঁলো। কৃত্রিম আলোগুলো দেখল। চুপ করে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে একটা মেয়ে ট্রেতে পানি আর ফুলের তোড়া নিয়ে ঢুকল। গ্লাসগুলো রেখে তোড়াটাও সামনে রেখে মিষ্টি করে বলল,
—” গুড আফটারনুন ম্যাম।”
ধারা মাথা নেড়ে হাসল। তারপর একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
—” একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
—” জি ম্যাম?”
ধারা চারপাশে তাকিয়ে বলল,
—” আপনাদের রেস্টুরেন্টটা কি সবসময় এমন সাজানো থাকে? সব ভিআইপি কেবিনই কি এমন সুন্দর?”
মেয়েটা অবাক হয়ে তাকাল,
—” না ম্যাম। এটা আজকে স্পেশালি সাজানো হয়েছে।”
ধারা ভ্রু কুঁচকাল,
—” মানে?”
মেয়েটা সহজ ভঙ্গিতে বলল,
—” স্যার আগে থেকেই বুক করেছিলেন। ডেকোরেশন সব উনার পছন্দে সেট করা। বলেছিলেন যেন অনেক রোমান্টিক একটা ভাইব থাকে, আর…
ধারা কেশে উঠল। বলল,
—” ঠিক আছে বুঝেছি। ধন্যবাদ।”
মেয়েটা এবারে হেসে বলল,
—” আজ বুঝি কোনো স্পেশাল দিন ম্যাম? আপনার বার্থডে, নাকি এনিভার্সেরি?”
ধারা দুদিকে মাথা নেড়ে হাসল,
—” না না। তেমন কিছু না। কিন্তু হয়তো কিছু একটা। আমার মনে পড়ছে না।”
মেয়েটা কিছু বুঝতে না পেরে আবার বলল,
—” ওহ, উনি তো বলছিলেন এটা নাকি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন।”
ধারা কিছু বলল না। মেয়েটা চলে গেল। আবারো দরজা বন্ধ হলো। আবার নীরবতা। ধারা ধীরে পানির গ্লাসটা হাতে নিল। চোখ নিচে নামল। ভাবলো। লোকটা আগে থেকেই সব প্ল্যান করেছে? তাহলে ওই রেস্টুরেন্টের নিয়ম? হাত ধরা? মায়ের ফোন? সব? ধারার বুকের ভেতর অদ্ভুত কিছু হলো। মনে হলো রাগ করা উচিত। খুব রাগ। কিন্তু কেন যেন চোখে পানি এসে গেল। সে দ্রুত চোখ মুছে ফেলল। নিজের মনকে ধমক দিল- না। এত সহজে গললে হবে না। শাস্তি চলছে। তবুও অদ্ভুতভাবে ঠোঁটের কোণায় একটু হাসি এসেই গেল। পাগলামো শুরু করেছে শ্রাবণ শেখ? ঠিক তখনই দরজা খুলে শ্রাবণ ঢুকল। মুখে এমন ভাব যেন যুদ্ধ জিতে এসেছে। ভেতরে ঢুকেই সন্দেহের চোখে তাকাল,
—” কী হয়েছে?”
ধারা দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
—” কিছু না।”
শ্রাবণ চোখ সরু করল। কিছু একটা হয়েছে। এই ‘কিছু না’ বিপজ্জনক। সে সামনের চেয়ারটাতে বসে বলল,
—” তোমার চোখ এমন কেনো?”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। এরপর খোঁচা দেয়ার জন্য বললো,
—” কবে থেকে চোখ পড়তে শুরু করলেন? মনে হচ্ছে অনেক বুঝদার হয়ে গেছেন?”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দমে গেল। টেবিলের উপর রাখা সেই তোড়াটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—” মনে হচ্ছে আমি আবার প্রেমে পড়ব।”
ধারা মুখ কুঁচকাল,
—” কী বললেন?”
—” না মানে, তোমার উড়নচণ্ডী ভাবটাও মন্দ নয়। কথায় কথায় খোঁচা দিচ্ছ। আরো কোনো রূপ থাকলে দেখিয়ে দাও।”
ধারা আবারো চোখ সরু করে তাকাল। শ্রাবণ এবারে গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের শার্টের কলার ঠিক করল। এরপর সেই ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে দিল ধারার দিকে। ধারা প্রথমে তোড়াটার দিকে তাকাল না। বরং শ্রাবণের হাতের দিকে তাকাল। হাতে এখনো হালকা ফাটা দাগ। সকালে দেখেছে। এখনো ভুলেনি। তারপর ধীরে চোখ তুলে শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ তোড়াটা এগিয়ে ধরেই আছে। মুখে একটা অদ্ভুত সিরিয়াস ভাব আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু চোখদুটো এত নার্ভাস যে মনে হচ্ছে ভাইভা দিতে এসেছে। ধারা শান্ত গলায় বলল,
—” এটা কী?”
