সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৯
Raiha Zubair Ripti
সারা রাত ড্রাইভ করে সিকান্দার ভোরের আগমুহূর্তে ঢাকায় এসে পৌঁছায়। চারপাশ তখনও ঘুমে ডুবে। এই বাড়ির মানুষজন সকাল আটটার আগে বিছানা ছাড়ে না বললেই চলে। বাড়ির দারোয়ান গেট খুলে দিতেই সিকান্দার ধীরগতিতে গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে বাগানের পাশ ঘেঁষে পার্ক করলো। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে এলো। গাড়ির চাবিটা পকেটে রেখে সে শান্ত পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো। বসার ঘরের আধো অন্ধকার পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। নিজের রুমের দরজার সামনে আসতেই আচমকা তার পদযুগল থেমে গেলো। নাকে ভেসে এলো তীব্র মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ। তার আর তার স্ত্রীর বেডরুমে তাদের অবর্তমানে কেউ ঢুকেছে! আর সেটাও নারী! সাথে সাথে সিকান্দারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। সে দরজা খোলার প্রয়োজনও বোধ করলো না। ভেতরে সত্যিই কেউ আছে কি না, সেটাও যাচাই করার দরকার মনে হলো না তার। নারীর উপস্থিতির আভাস পেয়েছে মানেই যথেষ্ট। সেদিকে পা বাড়ানোটা কিংবা সেখানে আর এক সেকেন্ড থাকাটাও এখন তার জন্য হারাম।
সিকান্দার শাহ্ এর মুনতাহা ব্যতিত অন্য সব নারীতে এলার্জি আছে।
সে পেছন ফিরে হাঁটা ধরলো। আজান দিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। সিকান্দার সোজা মসজিদে চলে গেলো। নামাজ শেষ করে পকেট থেকে ফোন বের করে বাড়ির ম্যেইড কে বলল- তার পুরো রুমটা ওয়াশ করতে। বিছানার চাদর থেকে শুরু করে বালিশের কাভার, জানালার পর্দা,সোফার কাভার,রুমের প্রতিটি আসবাপত্র সহ রুমের প্রতিটি আনাচেকানাচে তার ওয়াশ চাই। সে দেড় ঘন্টার মধ্যে বাড়ি ফিরবে। সময় তাদের দেড় ঘন্টা দেওয়া হলো।
এটুকু বলেই ফোন কেটে দিলো সে। ওপাশে থাকা ম্যেইডগুলো তো আতঙ্কে দৌড়ে সিকান্দারের রুমের দিকে চলে গেলো। রুমের দরজা কিঞ্চিৎ মেলে রাখা ছিলো। তারা তো জানে রুমে কেউ নেই। সেজন্য সরাসরি দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করতেই তাদের চোখ কপালে উঠে যায়। সিকান্দার শাহ্ এর রুমে ওয়েস্টার্ন ড্রেস পড়ে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে এক নারী। বিষম খেলো তারা।
ম্যেইডগুলোর চোখ প্রায় কপালে উঠে গেলো। ঠিক তখনই তাদের কাশির শব্দে মেয়েটা নড়েচড়ে উঠলো। পিটপিট করে চোখ মেলে সামনে তিন-চারজন ম্যেইডকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত মুখে উঠে বসলো।
“ হোয়াট ননসেন্স! এভাবে নক না করে রুমে ঢুকে হা করে তাকিয়ে আছো কেন আমার দিকে? ”
ম্যেইডগুলো মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর একজন কড়া গলায় বলল-
“ বের হোন আপনি। রুম ক্লিন করমু। ”
মেয়েটা চারপাশে একবার তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল-
“ রুম তো একদম ক্লিনই আছে। আবার কি ক্লিন করবে? ”
