সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৭
Jannatul Firdaus Mithila
“ এতো অধৈর্য্য হচ্ছিস কেনো সানশাইন? প্লিজ একটু সামলা নিজেকে!”
রৌদ্রের একের পর এক অনুনয়ের সুরে বলা কথাগুলোতেও থামছে না অরিন।মেয়েটার চোখেমুখে স্পষ্ট অধৈর্য্যের ছাপ! রৌদ্র চিন্তিত হলো মেয়েটার এমন ভাবভঙ্গিতে।সে চটজলদি মেয়েটাকে নিজের বুকে চেপে ধরে। অরিন নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায় কিন্তু ছেলেটার ওমন পুরুষালী শক্তির সাথে কিছুতেই বুঝি পেরে উঠছে না সে!রৌদ্র এবার মুখ খোলে।অরিনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলতে থাকে,
“ খুব খারাপ লাগছে বউজান?”
অরিন চুপটি করে পড়ে রইলো রৌদ্রের বুকে।ছেলেটার প্রশ্নের জবাবে কেবলই মাথা নাড়ালো কোনরকম।রৌদ্র ধীরে ধীরে অরিনকে নিজের বুকের ওপর থেকে উঠিয়ে, তার দিকে সরু চোখে তাকায়। মেয়েটার কানের পিঠে একহাত রেখে নরম কন্ঠে আবারও বলে,
“বল না সানশাইন! খুব খারাপ লাগছে?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
অরিন তৎক্ষনাৎ নিজের মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলে।মেয়েটার সরু নাকটা কেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। হয়তো মনে মনে বেশ রাগ লাগছে তার! রৌদ্র একদৃষ্টিতে অরিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর কি যেন একটা ভেবে চট করে মেয়েটাকে নিজের কোল থেকে নামিয়ে দিলো।অরিন হতবিহ্বল হয়ে গেলো এহেন কান্ডে। সে হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে রৌদ্রের পানে।রৌদ্র তার এহেন দৃষ্টিকে কোনরূপ পাত্তা না দিয়ে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর মেয়েটার সামনে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে অরিনের হাতদুটোতে নিজের হাতের স্পর্শ করায়।অরিন কিছুটা কেঁপে ওঠে।রৌদ্রের হাতদুটো আস্তে আস্তে উঠে এলো অরিনের বাহু বেয়ে কাঁধের ওপর। মেয়েটার কাঁধে পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে সেথায় ঠোঁট ছোঁয়ায় রৌদ্র। অরিন তৎক্ষনাৎ নিজের চোখজোড়া বন্ধ করে নেয়। তার সম্পূর্ণ শরীরজুড়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু ঝংকার। হাতদুটো খপ করে চেপে ধরেছে জামার একাংশ! রৌদ্র এবার গভীর চোখে অরিনের দিকে তাকায়। মেয়েটার বন্ধ করে রাখা নেত্রযুগলের ওপর আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়।তারপর ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনে মেয়েটার ঠোঁটের কাছে। রৌদ্র পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইলো অরিনের গোলাপি অধরজোড়ার পানে। মেয়েটার ওষ্ঠপুট কেমন তিরতির করে কাঁপছে! নিচের ঠোঁটটার বা-দিকটা এখনো কেমন হালকা ফুলে আছে! রৌদ্র সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। কিছুক্ষণ আগে সে-ই তো মেয়েটার নরম ঠোঁটের ওপর রীতিমতো আক্রমণ চালিয়েছে।তার রেশ যে এখনো স্পষ্ট ফুটে আছে মেয়েটার নরম অধরযুগলের ওপর। রৌদ্র অরিন গালের ওপর হাত রেখে ঘোরলাগা কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ চোখ খোল সানশাইন!”
অরিন কুঁচকে রাখা চোখদুটো ধীরে ধীরে মেলে। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন যুবকের ঘোরলাগা দৃষ্টিতে চোখ পড়তেই আঁটকে গেলো তার দৃষ্টি!হৃদয়টা বুঝি থমকে গেলো একমুহূর্তের জন্য! নিশ্বাসের উঠানামা হয়ে গেলো ঘন। রৌদ্র এবার অরিনের ঠোঁটের কোণে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়।যেমন কোমল,তেমনি ধীর সেই স্পর্শ! অরিনের চোখদুটো আবারও বুঁজে আসে। রৌদ্র ফের নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় অরিনের ঠোঁটের অপর কোণে। তারপর কিয়তক্ষন অনিমেষ চোখে মেয়েটার অধরজোড়ার পানে তাকিয়ে থেকে পরপর শুকনো ঢোক গিললো রৌদ্র। ছেলেটার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করছে! রৌদ্র নিজের শুষ্ক ঠোঁটজোড়া জিভ দিয়ে খানিকটা ভিজিয়ে নিলো। যাহ! হুট করে তার বুঝি বড্ড তেষ্টা পেয়ে গেলো! গলাটা কেমন খা খা করছে শুষ্কতায়! ভাব এমন — এ মুহুর্তে তেষ্টা নিবারন করতে না পারলে সে বুঝি জ্ঞানই হারিয়ে ফেলবে! রৌদ্র আর সাত-পাঁচ না ভেবে চট করে মেয়েটার ঠোঁটজোড়া দখল করে নিলো। প্রথমে আলতো স্পর্শে কাপিয়ে তুললেও এখন বুঝি সেই স্পর্শ হয়ে যাচ্ছে দ্বিগুণ জোরালো! অরিন স্পষ্ট টের পাচ্ছে — তার সারা শরীর কাপছে।পাদু’টোও কেমন আসাড় হয়ে আসছে! মেয়েটা খানিকটা হেলে পড়তে নিলেই তাকে নিজের বাহুডোরে আগলে নিলো রৌদ্র।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর অরিনের ওষ্ঠপুট ছেড়ে দিয়ে, তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে থাকে রৌদ্র। অরিনটাও কেমন হাঁপাচ্ছে! হাঁপানোর একপর্যায়ে অরিন কেমন মিনমিনে স্বরে বলে ওঠে,
“ এখানে… না সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে!”
