সাঁঝের মায়া পর্ব ২৯
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কেটে গেছে বাইশটা টা দিন।বাইশটা রমজান পার হয়ে আজ তেইশ তম রমজান।চন্দ্রকাননে সবার জীবন একইরকম ভাবে এগোচ্ছে।তিন দিন হলো চন্দ্রা দেওয়ান গিয়েছে আশ্রমে।সেখানে স্বামীর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে কিছু আয়োজন আছে।তাছাড়া রোজার জন্যও ইফতার করাবেন স্থানীয় অনাথ আশ্রম গুলোতে।সেগুলোর হিসেব নিকেশে সে সরাসরি থাকেন। বাড়ির কর্তারা নিয়মমতো অফিসে যায়,এলাকায় নিজেদের বিস্তর জমিজমার খোঁজ খবর রাখেন,আশেপাশের এলাকায় তাদের অনাথ আশ্রম,বৃদ্ধাশ্রম গুলোতে পরিদর্শন এ যান।গিন্নিদেরও একই রুটিন।পরিবার,সংসার,স্বামী, ছেলেমেয়ে, দিনের সব কাজ সেরে তিন জা মিলে জমিয়ে আড্ডা।নিশি,নূরির ভার্সিটি, নয়নের অফিস,রিশা,রোশনি, রাফির স্কুল। সকাল সকাল খাবার নিয়ে চেচামেচি সবই।
সবাই সবার মতো চললেও দুরত্ব ঠিকই বেড়েছে ঈশান তিতিরের।মনোমালিন্য কমেনি।বরঞ্চ সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্বিগুণ হয়েছে।সেদিনের পর তিতির চূড়ান্ত দূরে দূরে থাকে ঈশানের থেকে।ঈশানও একবারের জন্য কথা বলার চেষ্টাটুকুও করেনি তিতিরের সাথে। নিজের অফিস,কাজে ডুবে থাকে সে।তিতিরও গোটা দিন নিজের মতো রুমের মধ্যে বই পড়ে,বারান্দায় গাছ লাগিয়ে,বিকেল বেলা বাগানে ভাইবোন দের সাথে সময় কাটায়।
বিয়ের ওই সপ্তাহে কাজে না যাওয়ার ঈশানের কাজ জমে গেছে প্রচুর। তবে কাজ জমার থেকে বড় সে কাজের মধ্যে থাকতে চায়।বন্ধুদের সাথে এ কয়দিন বের হওয়া হয়নি মোটেই।সময়ই হয়ে ওঠেনি।সাজিদ,অনিমা ফিরে গিয়েছে কর্মস্থলে তখনই একবারে ঈদের ছুটিতে দু এক এর মধ্যেই ফিরবে,নিয়াজ,রিতুও তাই।নাইমের যেহেতু এখানেই চাকরিবাকরি সুতরাং একমাত্র নাইম এখানে।
ভর দুপুর এখন।আজকে বেশ গরম পরেছে।টানা কয়েকদিন হলো বৃষ্টির দেখা নেই।প্রকৃতি ভ্যাপসা হয়ে আছে একপ্রকার।শাওয়ার নিয়ে,নামাজ সেরে বিছানায় গা এলিয়ে আছে তিতির।চুল শুকাচ্ছে।তমার আসার কথা।মেয়েটার আসার নামগন্ধও নেই।
সেদিন এর পর থেকে ভুলেও ঈশানের রুমে যায়নি সে।নিজের রুমেই থাকে।যতবার তার মামনীরা তাকে এ রুমে দেখে, ততবার কড়া গলায় আদেশ ছোড়েন ঈশানের রুমে যেতে।তিতির খুব সুন্দরমতো ম্যানেজ করে নিয়েছে তাদের।বলেছে ঈশান দিনে বাড়িতে থাকেনা।একা একা তার ওই ঘরটায় মন বসেনা।তাছাড়া নিজের রুমে তার পাখি দুটো আছে।ঈশান তো আর তার রুমে সেটা এলাও করবে না।সুতরাং দিনটা এ ঘরেই কাটে তার।গিন্নি রা অবশ্য মনে মনে খুশিই হয়।হাসে মিটিমিটি। স্বামী ছাড়া স্ত্রীর ঘরে ফাঁকা ফাঁকা লাগবে,একা একা লাগবে সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে রাতের বিষয়টাও ম্যানেজ করে নিয়েছে সে।সন্ধ্যার পর ইফতার সেরে বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির সবার সাথে কাটায়।এ বাড়ির বড়দের সবার রুম নিচতলাতে।এবং সকাল সকালই ঘুমাতে যায় তারা।সাড়ে দশটার মধ্যে। দু একদিন সর্বোচ্চ এগারো টা বাজে আরকি।সুতরাং তার পরে ওপরে এসে সে কোনরুমে গেলো সেটা কেউই খেয়াল করেনা।অন্য রুমে যাওয়ার সন্দেহও জাগেনা মনে।ঈশান দিনে বাড়িতে থাকেনা।সকালে ব্রেকফাস্ট এর সময় সবার যে কয়েকমিনিট দেখায় হয় আরকি, সেটুকু সময়ে তাদের মনের খবর কেউ নিতে যায়না।
তবে কেউ খেয়াল করেনা বললে ভুল হবে।নয়ন,নিশি,নূরি জানে সেটা।তারাও সেদিন এর পর আর জোর করে ভাইয়ের কাছে মেয়েটাকে পাঠানোর সাহস করে না।ঈদের আর বাকির ছয়দিন।নিশি,নূরির ভার্সিটি বন্ধ হবে আজকেই।ওরা সকাল সকাল বেড়িয়েছে ভার্সিটিতে। এরইমধ্যে রিশা, রোশনি,রাফি রোজ এসে বায়না করে তিতিরের কাছে ঈদের শপিং এর জন্য ঈশান কে রাজি করাতে।এটা অবশ্য বাড়ির বড়দের শেখানো তা সে খুব ভালো করে জানে।বারবারই ভাইবোন গুলোকে এড়িয়ে গেছে সে।দু এক এর মধ্যে অবশ্য বের হতেই হবে।নিশি, নূরির বন্ধ হয়ে গেলে ওদের নিয়ে বের হওয়া যাবে।অবশ্যই নয়ন ভাই নিয়ে যাবে।
খোলা দরজা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো তমা।হাতে একটা প্যাকেট।তিতির উঠে বসলো না।কনুই এ ভর করে কাত হলো।ভ্রু উচুলো তমার দিকে।তমা এসে বেছে বিছানায় পা তুলে।
