সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৩ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
রাত শেষের দিকে। নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে চারিপাশ। মৃদু ড্রিম লাইটের নীল আলো জ্বলছে তিতিরের গোটা ঘরজুড়ে । নিশির ঘর থেকে মুভি দেখে খানিকক্ষণ আগেই নিজের রুমে এসেছে । ও ঘরে একসাথে ঘুমানোর কথা থাকলেও নিজের রুমে আসতে হয়েছে । অনেক কষ্টে ঘুম ধরেছে সবেই । পিরিয়ড এর পেইন এ ছটফট করছিলো একপ্রকার । ঘরে ওষুধ নেই । নিশি,নূরি ঘুমিয়ে পরেছে। তাছাড়া এটা কাউকে ডাকাডাকি করার সময় নয় একদমই। অগত্যা সকাল অবধি সহ্য না করা ছাড়া আর উপায় কি!
রুমের এসি বন্ধ । মাঝারি গতিতে সিলিং ফ্যান টা ঘুরছে। আবহাওয়া বোশ ঠান্ডা এখন । জানালা খুলে রাখা । কেমন একটা দম বন্ধ লাগছিলো । ওপাশে বারান্দার কাচ টাও বেশ খানিকটা খোলা । সেখান দিয়েও হুড়মুড়িয়ে ঢুকছে বাতাস । সদ্য ঘুমানো মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই পিটপিট করে উঠলো তিতিরের চোখজোড়া । নড়েচড়ে উঠলো গোটা শরীরই । স্বপ্ন দেখছে মেয়েটা ।
একটা তারই বয়সী মেয়ে । হাতে লাল গোলাপ নিয়ে রাস্তার ওপাশে দাড়ানো । আর একটা সাদা গাড়ি । ধেয়ে আসছে তারই দিকে । তিতির ছটফট করে উঠলো । ছুটে পালাতে চাইলো । কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার পা নড়ছে না। সে আটকে আছে সেখানেই । তবে গাড়ি টা তাকে ধাক্কা দিলো না । একদম মুখোমুখি এসে গাড়ির গতি মোড় নিলো দক্ষিণ দিকে । তিতির চিৎকার করতে গিয়েও পারলো না । গলাও যেনো কেউ চেপে রেখেছে । ভয়ার্ত মুখে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটা তীব্র বেগে গিয়ে ধাক্কা দিলো রাস্তার ওপাশে ফুটপাতে দাড়িয়ে থাকা ওই মেয়েটাকে । চোখের পলকে দেখা গেলো রক্তে ভেসে একাকার হয়ে যাওয়া রাস্তা। গাড়িটা সরতেই চোখের সামনে স্পষ্ট হলো একটা বিকৃত লাশ । এবং লাশ টা তার দিকে এগিয়ে আসছে । অসংখ্য গাড়ি বারবার মেয়েটাকে চাপা দিচ্ছে । রক্ত চুয়িয়ে পরছে গোটা দেহ থেকে । থেতলে যাওয়ার মুখের আদল বুঝতেই পারা যাচ্ছে না । অথচ মেয়েটার একটা মাত্র অক্ষত কবজি, সেটায় ধরে রাখা কয়েকটি লাল গোলাপ । সেই গোলাপ তিতিরকে দিতে ছুটে আসছে মেয়েটা। তিতির ঘুমের মধ্যে ছটফট করছে অনবরত। চিৎকার করতে চাইছে। সরে যেতে চাইছে ওখান থেকে। কিন্তু কোনোটাই হচ্ছে না। বন্ধ চোখের কার্নিশে গড়িয়ে পরছে নোনাজল। বালিশ ভিজে উঠলো জলদিই। মেয়েটা তিতিরের মুখোমুখি এসে তাকে ছুঁয়ে দেবে ঠিক তখনই চোখ মেললো তিতির। হুড়মুড়িয়ে নেমে পরলো বিছানা থেকে। হু হু করে কেদে ফেললো। দু হাত সামনে দিয়ে যেনো বাধা দিতে চাইলো কাউকে,
—”কাছে আসবে না। একদম আসবে না। আমি কিচ্ছু করিনি।”
