Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ৭
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে ইশান।সাথে নয়ন,নিশি,নূরি আর ছোট বিচ্ছু তিনজনও রয়েছে।রিশা,রোশনি,রাফিকে কিছুতেই বাড়িতে রেখে আসা যায়নি।একপ্রকার হাত পা ছোড়াছুড়ি করে কান্নাকাটি করে সাথে এসেছে।সে বারবার বুঝিয়েও লাভ হয়নি।
ঘন্টাখানেক হলো এখানে দাড়িয়ে আছে তারা।ছেলেমেয়ে গুলো আসতে পেরে মহা খুশি।ইশান ভেবে পায়না মাঝরাত্তিরে এতো মাতামাতি করার কি আছে!মেয়েটা পনেরো-ষোল ঘন্টার জার্নি করে ফিরছে,কতটা টায়ার্ড হতে পারে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তাছাড়া জন্মদিন তো কাল সারাদিন ও থাকবে।ভদ্রঘরের ছেলেমেয়ে রা এমন মাঝরাতে স্টেশনে দাড়িয়ে জন্মদিন পালন করছে বিষয়টাই দৃষ্টিকটু।কিন্তু কাকে বোঝাবে সে এইসব।এরা না হয় ইমম্যুচুয়র।বাড়ির বড়রাই মূলত উসকে পাঠিয়ে দিয়েছে।আশ্চর্য বাড়ির মানুষ তার একেকজন। তার বাবা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন তার বাড়ির ছেলেমেয়েদের মানসম্মান এতো ঠুনকো নয় যে নিজেদের জীবনের এতটুকু আনন্দ করলে সম্মানহানি ঘটবে।

ইশান আর কথা না বাড়িয়ে একপ্রকার ধমকাতে ধমকাতে নিয়ে এসেছে সবকটাকে।তিতির টা যথেষ্ট বড় হয়েছে,নিশি,নূরি আরও বড়,রিশা,রোশনি তারাও।বাড়ির এতো বড় বড় মেয়েকে নিয়ে এতো রাতে বের হওয়াটাও অনিরাপদ। কে শোনে কার কথা।তাদের মতো বড় বড় দুটো ভাই থাকতে বোনদের দিকে বাজে নজর দিলে তারা আবার কেমন ভাই।এহেন আরও জ্ঞান দিয়ে সবকটাকে পাঠিয়ে দিয়েছে তার সাথে।
রাত্রীর এখন এগারোটা বেজে আটত্রিশ। মোটামুটি মফস্বলের দিকে রাত এগারোটা মানে মাঝরাতই বলা চলে।স্টেশন পুরো ফাঁকা। আশপাশে শুধু ঝি ঝি পোকার শব্দ ভেসে আসছে।টিমটিম করে জ্বলছে স্টেশনের একসাইটে ল্যাম্পপোস্টের আলো টা।

ইশান এই মূহুর্তে বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে খোলা যাত্রী ছাওনির পিলারে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে।নয়ন পাশেই চিন্তিত ভঙ্গিতে ফোন করে যাচ্ছে বারবার তিতির কে।ফোনটা বন্ধ দেখাচ্ছে।ইশান তাকালো পাশে।ছোট তিনজন একপ্রকার ছটফট করছে যেনো উঠে দৌড়াদৌড়ি করতে।কিন্তু ইশান এর ভয়ে করতে পারছে না।নিয়ে আসার প্রধান শর্ত ছিলো স্ট্যাচু হয়ে বসে থাকতে হবে এখানে এসে।নিশি, নূরি দুজন চাপা গলায় তিতির কে কিভাবে কি কি করে চমকে দেবে সেই পরিকল্পনায় ব্যাস্ত। পাশেই সিটের ওপর বিশাল একটা কেক রাখা,আর হাতলের সাথে শ’খানেক বেলুনের বিশাল এক বহর বাঁধা। ইশান ঘুরে আবার তাকিয়ে থাকে লাইনের দিকে। ট্রেন আসতে বোধহয় আনুমানিক আর মিনিট দশেক লাগবে।