আরেকজন ম্যেইড এবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“ জীবাণু ঢুকছে রুমে। সিকান্দার স্যার ফোন দিয়া কইছে রুমের প্রতিটা জিনিস সাবান, সোডা, ডিসইনফেক্ট্যান্ট দিয়া ডইলা ডইলা ধুইতে। সময় দিছে মাত্র দেড় ঘণ্টা। বের হোন আপনি। আর রুম নাই ঘুমানোর জন্য? এই রুমে ঘুমাইয়া দিলেন তো আমাদের কাজ বাড়িয়ে। ”
কথাগুলো শুনে মেয়েটার মুখ অপমানে লাল হয়ে উঠলো। দাঁত চেপে বিছানা থেকে নেমে দ্রুত রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
মেয়েটা বের হতেই ম্যেইডগুলো কাজে লেগে গেলো। বিছানার চাদর, বালিশের কাভার, সোফার কাভার, জানালার পর্দা সব খুলে ফেললো। নতুন চাদর কভার পর্দা লাগানোর সময় বেডশিট উঁচা করতে গিয়ে মাথার কাছ টায় রাখা তাবিজ টা রেণু আলগোছে উঠিয়ে নিয়ে ওড়নার গিঁটে বেঁধে রাখলো। সে কিছু তো একটা বুঝে নিয়েছে এই কয়েকদিনে যে সেলিম মির্জা আর সাইদা মির্জা কিছু একটা খারাপ করছে সিকান্দারের সাথে। এখন অগোচরে এটা ফেলে দিলে কেউ বুঝবে না।হয়তো বোকা রেণু জানে না যখন সে তাবিজ টা ধরেছে তখনই তান্ত্রিক টের পেয়ে গেছে।
ফ্লোরে সাবান, সোডা আর জীবাণুনাশক মিশিয়ে বারবার ঘষে ধোয়া হলো। আসবাবপত্রগুলো ফার্নিচার ক্লিনিং লিকুইড দিয়ে মুছে চকচকে করে ফেলা হলো।
সিকান্দার শাহ্ নিজের জগতে মুনতাহা ছাড়া অন্য কোনো নারীর অস্তিত্ব সহ্য করতে পারে না। সিকান্দার দেড় ঘন্টা পর আসলো মির্জা বাড়িতে। সবাই এখন ঘুম থেকে উঠে বসার ঘরে চা খাচ্ছে। সিকান্দার কে দেখে সেলিম মির্জা বলে উঠলেন-
“ এসেছো কখন তুমি? ”
সিকান্দার একবার তাকালো তার দিকে।
“ ভোরের আগে। ”
“ তাহলে এখন কোথা থেকে ফিরলে? ”
“ মসজিদ থেকে। আমার একটা প্রশ্নের জবাব দিন। আমার রুমে আমার অবর্তমানে কে ঢুকেছিলো? ”
সাইদা মির্জা হকচকিয়ে গেলো। সেলিম মির্জা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল-
“ কি আবোলতাবোল বকছো। কে ঢুকবে তোমার রুমে? ”
সিকান্দার গম্ভীর গলায় বলল-
“ আমি মিথ্যা বলি না সেটা জানার কথা আপনার। পাশে বসে থাকার আপনার স্ত্রী কে জিজ্ঞেস করুন তো। ”
সেলিম মির্জা তাকালেন স্ত্রীর পানে। সাইদা মির্জা আমতাআমতা করে বলে উঠলেন-
“ জুলি ঢুকেছিল ওর রুমে। ”
সেলিম মির্জা বিরক্ত হলেন এই কথা শুনে। কি দরকার ছিলো সিকান্দারের রুমে ঢোকার? সিকান্দার ঠাণ্ডা গলায় সাইদা মির্জা ও সেলিম মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“ ফারদার ভবিষ্যতে যেন এমন কাজ আমি আর রিপিট হতে না দেখি। ”
সিকান্দার সিঁড়ি বেয়ে রুমে দিকে যাওয়ার সময় সেলিম মির্জা বললেন-
“ অফিসে এসো রেডি হয়ে। ”
সিকান্দার রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে মুনতাহা কে ফোন করে। মুনতাহার সারা রাত ঘুম হয় নি। তার মনে হচ্ছিল তারও চলে যাওয়াটাই ঠিক ছিলো। কিন্তু না! পাকনামি করে থেকে গেলো। রেখা ভোরে আজানের সময় মুনতাহা কে ডাকতে এসে দেখলো মেয়েটা ততক্ষণে নামাজে দাঁড়িয়ে গেছে। ডাকতে হয় নি আর। নামাজ শেষ করে কয়েকটা দোয়া-দরুদ পড়ে শুয়েছিল। হাতের মুঠোয় রাখা ছিলো ফোনটা। যে সিকান্দার