Home সিকান্দার শাহ্ সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৭

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৭

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৭
Raiha Zubair Ripti

রাত তখন অনেক। গ্রামের মেঠোপথে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটছে। চারপাশ অন্ধকার। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, কোথাও রাতজাগা কোনো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ। আকাশের বুকজুড়ে অসংখ্য তারা।মুনতাহার এক হাতে বিড়ালের ছানাটা। অন্য হাতটা সিকান্দারের মুঠোয়। কোনো কথা নেই দু’জনের মুখে। সিকান্দার মাথা নিচু করে ধীর পায়ে হাঁটছে। মাঝে মাঝে কয়েকবার মুনতাহার দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে কি না, পায়ের নিচে কাদা পড়ছে কি না এসবই যেন তার নজরে।
মুনতাহা শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙল। “ আর কত দূর? আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
সিকান্দার তাকাল। “ এই তো আর একটু।”

“আপনি আগে কেনো বলেননি আজ আমরা চলে যাব।”
” আজই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই আগে বলার সুযোগ হয় নি। ”
” যাচ্ছি টা কোথায়? বলুন না। ”
সিকান্দার আচমকা একটা বাড়ির সামনে এসে থেমে গেলো। মুনতাহা তাকালো। ঘুটঘুটে অন্ধকার। সিকান্দার ফোনের টর্চ টা ধরলো বাড়ির দিকে। তারপর পকেট থেকে চাবি বের করে সদর দরজাটা খুললো। খোলা শেষে মুনতাহার দিকে তাকিয়ে বলল,
” প্রবেশ করুন। ”
মুনতাহা তখনও বুঝতে পারছে না,এটা কার বাড়ি? এত রাতে সিকান্দার তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে, সেটাও তার কাছে পরিষ্কার নয়। চারপাশের অন্ধকারে বাড়িটার অবয়বটুকুই কেবল বোঝা যাচ্ছে। মুনতাহা মনে মনে বিসমিল্লাহ পড়ে বাড়িতে প্রবেশ করল। সিকান্দার কাপড়ের ব্যাগটা উঠানের একপাশে রেখে বারান্দায় উঠে গেল। তারপর বারান্দার কোণে রাখা হারিকেনটা হাতে নিয়ে জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই হলুদাভ নরম আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল পুরো বারান্দা। মুনতাহা থমকে দাঁড়াল। তার চোখ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে এলো আলোয়। তারপর তার চোখ ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াল পুরো বাড়িটার ওপর। কী সুন্দর! কী চমৎকার! এমন বাড়ি মুনতাহা আগে কখনো দেখে নি।
বাড়িটা একদমই ইট-সিমেন্টের নয়। বরং মোটা মাটি দিয়ে গাঁথা, তার ওপর সাদাটে মাটির প্রলেপ দেওয়া। দেয়ালের কোথাও অতিরিক্ত কারুকাজ নেই, নেই শহুরে বাড়ির মতো চাকচিক্য। অথচ সেই সরলতার মধ্যেই কী অপূর্ব একটা মায়া! উপরে নতুন টিনের ছাদ। ছাদের নিচে মোটা কাঠের আড়, আর সামনে ছোট্ট একটা কাঠের বারান্দা। বারান্দার মেঝেটা মাটি দিয়ে শক্ত করে লেপা। এতটাই মসৃণ যে হারিকেনের আলোয় হালকা চকচক করছে। মুনতাহা অতি উৎসাহের সাথে জিজ্ঞেস করলো,

” এটা কার বাড়ি? ”
সিকান্দার এগিয়ে আসতে আসতে জবাব দিলো,
” আমাদের বাড়ি। ”
মুনতাহা অবাক চোখে তাকালো। তারপর কিছু একটা ভেবে মলিন মুখে বলল,
” ভাড়া নিয়েছেন? ”
” না। প্রথমে জায়গাটা কিনেছি। তারপর বাড়িটা বানিয়েছি আপনার জন্য। ”
মুনতাহা যেন আকাশ থেকে টপকে পরলো এই মাত্র কথাটা শুনে। এটা তাদের নিজেদের বাড়ি! এটা কোনো স্বপ্ন নয় তো! মুনতাহা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ কোলে থাকা বিড়ালছানাটাকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ সত্যি? এটা আমাদের নিজেদের বাড়ি?”
সিকান্দার এবার তার দিকে পুরোপুরি ফিরে দাঁড়াল।
“হ্যাঁ।”
” কিভাবে সম্ভব হলো এটা? ”
সিকান্দার ধীরে ধীরে সব খুলে বললো। সব শোনার পর মুনতাহা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সিকান্দার কে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো। সিকান্দার ভ্রু কুঁচকে ফেলল।

” কাঁদছেন কেন?”
“খুশিতে।”
সিকান্দার তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল, “খুশিতে কাঁদতে হয় না।”
মুনতাহা ভেজা চোখে তাকিয়ে বলল, “আপনি বুঝবেন না।”
“কী বুঝব না?”
“একটা মেয়ের জন্য নিজের ঘর মানে কী। জন্মের পর থেকেই আমার নিজের ঘর বলতে কোনো ঘর ছিলো না। প্রথমে মামাদের বাড়িতে লাথি উষ্ঠা খেয়ে থাকলাম। তারপর নিজের মায়ের দ্বিতীয় সংসারে গিয়ে আশ্রিতার মতো বড় হলাম। তারপর একটা সুপুরুষের সাথে বিয়ে হলো। ভাবলাম এবার আমার একটা স্থায়ী ঠিকানা হবে। কিন্তু বিয়ের দু মাস পর সেই ঠিকানাও হারালাম আমরা। অবশেষে আল্লাহ মুখ তুলে তাকালেন আমাদের দিকে। আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে… এটা আমাদের। সত্যি সত্যি আমাদের। এখানে আমি আশ্রিত নই। কারও দয়া নিয়ে থাকছি না। কেউ কাল এসে বলবে না, এই ঘর ছেড়ে চলে যাও।”
সিকান্দারের মুখটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। নরম স্বরে ডেকে উঠলো- “মুনতাহা।”