____”কি ওতে?”
____”তোর আর ভাইয়ার জন্য ঈদের গিফট।”
তিতির খুশি হলো কি না বোঝা গেলো না।তমার হাত থেকে ব্যাগদুটো নিয়ে নিজের প্যাকেটে উঁকি দিলো।উটে বসে বের করলো পিংকিশ শাড়িখানা।খুবই সুন্দর একটা শিফনের শাড়ি।বেশ দামি।
____”তুই টাকা কোথায় পেলি হুম?”
____”আমার জমানো টাকা। “
তিতির ভ্রু কোচকায়।
____”আমি গিফট চেয়েছি?কেনো।অযথা টাকা খরচ করিস।”
তমা গিয়ে আগলে ধরে বোনকে।শুকনো চুমু খায় তিতিরের নরম গালে,
____”তুইযে আমাকে প্রতিবার দিস তারবেলায়!হু?এটা তোদের বিয়ে প্লাস ঈদ গিফট।অতো কথা শোনাস না তো আমাকে।”
তিতির হাসে।শাড়ি টা খুলে ধরে।তার খুব পছন্দ হয়েছে।
____”খুব খুব খুব সুন্দর কিন্তু। ঈদের দিন আমি আগে এটাই পড়বো।”
তমা ব্যাস্ত হয়ে দু হাত সমানে তোলে,আর্তনাদ করে ওঠে,
____”না ভাই মাফি…আগে আমার টা পরে আমাকে ফাঁসির আসামি বানাবেন না দেওয়ান বধূ।আমার ভাইয়ের দেওয়া জিনিসই আগে পরিধান করবেন দয়া করে।”
তিতিরের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।বাঁকা গলায় বললো,
____”আপনার ভাইয়ের দেওয়া উপহার সম্ভবত এ জীবনে আমার গায়ে উঠবে না দেওয়ান কন্যা।”
মুখ বাকায় তমা।গম্ভীর গলায় বলে,
____”তোরা দুজনেই অসহ্য।কেউ কাউকে একচুল ছাড় দিতে রাজি নোস।”
____”আমার দোষ?,”
থমকায় তমা।নাহ তিতিরের দোষ নয়।আবার ঈশানকেও এক তরফা দোষ দিতে খারাপ লাগে তার।স্পষ্ট দেখতে পায় দুজনের চোখে একে-অপরের জন্য কিছুএকটা।অথচ কেউ মাথা নোয়াতে নারাজ।তমা ব্যাস্ত হয়ে থামায় তিতিরকে,
____”এসব বাদ।যেটার জন্য এত জরুরি ভাবে আসা।সন্ধ্যায় ইফতার পার্টি আছে আমার কলেজে।গেট টুগেদার বলতে পারিস।তুই যাবি কিন্তু।”
দুদিকে মাথা নাড়ে তিতির।মুখ মলিন করে বলে,
____”অসম্ভব দোস্ত। আমার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা।সম্ভবই নয়।”
তমা মানতে নারাজ।সে যেকোনো মূল্যে তিতিরকে নিয়েই যাবে।
____”পারমিশন লাগবে?আমিই নেবো।বড় ভাইয়া বাদে যার থেকেই নিতে বলবি এক্ষুনি নিয়ে আসি গিয়ে।তুই শুধু হ্যা বল।”
রাহেলাও এসেছে এসময়।তমার মুখে সব শুনে সেও রাজি হলো।তিতির কে বললো যেতে।মেয়েটা একদম বাড়ি থেকে বের হয়না।তমার জোরাজোরি তে কাঁধ ঝাকায় সে।উদাস গলায় বললে,
____”আচ্ছা যাবো যা। “
রেস্তোরাঁ বন্ধ কেবিন রুমে গুমোট পরিবেশ এ বসা নূরি।সামনে নির্বিকার ভাবে বসা ইয়াজ।বাইরে যেখানে সেখানে দেখা করা মোটেই নিরাপদ নয়।তাই তাদের চিরায়িত সেই জায়গা যেখানে এতবছর দেখা করে এসেছে তারা।
সামনের মানুষ টা এসেছে প্রায় ঘন্টা হতে চললো।একটা শব্দও করছে না।নূরি বিরক্ত হয়।
____”তুমি কি চুপ করে থাকার জন্য এতদূর জার্নি করে এসেছোআমার ভার্সিটি মিস দেওয়ালে!”
ইয়াজ মাথা তোলে নূরির দিকে।করুন গলায় বলে,
____”বলো।,
____”আমি বলবো!বলবে তো তুমি।কোথায় ডুব দিয়েছিলো এই কয়দিন জবাব দাও।”
____”কাজের প্রচন্ড চাপ।তাছাড়া ফ্যামিলি…
নূরি রেগে কিছু বলতে গিয়েও বলেনা।এতগুলো বছরের সম্পর্ক তাদের।টেনেটুনে চলছে। শুধুমাত্র মেয়েটা সে বলে!ইয়াজ তাকে ভালোবাসে,তাতে কোনো সন্দেহ নেই।কিন্তু এতো ইফোর্টলেস সম্পর্ক কতদিন টেকানো যায়।
____”ইয়াজ!কি চাও তুমি আমার থেকে জানতে পারি?আর কি কি দেবো তোমাকে বলো।”
ইয়াজ দু হাতে মুখ ডলে।গম্ভীর গলায় বলে,
____”মানসিক প্রেশার এ আছি নূরি।”
নূরি বিরক্ত হয় এবারে।
____”তোমার মানসিক শান্তির জন্য আমি কি না করলাম।সব দিতে বসেছিলাম।উঠতে বসতে বলো আমাকে কাছে চাই।বিয়ে তো হবেই এক দু মাস পর।এখনই তোমার আমাকে চাই।হাজার দ্বিধা দন্ব কাটিয়ে নিজেকে সমর্পণ করতে চাইলাম তোমার কাছে। পরিবার,আত্মসম্মান, সমাজ… আবেগের বশে সবের ঊর্ধ্বে গিয়ে বললাম চলো লুকিয়ে বিয়েটা করে রাখি।তারপর যা চাও,যেভাবে চাও দিচ্ছি।।তারপরও একই কথা তোমার!বিয়ের আগে এসবে প্রেশার দিলে আমি কতটা মানসিক চাপে থাকি,অপরাধবোধ এ ভুগি জানো?”