ফোন করবে। কিন্তু সেই ফোন আসলো আটটার পর। তখন সে খাওয়া দাওয়া করে রিয়ার সাথে বাড়ির পুকুরঘাটে বসে ছিলো পানিতে পা ভিজিয়ে। রিয়া মেয়েটা ততটা চঞ্চল না হিয়ার মতো। তবে মিশুক,লজ্জাবতী। মেয়েটা নাকি একবার টেনে উঠে প্রেমে পড়েছিল তার স্কুলের ইংরেজি মাস্টার আনিসুজ্জামানের। লোকটা নাকি অনেক সুন্দর হ্যান্ডসাম ছিলো। তবে কখনো প্রকাশ করা হয় নি কখনো। বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেলে মার খাওয়ার ভয় ছিলো। এসএসসির পর নানির বাড়ি থাকার কারনে এখন আর তাকে দেখা হয় না। সেই প্রেমে কিঞ্চিৎ ভাঁটা পড়েছে। লোকটার হয়তো বিয়ে হয়ে গেছে। রিয়া সঠিক আর জানে না তার সম্পর্কে।
সিকান্দারের ফোন আসতেই শুকিয়ে যাওয়া মুখটায় হাসি ফুটলো। রিসিভ করে কানে নিয়ে সালাম দিতেই ওপাশ থেকে সালামের জবাব দেওয়া হলো। মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো-
“ পৌঁছেছেন তো ঠিকমতো? খাওয়া দাওয়া করেছেন? এখন কি আপনি অফিসে? ”
“ শান্ত হন আগে। আমি ঠিক মতো পৌঁছেছি,খাবার খেয়েছি। আর হ্যাঁ আমি এখন অফিসে যাচ্ছি। আপনি নামাজ পড়েছে? খাবার খেয়েছেন? ”
“ হু। পৌঁছেছেন কখন?”
“ ভোরের আগ দিয়ে। ”
“ আর ফোন দিলেন কেবল! ”
“ অপেক্ষায় ছিলেন আমার ফোনের? আমি তো ভাবলাম বিরক্ত হবেন আমি ফোন করলে। আমার থেকে দূরে থাকার জন্যই তো থেকে লেগেন। ”
মুনতাহা কাচুমাচু হয়ে নত গলায় বলল-
“ আমার ভুল হয়ে গেছে। ”
“ মজা করছি। সিরিয়াস হয়ে গেলেন দেখি। এনজয় করুন সাত দিন। ”
“ না চার দিন। ”
“ তারপর নিতে আসবো? ”
“ হু। ”
“ দয়া করলেন তাহলে এই অধমের উপর। আমি ভাবছিলাম সাতটা দিন কিভাবে কাটাবে আমি আপনাকে ছাড়া। ”
“ চিন্তা করে দেখলাম আপনার কষ্ট হবে আমাকে ছাড়া থাকতে। সেজন্য একটু দয়া করলাম। ”
“ আপনার হচ্ছে না কষ্ট? ”
মুনতাহা হকচকিয়ে গেলো। আমতাআমতা করে বলল-
“ ন…না। ”
“ হ্যাঁ। ”
মুনতাহা হেঁসে বললো-
“ না বলেছি। ”
“ আমি হ্যাঁ জানিয়েছি। ”
“ জানিয়ে উপকার করলেন খুব। এখন রাখুন। অফিসে যান। আর নিজের খেয়াল রাখবেন। খাবার খাবেন ঠিক মতো। ”
সিকান্দার সায় জানিয়ে কে’টে দিলো ফোন।
বান্দরবান জেলাটা তখন মেঘে মোড়া ছিল। সকালটা শুরু হয়েছিল ভেজা ঠান্ডা বাতাস দিয়ে। নাদিমের জন্য এই ট্রিপটা ছিল অফিসের চাপ থেকে একটু পালিয়ে বাঁচার মতো এক টুকরো মুক্তি।
ঢাকার কংক্রিটে আটকে থাকা জীবন, মিটিং, ডেডলাইন, ক্লায়েন্ট সব পেছনে ফেলে সে এসেছে বান্দরবানে। সঙ্গে তার অফিসের কয়েকজন কলিগ। গাড়িটা যখন চিম্বুকের দিকে উঠছিল, জানালার বাইরে শুধু বাঁকানো পাহাড় আর সবুজের লম্বা শ্বাস।
নাদিম জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার পাশে বসা রাফি বলল-
“ভাই, এই জায়গাটা আসলে অন্য লেভেলের। মনে হচ্ছে বিদেশে চলে আসছি।”
নাদিম মৃদু হাসল। আসলেই মনে হচ্ছে কোনো বাহিরের কান্ট্রি তে এসেছে তারা। যারা এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে, তারা কতটা লাকি! তাদের দিন রাত শুরু ও শুরু হয় এই এই প্রকৃতির সৌন্দর্য দিয়ে।
