সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৫
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বৈশাখ এর শেষের দিকে। তীব্র দাবদাহে জনজীবন অতিষ্ঠ একপ্রকার। শহরের আনাচে কানাচে মানুষ জনের ভিড় ভাট্টায় দম বন্ধ করা পরিস্থিতি একদম। সাজিদ যখন ডিআইজির বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামালো তখন বেলা গড়িয়ে গিয়েছে। ঢাকা শহর থেকে ট্রান্সফার হওয়ায় হাফ ছেড়ে বেচেছিলো বেচারা। তবে এই কেসটা তার শান্তি সহ্য করতে পারছে না সম্ভবত। নাকানিচুবানি খাওয়ানোর ওপরেই আছে। চাকরির এ কয়েক বছরের অসংখ্য জটিল জটিল কেসের সমাধান টেনেছে সে। অথচ কোন ধান্দা বাজ এর খপ্পরে যে এবার পরলো তা বলা মুশকিল।
শমশেরনগর এ তদন্ত চলছিলো পুরোদমে। সাজিদ নিজে দৌড়াদৌড়ি করছিলো সব জায়গায়। আচমকা গত রাতে ডিআইজির এর ফোন পেয়ে হম্বিতম্বি করে ছুটে আসতে হলো ঢাকা তে। সেই ভোর ভোর বেরিয়েছে ঢাকার উদ্দেশ্যে। জ্যাম ঠেলেঠুলে এসে পৌছুতে দুপুর পার হয়ে গেলো। ঈদের ছুটি শেষে চিরাচরিত কর্মব্যস্ততার জীবনে ফিরছে সকলেই। পথে ঘাটে পা ফেলার উপায় নেই।
পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছলো কপালের ঘাম টুকুন। না জানি কোন বিষয়ে বলি চড়াতে এতো জরুরি তলব করা হয়েছে তাকে।
বাড়ির ভিতর ঢুকতেই দেখা গেলো ডাইনিং এ আছেন তিনি। দুপুরের আহারে ব্যাস্ত। সাজিদ কে দেখে রাগলেন না। বরং বড্ড স্বাভাবিক স্বরেই বসতে বললেন তার পাশে। স্ত্রী কে উদ্দেশ্য করে বললেন,
—”খাবার বারো ওর জন্য। “
সাজিদ ব্যাস্ত হয়। মানা করলো। তবে কমিশনার সেটা গ্রাহ্যই করলো না। সাজিদের ঘটে ঢুকলো না,ঠিক কি কারনে এতো আপ্যায়ন। এমনিতে অফিসে যতবার ভিজিটে এসেছেন,ততবার দাঁতের চিপায় ফেলেছে লোকটা। তবে মানা আর করতে পারলো না। ডিআইজি গিন্নি বড্ড আদরের সাথে অতিথি আপ্যায়ন করলেন। আহার শেষে অবশেষে বিষয় এসে ঠেকলো কাজের কথায়। কমিশনার গম্ভীর গলায় বললেন,
—”কেসের অগ্রগতি কতদূর?
—”স্যার একাট্টা করেছি অনেককিছুই। এতো অল্প সময়ে কয়েকটা…আই মিন বিষয়টা প্যাচালো। মূলত এই কারণেই। তাছাড়া প্রথম কেসের সাথে পরবর্তী কেসের সামঞ্জস্য খুজতে গিয়ে আরও খানিকটা।”
এক এক করে নিজের তদন্তের আদ্যপান্ত জানালো সাজিদ। মোটামুটি যতটুকু সে জানতে পেরেছে আরকি। সামনে বসা মানুষটিও ভীষন মনোযোগ সহকারে শুনলো সেসবই। অতঃপর ঠান্ডা গলায় বললো,
—” কাল সদরঘাটে আরও একটা লাশ পাওয়া গিয়েছে জানো?”
সাজিদ এর চোখ বিষ্ফরিত হলো যেনো। সে জানেনা। তাকে জানানো হয়নি। এখানকার কর্মরত পুলিশের রিপোর্ট খানা এগিয়ে দেওয়া হলো সাজিদের দিকে। সাজিদ সেটা মন দিয়ে দেখলো। রাত এগারোটা নাগাদ হত্যা। লাশ পাওয়া গিয়েছে শেষরাতের দিকে। স্থানীয় এক জেলে আবিষ্কার করে দেহাবশেষ। এর আগে এক পুরুষের লাশ উদ্ধার হয়েছিলো। এটাও ঠিক তেমন ভাবেই হত্যা।
মহা সমস্যা! মেয়েগুলোর তদন্তেরই কূলকিনারা পাচ্ছে না। এখন আবার পুরুষ মানুষের হিড়িক পরে গিয়েছে।
—”তোমার নামে ডিমিরিট রিপোর্ট এসেছে। তদন্তে গাফিলতির জন্য। “
সাজিদ হতভম্ব হয়। তদন্তের ভার তাকে দেওয়া হলো কতদিন আর! ওখানে বদলি করা হলো এক মাসও তো হলো না। এতো জটিল একটা কেসের সমাধান এরা সাত দিনে কি করে আশা করে! মুখের ওপর কড়া কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হলো সাজিদের। কিন্তু চাকরির মায়া কার না আছে! মনের ইচ্ছে মনেই মাটি চাপা দিয়ে অতি বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলো,
—”আমাকে কি আবার ট্রান্সফার করা হচ্ছে স্যার ? “
—”মনে হয়।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাজিদ। কোন পলিটিকাল চক্করে পরলো নিজের অজান্তে কে জানে!
—”কবে নাগাদ নোটিস পাবো স্যার?”
—”জানিয়ে দেওয়া হবে সবই। এ মাসটা সম্ভবত ওখানেই থাকবে। এটা আমার মত। এবং সেটা তোমার তদন্তের রিপোর্ট দেখে মাত্র ঠিক করলাম। যদিও এতে আমার ভাগেও ডিমিরিট চলে আসবে। তবুও আমি চাই তুমি তদন্ত টা করো।”
সাজিদ এ যাত্রায় আরও অবাক হলো। ডিআইজি সাহেবের সাথে ওর মাখোমাখো সক্ষতা কোনোকালেই ছিলো না। একদম চাকরির শুরু থেকেই গা বাঁচিয়ে চলে সাজিদ। কাজের কথা ছাড়া রসের আলাপ কখনো করা হয়নি। ঠিক কি কারণে নিজে মাথা পেতে ডিমেরিট এর ভাগিদার হয়ে কেসটা সাজিদকেই দিয়ে রাখতে চায় এটার হিসেব তো মিললো না সাজিদের কাছে।
— “কিন্তু স্যার…”
—”আহ্ ইয়াং ম্যান। এতো প্রশ্নের কিচ্ছু নেই। আছে কি? তদন্ত টা তুমি করছো। তোমার ওপর দায়িত্ব টা। মাঝপথে সেটা থেকে সরিয়ে দেওয়া রীতিমতো অন্যায়। তবে বেশিদিন আমি ওপর মহলের আদেশে ব্যাগড়া দিয়ে তোমাকে রাখতে পারবো না। সর্বোচ্চ এই একটা মাসই। “
ডিআইজি সাহেব শ্বাস নিলেন একদমে কথাগুলো বলেই। তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,
—”তাছাড়া আরেকটা বিষয়ও আছে। “
—”স্যার?”