রৌদ্র হাসলো ঠোঁট পিষে। অরিনের কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
“ ছিলো, কিন্তু এখন নেই!”
এহেন কথায় অরিন বুঝি অবাক হলো কিছুটা। সে কেমন অবাক চোখে তাকায় রৌদ্রের পানে।রৌদ্র বুঝলো মেয়েটার এরূপ দৃষ্টি। সে হাতের ইশারা দেয়ালের কোণে তাক করে বলে,
“ তাকিয়ে দেখ সোনা! আমার রোম্যান্সে বাঁধা হয়ে আসার জন্য তাকে অনেক আগেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে!”
অরিন তৎক্ষনাৎ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আনে দেয়ালের ওপর। দেয়ালের দিকে তাকাতেই খানিকটা চমকে ওঠে সে। কাল অবধি এখানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও, আজ যে সেটার কোনো অস্তিত্বও নেই! অরিন এবার নিজের দৃষ্টি আনে রৌদ্রের ওপর। বলে,
“ কখন সরালেন এটা?”
রৌদ্র অরিনের কোমর একহাতে জড়িয়ে নিজের একেবারে কাছাকাছি নিয়ে আসে। তারপর মেয়েটার নাকে আলতো টান মেরে বলে ওঠে,
“ সকালে এসেই আগে আমার শত্রুকে জায়গা থেকে সরিয়েছি! কেননা এটার দিকে তাকালেই শরীরে রাগ উঠবে আমার! তাই সরিয়ে দিলাম নিজ দায়িত্বে!”
অরিন হা করে শুনলো রৌদ্রের কথা।কি বলছো এ লোক? সামান্য একটা সিসিটিভি ক্যামেরাকে নিজের শত্রু বানিয়ে ফেললো? অরিন নিজের মনে উঠা প্রশ্নটাকে ঠোঁটের আগায় নিয়েই এলো —
“ সামান্য একটা সিসিটিভি ক্যামেরা আপনার শত্রু হয়ে গেলো?”
রৌদ্র চোখমুখ কুঁচকে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ তা নয়তো কি? এই ইডিয়টটার জন্যই তো গতবার বাসরটা হতে গিয়েও হলোনা!তাছাড়া এমন একটা কাজের জন্য আমি নিশ্চয়ই এটাকে নিজের আশেপাশে রাখবোনা! তাই শত্রুকে সরিয়ে দিয়েছি!”
এমন একটা কথায় অরিন না চাইতেও কেমন খিলখিল করে হেসে দিলো! আর রৌদ্র? সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার প্রেয়সীর মনকাড়া হাসির দিকে। প্রায় মিনিট খানেক পর অরিন কোনমতে নিজের হাসিটা চেপে বললো,
“ দিনদিন পাগল হচ্ছেন ডাক্তার সাহেব!”
রৌদ্র মুচকি হাসলো মেয়েটার কথায়। অরিনের কানের পিঠে আলতো করে কামড় বসিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ এর জন্য নিশ্চয়ই আমি একা দায়ী না?”
অরিন মৃদু হেসে মাথা ঝাকায়। রৌদ্রের গলার কাছে হাত রাখার জন্য হাতদুটো উঁচু করতেই রৌদ্র খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়ালো। মেয়েটা আবার তার তুলনায় বেশ ছোট-খাটো কি-না! অরিন গালভর্তি হাসি টেনে রৌদ্রের গলা আঁকড়ে ধরলো। বেশ আদুরে কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ ওই! রোদ ভাই… চলুন না প্রেম করি!”
রৌদ্র তৎক্ষনাৎ ভ্রু কুঁচকে ফেলে মেয়েটার কথায়।কপালে দু-তিনেক বিরক্তির ভাজঁ ফেলে অসহায় কণ্ঠে বললো,
“ জামাই লাগি তোর বউজান! দোহাই লাগে আর ভাই ডাকিস না!”
অরিন দুষ্ট হাসলো। রৌদ্রের বুকের সঙ্গে একপ্রকার লেপ্টে গিয়ে ফের বললো,
“ আচ্ছা ডাকবোনা কিন্তু কথাতো এটা না! কথা হচ্ছে আরেকটা….”
রৌদ্র এবার সন্দিগ্ধ চোখে তাকায় অরিনের পানে।বলে,
“ আবার কি?”
“ বলছি, তার আগে কোলে তুলুন!”
অরিনের বলতে দেরি, তাকে পাঁজা কোলে তুলতে দেরি করলোনা রৌদ্র! মেয়েটাকে কোলে তুলে খানিকটা ঝাকিয়ে বললো,
“ এবার বল না জানবাচ্চা!”
অরিন এবার মৃদু হাসলো। রৌদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে অবুঝ গলায় বলতে লাগলো,
“ ভাবছি, আমাদের বাবু হলে সে আপনাকে কি বলে ডাকবে?”
এহেন একটা নির্বোধ মার্কা প্রশ্নে কুঁচকে রাখা ভ্রু আরও খানিকটা কুঁচকে আসে রৌদ্রের। সে কেমন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ এটা আবার কেমন প্রশ্ন বউজান? আর হুট করে এমন একটা উদ্ভট প্রশ্ন তোর মাথাতে আসলোই বা কিভাবে?”
অরিন আবারও বাচ্চাদের মতো নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। তা দেখে রৌদ্র তৎক্ষনাৎ গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠে। বলে,
“ আর সিডিউস করিস না সানশাইন! বিশ্বাস কর! বহু কষ্টে নিজেকে এখনো সামলে রেখেছি।তারওপর তুই যদি আমার জিনিসের ওপর এমন হুটহাট কামড়াকামড়ি করতে থাকিস তাহলে আই সয়্যার, আমি কিন্তু সুস্থতা কিংবা অসুস্থতা মানবো না!জোর করে হলেও নিজেরটা ঠিক আদায় করে ছাড়বো।”
রৌদ্রের এমন শক্ত কথাতেও হাসলো অরিন। সে হাসি মুখেই বলতে থাকে,
“আচ্ছা শুনুন না…. ভাবছি আমাদের বাবু হলে সেও যদি আমার মতো কনফিউশানে পড়ে আপনাকে আব্বুর জায়গায় মামা ডেকে ফেলে? তখন….! ”
তার কথা শেষ হবার আগেই খেঁকিয়ে ওঠে রৌদ্র। কর্কশ গলায় বলে,
“ অরি!!!! কি যা-তা বলছিস মাথা ঠিক আছে?”