নাদিম আর তার কলিগরা প্রথমে গেল নীলাচলে।
মেঘে ঢাকা পাহাড়, দূরের শহর, আর বাতাসে এক অদ্ভুত শীতলতা। সবাই ছবি তুলছে, হাসছে, কেউ ভিডিও করছে। কিন্তু নাদিম এখানে এসেই একান্তে নিরিবিলি একটু বসলো। সতেজ ফ্রেশ ঠান্ডা বাতাস খেতে লাগলো। কেমন যেন শান্ত হয়ে যাচ্ছিল তার ভেতরটা। ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল দূরে একটা ছোট ট্রেইলের দিকে। সাদা আর হালকা নীল শাড়ি পরিহিত এক মেয়ে, বাতাসে চুল উড়ছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। নাদিমের হৃৎস্পন্দন থেমে যায়। চারপাশের শব্দ একটু একটু করে কমে আসে তার কানে। সে চোখ সরাতে পারে না। মেয়েটার মুখ দেখার ইচ্ছে হচ্ছে ভীষণ। মনে হচ্ছে সে চিনে এই রমণী কে। কিন্তু সেটা কি করে হয়?
মেয়েটা একটু এগিয়ে যায় রেলিংয়ের কাছে। দুই হাত রেখে নিচের দিকে তাকায়। বাতাস তার মুখে এসে পড়ছে। সেজন্য চুল গুলো উড়ে উড়ে যাচ্ছে।
নাদিম বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এগোয়। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করছে। এমন অনুভূতি যেটার সে কোথাও নাম দিতে পারছে না। মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়ানোয় দূরত্বটা এখন খুব কম তাদের। ইশ মেয়েটা যদি একটু এদিক ফিরে তাকাতো। তাহলে নাদিম তার অস্থিরতা কে একটু দমিয়ে রাখতে পারতো।
নাদিম জিহবা দিয়ে ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নেয়। এক্সকিউজ মি বলার জন্য মুখ টা খুলতেই পাশ থেকে একজন ডেকে উঠলো-
“ ইলা এবার বাড়ি চল। ”
নাদিম নাম টা শুনে চমকে উঠলো। মুখ থেকে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে আসলো- মিস ঢিলা! ”
নিজের নামের খুবই বিকৃত এক পরিচিত ডাক শুনে ইলা পেছন ফিরলো। চোখের সামনে নাদিম কে দেখে তার চোখ মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠলো।
“ আপনি এখানেও! ”
নাদিমের ভালো লাগার অনুভূতি তে জাস্ট মুতে দেওয়ার মতো একটা ভাঁটা পরলো। এই পাগল অকৃতজ্ঞ মেয়েকে দেখে সে ফিট খাচ্ছিল এতক্ষণ! ছিঃ! মন মেজাজ বিরক্তির চরম পর্যায়ে।
“ আপনি এখানেও মানে? এমন ভাবে বলছেন যেন মনে হচ্ছে আমি বখাটে ছেলে আপনাকে প্রতি জায়গায় ফলো করি। ”
ইলা বাবার দিকে তাকালো। তিনি হেঁটে আসছিলেন ধীর পায়ে। কিন্তু মেয়েকে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন।
“ আমি সেভাবে বলি নি। আপনি এখানে যে? ”
“ ঘুরতে আসছি। ”
“ ওহ্ আচ্ছা। আছেন কতদিন? ”
“ সেটা জেনে আপনি কি করবেন? ”
“ না এমনি। আমার দাদু বাড়ি এখানেই।
নাদিম ভ্রু কুঁচকালো।
“ ওহ্ আচ্ছা ভালোই তো তাহলে। দাওয়াত করে খাওয়াতে চাচ্ছেন? আমি কিন্তু একা নই। সাথে কলিগরাও আছে। ”
ইলা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। সে কখন বললো দাওয়াত করে খাওয়াতে চাইছে। এক লাইন বেশি বুঝে খবিশটা।
ইলা হাঁটা ধরলো উল্টো ঘুরে। নাদিম কি ভেবে যেন তাকে ডেকে বললো-
“ মিস ঢিলা শুনুন। ”
ইলা পেছন ফিরে তাকালো। নাদিম এগিয়ে এসে বলল-
“ আপনি সিঙ্গেল? ”
ইলা একটু ভাব নিয়ে বলল-
“ হ্যাঁ। ”