ইয়াজ যেনো অবাক হয়। অবাক গলায় বলে,
____”আমাকে ভালোবেসে আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে চাওয়াকে তুমি আবেগ বলছো!পাপ বলছো?”
____”পাপ নয়? বিয়ের আগে এসব পাপ লাগে না তোমার কাছে!!ধর্ম মানো না?মানো তো নাকি তাহলে সেদিন তোমার জোরাজোরি তে যদি যদি শেষ মূহুর্তে বাধা না দিতাম কি হতো ভাবতে পারছো…
কথাগুলো বলে থমকায় নূরি,চোখের সমানে ভেসে ওঠে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ঘটনার দৃশ্যপট…ইয়াজের সেদিনের জোরজবরদস্তি! কেমন হুহু করে ওঠে নূরির বুকটা।একে একে পরিবার এর সবার মুখ ভাসে চোখের সমানে।উঠে দাড়ায় আচমকা।
____”এখানে থাকছো কদিন?”
____”তিনদিন এর ছুটি।”
____”আজ আসি।শরীর খারাপ লাগছে। কাল শেষ দেখা করতে পারবো।আমার ছুটি আজই শেষ।কিছু একটা বলে কাল ম্যানেজ করতে পারবো।”“
ইয়াজ কিছু বলার আগেই বেড়িয়ে আসে নূরি।রিকশা ডাকে।আজও গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছেনা।ঈশান নিশ্চিত রাগারাগি করবে।হঠাৎ শরীর খারাপ লাগছে তার।কেমন একটা অনূভুতি। সেদিনের ঘটে যাওয়া ভুলটা ক্ষতবিক্ষত করে তাকে রোজ।আচ্ছা সেদিন ওটা ইয়াজ না হয়ে অন্য পুরুষ হলে কি বলতো সে!রে***!তাহলে বাধা দেওয়ার পরও ইয়াজ যখন একই কাজ করতে চেয়েছিলো, তবুও লোকটাকে ছাড়তে পারছে না কেনো সে।ভালোবাসে বলে়?ভালোবাসলে মন সকল যুক্তির উর্ধ্বে যায় বুঝি!পাপ,অন্যায় এরও উর্ধ্বে!
নূরির শরীর থরথর করে কাপে।ইয়াজ কে ছাড়ার কথা ভাবতে পারতে না সে।এখন তো আরও না।তার সবকিছু যে পুরুষের কাছে সমর্পিত প্রায়… না না, জোর করে সমর্পণের চেষ্টা করানো হয়েছে তাকে। সে ছাড়তে পারছে না।এতগুলো দিনের সম্পর্কের দোহাই দিয়ে ইয়াজ তাকে ছুঁয়েছে, জোর পূর্বক ছুঁয়েছে।তবে গভীর ভাবে ছোঁয়ার আগেই বোধদয় হয় নূরির,বাধা দিয়ে বসে।কোনোমতে নিজের শেষ সম্বল টুকু হেফাজত করেছিলো সে। তবে বিয়ের আগেই কোনো পুরুষের ছোঁয়া তার শরীরে।এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত কি ইয়াজকে বিয়ে করলেই মুছবে!কখনো না।খোদার হিসেবে পাপ এটা।ভয়াবহ পাপ।দীর্ঘশ্বাস ফেলে নূরি।মাঝেমধ্যে মনে হয় মৃত্যু কিন্তু ঢের সহজ!
অফিস শেষে বাইক হাকিয়ে বাড়ি ফিরছে নাইম।অফিস ছুটি হবে ঈদের একদিন আগে।কালকে সম্ভবত সব বন্ধুবান্ধব রা ছুটিতে চলে আসবে।অথচ তার এখনো ছুটি হওয়ার নামগন্ধ নেই।এবারে সেই যে রোজার দু একদিন আগে বৃষ্টি হলো গোটা রমজান পার হয়ে গেলো আর বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই।শহুরে রেশ কাটিয়ে গ্রামের পথে বাইক ছোটাতেই সামনে অতি চেনা একজন চোখে পরলো।মেইন রাস্তা থেকে দক্ষিনে তাদের এলাকার রাস্তা।আসেপাশে বিস্তর ক্ষেত,পুকুর,কিছুদূর পরপর বিশাল বিশাল বট,অশ্বথ গাছের সমারোহ।মনোরম পরিবেশ।পিচ ধালাই করা পাকা রাস্তা,একটা কার যাওয়ার মতো প্রশ্যস্ত।
তবে নূরি এই গরমের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে।এক হাতে সময় দেখলো নাঈম।সাড়ে তিনটে বাজে।বাইক জোরে টেনে এসে দাড়ালো নূরির পাশে।আচমকা পাশে গাড়ি আসায় চমকে ছিটকে গেলো নূরি।ভয় পেয়েছে মেয়েটা।ধমক দিয়ে কিছু বলতে যাবে তবে নাঈম কে দেখে আটকে গেলো গলায়।বড় ভাইয়ার বন্ধু, বয়সে তার থেকে ঢের বড়।বেয়াদবি করে ফেললে সর্বনাশ।তবে মোটেই খুশি হলো না নাঈম কে দেখে।লোকটাকে তার পছন্দ না।একফোঁটা পছন্দও না।অসহ্য লাগে বলতে পারা যায়।নূরি কিছু বলার আগে শোনার গেলো নাঈমের গলা,