—”গোপন সূত্রে আমার কানে এসেছে। কালপ্রিট তোমাদের ওখানকার। তোমার একই এলাকার। আর তোমার এলাকার মানুষ কে তোমার থেকে ভালো আর কে চিনবে বলো৷! আমার দৃঢ় বিশ্বাস চোখকান খোলা রাখলে এক মাস যথেষ্ট তোমার জন্য। “
সাজিদ ডিআইজির বাসা থেকে বের হলো। একবার সদরঘাট থানায় গিয়ে গতরাতের লাশটা নিয়ে জানাশোনা করে যাওয়া উচিত কি-না বুঝলো না। অবশ্য এইখান থেকে আবার শহরের মানুষের ঠ্যালাঠয়ালি সহ্য করে পুরান ঢাকা যাওয়ার ইচ্ছে তার থোরাই আছে। সেসব মাথা থেকে ঝেড়ে এখনই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিলো সাজিদ। তবে মাথায় চক্কর কাটছে ডিআইজির অন্য কথা। কালপ্রিট তার এলাকার! তা কি করে হয়! ওইটুকুন একটা এলাকা।
কমবেশি সবার সম্পর্কেই স্পষ্ট ধারনা আছে তার। আর তাছাড়া এরকম পাকা ক্রিমিনাল তাদের ওখানে কে-ই বা হবে? এসব প্রশ্ন ডিআইজি সাহেব কে করে ক্ষেপিয়ে তোলার মানেই হয়না। যেহেতু গোপন সূত্রে খবর এসেছে, কিছু একটা তো অবশ্যই আছে।
—”রাকিন বাড়ি ফিরবে কবে, বাপ?”
রানী বেগমের ঘুম ভেঙেছে সবেই। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সারাক্ষণ ঘুম ঘুম ভাব থাকেই। সকালের নাস্তা করে আবার ঘুমিয়েছিলো। এখন ভাঙ্গলো সে ঘুম।
রাহাত পাশেই বসা ছিলো। দুপুরের ওষুধ টা খায়িয়ে তারপর বের হবে বাড়ি থেকে। আচমকা মায়ের এ প্রশ্নে চটক লাগে তার। ছেলের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত উত্তর না পেয়ে পুনরায় একই প্রশ্নের উত্থাপন করেন তিনি। রাহাত হাসে, মায়ের হাতের ওপর মাথা রাখে।
—”সামনে মাসে আসবে বললো তো।”
—”সবে এ মাসের শুরু। সামনে মাস তো অনেক দেরি।”
মাসের শুরু মোটেই নয়। এটা মাসের শেষের দিক। রানী বেগমের আজকাল দিন, তারিখের হিসেব থাকে না। ছেলেকেই শুধু চিনতে পারে এই যা। বাড়ির কাজের মেয়েটিকে সময় অসময় ‘তিতির’ বলে ডেকে ফেলে। তিতিরকে দেখেছিলো সে ছবিতে। রাহাত দেখিয়েছিলো। পরবর্তীতে কয়েক ঝলক সামনাসামনিও দেখেছে। তবে চেহারা বা বিস্তারিত কিছুই মনে নেই তার। গোটা বাড়িতে সদ্য তিনজন তারা। ছেলের মুখে সুস্থ থাকাকালীন তিতির নামটা এতো বার শুনেছে যে মেয়েটিকে তিতির বলে ডেকে ফেলে মাঝেমধ্যেই। এক রাহাত ছাড়া স্পষ্ট ভাবে আর কাউকে মনে নেই তার মায়ের। মাঝেমধ্যে অন্য কেউ আসলে অস্থির ভঙ্গিতে কাজের মেয়েটিকে তিতির কল্পনা করে পাশে দাড় করিয়ে রাখে। তখন রাহাত অবশ্য কিছু বলে না। একদিকে শান্তিই লাগে। রাহাতকে যে– সে নিজে তিতিরের বাড়ি পাঠিয়েছিলো বিয়ের প্রস্তাবে। রাহাত এবার এসে দেখে বেমালুম ভুলে আছে সে কথা। বরং রাহাতকে অবাক করে দিয়ে কাজের মেয়েটাকে বউমা,তিতির নানা নামে ডাকছে। মায়ের দিকে মুখ তুলে চেয়ে শান্ত গলায় বললো,
—”রাকিনের কথা তো তুমি জিজ্ঞেস করো না তো মা সচরাচর? “
রানী বেগম মলিন হাসে। মলিন কন্ঠে বলে,
—”তুই কাছে আসলেই গল্প হয় আমার রোগবালাই নিয়ে। সংসার নিয়ে গল্পের সময় কই!”
কথা সত্য। রাহাত ইচ্ছে করেই তুলতে চায়না এসব কথা। সামনেও হয়তো তুলতো না কখনো। তবে হুট করে তার মায়ের মাথায় কথাটা কি করে মনে পরলো কে জানে! এ ঘরে কোনো ফটোফ্রেম নেই। সব রাহাত সরিয়ে ফেলেছে। স্মৃতিভ্রংশ একজন মানুষ কোনো মৃত মানুষ কে ক্রমাগত খুঁজে চললে কোথা থেকে হাজির করবে রাহাত!
ব্যাস্ত শহরের বিলাসবহুল একটা হোটেলের তেরো তলার একটা কামড়ায় এসে বসে আছে রুষা। বসে আছে,তবে সেটা স্বইচ্ছায় মোটেই নয়। বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। কারোর একটা আসার অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে মোচড়ামুচড়ি করছে জেনো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো। একই ভাবে স্ট্যাচু হয়ে আছে সে।
সামনে দাড়িয়ে থাকা গার্ডকে কর্কশ গলায় তৃতীয় দফা ধমক চড়ালো।
—”তোমাদের বস কি হামাগুড়ি দিয়ে আসছে? কয় ঘন্টা অপেক্ষা করবো আমি?”
