সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪১ (২)
Raiha Zubair Ripti
আমাদের স্রষ্টা কে?
কারণ ধর্মের সবচেয়ে প্রথম প্রশ্ন হলো,যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমি তাঁর সম্পর্কে কী বিশ্বাস করব এবং তাঁর ইবাদত কীভাবে করব? ইসলাম প্রথমেই এই প্রশ্নের উত্তর দেয়,আল্লাহ এক।
তিনি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা। আকাশ, পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র, মানুষ, প্রাণী সবকিছু তাঁর সৃষ্টি। তিনি নিজে কারও সৃষ্টি নন।
কুরআনের সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গভীর একটি সূরা হলো সূরা আল-ইখলাস। সেখানে আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন,
” বলুন, তিনি আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।
তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি।
আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” সূরা আল-ইখলাস, ১১২:১–৪
যদি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা একজন না হয়ে দুইজন বা তারও বেশি হতো, তাহলে কী হতো? ধরুন, দুজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আছে। এখন একজন সিদ্ধান্ত নিলেন, আজ সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠবে। অন্যজন সিদ্ধান্ত নিলেন, সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উঠবে। কার সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে? যদি একজনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়, তাহলে অন্যজন সর্বশক্তিমান নন।
আর যদি দুজনের সিদ্ধান্তই কার্যকর হয়, তাহলে একই বিষয়ে পরস্পরবিরোধী দুটি ফল কীভাবে একই সঙ্গে সত্য হবে? আবার ধরুন, একজন চান আজ বৃষ্টি হোক, অন্যজন চান বৃষ্টি না হোক। একজন চান একটি মানুষ বেঁচে থাকুক, অন্যজন চান সে মারা যাক। যদি দুজনই স্বাধীনভাবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন, তাহলে তাদের ইচ্ছার সংঘর্ষ হবেই।
কুরআন এই যুক্তিটাই খুব সংক্ষেপে বলেছে,
” যদি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আরও উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই বিপর্যস্ত হয়ে যেত। “সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:২২
একটু ভেবে দেখুন, যিনি সত্যিকার অর্থে স্রষ্টা,তিনি স্রষ্টা সৃষ্টি নন। তিনি মানুষের রূপ নেন না, ক্ষুধার্ত হন না, মৃত্যুবরণ করেন না। তিনি নিজে কারও সন্তান হতে পারেন না। তাঁর জন্ম হতে পারে না। তাঁর কোনো বাবা-মা থাকতে পারে না। তাঁকে কারও সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে না। কারণ যার নিজের অস্তিত্বের জন্য অন্য কারও প্রয়োজন, সে কীভাবে সমস্ত অস্তিত্বের স্রষ্টা হবে? ইসলামের আল্লাহ এমন একজন স্রষ্টা,যিনি কারও ওপর নির্ভরশীল নন বরং সব সৃষ্টি তাঁর ওপর নির্ভরশীল।
কুরআন বলে, “হে মানুষ! তোমরাই আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আর আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, প্রশংসিত।” সূরা ফাতির, ৩৫:১৫
এখন আপনি আমাকে বলতে পারেন, “আমরা তো ঈশ্বরকে বিভিন্ন রূপে দেখি।”
হ্যাঁ দেখেন। কারণ হিন্দুধর্মের মধ্যে বহু দর্শন ও মতবাদ রয়েছে। কেউ ব্রহ্মকে পরম সত্য মনে করেন, কেউ বিষ্ণু, শিব বা দেবীকে সর্বোচ্চ হিসেবে উপাসনা করেন, আবার বিভিন্ন দেব-দেবীর ভক্তির ধারাও রয়েছে।
কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমার কাছে প্রশ্নটা খুব মৌলিক,স্রষ্টা যদি একজন হন, তাহলে তাঁর উপাসনাও কি একমাত্র তাঁরই হওয়া উচিত নয়? ধরুন, একজন রাজা তাঁর প্রজাদের বললেন, ” তোমরা কেবল আমার আদেশ পালন করবে।” তখন প্রজারা যদি রাজার বদলে তাঁর বানানো মূর্তির সামনে গিয়ে মাথা নত করতে শুরু করে, রাজা কি বলবেন না,”আমি তো তোমাদের সামনে আছি।আমার তৈরি জিনিসের সামনে কেন মাথা নত করছ?”
তাহলে আল্লাহ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আমাদের দেহ, চোখ, হৃদয় সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদতের জন্য। তাঁরই সৃষ্টি করা কোনো পাথর, কাঠ বা ধাতব আকৃতির সামনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন কেন হবে?
কুরআন খুব সরল একটি প্রশ্ন করে, “যে সৃষ্টি করে, সে কি তার মতো যে সৃষ্টি করে না?” সূরা আন-নাহল, ১৬:১৭
আর ইবরাহিম (আ.) তাঁর জাতিকে প্রশ্ন করেছিলেন,
” তোমরা কি এমন কিছুর উপাসনা করো, যা তোমরা নিজেরাই খোদাই কর?” সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:৯৫
এখানে ইসলামের আপত্তি মানুষের প্রতি নয়। আপত্তি হলো স্রষ্টার জায়গায় সৃষ্টিকে বসানোতে। আপনি যদি একটি মূর্তি তৈরি করেন, তাহলে প্রথমে সেটা পাথর ছিল। আপনি সেটাকে আকার দিলেন। তারপর আপনি তার সামনে দাঁড়ালেন। তাহলে যে বস্তুটিকে আপনি নিজেই তৈরি করলেন, সে কীভাবে আপনার স্রষ্টা হয়ে গেল?