____”এই রোদের মধ্যে রোজা রেখে হেঁটে যাচ্ছো কেনো!গাড়ি কই?”
মেজাজ খারাপ হয় নূরির।মনে পরে এর আগে একদিন লিফট দিয়েছিলো এই লোক তাকে।সে সেদিন ইয়াজ এর সাথে দেখা করবে বলে ভার্সিটি থেকে দূরে নেমেছিলো।লোকটা ঈশানকে বলে দিয়েছিলো সে কথা।আজকেও নিশ্চিত একই কাজ করবে।তবে সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলে,
____”আমার কিছু কাজ ছিলো। পারসোনাল। তাই ভার্সিটি আগে শেষ হওয়ায় বেরিয়ে এসেছি।গাড়ি নিশি আপুকে নিয়ে আসবে।”
এ নিয়ে আর দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো না নাঈম।নরম গলায় বললো,
____”গরমের মধ্যে এখনো বেশ খানিকটা পথ।উঠে এসো।”
নূরি পরখ করলো বাইকটা। বিনয়ের সাথে মাথা নাড়লো,
____”দরকার নেই ভাইয়া।আপনি যান।চলে যেতে পারবো আমি।”
____”তোমার ভাইয়ের আদেশ এটা।পারমিশন আছে ওর। এসো ভয় নেই।”
এইযে সমস্যা সবাই জানে সে কি পরিমাণ ভয় পায় ঈশান কে।সবাই বোধহয় সেই সুযোগ টাই কাজে লাগায়।কিছু হলেই ঈশানের কথা তুলতে হবে তার সামনে।তবুও উঠে আসে না সে।আমতা আমতা করতে থাকে।ব্যাস্ত হয়ে এদিক ওদিক রিকশার খোঁজ করে।নাঈম স্থির দৃষ্টিতে দেখছে নূরিকে।মেয়েটর মুখজুড়ে এতো মায়া!এইযে গরমে ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গেছে মেয়েটা।চোখে হালকা করে লাগানো কাজল টা একটু একটু ছড়িয়ে গেছে,বারবার কপাল কুচকে রিকশার জন্য এদিকসেদিক করছে।কি সুন্দর লাগছে তাকে!নাঈম কাশে হালকা করে।নূরির মনোযোগ আকর্ষন করতে আরকি।
____”এই অসময়ে আমাদের এদিকে রিকশার আশা করা একটু বিলাসিতা হলো না?উঠে এসো।রোদে দাড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না।”
নূরি নিতান্তই অনিচ্ছার সাথে উঠে এলো বাইকে।ধরে বসলো না।
____”ধরে বসো।
“____আমার বাইকে বসার অভ্যেস আছে।চলুন।”
নাঈম মনে মনে হাসে।নিজের মাথার হেলমেট টা খুলে পিছনে বাড়িয়ে দেয়।নূরি খানিক অবাক হয়েই বলে,
____”আপনি পরুন।আপনার টা আমাকে দিচ্ছেন কেনো!”
____”আপনার কিছু হলে দেওয়ান সাহেব খুন করবে আমাকে। পড়ে ফেলুন ম্যাডাম।”
নূরির কথা বাড়াতে ইচ্ছে করে না।দ্রুত পরে ফেলে হেলমেটটা।আচমকা হুমড়ি খেয়ে এসে পরে নাঈমের ওপর।নাঈম খুবই বিনয়ের সাথে বলে ওঠে,
____”বলছিলাম ধরে বসতে।”
নূরি বিরক্ত ভঙ্গিতে সোজা হয়।এবারও ধরে না।নাঈম সামনে তাকিয়ে হেসে টান দেয় বাইক।
ঈফতারের বাকি আরও প্রায় পোনে দুই ঘন্টা।তমার এরইমধ্যে ফিটফাট হয়ে রেডি হয়ে এসে বসে আছে তিতিরের ঘরে।তিতির বড্ড ধীরস্থির হয়ে তৈরি হওয়ার জন্য জামাকাপড় বের করছে।তমার প্রাক্তন কলেজ তাদের বাড়ি থেকে দশ মিনিটের পথ।সর্বোচ্চ ত্রিশ,পয়তাল্লিশ মিনিট আগে পৌছুলে এনাফ।অথচ তমা তার বাড়িতে সেই তিনটা থেকে বসে আছে।তিতির এতো ঘসামাজা করে দেরি করছে তৈরি হতে মেয়েটার মধ্যে তবুও একফোঁটা বিরক্তির রেশ মাত্র নেই।বরং মহা আগ্রহে তিতির কি কি পরবে সেগুলো ঠিক করে দিতে ব্যাস্ত।নিশি নূরি দুজনেই ফিরেছে।এরইমধ্যে দু বার এসে এখানে গল্পও করে গেছে ওদের সাথে।এখন যথাসম্ভব নিচে মায়েদের সাথে ইফতার বানানোতে সাহায্যে ব্যাস্ত দুজন।অন্যদিন হলে তিতিরও থাকতো।
তিতির তৈরি হয়ে গেছে।বের হলো দুজন।সবার থেকে বিদায় নিয়ে বের হলো।বাড়ির গাড়ি নিচ্ছে না।পাঁচ দয় মিনিটের রাস্তার জন্য এমন বিলাসিতা করতে ইচ্ছে হয়না।হেটেই যাবে,দরকার লাগলে রিকশা নেবে।রাহেলা দেওয়ান ছুটে এলেন বউমার দিকে,