সামনের লোকটা ভয়ার্ত মুখে তাকালো হোটেলরুমের দরজার দিকে। হুট করে বস ঘরে ঢুকে কথাটা শুনে না ফেলে। বিনয়ের সাথে বলে,
—”চলে আসবে ম্যাডাম। আর একটু…”
রুষা এক ঝটিকায় উঠে দাড়ায়। হ্যান্ডব্যাগ টা হাতে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
—”বলে দেবে এতো অপেক্ষা আমার ধাঁচে নেই। যেমন তার নেই। অপমানিত হই আমি।”
লোকটা ব্যাতিব্যাস্ত হয় রুষাকে না ছুঁয়ে আটকাবার।
—”ম্যাডাম, স্যার আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি এভাবে চলে গেলে।”
রুষা বিরক্ত, অত্যন্ত বিরক্ত। সামনের লোকটাকে দেখে মনে হয়না এ ধরনের কাজে সে আছে। নিতান্তই গোবেচারা একজন লোক। অথচ শার্টের অংশ তুললে দেখা যাবে একপাশে ধারালো ছোড়া, অন্য পাশের লোডেড পিস্তল গোজা। কার না কার জান কবচ করতে সে-সব ঝুলিয়ে রেখেছে!
রুষা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গটগট করে গিয়ে বসে সোফায়। প্রায় একই সময় দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো কেউ। ফিটফাট এক পুরুষ। রুষার সেই ছায়া মানব। রুষা মেঝেতে পরা সেই অবয়ব এর দিকে রাগত চোখে তাকিয়ে থাকে। মুখ তোলার প্রয়োজন বোধ করেনা। লোকটা ইশারা করলো গার্ডকে বের হয়ে যেতে। দরজা লক করে এসে বসলো মুখোমুখি একেবারে। রুষা অজানা কারণে এই মূহুর্তে রাগে কাঁপছে। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না যেনো।
—”মির্জা বাড়ির কারোর এতো ছটপট রেগে যাওয়া মানায় না।”
রুষা তপ্ত চোখে তাকালো সামনের মানুষ টার দিকে। আজকাল ঘৃণায় তাকলে পারে না। গা শিওড়ে ওঠে। তবে ভয় পায়না। না তো আগে কখনো পেয়েছে,আর নাতো ভবিষ্যতে এ পাবে। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে। সমানের লোকটা তার গায়ে ফুলের টোকা দিতেও অপরাগ। যত হম্বিতম্বি তার ক্ষেত্রে, সে-সবই মুখের ভাষায়। রুষা দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—”তুমি যা করছো তা মির্জা বাড়ির সাথে মানায়?”
—”অনেক কিছুই মানায়।”
—”পাগল তুমি। চিকিৎসার প্রয়োজন তোমার। জলদি। “
অট্টহাসিতে ফাটলো পুরুষটি। হাসি থামলোও তৎক্ষণাৎ। গম্ভীর স্বরে বললো,
—”বিবাহিত পুরুষের জন্য পাগল হয়ে মরছো। এটা পাগলের কাজকারবার নয়?”
বারংবার এক কথায় ক্ষতবিক্ষত করা হয় রুষাকে। অথচ আজ ঈশান সে বাদে অন্য নারীর সাথে বিবাহিত কেনো! সামনে বসা মানুষ টার জন্য, নয়কি!
—” আমাকে মুক্তি দাও। আমি তোমার ছায়া থেকে বাঁচতে চাই।”
—”সবাই তোমরা এভাবে আমার ছায়া থেকে বেচে কোথায় যেতে চাও? একজন তো দুনিয়া ছাড়লো। আরেকজন ও রাতদিন সে পায়তারায় থাকে। এখন তুমিও?”
রুষার মুখচোখ শুকনো হয়,অসহায় লাগে নিজেকে। এসব ছেড়ে ছুটে পালাতে পারলে বাঁচতো কি? হয়তো বা।
—” যার যেটা ছাড়ার সে সেটা ছাড়বেই। অন্য কারোর করা কাজের দায় আমরা নিতে যাবো কেনো! পাপ পূন্যের হিসেব একা একজনেরই হয়। তার হয়ে পূন্য কামাতে যেমন কেউ পারে না, তেমন পাপ ও না।”
—”খেয়েছো দুপুরে?”
সিরিয়াস কথার পিঠে আবার অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া হলো কথা। রুষা উঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। যার জন্য আসা,সেই কথাগুলেই যদি না হয়। বাকি ফাও আড্ডায় কাজ কি তার। লোকটি রুষার ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করতে ব্যাস্ত। রুষা যে চলে যেতে মরিয়া তাও টের পাচ্ছে সে।
—” আজকাল একা থাকা শুরু করেছো! একা নিজের মতো চলছো। এসব কি ঠিক! আমার একটা ইমেজ আছে।”
—”ইমেজ!”
হেসে ফেললো রুষা। বিদ্রুপের হাসি দিয়ে বললো,
—”গোটা জীবন পারি দিলাম তোমার ইশারায়। আজও আমার ব্যাক্তিগত ইচ্ছে থাকতে পারে না?”
—”পারে। তবে সে ইচ্ছেয় জড়িয়ে থাকে ঈশান! সেটা কেনো?”