আর যদি বলা হয়, মূর্তিটি ঈশ্বর নয়, ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার মাধ্যম, তখনও ইসলামের প্রশ্ন থাকে। আল্লাহ কি এত দূরে যে তাঁর কাছে পৌঁছাতে কোনো বস্তু বা মধ্যস্থতাকারী দরকার? কুরআনে আল্লাহ নিজেই বলেন, “আমি তো নিকটেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।” সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬
অর্থাৎ আমি কাঁদলে আল্লাহ শুনতে পান। দোয়া করলে আল্লাহ শুনতে পান। একা ঘরে বসে তাঁকে ডাকলেও তিনি শুনতে পান। আমার আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো মূর্তি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই।
এটাই তাওহীদ। আল্লাহই একমাত্র উপাস্য। তাই ইবাদতের কোনো অংশও অন্য কারও জন্য করা যাবে না। কারণ আমাদের বিশ্বাস, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ..আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।
এই একটি বাক্যের মধ্যেই ইসলামের মূল পরিচয়। সৃষ্টির সামনে নয় স্রষ্টার সামনে মাথা নত করা।
কুরআন স্পষ্টভাবে বলে, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ধর্ম একমাত্র ইসলাম। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯)। এবং আরও বলেন, যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম অনুসন্ধান করবে, তা কখনো তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না। (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫)। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না এর বাইরে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। (সূরা আন-নিসা ৪:৪৮)
আমি আপনাকে এভাবে সব ভেঙে ভেঙে বলতে গেলে দু দিনেও বলা শেষ হবে না। তবে আমি আপনাকে নিজ থেকে জানার জন্য কিছু দিতে পারি। আপনি পড়তে আগ্রহী হলে দিব। তখন আপনি হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিস্ট্রান ও আমাদের কুরআন পড়লে নিজ থেকেই বুঝতে পারবেন সবটা, যে কেনো ইসলাম শান্তির ধর্ম কেনো ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম। কারন আমাদের জীবনের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর, প্রতিটি পরিস্থিতির আগাম বার্তা,ও এর ফলাফল সব কুরআন সুস্পষ্ট ভাবে আগেই বলে দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা । আমি যখন কোনো সমস্যার মধ্যে পড়ি,অশান্তি অনুভব করি। তখন কুরআন খুলি,সেই সমস্ত আয়াত খুঁজি যেখানে আমার সম্পর্কে বলা আছে। আমার শান্তি,আমার প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন। ”
বিনোদিনী এবার বলে উঠলো,
” কুরআনে তোমার সম্পর্কে বলা আছে? ”
” হু। আপনার সম্পর্কেও বলা আছে। কেবল খুঁজে নিতে হবে। কোন আয়াতে, কোন পৃষ্ঠায়। ”
” আমি তোমাদের ধর্মের ভাষা বুঝি না। ”
” কোনো সমস্যা নেই। বাংলা অনুবাদ পড়বেন। আমাদের বোধগম্য ভাষাতেই সাজানো আছে। আপনি কুরআনে পাবেন। সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষের সৃষ্টি, আল্লাহর পরিচয়, নবী-রাসূলদের আগমন, তাঁদের সংগ্রাম, শয়তানের ঘটনা, মানুষের পরীক্ষা, জীবন-মৃত্যু, দুনিয়া ও আখিরাত,অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর। আর কুরআন নিজেই নিজেকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেও বলেনি বরং বারবার চিন্তা করতে, বুঝতে ও প্রমাণ নিয়ে ভাবতে বলেছে। তাই প্রশ্ন নিয়েই পড়ুন। কোথাও প্রশ্ন জাগলে সেটাও খুঁজুন। শুধু অনুবাদ পড়বেন না অর্থটা বোঝার চেষ্টা করবেন। তারপর নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করবেন কথাগুলো সত্য কি না।”
” বেশ দাও তবে, কি দিবে। আমিও জানতে চাই যাচাই করে দেখতে চাই। ইসলামের মধ্যে এমন কী মহত্ত্ব আছে, যার কারণে কোটি কোটি মানুষ এক আল্লাহর সামনে মাথা নত করে। ”
মুনতাহা কিছুক্ষণ নীরবে বিনোদিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তাকের উপর রাখা কুরআন শরিফটি হাতে তুলে নিল। মলাটের ওপর আঙুল বুলিয়ে খুব যত্ন করে বইটি তার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
“এই নিন।”
বিনোদিনী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মুনতাহা মৃদু হেসে বলল,
“আপনি তো বললেন, যাচাই করে দেখতে চান ইসলামে এমন কী আছে, যার জন্য একজন মানুষ এটাকে সত্য ও শ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করে। তাহলে অন্যের মুখের কথা শুনে কেন বিচার করবেন? নিজেই পড়ুন। এটা বাংলা অনুবাদসহ কুরআন। আপনার বুঝতে কোনো অসুবিধা হবে না। শুরু থেকে পড়তে পারেন, আবার যে বিষয়গুলো নিয়ে আপনার প্রশ্ন আছে, সেগুলোও খুঁজে দেখতে পারেন। আর একটা কথা শুধু প্রশংসা খুঁজে পড়বেন না। প্রশ্ন নিয়ে পড়বেন। সন্দেহ নিয়ে পড়বেন। যুক্তি নিয়ে পড়বেন। কোথাও থেমে গেলে আমাকে জিজ্ঞেস করবেন। কারণ সত্যিই যদি এটা আল্লাহর কিতাব হয়, তাহলে সত্যকে যাচাই করতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারন কুরআন নিজেই মানুষকে চিন্তা করতে বলে, প্রশ্ন করতে বলে, নিজের বিবেক ব্যবহার করতে বলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর যদি তোমরা আমার বান্দার প্রতি যা নাজিল করেছি সে বিষয়ে সন্দেহে থাকো, তবে তার অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আসো এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সব সাক্ষীকে ডাকো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। সূরা আল-বাকারা, ২:২৩