____”গাড়ি ছাড়া যাচ্ছিস মানে!ঈশান রেগে যাবে কিন্তু। “
____”তোমার ছেলে কি ইফতারে আসবে নাকি!তার তো আসতে ঢের রাত।আমি তো আটটার মধ্যেই চলে আসবো।”
মুখটা চিন্তিত হয় রাহেলার তবুও।মলিন মুখে বলে,
____”রাত হয়ে যাবে।তবুও…
____”মামনি!এতটুকুন এর পথ।কোনো সমস্যা হবে না।চিন্তা করো না কেমন।আসি?”
রাহেলা দেওয়ান শুকনো মুখে তিতিরকে আর বাধা দেয় না।ঈশান টা পৈ পৈ করে রোজ বলে যায় বাড়ির মেয়েদের যেনো কিছুতেই বাড়ির গাড়ি ছাড়া বাইরে যেতে না দেওয়া হয়।একা একা তো কক্ষনো না।কিন্তু তার একটা মেয়েও কথা শোনার বান্দা নয়।যার যখন ইচ্ছে হচ্ছে বেরিয়ে যাচ্ছে নিজেদের মতো।এই যেমন আজ নূরি ফিরলো গাড়ি ছাড়া,নিশি টা আরও পরে একা ফিরলো।তিতির, তমা যাচ্ছে এভাবে।ফিরতে রাত হবে।ঈশান যদিও রাতে ফেরে দেরিতে,বলাবাহুল্য বাড়ির প্রত্যেকটা পুরুষই বেশ রাতে ফেরে অফিস থেকে।তবুও শুধুতো তাদের ভয়ে নয়,সত্যিই নিরাপত্তার চিন্তা হয় মেয়েদের নিয়ে।আগে তো এতো চিন্তা হতো না।ঈশান ও কখনো এতো নিষেধ করতো না।পুরো এলাকা তাদের।এ এলাকার সবাই তাদের অত্যন্ত সম্মান করে।এ বাড়ির মেয়েদের দিকে চোখ তোলা তো দূর, কেউ কিছু বললেও নিজেদের মেয়ে,বোনের মতো আগলাতো।এখনও তাই।তবুও অন্য কিছুর শঙ্কা করে কি ঈশান!কি জানি।তিতির চোখের আড়াল হতেই সদর দরজা থেকে ভিতরে চলে আসে সে।রান্নাঘরে বাকি দু জা কাজ করছে।নূরি,নিশি ডাইনিং এ বসে ফল কাটছে।রাহেলা ধীরেসুস্থে এসে বসলেন মেয়েদর পাশে।গলা নামালেন,
____”,ঈশান তিতিরের কিছু হয়েছে?জানিস তোরা?”
আৎকে উঠলো দুজনেই।আচমকা এমন প্রশ্নে চমকে গিয়েছে। রাহেলা দুই মেয়ের চমকানো লক্ষ করলেন।ভ্রু জোড়া তুললেন,
____”কি রে।হয়েছে?”
নিশি দু পাশে মাথা নাড়লো।ব্যাস্ত গলায় বললো,
____”নাহ কি হবে!ঠিকই তো আছে।”
রাহেলা দেওয়ান মুখ দ্বিগুণ গম্ভীর করলেন।
____”আমাকে বোকা মনে হয় তোমাদের? মা আমি তোমাদের। নাড়ি নক্ষত্র আয়ত্তে আমার।তোমরা কি করো,করতে পারো, বলো, ভাবছো একটু হলেও টের পাই আমি।গোটা রমজান পার হয়ে গেলো।তিতির ঈশানের বিয়ের ঠিক এক মাস আজকে।তোমাদের কি মনে হয় ওদের দুরত্ব আমি খেয়াল করিনি। হ্যা?দু দিন হলো তো রাতেও তিতিরকে নিজের রুমে দেখি আমি।”
চমকে উঠলো দুজনেই।কারণ তাদের ঘোর ধারনা ছিলো ঈশান তিতিরের আলাদা থাকার বিষয়টা জানা নেই কারোর।তাদের মা এরইমধ্যে টের পেয়ে গেছেন।
____”সেরকম কিছু না মা।তিতিরের শরীরটা খারাপ।ভাইয়া আসার আগে নিজের রুমে থাকে।ঘুমিয়ে যায় হয়তো।ভাইয়াও আর জাগায় না।আমি আজ বলে দেবো আগে না ঘুমাতে।”
রাহেলা গম্ভীর গলায় বলে ওঠেন,
____”কিচ্ছু বলতে হবে না তোমাদের। আর এক দু দিন দেখবো আমি।তারপর যা বলার,আর করতে হয় আমিই করবো। “
নিশি, নূরি মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।তিতিরকে সতর্ক করে দিতে হবে আজকেই।
অফিসের কাজে আজকাল গলা অবধি ডুবে থাকতে হয়।অন্যদিক সামাল দেওয়ার একট বিষয় তো আছেই।মাথা প্রচন্ড গরম থাকে সবসময়।কেমন একটা মানসিক অশান্তি তে থাকে ঈশান।মনোযোগ সহকারে একটু আগে আসা ফাইলগুলোতে চোখ বুলাচ্ছে সে।দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন রাইসুল দেওয়ান।বাবা কে দেখে চোখ তুলে তাকালো ঈশান।ফাইলখানা বন্ধ করলো।
____”বাবা, এসো…
রাইসুল দেওয়ান গম্ভীর মুখে এগিয়ে গিয়ে ছেলের মুখোমুখি বসলেন।
____”ব্যাস্ত আছো?”
____”না বলো।,
রাইসুল দেওয়ান কি বলবে ভাবলেন হয়তো।গুছিয়ে নিয়ে আসা কথাগুলো এলেমেলো ঠেকলো।
____”বাবা…বলবে কিছু?”
ঘোর কাটলো রাইসুল সাহেবের।
____”উমমম হু।বলবো।”
ঈশান অধীর আগ্রহে তাকালো বাবার কথা শোনা র জন্য।
____”তুমি কি কিছু লুকাচ্ছো ঈশান?”
____”কি লুকাবো!”
____”আজকেও খানিকপর বের হবে নিশ্চয়? “
ঈশানের মুখ এবার গম্ভীর হলো।হেলান দিলো চেয়ারটায়।ছোট্ট করে বললো,
____”হুম।”
____”আমি প্রথমে ভাবলাম বাড়ি যাও তুমি এসময়।পরে তোমার মা বললো তুমি একেবারে সেই রাতেই ফেরো।অফিস থেকে তুমি চলে যাও সন্ধ্যের আগেই।কখনো বা দুপুরে! “
ঈশান সোজা হয়ে টেবিলের ওপর দু হাত রেখে বসলো,
____”বাবা,ক্লাস টুর বাচ্চাকে জেরা করার মতো হলো না বিষয়টা?ছোটবেলায় মাঠ থেকে খেলে ফিরতে দেরি হলে তুমি এহেন জেরা করতে।”
রাইসুল সাহেব বিরক্ত হন ছেলের হেয়ালি তে।মুখ কঠিন করে বলে,
_____”ঢাকা তে তুমি কি জব করতে?হঠাৎ সেটা ছাড়লে কেনো!”
ঈশান জবাব দেয় না।ফাইল টা বাবা দিকে এগিয়ে নিজের স্যুট টা হাতে ঝোলাতে ঝোলাতে দরজার দিকে এগোয়।ঘাড় বাঁকিয়ে বলে,
____”টেরোরিস্ট ছিলাম না বাবা।”
____”বাবা হয়ে জিজ্ঞেস করাটা আমার অপরাধ?তোমার চাকরি কি ছিলো”
____”মোটেই না।করতেই পারো জিজ্ঞেস। “
____”তাহলে! আজীবন নিজের মর্জি মতো চললে।কখনো আমার কথা শোনার প্রয়োজন বোধটা করলে না।”
____”তোমার ইচ্ছে ছিলো বিজনেস জয়েন করলাম সেটা.।.তোমাদের ইচ্ছে হলো ধরে বেধে বিয়ে করাবে।সেটাও করলাম…বাড়িতে সেটেল হতে,হলাম..।আর কি করতে বলছ?”