“হুম?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সিকান্দার বলল, “আমার বলায় একটু ভুল হয়েছে।”
মুনতাহা অবাক হয়ে তাকাল। “কী?”
সিকান্দার মৃদু হেসে বলল, “আমি বলেছিলাম এটা আমাদের বাড়ি। আসলে বলা উচিত ছিল, এটা শুধুই আপনার বাড়ি।”
মুনতাহা কপাল কুঁচকে ফেলল। “মানে?”
সিকান্দার আর কিছু বলল না। কাপড়ের ব্যাগের ভেতর থেকে একটা ফাইল বের করল। তারপর সেটার সঙ্গে থাকা আরও কয়েকটা কাগজ মুনতাহার হাতে তুলে দিল। মুনতাহা হতভম্ব হয়ে কাগজগুলোর দিকে তাকাল।
“এগুলো কী?”
“জমির দলিল। বাড়ির কাগজ।”
মুনতাহা কিছুই বুঝতে পারছিল না। সিকান্দার শান্ত গলায় বলল, “সব আপনার নামে করা।”
মুনতাহা যেন কথাটা শুনেও বুঝতে পারল না।
“আমার নামে! কিন্তু কেন?”

” কখনো যেন আপনার ভেতর এই অনুভূতি টা না হয় যে আমি না থাকলে আপনার কি হবে। আপনি কোথায় যাবেন। কার দরজায় দাঁড়াবেন? কে আপনাকে আশ্রয় দেবে? কার বাড়িতে গিয়ে বলবেন আমাকে একটু জায়গা দিন? আমি এও জানি না, আল্লাহ আমাদের দুজনের মধ্যে কাকে আগে ডাকবেন। আমি আপনার আগে চলে যেতে পারি, আপনিও আমার আগে চলে যেতে পারেন। মানুষের হাতে তো আগামীকাল বলতে কিছু নেই। তবে আমি আপনার আজীবনের দায়িত্ব নিয়েছি। আমি বেঁচে থাকি কিংবা না থাকি, আপনার প্রতি আমার দায়িত্ব, আপনার জন্য আমার ভালোবাসা কোনোটাই শেষ হবে না। কেয়ামত পেরিয়ে জান্নাত অব্দি তা চলতেই থাকবে। আমার জীবদ্দশায় যেমন আপনার দায়িত্ব আমার ছিল, মৃত্যুর পরও আমার রেখে যাওয়া প্রতিটি ব্যবস্থা আপনার জন্যই থাকবে। ছোটবেলা থেকে আপনি ঠিকানা হারিয়েছেন। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে গেছেন। আশ্রয় পেয়েছেন, কিন্তু নিজের বলে কোনো জায়গা পাননি। আমি চাই না, আমার জীবনে এসে আবারও আপনার সেই অনিশ্চয়তা শুরু হোক। আমি আপনার জন্য যা করতে পারি, যতটুকু রেখে যেতে পারি সবকিছু করেই যেতে চাই।”

মির্জা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার ঠিক তিন মাস চার দিন পর সিকান্দার শাহ্ আজ তার স্ত্রী কে একটি বাড়ি উপহার দিলো। মুনতাহা তাকিয়ে রইল। দুচোখ জলে ভরা। মুনতাহা নিশ্চয়ই জীবনে কোনো একটা ভালো কাজ করেছিল। যার কারনে এমন এক চমৎকার লোক তার জীবনে এসেছে। তার আম্মা এই একটা চমৎকার কাজ করেছে তার জন্য। সেজন্য আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে মুনতাহা তার মায়ের কাছে।
মুনতাহা এবার পুরো বাড়িটার দিকে নজর দিলো। সিকান্দার বাড়িটা বানানোর সময় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টার দিকে খেয়াল রেখেছিল, সেটা ছিল মুনতাহার পর্দা।
সে এমন বাড়ি চায়নি, যেখানে মুনতাহাকে পর্দা করতে গিয়ে সারাক্ষণ ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকতে হবে। আবার এমন বাড়িও নয়, যেখানে নিজের উঠোনে দাঁড়িয়েও তাকে ভাবতে হবে বাইরের কোনো পুরুষের চোখ তার ওপর পড়ছে কি না।

সিকান্দার চেয়েছিল, তার স্ত্রী নিজের বাড়ির ভেতরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করবে, অথচ তার পর্দাটাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। তাই বাড়িটা সে গ্রামের একেবারে চলাচলের রাস্তার ধারে করেনি। বাড়িটা গ্রামের একেবারে ভেতরের দিকে, লোক চলাচলের প্রধান পথ থেকে খানিকটা দূরে নিরিবিলি জায়গায়। বাড়ির চারিপাশে শক্ত বাঁশের বেড়া, তার গায়ে আবার ঘন করে লাগানো হয়েছে বাঁশের চাটাই। বাইরে থেকে কেউ রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেও ভেতরের উঠোনটা একটুও চোখে পড়ে না।
সিকান্দারের কাছে এটা কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না।
কারণ পর্দা তার কাছে শুধু মুনতাহার হাত মুখ ঢেকে রাখার নাম নয়। পর্দা মানে দৃষ্টি সংযত রাখা, আড়াল রক্ষা করা, ঘরের ব্যক্তিগত জীবনকে অপ্রয়োজনীয় চোখ থেকে নিরাপদ রাখা।
কুরআনে মুমিন পুরুষদেরও আগে দৃষ্টি নত রাখতে বলা হয়েছে। সেখানে নিজের স্ত্রীকে এমন পরিবেশে রাখা, যেখানে প্রতিনিয়ত অপরিচিত পুরুষের দৃষ্টি পড়ার সম্ভাবনা থাকে এটা সে নিজের দায়িত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে না।