এর পরের আয়াতে বলা হয়েছে,অতঃপর যদি তোমরা তা করতে না পারো আর তোমরা কখনোই তা করতে পারবে না তবে সেই আগুন থেকে বাঁচো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর… সূরা আল-বাকারা, ২:২৪
আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন,বলুন, যদি মানুষ ও জিন সবাই মিলে এই কুরআনের অনুরূপ কিছু নিয়ে আসার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ কিছু নিয়ে আসতে পারবে না, যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮৮ ”
কথাটা শোনার পর বিনোদিনী ধীরে ধীরে কুরআনের বাংলা অনুবাদ তফসির টা হাতে নিলো তার হাত অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছিল। হাত ফস্কে কুরআন শরীফ পড়ে যেতে নিলে মুনতাহা সাথে সাথে ধরে ফেললো। এবং বললো,
” সাবধানে। কুরআন হাত ফস্কে পড়ে যাওয়ার মতো জিনিস না। শক্ত করে ধরুন। ”
বিনোদিনী শক্ত করে ধরে উঠে দাঁড়াল। মুনতাহা নিজেও উঠে বলল,
” আমার কাছে কুরআনের সবচেয়ে হৃদয় ছোঁয়া কাহিনি কোনটা জানেন? হযরত ইউসুফ (আঃ) এর বর্ননা। আপনি যখন তাকে পড়বেন। আপনি নিজেও মুগ্ধ হয়ে যাবেন। হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। অন্তর কেঁদে উঠবে। আশা করছি কুরআনের সাথে আপনার দিনগুলো ভালো কাটবে। এবং পড়া শেষে অবশ্যই আমাকে জানাবেন আপনার উপলব্ধি টা। আমি অপেক্ষায় থাকবো। ”
বিনোদিনী উপর নিচ মাথা ঝাঁকাল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চারিদিকে অন্ধকার ছড়িয়ে গেছে। মুনতাহা সদর দরজা অব্দি এসে বলল,
” আপনি কী একা যেতে পারবেন? ”
বিনোদিনী উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
” হু। ”
তারপর অন্ধকারের রাস্তা ধরে হাঁটা ধরলো। কুরআন টা তখন তার বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরা। হঠাৎ হঠাৎ কোথা থেকে যেন শীতল ঠান্ডা বাতাস এসে তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। বিনোদিনী কেঁপে উঠছে। এই প্রথম সে এই পরিচিত রাস্তা টা অচেনা অনুভব করলো। সে তো কেবল মুনতাহার কাছে গিয়েছিল সিকান্দার কে দেখার জন্য। তার বিষয়ে জানার জন্য। হুট করে কেনো এটা জিজ্ঞেস করতে গেলো সে বুঝতে পারছে না। বুকের ভেতর তার সহস্র প্রশ্ন চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে চেয়ারম্যান বাড়ি এসে পৌঁছাল বুঝতেই পারলো না। সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা হলো তার বাবার সাথে। বিনোদিনী প্রথমে খেয়ালই করে নি। চেয়ারম্যান সাব ডাকায় বিনোদিনী চমকে দাঁড়িয়ে গেল।
চেয়ারম্যান এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, ” কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ? আজকাল বাড়িতে থাকো না যে? কি হয়েছে তোমার? ”
বিনোদিনী বরফের মতো জমে গেল। অথচ সে অন্য সময় হলে জাস্ট পাশ কাটিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে চলে যেত। কোনো কৈফিয়ত দিত না। তবে আজ পারলো না। সে অজানা এক ভয়ে জমতে শুরু করলো। চেয়ারম্যান সাব এগিয়ে এলেন। মেয়েকে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বললে,
” চুপ করে আছো কেনো? আর হাতে ওটা কি? ” কথাটা শেষ করে তিনি বিনোদিনীর হাতে থাকা জিনিসটার দিকে তাকালো।
বিনোদিনী সাথে সাথে কুরআন শরীফ টা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললো। তার মন বলল বাবা এটার সম্পর্কে জেনে গেলে হুলস্থুল বেঁধে যাবে। তাই সে বলল,
” ব…বই। একটা বই নিয়ে এসেছি। ”
” কিসের বই? দেখি। ”
বিনোদিনী আরো চেপে ধরলো কাপড়ের নিচে। বলল,
” তুমি দেখে কি করবে। আর এত প্রশ্ন কেনো করছো? পথ ছাড়ো। ”
বিনোদিনী তার বাবাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুমে চলে গেল। রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো। যাতে কেউ রুমে ঢুকতে না পারে আর এই কুরআন টা দেখতে না পারে। কুরআন টা সে বিছানার উপর রাখলো। তারপর কি মনে করে যেন আলমারির ভিতর ঢুকিয়ে রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পরলো। হরিমতি কয়েকবার ডেকে গেল। কিন্তু বিনোদিনী জানাল,সে কিছু খাবে না। তাকে যেন বিরক্ত করা না হয়।
বিনোদিনী বাড়ি থেকে চলে যাবার পর মুনতাহা অতিথি রুমে ঢুকে। সিকান্দার তখন চোখের উপর হাত রেখে শুয়ে ছিল। মুনতাহা গিয়ে পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলালে সাথে সাথে সিকান্দার চোখ মেলে তাকিয়ে বলল,
” উনি চলে গেছেন? ”
মুনতাহা উপর নিচ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ” হু। ”
সিকান্দার শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালো। তারপর বলল,
” কেনো এসেছিল? ”
” ইসলাম সম্পর্কে জানতে। খুব আগ্রহী মনে হলো। প্রশ্ন করলো কেনো ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, কেনো ইসলাম কে শান্তির ধর্ম বলা হয়। ”
” আপনি কি বললেন? ”
” কিছুটা ধারণা দিয়েছি। বাকিটা সে নিজেই পরীক্ষা করে দিবে। ”
” মানে? আপনি কী কোনোভাবে তার হাতে….”