নাদিম চলে যেতে যেতে বলল-
“ আহারে আপনাকে মনে হয় কেউ পছন্দ করে না তাই না? সেজন্যই তো এখনকার যুগে এসেও আপনি সিঙ্গেল। দুঃখ হচ্ছে আপনার জন্য। ”
ইলার মুখ রাগে ফেটে যেতে লাগলো।
“ আপনাকে ক’জন পছন্দ করছে আপনার এই খবিশ মার্কা চেহারা দেখে শুনি? ”
“ এই খবিশ মার্কা চেহারা নিয়ে অলরেডি ৫ টা গার্লফ্রেন্ড পুষছি। আরো জানতে চান? ”
ইলা বিরবির করে বলল-
“ প্লে বয় একটা। ”
নাদিম শিস বাজাতে বাজাতে বলল-
“ আপনি প্লে গার্ল হলে মন্দ হতো না মিস ঢিলা। ইউ নো হোয়াট আই মিইননন?”
ইলা হাঁটা ধরে বিরবির করে বলল- “ উষ্টা খেয়ে মর শালা। ”
ইলার বাবা এগিয়ে এসে মেয়ের হাত ধরে বললেন-
“ কার সাথে কথা বলছিলি? কে ঐ ছেলে? ”
“ মুনতাহার ভাই। ”
“ ঐ ছোকরা এখানে কেনো? ”
“ ঘুরতে এসেছে অফিস থেকে। ”
ইকরাম ফরিদ মেয়েকে নিয়ে হাঁটা ধরে বলল-
“ ঐ ছেলের থেকে দূরে দূরে থাকবা। কথা বলার দরকার নেই। ”
সিকান্দার অফিসে ঢুকতেই ঠান্ডা এয়ারকন্ডিশনের বাতাস মুখে এসে লাগলো। বাইরে তখনও সকাল পুরোপুরি জমে ওঠে নি, কিন্তু “মির্জা গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড এক্সপোর্টস” এর হেড অফিসে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই।
দেশের অন্যতম বড় এক্সপোর্ট কোম্পানি এটি। গার্মেন্টস, লেদার ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট বিদেশে রপ্তানি করে তারা। জার্মানি, ইতালি, কানাডা, দুবাই বড় বড় বিদেশি বায়ারদের সাথে কাজ করে কোম্পানিটা।
সিকান্দার অফিসে আসতেই তার কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে এলেন সেলিম মির্জা।
হাতে মোটা একটা ফাইল। মুখ শক্ত। কোনো ভূমিকা ছাড়াই ফাইলটা সিকান্দারের টেবিলের উপর সজোরে রেখে বললেন-
“ তুমি দুদিন অফিসে না থাকায় আমার কোম্পানি ১ কোটি টাকার লস খেয়েছে। ”
সিকান্দার ভ্রু কুঁচকালো। সেলিম মির্জা থামলেন না।
“ কর্মচারীরা কাজ ঠিক মতো করে নি। সময় মতো পণ্য ডেলিভারি যায় নি। এখনও দুটো কার্গো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে আছে। বিদেশি বায়াররা একের পর এক মেইল করছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ডেমারেজ চার্জ যাচ্ছে। ”
সিকান্দার ধীরে চেয়ার টেনে বসল।
“ ম্যানেজার কোথায়? এগুলো তো দেখার কথা তার। ”
“ সে ছুটিতে গেছে। ”
“ কবে? ”
“ গতকাল। নাকি খুব ইমার্জেন্সি ছিলো। এখন তুমি এই ভেজাল সামলাও। ”
কথাটা বলেই সেলিম মির্জা বেরিয়ে গেলেন।সিকান্দার ধীরে ফাইলটা খুললো। প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা দেখেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।গণ্ডগোল তো আছেই। বরং ভয়ংকর গণ্ডগোল।
ইনভয়েসে পণ্যের পরিমাণ লেখা হয়েছে দশ হাজার ইউনিট, অথচ প্যাকিং লিস্টে বারো হাজার। দুইটা কন্টেইনারের সিল নম্বর মিলছে না।