বাড়ির মূল দরজাটাও তাই সরাসরি উঠোনের দিকে মুখ করে নয়। মূল প্রবেশপথের সামনে সিকান্দার ছোট্ট একটা বাঁকানো দেয়াল তুলে দিয়েছে। যাকে গ্রামের ভাষায় বলা যায় আড়াল। বাইরে থেকে কেউ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেও ভেতরের উঠোন বা ঘরের দরজা তার চোখে পড়বে না।
সিকান্দার এটাকে নিছক বাড়ির সৌন্দর্যের জন্য করেনি।
মুনতাহার পর্দার জন্য করেছে। বাড়ির ভেতরেও সেই একই সরলতা। দুটো ঘর। একটা তাদের শোবার ঘর, অন্যটা বসা ও প্রয়োজনীয় জিনিস রাখার জন্য। শোবার ঘরে খুব বেশি আসবাব নেই। একটি সাধারণ কাঠের চৌকি, একটা কাঠের আলমারি, ছোট্ট একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার। বসার ঘরের সবচেয়ে ভেতরের ঘরের একপাশে সিকান্দার কাঠের ছোট্ট একটা তাক বানিয়েছে। সেখানে কুরআন শরীফ,আতর,কয়েকটা ইসলামিক বই আর দুটো জায়নামাজ।
বাইরের মানুষ এলে পুরুষদের বসার জন্য বাড়ির সামনের অংশে আলাদা একটা ছোট ঘর রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই ঘর থেকে বাড়ির মূল অংশে যাওয়ার কোনো খোলা পথ নেই। মাঝখানে দরজা, আড়াল এবং আলাদা প্রবেশপথ। কোনো পুরুষ অতিথি এলে মুনতাহাকে হঠাৎ বোরকা-নিকাব খুঁজে দৌড়াতে হবে না। কারণ সিকান্দার এমন ব্যবস্থা করেছে, যেন গায়রে মাহরাম পুরুষ আর তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত জায়গা একে অপরের সঙ্গে মিশে না যায়।

বাড়ির জানালাগুলোও রাস্তার দিকে বড় করে খোলা নয়। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে কাঠের পাল্লা আর ঘন জালি বসানো হয়েছে। বাইরে থেকে আলো-বাতাস আসবে, কিন্তু ঘরের ভেতরের মানুষের ব্যক্তিগত জীবন বাইরে থেকে দেখা যাবে না। পেছন দিকেও একই ব্যবস্থা। রান্নাঘর, কাপড় শুকানোর জায়গা, গোসলের স্থান সবকিছুই বাড়ির একেবারে ভেতরের অংশে। চারপাশে উঁচু দেওয়াল। মুনতাহা যেন এসব কাজ করতে গিয়েও কোনো অপরিচিত পুরুষের সামনে পড়ে না যায়।
আর বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা ছিল বাড়ির মাঝখানের ছোট্ট উঠোন। আকাশটা পুরোপুরি দেখা যায় সেখানে। এই উঠোনটাও বাইরে থেকে পুরোপুরি আড়াল করা। এ বাড়ির মধ্যে সিকান্দারের সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটা হচ্ছে উঠোনের এক কোণ। সেখানে সে দুটো কাঠের খুঁটি পুঁতে একটা দড়ি টাঙিয়েছে। মুনতাহা সেখানে কাপড় শুকাবে। পাশে একটা ছোট্ট কাঠের চৌকি। সন্ধ্যায় নামাজ শেষে সিকান্দার প্রায়ই সেখানে বসে থাকবে মুনতাহা কে নিয়ে আর বিড়ালের ছানাটা উঠোনে দৌড়াদৌড়ি করবে। কেউ তাদেরকে দেখবে না।
উঠোনের চারপাশে সিকান্দার ফলের গাছ লাগিয়েছে পেয়ারা, লেবু, ডালিম, কাঁঠাল। কিছু জায়গায় ইচ্ছে করেই ঘন গাছ লাগিয়েছে।

সিকান্দার চায় না মুনতাহা মানুষের দৃষ্টি থেকে লুকিয়ে থাকুক বলে পৃথিবীটাকেই তার জন্য ছোট করে দিতে। বরং সে মুনতাহার জন্য এমন একটা ছোট্ট পৃথিবী বানিয়েছে, যেখানে সে নিরাপদে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে।বাড়িতে পা রাখার পর প্রথমেই তারা দুজন কলপাড়ে গেল। অন্ধকারে কলের পানির শব্দ আর দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া চারপাশটা বেশ নীরব। সিকান্দার আগে ওজু করল, তারপর মুনতাহাও ধীরে ধীরে ওজু করে নিল।
ওজু শেষে দুজন বসার ঘরে ফিরে এলো। সিকান্দার ঘরের তাক থেকে দুটো জায়নামাজ নামিয়ে মেঝেতে বিছিয়ে দিল। পাশাপাশি আগপিছ দাঁড়িয়ে তারা নফল নামাজ আদায় করল। এরপর রাতের নীরবতায় শুরু হলো তাহাজ্জুদ।
নামাজ শেষে মুনতাহা নিজের জায়নামাজেই বসে রইল। সিকান্দারও কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। কোনো কথা না বলে ঘরের একপাশের তাকের কাছে গিয়ে সেখানে রাখা সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো একটি জিনিস হাতে তুলে নিল। তারপর ধীর পায়ে ফিরে এসে মুনতাহার সামনে বসল। মুনতাহা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
সিকান্দার সাদা কাপড়ে মোড়ানো জিনিসটি তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