সিকান্দার কে পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে সে বলল,
” হ্যাঁ, তার হাতে আমি কুরআনের বাংলা অনুবাদ তফসির দিয়েছি। আমি চাই না সে কেবল আমার মুখের কথা শুনে বুঝুক। তার মনে সন্দেহ জাগতে পারে আমি হয়তো বানিয়ে বানিয়ে বলছি,মিথ্যা বলছি। আমি তার হাতে রেফারেন্স সহকারে একটি মুসহাফ তুলে দিয়েছি। তার সকল আগ্রহ আর প্রশ্নের উত্তর তার নিকেটই আছে। সে এবার খুঁজে বের করে দেখুক। ”
সিকান্দার তপ্ত এক শ্বাস ফেললো। কেমন যেন বিনোদিনীর বিষয়ে সে একধরণের অশান্তি গুমোট ভাব অনুভব করে। তার থেকে মুনতাহা আর সিকান্দার যতদুরে থাকবে ততই মঙ্গল।
সিকান্দার আর মুনতাহা রুমের দিকে আসতে নিলে মুনতাহার হুট করে একটা কথা মনে পড়ায় সিকান্দার কে খোঁচা মেরে বলল,
” শুনেছি আপনি নাকি বিনোদিনীর দিকে তাকান নি। মেয়েটা অনেক আফসোস করে বলল। সে নাকি আপনার সাথে কথাও বলতে এসেছিল। ”
সিকান্দারের হাত পা কিছুই থামলো না। নিজের কাজ সক্রিয় রেখেই বলল,
” হু, আজও এসেছিল। ”
” তাকান নি কেনো? জানেন মেয়েটা কত সুন্দরী! একদম দুধে-আলতা গায়ের রং। চোখ মুখ জুড়ে একধরনের দৃঢ়তা। চোখ বন্ধ করে বলতে পারি মেয়েটা এই গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর রূপবতী মেয়ে। আপনি না তাকানোয় কষ্ট পেয়েছে খুব। খারাপ লাগলো শুনে। ”
সিকান্দার এবার হেঁসে ফেললো। পিছু ফিরে মুনতাহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
” যার ঘরে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী আর রূপবতী বউ থাকে। সেই ব্যাটা বাহিরের কোনো নারীর দিকে তাকায় কি করে? ”
” ও হো! পাম দিচ্ছেন কেনো আমায়? আমি মোটেও উনার মতো অত সুন্দরী না। ”
” উনি দেখতে কেমন আমি জানি না। জানতেও চাই না। একবিন্দু আগ্রহীও নই। আমার কাছে আপনার চেয়ে সুন্দর নারী এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আপনি আমার চক্ষু শীতল কারি। হৃদয়ে প্রশান্তি আনা নারী। আর পৃথিবীর বাকি সব পরনারী আমার জন্য জাহান্নাম। আর আমি জান্নাতের লোভী। জান্নাতের একটি ফুল আমার জীবনে এসেছে। আমি তাকে আঁকড়ে ধরেই আজীবন কাটাতে চাই। ”
মুনতাহা মুখ ভেঙিয়ে বলল,
” এ্যাহ আসছে। যদি আমি আগে মরে যাই তখন? তখন তো ঠিকই দ্বিতীয় বিবাহ করবেন। ”
সিকান্দার কয়েক কদম এগিয়ে আসলো। মুনতাহার থুতনিতে হাত রেখে বলল,
” কিছু করি নি,তারপরও এত জেলাস! আপনাকে যদি খোদা আমার আগে তার কাছে নিয়ে নেয়। তাহলেও আমি কেবল মুনতাহা মুনেরই স্বামী হয়ে এই পৃথিবীতে বাঁচবো। এর বাহিরে আমি এক রবের বান্দা আর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মত, আমার সন্তাদের পিতা ব্যতিত আমার আর দ্বিতীয় কোনো পরিচয় হবে না, দ্বিতীয় বিবাহও হবে না। ”
” তা নিজের লয়্যালটি দেখাচ্ছেন নাকি এসব বলে? ”
” লয়্যালটি কি বলে দেখানোর মতো জিনিস? এটা উপলব্ধি করার মতো জিনিস। ”
” তা আমাকে প্রুফ দিন। সিকান্দার শাহ্ তার স্ত্রীর প্রতি তাহলে কতটা লয়্যাল ছিলো?”
সিকান্দার শক্ত করে মুনতাহার কোমর চেপে একদম শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে বলল,
” সিকান্দার শাহ্ তার স্ত্রীর প্রতি এতটাই লয়্যাল ছিলো যে তার সামনে দিয়ে শত শত নারী হেঁটে নেচে গেলেও তার দৃষ্টি সর্বদা থাকতো মাটিতে। সে কখনো ভুলেও নত করা মাথা উঁচু করতো না। না বিয়ের আগে আর না বিয়ের পরে। সে নিজের দৃষ্টির হেফাজত করতো। যেটা একজন পুরুষের জন্য ফরজ করা হয়েছে ইসলামে..!!”