খানিকক্ষণ চাপা কন্ঠে শব্দগুলো আউরালো তিতির। মেঝেতে বসা। পিঠ ঠেকেছে ড্রেসিং টেবিলের সাথে। বিষয়টা যে স্বপ্ন হুট করেই খেয়াল হলো তার। থমকালো। দু’হাতে চোখ ডলে পুরো রুমে তাকালো। তাদের বেডরুম এটা ! তাহলে এতক্ষণ কি হচ্ছিলো তার সাথে। সেই দুঃস্বপ্ন। ঈশান যেদিন চলে গেলো সেদিন থেকে এ-রকম হচ্ছে। যতবার ঘুমুতে যাচ্ছে ততবারই ঠিক একই স্বপ্ন। তিতিরের কান্নার গতি বেড়ে গেলো আচমকা। কি হচ্ছে তার সাথে। সেই দিনের সেই ফোন কলটা। না চাইতেও মাথার মধ্যে গেঁথে আছে। ওই বিভীষিকাময় স্মৃতির কথা ভুলতে কত কাঠখড় না পোড়াতে হয়েছিলো তাকে। বলা যায় সফলও হয়েছিলো। আজ নতুন করে সে অসহ্যকর স্মৃতি এসে জানা দিচ্ছে মাথায়।
তিতির বেশ সময় নিয়ে নিজেকে শান্ত করলো । ঘড়িতে সময় দেখলো । চারটা বাজে। ফজরের আজান দেবে কিছুক্ষণ পরেই । বাহিরে অদূরে কুকুর এর ঘেউ ঘেউ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে । ঈশানের ঘর ছেড়ে তিতির তার নিজের রুমে আসলো । টিয়াপাখি জোড়া ঝিমাচ্ছে। সন্ধ্যেরাতে খাবার দিয়েছিলো কি ! মনে পরছে না। পাখি দুটোর খাচায় দানা পানি দিয়ে আবার ফিরলো তাদের রুমে। চোখে ঘুম নেই । ভয় ভয় করছে। গা ছমছম করছে অজানা এক কারণে । রাহাত এর বিষয় টা আজকাল বড্ড ভাবাচ্ছে। চারিদিকে শুধু অসহ্যকর অনূভুতি গুলো। ঈশান থাকলে সে সব কিভাবে যেনো ভুলে থাকে।
সামনে সপ্তাহে ভার্সিটি খুলবে। ঈশান কড়া ভাবে নিষেধ করে গেছে সে না ফেরা অবধি গেটের বাইরেও পা দেওয়া যাবে না। তার মানে তার ভার্সিটি যাওয়ার যে পেছাচ্ছে তা বুঝতে বাকি নেই।
বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বুঝতেই আচমকা মনে হলো এক জোড়া চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকালো তিতির। বারান্দায় গ্লাস খুলে রাখা। তখন আটকেছিলো কি? নাকি খোলাই ছিলো। মনে পরলো না তার। তবে সেদিকে কাউকে চোখে পরলো না । অবাস্তব চিন্তা ভাবনার জন্য নিজের ওপরই রাগ হলো তিতিরের । দোতলা তে মই বেয়ে কেউ নিশ্চয় এখন তার দিকে তাকিয়ে থাকতে আসবে না। ভোর হবে খানিক পরেই । মনের ভয় এখন বাস্তবে সে রুপ দেওয়া শুরু করেছে । তিতির উঠে গিয়ে দ্রুত বারান্দার কাচ লাগিয়ে দিলো । জানালা চেক করলো আরেকবার।
গুনগুন করে গান গাইছে কেউ। নূরির ঘুম এমনি তে
খুব গাঢ় হলেও আজকাল ঘুম হতেই চায়না। আর হলেও একটু শব্দে ঘুম ভাঙ্গে । নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে হয় আজকাল । তারপরও ঘুম হতে চায়না । আজকেও তার ব্যাতিক্রম নয় । নিশির ঘরে শুয়েছে সে । সিনেমা দেখে তিতির নিজের ঘরে চলে গেলেও সে যায়নি । এই গুনগুন শব্দ কোত্থেকে আসছে ঘুমের মধ্যে ঠাহর করে উঠতে পারলো না নূরি । তবে আরেকটু শব্দটা জোরালো হতেই উঠে বসলো । পাশে অঘোরে ঘুমুচ্ছে নিশি । শব্দের উৎস তো বারান্দায় মনে হচ্ছে । মনের ভুল ছাড়া আর কিচ্ছু না হয়তো । তবে নূরির সে ধারনা ভুল প্রমান করে থেমে থেমে শব্দটা হচ্ছেই । বদ্ধ ঘরে থেকেও বাহিরের কোথাও একটা কুকুরগুলোর তীক্ষ্ণ চিৎকার কানে এসে লাগছে। কুকুর গুলো সচরাচর এমন করে না । মাথার আধখোলা খোপা শক্ত