সায়রে গর্জন পর্ব ৫৮
নীতি জাহিদ
থাপ্পড় যে এক ধরনের শিল্পতে রূপ নিয়েছে তা থাপ্পড় মঞ্জিল ওরফে সুলতানা মঞ্জিল না থাকলে অজানা থেকে যেতো। থাপ্পড়ের ধরন এক, শব্দের পরে যে অনুভূতি হয় তাও এক, হালকা জ্বলুনি লাগে গালে। মনে হয় যেন মরিচ বাটা লাগিয়ে দিয়েছে, কানের মাঝে জল তরঙ্গের মতো ভো ভো আওয়াজ করে অথবা একশ বছর আগে যে সাদাকালো টেলিভিশনে এন্টেনা নড়ে গেলে ঝিরিঝিরি আওয়াজ করতো তেমন করে। বেশি কিছু না মাঝে মাঝে বয়রা হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে এই আর কি? আসল কথায় আসা যাক, আজকের থাপ্পড় থেরাপির যোগ্য প্রার্থী হিসেবে নাম লিখিয়েছে শাহাদ ইমরোজের ছোট বোন সাইদা রোজা শিফা।
ধরাও খেয়েছে ভাইয়ের কাছে। গতদিনের খুশির সংবাদ পেয়ে সবাই যখন আহ্লাদে আটখানা, ঠিক তখনই খুশির মহল থেকে শিফা হঠাৎ গায়েব৷ শিফাকে খুঁজতে খুঁজতে তার বেডরুমে হাজির হয় শাহীন। বোনকে না পেয়ে বের হয়ে যাবে সেই মুহুর্তে চোখ গেলো বোনের টেবিলের উপর রাখা ডায়েরীর উপর যার ভাঁজে শুকনো লাল গোলাপ রাখা, কিছুটা বেরিয়ে এসেছে। মেজর ভাইয়ের আনচান মন শান্ত হচ্ছেনা। হাসি মুখেই এগিয়ে গিয়ে দেখলো ডায়েরীর সব পাতাই সাদা। কিছু পাতা ছেঁড়া। সিক্স স্পাইডারদের চিফ। মনের মাঝে উদ্ভট চিন্তা আসাটা স্বাভাবিক। ডায়েরীর কোথাও লিখা নেই শুধু লাল গোলাপ ছাড়া। চেয়ার টেনে বোনের টেবিলে বসে একটা পেন্সিল নিলো। ডায়েরীতে ছেঁড়া পাতায় লেখার উপর আলতো স্কেচ করতেই ভেসে উঠলো প্রতিটি অক্ষর। প্রথমে অধরে হাসি থাকলেও শেষের নামটি পড়ে মেজাজ তিরিক্ষি হলো। প্রেম নিবেদন করে লেখা পাতা। মনে মনে দোয়া পড়ে ভাবলো, এই বোনটাও বুঝি উচ্ছ্বনে গেলো। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উপরে চিলেকোঠার ঘরে রওয়ানা হলো। বোন এবং বন্ধু দুজনকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে বোনকে ঠাটিয়ে এক চড় দিলো। বন্ধুর নাকে ঘুষি পড়লো। আকস্মিকভাবেই হুলস্থূল লেগে গেলো। শিফার গালে টানা দুটো চড় মারার পর ও যখন শান্ত হলো না, পাভেল তখন শাহীনের নাক বরাবর ঘুষি মে*রে হাত মচকে ধরে দমালো। চেঁচিয়ে উঠে বললো,
– পাগল হলি বাই******দ কি শুরু করছিস? মেয়েটা ম*রে যাবে।
– আমার বোন আমি যা খুশি করবো তোর কি?
– আমার অনেক কিছু। শিফা বাসায় যাও। আমি কথা বলবো পরে।
ছুটে বেরিয়ে গেলো শিফা। শাহীনকে জোরজবরদস্তি করে রুমে রেখে দরজা আটকে দিলো পাভেল। ধমকে বললো,
– চুপ করে বস, শান্ত হ। বুঝিয়ে বলছি আমি।
– কিচ্ছু শুনতে চাই না আমি।
– শুনতে হবে, ভুল বুঝেছিস তুই দোস্ত।
– কিসের দোস্ত। তোরা বন্ধুরা কি বোনদের দিকেই চোখ দিস? আর মেয়ে নাই? স্বভাব চরিত্র এত খা*রাপ কেনো তোদের?