” ভুল করেও কি নজর যায় নি কোনো নারীর উপর? ”
সিকান্দার শান্ত গলায় বলল,
“মানুষের চোখ তো আর পাথর না। অনিচ্ছায় হঠাৎ কারও দিকে চোখ চলে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু চোখ পড়ে যাওয়া আর ইচ্ছা করে তাকিয়ে থাকা এক জিনিস নয়। ইসলাম আমাকে প্রথম অনিচ্ছাকৃত দৃষ্টির জন্য নয়, বরং দৃষ্টি সংযত রাখার জন্য আদেশ করেছে। হঠাৎ কোনো নারী সামনে পড়ে গেলে প্রথম দৃষ্টিটা অনিচ্ছাকৃতভাবে চলে যেতেই পারে। কিন্তু সেই দৃষ্টিকে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে নেওয়া সেটাই নিজের নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ।
“যদি কোনো পর নারী আপনার সাথে কথা বলতে চায়? তখনও কি তাকাবেন না? ”
“প্রয়োজন হলে প্রয়োজনের কথা বলব। কিন্তু চোখের হেফাজত করব।”
মুনতাহা এবার ধীরে বলল, “এত কঠিন?”
সিকান্দার মাথা নিচু করল।
“দীন মানা সবসময় সহজ নয়। কিন্তু আল্লাহ যখন কোনো কিছু থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে বলেছেন, তখন একজন মুমিনের কাজ হলো নিজের ইচ্ছাকে নয়, রবের আদেশকে প্রাধান্য দেওয়া। আর আমি শুধু আমার স্ত্রীর প্রতি লয়্যাল থাকার জন্য দৃষ্টি সংযত করি না। আমি আমার রবের জন্য দৃষ্টি সংযত করি। স্ত্রী আমার জীবনে আসার আগেও এই হুকুম ছিল, স্ত্রী আসার পরেও আছে। আর মৃত্যুর আগ অব্দিও থাকবে। ”
কথাটা শেষ করেই সে মুনতাহার নাকের ডগায় ওষ্ঠ ছোঁয়াল। মুনতাহা বরফের মতো জমে গেল। চোখ বন্ধ হয়ে আসলো।
সিকান্দার তা দেখে হেসে ছেড়ে দিয়ে বলল,
” বিয়ের এত মাস হয়ে যাওয়ার পরও স্বামীর ছোঁয়া পেলেই প্রথম দিনের মতো জমে যান! অভ্যস্ত হন নি এখনো? ”
মুনতাহা মাতা নত করে বলল, ” হয়েছি। তবে মাঝেমধ্যে.. ”
” মাঝেমধ্যে কি লজ্জা পান? হু পান। বেশি করে পান। লজ্জা নারীর ভূষণ। আপনার লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা একটু বেশিই আকর্ষণীয়। আই লাভ ইট। ”
মুনতাহা আবার লজ্জায় ডুবে গেলো। পেছন থেকে স্বামীর পিঠে মুখ লুকালো।
রাত যত গভীর হতে লাগল, বিনোদিনীর কাছে তার ঘরটা যেন ততই অচেনা হয়ে উঠল। কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি বারবার তাকে ঘিরে ধরছিল মনে হচ্ছিল, এই ঘরে সে একা নয়। কেউ একজন আছে। তাকে দেখছে, পরখ করছে। ডাকছেও।
ভয়ে চাদর টেনে পুরো শরীর ঢেকে শুয়ে ছিল সে। হঠাৎ আচমকা এক ঝটকা বাতাসে জানালাটা বিকট শব্দে খুলে গেল। বিনোদিনী আঁতকে উঠে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। বাইরে প্রবল বাতাস বইছে। আকাশের অন্ধকারে যেন ঝড় আসার পূর্বাভাস। গাছের পাতাগুলো অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে।
বিছানা থেকে নেমে জানালাটা বন্ধ করতে এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত হাত বাড়াল না। হঠাৎ তার মনে পড়ল আলমারিতে রাখা সেই কুরআন শরীফটির কথা।
মুনতাহার কথায় কৌতূহলবশত বইটি হাতে নিয়ে আসলেও তারপর আর খোলা হয়নি। কিন্তু এখন কেন যেন মনে হলো, এখনই সময়। ঘরে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। কেউ দেখবে না। ধীর পায়ে বিনোদিনী আলমারির কাছে এগিয়ে গেল।
আলমারির দরজা খুলতেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। ভেতর থেকে যত্ন করে কুরআনের বাংলা অনুবাদ তফসিরটি বের করে আনল সে। তারপর টেবিলের ওপর একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে তার সামনে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ শুধু বইটির দিকে তাকিয়ে রইল। মলাটের ওপর আরবি অক্ষরে লেখা নামটি তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। অক্ষরগুলো চিনতে পারল না, উচ্চারণও করতে পারল না। আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে মলাটের ওপরের লেখাগুলো ছুঁয়ে দেখল বিনোদিনী।
একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার এইখানে। কুরআন পড়ার আগে ওজু করে নেওয়া উত্তম। আর যদি কেউ বাংলা অনুবাদ বা তাফসির পড়তে চায়, সেক্ষেত্রে ওজু করা আবশ্যক নয়। কারণ অনুবাদ-তাফসিরের বইয়ে আরবি আয়াত থাকলেও, যদি সেটি মূলত অনুবাদ ও ব্যাখ্যার গ্রন্থ হয়, তাহলে ওজু ছাড়া তা পড়া যায়। তবে আরবি মূল মুসহাফ স্পর্শ করার ক্ষেত্রে ওজু করা আবশ্যক।”
তারপর খুব সাবধানে প্রথম পৃষ্ঠাটি খুলল। পাতার পর পাতা আরবি অক্ষরে ভরা। কিছুই বুঝতে পারছে না সে। তবুও বইটি বন্ধ করতে পারল না।
বরং অদ্ভুত এক টানে আরও সামনে এগিয়ে গেল তার চোখ। অক্ষরগুলোর অর্থ সে জানে না, উচ্চারণ জানে না তবুও মনে হচ্ছিল, এই অচেনা ভাষার ভেতরেই যেন কোনো পরিচিত ডাক লুকিয়ে আছে। বিনোদিনী ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না… তবুও কেন মনে হচ্ছে, আমাকে কিছু একটা বলা হচ্ছে?”