করে বেধে পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো অন্ধকার ঘরে । সত্যি বলতে উঠে শব্দের উৎস খোঁজার মতো সাহস হতে চাচ্ছে না তার । কেমন শরীর ছমছম করা শব্দ। তবে একটা পর্যায়ে হার মানলো নিজের কাছে। দারোয়ান আংকেল উঠে থাকতে পারে । নূরি বারান্দার দরজা খুলতেই ভূত দেখার মতো চমকালো। বড় বড় চোখ করে চিৎকার করার আগেই তার মুখ চেপে হেচকা টানে বারান্দায় এসে কাচ লাগিয়ে দিলো ইয়াজ।
বাইরে এখনো ভোরের আলো ফোটার কোনো তোরজোর নেই । ঘোর অন্ধকার । তাদের বাড়ির গেটের সামনে দু দুটো বড় বড় লাইট লাগানো । আশেপাশে বেশ দূর অবধি স্পষ্ট দেখা যায় । তবে তাদের ভাইবোন দের বারান্দার সাইট গুলো একটু আলো কমই লাগে । কুকুর এর তীক্ষ্ণ ডাকের সাথে অনবরত পাশের ঝোপঝাড় থেকো ঝি ঝি পোকার ডাক কানে আসছে । নূরি এতোটা ভয় এ জীবনে পেয়েছে কি না মনে করতে পারলো না । নাহ, পেয়েছো তো। এর আগে একদিন । এমনই এক মাঝরাতে । ইয়াজের জন্যই। যেদিন ইয়াজ… নূরির ঘোর এখনো কাটেনি । দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে ভয়ের চোটে । ইয়াজ ধীরে সুস্থে হাত সরালো নূরির মুখের ওপর থেকে৷ । ভীষন হালকা কন্ঠে বললো,
—”ভয় পাচ্ছো কেনো? আমিই তো।”
নূরি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো না । দিলো না ঠিক সঠিক নয়। দিতে পারলো না । এ-রকম ভাবে মাঝরাতে ক্রিমিনাল এর মতো বাড়ির বারান্দায় উঠে গুনগুন করে গানের সুর তুলছে । আর বলে ভয় পাওয়ার কি আছে ! নূরি অবিশ্বাস এর কন্ঠে বললো,
—”তু-তুমি এখানে কি করছো? সাহস হলো কি করে এভাবে আসার?”
ইয়াজের মুখে কেমন একটা অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো । বোকা মেয়ে সামনের মানুষ টার সেই কপটতা ধরতে কখনো পারেনি । আজও পারলো না।
—”অ্যাম সরি নূরি। খুব ভুল করে ফেলেছি আমি। সেদিন যা যা হয়েছে সব কিছুর জন্য মাফ চাচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করো । আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবনা । যা করেছি ভুল। সব ভুল । বিয়ে করে নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলো? নূরি?”
নূরির জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে । ভয়ে তার হাত পা শুকিয়ে আসার দশা একপ্রকারে । পিছনের বারান্দার বদ্ধ দরজার দিকে এক নজর দিয়ে পাশে এগিয়ে তাকালো নিচের দিকে । দারোয়ান এর গেট লাগোয়া ঘরের আলো এখনো জ্বলেনি । ঘুম থেকে ওঠেনি তার মানে । তাদের গেটে বিশাল তালা টা ভিতর থেকে এখনো ঝুলছে। ইয়াজের কোনো কথাই কানে গেলো না তার । ব্যাগ্র কন্ঠে বললো,
—”তুমি ভিতরে আসলে কি করে? গেটে তো তালা এখনো। তাছাড়া – তাছাড়া পাগল হয়ে গেছো তুমি । আমাদের বাড়ি তে এভাবে ঢুকেছো এটা কোনো ভাবে কেউ জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাছাড়া সিসিটিভি তো আছেই। “
—”সে সব এর ব্যাবস্থা করেই এসেছি আমি। ভয় পাচ্ছো কেনো?”