তিতির টুকিটাকি যা বাইরে ছিলো সব দেখে ব্যাগে তুলে ফেললো।সামনে অনিমা,সাজিদ ও সবটা দেখেশুনে গুছিয়ে নিলো।নামার প্রস্তুতি চলছে।
রানা মালপত্র টেনে দরজার কাছে নিয়ে যাচ্ছে।এই স্টেশনে তারা ছাড়া আর কারোর নামার সম্ভাবনা নেই এই মূহুর্তে। তিতির এর আজকের মতো বিরক্তিকর জার্নি আগে কখনো করেনি।এর আগে যতবার বাড়ি এসেছে এতটা ধকল কোনোবার হয়নি।বিরক্তি নিয়ে ফোন চালু করার চেষ্টা করলো আবার।পাওয়ার অফ হয়ে গেছে।ভাগ্যিস নয়ন ভাইকে আগেই লোকেশন জানিয়ে দিতে পেরেছিলো।
অনিমা তাকালো তিতির এর দিকে।আহারে মুখটা একদম শুকনো দেখাচ্ছে।বাচ্চা একটা মেয়ে।এতদূর একা ট্রাভেল করছে,তারমধ্যে এতোক্ষণ আটকে থাকা ট্রেনে।আলতো গলায় বললো,”খুব ক্লান্ত লাগছে সোনা?আর দশ মিনিট।”
তিতির মিষ্টি হাসলো।এই এতটুকু সময়েই মানুষ গুলো তাকে বড্ড আপন করে নিয়েছে। ইশান ভাইয়ের বোন বলে হয়তো।কত্তো আদর করছে।ট্রেনেই জোরে হুইশেল শোনা গেলো।স্টেশন এসে গেছে।সাজিদ এসে ওদের তাড়া দিলো বের হতে।অনিমা তিতিরের হাত ধরে বেরিয়ো এলো কামড়া থেকে।চোখ বুলিয়ে নিলো একবার ভেতরটা।কিছু রেখে যাচ্ছে কিনা।

ট্রেন থামতেই নেমে পরলো আগে তিতির আর অনিমা।রানা ওদের দিকে ফিরে বললো,” অনি তুই তিতির কে নিয়ে হেটে ওদিক যা।আমরা জিনিসপত্র নামিয়ে নিয়ে আসছি।এতো এদিকটায় থামবে বুঝতে পারিনি।তিতির এর তো অনেক জিনিস।আমর ভ্যান ঠিক করে এগুলো নিয়ে আসছি।
সামনে তিতির এর বাড়ির মানুষ আছে।যা এগিয়ে।”
তিতির অণিমা হাটা ধরলে।বিশাল স্টেশনের মাঝামাঝি আসতেই দূরে থেকে হৈ হৈ করে ছুটে আসতে দেখা গেলো কয়েকজন কে।অন্ধকার ঠেলে সামনে আসতেই রিশা,রোশনি,রাফি ঝাপিয়ে পরলো তিতিরের দিকে।জড়িয়ে ধরলো বোনকে।তিতির ভারসাম্য রাখতে না পেরে পিছিয়ে গেলো কয়েকপা।পরে যাওয়ার আগেই তাকে জড়িয়ে ধরলো অনিমা।উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সবাই।দুহাতে জড়িয়ে রাখলো ভাইবোনগুলোকে।ওদের ছেড়ে সোজা হতেই দেখলে ছুটে আসছে নিশি,নূরি।তাদের বেশ খানিকটা পেছনে স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে আসছে দুজন পুরুষ।
নিশির হাত অনুসরণ করে ওপরে তাকালো তিতির।কম করে হলেও একশ বেলুন একসাথে বাধা।মনটা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। বড় দুবোন এসেও জড়িয়ে নিলো।তারপর একমুহূর্ত থেমে সবাই একসাথে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলো,”হ্যাপি বার্থডে বার্বিডল ”
তিতির বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলো এবার।এতক্ষণে খেয়াল করলো তাকে নিতে বাড়ির সবগুলা ভাইবোনই এসেছে।খুশিতে চোখে পানি এসে গেলো তার।সারাদিন এর জার্নি নিমিষেই কেটে গেলো যেনো।খুশিতে কাঁপা গলায় বললো,”থ্যাংক ইউ”…