মোমবাতির কাঁপা আলোয় কুরআনের পাতাগুলো নড়ে উঠল। বাইরে তখন ঝড়ের শব্দ আরও তীব্র হচ্ছে।
আর বিনোদিনী একজন অন্য ধর্মের মেয়ে প্রথমবারের মতো কুরআনের সামনে বসে রইল, অর্থ না বুঝেও এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ভিজে যেতে লাগল তার অন্তর। আরবি অংশের নিচেই বাংলা অনুবাদ দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। সে পড়তে শুরু করল। প্রথমে পড়ল সূরা ফাতিহার বাংলা অর্থ।
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের প্রতিপালক…” কুরআনের সবচেয়ে দামী সূরা। যেই সূরা ছাড়া নামাজ পড়া যায় না। বিনোদিনী থেমে গেল। সকল জগতের প্রতিপালক..!
শব্দগুলো তার মনে আটকে রইল। এতদিন সে ঈশ্বরকে নিজের পরিচিত ধারণা আর পারিবারিক বিশ্বাসের মধ্য দিয়েই ভেবেছে। অথচ এখানে বলা হচ্ছে, তিনি শুধু কোনো একটি জাতি, গোষ্ঠী কিংবা নির্দিষ্ট মানুষের নন তিনি সমস্ত জগতের রব।
আরও পড়ল। তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু। বিনোদিনীর চোখ স্থির হয়ে গেল সেই লাইনে। তারপর যখন পড়ল,বিচার দিনের মালিক। তার বুকের ভেতর কেমন একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।
মানুষের কাছে নিজের কাজ লুকানো যায়। মিথ্যা বলা যায়। অন্যায়কে আড়াল করা যায়। কিন্তু যদি সত্যিই এমন একজন মালিক থাকেন, যাঁর কাছে একদিন ফিরে যেতে হবে,তাহলে?
তারপর সে কুরআনের এমন আয়াত পড়ল যেখানে মানুষের সৃষ্টি, পৃথিবীর জীবন, পরীক্ষা এবং মৃত্যুর পর ফিরে যাওয়ার কথা এসেছে। জীবন তাহলে শুধু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নয়। মানুষ যা করছে, তার হিসাবও আছে। তার কর্মের ফল ভোগ করবে। মুনতাহা যা যা বলেছিল তাই তাই তো পেয়েছে। বিনোদিনী অজান্তেই নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাল।
হঠাৎ তার চোখ চলে গেল এমন একটি আয়াতের দিকে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ কারও প্রতি অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।” সূরা আন-নিসা, আয়াত ৪০
সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। অদ্ভুত! যে সৃষ্টিকর্তাকে সে এতদিন শুধু দূরের কোনো শক্তি হিসেবে কল্পনা করেছে, এই গ্রন্থে তাঁকে একজন ন্যায়বিচারকারী রব হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে যিনি সামান্যতম অন্যায়ও করেন না। আরও পড়তে পড়তে সে এমন আয়াত পেল যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষের অন্তরের কথাও জানেন। বিনোদিনী বই থেকে চোখ তুলল। অন্তরের কথাও? তার মানে তার অন্তর যে সিকান্দার নামের লোকটাকে চায় সেটাও তিনি জানেন!
তার মনে হলো, পৃথিবীর কাউকে না বলা কথাগুলোও যদি কেউ জানেন, তাহলে তার ভেতরের সমস্ত অন্ধকারও তো তাঁর অজানা নয়।
কিছুক্ষণ পর সে এমন একটি আয়াতে এসে থামল যেখানে বলা হয়েছে,“আমি তো নিকটেই আছি। আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই যখন সে আমাকে ডাকে।”
বিনোদিনীর বুকটা কেঁপে উঠল। কাউকে ডাকতে হলে কি সত্যিই এত কাছে পাওয়া যায়? তারপর সে পড়ল আল্লাহর রহমত সম্পর্কে। মানুষ যত ভুলই করুক, সত্যিকারভাবে ফিরে এলে আল্লাহর ক্ষমার দরজা বন্ধ হয় না এই অর্থ তাকে থমকে দিল। বিনোদিনীর যতই গভীরে যাচ্ছে ততই যেন চোখ ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এল তার। এখানে সতর্কতা আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি দয়া আছে। শাস্তির কথা আছে, আবার ক্ষমার কথাও আছে। জীবনের হিসাবের কথা আছে, আবার ফিরে আসার পথও দেখানো হয়েছে।
“যদি সত্যিই এমন একজন রব থাকেন… যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমার গোপন কথাও জানেন, আমার অন্যায় দেখেন, আবার আমি ফিরে এলে ক্ষমাও করতে পারেন তাহলে আমি তাঁকে কখনো খুঁজে দেখিনি কেন?”