” এটা আপনার জন্য মন। নতুন বাড়িতে পা রাখলেন প্রথমবার। তোহফা পাওয়া আবশ্যিক ছিলো। আর আমার মতে এর চেয়ে দারুন, উত্তম তোহফা আর কোনোটাই হতে পারে না। ”
মুনতাহা সাদা কাপড় টা উপর থেকে সরিয়ে দেখলো এটা কুরআন শরীফ। মলাটের ওপর অপূর্ব ক্যালিগ্রাফি। খুব সাধারণ কোনো ছাপা মলাটের মতো নয়। অক্ষরগুলোর বিন্যাসে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য আছে। মুনতাহা নিঃশব্দে পাতা উল্টাতে লাগল। এক পৃষ্ঠা। দুই পৃষ্ঠা। তারপর আরও কয়েকটি। সবকটিই সিকান্দারের হাতে লেখা। মুনতাহার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলে সিকান্দারের দিকে তাকাল।
“এটা… আপনি লিখেছেন?”
সিকান্দার খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, “জি।”
মুনতাহা আবার কুরআন শরীফটির দিকে তাকাল। তাহলে কতটা সময়! কতগুলো রাত, কতগুলো ভোর, কতগুলো ঘণ্টা সে ব্যয় করেছে?
মুনতাহা কিছু বলার আগেই সিকান্দার শান্ত স্বরে বলল,
“এটা আমার লেখা প্রথম কপি।”
মুনতাহার চোখ এবার আরও বড় হয়ে গেল। সিকান্দার একটু থেমে বলল, “প্রথম কপিটা অন্য কারও জন্য রাখিনি। আপনার জন্যই এনেছি।”

কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো বিশেষ আবেগ ছিল না। যেন খুব স্বাভাবিক একটা কথা বলছে। কিন্তু মুনতাহার কাছে কথাটা স্বাভাবিক রইল না। সে কুরআন শরীফটার মলাটে হাত রাখল। তারপর অত্যন্ত যত্নে সেটাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। সিকান্দার তাকিয়ে রইল।
মুনতাহার চোখের কোণে জমে থাকা জলটা এবার আর তার অগোচরে রইল না।
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেল তাদের। বসার ঘরের মাদুরের উপর বিড়াল ছানাটা গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। সিকান্দার আর মুনতাহা তখনও জেগে। জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। বাহিরে শীতল ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। হয়তো বৃষ্টি আসবে। কথাটা ভাবা মাত্রই ফোটা ফোটা করে বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করলো। তারপরই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। তাদের চোখের সামনে গত কয়েক মাসের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠলেও তারা তাকিয়ে আছে টিনের চাল বেয়ে পড়া পানির দিকে। সিকান্দার মাথা নিচু করল। তার ঠোঁটে নড়ল।
“আলহামদুলিল্লাহ। ইয়া রব,আমি তো শুধু একটা দরজা চেয়েছিলাম। আপনি পুরো একটা ঘর দিয়ে দিলেন। আপনার এই অশেষ রহমতের শুকরিয়া আমি কীভাবে আদায় করব? কোন আমলের মাধ্যমে আপনার এই নিয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব? আমি তো আপনার অতি তুচ্ছ, অতি নগণ্য এক বান্দা। আমার আমল অল্প, আমার সামর্থ্য সীমিত, অথচ আপনার দয়া সীমাহীন। আমি যতটুকু চাইতে জানি, আপনি তার চেয়েও বেশি দিয়ে দেন। আমি যতটুকু প্রার্থনা করতে পারি, আপনার দান তারও বহু ঊর্ধ্বে। আমার এই ক্ষুদ্র হৃদয়ের কৃতজ্ঞতাকে আপনার দরবারে গ্রহণযোগ্য করে দিন। আলহামদুলিল্লাহি ‘আলা কুল্লি হাল। সমস্ত প্রশংসা শুধু আপনারই, ইয়া রব।”

পাশ থেকে মুনতাহার ঘুমজড়ানো কণ্ঠ এলো,
“ঘুমাবেন না?”
সিকান্দার ফিরে তাকাল। মুনতাহার হাত মুঠোয় নিয়ে একবার বিড়ালছানার দিকে তাকালো। তারপর শোবার ঘরে চলে আসলো। হারিকেনের আলো টা নিভিয়ে তারা বিছানায় শুয়ে পরলো। তাদের দৃষ্টি তখন সিলিং এর দিকে। জানালা দিয়ে শো শো করে বাতাস আসছে। পুরো রুম জুড়ে শীতল বাতাসের মেলা। সিকান্দার জিজ্ঞেস করলো
“বাড়িটা কি আপনার পছন্দ হয়েছে?”
সিকান্দারের প্রশ্নে মুনতাহা এক মুহূর্তও ভাবলো না। ধীরে এক হাত রাখলো তার বুকের ওপর। চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই বললো,
“খুউব পছন্দ হয়েছে।”
সিকান্দারের মুখে মৃদু হাসি ফুটলো। তবুও কোথাও যেন একটা অস্থিরতা রয়ে গেল।
“দুশ্চিন্তায় ছিলাম। বাড়িটা আপনার পছন্দ হবে কি না—সেটা নিয়েই। আসলে…” সিকান্দার একটু থামলো। তারপর শান্ত গলায় বললো, “বিল্ডিং করে বানানোর মতো টাকা এখনো পাইনি। তাই এই বাড়িটাই যতটা সম্ভব নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ, যখন টাকা হবে, তখন আপনার জন্য আরও সুন্দর একটা বাড়ি বানিয়ে দেব।”

মুনতাহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।
“না, না। এই বাড়িটা ভাঙবেন না।”
সিকান্দার একটু অবাক হয়ে তাকালো।
“কেন?”
মুনতাহা তার বুকের ওপর রাখা হাতটা সরালো না। বরং আরও আপন করে কাছে এসে বললো,
“আমি আজীবন এই বাড়িতেই থাকতে চাই। দালান-কোঠার আভিজাত্যপূর্ণ জীবন আমার চাই না। বড় বাড়ি, দামি আসবাব, উঁচু দেয়াল—এসবের কোনো কিছুই আমাকে টানে না। এই বাড়ির প্রতিটা কোণ আমার ভালো লেগেছে। এখানে আমাদের প্রথম সংসারের স্মৃতি থাকবে। এই উঠোনে হয়তো একদিন আমাদের সন্তানরা ছুটে বেড়াবে। এই বারান্দায় বসে আমরা বুড়ো হবো। এই বাড়িতেই আল্লাহ চাইলে আমরা মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবো। এত স্মৃতি নিয়ে একটা বাড়ি কীভাবে ভেঙে ফেলি বলুন? তাই আমি বলবো, এই বাড়ির কোনো কিছুতেই পুনরায় হাত দেবেন না। যেমন আছে, তেমনই থাকুক। খুব প্রয়োজন না হলে একটা ইটও বদলাবেন না। এটা আমার ইচ্ছে।”

সিকান্দার কিছুক্ষণ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর মৃদু হেসে বললো,
“আপনার ইচ্ছেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা।”
মুনতাহা হেসে ফেললো। “তাহলে কথা দিলেন?”
সিকান্দার তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখলো।
“কথা দিলাম। এই বাড়ি আর কখনো ভাঙা হবে না।”
মুনতাহা আচমকাই জড়িয়ে ধরলো স্বামীকে। মুখটা এনে রাখলো সিকান্দারের গলার কাছে, তারপর অতি মৃদু করে ঠোঁট ছোঁয়ালো সেখানে। দীর্ঘ কতগুলো দিন পর আজ তারা একই ঘরে, একই বিছানায় একে অপরের এতটা কাছে। সিকান্দারের বুকে মাথা রেখে মুনতাহার মনে হলো, এতদিনের দূরত্ব বুঝি আজ এক নিমেষেই মুছে যাচ্ছে।

কিছু তৃষ্ণা জমে ছিল দু’জনের মাঝেই। ভালোবাসার তৃষ্ণা।
দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার যে অদ্ভুত আকুলতা, তার কোনো ভাষা হয় না। শুধু অনুভব করা যায়। আর সেই অনুভূতির কাছে শব্দেরা বড় অসহায়।
সিকান্দারের বাহু ধীরে ধীরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। মুনতাহা চোখ বন্ধ করলো। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান, অপেক্ষা, একাকিত্ব সবকিছু যেন তার স্বামীর বুকে এসে গলে যাচ্ছিল।
বাইরে তখন অঝোর বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ একটানা বাজছে। দূরের অন্ধকারে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে, আবার চারপাশ ডুবে যাচ্ছে বৃষ্টিভেজা নীরবতায়। আর ঘরের ভেতর? সেখানে দুজন মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হচ্ছিল কিছু দীর্ঘ আলিঙ্গনে, কিছু অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষায়। মুনতাহা সিকান্দারের বুকে মুখ লুকিয়ে আরও একটু কাছে সরে এলো। সিকান্দারও তাকে আলাদা করলো না। সেই রাতে বৃষ্টির শব্দ আরও গভীর হলো।

বদ্ধ ঘরের দরজার ওপাশে পৃথিবী তার নিজস্ব ব্যস্ততায় রয়ে গেল, আর এপাশে দু’জন মানুষ দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজেদের সমস্ত দূরত্ব ভুলে একে অপরের কাছে ফিরে এলো। কতটা সময় পেরিয়ে গেল, তারা কেউ জানলো না।সে দুজনের মাঝখানে দীর্ঘ বিরহের সমস্ত শূন্যতা ধুয়ে দিয়ে নেমেছিল এক গভীর, প্রশান্ত ভালোবাসা।
সকালে খুব ভোরে তাদের ঘুম ভাঙলো। গোসল সেরে নামাজ পড়ে মুনতাহা আবার শুয়ে ছিল। সিকান্দার অবশ্য ঘুমায় নি। বাহির থেকে একাধারে ডেকে উঠার শব্দ পেয়ে বাহিরে এসে দরজা খুলে দেখে রাশেদ এসেছে। হাতে তার খাবার। সিকান্দার কে দেখেই সে হেঁসে দাঁত পাটি দেখিয়ে বলল,
” মায় ভাত পাঠায় দিছে আমনে গো লাগি। আইজ আর রাইনদেন না। আমি আইয়া দিয়া যামু নি দুপুরে আর রাইতে। ”
সিকান্দার তপ্ত শ্বাস ফেলে নিলো খাবারের পুঁটলি টা। তারপর রাশেদের উদ্দেশ্যে বলল,
” না আনলেও চলতো রাশেদ। চাচি কে মানা করে দিও। আমাদের খাবারে সমস্যা হবে না। ”
” নিত্তি কি আনমু নাকি ভাই। আইজকার দিন টা খান। বাজার সদাই কি করছেন? নাকি করেন নাই? ”
” করা আছে সব রাশেদ। ভেতরে আসো তুমি। ”
” না ভাই,ক্ষেতে যামু। আজ আহি। আমনে কিন্তু বাড়িডা মেলা সুন্দর বানাইছেন। চেয়ারম্যান বাড়ির থেকেও মেলা সুন্দর। ”