রুষা বাঁকা জবাব দিলো,
—”যেভাবে তোমার ইচ্ছেয় জড়িয়ে থাকে কখনো নূরি, আজকাল তিতির। বাড়ির কাজের মেয়েটাকেও তো ছাড়ো না।”
পুরুষটি গর্জে উঠলো রুষার কথায়। মেয়েটার চটাংচটাং কথায় ভীষন আত্মসম্মান এ লাগলো তার। দাঁতে দাঁত পিষে ধমকে উঠলো। রুষাও একই স্বরে চিৎকার করে উঠলো,
—”আমাকে পুতুল পাওনি ইয়াজ মির্জা। আজীবন তোমার কথামতো নিজের জীবন বলি আমি দেবো না। তোমার একেক বেলা একেক রমনীকে দরকার হতে পারে তোমার কামনার তাড়নায়। কিন্তু আমার, আমার শেষ পর্যন্ত ঈশান কেই লাগবে। সুতরাং শান্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসার দরকার। ভাবো ভাবো।”
রুষা চলে গেলে বজ্র মূর্তি হয়ে দাড়িয়ে থাকে ইয়াজ।
মেয়েটা আজকাল হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। ডমিনেট করতে পারা যায়না কিছুতেই। খবরমতে ঈশান আরশাদ ঢাকা ছাড়বে আজকে। সম্ভবত সকালেই ফিরে গিয়েছে। রাতে ইয়াজের এক লোককে খুন করে সে রক্তের দাগ ধুয়ে মুছে সাফ করে ভদ্র পুরুষ হয়ে বাড়িতে ফিরবে। তা হয় কি করে! সামনাসামনি আলাপে আসা দরকার।
রোদ পরে গেছে এখন। সূর্য সবে বিদেয় নেবো নেবো করছে। নিশির ঘরে বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে আছে গোটা দশেক শাড়ি। সেগুলো উদগ্রীব হয়ে নাড়াচাড়া করছে তমা। ঈশান চলে যাওয়ায় এবারের ঈদ তো তাদের মাঠে মারা গিয়েছে। না তারপর আর কোথাও ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে আর না তো তারা নিজেদের মতো একটু সেলিব্রেট করেছে।
আজ হঠাৎই তমার বায়নায় সবাই শাড়ি নিয়ে বসেছে। প্ল্যান শাড়ি পরে বাড়ির ছাদে,বাগানে হালকা পাতলা ফটোসেশান হবে আরকি।
তবে আশ্চর্যজনক ভাবে নূরিকে কিছুতেই রাজি করানো যাচ্ছিলো না। এমনকি নিজ ঘর থেকে বের ও হয়নি তখন। বলাবাহুল্য সেরকমই কোনো এক অজানা আশঙ্কায় নিশি নিজেও জোরাজুরি করেনি নূরিকে। আর না তো তমা বা তিতির কে জোর করতে দিয়েছে। তবে খানিক পরেই নিজ থেকেই এসে যোগ দিয়েছে বোনদের সাথে।
রিশা,রোশনিদের স্কুল খুললেই হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা। তাদের খানিকবাদেই পড়তে বসার তাগাদা দেওয়া হবে। সুতরাং তাদেরও আনন্দের সাথে শাড়ি পরতে যাওয়ার বায়না ধোপে টেকেনি।
তিতির অবশ্য নিজের নতুন শাড়িটা কোলের ওপর নিয়ে বসে আছে। এটা এই ঈদে তমা গিফট করা সেই শাড়িটা। নিশি শাড়ি পরাচ্ছে নূরিকে। তিতির চোখমুখ মলিন করে বসা। পেটের ব্যাথায় নড়তেচড়তে পারছে না বেচারি। অথচ তমার অত্যাচারে এখন নাকি শাড়ি পরতে হবে!
একে তো কয়েকদিন হলোই বৃষ্টির দেখা নেই। গরমে অসহ্যকর পরিস্থিতি। এসির নিচ থেকে সরতে হাঁশফাস লাগে। এর মধ্যে কোন শখে শাড়ি পরতে হবে সে কথার জবাব তমার কাছ থেকে পাওয়ার আশা করাই ভুল। নিশি চাইলেই মানা করে দিতে পারতো। তবে ঈশান না থাকায় তিতিরের মন খারাপ আবার অন্য দিকে নূরির অবস্থা! সব মিলিয়েই রাজি হয়েছে। হৈ হুল্লোড় এর মধ্যে থাকলে মনটাও ভালো থাকে।
তিতিরকেই শাড়িটা পরানো হচ্ছে। ছাদ থেকে আচারের থালা হাতে নামতে নামতে রাহেলা,রিক্তা এসে দাড়ালো মেয়েদের কাছে। বরাবরই সকলে রাহেলার থেকে শাড়ি পরলেও আজ তার ব্যাস্ততা তুঙ্গে।
সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে রিক্তা চাপা গলায় বললো,
—”ঈশান রওনা দিয়েছে এটা বললে না কেনো? খুশি হয়ে যেতো মেয়েগুলো।”
রাহেলা ঠোঁট টিপে হাসে জায়ের কথায়। নিজেও চাপা কন্ঠে বলে,
—”ছেলে তার বউকে সারপ্রাইজ দেবে। আমি সেটায় ব্যাগড়া দেবো! এ আবার কেমন কথা?”
রাতে রওনা দেওয়া কথা থাকলেও এদিককার কাজের ঝামেলা মিটিয়ে ঈশান বেলা থাকতেই রওনা দিয়েছে। কানে এসেছে সাজিদের শহরে আসার খবর। সাজিদ নিজেও কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে ঈশানের সাথে। ঈশান ইচ্ছে করেই যোগাযোগ টা করেনি। তারও কারণ আছে বইকি। বেস্ট ফ্রেন্ড হতে পারে তবুও গতকালের রক্তের দাগ ঈশানের হাত থেকে এখনো শুকায়নি। এএসপি সাহেবের শকুনের চোখ। বেফাঁস কিছু তার চোখে পরবে কি-না কে জানে৷
মাগরীবের আজান পরেছে বেশখানিকটা আগেই। পথঘাটে বিন্দুমাত্র দিনের আলোর ছিটেফোঁটা নেই এখন। রাস্তার প্রচুর মানুষজনের সমাগম। গাড়িগুলোতে শহরমুখী মানুষের উপচে পরা ভিড়। ঈদের ছয় দিন চলে। ছুটি শেষ সকলের। ফিরে আসছে যার যার কর্মস্থলে। স্বাভাবিক গতির থেকে বেশ জোরেই ছুটে চলছে ঈশানের গাড়িখানা। বাড়ি পৌছুতে আরও ঘন্টা চারেক লাগবে। অর্থাৎ তখন সময় থাকবে এগারো বা বারোটার আশেপাশে। তিতির তখনই শুতে যায়। মেয়েটা আজ আবার আরও আগে ঘুমিয়ে না পরে। এই সাতদিন সাত জনম লেগেছে তার কাছে। ওই মুখ, সে মুখের মিষ্টি হাসি, রাগে-অভিমান, কন্ঠস্বর। কতদিন সামনা-সামনি অনূভব করা হয়না। ওই শরীরের মাতাল করা ঘ্রান কতদিন টানা হয়না।
হাসলো ঈশান। পাগল হয়ে গিয়েছে সে। আজ থেকে দু মাস আগেও কি ভেবেছিলো এই মেয়েকে না দেখতে পেলে এরকম ছটফট লাগবে তার। দিনের পর দিন,বছরের পর বছর বাড়িতে ফেরেনি। বাড়ির মানুষের শত ডাকাডাকিতেও নয়। অথচ আজ! কি হয়েছে তার! এটাকেই ভালোবাসা বলে বুঝি!