—”সিসিটিভি?”
—”বন্ধ। “
—”ওপরে উঠলে কি করে ! তুমি জানো কতটা বাজে কাজ হয়েছে এটা?”
ঘাড়ে বাকিয়ে লম্বা মই টা ইশারা করে দেখালো ইয়াজ। নূরির মাথা ভনভন করে উঠলো । এলাকার সবথেকে সনামধন্য , মান্যগন্য পরিবার তাদের । সেই বাড়ির মেয়ে হয়ে একদিন মাঝরাতে বৃষ্টি মাথায় রাস্তায় একটা ছেলের সাথে, তো আরেকদিন সে ছেলে মই বেয়ে মাঝরাতে ঘরে চলে আসছে । ছিহ্ । কি লজ্জার কথা । নূরি পিছিয়ে দাড়ালো কিছুটা । এতদিন চিন্তা হলেও আজ কোনো এক অজানা কারণে সামনের মানুষ টার দৃষ্টি, কাজ কর্ম তার পছন্দ হলো না । এতদিন পর দেখেও ভালোলাগায় শিগরন হলো না শরীরে। বরং সেদিন রাতের নোংরা স্মৃতিগুলোর বুকের ভিতর সূচের মতো বিধলো। এ অনূভুতি মোটেই সুখকর নয়। বিরক্তি,অশান্তি সব নেগেটিভিটি তে জড়ানো। আজকাল সে যে ইয়াজ কে দেখে সে ইয়াজ তার ভালোবাসার সেই পুরুষ টা নয়। আকাশ পাতাল তফাত আগের সেই ইয়াজের সাথে। নূরির তপ্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ইয়াজ হা হুতাশ করা কন্ঠে বললো,
—”আমার দ্বারা যা হয়েছে মাফ করো আমাকে । আমি মরে যাবো তোমাকে ছাড়া । তুমি আমাকে ইগনোর কি করে করছো ? এমন ভুল আর হবে না । কখনো হবে না।”
এতদিন নূরির মনে হলো সে বুঝি চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে ইয়াজের জন্য । মনে হবে কেনো শুধু। আসলেই করতো অপেক্ষা । কিন্তু আজ সে সব অনুভূতি সব কোথায় পালালো । যে স্মৃতি মস্তিষ্ক মানতে পারে না, অতচ মন বারবার বোকামি করে ক্ষমা করতে চায়। সে স্মৃতির ভার বহন করা খুব কঠিন। মন আর মস্তিষ্কের লড়াই খুব ভয়াবহ। আজ বোধহয় মস্তিষ্ক জিততে যাচ্ছে! বোকা বোকা মেয়েটার মন হুট করেই মস্তিষ্ক কে সায় জানাচ্ছে। অবচেতন মন কি একটা ইশারা করছে বারংবার। নারী দের সেই সিক্সথ সেন্স কিছু একটা বলতে চাচ্ছে তাকে।
—”এসব নিয়ে আলোচনার সময় বা স্থান কেনোটাই এটা নয় ইয়াজ । তুমি চলে যাও এখন । আজান দেবে খানিক পর। বাড়ির সকলে উঠে পরবে। কতটা নোংরা একটা বিষয় এটা জানো?”
—” নোংরা কাজ করতে পারো, আর সেটা জানাজানি হলেই দোষ?”
ইয়াজের শীতল কন্ঠে চকিত হলো নূরি । মুখের ভয়ার্ত ছাপ সরে গিয়ে ভিড় জমালো একরাশ প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি । হুট করে এটা কি বললো ইয়াজ ? বুঝতে পারলো না যেনো সে। নোংরা কাজ বা এ জাতীয় কিছু বললো কি!
—”কিহ?”