____”দ্রুত বাড়ি ফিরবে এখন থেকে।যতদূর জানি তোমার বন্ধুরা কেউ নেই এখানে।আড্ডাতেও যাওনা।তাহলে! “
____”বাবা আসি দেরি হচ্ছে। “
ঈশান দাড়ায় না আর।আর না তো অপেক্ষা করে রাইসুল দেওয়ান এর কোনো কথা শুনতে।ছেলের একগুঁয়েমি তে বিরক্ত রাইসুল সাহেব।সামান্য কথাটা ত্যাড়ামি ছাড়া জবাব দেয়না।দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে।
ঈশান গাড়ি এসে থামলো একটা পুরাতন ভবনের সামনে।শহর থেকে প্রায় আটত্রিশ কিলোমিটার উত্তরে এটা।শহুরে কোলাহল, লোকসমাগম থেকে বেশ দূরেই এটা।ভিতরে ঢুকতেই এগিয়ে এলো তিন চারজন ব্যাক্তি।ঈশান কথা বললো না।সে মানুষ গুলোও ইশারা করে কিছু দেখালো।কথা বাড়ালো না।ঈশান বসতেই।একজন এগিয়ে দিলো ফোন।ফোন স্ক্রিনে চলমান কিছু থেকে ভ্রু জোড়া কোচকালো ঈশানের।গম্ভীর গলা বললো,
____”কবের এটা?”
____”আজকে।”
____”মুখ স্পষ্ট নয় কেনো!”
____”পজিশন ঠিক ছিলো না।”
____”স্টুপিড।”
মুখ কুচকে যায় লোকগুলোর।মাগরিব এর আজান পরেছে এই মাত্র।ইফতারের বেশ কিছু আইটেম রাখা ভাঙ্গা টেবিলটায়।ঈশান মুখে তুলে নিলো সেগুলো।বাকিরাও তাই।সময় নিয়ে বললো,
____”বডি কোথায় রাখা?”
____”এটার তিনতলাতে।”
____”থাকুক।”
বাকিসময় আর একটা কথাও হলো না গোটা রুম জুড়ে। একদম চুপচাপ,নিরব ঘরের ভিতরটা।তবে আশেপাশের জঙ্গলের পশুপাখিগুলোর মধ্যে চুপ থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে দেখা গেলো না।শরীর হীম করা শব্দ একেকটার।ঈশান উঠে দাড়ালো।সাথে সাথে বাকিরাও।পকেটে হাত গুজে বরাবর এর মতো ভারি গলা বললো,
____”এখানে স্টে করার দরকার নেই।পুলিশ জঙ্গল রেড দিলে মারা পরবে।বডি এখানে থাকুক।”
হাত বাড়িয়ে একট চিরকুট হাতে ধরিয়ে দিলো সে।
____”এই লোকেশন এ চলে যাও।সকালে এসে বডি সরাবে।”
মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানায় সবাই।আজকে ঈশানের বেশ ক্লান্ত লাগছে। সারাদিন প্রচুর ধকল গেছে অফিসে। বাড়ি ফিরবে তাড়াতাড়িই আজকে।আগেই ঠিক করে রেখেছে।সেখান থেকে বেড়িয়ে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে মনে মনে হাসলো ঈশান।বাবা আজকে খুশিই হবে,তাড়াতাড়ি ফিরেছে বলে!গাড়ি চলতে শুরু করেছে।জঙ্গলের এড়িয়া পেরিয়ে মেইন রোডে উঠতেই কাচ নামিয়ে দিলো গাড়ির।বুকের ভিতরটা আজকাল বেশ অস্থির থাকে তার।কিছু একটা নেই নেই মনে হয়।সেদিন মায়ের কাছে শুনছিলো তিতিরের ছুটি শেষের দিকে।ঈদের পর সম্ভবত আর দশ দিন থাকবে!সে হিসেবে আর পনেরো -ষোল দিন ছুটি!তিতিরের সাথে কথা হয়না প্রায় বিশ-বাইশ দিন হবে।মেয়েটা দূরে চলে গেছে তার।ভুল করেও একটা শব্দ উচ্চারণ করে না তার সাথে।
সেও প্রয়োজন বোধ করেনি।তবে আজকাল আবার সেই সুপ্ত বাসনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।আকড়ে ধরতে মন চায় মেয়েটাকে,জাপটে বুকের ধরে বুকের জ্বালাপোড়া কমাতে মন চায়!মেয়েটার রাগ,অভিমান,অভিযোগ শুনতে মন চায়,ওকে বকতে মন চায়।গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিতে মন চায়।দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশান।অবাস্তব সব চাওয়া এগুলো।কোনো কারণ নেই,তবুও এসবই মনে হয়!সে তো এমন ছিলো না।আবেগ,অনূভুতি তে মিশে মাথা গোলানো মানুষ তো সে না।তার প্রফেশন এর সাথে এসব যায়না।এখানে আবেগের জায়গা নেই।একদম নেই।আজীবন তার জগৎ থেকে আলাদা রাখতে চেয়েছে সে তার পরিবার কে।আজকাল সব অগোছলাো লাগে।এই যেমন আজকে!আগে হলে কি সে আজকের দিনের একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ রেখে সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়!অজান্তেই হাতের নিচে ধরা স্টিয়ারিং এর বাধন শক্ত হয়।মুখের আদল পাল্টায়।
ঈশান বাড়ি ফিরেছে আজ জলদি।অন্যদিন হলে খুশিতে বাড়ি মাথায় তুলতেন রাহেলা দেওয়ান।আজ তা করলেন না।ভয়ে মিশে গেলেন।গেটে ঈশানের গাড়ি দেখে ছুটে এসে তাদের খবর দিয়ে বাড়ির কাজের বুয়া টা।রাহেলা শুকনো মুখে হাক ছাড়লো নিশি কে।নিশি বিছানায় গা এলিয়ে নিয়াজের সাথে প্রেমালাপ এ ব্যাস্ত।মায়ের এহেন চিৎকার এ ফোন ফেলে ছুটে এলো দোতলার করিডরে।ওখান থেকেই সেও একই স্বরে চেঁচালো।