পাভেল চিৎকার দিয়ে বললো,
– অনেক হয়েছে থাম। তোর বোনের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
– আমি তো ভুল দেখেছি, তাই না? জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে ছিলি কেনো? আর এই কাগজটা দেখ। তোর নামে প্রেমের ছড়াছড়ি। কেউ যাতে না দেখে ছিঁড়ে ও ফেলেছে।
– এক্সপ্লেইন তো করতে দিবি। এরপর শাস্তি দিস।
শান্ত হলো শাহীন। খাটে বসলো পাভেলের। পাশের চেয়ার টেনে বসে পাভেল ব্যক্ত প্রকাশ করলো,
– তুই থাপ্পড় দেয়ার আগে আমি একটা থাপ্পড় দিয়েছি। মেয়েটা কাঁদছিলো শাহীন। ঠান্ডা করতেই ওকে আগলে নিয়ে শান্ত করছি।
শাহীন তেঁতে উঠলো,
– তুই কেনো থা*প্পড় দিবি আমার বোনকে?
পাভেল বিষের শিশিটা বের করে শাহীনের হাতে ধরিয়ে বললো,
– মহান রব জানেন এই জিনিস কোথা থেকে পেয়েছে। এনে আমাকে বললো, পাভেল ভাই আপনি কেনো আমাকে পছন্দ করেন না। আমার কোনো পুরুষেই মন বসেনা। বান্ধবীদের অনেক বয়ফ্রেন্ড আছে। আমার ভালো লাগেনা। কলেজের ছেলেরা বয়ফ্রেন্ড হতে চায়। আমার ওদের ভালো লাগেনা। এসব বলছিলো।
শাহীন সন্দিহান চোখে বললো,
– বিষের শিশি এলো কিভাবে? তোকে কেনো ভয় লাগালো?
– যাতে আমি ওকে ভালোবাসি নয়তো ও বিষ খেয়ে নিবে। ক্রোধ সামলাতে না পেরে কষিয়ে চ ড় দিয়েছি। এসে তুই ও মা/রলি।
শাহীন নিশ্চুপ। পাভেলের মনে হলো শাহীনকে সে মনের অজান্তে ছোট করে ফেলেছে। বোন তো তারও আছে। সুরাইয়ার সাথে যখন নোমানের সম্পর্ক শুনলো বোনকে মে/রেছে অনেক বার। প্রতিটি ভাই চায় বোনের সুন্দর ভবিষ্যৎ। শাহীনের কাঁধে হাত রেখে বললো,
– কাউকে কখনো বলিনি আজ তোকে বলি, বিশ্বাস কর শিফাকে আমি প্রচন্ড পছন্দ করি। মন থেকে বলছি। কিন্তু অসম্ভব ব্যাপার তাই চেপে গিয়েছি। মেয়েটা যতবার এসেছে ততবার বকেছি, ধমকেছি, ফিরিয়ে দিয়েছি। আজ যখন হাতে বিষের শিশিটা দেখলাম আমার মনে হলো আমার বুক ছিড়ে যাচ্ছে। হুঁশ হারিয়ে থাপ্পড় দিয়েছি। মা/রা/র পর ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি ফরসা চেহারার চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। গালে আমার হাতের দাগ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। বুকে টেনে নিলাম। নিজেকে আড়াল করতে এই বাড়ি আসতে চাই না। এজন্যই আমি থাকতে চাইনি চিলেকোঠায়। তুই জোর করলি বস নেই তাই এলাম। আমি এখনই চলে যাবো। আমার জন্য মেয়েটাকে আর মা*রিস না দোস্ত। ছোট একটা মুখ। এতগুলা থাপ্পড় হজম করেছে। দেখ অসুস্থ হয়ে না পড়ে।
শাহীন মাথায় হাত দিয়ে বললো,
– ভাইজান যদি জানতে পারে?
– মনে হয় আন্দাজ করেছে কিছু। আবার জানতে পারলে আমাকে নিজের হাতে পুঁতে দিবে।
– আমি তো তোকে বিশ্বাস করতে পারছিনা পাভেল। নোমান যা করলো?