ইয়াজ এবারে আর কপটতার অভিনয়ে নিজেকে মুড়িয়ে রাখলো না । মুখ জুড়ে খেলে গেলো অন্য রকম এক হাসি। যে মুখের আদলে বুক কাঁপলো নূরির । ইয়াজ ফিচেল কন্ঠে বললো,
—” হোটেল রুমে ঘনিষ্ঠ হতে পারো যার সাথে। তাকে মাঝরাতে ঘরে ডাকলে অসুবিধা কি?”
নূরি হতবুদ্ধি হয় । কি যা তা বলছে । ইয়াজের কথার ধরন এমন কবে থেকে হলো । এসব কি তার স্বপ্নে ঘটছে । ঘুম ভাঙ্গলে ভালোবাসার মানুষ টাকে নিয়ে এমন বাজে একটা স্বপ্ন দেখার জন্য নিজেকে ধিক্কার দেবে সে ? তবে তার ভাবনার কোনোটাই হলো না । ইয়াজ ততক্ষণে নিজের ফোন থেকে কয়েকটা ছবি বের করে ধরলো নূরির সামনে।
হাঁটু থরথর করে কেঁপে উঠলো নূরির । মাথায় বজ্রপাত হলো যেনো । চোখ ধাঁধিয়ে উঠলো একটা সময় । ইয়াজের হাতের ছবিগুলোয় সে আর ইয়াজ । হোটেলের সেই রুম টাতে । যেদিন ইয়াজের সাথে দেখা করতে গিয়ে প্রথম ইয়াজ তার সাথে বাজে ব্যবহার করেছিলো । কিন্তু সেসব এর ছবি ! তাছাড়া এতো খোলামেলা কখন হলো সে। সেদিন আদতে কিচ্ছু ঘটেনি । ইয়াজের হেঁচকা টানে পরে গেছিলো বিছানায় । ঠোঁটে জাস্ট এক সেকেন্ডের স্পর্শ লাগে । তখনই সরিয়ে দেয় নূরি ইয়াজ কে । কিন্তু ইয়াজের হাতে এই মূহুর্তে থাকা ছবিগুলো বেশ খোলামেলা, স্পষ্ট, বাজে ধরনের । কয়েকটা ছবি পার হয়ে পাশে যেতেই আরেক দফা হোঁচট খেলো নূরি । এই ছবিটা একদম অশ্লীল । সম্পূর্ণ বাজেভাবে ইঙ্গিত করছে । যে দেখবে বুঝতে বাকি থাকবে না কোন অবস্থায় তোলা ছবি এগুলো । কিন্তু এমন পরিস্থিতি তাদের মধ্যে কখনো আসেনি । নূরি তোতলায়। গলায় আটকে থাকা দলা সরিয়ে প্রশ্ন করে,
—”এ-এ-এসব কি ইয়াজ?”
—”তোমার আর আমার ভালোবাসার মূহুর্ত । মনে নেই?”
রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিলো ইয়াজ। অশ্লীল ভঙ্গিতে হাসলো । শরীর কেঁপে উঠলো নূরির। ইয়াজ বাঁকা কন্ঠে আউড়ালো,
—”তোমার বড়ভাই শুরুর কয়েকটা দেখেছে। তাতেই ব্যাটা আমার ওপর যা ক্ষেপেছে। পরের গুলো দেখলে কেমন হবে বলোতো!”
—”বড় ভাইয়া সব দেখেছে মানে। “
— “দেখেছে বলেই তো আমাকে দেখতে পারে না আবার। কি যে সমস্যা । কি আর বলবো।”
নূরির আজ অবাক হওয়ার দিন । কি থেকে কি ঘটছে এসব তার সাথে ! ইয়াজ এসব কি বলছে।
—”তুমি দেখিয়েছো এই মিথ্যা ছবিগুলো?”
—”তাছাড়া কে ? আর মিথ্যা বলছো কোনটাকে । দেখো দেখো একটাকে দেখেও ফেক মনে হয়?”
ব্যাস্ত হাতে অশ্লীল ছবিগুলো নূরির মুখের সামনে ধরলো ইয়াজ । নূরির গা গুলিয়ে ওঠে । হুড়মুড়িয়ে পিছিয়ে যায় খানিকটা । ছুটে ঘরের ভিতর চলে যাবে ? নাকি কাউকে ডাকবে?