আজ তিতিরের ফোন এসেছে অনেকবার। কাল রাতে কথা বলে ঘুমিয়েছে দুজন প্রায় একই সাথে। আজ ঈশান ফিরবে কি-না এ নিয়েও শতবার ম্যাসেজ করেছে এরই মধ্যে। ঈশান জবাব দেয়নি। কোথায় ভেবেছিলো এদিককার কাজ চাপিয়ে রেখো গেলো, এবার অন্তত বউকে কাছে পাবে। সে গুড়ে বালি। সে তো ভুলেই যায় তার বউয়ের পিরিয়ড,তার সাথে বিরোধিতায় নেমেছে। সে যতবার কাছে টানবে ততবার সে ব্যাটা হাজির।
—”ভীষন ভোগালি মেয়ে। জীবনে বিয়ে একটা করলাম। দুই দুইটা মাস সে বিয়ের। এখনো কাছে টানতে পারলাম না। মানুষ জলে-জঙ্গলে, গাড়ি-ঘোড়া, আকাশ-পাতাল কোথাও ছাড়ে না বউকে কাছে পেলে। বাসর সেরে ফেলে। আর আমি শালা সাজানো গোছানো সব পেয়েও অভুক্ত হয়ে বসে আছি! ঈশান আরশাদ দেওয়ান বিয়ের দুইমাসেও ভার্জিনিটি খোয়াতে পারলনা। ডিপ্রেশন এ পরার জন্য এতটুকুই এনাফ।”
কথাগুলো বিরবির করে আউরালো ঈশান। ফাঁকা গাড়িতে কথাগুলো বলে একাই শব্দ করে হেসে ফেললো। যতবার তিতিরকে কাছে টানে, ওইটুকুতেই মেয়েটার যা অবস্থা হয়। বাকিটাতে এগোলে সে মেয়ে বেঁচে থাকলে হয়। লজ্জায় মাটি ফুঁড়ে পালাতে চাইবে।
জনসমাগম ছাড়িয়ে এসে হাইরোডে উঠেছে ঈশান। শো শো করে বাস, ট্রাক চলছে অনবরত। কার আগে কে যেতে পারে সেই প্রতিযোগিতা সবেতেই। ঈশানও একই খেয়ালে আছে যদিও।
আচমকা খেয়াল হলো বেশ দূর থেকে একটা গাড়ি তার গাড়ির একদম সোজা আসছে। উল্টোদিকের গাড়িটির জন্য এটা ভুল সাইট। ঈশান ভ্রু কুচকে হর্ন দিলো কয়েকবার। উহু সমান গতিতেই আসছে। বাধ্য হয়ে নিজের গাড়ি স্লো করে সাইট কাটলো সে। তবে গাড়িটি মোটেই চলে গেলো না। খানিকবাদেই ফ্রন্ট মিররে চোখে পরলো একই গাড়ি তার গাড়ির পিছন পিছন। ক্রমাগত হর্ন দিচ্ছে। ঈশান বিরক্ত হলো! কোন পাগলের পাল্লায় পরলো। আর একবার শব্দ করতেই ঈশান কড়া ব্রেক করে গাড়ি সাইট করলো রাস্তার বা পাশে। বলাবাহুল্য গাড়িটা পাশ কাটিয়ে বেশ দূর অবধি গিশেও আবার ঘুরে এসে মুখোমুখি হলো ঈশানের গাড়ির।
কোন এক খেয়ালে ঈশানের হাত চেক করে নিলো পিছনে শার্টের নিচে গোজা আগ্নেয়াস্ত্রটিকে। ব্যাস্ত রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি চলছে। আশেপাশে কোনো দোকানপাট নেই। লোকালয় থেকে বেশ দূরেই এসেছে। ঈশান গাড়ি থেকে নেমে দাড়াতেই ওপাশের গাড়ি থেকেও নেমে এলো কেউ একজন। ঈশানের জলন্ত চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। সাথে কপালে ভাজ পরলো একই সাথে। আভিজাত্য বলে দিচ্ছে সাধারণ কেউ নয়।
—” রেগে যাবেন না মিস্টার দেওয়ান। রেগে যাবেন না। আই এপোলাইজড। আমারই ভুল। এভাবে কেউ মাঝরাস্তায় গাড়ি থামায় না। তাও আবার এমন কায়দায়। “
ঈশানের অভিজ্ঞ সত্তা এক ঝটকায় ধরে ফেললো কন্ঠস্বরের মানুষটিকে। এই কন্ঠস্বর কি করে ভোলে সে! ঈশানের মুখে বাঁকা হাসি খেলে গেলো। দু হাত পকেটে গুজলো। নিজের গাড়ির সাথে হালকা হেলান দিয়ে দাড়ালো। বাঁকা কন্ঠেই বললো,
—”চিড়িয়া নিজ থেকে ধরা দিতে চলে এলো? কি ব্যাপার?”
ইয়াজও নিজের গাড়ির সমানে এসে স্থির হয়ে দাড়ালো। ফরমাল ড্রেসআপ। নরমাল মানুষই মনে হয়। তবে একটু খেয়াল করলে এই অতি ফরামলের মধ্যেও বিশাল আভিজাত্য লক্ষ করা যায়। ঈশানের থেকে হাইট সম্ভব খানিকটা কম। সুদর্শন অবশ্যই। ইয়াজ শান্ত স্বরে জবাব দিলো,
—”ভাবলাম সমঝোতায় যখন আসতেই হবে। ঝামেলা করে কি লাভ। বসে কথা বলি?”
ঈশান ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে এদিক ওদিক তাকালো। তারপর হতায়লশ চোখে ইয়াজের দিকে তাকিয়ে। দু হাত গাড়ির বনেটে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে বসলো। ইয়াজকে লক্ষ করে বললো,
—” বসতে পারিস ওখানে। নিচেই বোস। বসে কথা বলি।”
ইয়াজের চোখ জ্বালা করে উঠলো আচমকা। রক্ত গরম তার। ঈশানের গা জ্বলানো কথায় আরও রাগ হয় তার। তবে রাগলো না।
—” ওইযে ওই কথাই। আপনার বউটা লাগতো যে দেওয়ান সাহেব। “
—”আরও কথা কথা জমে আছে তোর আমার! শুরুটা আমার হৃদস্পন্দন নিয়েই করলি! দ্যাটস নট ফেয়ার।”
ইয়াজ শান্ত শকুনের মতো তাকিয়ে থাকে। তাকে এতো খোঁজাখুজি করছিলো। তার তীব্র ধারনা ছিলো আজ হুট করে সে সামনে এসে পরিচয় দিলে বড় চমকান চমকাবে ঈশান। কিন্তু ঈশানের চোখেমুখে তার কোনো আভাসই নেই। অন্য সময় সামনে না এসে এই ফাঁকা হাইরোডে গাড়ি থামিয়ে ঈশানের সামনে আসাও তার সেই পরিকল্পনার মধ্যেই পরে। ঈশানও ভীষন শান্ত হয়েই তাকিয়ে আছে তার দিকে। গোটা মুখজুড়ে খেলে যাচ্ছে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি।
—” তোর ভাইটা ছিলো এক মাদা***। শা*লা তুই তো তার ডাবল দেখছি৷ কারোর থেকে কেউ কম যাস না।”
মৃত্যু ভাইকে নিয়ে ঈশানের মুখের এ কথা ঠিক পছন্দ হলো না ইয়াজের। মুখ ফসকে গালি দিতে গিয়েও থামলো।
—” কেনো মারলি আমার ভাইকে?”