সে আরও পড়ল জান্নাতের বর্ণনা। এমন এক স্থানের কথা, যেখানে ভয় নেই, দুঃখ নেই, ক্লান্তি নেই। তারপর জাহান্নামের বর্ণনা পড়তে গিয়ে তার শরীর শিউরে উঠল।
এও বলা হলো বান্দা যখন কোনো কিছু রবের নিকট প্রার্থনা করে চায়,তখন আল্লাহ তার ভাগ্যে সেটা লিখে না রাখলেও দিয়ে দেন। কারন দোয়াই একমাত্র ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে।
বিনোদিনীর মনে একটা আশা জাগলো। তারমানে সে যদি সিকান্দার কে চায়। তাহলে আল্লাহ তাকে সিকান্দার দিয়েও দিতে পারে! একটা আশা জাগলো মনে। বেশ ভালো লাগলো তার। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো যেন সিকান্দার শাহ্ এসে তার গালে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় মেরে বলছে,
” নারীর সৌন্দর্য তার হায়ায়,
আর পুরুষের সৌন্দর্য তার গায়রতে।
যে নারীর মধ্যে হায়া নেই সে কোনো নারী ই না,
আর যে পুরুষের গায়রত নেই সে কোনো পুরুষ ই না। ”
বিনোদিনী সাথে সাথে দু গাল চেপে ধরলো। কল্পনা করলো দৃশ্য টা। তাতেই মুখের ভঙ্গিমা চেঞ্জ হয়ে গেল।
তারপর সে মুনতাহার বলা সেই সূরা ইউসুফ টা পড়তে লাগলো। পড়ার সময় অনুভব করলো তার হৃদয় ভার হয়ে গেছে। আল আযীযের স্ত্রী এতটা জঘন্য! পড়ার সময় ঠিক এমনটাই মনে হলো। কিভাবে নিজের দিকে প্রলুব্ধ করেছিল। জঘন্য নারী। কুরআনে জুলেখা নামে কোনো চরিত্রের উল্লেখই নেই। তাকে বলা হয়েছে আল-আযীযের স্ত্রী । তিনি ইউসুফ (আ.)-কে নিজের দিকে প্রলুব্ধ করেছিলেন। ইউসুফ (আ.) আল্লাহকে ভয় করে তাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং তার প্রস্তাব থেকে বাঁচতে কারাগারকেও বেছে নেন। কুরআন তাকে নাম ধরে উল্লেখ করেনি।
পরবর্তী তে ইউসুফ (আ.) ও জুলেখার মিলন,বিয়ে হয়েছে। এমন কোনো ঘটনা কুরআন কিংবা সহিহ হাদিসে নেই।
সে সৃষ্টির শুরু টা পরলো,সেই আদাম ( আঃ) থেকে। যখন তাকে বানানো হলো। এবং ইবলিশ কে সেজদা করতে বললো। আর ইবলিশ সেজদা করতে অস্বীকৃতি জানালো। ধারাবাহিক ভাবে সারা রাত জেগে সে বিভিন্ন নবী রাসূলের বিভিন্ন জাতির নিকট আগমনী, তাদের সংগ্রাম,তাদের আল্লাহর দাওয়াত দেওয়া। সব পড়তে শুরু করলো। একসম হুট করে কুরআনটা বন্ধ করে দিল সে। আর পড়া সম্ভব নয়। ভালো লাগার চেয়ে কষ্ট লাগছে তার। মুসলিম রা পড়ে কিভাবে এটা? কাঁদতে কাঁদতে পড়ে? বিনোদিনী চোখ বন্ধ করেও পড়াগুলো ভুলতে পারল না।
প্রশ্নটা নিজের কাছেই করল বিনোদিনী। বাইরে তখন ঝড় আরও জোরে শুরু হয়েছে। কিন্তু তার ভেতরের ঝড় যেন তার চেয়েও বেশি প্রবল।
কুরআনের সবকিছু সে বুঝে ফেলেনি। অনেক আয়াত তার কাছে কঠিন লেগেছে, অনেক কিছু নিয়ে তার প্রশ্নও জেগেছে। কিন্তু একটি বিষয় সে সেদিন প্রথমবারের মতো অনুভব করল, এটি যেন তাকে নিজের ভেতরের মানুষটার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
সে আর ছুঁবে না এই বই। সকাল হলেই দিয়ে আসবে মুনতাহা কে।
নাদিম আর ইলা আজ একটা রেস্টুরেন্টে বসেছে। মূলত তার দুজনই শপিং করতে বের হয়েছিল। হুট করেই দেখা হয়ে যায়। ইলার কাজিনের সামনে বিয়ে,নাদিমের কাজিন + সাথে এক কলিগেরও সামনে বিয়ে। নাদিমই প্রথম তাকে দেখেছে। ডাক দিয়েছে। তারপর রেস্টুরেন্টে এসেছে। ইলা আসতে চায় নি। নাদিম সেজন্য বলল, ” আরেহ্ প্যারা নিয়েন না মিস ঢিলা। ট্রিট আমার তরফ থেকে। চলুন। ”
ইলা আসলো। নাদিম মেন্যু কার্ড ইলার দিকে বাড়িয়ে দিলে ইলা ইচ্ছে মতো খাবার অর্ডার দেয়। একেবারে ফতুর করে ছাড়বে আজ।
নাদিম ভেতরে ভেতরে ইলা কে আখাইয়া বলে গালি দিলেও সামনে তা প্রকাশ করলো না। ভালো লাগে বলে দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগলো।
ইলাও দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে খাচ্ছে। নাদিম মনে মনে বললো,দাঁত খোসে পড়ে যাক তোর বেয়াদব। ভালো লাগে বলে কিছু বলছি না।
ইলা একটা আধখাওয়া বার্গার নাদিমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ” নিন খান। আর নেই। ”