এহেন কথায় হাসি মুখটা তৎক্ষনাৎ চুপসে আসে অরিনের। মুখটায় নেমে আসে অন্ধকার! কি এমন বলেছে সে,যার জন্য এতো শক্ত গলায় কথাগুলো বলতে হলো।সে-তো শুধু মজা করেই বলেছিলো তাই-না!
অরিন মুখ ভার করে মাথা নুইয়ে রাখলো।রৌদ্র এখনো কেমন ফোঁস ফোঁস করছে রাগে। এই একটা কথার জন্য কিছুদিন আগেও কেমন শিক্ষা দিয়েছিলো মেয়েটাকে অথচ আজকে দেখো,সেই একই কথা আবারও বেরোলো তার মুখ দিয়ে!
রৌদ্র শক্ত মুখে অরিনকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো।অরিন ভড়কে যায় এহেন কান্ডে। সে তৎক্ষনাৎ চটে যাওয়া মেজাজে বলে ওঠে,
“ এটা কি হলো? এইটুকু কথা বলাতে কি এমন হয়েছে? এতো রাগ…..!”
বাকিটা আর বলতে পারলোনা অরিন। তার আগেই তার চোয়ালখানা শক্ত হাতে চেপে ধরেছে রৌদ্র।অরিন মৃদু ব্যাথায় ককিয়ে উঠে। রৌদ্রের হাতটা চোয়াল থেকে সরাতে নিলেই খেঁকিয়ে উঠে ছেলেটা!
“ কি বলেছিলি আরেকবার বল! খোদার কসম, আজকেই তোর জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো আমি! এই.. তোরে ঐদিন কি বলে দিয়েছিলাম? বলেছিলাম না আমাকে দ্বিতীয়বার কোনদিন যেন ভাই না ডাকতে! আমার না করা স্বত্বেও, তুই ভাই ডাকলি কোন সাহসে?”
অরিনের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুয়েক ফোঁটা নোনাজল। সেই জলের উপস্থিতি টের পেতেই সাথে সাথে তার চোয়াল ছেড়ে দেয় রৌদ্র। মেয়েটার ছলছল চোখজোড়ার দিকে তাকাতেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার।রৌদ্র ফাঁকা ঢোক গিললো পরপর। অরিনের নুইয়ে রাখা মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে তৎক্ষনাৎ। নরম কন্ঠে বলে ওঠে,
“ মাফ করে দে জানবাচ্চা! ভুল হয়ে গেছে আমার! কিন্তু আমিই বা কিভাবে নিজের রাগ কন্ট্রোল করবো বল? তোর মুখে ভাই ডাক শুনলেই মাথায় রক্ত উঠে যায় আমার! তাই…. আচ্ছা এবারের মতো মাফ করে দে সানশাইন!”
অরিন নাক টানে কিছুটা। রৌদ্রের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে হাতের উল্টো পিঠে চোখদুটো মুছে নেয় সে।রৌদ্রের দিকে না তাকিয়েই বলে,
“ বাসায় যাবো!”
“ সানশাইন, আমার কথাটা..”
“ ভালো লাগছে না আমার! আমি বাসায় যাবো!”
অগত্যা এহেন কথায় অসহায় চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলো রৌদ্র। এখন কিভাবে রাগ ভাঙাবে মেয়েটার? রৌদ্র ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললো।ডেস্কের কাছে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল লাগালো অনিকের কাছে। প্রায় দুবার রিং হতেই কলটা রিসিভ করলো অনিক। রৌদ্র অরিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,
“ কেবিনে আয়!”
ব্যস এটুকুই বললো সে।এরপরই ফোনটা কেটে দিয়ে ফের অরিনের কাছে এসে দাঁড়ায় রৌদ্র। সোফার ওপর পড়ে থাকা অরিনের হিজাবটা হাতে নিয়ে সযত্নে পড়িয়ে দিতে লাগলো মেয়েটাকে।এর মধ্যে রৌদ্র বেশ কয়েকবার অরিনের দিকে আড়চোখে তাকালেও অরিনটা কেমন মাথা নিচু করেই রাখলো।একটিবারের জন্যও মাথা তুলে ছেলেটার দিকে তাকালো না অবধি! রৌদ্র অরিনের এমন ভাবভঙ্গিমায় আহত হলো খানিকটা। তবুও সে নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখে অরিনের কপাল বরাবর ঠোঁট ছোঁয়ায়। বলে,
“ বাসায় গিয়ে রেস্ট নিবি!”
প্রায় মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কেবিনে এসে উপস্থিত হলো অনিক।পুরো কেবিন জুড়ে নিস্তব্ধতা দেখে খানিকটা শঙ্কিত হলো ছেলেটা।ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখতে পেলো — অরিনটা গালে হাত দিয়ে বসে আছে সোফায়। আর রৌদ্র তার থেকে খানিকটা দূরে গা এলিয়ে বসে আছে।দৃষ্টি তার অরিনের দিকেই নিবদ্ধ। ছেলেটার পড়নের শার্টটার উপরের বেশ কয়েকটা বোতামও কেমন খুলে রাখা! অনিক জোরালো কদমে এগিয়ে আসে তাদের নিকট। রৌদ্রের পানে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“ কি হয়েছে ভাইয়া? তোমার এ অবস্থা কেনো?”
রৌদ্রের দৃষ্টি এখনো মেয়েটার নতমুখের পানে নিবদ্ধ। সে অনিকের কথার প্রতিত্তোরে খানিকটা নড়েচড়ে বসলো। হাত দিয়ে কপালের উপর লেপ্টে থাকা অগোছালো চুলগুলো খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে বললো,
“ ওকে বাসায় নিয়ে যা। আর হ্যা, আজকের ঘটনা যেন জানাজানি না হয় বাসায়!”