ইয়াজ বোধহয় বুঝলো নূরির চোখের ভাষা । ঠোঁট উল্টিয়ে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বললো,
—”কোনোটাই করে লাভ নেই । মানুষ ডাকবে আর আমি ছবিগুলো এভাবে তাদের সামনে ধরবো । তোমার সুশীল বাপ,ভাই নিশ্চয় সেটা পছন্দ করবেন না?”
নূরির চোখের পানি বাধ মানছে না। অসহায় লাগছে বড্ড।
—”কি চাও তুমি ? এমন অসভ্যতামি করার কারণ কি? এসব কি ইয়াজ ? আমাদের ভালোবাসা গোটা টা মিথ্যা করার পায়তারা জুড়েছো তুমি ? এসব কি হ্যা?”
শব্দ করে হাসতে গিয়েও নাটকিয় ভঙ্গিতে মুখ চেপে ধরলো ইয়াজ । এমন মুখের ভঙ্গি যেনো নূরি খুব হাসির কথা শুনিয়েছে তাকে।
—”ভালোবাসা ? কে ? কাকে ভালোবাসে?”
নূরি বুঝে উঠতে পারছে না সামনে সে কোন ইয়াজ কে দেখছে । কোনো হিসেবই তো মিলছে না তার । নূরির কান্নার তীব্রতা বাড়তে দেখে বড্ড বিরক্ত হলো ইয়াজ।
—”কান্না থামাও জান । যা বলছি সেটায় একটু মন দিতে হয় যে । পরিবার , বাপ ,ভাই বাকি বোনদের মানসম্মান বাঁচাতে চাও তো নাকি ? না চাইলে আলাদা কথা । তবে চাইলে যেটা বলবো সেটা করতে হবে । তোমাদের তিতিরপাখিটিকে বিধবা করতে না চাইলে অথবা গোটা বংশ নির্বংশ হওয়া দেখতে না চাইলে যা বলবো একটু কষ্ট করে শুনতে হবে জান।”
বেলা বারোটা গড়িয়েছে । ঈশান তীব্র মাথা যন্ত্রণা নিয়ে একগাদা ফাইল উল্টাচ্ছে বিছানার ওপরে । খানিক আগেই তার এক লোক এসে বেশ কিছু ফাইলপত্র দিয়ে গিয়েছে। রাতে বারবার এর ওর ফোনের যন্ত্রনায় শান্তিতে ঘুম তো হয়নি । তার ওপর এ বেলা যদি শান্তিতে একটু ঘুম ঠিকঠাক হতো তাহলে না-হয় একটা কথা ছিলো।
কফি তে চুমুক দিতে দিতে কপালের ভাজ দ্বিগুণ হচ্ছে। ইয়াজ সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য । সিঙ্গাপুর এও এ লোকের কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই । বরং সভ্য ভদ্র নাগরিক হিসেবে বেশ সুনাম যেখানে । কোনো চাকরি সেখানে সে করে না । স্থানীয় এক বুকশপের শেয়ার আছে । এবং সিঙ্গাপুর থাকাকালীন তাকে সাধারণত বুকশপ গুলোতেই দিনের বিশ ঘন্টা দেখতে পাওয়া যায় । তবে বাংলাদেশে লোকটার কোনো তথ্য সে পায়নি এখনো । এও হয় নাকি! জলজ্যান্ত একটা মানুষ এর সিঙ্গাপুর এ এতো পিওর ক্যারেকটার নিয়ে বসবাস । অথচ বাংলাদেশে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
সকালের ব্রেকফাস্টই এখনো করা হয়ে ওঠেনি । ঘুম ভালো হয়নি । তার ওপর এই ফালতু টার ওলট-পালট তথ্য । মাথা ঝিম মেরে আছে ঈশানের । এসবের চক্করে কাল থেকে তিতিরের সাথে একটা কথাও হয়নি । আজ আর কাল এখানে থাকবে সে । তারপর বাড়ি ফিরবে মনটা ছটফট করছে বাড়িতে ফিরতে ।
ইয়াজের লোকেশন এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর না তো সেদিন কবরস্থান এ পাওয়া সেই ফোন টা থেকে আর কোনো তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তার ফোনে এরই মধ্যে আন-নোউন একটা নাম্বার থেকে ফোন আসতেই সর্বপ্রথম মাথায় আসলো ইয়াজের কথা। হলোও তাই। সত্যিই ইয়াজ।
—”শয়তানের কথা মনে করতেই শয়তান হাজির।”
ঈশানের প্রথম কথাতেই চটলো ইয়াজ। তবে সেটা প্রকাশ করলো না। বরং দীর্ঘশ্বাস এর একটা শব্দ শুনলো ঈশান।
—”শয়তান বলিস আর যাই বলিস। আমি মাইন্ড করলাম না।”
—”তোর মতো ব্লা/ডির মানসম্মান আছে কি!”