_____”হলো টা কি।”
রাহেলা ঘামছে দরদর করে।শাড়ির আচলে মুখটা মুছে বললো,
____”ঈশান এসেছে…তিতির…”
মুখ চুপসে ফাটা বেলুন হয়ে গেলো নিশির।বড় মায়ের হাকডাকে ঘর থেকে বেড়িয়েছে নূরিও।বোনের পাশে এসে দাড়িয়েছে।চোখাচোখি হলো।কিয়নক্ষন সময় লাগলো মায়ের কথা বুঝতে।মাথায় ঢোকা মাত্র ছুটলো নিজের রুমে।তিতিরকে কল করতে।তিতির কল তুলছে না।ইফতার পার্টি তে প্রচুর মানুষ জন।তমাদের ইয়ারের একটা ছেলেমেয়েও বাদ নেই আজকে আসতে।ইফতার করে ডিনার সার্ভ করা হচ্ছে টেবিলে।এতো হৈ হৈ এর মধ্যে ভাইব্রেট করা ফেনের কাপুনি মোটেও খেয়াল হলো না তিতিরের।নিশি চিন্তিত মুখে নূরির দিকে তাকালো।
____”তমা কে কল করো আপু।”
নিশি একই গতিতে কল লাগালো তমাকে।একই ঘটনা।কেউ ফোন তুলছে না।দু বোন ছুটে বেড়িয়ে এলো করিডরে।নিচতলায় মা এখনো ওপরের দিকে অসহায় দৃষ্টি তে তাকানো।নিশি, নূরি দু দিকে মাথা নাড়িয়ে জানালো পায়নি।কপাল চাপড়ালেন রাহেলা।নয়ন টাকে যে কল করে নিয়ে আসতে বলবেন সে উপায় নেই।নয়ন গিয়েছে ঢাকা অফিসের কোনো এক কাজে।সুতরাং আজকে তিতিরের খবরই আছে।দু জা এসে গুটিসুটি মেরে দাড়িয়েছে রাহেলার পাশে।রিক্তা ফিসফিস করে বললো,
____”জিজ্ঞেস করলে বলবে মাথা যন্ত্রণা করছিলো খায়িয়ে ঘুম পারিয়ে দিয়ে এসেছো। রুমে যেতে নিষেধ।”
মুক্তা কনুই দিয়ে ধাক্কা দেয় মেজো জা কে।
____”ছেলে সেটা মানবে!সামান্য মাথাব্যথার জন্য বউ রাখবে অন্য রুমে!”
মুক্তার বাঁকা কথায় অন্য সময় হলেও হাসতো বাকিরা।আজ হাসলো না।কারণ তারাও জানে কতটা সিরিয়াস ভাবে তিতিরের বা কোনো মেয়ের একা বাইরে বের হওয়া নিষেধ করেছে ঈশান।আর রাতে বেড়িয়েছে জানলে!আতঙ্কিত হয় তিনজনই।
হাতে কালো ব্যাগটা নিয়ে ক্লান্ত শরীরে সদর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে ঈশান।ড্রয়িং রুমে সারি বদ্ধ হয়ে মা চাচিদের দেখে চোখ কোচকায়।ওপরে একই ভাবে তাকিয়ে আছে নিশি,নূরি!তবে এতো কিছু ভাবলো না সে।রাহেলা এগিয়ে এলেন,
____”আজ এতো তাড়াতাড়ি যে বাপ?”
____”খুশি হওনি মনে হচ্ছে। “
দাতে জিব কাটে রাহেলা ব্যাস্ত গলায় বলে,
____”এ বাবা। এটা কি কথা।আমার বাপ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে।আমিও তো সেটাই চাই।যা ঘরে যা।ফ্রেশ হয়ে আয়। কি না কি দিয়ে ইফতার করেছিস।একেবারে ডিনার করবি আয়।”
ঈশান মাথা ঝাকিয়ে সিড়ি দিয়ে ওপরে ওঠে।একনজর এদিক সেদিক তাকায়।সোফা,কিচেন,নিচতলায় কোথায় তিতির এর অস্তিত্ব নেই।ঘরে বোধহয়। ভাইয়ের আসা দেখেই ঘরে ঢুকে গেছে নিশি,নূরি।
সময় নিয়ে কোল্ড শাওয়ার নিয়ে বের হলো ঈশান।শরীরটা ভার ভার লাগছে আজকে।ম্যাজম্যাজ করছে।জ্বর আসবে নাকি!খিদে পায়নি।তবে খেতে যাবে সে এখনই।বাড়ির সবাই এখনি বসবে হয়তো খেতে।ইফতারের পর রাতের খাবার জলদিই খাওয়া হয় তাদের বাড়িতে সচারাচর। মন ছটফট হয়ে আছে অন্য কারনে।মনে মনে খানিকটা মেজাজ খারাপ হলো তার নিজের ওপরে।মনটা বেহায়া হয়ে বসে আছে আজকাল।ভালো লাগে না একটা কাঙ্খিত মুখ না দেখলে।পাতলা শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে আসে ঈশান।খাবারদাবার টেবিলে সাজানো।রিশা,রোশনি,রাফি সুন্দর মতো বসে গেছে সামনে প্লেট নিয়ে।যদিও কয়েক লোকমা মুখে দেওয়ার পর বায়না জুড়বে খায়িয়ে দিতে।তখন সেই খাইয়েই দিতে হবে।তারপরও আগে বায়না জোরে এমন।
ঈশানকে দেখেই লাফিয়ে ওঠে তিনজন।ঈশান হাত বুলিয়ে দিলো তিনজনের মাথায়।পকেট থেকে বের করলো চকলেট।ধরিয়ে দিলো তিনজনের হাতে।হুড়মুড়িয়ে নিশি,নূরি এসে বসলো। অন্য দিন হলে বড় দুটোও একই ভাবে হাত পাততো চকলেট এর জন্য। ঈশান অবশ্য এনেছে ওদের জন্যও।আজ গম্ভীর দেখে অবাকই হলো খানিকটা।দুটোর মুখই শুকনো।ঈশানের কপালে ভাজ পরলো। নূরিকে পরখ করলো বিশেষ ভাবে।পকেট থেকে তিনটে চকলেট বের করে হাতে দিলো দুজনের।আজ একটা চকলেট বেশির কারন বুঝলো না প্রথমে ওরা।রাফি ওই চকলেট টা এক্সট্রা মনে করে কেড়ে নিতে গেলেই ঈশান খানিক শব্দ করলো।থেমে গেলো বেচারা।নিশি, নূরি ততক্ষণে ধরে ফেলেছে।ভাইকে কিছু না বললেও রাফিকে বাকা গলায় বললো,