এক্সপোর্ট ডকুমেন্টে ভুল এইচএস কোড ব্যবহার করা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় সমস্যা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য যেই অথরাইজেশন সিগনেচার দরকার ছিলো সেটা নেই। সিকান্দার বিরক্তিতে ফাইলটা বন্ধ করে আবার খুললো। এত বড় ভুলগুলো কিভাবে এড়িয়ে গেছে? এই ধরনের ভুল হলে বিদেশি বন্দর পর্যন্ত চালান আটকে যেতে পারে। কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্তও বসতে পারে।সে সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারকম তুলে বললো-
“ রবিনকে পাঠান। এখনই। ”
কয়েক মিনিট পর রবিন ভেতরে ঢুকলো। তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে পরিস্থিতি ভালো না।সিকান্দার ফাইলটা টেবিলের উপর ঠেলে দিয়ে বললো-
“ এগুলো কি? এত বড় বড় ভুল ফাইলে আসলো কিভাবে? ”
রবিন শুকনো গলায় বললো-
“ স্যার… আসলে সব একসাথে হয়ে গেছে। ”
“ আমি সেটা দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু করেছে কে? ”
“ এক্সপোর্ট টিমের জুনিয়ররা ডকুমেন্ট তৈরি করেছে। ম্যানেজার স্যার নাকি চেক করার আগেই চলে যান। তারপর শিপমেন্টের ডেডলাইন চলে আসায় সবাই তাড়াহুড়ো করে ফাইল সাবমিট করে দেয়। ”
সিকান্দার ঠান্ডা গলায় বললো-
“ আর কেউ এগুলো চেক করার প্রয়োজন মনে করলো না? ”
রবিন চুপ। কেবিনের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা নেমে এলো। তারপর রবিন ধীরে বললো-
“ স্যার… আপনি না থাকলে অফিসে কেউ বড় ডিসিশন নিতে চায় না। সবাই ভয় পায় যদি ভুল হয়। তাই সবাই ফাইল এক ডিপার্টমেন্ট থেকে আরেক ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়েছে, কিন্তু ফাইনাল ভেরিফিকেশন কেউ করে নি। ”
কোম্পানির সবচেয়ে কঠিন প্রজেক্টগুলো সিকান্দারের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। একদিকে বিদেশি ক্লায়েন্ট সামলাতে হয়, অন্যদিকে ব্যাংকের এলসি, কাস্টমস, শিপিং লাইন, ফ্যাক্টরি সবকিছুর দায়িত্বও তাকেই নিতে হয়।সে চোখ তুলে রবিনের দিকে তাকালো।
“ এখন কাস্টমস কি বলছে? ”
“ স্যার, তারা পুরো চালান পুনরায় ভেরিফিকেশন করছে। আর বন্দরে কন্টেইনার পড়ে থাকার জন্য প্রতিদিন চার্জ বাড়ছে। বিদেশি বায়ারও আজকের মধ্যে আপডেট চেয়েছে। ”
সিকান্দার ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।তার ক্লান্ত চোখে এবার ঠান্ডা কঠোরতা নেমে এসেছে।
“ এক্সপোর্ট টিমের সবাইকে কনফারেন্স রুমে পাঠান। আর চট্টগ্রাম বন্দরে ফোন লাগান। আজ কেউ অফিস থেকে বের হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি এই চালান ছাড়াতে না পারছি। ”
তাই করলো রবিন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই এক্সপোর্ট টিম, ডকুমেন্টেশন সেকশন, শিপিং ডিপার্টমেন্ট সবাইকে কনফারেন্স রুমে জড়ো করা হলো। বিরাট রুমটার ভেতর তখন চাপা টেনশন।
কারও হাতে ল্যাপটপ, কারও সামনে ফাইলের স্তূপ, কেউ নিচু স্বরে ফোনে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে কথা বলছে। বড় স্ক্রিনে একের পর এক শিপমেন্ট ডিটেইলস ভেসে উঠছে।
সিকান্দার টেবিলের মাথায় দাঁড়িয়ে একটার পর একটা ভুল বের করতে লাগলো। কোথাও ইনভয়েস মিসম্যাচ। কোথাও ভুল এইচএস কোড।
কোথাও সিগনেচার নেই। কোথাও শিপিং ডেট ভুল।