অনিক মাথা কাত করলো বুঝদারদের ন্যায়।তারপর অরিনের হাতটা মুঠোয় নিয়ে বললো,
“ চল বনু!”
অরিন ধীরসুস্থে উঠে দাঁড়ায়। ভাইয়ের হাত ধরে, পা বাড়ায় চলে যাবার উদ্দেশ্যে।অথচ একটিবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকালো না অবধি! তাকালে হয়তো দেখতে পেতো,একজোড়া ক্লান্ত চোখ তার পানেই কেমন আকুল হয়ে তাকিয়ে আছে!
রাত সাড়ে ১২ টা! এহসান বাড়ির প্রতিটি আনাচে কানাচে নিস্তব্ধতা নেমেছে বেশ আগে। যে যার মতো করে চলে গিয়েছে নিজ কামরায়। অথচ রৌদ্র এখনো বাড়িতে ফিরেনি! ছেলের চিন্তায় একরাশ ক্লান্তি নিয়েও এতক্ষণ ড্রয়িং রুমে বসে অপেক্ষা করছিলেন জুবাইদা বেগম। তার জা’য়েরা এসে শুয়ে পড়তে বললেও মমতাময়ী কোনও কথাই শুনলোনা এ প্রসঙ্গে! কিন্তু আধ ঘন্টা আগে রৌদ্র যখন তার কাছে কল দিয়ে বললো —
“ আমার জন্য অপেক্ষায় থেকো না মা,আমি একটা জরুরি কেসে আটকা পড়েছি।ফিরতে লেট হবে! ”
তখন গিয়ে অপেক্ষার অবসান ঘটলো জুবাইদা বেগমের।
ছেলের কথার বিপরিতে যাওয়ার সাধ্যিটি কি আর আছে তার? মধ্যবয়স্কা ক্লান্ত দেহটা নিয়ে তিনি চলে গেলেন নিজ রুমে।
এদিকে, অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে একপ্রকার ক্লান্ত অরিন।মেয়েটা সেই কখন থেকে কল দিয়ে যাচ্ছে রৌদ্রকে, অথচ রৌদ্রের বুঝি সেদিকে কোনো খেয়াল নেই! অরিন এবার অধৈর্য্য হলো।মনে একরাশ ঠুনকো রাগ নিয়ে হাতে থাকা ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেললো। নাহ! এতেও বুঝি রাগটা কমবার নাম নেই! মেয়েটা এবার দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সারা ঘরময় পায়চারি চালালো। মনে মনে বললো —
“ আজ শুধু আসুক একবার! আমাকে ইগনোর করার সাধঁ মিটিয়ে ছাড়বো!”
অরিনের এহেন ভাবনার মাঝেই কর্কশ শব্দ তুলে তার ফোনটা বেজে উঠলো।অরিন একপলক আড়চোখে ফোনটার দিকে তাকিয়ে মুখ ভেংচি কাটেঁ। বেশ বুঝতে পারছে সে, এটা কার কল হতে পারে! তাই তো সে একদমই তাড়া দেখালো না ফোনটা রিসিভ করার।পরপর প্রায় দুটো কল এসে যখন কেটে গেলো,তখনি টনক নড়ে মেয়েটার! তার ডাক্তার সাহেব যেই পরিমাণে শর্ট-টেম্পার্ড,না জানি ফোন না তোলায় আবারও কিরকম রেগে যায় তারওপর! অরিন তৎক্ষনাৎ ছুটে আসে ফোনটার কাছে। ভয়ে ভয়ে ফোনটা অন করতেই দেখতে পায় —ইতোমধ্যেই রৌদ্রের দুটো মিসড কল,আর পাঁচটা মেসেজ এসেছে। অরিন কপাল চাপড়াতে থাকে।মেসেজগুলো যে অন করবে সেই সাহসটুকুই পাচ্ছে না বেচারি।অরিন লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে নিজেকে কোনমতে স্বাভাবিক করলো।কাঁপা হাতে মেসেজগুলো অন করলো,
১/ ফোন তুলছিস না কেন?
২/ এই তোর সমস্যা কি?
৩/ এবার ফোন না তুললে কিন্তু তোর খবর আছে বলে দিলাম…
৪/ এতোগুলা মেসেজ কি চোখে পড়ছে না তোর?
৫/ এবার শেষবারের মতো ফোন দিবো! এন্ড এবারও যদি ফোন না তুলিস…দ্যান আই প্রমিস — বাসায় এসেই তোরে কোলে তুলে একটা আছাড় মারবো! বেয়াদব!
শেষ মেসেজটা এসেছে ৩০ সেকেন্ড পূর্বে।তার মানে শেষ কলটা এখনো আসেনি।অরিন হাঁফছেড়ে বাচলো।ফোনটা হাতে নিয়ে অধির আগ্রহে বসে রইলো রৌদ্রের কল আসার অপেক্ষায়! প্রায় সেকেন্ড দশেকের মাঝেই কল এলো কাঙ্খিত ব্যাক্তির।অরিন আর কোনো কালবিলম্ব না করে চটজলদি রিসিভ করে নিলো কলটা।ফোনটা কানে ঠেকিয়ে যেই-না কিছু বলতে যাবে, তার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে রৌদ্রের গুরুগম্ভীর কন্ঠ!
“ নিচে নাম!”
অরিন হকচকায়।এ মুহুর্তে এই অন্ধকারে কিভাবে নিচে যাবে সে? অরিন ফাঁকা ঢোক গিলে কোনমতে বললো,
“ ইয়ে.. মানে… এই অন্ধকারে…! ”
“ এটাই তোর শাস্তি নাম!”