পাভেল তাচ্ছিল্যের হাসি হসে বললো,
– ধুর পাগল, আমি কি বলেছি তোকে বিশ্বাস করতে। আমি বের হচ্ছি। খেয়াল রাখিস ওর। বাড়তে দিস না। বস ফিরে এসে এসব শুনলে খুব রাগ করবে। আমার কাছ থেকে ও কিছুই পাবেনা এতটুকু ভরসা রাখিস। ছোট মানুষ ভুল করছে। শুধরে নিবি সকলে মিলে।
ছাদের চিলেকোঠা ছেড়ে বেরিয়ে গেলো পাভেল। মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে নিরবে। নতুন ঝড় উঠবে নাতো? বন্ধুটাকে কষ্ট দিলো। পাভেল কখনোই বিশ্বাস ভাঙবেনা। বন্ধুর বিয়ে কিছুতেই বোনের সাথে দেয়ার অধিকার তার নেই। লিমন তাহির বিয়েতে যা করেছে। এরপর ভাইজান সম্পর্ক শেষ করে ফেলবে যদি জানতে পারে পাভেল- শিফার ব্যাপারে শাহীনের আগ্রহ আছে।
গ্যালাপাগোসে আজ তৃতীয় দিন। ঘুরে ফিরে দুদিন এভাবেই কাটিয়েছে। সারাদিন থেকে রাতেই রওয়ানা হবে, হঠাৎ করেই শাহাদ জানান দিলো। আজ সকলে মিলে এক দূর্দান্ত ঘটনার সাক্ষী হবে। শাহাদ জানিয়েছে সবাইকে স্নোর কেলিং করতে হবে। গ্যালাপাগোস এসে যদি মেরিন রিজার্ভ নাই দেখে এর সৌন্দর্য্য দেখা থেকে যে বঞ্চিত হবে। দিয়া ভয়েই আগাচ্ছেনা।
যে যার যার মতো করে এসেছে। শেহজাকে মল্লিকার কাছে দিয়ে দিয়াকে নিয়ে মাস্ক পরেই ঝাঁপ দিলো শাহাদ। পানির নিচে ডুবে থাকাটা দিয়ার জন্য খুব স্বাভাবিক। জড়িয়ে শক্ত পোক্ত পুরুষালি হাতের বাহুতলে আবদ্ধ ছোট হাতটি। আশপাশে সব রঙিন মাছের ঘুরাঘুরি। মাথা উঠালো দুজন। লক্ষ্য করলো হাসের মত একটা পাখি ডুবে ডুবে মাছ খাচ্ছে। শাহাদ দিয়াকে নিয়ে কিছুটা কাছে এগিয়ে গেলো। অতটা কাছে যায়নি যতটা গেলে পাখিটির মনে হতে পারে মানুষ তার ক্ষতি করছে। শাহাদের মনে হলো এত গ্যালাপাগোস পানকৌড়ি। পৃথিবীতে অসংখ্য পানকৌড়ি রয়েছে তার মধ্যে একমাত্র গ্যালাপাগোস পানকৌড়ি উড়তে পারেনা।
সাগরের তলদেশের মুগ্ধতা উপভোগ করে দুজন যখন তীরে উঠে এলো মাস্ক খুলেই দিয়া খুশিতে উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,
– আপনি না থাকলে আমি জীবনেও এত সুন্দর কিছু দেখতে পেতাম না কমান্ডার সাহেব। কিভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি বলুনতো?
কানের কাছে ফিসফিস শাহাদ বলে উঠলো,
– কিছু চাইলে পাবো?
দিয়া সজোরে মাথা ঝেঁকে বললো,
– অবশ্যই, যদি আমার সাধ্যে থাকে।
– ইনশাআল্লাহ চেয়ে নিব। তবে এখন তুমি ভয়ে চিৎকার দিবে তার আগেই আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো।
বিস্ময় নিয়ে তাকালো দিয়া স্বামীর দিকে। দুবার পলক ঝাপটে বুঝার চেষ্টা করলো। মনের কোণে ভয় ভয় লাগছে, কিছু কি খারাপ ঘটবে! দিয়া আশপাশটা ভালো করে দেখছে। লজ্জা লাগছে জড়িয়ে ধরতে। মানুষ আছে অনেক। হঠাৎ চোখ গেলো বৃহৎ এক টিকটিকি বা গিরগিটি প্রজাতির প্রানীর দিকে। চিৎকার দিয়ে উঠলো। লাফিয়ে শাহাদকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– ইয়া আল্লাহ, এটা কি?
শাহাদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। দিয়া এক পর্যায়ে কেঁদে দিলো। এই গিরগিটি সামনের দিকে এগিয়ে আসছে পা ফেলে। শাহাদ দিয়াকে পাঁজকোলে তুলে বললো,
– বোকা মেয়ে কাঁদছো কেনো? এটাই সেই মেরিন ইগুয়ানা। ড্রাগন প্রজাতির একটি উভচর প্রানী যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এই প্রজাতি হিংস্র নয়। এরা জলে এবং স্থলে দুই জায়গায় বাস করে। এরচেয়ে ভয়ানক এক বৃহদাকৃতির টিকটিকি বা গিরগিটি আছে যা কমোডর ড্রাগন নামে পরিচিত। শুধুই ভয়ানক নয় হিংস্র ও মাংসাশী বটে। মেক্সিকো এবং ব্রাজিলে পাওয়া যায়। মেরিন ইগুয়ানা শান্ত, তৃনভোজী প্রাণী। এরা কোনো ক্ষতি করবেনা।
কথা বলতে বলতে অনেক টাই এগিয়ে আসে শাহাদ। শাহাদ দিয়াকে নামিয়ে দিয়ে বললো,
– জানো ফারাহ্, গ্যালাপাগোস নামকরণ কে করেছে?
– কে?
– চার্লস ডারউইন। তার বই ভয়েজ অফ দ্য বিগল এ লিখেছিলেন তার পাঁচ বছরের ভ্রমণযাত্রার কথা। পৃথিবী ভ্রমনের কথা আছে সেই বইতে। দারুন সব জানা অজানা বিস্ময়কর তথ্য । তিনি গ্যালাপাগোসে দু সপ্তাহ ছিলেন। এই যে দেখতে বিশাল দৈত্যাকার কচ্ছপ, সাগরের এই গিরগিটি যা মেরিন ইগুয়ানা, অদ্ভুত সব পাখি যা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। এসব নিয়েই ছিলো তার কাজ।
– আপনি এত কিছু কিভাবে জানেন? মনে তো হয় আপনি ডারউইনের পাশে ছিলেন যখন সে গবেষণা করছিলো।
শাহাদ হো হো করে হেসে বললো,
– নেভি কর্মকর্তা আমি, সাগরে,দ্বীপে দিন কেটেছে। আর দ্বীপ সমন্ধে জানবোনা তা কি হয়? আচ্ছা বাদ দাও। ওদিকে দেখো একটা সী লায়ন। দেখেছো কখনো?
দিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,
– আল্লাহ এগুলো তো টিভিতে দেখেছি। এত্ত সুন্দর কেনো?
শাহাদ প্রেয়সীর উচ্ছ্বাস দেখছে। মৃদু হেসে বললো,
– ফারাহ্, আমার ছানা আর তোমাকে নিয়ে না এলে হয়তো আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম ট্রিপটা মিস করে ফেলতাম।
– আর আপনাকে না পেলে আমার অসম্পূর্ণ জীবনটা শূণ্যতায় শেষ হয়ে যেত।
দিয়ার গাল টেনে শাহাদ বললো,
– একটা মজার জিনিস দেখবে?
– হুম হুম।
শাহাদ একটা পাখি এবং সী লায়নের মাঝখানে গিয়ে বসলো। দিয়া ভীত হয়ে কিছুটা ছিটকে গেলো। শাহাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই এই দুই প্রাণীর। ঠিক তখনই শাহাদ বলে উঠলো,
– ফারাহ্ আই থিং আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টির মধ্যে এদের আর মানুষের মাঝে যে নির্ভয় দৃশ্য তৈরি হয়েছে তা একটি। একটুও ভয় পাচ্ছেনা আমাকে। নিজেদের মত করে খেলছে। পাখিটার তো আমাকে দেখে পালানোর কথা। অথচ সে নিজের মত পাতার উপর খেলছে দেখো।
দিয়া মুগ্ধ হয়ে দেখছে। ভয় অনেকটাই কমে এসেছে। দ্বীপের এমন মোহনীয় পরিবেশ পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যাবে। শাহাদ পাশে এসে বললো,
– চলো, রোদ পড়ছে। ফিরতে হবে। মিস করবো দ্বীপকে তাই না?