শ্রাবণ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
—” ফুল। ”
—” সেটা আমি দেখছি। কেন?”
শ্রাবণ থেমে গেল। দুই সেকেন্ড ভাবল। তারপর খুব গম্ভীর হয়ে বলল,
—” এটা কঠিন প্রশ্ন।”
ধারা চোখ সরু করে বলল
—” এখন বলবেন না, এটাও রেস্টুরেন্টের নিয়ম।”
শ্রাবণের চোখ চকচক করে উঠল,
—” রাইট। ইউ আর জিনিয়াস। ঠিক ধরেছো। এটাও নিয়ম। তাড়াতাড়ি নাও।”
তবুও ধারাকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধারা এবারে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—” আমাকে এত বোকা মনে হয়?”
ধারা ভ্রু তুলল। শ্রাবণ আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে বলতে লাগল,
—” না ধারা। এভাবে বলে না। শোনো, ডেটে নাকি ফুল দিতে হয়। তোমার অতি সততার আদর্শ নীল ভাই-ই বলেছে। আমি ভাবলাম যেহেতু আমার জীবনের প্রথম..মানে..
মাঝপথে থেমে গেল। ধারা সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
—” প্রথম কী?”
শ্রাবণ কাশি দিল,
—” প্রথম বৈবাহিক বৈধ ডেট।”
ধারা মুখ ফিরিয়ে নিল। কথাটা শুনে হাসি পেল তার। আড়ালে হাসলও। শ্রাবণ দেখে ফেলল। সাথে সাথে সাহস বেড়ে গেল। আরেকটু এগিয়ে তোড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—” নাও।”
ধারা এবার তাকাল তোড়ার দিকে। সাদা আর হালকা গোলাপি ফুল। আলতো হাতে তোড়াটা নিল সে। কোলের উপর রেখে হাত বুলালো। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল,
—” আগে থেকে কেনো করেছেন এসব? কীভাবে জানলেন আজ বাইরে আসতে হবে?”
শ্রাবণ জমে গেল। চোখ পিটপিট করল। আত্মা যেন এক পলকে বের হয়ে আবার দেহে ঢুকল। ওহ। ধরা খেয়েছে। অবশ্য খাওয়ারই কথা। সে দ্রুত গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—” আচ্ছা, ব্যাপার টা হচ্ছে, তোমার সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আছে বুঝলে। ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। জীবন-মরণের বিষয়! ”
ধারা তাকিয়ে রইল। শ্রাবণ এবারে নিজেই শুকনো ঢোক গিলল। উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। ধারা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাল। শ্রাবণ ঘুরে এসে এবারে ধারার চেয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছু বলল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকেই মানসিকভাবে বোঝাল, এখন পিছিয়ে গেলে আর কখনো সাহস হবে না। বেশ অনেকটা সময় মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে বুক ভরে শ্বাস নিল, যেন সাহস জমা করল। ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ শ্রাবণ খুব ধীরে নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকাল। ধারার মনে হলো ফোন বের করবে। কিন্তু না। একটা ছোট কালো ভেলভেটের বক্স বের হলো। ধারার আঙুল থেমে গেল ফুলের উপর। শ্রাবণ একবার চোখ বন্ধ করল। তারপর আস্তে করে আরেকটু এগিয়ে এসে ধারার সামনে দাঁড়াল। ধারা এবার সত্যিই অস্থির হয়ে উঠল।
—” কী করছেন আপনি? কী এটা?”