এবার নয়ন এসে দাড়ালো তিতির এর পাশে।একহাতে জড়িয়ে ধরলো মেয়েটাকে।অণিমা গিয়ে জড়িয়ে ধরলো ইশান কে।অণিমাকে এখানে আসা করেনি সে।অণিমা বুঝতে পেরে একগাল হেসে বললো,”আমাকে আশা করিসনি না?ইচ্ছে করেই জানাইনি।তিতির কে বলতে নিষেধ করেছিলাম। জানতাম সারপ্রাইজ হবি.”
ইশান হাসলো,এদিক ওদিক তাকালো।অণিমা বললো,”সাজিদ, রানা আসছে।জিনিসপত্র নিয়ে ভ্যানে।আমরা অপেক্ষা করিনি ওপাশে।”
ইশান টুকটাক কথা শেষে তাকিয়ে রইলো তিতির কে দেখার জন্য। সবার আড়ালে দেখাই যাচ্ছে না মেয়েটাকে।এমন ভাবে সবকটা ঘিরে ধরে আছে।নয়নকে জড়িয়ে ধরে আছে।নয়নের কোমড়ের পিছনে তিতির এর ফর্শা ঘড়ি দেওয়া হাত দেখা যাচ্ছে। কেনো যেনো এই মূহুর্তে তার দারুণ বিরক্ত লাগছে।ইশান ঠায় দাড়িয়ে রইলো সেভাবেই।
এবার নিশি,নূরি ঘুরে তিতিরকে নিয়ে হাঁটা দিলো কেকের দিকে।ওরা সরতেই দৃশ্যমান হলো যে সাক্ষাৎ এক হুরপরীর। ইশান থমকে গেলো এক মূহুর্ত।পলক ফেলতে ভুলে গেলো বোধহয়।সামনের মেয়েটা কোনো এক রুপকথার গল্পের রাজকন্যা মনে হচ্ছে। অস্বাভাবিক সুন্দর একজন কিশোরী।

দুপাশে কোমড় ছাড়ানো চুলগুলো বেণী করে রাখা।সারাদিন এর ক্লান্তিতে চুলগুলো বেশ অগোছালো। অবাধ্য এক গোছা চুল চোখমুখ লেপটে আছে।দারুণ ক্লান্তি ভর করেছে ওই মায়াবী, লাল টকটকে মুখটায়।কমলার কোয়ার মতো লাল-গোলাপি পাতলা ঠোটখানা।গায়ে সাদা আনারকলি। ইশানের মনে হলো এরকম মেয়ে দুনিয়ার হতে পারেনা।হঠাৎ করে মাঝরাত্তিরে গ্রামের এই শুনশান স্টেশনে এমন মেয়েকে দেখলে যেকোনো মানুষ আসমানের জিন পরী ভেবে ভুল করে বসলে অস্বাভাবিক হবে না বিষয়টা।পরী রা বোধহয় এমনই দেখতে হয়।
হঠাৎই নয়নের হাতের ঝাঁকিতে ঘোর কাটলো ইশানের।পাশে তাকাতেই খেয়াল হলো আশেপাশে সবাই ইতিমধ্যেই তিতিরকে নিয়ে চলে গেছে ওদিকটায়।
নয়ন চিন্তিত গলায় বললো,”ঠিক আছো ভাই?চলো ওদিকটায় যাবে চলো।”
ইশান ঘুরে তাকায়।তিতির রা হৈ হুল্লোড় করছে।
নয়নকে যেতে বলে সে ঠায় দাড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

নয়ন মাথা নেড়ে দ্রুত পায়ে হেটে যায় বাকিদের দিকে।।এতক্ষণ কোন খেয়ালে ছিলো সেটা মাথায় আসতেই চমকে উঠলো নিজেই।ধিক্কার জানালো নিজেকে।কি ভাবছিলো সে এতক্ষণ। ছিহ্। ছোট বোন হয় তার তিতির।সেটা মামাতো, ফুপাতো যেমনই হোক,বোন তো বোনই।
ইশান বিরক্ত হলো নিজের ওপর।সবার এতো এতো বর্ণনায় মেয়েটাকে এতো বছর পর একটু বেশিই দেখার ইচ্ছে ছিলো বোধহয়। রুপের বর্ণনায় চোখের সামনে মেয়েটার রুপেই সেই ঘোরে চলে গেছিলো।আর কিছুনা।নিজেকে একগাদা বুঝ দিয়ে হাঁটা দিলো সবার দিকে।পকেট থেকে হাতড়ে ফোন বের করে কল করলো সাজিদ কে।জানালো তারা আসছে।মালপত্র ভ্যানে তুলছে।
ইশান দাড়ায় ছেলেমেয়েগুলোর দিকে।সবাই হৈ হুল্লোড় করছে।এরই মধ্যে তিতিরের মাথায় প্রিন্সেস ক্রাউন দেওয়া হয়ে গেছে। কেক সাজিয়ে ফেলা হয়েছে। ইশান তাকিয়ে থাকে সেদিকে।মেয়েটা সত্যি স্নিগ্ধ। হঠাৎই বেশ কয়েক বছর আগের মেয়েটাকে থাপ্পড় মারার দিনটার কথা মনে পরে গেলো।দারুণ মায়া হলো এই মূহুর্তে তার ।এই গালে হাত তোলা যায়!