– অনেক। আমার জন্য সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে।
কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেলো ক্রুজের দিকে। ফিরে যাবার প্রস্তুতি নিতে হবে। সকলের কাছে একটি স্মৃতিময় ভ্রমণ হয়ে থাকবে গ্যালাপাগোস। সানক্রিস্টোবালে ফিরেই ইকুয়েডরের ফ্লাইট ধরে সোজা আমেরিকা এরপর বাংলাদেশ। আজ রাতেই সানক্রিস্টোবালের ফ্লাইট। কাল সকাল নাগাদ বাংলাদেশের ফ্লাইট ছাড়বে।
রত্নার শরীর টা বেশ খারাপ। রাতের খাবার আগে খেয়েই শুয়ে পড়েছে। তাহি জোর করে খাইয়ে দিয়েছে। আজ ডিউটি নেই। লিমন অফিসের মিটিংয়ের কাজে গত দুদিন সিলেট। বাসায় থাকলে তাহির পেছন পেছন ঘুরে। এটা সেটা বলে জ্বালিয়ে তোলে। আজ দুদিন কেমন যেন খালি খালি ঘরটা। কিছু পেশেন্ট এর শর্ট কেইস দেখতে দেখতে ঘড়িতে এখন প্রায় দেড়টা। চেয়ারের উপরই ঝিমিয়ে গিয়েছে। কলিংবেলের আওয়াজ আসছে কানে। ধড়ফড়িয়ে উঠলো। এত রাতে কে আসবে। ভয়ে ভয়ে দরজার সামনে গিয়ে ডোর ভিউতে চোখ রাখলো। পুরুষ মানুষের অবয়ব। ঘুম ঘুম চোখ কচলে ভালো করে লক্ষ্য করে বুঝলো লিমন। দরজা খুলে দিলো। লিমন তাহিকে দেখে সালাম দিয়ে হেসে বললো,
– স্যরি ঘুম ভাঙিয়ে দেয়ার জন্য। বুঝিনি এত রাত হবে না হয় কাল সকালে আসার মতো করে রওয়ানা দিতাম।
– আসুন। সমস্যা নেই। আমি কাজ করছিলাম। ঘুম গভীর হয় নি।
ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে লিমন বললো,
– আপনি যান শুয়ে পড়ুন। আমি দরজা আটকে দিচ্ছি।
তাহি দরজা ছেড়ে দিলো। লিমন দরজা আটকে জুতা মোজা খুলে ব্যাগ রেখে ডাইনিং এর ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো। রুমে আওয়াজ হলে আবার তাহির ঘুম ভেঙে যায় যদি। মেয়েটার চোখে ঘুম ছিলো। হাত মুখ ধুয়ে রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলো তাহি বেডের উপর লিমনের টিশার্ট ও ট্রাউজার গুছিয়ে রেখেছে। খাটের উপর গুছানো কাপড় দেখে মুচকি হেসে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ফ্রেশ হয়ে বের হতেই দেখলো পড়ার টেবিলের উপর খাবার ঢেকে রাখা। লিমন ঢাকনা উলটে দেখলো সাদা পোলাও সাথে মুরগীর রোস্ট, সবজি, টমেটো চাটনী এবং সালাদ। খানিকটা হেসে বললো,
– বাসায় কি কারো দাওয়াত ছিলো?
তাহি হেসে লিমনের পাশে চেয়ার টেনে বসে বললো,
– আপনি যে কারণে এত রাতে সিলেট থেকে ছুটে এসেছেন, সেই কারণে মা রান্না বান্নার আয়োজন করেছেন।
লিমন খাবার মেখে তাহির মুখের সামনে তুলে ধরেছে। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
– শুভ জন্মদিন ডাক্তার তাহি।
তাহি খাবার মুখে নিয়ে বললো,
– আমার উপহার?
লিমন খেতে খেতে বললো,
– খেয়ে উঠে দিব। খাবার খুব মজা হয়েছে। জানলেন কি করে আমি আসবো?