—”হোল্ড ইয়্যর মাউথ ঈশান আরশাদ দেওয়ান। “
—”তুই নিজেকে হোল্ড কর। মৃত্যু সন্নিকটে জেনেও যে পরিমাণ উড়ছিস। পরে দেখবি মরার সময় পানি চাওয়ার মতো দম টুকুও পাবি না।”
ইয়াজ দাঁতে দাঁত চাপলো।
—”সবসময় আমরা মৃত্যুর অপেক্ষায় বসে থাকবো । আর তোরা নিজেদের খোদার স্থানে বসিয়ে মৃত্যু দিয়ে যাবি সেটা কি ভালো দেখায়।”
—”আসতাগফিরুল্লাহ । আল্লাহ তোকে সুবুদ্ধি দিক। কথার লাগাম টানতে শেখ।”
—”খোদা তোদের মাফ করে বুঝি?”
ঈশান শ্রাগ করলো শুধু । বাঁকা গলায় বললো,
—”নিজের চিন্তা কর । আমার প্রতি খোদার বিচার ঠিক কি হবে সেটা তোর জানার দরকার নেই।”
—”তোর জীবন আমি জাহান্নামে পরিনত করবো ঈশান আরশাদ দেওয়ান । এটা তুই বুঝতে পারছিস কি?”
শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান । কফিতে চুমুক দিয়ে মগ টা টেবিলে রাখলো । আঙুল কপালে চেপে হাসলো বেশকিছুক্ষন। ফিচেল গলায় বললো,
—”নিজের জাহান্নাম নিশ্চিত করে এখন সাগরেদ জোটাচ্ছিস! সো ব্যাড।”
ক্রমাগত ঈশানের কথায় পিষ্ট হচ্ছে যেনো ইয়াজ। যতবার কথা বলতে নেয় ততবার রাগে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে হয় তার । ইয়াজ ঈশানের এই কথার উত্তর বা পাল্টা প্রশ্ন করলো না । গম্ভীর গলায় বললো,
—”প্ল্যানে পরিবর্তন এসেছে বুঝলি । মেয়ে জাতি মায়া জানে । সব সমস্যার মূলে কিন্তু এই মেয়ে জানিস সেটা ? উন্নতি বলিস আর ধ্বংস । লক্ষ্য স্থির বলিস বা লক্ষ্য ভ্রষ্ট। সব মেয়ে জাত এর জন্যই হয়।”
ইয়াজের কথায় ঈশানের মাথায় সর্বপ্রথম এসে গেলো বাড়ির মেয়েদের কথা । সে বাড়ি নেই । প্রতি মূহুর্তে মেয়েগুলোর চিন্তায় অস্থির থাকে । ঈশান চুপ করে রইলো ইয়াজের পরের কথাগুলো শুনতে।
ইয়াজ শব্দ করলো কেমন একটা । তারপর স্পষ্ট গলায় বলো উঠলো,
—”আসল কথায় আসি। সমঝোতা করি চল। তোর বউটাকে লাগবে । তোর বউটা একদম পুতুল একটা । মেয়ে দেখেছি । তবে তোর বউয়ের মতো দেখা হয়নি এ পর্যন্ত। তোর বউকে দেখার পর থেকে, তোর বোন টাকে আর মনে ধরছে না । মন থেকে উঠে গিয়েছে । এক কাজ করতে হবে তোকে । তোর বউ টা দিয়ে দে । তোর সাতখুন মাফ। যাহ্।”
ঈশান এর রাগ মাথায় উঠলো ইয়াজের কথায় । তবে চিৎকার করলো না । বরং গা জ্বলানো হাসি দিলো সেও। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন । এই নীতি তে আজকাল ভীষন বিশ্বাসী সে । ইয়াজ এর মতো দু মুখো সাপ কে কবজায় আনতে রাগ মাথায় উঠে থাকলে চলে?