তিতির এখন নিশি,নূরির,নয়নের কাছে সারাদিন এর বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা জানাচ্ছে হাত নেড়ে নেড়ে।
পিছনে ভ্যানের শব্দে তাকালো সবাই।ভ্যান এসে পাশে থামতেই নিশি থতমত খেয়ে গেলো।অনিতা,নূরি,সাজিদ মিটিমিটি হাসে দু’জনের দিকে তাকিয়ে। রানা ইতস্তত করলো খানিকটা।তারপর স্বাভাবিক ভাবে নামলো।নিশির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জড়িয়ে ধরলো ইশান কে।
নয়ন এসে হাত মেলালো দুজনের সাথে। সবাই মিলে মালপত্র নামিয়ে, ভ্যানওয়ালা কে ভাড়া মিটিয়ে বিদায় দিলো।
অনিমা এগিয়ে এলো এবার,তাকে আসতে দেখেই ভ্রু কুচকে কড়া চোখে তার দিকে তাকালো রানা।অনিমা সে দৃষ্টি থোরাই পরোয়া করলো।
ইশানের পাশে দাড়াতে দাড়াতে বললো,”হ্যা রে ইশান।বলিহারি।ওকে একটু ওদিকটায় যেতে দে।বেচারা ক্লান্ত। একটু এনার্জির দরকার। ”

ইশান না বোঝার প্রশ্ন করলো অনিমার দিকে।অনিমা আবার তাকালো রানর দিকে।রানা মাথা নাড়ছে, কড়া চোখে।
অনিমা বাঁকা হাসলো।”মানে সবাইকে বসতে দে কিছুক্ষণ। সাজিদ, রানা দুজনের কথাই বলছি আরকি।কেক টেক খাক। একটু এনার্জি হবে।”
সাথে সাথেই ঘুরে তাকালো নিশির দিকে।”নিশি ওখানটায় পানির বোতল টা দাও তোমার রানা ভাইদের। ”
ভাই সম্মোধন টা আরও ভালো লাগলো না রানার।চোখ সরিয়ে নিলো অনিমার থেকে।মেয়েটা তাকে অপদস্ত করার সুযোগ মোটেই ছাড়বে না এটা তো জানা কথা।এখন শুধু ইশানটার সামনে বাকিটুকু বলে না দিলেই হলো।তাহলেই ঘাড়ের মাথাটা রেললাইন এ গড়াগড়ি খেলো বলে।বেস্ট ফ্রেন্ড তাকে না জানিয়ে তারই বোনের সাথে বিগর ৭ বছর হলো প্রেম চালাচ্ছে এটা ইশান আরশাদ এর কানে গেলে তার যে দফা ঠান্ডা করে দেওয়া হবে ভাবতেই রানার গা শিউরে উঠলো।

তবে অনিমা আর কিছু বললো না।মিটিমিটি হেসে তিতির এর দিকে ফিরে তাগাদা দিলো কেক কাটাতে।
ঘড়িতে রাত বারেটা তেরো বাজে।কেক কাটা শেষে একেএকে সবার মুখে তুলে দিলো কেক।ইশান এর কাছে আসতেই হতভম্ব হয়ে গেলো।এনাকে তো এতক্ষণ খেয়াল করেবি সে।
ফর্শা একহারা মুখ।মাথায় চুল গুলো সাইড ব্যাক ব্রাশ করা।নুড গ্রিন শার্ট আর সাদা প্যান্ট। লম্বায় সে মানুষ টার বুক অবধি হবে বোধহয়। কতো হবে উচ্চতা? ৬ ফুট তো ভালোমতো। পেশি ফুলে ফেঁপে শার্ট ভেদ করে আসতে চাচ্ছে।কালচে গোলাপি ঠোঁট, কপাল কুচকে তাকিয়ে আছে তারই দিকে।পুরুষমানুষ এতো সুন্দর কেনো হবে,যে প্রথম দেখায় মনটা বেহায়া হয়ে যাবে।এ আবার কোন ধরনের বিচার।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৬

সে এই মূহুর্তে কেকের টুকরোখান হাতে নিয়ে হা করে দেখছে ইশানকে। হুট করেই তাদের ড্রয়িং রুমে সাজিয়ে রাখা ফটোফ্রেম এর কথা মনে পরে গেলো।হ্যা ওখানেই দেখেছে।দ্বিগুন হা হয়ে গেলো মুখটা তার।
অস্ফুটস্বরে বললো,”ইশান ভাই!”

সাঁঝের মায়া পর্ব ৮