– আপনি আমার জন্মদিনে থাকবেন না তা হতেই পারেনা। রান্না করার কথা ছিলো আজ। মা বলেছিলেন। কিন্তু আমার মন সায় দিচ্ছিলো না তাই রাতেই রাঁধলাম। বেশি কিছু করতে পারিনি। আপনি সাদা পোলাও আর রোস্ট পছন্দ করেন ওটাই করলাম।
লিমন আরেক নলা তুলে দিয়ে বললো,
– আমার জন্য বসে না থেকে খেয়ে নেয়া উচিত ছিলো।
তাহি হেসে বললো,
– হসপিটালেই তো থাকি। সময় দিতে পারিনা বাসায়। আপনি যতক্ষন থাকেন যত্ন করেন। এতটুকু সুযোগ হারাতে ইচ্ছে হলোনা। তাই খাইনি। একসাথে খাব বলে।
লিমন হাসছে। তাহি অধীর আগ্রহে লক্ষ্য করে দেখলো বছর খানেক আগের লিমন এবং এই লিমনে বিষদ তফাৎ। এই লিমন ম্যাচিউর। এই লিমন পরিস্থিতি সামলে নিতে জানে। তাহিকে আগলে রাখতে জানে। সবার আগে তার কাছে গুরুত্ব পায় তাহি।
ব্যাগ থেকে একটা মনিপুরী শাড়ি বের করলো লাল রঙের। কিছু গয়না, আর ঊনত্রিশটা গাঁদা ফুলের একটা লহর। তাহি সাথে সাথে মুখে হাত দিয়ে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে বললো,
– আপনাকে দিয়ে সব সম্ভব। এই গাঁদার লহর পেলেন কোথায় এই রাতে?
– সিলেট থেকে নিয়ে এরপর রওয়ানা দিয়েছি। এই ফুল ভালো থাকবে আশা করছি। ভালো না থাকলে কাল আবার কিনে দেব। ভাইজান আসবে কাল। ছোট করে উদযাপন করবো আমরা। শাড়ির সাথে ফুল পরবেন খুব ভালো লাগবে আমার।
– আচ্ছা।
লিমন আমতা আমতা করে বললো,
– একটা কথা বলি?
– হুম।
– লাইট টা বন্ধ করবেন। একটু রেস্ট নিব। আপনিও শুয়ে পড়ুন।
– শরীর বেশি খারাপ লাগছে?
– খারাপ লাগছেনা। অভ্যাস আছে জার্নির। তবে ক্লান্ত।
তাহি বাতি নিভিয়ে দিলো। লিমন ফোনে মেইল চেক করতে করতে বললো,
– বুঝলেন তাহি, সেদিন যদি ছুটে না যেতাম কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। কি পরিমাণ টেনশন নিয়ে ক্লায়েন্ট ডিল করতে হয়েছে।
লিমনের বস ফোন দিয়েছে। ভেবেছিলো একটু বিশ্রাম নিবে তাও পারলোনা। হয়তো এত রাতে এসে ঠিক ভাবে বাসায় পৌঁছাতে পেরেছে কিনা জানতে ফোন দিয়েছেন। কথা শেষ করে লিমন ঘাড় ঘুরিয়ে তাহিকে বললো,
– কোথায় গেলেন? কি এত কাজ করছেন এখনো না শুয়ে…
আর শেষ করতে পারলোনা। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে একান্ত নারীর দিকে। লাল মনিপুরী শাড়িতে এতটাও মোহনীয় লাগবে লিমনের চিন্তার বাইরে ছিলো। খোঁপায় ফুল গুলো যেন হলুদ আভা ছড়াচ্ছে কামরা জুড়ে। নির্বাক লিমন শুকনো ঢোক গিলে উঠে বসলো। হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে। অনুভূতি শক্ত পোক্ত ভাবে নাড়া দিচ্ছে। উঠে দাঁড়ায়। তাহিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে রুম থেকে বের হতে যাবে তাহি হাত আকড়ে ধরে বললো,
– আপনি স্বপ্ন দেখছেন না। আমাকে কেউ কিছু বুঝায় ও নি। আমি নিজেই লাইফে এগিয়ে যেতে চাইছি এবার।
– পরে আফসোস হলে?
– আপনাকে ভালোবাসার চেষ্টা করাতে আফসোস হবে বলছেন?
– হতেও পারে?
– হবে না। আমি যাদের ভালোবাসি সবটা দিয়ে বাসি। আপনার ও অধিকার আছে আমার উপর। জোর খাটান নি তো আজ অবধি। তাহলে সম্মান টুকু দিতে আমার আপত্তি থাকবে কেনো?
– সবসময়ই তো বলেন, বয়সে আপনার চেয়ে ছোট।
– সত্য নয় কি?
– সত্য।
– তবে?