—”সে প্রশ্নের উত্তর জানার হলে তিন বছর আগে এভাবে গাড়ি থামিয়ে প্রশ্ন টা করতে পারতি। এত কাহিনি করার দরকার ছিলো না তো।”
—”আইন ছিলো না? তুই মারার কে?”
—”তখন মনে হয়েছিলো আমিই আইন। শাস্তি দিয়ে দিয়েছি। “
দাঁতে দাঁত পিষলো ইয়াজ। হাতের রগ ফুলে ফেঁপে উঠলো। আজও নির্বিকার। ঈশান আরশাদ দেওয়ান আজও নির্বিকার। এই ভাবলেশহীনতাই সে সহ্য করতে পারে না।
—”তোর মনে হওয়াতে জীবন চলে যাবে সবার?”
—”সবার যেতে হবে কেনো? আমার চলে গেলেই হলো।”
—” তোর আর কিছু জানার নেই?”
হেসে ফেললো ঈশান। ইয়াজের উশখুশ দেখে বললো,
—”ধরা সিগারেট। অনুমতি দিলাম।”
—”নিজেকে মহান মনে করিস?”
—”নাহ তো। সাধারণ মানুষ আমি। মহান হওয়া আমার ধাঁচে নেই। মহান মানুষজনের ত্যাগের লিস্টও বিশাল বড়। আমার সেসব নেই। আমি নিজের জিনিসে এক মিলিমিটার ও ভাগ বসাতে দিতে পারিনা। মহান হওয়ার প্রথম শর্তেই আমি হেরে বসলাম। “
ইয়াজ অপমান অগ্রাহ্য করে সিগারেট ধরায় একটা। নাকেমুখে ধোঁয়া টানে। ঈশান তাকে দেখে অবাক হয়নি,এই মূহুর্তে এটাই তাকে যন্ত্রনা দিচ্ছে বেশি।
—”তোর বোনটাকে নিয়ে আমি খেলবো না। ওকে মুক্তি দেবো। সর্বনাশ টর্বনাশ করা হয়নি। দেওয়ানদের রক্ত। বড্ড শেয়ানা। বোকার হদ্দ অথচ খেয়ালে টনটনা। বিয়ে ছাড়া নাকি ছুঁলে ফোসকা পরবে। অসহ্যকর নাটক সব। যাহ ওটার বিয়েশাদি দিয়ে দে চটজলদি। এটা উঠে গেছে মন থেকে। নাহ, উঠে গেছে মন থেকে, বিষয়টা এমন নয়৷ মনে ছিলোই না কখনো।”
ঈশান এর চোয়াল এ যাত্রায় শক্ত হলো। এক দলা থুথু ফেলে তপ্ত চোখ রাঙিয়ে বললো,
—” ওটা আমার বোন। বোকা,শেয়ানা যা ইচ্ছে বলা যায়না ওকে। তোর মতো শুয়ো*রের মুখ থেকে আমি ওর কমপ্লিমেন্ট থোরাই শুনবো। যা বলার অধিকার, শুধু আমার আর আমার পরিবার এর আছে। তোর না। তবে রুচি খারাপ ওর। সেটা সত্য। দেওয়ান দের রুচি এতো নিম্নস্তরের এটা মানা কষ্ট। সে রাগে কথা বলা বন্ধ করেছি বোনটার সাথে। তোর মতে বোকার হদ্দ। এটাও ঠিক। না হলে তোর মতো কালসাপ কে চিনতে ভুল করে! ভালোবেসে ভুল করে?”
ঈশান ভুরভুর করে সিগারেটের ধোয়া ছাড়ছে। রাগ নিয়ন্ত্রণ হয় না ঈশানের সাথে কথা বলতে গেলে।
—” আমার লোককে কাল মারলি কেনো?”
—”তোর প্রশ্নেই তো উত্তর আছে।”
—”আমার লোক তাই?”
—”বুদ্ধিমান তুই।”
—”আমার সব লোকজন এভাবে মারবি?”
—”যতদিন তুই ধরা না দিস।”
—”রুষা কে, তা তুই জানতি না?”
বিচিত্র হাসলো ঈশান। দু হাতে মাথার চুলগুলো পিছনে ঠেলে আঙুলে ব্যাকব্রাশ করলো। শান্ত স্বীকারোক্তিতে বললো,
—”আমার সাথে যে ছলনা করতে এসেছিলো সেটা শুরুতেই জেনেছিলাম। ছলনার উদ্দেশ্য কি সেটা একটু সময় লেগেছে। আর…”
—”আর?”
—” আর কি? আজ জানলাম তুই রুষা এক গোয়ালের গরু। “
ইয়াজ থমকায়। হটকারিতায় প্রকাশ পেয়ে গেলো তার সাথে রুষার কানেকশন এর কথা। ঈশানই আচমকা ভ্রু কুচকে ভীষন অনুসন্ধানি গলায় বললো,
—”রুষমিতা মির্জা! ইয়াজ মির্জা!”
এই হিসেবে মেলাতে বসেছিলাম যেদিন তোর নাম জানতে পারি। আজ সন্দেহ দূর হলো। ওটাকে মাফ করতে চাই বরাবর। বেচারি ভালোবাসে আমাকে। সেটায় সন্দেহ নেই।”
—”মুখ সামলে বল। রুষার তোর প্রতি ভালোবাসা নেই। সব আমার কথা মতো।”
—”নাটক সিনেমার ডায়লগ কম দে। বাড়ি যাবো। রাস্তা থেকে সরে দারা। তোকে ধরার এটা সময় নাহ। চাইলেই এখানে সুট করে রেখে যেতে পারি। সেটা করার সময় না এটা। ক্যানো না বলতো? তুইও জানিস, আমিও জানি। তোর সময় ঘনিয়ে এসেছে। কালেমা পর এ কয়দিন।”
ঈশান বাঁকা হাসি দিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে এমন সময় শোনা গেলো ইয়াজের একরোখা কন্ঠস্বর।
____” তিতির ইজ গোয়িং টু বি মাইন।”
পা জোড়া স্থির হলো ঈশানের। চোখ বুঝে শ্বাস ছাড়লো জোরে জোরে। ঘুরে দাড়ালো হাসি হাসি মুখে। মনে হলো ইয়াজের কথায় হাসি পেলো যেনো ঈশানের ।
ওদিকে চোখমুখ কঠিন করে তাকিয়ে আছে ঈশানের দিকেই। চোখেমুখে অগ্নি ঝরছে যেনো। ঈশানের
গাড়ির ফ্রন্ট লাইটের আলোয় কেমন একটা ভয়ংকর মুখাবয়ব। হুট করেই ঈশানের মনে হলো
এই মুখ, এই দেহের গঠন, এর আগেও কারোর দেখেছে। কোথায় একটা দেখেছে ঈশান। কিন্তু কোথায়? খুবই পরিচিত লাগলো।
ঈশান একগাল হেসে বাঁকা গলায় বললো,
____” বউটা অপেক্ষা করছে আমার আদরের। আর তুই কি-না বিবাহিত নারীর পিছনে হা হুতাশ করে মরছিস! মির্জা বংশের ছেলের সাথে এই ইমেজ যায়?”