” এটা আবার আমাকে দেওয়ার কি দরকার ছিল? খেয়ে ফেলতেন। ”
ইলা হাত ট্যিসু দিয়ে মুছে বলল, ” আরেহ্ খেতে পারছি না বলেই তো দিয়েছি। খেতে পারলে কি আর আপনাকে সাধিতাম? ”
নাদিমের ইচ্ছে করলো এই মুহূর্তে মুখে ঢুকিয়ে ফেলা বার্গার টা ইলার মুখে ছুঁড়ে মারতে। মনের সব ইচ্ছে কে সে মনেই দাফন করতে লাগলো। বিল পে করে তারা হাঁটতে লাগলো। নাদিম এক প্রকার আজ বিরক্ত হয়েই ইলাকে বলল,
” এ্যই ঢিলা শুনুন। ”
ইলা হাঁটতে হাটতে জবাব দিলো,
” বলুন শুনছি। ”
” আমি তো আপনাকে ট্রিট দিছি সেই হিসেবে আমাকেও কিছু দিন। ”
” আগে কেন বলেন নি যে আপনি ছুঁচো। কাউকে ট্রিট দেন তার থেকে ট্রিট পাওয়ার বিনিময়ে। আগে জানলে খেতামই না। ”
” খেয়েই তো ফেলছেন। ফেরত তো দিতে পারবেন না। আপনি চাইলে একটা কাজ করতে পারেন। ”
” কী? ”
” ট্রিটের বিনিময়ে আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যান। রোজ রেস্টুরেন্টে এসে খাওয়াবো আপনায়। ”
ইলার হাঁটা থেমে গেল। নাদিমের দিকে সাথে সাথে ফিরে বলল, ” বেক্কল বেডা,নেশা করছেন নাকি আজ? তাই তে মনে হচ্ছে। উল্টা পাল্টা কথাবার্তা বলছেন। ”
” জীবনে নেশা করি নি। মিথ্যা অপবাদ দিবেন না। আমি সত্যি আপনাকে বিয়ে করতে আগ্রহী। ”
নাদিম এমন ভাবে বললো মনে হলো যেন ইলা তাকে বিয়ের প্রপোজাল দিয়েছিল। নাদিম সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে উত্তর দিচ্ছে।
” আমি আগ্রহী না। ”
” কেনো? দেখতে শুনতে খারাপ নাকি আমি? ”
” খুব একটা ভালোও তো না। চলার মতো। তবে আমার আপনার ভাইয়ের মতো জীবনসঙ্গী চাই। ”
” তো আমাকেই বানিয়ে নিন না। সমস্যা কোথায়? ”
” আপনাকে যদি আমার মানুষ করতে হয় তাহলে আমাকে কে মানুষ করবে? ”
” দুজন দুজনকে মানুষ বানিয়ে নিব। সমস্যা কোথায়? ”
” আমার বাপ রাজি হবে না। ”
” কেনো? ”
” বিষয়টা খারাপ ভাবে নিবেন না। আপনার বাসায় আপনার সৎ মা আছে। আমার বাবা সেজন্য আপনাদের পরিবার কে পছন্দ করে না। সেই পরিবারে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই তো সে তুলবে না। ”
” আচ্ছা তাহলে আমি না হয় ঘরজামাই থাকবো। ”
” বেক্কল বেডা। লোকে কি বলবে আমার বাবাকে? এসব চিন্তা ভাবনা বাদ দেন। উই আর জাস্ট ফ্রেন্ড। ওকে? ”
” ধূর আপনার ফ্রেন্ড কে? আমি কোন দিক দিয়ে আপনার ফ্রেন্ড লাগি? জামাই হওয়ার বয়স আমার। রাজি হন। বাবা কে পাঠাবো। মুনতাহার ভাবি হতে পারবেন। মাঝেমধ্যে দেখা করতে যেতে পারবেন। ভাবুন আমাকে বিয়ে করলে কত লাভ আপনার। ”
” আপনাকে বিয়ে করলে আমার জীবনটাই লস। সামনে বোনের বিয়ে সেটায় ফোকাস করুন। ভালো মেয়ে পাবেন আমার থেকেও। ”
” সব মেয়েরা এটা বলেই রিজেক্ট করে ছেলেদের। ভাই দরকার নেই তো আমার আপনার থেকে ভালো। আপনিই চলে আসুন। দুজন মিলে সংসার করি। বছরে বছরে আন্ডাবাচ্চা ফুটাবো। তাদের নিয়ে ঘুরবো দেশ বিদেশ। ”
ইলা হতাশ হয়ে হাঁটা ধরলো। নাদিম চিৎকার করে বলে উঠলো, ” এবার কিছু বলেন নি। তারমানে আপনি রাজি? চুপ থাকা কিছু না বলা কিন্তু সম্মতি দেওয়ার লক্ষন। বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো তবে?”
ইলা বিরক্ত হয়ে বলল, ” আপনার যা মনচায় তাই করুন গিয়ে। ”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৪১
সেলিম মির্জা আজ অনেকদিন পর একটু ধাতস্থ হয়েছেন। ব্যবসাটা একটু উঠে দাঁড়িয়েছে, তার মেয়ের হবু জামাইয়ের জন্য। ছেলেটা বেশ বুদ্ধিমান। পুরো ঢাকা জুড়ে রটে গেছে সুনেহরা মির্জার বিয়ে। আজ সে মোহনগঞ্জ যাবে,তার সেই সিকান্দার শাহ্ নামের ছেলেটাকে দেখতবে। দেখবে কোন হালে আছে। কি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সেজন্য সকাল সকাল বডিগার্ড নিয়ে মোহনগঞ্জের উদ্দেশ্যে বের হলো।
মুনতাহা ভার্সিটি তে গেছে। সিকান্দার তখন ক্ষেতে ছিলো। হঠাৎ করে কয়েকজন লোক দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললো,
” সিকান্দার ভাই, সিকান্দার ভাই কেরা জানি বুলডোজার নিয়া আপনার বাড়ি ভাঙতে আইছে…