কথাটা বলেই খট করে কলটা কেটে দিলো রৌদ্র। এদিকে অরিন পড়লো মহা বিপাকে। এমনিতেই রাত,তারওপর বাড়িতে সবাই আছে। ঘুনাক্ষরেও যদি কেও একজন টের পেয়ে যায় তাহলে যে কেলেংকারী ঘটবে তা নিশ্চিত! অরিন মাথা চুলকাতে লাগলো। অস্থিরতায় এদিক ওদিক পায়চারি চালালো দ্রুত কদমে। প্রায় মিনিট খানেক পেরুনোর পর নিজ ভাবনায় নিজেই অতিষ্ঠ হয়ে গেলো মেয়েটা।সে আর কিছু না ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে গেলো রুম ছেড়ে।
অন্ধকার সরু করিডরে হাঁটতে অসুবিধে হওয়ায় ফ্ল্যাশলাইট অন করতে চাইলো অরিন।কিন্তু তার আগেই তার সামনে এসে দাঁড়ালো সটান এক ছায়ামূর্তি। অরিন ভড়কে যায়। চোখ বড়সড় হয়ে আসে আপনাআপনি। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে পিছিয়ে গেলো দু-কদম। আরেকটু পেছাতে গেলেই ছায়ামূর্তিটি তার একহাত চেপে ধরে। অরিন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ কে?”
ছায়ামূর্তি এবার মুখ খোলে। অরিনের বেশ খানিকটা কাছে এসে মিনমিনে স্বরে বলে,
“ বনু! ভয় পাস না।এটা আমি!”
অরিনের কলিজায় বুঝি এবার পানি এলো।মেয়েটা ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ভাইয়ের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললো,
“ এভাবে হুট করে আসে কেও? আমিতো আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক করে বসতাম ভাইয়া!”
অনিক একহাতে মেয়েটাকে আগলে নিলো।অপরাধী স্বরে বলতে লাগলো,
“ এক্সট্রেমলি সরি বনু! আসলে আমি বুঝিনি তুই এতোটা ভয় পেয়ে যাবি!”
অরিন প্রতিত্তোরে আর কিছু বললো না।চুপ করে পড়ে রইলো ভাইয়ের বাহুডোরে।কিয়তক্ষন বাদে অনিক ফিসফিসিয়ে বললো,
“ আমার হাত ধরে হাঁটবি কেমন?”
অরিনও ভাইয়ের কথায় মাথা নাড়ায়। তারপর ভাইয়ের হাত ধরে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে।
অনিক নিঃশব্দে বাড়ির মেইন দরজাটা খুলে দেয়। তারপর অরিনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ আমি এখানেই দাড়াচ্ছি।তুই সামনে যা।ভাইয়া ঐদিকেই আছে।”
অরিন ভয়ে ভয়ে একবার বাইরের দিকে তাকায়। আমাবস্যা হওয়ায় চারিদিকে আলোর ছিটেফোঁটাও নেই! অরিন বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। বাড়ির গেটের সামনে এসে আশেপাশে খুঁজলো রৌদ্রকে।কিন্তু নাহ! রৌদ্র কি,রৌদ্রের টিকিটারও খোঁজ নেই কোথাও! অরিন ব্যস্ত হাতে ফোন লাগায় রৌদ্রের নাম্বারে। ওপাশে থাকা রৌদ্র তৎক্ষনাৎ রিসিভ করলো কলটা।ভাব এমন — ছেলেটা বুঝি মুখিয়েই ছিলো কলটা ধরবার জন্য! অরিন তখন ভীতু গলায় বলে ওঠে,
“ কোথায় আপনি ডাক্তার সাহেব?”
“ সামনে আয় আরেকটু! তাহলেই পাবি!”
অরিন ফোনটা কানে নিয়েই হাঁটা ধরলো সামনের দিকে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর থমকে দাঁড়ায় মেয়েটার পদযুগল। আশেপাশের অন্ধকার যেন ক্রমশই গিলে নিচ্ছে তাকে। অরিন ফের ভীতু গলায় বললো,
“ কোথায় আপনি? আমার ভিষণ ভয়….”
বাকিটা বলার আগেই একজোড়া বলিষ্ঠ হাত এসে তাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো। মেয়েটার পাদু’টো খানিকটা ঝুলে পড়লো জমিন থেকে। ঘটনার আকস্মিকতায় অরিন হতভম্ব হয়ে গেলো।কিয়তক্ষন বাদে তার কানে এসে ঠেকলো সেই পরিচিত পুরুষালী ভরাট কন্ঠ,
“ আমার হুতুম পাখি একটা!”
রৌদ্রের কন্ঠ কানে আসতেই সকল ভয়-ডর যেন ছুটে পালালো মেয়েটার।সে ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে জড়িয়ে ধরলো রৌদ্রকে।রৌদ্রও আরেকটু গভীরভাবে মিশিয়ে নিলো মেয়েটাকে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ যাবত দু’জনের মাঝেই খানিকটা নিস্তব্ধতা চললো। তারপর সেই নিস্তব্ধতা ভাঙলো রৌদ্রের ভরাট কন্ঠে,
“ রাগ কমেছে আমার বউজানের?”
অরিন রৌদ্রের বুকে মাথা গুঁজেই আলতো করে মাথা নাড়লো। ধীরে ধীরে মাথা তুলে রৌদ্রের পানে তাকিয়ে বললো,
“ ভিষণ মিস করেছি আপনাকে!”
রৌদ্র একহাতে মেয়েটাকে কোলে রেখে অন্যহাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে ফ্ল্যাশলাইট অন করলো।তারপর ফোনটা অরিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
“ খুব মিস করেছিলে সানশাইন?”
অরিন মাথা নাড়ায়। রৌদ্র মেয়েটার মুখপানে তাকিয়ে রইলো অনিমেষ চোখে। এতক্ষণের ঢের ক্লান্তি যেন নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো তার! মেয়েটার মধ্যে নির্ঘাত কোনো না কোনো জাদু আছে নিশ্চয়ই, নাহলে তার কাছে এলেই রৌদ্রের সকল ক্লান্তি,রাগ,সবটা এমন উধাও হয়ে যায় কি করে? এইতো কিছুক্ষণ আগের কথাটাই ধরা যাক না, মেয়েটা তার ফোন ধরেনি বিধায় সে কি রাগ তার! ভেবেছিলাে আজ একবার আসুক, তারপর আচ্ছামতো দু-চারটে শক্ত কথা শুনিয়ে দিবে তাকে।কিন্তু ওমাহ! মেয়েটার আদুরে মুখটা দেখলে তার কি আর রাগ-ক্ষোভ থাকে?