– ঘুমিয়ে পড়ুন আপনাকে সুন্দর লাগছে।
– আমার দিকে তাকিয়ে বলুন।
– সাহস নেই।
তাহি কামরার বাতি জ্বালিয়ে সামনে চলে এলো। লিমন মুগ্ধ হয়ে একবার তাকিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তাহি হেসে লিমনের মুখ তাহির দিকে ফেরালো। লিমন মাথা নুইয়ে ফেললো। তাহি লিমনের থুতনি ধরে মাথা উঠালো। লিমন খানিকটা রুঢ় হয়ে বললো,
– আপনার কি আমাকে ফিলিংসলেস মনে হয়? সরুন।
– হুম হয়। দ্য পারসোন, ডাজেন্ট হ্যাভ ফিলিংস ইজ কলড আন রোমান্টিক।
লিমন ক্রোধান্বিত চক্ষুতে তাকিয়ে বললো,
– আমাকে প্রোভোক করে আপনার কি লাভ হচ্ছে? অপমান করছেন তাই না আনরোমান্টিক বলে? কিভাবে কাউকে অপমান করতে হয় আপনারা ডাক্তাররা ভালোই জানেন। আন রোমান্টিক ট্যাগ সহজে লাগানো যায়, আমার যে কত পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে তা পরিমাপ করার যন্ত্র আছে আপনার কাছে? এভাবে সেজে গুঁজে আমার সামনে তখনই দাঁড়াবেন যখন আপনাকে ছুঁতে দিবেন এর আগে নয়। সত্যি কথা শুনতে খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। এখন সরুন জায়গা দিন বের হবো।
লিমন রুম থেকে বেরিয়ে যাবে, তার আগেই তাহি বলে উঠলো,
– আমি বারণ করলাম কখন?
দরজার সামনে এসে থমকে গেলো লিমনের পদচারণ। মনে হলো ভুল শুনেছে। তবুও অপেক্ষা করছে দ্বিতীয় বার শুনতে। ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
– অনুমতি ও তো দেন নি।
– আপনি স্বশিক্ষিত, আমিও স্বশিক্ষিত। অধিকার ফলাতে আসলে অবশ্যই বাঁধা দিতাম না। এত দিনে এত টুকু বুঝে নিলেন না কেনো আমার আচরণে? অসদাচরণ তো একটিবারও করিনি।
লিমন ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। মনে হচ্ছে পা দুটো অবশ। তাহি সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাচ্ছে এ যেন আকাশের চাঁদ পাওয়া। সংশয় কাটিয়ে লিমন এগিয়ে এসে তাহির আনত মুখটা আজলে তুলে বললো,
– আমি স্যরি। বুঝতে পারিনি আপনার কষ্ট গুলো। মাফ করা যায় না এই গর্দভকে?
চোখ বেয়ে পড়া প্রেয়সীর পানি মুছে দিচ্ছে লিমন, অপরদিকে তাহি নাক টেনে বলে,
– কেনো মাফ করব? কষ্ট দিলেন কেনো? আপনি কি ছোট যে কথা বুঝেন না।
হঠাৎ লিমন হো হো করে হেসে উঠলো। তাহি তব্ধা খেয়ে বললো,
– আস্তে… মা উঠবে।
লিমন হাসি থামিয়ে বললো,
– আমাকে কে যেন বলতো আপু ডাকবে। আমি তোমার থেকে বড়ো।
রাগে গাল ফুলিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো লিমনকে। রুমের বাতি নিভিয়ে ধুপধাপ করে শুয়ে পড়লো তাহি। হাসতে হাসতে তাহির পাশে শুয়ে পড়লো। সংকোচ কাটিয়ে এই প্রথম প্রিয় নারীর কোমর ধরে কাছে টেনে ঘাড়ে মাথা রেখে প্রেয়সীর ডান গালে উষ্ণ অধর ছুঁয়ে গেয়ে উঠলো,
সায়রে গর্জন পর্ব ৫৭
– এই দিন যদি না থামে
এই রাত যদি না শেষ হয়
তুমি নীলচে কোন খামে
আমায় মোড়ালে বেশ হয়
পড়ে যাচ্ছি যেন তোমারই নেশায়।
লিমন কি আর গুটায় তার সত্ত্বাকে ভুলে? ফিরে এসেছে পুরোনো সত্ত্বায়। আষ্টেপৃষ্টে মুড়িয়েছে প্রেয়সীকে ভালোবাসায়।