সে রীতিমত বিরক্তিকর গলায় বলছে-
“ এই ফাইল কে ভেরিফাই করেছে? এটা কাস্টমসে পাঠানোর আগে কেউ চেক করো নি? তোমরা বুঝতে পারছো একটা ভুলের জন্য কোম্পানির কোটি টাকা লস হচ্ছে? ”
কেউ মাথা তুলে ঠিকমতো উত্তর পর্যন্ত দিতে পারছিলো না। একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে শুধু। শেষ পর্যন্ত সিকান্দার নিজেই সব দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে নিলো। কার কোন কাজ, কে কোন ডকুমেন্ট ঠিক করবে, কে বন্দরে যোগাযোগ রাখবে, সব ভাগ করে দিলো সে।
তার আজ আর বাড়ি ফেরা হবে না। আজকের রাতের মধ্যেই তাকে সব ঠিক করতে হবে। নাহলে বিদেশি বায়ার চুক্তি বাতিল করে দিতে পারে।
সিকান্দার নিজের কেবিনে ফিরে আবার কাজে বসলো। একটার পর একটা ফোন। মেইল। ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন। ভিডিও কনফারেন্স।চট্টগ্রাম বন্দর। কাস্টমস অফিস। শিপিং লাইন।বিদেশি ক্লায়েন্ট। মাথার ভেতর যেন অবিরাম শব্দ বাজছে। ব্যস্ততার মাঝে খাওয়ার সময়টুকুও পেলো না সে। সকাল থেকে শুধু পানি আর তিতা কফি খেয়েই আছে। তবুও একটা জিনিস বাদ দিলো না। সেটা হলো নামাজ। আজান হলেই সে কাজ থামিয়ে দিতো। কেবিনের এক পাশে রাখা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যেতো। নামাজ শেষ করেই আবার ফাইলে ডুবে যেতো। এভাবেই সময় গড়িয়ে রাত একটা। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে যাচ্ছে। একেই সারা রাত ড্রাইভ করে ঢাকায় ফিরেছে, ঘুম হয় নি। এখন আবার পুরো রাত জেগে কাজ করছে। ক্রমশ তার মেজাজ খারাপের দিকে যেতে লাগলো।
মনে হচ্ছিলো টেবিলের উপর থাকা সব ফাইল ছুঁড়ে ফেলে দিতে। সবকিছু ভেঙেচুরে ফেলতে। সে দুহাতে মুখ চেপে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো।
মস্তিষ্কটাকে শান্ত করতে চাইলো। সেজন্য জায়নামাজটা মেঝেতে বিছিয়ে তার উপর শুয়ে পড়লো। কিন্তু শান্তি মিললো না। বরং মাথার ভেতরের চাপ আরও তীব্র হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্থিরতা জমতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত উঠে ওজু করলো সে। তারপর গভীর রাতে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়ালো।
নিস্তব্ধ অফিস। অন্ধকার কাচের ওপাশে ঘুমন্ত ঢাকা শহর। নামাজ শেষে সিকান্দারের ক্লান্ত কণ্ঠে কোরআনের আয়াত ভেসে উঠতে লাগলো। শেষে আর উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পেলো না সে। জায়নামাজের উপরেই মাথা ঠেকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না। ভোরের আজানে ঘুম ভাঙলো তার। ফজরের নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। মাথা ভারী। মেজাজ ভয়ংকর খিটখিটে হয়ে আছে। কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বের হতেই হঠাৎ করিডোরের দিক থেকে কর্মচারীদের হাসির শব্দ ভেসে এলো। কেউ হয়তো গল্প করছে। কেউ হালকা মজা করেছে। স্বাভাবিক একটা অফিস সকালের মতোই।