রৌদ্র পকেট থেকে দুটো ডেইরি মিল্ক চকলেট বের করে। সেগুলোকে অরিনের হাতে ধরিয়ে বলে,
“ খেয়ে নিন বউজান! আপনার ক্রেভিংস কমবে!”
অরিন এবার বেশ খানিকটা অবাক হলো। আচ্ছা তার ডাক্তার সাহেব কি করে জানলো তার চকলেট খাবার ক্রেভিংস হচ্ছিলো? অরিনের অবাক দৃষ্টি দেখে রৌদ্র বাঁকা হাসলো। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বললো,
“ তোমার ঐ ছোট্ট মাথায় এতো জোর দিতে হবে না হানি! এগুলো নরমাল ব্যাপার, যেটা সবাই কমবেশি জানে!”
অরিন হয়তো বুঝলো সবটা। সে মাথা নাড়িয়ে, ব্যস্ত হাতে একটা চকলেট ছিড়ে মুখে পুড়লো তৎক্ষনাৎ। রৌদ্রের কোলে থেকেই চোখ বন্ধ করে মনের সুখে খেয়ে যাচ্ছে চকলেটগুলো।এদিকে তার ওমন খাওয়া দেখে অবস্থা কাহিল বেচারা রৌদ্রের! ছেলেটা পরপর শুকনো ঢোক গিললো। ইশশ্, এ মুহুর্তে তার পাপী মনটা কি কি চাইছে তার কাছে… ভাবতে গেলেই ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে আপনাআপনি। অরিন খাওয়ার একপর্যায়ে রৌদ্রকে বাঁকা হাসতে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। ইশারায় জিজ্ঞেস করে, — কি ব্যাপার?
রৌদ্র প্রতিত্তোরে ঠোঁট কামড়ে হাসে। মেয়েটাকে কোলে নিয়েই হাঁটা ধরে অদূরেই দাঁড়িয়ে থাকা নিজের গাড়িটার দিকে।অরিন খাওয়া বাদ দিয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। কিছুক্ষণ পরেই তাকে গাড়িতে এনে বসিয়ে দেয় রৌদ্র। তারপর নিজেও এসে বসলো মেয়েটার পাশে। অরিন এখনো খেয়েই যাচ্ছে নিজের মতো করে। কখন ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা চকলেট গুলো জিভ দিয়ে চাটছে, আবার কখনো আঙুলের গুলো মুখে পুরে দিচ্ছে। ওদিকে রৌদ্রের নিশ্বাস কেমন ঘন হয়ে আসার উপক্রম মেয়েটার এমন কান্ড দেখে।রৌদ্র নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে অথচ বেহায়াগুলো সরলে তো! তারা বুঝি পণ করে রেখেছে মেয়েটাকে দেখতে থাকার।রৌদ্র ধীরে ধীরে অরিনের কানের পিঠে আলতো করে হাত রাখে।অরিন চকলেট খেতে খেতেই তার দিকে তাকায়। মেয়েটার ঠোঁটের চারিপাশে লেপ্টে আছে চকলেট। রৌদ্র আবারও ঢোক গিললো।জিভ দিয়ে শুষ্ক অধরজোড়া ভিজিয়ে নিলো খানিকটা। তারপর হাস্কি স্বরে বললো,
“ এদুটো খাওয়া শেষ হলে বাকিগুলোও খেয়ে নিবি কেমন?”
অরিন ভ্রু কুঁচকায়।আঙুলটা মুখে রেখেই জিজ্ঞেস করে,
“ বাকিগুলো বলতে?”
রৌদ্র মুচকি হাসলো। অরিনের গালে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে বললো,
“ পেছনে তাকা!”
রৌদ্রের কথা মোতাবেক অরিন ব্যাকসিটে তাকায়।আর ওমনি হতভম্ব হয়ে মুখটা তৎক্ষনাৎ হা হয়ে আসে মেয়েটার। সম্পূর্ণ ব্যাকসিট জুড়ে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চকলেট। কিছু কিছু অরিনের ভিষণ প্রিয় হলেও,বাকিগুলো দেখতে কেমন যেন নতুন নতুন লাগছে তার কাছে। অরিন চকলেট গুলোর দিকে তাকিয়েই ঢোক গিললো কয়েকটা। বললো,
“ এত্তগুলা কে খাবে?”
রৌদ্র হাসলো ঠোঁট কামড়ে। মেয়েটার আদুরে মুখটার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ আমার বউজান খাবে!”
অরিন এবার ঘুরে বসে সামনের দিকে। হাতে থাকা চকলেটটা মুখে পুরে বলে,
“ এত্তোগুলো একা খেলে পেট খারাপ হবে তো!”
“ কে বলেছে তুমি একা খাবে হানি? আমি আছি তো, আমিও খাবো তোমার সঙ্গে!”
কথাটা শোনামাত্রই অরিনের চোখদুটো কেমন চিকচিক করে উঠে। সে আপ্লুত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ সত্যি? তাহলে আসুন একসাথে খাই!”
রৌদ্র এপর্যায়ে বাঁকা হাসলো। অরিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,
“ খাইয়ে দিলে খাবো!”
অরিন তৎক্ষনাৎ নিজের হাতে থাকা চকলেটটা এগিয়ে দেয় রৌদ্রের দিকে।রৌদ্র মেয়েটার হাতের কব্জি চেপে মেয়েটাকে একেবারে কাছাকাছি নিয়ে আসে নিজের। তারপর হাস্কি স্বরে বলে,
“ চকলেট এভাবে খেতে হয়না হানি!”