____” দেওয়ান দের সাথে মিথ্যা,ছলনা,খুন, ধর্ষ** সব চলে? মির্জা রা কিছু চাইলেই দোষ?
ইয়াজের কথার পাত্তা দিলো না ঈশান। উন্মাদের প্রলাপে কান দিলে চলে! ঈশান তীক্ষ্ণ অথচ হাসিমুখে তাকিয়ে রইলো।
____ “ওউকাত অনুযায়ী চাইতে হয়। বিড়ির টানার জন্য পাঁচ দশ টাকা চাইতি। এক দু বেলা কাঙালি
ভোজন করতে চাইতি। করাতাম। সমস্যা কি! তাই বলে শেষমেষ ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর বউ চাস?
আরেহ্ বোকা একটাই জীবন। মায়া কর অন্তত…
ইয়াজ বিশ্রি হাসলো এ যাত্রায়। ফিসফিস করে বললো,
____”তুই যে জলদিই জেলের ভাত খাবি, রে*প কেসে ফেসে যাবি। তখন তোর
বউকে আগলাতে কাউকে লাগবে তো নাকি?”
দু হাত তুলে স্যারেন্ডার করার ভঙ্গিতে দাড়ালো ঈশান। কপট ভয় মুখে খেলা করে গেলো তার। ভয় পাওয়া স্বরে বললো,
—” তোর ক্ষমতা আছে? দয়া করে আমার সাথে এই অন্যায় টা করিস না। আমার বউ,আমার পরিবার শেষ হয়ে যাবে ইয়াজ সাহেব! এটা করবেন না আমার সাথে। “
কথাগুলো একদমে বলে শব্দ করে হাসতে হাসতে নিজের গাড়িতে উঠে বসলো ঈশান। ইয়াজ তখনো নড়চড়হীন দাড়িয়ে। ঈশানের ভাবভঙ্গি আজ সামনে থেকে দেখার সময় পেলো। যতদূর জানতো ছেলেটা কথা কম বলে,বদমেজাজি। সেসব আজ মনে হলো না। উল্টো বোঝা গেলো ধৈর্য্যর পাহাড় ও একটা।
এতদিন যাকে খুজে আসছে। তাকে পেয়েও ভাবের পরিবর্তন হলো না। আবার কোন প্যাচের ছক কষছে সেটা কে জানে!
বোনেরা সবাই মিলে ছাদে আড্ডা দিতে ব্যাস্ত। বিকেল থেকে শাড়ি পরে গোটা বাগান ছোটাছুটি করেছে সবগুলো। ফটোসেশান করতে করতে নিজেরাই ক্লান্ত এখন। সন্ধ্যার পর ছাঁদের ফেইরি লাইটের আলোয় তোলা ছবিগুলো এখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে সবাই। সারাদিন এর ভ্যাপসা গরম এখন দ্বিগুণ বেড়েছে। পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। এমন গরম পরলে সাধারণত ঝড় বৃষ্টি হয়।
রাহেলা কয়েকবার ডেকে গেছেন মেয়েদের। নিচে নেমে খাবার খেয়ে নিতে। কে শোনে কার কথা। রাফি,রোশনিরাও নিজেদের পড়া শেষ করে ছুটে এসেছে ছাদে। এবং সাথে করে টেনে নিয়ে এসেছে নয়নকে।
এবারে হৃদয় থমকালো তমার। সে শাড়ি পরে, সেজেগুজে এতো ঘুরঘুর করছে কার জন্য! ওই মানুষটার জন্যই তো। তবে নয়ন এর অবাধ্য চোখ সর্বপ্রথম তিতিরের ওপরেই গিয়ে ঠেকেছে। ডার্ক গ্রিন একটা জরজেট শাড়ি গায়ে মেয়েটার। তবে নিজের দৃষ্টি সংযত করলো সে দ্রুতই। অনূভুতি গুলোকে চাপা দিতে দিতে আজকাল দক্ষ হয়ে গিয়েছে সে।
তাকে দেখে সবার আগো এগিয়ে এলো তমাই। একগাল হেসে প্রশ্ন ছুড়লো,
—”কখন এলেন নয়ন ভাইয়া?”
—”সবেই।”
নয়ন মাত্রই এসেছে অফিস থেকে। গায়ে পোষাকও রয়েছে অফিসের। চেঞ্জ করার সময় টা অবধি পায়নি। রাফির পাল্লায় পরে ছুটে আসতে হয়েছে। নয়ন তমাকে পাশ কাটিয়ে বাকি তিনজনের দিকে এগিয়ে যেতেই মলিন হয় তমার মুখ। একটাবার তাকালোও না!
—”মা, বড় মা ডাকছিলো তোদের। খাবিনা?”
মাথা নাড়লো সকলেই। নামা উচিত। মশাও অত্যাচার করছে।
—”বড় ভাইয়া আসছে জানো, বার্বি?”
রাফির কথায় হা হয়ে গেলো তিতির। আসছে মানে! কই তাকে তো বললো না কিছু। নয়ন একনজর দেখলো তিতিরের অপ্রকাশিত উচ্ছ্বসিত মুখের ভাবভঙ্গি। অশান্তি হয় এই মুখ দেখলে। নড়বড় করে বুকের ভিতর।
শাড়ির কুচি আকড়ে সবার আগে নামলো তিতিরই। তার ফোনে চার্জ নেই। ঘরে গিয়ে ঈশানের খোঁজ নেবে আগে। নিশি,নূরি বাকিদের নিয়ে নেমে গেলো একে একে। ভাইবোনদের সবার প্রস্থান শেষে পা বাড়ালো নয়ন।
—”আমি এখনো ছাদে আছি। খেয়াল করেননি বুঝি?”