কিন্তু সেই মুহূর্তে শব্দগুলো সিকান্দারের মাথার ভেতর বিস্ফোরণের মতো লাগলো। কোম্পানির কোটি টাকার ঝামেলা মাথার উপর। আর এরা দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে! মুহূর্তেই নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না সে। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার। রাতভর জেগে থাকা ক্লান্ত চোখ দুটো রাগে রক্তিম হয়ে উঠলো। কপালের রগ ফুলে উঠেছে স্পষ্ট। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর আচমকাই গর্জে উঠলো-
“ অফিসটাকে কি সার্কাস বানিয়ে ফেলেছেন আপনারা? এখানে কোটি টাকার শিপমেন্ট বন্দরে আটকে আছে! বিদেশি ক্লায়েন্ট মাথার উপর উঠে বসে আছে! পুরো কোম্পানি একটা ভুলের জন্য ক্ষতির মুখে! আর আপনাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন কিছুই হয় নি। গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে আমি একা এই জঞ্জাল সামলাচ্ছি! কার ভুল, কার গাফিলতি। সব আমার ঘাড়ে এসে পড়ছে! আর আপনারা হাসাহাসি করছেন! ”
একজন জুনিয়র স্টাফ ভয়ে কাঁপা গলায় বললো-
“ স্যার… আমরা আসলে ”
“ চুপ! একদম চুপ! ”
এত জোরে ধমক দিলো যে ছেলেটা সাথে সাথে থেমে গেল। সিকান্দার আঙুল তুলে চারপাশ দেখিয়ে বললো-
“ এটা কোনো কলেজ ক্যাম্পাস না! এটা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি! এখানে একটা ভুলে কোটি টাকা ডুবে যায়! শত শত কর্মচারীর চাকরি ঝুঁকিতে পড়ে! আপনাদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জন্য গত তিনদিন ধরে পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়েছে! ” পাশ থেকে ফাইল হাতে তুলে নিয়ে বলল- “ এই ফাইলগুলো কি খেলনা? এগুলোতে কোম্পানির কোটি কোটি টাকার ডিল থাকে! একটা ভুল সিগনেচার, একটা ভুল কোড আর পুরো চালান বন্দরে আটকে যায়! আপনাদের মাথায় এসব ঢোকে না? আজ থেকে অফিস আওয়ারে কাউকে অযথা দাঁড়িয়ে গল্প করতে দেখলে সরাসরি এইচআর-এ রিপোর্ট যাবে। আর কাজ করতে না পারলে এখনই রিজাইন লেটার দিয়ে বের হয়ে যান। কোম্পানির ক্ষতি করার জন্য আমাকে আপনাকে বেতন দেওয়া হয় না। ”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৮
সিকান্দার কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলো। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। রাগে, ক্লান্তিতে, নির্ঘুম অবসাদে পুরো শরীর টা টানটান হয়ে আছে। তারপর কোনোদিকে না তাকিয়েই ঘুরে নিজের কেবিনে ঢুকে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিলো। সে হয়তো ধারণাও করতে পারছে না কেবল এইমাত্র সে কি করে বসেছে তার কর্মচারী দের সাথে।
বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীরা তখনও হতভম্ব। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কেউ নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ অস্বস্তিতে হাত মুচড়াচ্ছে। নারী কর্মচারীদের কয়েকজন তো স্পষ্ট ভয় পেয়ে গেছে। কারণ সিকান্দারকে সবাই সবসময় ঠান্ডা, হিসেবি মানুষ হিসেবেই দেখেছে। সে রাগলেও নিচু স্বরে কথা বলতো। কিন্তু আজ! আজ তারা এক অন্য সিকান্দার কে দেখলো!