কথাটা বলে হয়তো সেকেন্ড খানিক পেরুলো।তার মধ্যেই পাগল ছেলেটা ঝট করে আঁকড়ে ধরলো মেয়েটার ঠোঁট। অরিন হতবুদ্ধির ন্যায় বসে রইলো নিজ জায়গায়। তার হাতে থাকা চকলেটটাও গড়িয়ে পড়লো অবহেলায়।রৌদ্র গভীরভাবে শুষে নিচ্ছে মেয়েটার নরম অধরযুগল।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর মেয়েটার ওষ্ঠপুট ছেড়ে দিয়ে রৌদ্র কেমন অস্থির গলায় বলতে লাগলো,
“ কোলে আয় জান, এভাবে তোকে ফিল করতে পারছিনা!”
কথাটা শেষ করে আবারও নিজ উদ্যোগে একটানে মেয়েটাকে নিজের কোলে বসিয়ে নিলো রৌদ্র। তারপর আবারও গভীরভাবে আঁকড়ে ধরলো তার প্রেয়সীর ওষ্ঠপুট। একদিকে তার ওষ্ঠপুটের বেপরোয়া দখলদারিত্ব,অন্যদিকে তার হাতদুটোর বেহায়া স্পর্শে একেবারেই কুপোকাত অরিন।মেয়েটার নিশ্বাস কেমন জুড়িয়ে আসছে। বুকের ভেতরটায় বুঝি হাতুড়ি পেটা চলছে।সে কাঁপা কাঁপা হাতদুটো রাখলো রৌদ্রের বুকের ওপর।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর রৌদ্র ছাড়লো মেয়েটাকে। এরপর দুজনেই কেমন হাঁপাতে থাকলো একে-অপরকে জড়িয়ে। রৌদ্র হাঁপাতে হাঁপাতেই বলে ওঠে,
“ ড্যাম!চকলেট এত্তো টেস্টি কিভাবে হয় হানি?”
এহেন কথায় লজ্জা পেলো মেয়েটা। লজ্জায় একপ্রকার কুঁকড়ে গিয়ে মুখ লুকালো রৌদ্রের বুকে। রৌদ্র আলতো করে জড়িয়ে রাখলো অরিনকে। মেয়েটার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,
“ নেক্সট টাইম আরও ভালো করে টেস্ট করবো হানি!”
কথাটা শুনে তৎক্ষনাৎ ছেলেটার বুকে আলতো করে ঘুষি মেরে বসে অরিন।লজ্জালু হাসিতে মিইয়ে যায় মেয়েটা। ওদিকে রৌদ্রও যে হাসছে তার প্রেয়সীর এহেন কান্ডে।
প্রায় আধঘন্টা পর বাড়ির দিকে হেঁটে আসে রৌদ্র, অরিন। দু’জনের হাত একে অপরের হাতে। পদযুগল একে-অপরের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটছে।দু’জনার মাঝে কথা হচ্ছে টুকটাক।কথা বলার একপর্যায়ে অরিন হুট করেই এক ভিন্ন আবদার জুড়ে বসে,
“ ও ডাক্তার সাহেব!”
রৌদ্র থামলো।মেয়েটাকে নিজের সামনে এনে তার কোমর জড়িয়ে বললো,
“ জ্বি বউজান!”
“ একটা গান শোনান না প্লিজ!”
রৌদ্র ভ্রু কুঁচকায়।ভিষণ অনিহার সুরে বলে ওঠে,
“ কিন্তু আমিতো গান পারিনা সানশাইন!”
অরিনের মুখে তৎক্ষনাৎ আধার নেমে আসে। সে কেমন ঠোঁট উল্টে বললো,
“ সত্যি পারেন না?”
“ উহুম! নাহ..!” — রৌদ্রের ছোট্ট উত্তর।
অরিনও এমন কথার পিঠে আর কিছু না বলে,মন খারাপ করে সামনের দিকে পা বাড়ায়। এক-কদম সামনের দিকে এগোতেই পেছন থেকে তার একহাতের কব্জি আঁকড়ে ধরে রৌদ্র। অরিন থমকায়। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকায় রৌদ্রের দিকে। রৌদ্র আলতো হাসলো।একটানে মেয়েটাকে নিজের বুকের ওপর আছড়ে ফেলে, মেয়েটাকে চেপে ধরলো নিজের সঙ্গে। অরিন ভড়কে যায় হুটহাট আক্রমণে।সে রৌদ্রের দিকে তাকায় সরু চোখে। ছেলেটার বিড়াল চোখদুটো কি সুন্দর চকচক করছে লাইটের মৃদুমন্দ আবছা আলোয়। অরিন নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলো রৌদ্রের চোখের দিকে।
রৌদ্র এবার চোখে হাসলো।অরিনের কোমর ছেড়ে দিয়ে তার গালদুটোতে আলতো করে হাত রাখলো।তারপর গলায় মুগ্ধ সুর তুলে গাইতে লাগলো,
তোমায় দেখতে দেখতে আমি যেন অন্ধ হয়ে যাই
দুনিয়াতে তুমি ছাড়া কিছু দেখার তো আর নাই!!
তোমার ভালবাসা ছাড়া,
কোন কিছু এ মন চায় না
আমার হৃদয় একটা আয়না
এই আয়নায় তোমার মুখটি ছাড়া
কিছুই দেখা যায় না!!
(বাকিটা নিজ দায়িত্বে শুইনেন)
অরিন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের দিকে।ছেলেটার কন্ঠস্বর এতো সুন্দর? কই সে-তো আগে জানতো না এ বিষয়ে! কথায় আছে, ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানোর অন্যতম দুটো মাধ্যমের একটি হলো, ১. নিজের প্রিয়তমের চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, আর অপরটি হলো,২. গান গেয়ে নিজের অব্যক্ত অনুরক্তি জ্ঞাপন করা! অরিনের এ মুহুর্তে মনে হচ্ছে রৌদ্রের গাওয়া গানটা যেন, রৌদ্রের মন-গহীনের মধ্যে থাকা সকল কথাগুলোকে একত্রে প্রকাশ করার একটা সুপ্ত মাধ্যম।
অরিন আর কিছু না ভেবে চট করে জড়িয়ে ধরে রৌদ্রকে।রৌদ্রও আলতো হেসে মেয়েটাকে জড়িয়ে রাখে নিজের সঙ্গে। তারপর কি মনে করে যেন বলে ওঠে,
“ সানশাইন!”