রাশেদ আগেই একদিন সিকান্দারকে ডাকতে এসে বাড়িটা দেখেছিল। শহুরে ছেলে তো জীবনে অনেক কিছু দেখেছে, অনেক ধরনের বাড়িঘরও দেখেছে। তাই গ্রামের আর দশটা বাড়ির তুলনায় সিকান্দারের বাড়িটা যে একেবারেই আলাদা, সেটা তার চোখ এড়ায়নি।
রাশেদ চলে যাওয়ার পর সিকান্দার দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল। তারপর ঘরে এসে মুনতাহাকে ডাকলো। দু’জনে একসঙ্গে বসে খাবার খেল। খাওয়া শেষ করে আর দেরি করলো না সিকান্দার। মুনতাহাকে সঙ্গে নিয়ে শহরের দিকে রওনা হলো।
প্রথমে গেল কুরিয়ার অফিসে। নাদিম বেশ কিছুদিন আগে মুনতাহার নামে তার শিক্ষা জীবনের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র পাঠিয়েছিল। সিকান্দার নিজেই সেগুলো বুঝে নিল। সার্টিফিকেট, মার্কশিট, প্রয়োজনীয় নথিপত্র। মুনতাহার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্য যা যা দরকার, একটিও যেন বাদ না পড়ে, সেদিকে তার তীক্ষ্ণ নজর।
তারপর সেখান থেকে সোজা শহরের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটিতে গেল তারা।মুনতাহা তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারছিল না সিকান্দার তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ভবনটার সামনে গাড়ি থামতেই সে অবাক হয়ে তাকালো।

“এখানে কেন?”
সিকান্দার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো, “আপনাকে ভর্তি করাতে এসেছি।”
মুনতাহা কিছুক্ষণ নির্বাক। “কীসে?”
“আপনার পছন্দের বিষয়টায়।”
মুনতাহার চোখ বড় হয়ে গেল। “ফার্মেসি তে?”
“হ্যাঁ।”
সিকান্দারের উত্তরটা এত সহজ ছিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক একটা কাজের কথা বলছে। কিন্তু মুনতাহার কাছে ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। একসময় পরিস্থিতির চাপে তার পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্নগুলো সে বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল, সেগুলোও একসময় বাস্তবতার কাছে হার মেনে গিয়েছিল। তাই আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমের সামনে বসে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। তার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় ঢাবি! তাকে আর পাওয়া হবে না। মানুষ চান্স পায় না। আর সে চান্স পেয়েও পড়তে পারলো না। তবে সেই দুঃখ অবশ্য সিকান্দার রাখে নি। সিকান্দার শুধু তাকে ভর্তি করিয়েই থামলো না। আগামী চার বছরে তার পড়াশোনার জন্য টিউশন ফি, সেমিস্টার ফি, বইপত্র, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সংক্রান্ত খরচ সবকিছুর হিসাব করে অগ্রিম পরিশোধ করে দিল। মুনতাহা তখন আর চুপ থাকতে পারলো না।

“এত টাকা একসঙ্গে দিয়ে দিলেন কেন?”
সিকান্দার কাগজপত্র গুছাতে গুছাতে বললো, “যাতে আগামী চার বছরে পড়াশোনার খরচ নিয়ে আমাকে বা আপনাকে একবারও ভাবতে না হয়।”
“কিন্তু এত খরচ করে প্রাইভেটে পড়ার কী দরকার ছিল? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়লেও তো হতো। আমি ওখানেই পড়তাম।”
সিকান্দার এবার তার দিকে তাকালো। “না।”
একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের মধ্যে সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা ছিল। মুনতাহা মৃদু বিরক্ত হয়ে বললো,
“কেন না?”
“কারণ আপনার পড়াশোনা নিয়ে আমি দ্বিতীয়বার কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। একবার আপনার পড়াশোনা থেমে গেছে। সেটা আর কখনো হতে দেব না। জীবনে যত উত্থান-পতনই আসুক, যত খারাপ সময়ই আসুক, আপনার পড়াশোনা যেন কোনো পরিস্থিতিতেই বন্ধ না হয়,আমি সেটা নিশ্চিত করতে চাই।”