শ্রাবণ উত্তর দিল না। বরং ধীরে, খুব ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল। ধারার চোখ বড় হয়ে গেল। হাত থেকে প্রায় তোড়া পড়ে যাওয়ার উপক্রম। চারপাশের আলোটা হঠাৎ আরও নরম মনে হলো। শ্রাবণ নিচু মাথায় কয়েক সেকেন্ড বসে থেকে বক্সটা খুলল। ভেতরে চিকচিক করে উঠল একটা সরু ডায়মন্ড রিং।
নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা মেয়েটা। দম বন্ধকর অবস্থা। হচ্ছে টা কী? শ্রাবণ মাথা তুলে তাকাল এবার। চোখদুটো লাল। ভয়ও আছে, লজ্জাও আছে, আবার অদ্ভুত এক দৃঢ়তাও আছে। সে খুব ধীরে বলতে শুরু করল,
—” ধারা, আমি জানি আমাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু ওই বিয়েটা আমি করেছিলাম দায়িত্ব নিয়ে। মানুষ হয়ে না। স্বামী হয়ে না।”
ধারার বুকটা কেমন করে উঠল। আবারো সেসব কথা কেন? শ্রাবণ আবার বলল,
—” আমি তোমাকে ঘরে এনেছিলাম। কিন্তু নিজের জীবনে আনি নি। তোমাকে নিজের মানুষ করেছিলাম, কিন্তু মানুষটার দিকে তাকাইনি। তুমি পাশে ছিলে, অথচ আমি তোমাকে অপেক্ষা করিয়েছি। আজকে আমি কোনো ভুল ঠিক করতে আসিনি। কারণ কিছু ভুল ঠিক হয় না। কিছু ক্ষত দাগ রেখেই যায়। তোমায় আমি যত কষ্ট দিয়েছি, তা হয়তো মুছে দেয়া সম্ভব না। কিন্তু, ভুলিয়ে দিতে চেষ্টা করতে পারি। আমি শুধু নতুন করে শুরু করতে চাই।”
ধারা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। শ্রাবণ রিংটার দিকে তাকিয়ে ছোট করে হাসল।
—” জানো? এই রিংটা কিনতে গিয়ে একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল ‘ প্রপোজ কবে করব? বিয়ে কবে? আমি উত্তর দিতে পারিনি। কারণ আমার মনে হয়েছিল আমি তো অনেক দেরি করে ফেলেছি। এখন যত যা-ই করি না কেন, সেই প্রথমের মত কিছু হবেনা।”
ধারার চোখ ঝাপসা হচ্ছে। সে শক্ত করে চেয়ারের হাতল চেপে ধরল। শুকনো ঢোক গিলো চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল। শ্রাবণ আবারো আকুল স্বরে ডাকল,
—” ধারা তুমি যা-ই বলো না কেন, যত-ই আমায় ইগনোর করো না কেন, আমি জানি, তুমি আমায় ভালোবাসো। আমায় অবশ্যই ভালোবাসো তুমি। হয়তো কষ্ট পেয়ে আগের মত মানছো না, কিন্তু অস্বীকার করতে পারবেনা তুমি। শ্রাবণ শেখ পৃথিবীর নিকৃষ্ট পুরুষ হলেও তুমি তাকে ভালোবেসে যাবে। এটাই তুমি। ”
একটু থামল শ্রাবণ। বুড়ো আঙুলে নিজের চোখের কোণে সদ্য আসা পানিটুকু ছিটকে ফেলে দিয়ে আবারো বলল,
—” আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি না। কারণ ক্ষমা চাইলে মনে হয় সবকিছু সমান হয়ে যাবে। আমি সেটা চাই না। তুমি রাগ রাখো। অভিমান রাখো। শাস্তি দাও। যা খুশি তাই করো। ক্ষমা কোরো না আমাকে। আমার শাস্তি দরকার। কিন্তু আমাকে তোমায় ভালোবাসার অনুমতি দাও। আমার বুকে মাথা রেখে পিঠে ছুরি মেরো, তবুও কাছে এসো।”
ধারার চোখ ভিজে উঠল। চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করল সে। শ্রাবণ এবারে ধারার দিকে তাকাল। চোখে পানি নিয়েই বলে ফেলল,
—” আমি আবার বিয়ে করতে চাই তোমাকে।”
ধারা থমকে গেল। চট করে তাকাল শ্রাবণের চোখে। বিয়ে? শ্রাবণ হেসে বলল,
—” হ্যাঁ জানি, বিয়ে হয়েছে। আবার বিয়ে করতে ক্ষতি কী? এবার সব নিয়ম মেনে বিয়ে করি। ফুল থাকবে। আমাদের ছবি থাকবে। মানুষ থাকবে। তুমি সুন্দর করে বউ সাজবে। আমি তোমায় দেখব।”
ধারা চোখে পানি নিয়েই ভ্রু কুঁচকাল। শ্রাবণ এবারে একটু থেমে বলল,
শ্রাবণ ধারা পর্ব ৩১
—” আমার আরেকবার কবুল বলার খুব ইচ্ছে হয়েছে ধারা। ”
তারপর ধীরে রিংটা এগিয়ে দিল। একটা লম্বা শ্বাস নিল।
—” উইল ইউ এগেইন ম্যারি মি, ওয়াইফি?”