“ হু!” — রৌদ্রের বুকে থেকেই জবাব দিলো অরিন।
“ তুই আমায় কখনো ছেড়ে যাবিনা তো?”
চট করে মাথা তোলে অরিন।রৌদ্রের দিকে তাকায় জিজ্ঞাসু চোখে। বলে,
“ নিজের জীবন থাকতে এটা হতে দিচ্ছিনা ডাক্তার সাহেব!”
এহেন কথায় রৌদ্র চোখে হাসলো খানিকটা। মেয়েটার গালে হাত রেখে, কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“ একটা কথা সবসময় মনে রাখিস সানশাইন! আমাদের জীবনে যতই ঝড়-ঝাপটা আসুক না কেন,তুই শুধু আমার পাশে থাকিস! আমি রৌদ্র কথা দিচ্ছি, তোর ওপর বিন্দু পরিমাণ আচঁ অবধি লাগতে দিবোনা কখনো! এটুকু বিশ্বাস আছে তো আমার ওপর?”
অরিন মুগ্ধ হাসলো। পরপর মাথা ঝাকিয়ে বললো,
“ বেশ আছে!”
রৌদ্র আলতো হাসলো। মেয়েটার কপাল বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখলো বেশ খানিকটা সময় নিয়ে। তারপর সেখান থেকে ঠোঁট সরিয়ে বলে,
“ চল এবার যাওয়া যাক!”
অরিনও মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।তারপর দু’জন মিলে হাতে হাত রেখে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে। বাড়ির গেটের সামনে এসে রৌদ্র মেয়েটার কোমরে হাত রাখতেই সেই হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দেয় অরিন।ইশারায় বলে,
“ কেও দেখে ফেলবে!”
রৌদ্র হাসলো একটু। মেয়েটার নাক টেনে দিয়ে হাঁটা ধরলো বাড়ির ভেতরে।
এদিকে তাদের এমন দৃশ্য দেখে মুহুর্তেই থমকে গেলেন নিচতলার বারান্দায় পায়চারি করতে থাকা কবির সাহেব। মানুষটার আবার প্রায় রাতেই হুটহাট ঘুম ভাঙবে কি-না, তাই মাঝেমধ্যে এসে বারান্দায় পায়চারি চালিয়ে আবারও শুয়ে পড়েন। আজকেও ঠিক এমনটাই হয়েছিল।ঘুম ভেঙে যাওয়ায় একটু পায়চারি চালাতে এসেছিলো বারান্দায়। কিন্তু হঠাৎ করে এমন একটা দৃশ্য দেখে মুহুর্তেই বাকহারা হয়ে গেলেন তিনি। মানুষটার কোমরে পেছনে বাঁধা হাতদুটো তৎক্ষনাৎ সামনে এনে নিজের বুকের বাঁপাশে চেপে ধরলেন।হুট করেই এখানটায় কেমন যেন চিনচিনে একটা ব্যাথা হচ্ছে! কবির সাহেব বারান্দায় মেলে রাখা গদিটায় বসে পড়লেন। তার সারা শরীর কাপছে। সম্পূর্ণ শরীরে কেমন ঘাম ছুটে যাচ্ছে! পড়নের পাতলা সফেদ রঙা পাঞ্জাবিটাও হয়তো ভিজে গিয়েছে অনেকটা। মানুষটার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন,
“ তিনি যা দেখলেন সবটাই কি সত্যি ছিলো?”
নাহ! আর ভাবতে পারলেন না তিনি। কাঁপা কাঁপা শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। একহাত এখনো তার বুকে চেপে রাখা।মানুষটা ধীরে ধীরে রুমে আসেন।অন্ধকার রুমটায় কোনরকমে হাতড়ে এসে বিছানায় বসলেন। পাশেই স্ত্রী জুবাইদা বেগম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছেন।কবির সাহেব দু’হাত বিছানায় চেপে মাথাটা নিচু করে বসে রইলেন। ভাবছেন,
“ ২৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা আবারও পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে এহসান বাড়িতে? আমরিনকে দেওয়া কথাটা তাহলে এভাবে তীরের মতো এসে ফলে গেলো তার ওপর?”
এসব ভাবতে ভাবতেই বুকের ব্যাথাটা আবারও তীব্র হয়ে আসে তার।তিনি হাত বাড়িয়ে বেডসাইড টেবিলের ওপর থেকে গ্লাসটা তুলতে গেলেই সেটা অন্ধকারে হাত লেগে পড়ে যায় ফ্লোরে। হঠাৎ এমন কাচ ভাঙা শব্দে একপ্রকার ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়েন জুবাইদা বেগম। ঘুম ঘুম চোখে সামনেই স্বামীকে ওমন মাথা নিচু করে বসে থাকতে দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি।স্বামীর পিঠে হাত রেখে ব্যস্ত গলায় বলতে লাগলেন,
“ কি হয়েছে রোদের আব্বু? তুমি এভাবে বসে আছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে কি?”
কবির সাহেব ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।ঘাড় বাকিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ নাহ! আমি ঠিক আছি!”
জুবাইদা বেগম হয়তো বিশ্বাস করলেন না স্বামীর মুখের কথা।তিনি আরও খানিকটা বিচলিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছো তুমি?”
এপর্যায়ে কবির সাহেবের কন্ঠ কেমন মোটা হয়ে আসলো।তিনি চোখদুটো আলগোছে বন্ধ করে নিয়ে বলতে লাগলেন,
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৫+৪৬
“ ভাগ্যিস যদি এ কথাটা বলতে পারতাম কিন্তু তা আর হলো কই! দুঃস্বপ্ন যখন বাস্তবে পরিনত হয়, তখন সেটা স্বপ্নের চাইতেও দ্বিগুণ ভয়ানক হয়। যার প্রভাব পড়ে মানুষের সম্পূর্ণ অস্তিত্বের ওপর!”
জুবাইদা বেগম হতবুদ্ধির ন্যায় শুনলেন স্বামীর কথা।হয়তো বুঝতে চেষ্টা করছেন এহেন গভীর কথার জ্ঞাতার্থ!