“কিন্তু..”
“কোনো কিন্তু নয়। আপনি কী জানেন, জীবনে কী কী হতে পারে, আমি জানি না। আজ সবকিছু ভালো আছে, কাল হয়তো থাকবে না। মানুষের হাতে থাকা সময়, অর্থ, পরিস্থিতি কিছুই স্থায়ী নয়। কিন্তু আমি চাই, আপনার পড়াশোনাটা যেন কোনোদিন পরিস্থিতির কাছে হেরে না যায়। আর আপনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন কি না, সেটা নিয়ে এত চিন্তা করছেন কেন?”
“কারণ খরচটা অনেক।”
সিকান্দার এবার হেসে ফেললো। “আমার একটাই বউ।”
মুনতাহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। “তাতে?”
“তাতে এই যে, আমার উপার্জন যদি আপনার জীবনটা একটু সহজ করার কাজে না আসে, তাহলে সেই টাকা দিয়ে আমি করবটা কী? আমি টাকা উপার্জন করি শুধু আমাদের জন্য। আপনার প্রয়োজনের সময় যেন আপনাকে কারও দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয় এই জন্য করি। আপনার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে যেন কখনো মনে না হয়, টাকার জন্য পারলাম না। এই কথাটাই আমি আপনার জীবনে রাখতে চাই না।”
মুনতাহার চোখের কোণে অল্প পানি জমলো। মেয়েটা এত কাঁদে কেন? সিকান্দার সেটা দেখেও কিছু বললো না। শুধু তার সামনে রাখা ভর্তি-সংক্রান্ত কাগজগুলো নিজের হাতে গুছিয়ে নিল।তারপর বললো,
“আপনি শুধু পড়াশোনা করবেন। মন দিয়ে করবেন। বাকি দায়িত্ব আমার।”
মুনতাহা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলো। এই লোক এত ভালো কেনো? ইয়া রব…

নাদিম নিজের ব্যাগপত্র গোছাচ্ছে। সিকান্দারের সাথে কথা হয়েছে। আজই সন্ধ্যার পর রওনা দিবে। ময়না বেগম অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল কোথায় যাচ্ছে নাদিম। নাদিম বলে নি কোথায় যাচ্ছে। চুপচাপ ছিলো। বের হবার আগে শুধু সালমান মির্জা কে আসছি বলে বেরিয়ে আসলো। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে সোজা ইলাদের বাসায় গেলো। ইলা এখনো নামে নি। সেজন্য কয়েকবার ফোন দিলো। অবশেষে মিনিট দশেক পর ইলা আসলো। সাথে তার বাবা মা-ও। ইলার বাবা নাদিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
” দেখে শুনে যাবে। পৌঁছেই ফোন দিবে। আমার মেয়েটাকে ও স্ত্রী টাকে দেখেশুনে রাখবে। আর আগামী কালই ব্যাক করবে। ”
নাদিম ভ্রু কুঁচকে কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো। উনার স্ত্রীও যাবে! ইলা আগে কেন বললো না? বললে তো যাওয়া টা ক্যান্সেল করে দিত। ওদের মা মেয়ের বডিগার্ড নাকি সে।
” কি হলো কথা ঢুকেছে কানে? ”
” জি ঢুকেছে। ”

ইলার বাবা মেয়ে ও স্ত্রীর সাথে কিছু কথাবার্তা করে তারপর গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। ইলার বাবা ইলাকে একা একটা পরপরুষের সাথে যেতে দিতে চাচ্ছিলো। কিন্তু ইলা যাবেই। মুনতাহার সাথে দেখা করবেি। সেজন্য তিনি স্ত্রী কেও পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো। ইলার অবশ্য এসবে আপত্তি ছিলো না। তবে নাদিম গাড়িতে বসে ফুঁসছে রাগে। কি একটা দারুন মুড নিয়ে বের হয়েছিল। ইলা আর নাদিম পাশাপাশি একই সিটে। আহ! পুরাই মিঙ্গেল মিঙ্গেল ফিল দিত। কিন্তু অসভ্য ইডিয়েট গার্ল মা নিয়ে হাজির।
দীর্ঘ কয়েক ঘন্টা পর তাদের গাড়িটা এসে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে এসে থামে। কিন্তু বাড়িতো চিনে না। সেজন্য ফোন করলো সিকান্দার কে। সিকান্দার আর মুনতাহা তখন দুজনে মিলে সবে রান্না বান্না করে খাবার সজিয়েছে। নাদিমের ফোন পেয়ে সিকান্দার শরীরে শার্ট জড়িয়ে চলে গেলো তাদের আনতে।
ইলা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে চারিপাশে। কি সুন্দর গ্রাম! সিকান্দার আসতেই সে সিকান্দার কে সালাম দিলো। সিকান্দার মাথা নত রেখেই সালামের জবাব দিলো। তারপর নাদিমের দিকে তাকিয়ে বলল,
” আসতে কেনো সমস্যা হয় নি তো? ”
নাদিম চিৎকার করে করে বলতে চাইলো,বিরাট বড় সমস্যা হয়েছে। এই ঢিলার ঘরে ঢিলা ওর মা কে নিয়ে আসছে কাবাব মে হাড্ডি করার জন্য। তবে তার বুক ফাটলেও মুখ ফুটলো না। বুঝালো তাদের আসতে সমস্যা হয় নি।