____”তোর বার্বির জিনিসে কবে থেকে নজর দেওয়া শুরু করলি রাফি। হ্যা?”
রাফি বোধহয় অবাকই হলো।এটা বার্বির তা কখন বললো তাদের বড় ভাইয়া।
____”ভাইয়া তো একবারও বললো না সেটা।”
রিশা ধমকে ওঠে ভাইকে।বড়দের মতো করে বলে ওঠে,
____”ভালোবাসার জিনিস কি বলে বলে দেয় গাধা?খাবার খা।”
কেশে ওঠে ঈশান।মিটিমিটি হাসছে বাড়ির সকলে।ঈশান খাওয়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করে।সবাইকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ম্যাডামকে বাদে।ঈশানের পাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন রাহেলা চিন্তিত মুখে।মনে মনে বারবার আল্লাহ কে ডাকছেন ঈশান যেনো তিতিরের খোঁজ না করে।আর এইসময় তিতির যেনো বাড়িতে না ঢোকে।তবে হলো না সেটা।দু লোকমা মুখে তোলার পর ঈশান ভ্রু কুচকে তাকালো মায়ের দিকে।
_____”তোমাদের নবাব নন্দিন কই।দেখছি না তাকে।”
আৎকে উঠলো বাড়ির সকলে।মুখ শুকিয়ে এলো সকলের।মিথ্যা কথা কি করে বলবেন অবলীলায়…মুখ নিচু করে খেয়ে যাচ্ছে নিশি, নূরি।কাউকে জবাব না দিতে দেখে একই প্রশ্ন পুনরায় করলো ঈশান,
____”কি হলো।”
ঝটপট একটা মিথ্যা বলে বসলো নূরি।
____”ঘুমিয়ে গেছে ও।”
ঈশান মাথা তুলে তাকায়।এ বাড়ির সবার মিথ্যা ধরে ফেলতে পারে তার অভিজ্ঞ চোখ।গ্লাস হাতে নিলো।তবে তা নিজে খেলো না।নূরির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
____”আমার সামনে অন্তত মুখটা সামলা।নাকি?”
চুপসে গেলো সে।তবে এই মূহুর্তে লাফিয়ে উঠলো রাফি।সে তো জানে জবাব টা।ভাইকে সঠিক জবাব টা দিয়ে বাহবা কামানোর সুযোগ সে মোটে হাতছাড়া করতে চাইলো না।উচ্ছসিত কন্ঠে জবাব দিলো,
____”বার্বি তো তমাপুর সাথে পার্টিতে গেছে।”
চোখমুখ খিচে বন্ধ করে নিলো সকলে।মুক্তা পিছন থেকে চেপে ধরলো ছেলের মুখ।রাফি তখনও ছটফট করে ঈশানকে বাকি কথাটুকু জানাতে ব্যাস্ত।ঈশান এর হাত থেমে গেলো।চামচ নামিয়ে তাকালো মায়ের দিকে।গম্ভীর গলায় বললো,
____”তিতির কোথায়।কিসের পার্টি?”
রাহেলা ব্যাস্ত হলেন।জলদি বললেন,
____”পার্টি না বাপ।ইফতার পার্টি। ওইযে তমার কলেজের আরকি…”
চুপ করে গেলেন রাহেলা।ঈশানের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেছে।বাড়ির ঢোকার সময় সবগুলো গাড়িই দেখেছে পার্কিং এ। তারমানে গাড়ি নিয়ে যায়নি।ঘড়ির দিকে তাকালো সে।পোনে আটটা বাজে।শব্দ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো।রাহেলা এসে আকড়ে ধরলো ছেলের হাত,
____”রাগ করিস না মেয়েটার ওপর বাপ।যেতে চাচ্ছিলো না।আমিি জোর করে পাঠিয়েছি।সামান্যই দূর।এসে পরবে।তুই খাওয়া ছেড়ে উঠলি কেনো।খেয়ে নে।ও চলে আসবে।”
সাঁঝের মায়া পর্ব ২৮
ঈশানের মুখ রক্তিম আবায় ছেয়ে গেছে রাগে।হাজার একটা চিন্তা ঘোরে মাথার ওপর।বাড়ির সব জেদি,একরোখা মেয়েগুলোকে নিয়ে সে পরেছে ডাবল বিপদে।একজনও কথা শোনে না তার।মায়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দ্রুত ওপর থেকে গাড়ির চাবি নিয়ে নামে।বাইক নিয়েই যেতো।তবে তমা ও আছে সাথে।অগত্যা অল্প পথ হলেও গাড়ি নিয়ে যাবে সে।রাহেলা ছেলেকে আটাকতে গেলো।শুনলো না সে।গটগট করে বেড়িয়ো গেলো বাড়ি থেকে।দীর্ঘশ্বাস ফেললো বাড়ির সকলে।নূরি নিজের খাবার প্লেটে র দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললো,
____”আজ আবার চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ লাগলো বলে।বড় মা তোমার বউমা আজকে শেষ।”
ভয়ে চোখ বড় বড় করে রাহেলা তাকিয়ে আছে দরজার দিকে।আসলেই বোধহয়.।