নয়ন পিছনে ঘোরে না। তবে সিঁড়ির দরজা ধরে দাড়ায়। তমা নিজ থেকেই এগিয়ে এলে। তবে নেমে গেলো না। বরং একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসলো। নয়নের ঘর্মাক্ত কবজি ধরে নিজের দিকে ফেরালো। নয়নের চোখমুখ অস্বাভাবিক ভাজ পরলো। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—”খেয়াল করিনি। নামো এখন। নাকি একা ছাদে থাকার শখ?”
তমার মিষ্টি হাসলো। নয়নের হাত তখনো ছাড়েনি সে।
—”একা এখানে থাকার শখ থাকলে আপনাকে পিছু ডাকতাম বুঝি? “
—”নিচে চলো। “
—”আমার আপনাকে কিছু বলার আছে?”
নয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তমার নরম হাতের মধ্যে শক্ত করে আকড়ে থাকা নিজের হাতটা আলগোছে সরিয়ে নিলো। অনেকটা বল খাটিয়েই।
—”পরে শুনবো। এখন চলো।”
—”আপনি ঠিক এতোটাই বোকা? নাকি আমার কাছে বোকা সাজেন?”
সারাদিন এর ক্লান্তি শেষ বাড়িতে আসা মাত্রই এরকম হেয়ালিপনায় আটকে যাওয়া পছন্দ হলো না নয়নের। বিরক্তির ছাপ চোখেমুখে ফুটে উঠলো স্পষ্ট।
—” আগে থেকেই মুখে লাগাম নেই। তবে আজকাল কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটাও ভুলে গেছো দেখছি।”
তমা কেমন মলিন হাসলো। নয়ন ভাই ইহজন্মে কারোর সাথে রুক্ষ ভাবে কথা বলেনি। নিজের পরিবার তো দূরে থাক বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় সজন কারোর সাথে নয়। ঈশান বরাবর বদমেজাজি, গম্ভীর থাকতো। ভাইবোনদের সাথে আহ্লাদ করতে পারতো না। তার থেকে সবাই দূরে দূরেই থাকতো। কিন্তু ব্যাতিক্রম ছিলো নয়ন। সবার সব বায়না থাকতো নয়নের কাছে। আজকাল সেই নয়ন ভাইয়ের এ রুপ সহজে হজম হতে চায়না তমার। আর রইলো বাকি তার সাথে ব্যবহার! এটা তো আরও মেলাতে পারে না।
তমার নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
—”আপনি তো এমন ছিলেন না, নয়ন ভাইয়া।”
নয়ন কেমন একটা হাসলো। ভ্রু জোড়া নাচিয়ে প্রশ্ন করলো,
—”কেমন ছিলাম?”
—”ভাবুন কেমন ছিলেন।”
—”মানুষ পরিবর্তন হয়না?”
—”হয়। তবে হুট করে এতটা?”
—”ও তোমার মনের ভুল। চলো নিচে চলো।”
নয়ন তমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবার হাঁটা ধরতেই সামনে চলে এলো তমা।
—”আমার কথা শেষ হয়নি। “
—”পরে শুনবো।”
—”এখন।”
—”বেশ একমিনিটে শেষ করো।”
নয়নের এমন ব্যবহার ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে তমাকে। কি কারনে এই অ-মূল পরিবর্তন তার জবাব আশাও করতে পারছে না সে।
—”আপনি কি কিচ্ছু বোঝেনা না? আমি কি বলতে চাই টের পান না?”
নয়ন শুকনো ঢোক গেলে। এলোমেলো দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে।
—”নাহ।”
তমা নয়নের থেকে সামান্য দুরত্বেই দাড়ানো। সামনের মানুষটার শরীর থেকে কেমন একটা অতি পছন্দের ঘ্রান ভেসে আসছে। তমা ঠোঁট কামড়ে ধরে কথা সাজায় হয়তো।
—”আমি আপনাকে পছন্দ করি নয়ন ভাই।”
নয়ন নির্বিকার। তমার বলা কথাগুলো সম্পর্কে যেনো বহু আগে থেকে অবগত সে। এবং এ কারনেই দুরত্ব বাড়ানো মেয়েটার থেকে। সে তো ভালোবাসেনা। বিন্দুমাত্র না। নয়ন শান্ত কন্ঠে বলে,
—”কাকে কি বলছো ভেবে বলছো? কমনসেন্স কোথায়? সম্পর্কে আমি তোমার ভাই হই।”
—”তো? বড়ভাইয়া আর বার্বি..।”
ক্ষততে পুনরায় আঘাত করলো যেনো তমা। ধমকে উঠলো নয়ন।
—”মানসম্মান এর কথা ভুলতে বসেছো? সম্পর্কের সমীকরণ এর গুরুত্ব, সম্মান নেই? “
তমা আচমকা ধমকে কেঁপে ওঠে কানিকটা। তবে সামলেও নেয় জলদিই।
—”আমার কথাটা…”
—”আমি তোমাকে পছন্দ করিনা তমা। আমার বোন হও সম্পর্কে। সেরকম কোনো ফিলিংস আসেনি। আসবেউ না।”
তমা থমকে তাকিয়ে থাকে। নয়ন ভাবলেশহীন। তমার কথায় আহামরি যায় আসলো না তার হয়তো বা। আবার এমনও হতে পারে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলো না। তমা দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞেস করলো,
—”আ-আপনি কাউকে ভালোবাসেন নয়ন ভাই?”
—”হুম।”
সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৪
নয়ন আর দাড়ায় না। তমার বাহু টেনে সরিয়ে নেমে যায় নিচে। তমা নড়ে না। ওখানেই দাড়িয়ে থাকে। এতোদিনের ভালোবাসা তার! যখন থেকে রোমান্টিকতা বুঝতে শিখেছে নয়ন কে ছাড়া কখনো কারোর দিকে তাকানো হয়নি।
তারই আদতে বলতে দেরি হয়ে গেলো নাকি অন্য কিছু আছে এর মধ্যে ধরা কঠিন। চোখ জ্বালা করছে তমার। অসম্ভব জ্বলছে। নিশুতি রাতে জীবনের প্রথম ভালোবাসার কাছে নিজের মনে ব্যাকুল অনূভুতি ব্যাক্ত করার পর, সে মানুষ টা যখন জানান দেয় তার মনে বাস করে অন্য কেউ। ভালোবাসে সে অন্য কাউকে। এপাশের মানুষটার মনের অবস্থা তখন কেমন হবে আাশা করা যায়! দু হাতে মুখ চেপে হু হু করে কেঁদে ফেললো তমা।