গাড়িটা তাদের বাড়ি অব্দি যাবে না। কারন ওদিকে রাস্তাটা কিছুটা সরু। তারা সিকান্দারের পেছন পেছন হেঁটে আসলো। বাড়িতে ঢুকে ইলা আর ইলার মা ভেতরের ঘরে চলে গেলো। আর নাদিম কে অতিথি রুমে রাখা হলো। সিকান্দার আগেই জানিয়ে দিছে মুনতাহা এখন পুরোপুরি পর্দা পালন করে। সিকান্দার ব্যতিত আর কোনো পরপুরুষের সামনে সে আসে না। তাই নাদিম বাড়ির ভেতরে যেতে পারবে না।
নাদিমের অবশ্য সেসব নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। অন্যের বউ সে দেখে কি করবে। তবে এখানে প্রচুর গরম। অবশ্য সিকান্দারদের কাছে এটা গরম না। নাদিমের তো অভ্যাস নেই এসির বাহিরে থাকা। তার উপর এখানে বিদ্যুৎ ও নেই। সিকান্দার আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে কথা বলবে এটা নিয়ে। সিকান্দার নাদিম কে হাসফাস করতে দেখে বলল, ” গোসল করে আয়। ভালো লাগবে। ”
নাদিম তাই করলো। কিন্তু গোসল করতে এসে দেখলো এ তো কুয়া। কুয়া থেকে জল তুলে তুলে গোসল করতে হয়! সিকান্দার ভেতরে অবশ্য টিউবওয়েল ও লাগিয়েছে। তবে সেটা ভেতরে হওয়ায় যাওয়া সম্ভব নয় নাদিমের। সিকান্দার দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলে পানি তুলে দিলো। নাদিম গোসল করলো পিচ্চি বাবুদের মতো।
গোসল শেষে রুমে এসে নাদিম বলল,

” কিভাবে থাকছিস তুই ভাই! কারেন্ট নেই কেনো? ”
সিকান্দার দুটো চার্জার ফ্যান কিনেছিলো। বাড়িতে সোলার লাগিয়েছে। সেটাই অন করে দিলো।
” নে ঠান্ডা হ। আর এই গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ আসে নি। ”
নাদিম বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
“সিকান্দার।”
“হুম?”
“ চাচার খবর জানিস?”
সিকান্দারের হাত থেমে গেল।
“ ফোনে বলেছিলি তো।”
“নতুন খবর আছে।”
সিকান্দার তাকাল। নাদিম নিচু গলায় বলল, “ব্যাপারটা এখন আর শুধু ব্যবসায়িক লোকসান না। কয়েকটা বড় প্রজেক্ট থেকে টাকা আটকে গেছে। ব্যাংকের চাপ আছে। পার্টনাররা সরে যাচ্ছে। কিছু লোক মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যে মানুষটা এতদিন অন্যদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করত, এখন নিজের জীবনটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সব কর্মের ফল। ”
সিকান্দার কিছুই বললো না। নাদিম ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করলো। সিকান্দারের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“এটা তোর। ”
“কী আছে?”
“খুলে দেখ।”
সিকান্দার খাম খুলল। ভেতরে একটা কাগজ। কাগজটা পড়তে পড়তে তার মুখের ভাব বদলে গেল। কাগজটা ইস্তাম্বুল থেকে এসেছে। আরবি হাতের লেখা। নাদিম অর্থ বুঝে না। সেজন্য খুলে একবার দেখলেও কি লেখা আছে তা জানতে পারে নি।
“কী? তোর কুরআনের দ্বিতীয় সংস্করণের অনুমোদন হয়েছে? সেটার কাগজ? ”
“না।”
“তাহলে?”
সিকান্দার এবার নাদিমের দিকে তাকাল। চোখ মুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। সে চোখ বুঝে বলল,
“ওরা আমার হাতে লেখা কুরআনের একটা কপি কাবার লাইব্রেরির জন্য পাঠানোর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।”
নাদিম কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ। তারপর উৎসাহের সহিত বলল,
” সত্যি!! ”
সিকান্দার ধীরে মাথা নাড়ল।
“হুম।”

সিকান্দার কাগজটা আবার বুকে চেপে ধরলো। ঠোঁটে খুব ক্ষীণ একটা হাসি ফুটল। মনে পরলো সূরা আত-তালাকের একটি আয়াত।
“ওয়া ইয়ারযুকহু মিন হাইসু লা ইয়াহতাসিব।”
অর্থ- আমি তোমার জন্য এমন স্থান থেকে রিজিক দিব, যা তুমি কখনো কল্পনাও করতে পারো নি।
আসলেই সিকান্দার কল্পনা করতে পারে নি। এখান থেকে এভাবে তার রিজিকের পূনরায় সূচনা হবে। তার এই জীবনে আল্লাহ আর কী লিখে রেখেছেন? সিকান্দার জানে না। সত্যি জানে না। সিকান্দার শুধু বিরবির করে বলল,
” ইয়া রব আপনার এই ক্ষুদ্র পৃথিবীতে আমাকে ও আমার স্ত্রী কে যেভাবে আগলে রাখছেন। আপনার বিশাল জান্নাতে কি আমার ও আমার স্ত্রীর জন্য একটু জায়গা হবে না? ”
“ নিশ্চয়ই হবে…!!”
আল্লাহ তায়া’লা সূরা আয-যুখরুফ এর ৬৮-৭০ নম্বর আয়াতে তার ইমানদার বান্দাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন,

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৬

ইয়া ‘ইবাদি, লা খাওফুন ‘আলাইকুমুল ইয়াওমা, ওয়ালা আনতুম তাহযানূন। আল্লাযীনা আমানূ বিআয়াতিনা, ওয়াকানূ মুসলিমীন। উদখুলুল জান্নাতা আনতুম ওয়া আযওয়াজুকুম তুহবারূন।
অর্থাৎ — “ কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের আশ্বস্ত করবেন। এবং বলবেন হে আমার বান্দাগণ, আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই, তোমরা দুঃখিতও হবে না। তোমরা তো তারাই, যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান এনেছিলে এবং আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলে। অতঃপর, তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীরা খুশী মনে জান্নাতে প্রবেশ করো…!!”

সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৮