—”আমার সাতখুন মাফ করার তুই কে ? নিজের মরার চিন্তা টা কর আগে । আমার বউ , বোন কেনোটাই পাবিনা তুই। “
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ঈশান । হতাশ গলায় বললো,
—”শা*লা জীবনটা পাহারাদার এর মতো হয়ে গেছে এই সুন্দরী বউ বিয়ে করে । অবশ্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়েই থাকি আমি ৷ ওরকম পুতুলের মতো সুন্দরী বউ ঘরে থাকলে তোর মতন এমন কাক,শকুন,শু*য়োর ভিড় করবেই। সেসবে তাকালে চলে? ছ্যাহ্ ! আর শোন । তোকেও আমি একটা কথা বলি । আমার বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকালে, আমার সাতখুন আর কি মাফ করবি ? আরও সাতশো খুনের বন্যা বয়িয়ে দেবো। আর তার প্রথম শিকার হবি তুই । সুতরাং হৃদপিন্ড জায়গা মতো রাখতে চাইলে তিতির এর থেকে দূরে থাক।”
ইয়াজ এর মুখ রাগে লাল হয়ে আছে । চোখে সামনে ভাসছে গতরাতে দেখা ঘুমন্ত তিতিরের মুখখানা । নিশির বারান্দায় যাওয়ার আগে ভুল তো সে তিতির এর বারান্দা তেই উঠেছিলো।
—”তোর বউকে আমার চাই । প্রচুর সুখে রাখবো। সহজ হিসেব। দিয়ে দে। ঝামেলা, শত্রুতা খতম কর।”
—”শালা বউ বিয়ে দেবো এ বুদ্ধি তোকে দিলো কে। সেইটা আগে বল। এটা কি আম, কাঠালের বাগান? নাকি গরু মহিষের খামার । যে বড় করার পর চিন্তায় মরবো বেচে দেওয়ার। শা*লা ওইটা আমার বিয়ে করা বউ । বিয়ে করেছি সকাল, সন্ধা ,রাত বুকে রেখে আদর করতে। ঈশান আরশাদ দেওয়ান বউকে সুখ দিতে পারে । এক ঈশান আরশাদ এর দেওয়া সুখে ওই মেয়ে গোটা জীবন পারি দিয়ে দিতে পারবে। তোর চিন্তা করতে হবে না আমার বউয়ের বিয়ে নিয়ে। ”
—”তোর বউকে যে তুই এখনো ছুয়ে দেখিস নি সেটা বোধহয় আমি জানি।”
—”ভুল জানিস। স্বামী স্ত্রীর আদর ভালোবাসা ম্যাটিনি সিনেমার শো না । যে সবাইকে টিকিট কেটে দেখতে অনুরোধ করবো। বউকে আদর করবো সেটা টিকিট কেটে সবাই দেখবে। এমন হয়? শুনেছিস কখনো?
ইট’স টু পারসোনাল। শুধু দুজন মানুষ এর মধ্যকার রাতের অন্ধকার এর ব্যাপার স্যাপার । আমার অবশ্য অন্ধকার লাগে না ওরকম পুতুলের মতো বউকে আদর করতে।”
সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৩
ইয়াজ এর শরীর বিষিয়ে উঠলো। তারমানে ঈশান ছুঁয়েছে তিতির কে! শুরুতে ভালোবাসে না। জোর করে বিয়ে করা। এতো এতো অশান্তি । এতো সহজে সেসব ভুলে একসাথেও হয় ওরা ! ইয়াজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ঈশান বললো,
—”তুই বেঁচে থাকতে একটা ফুটফুটে বাচ্চাও দেখিয়ে দেবো না হয় । আমার ঘরে আরেকটা পুতুল আসবে যখন তখন না হয় মিলিয়ে নিস বউকে কতটা গভীরে আদর করি।”
