Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৭
তানিয়া হুসাইন

সে ধীরে বলে,
না!কিছু লাগবে না।
____গার্ডরা নিঃশব্দে পেছনে সরে যায়,
দরজার পাশে ফের আগের জায়গায় ফিরে দাঁড়ায়।
____বাইরে পাখিরা ডাকছে,
কিন্তু এই ঘড়টা এখনো শব্দহীন।
ইশায়া ধীরে ধীরে ওঠে,
নিজেকে এক প্রকার টেনে তোলা যাকে বলে, শরীরে একরাশ ক্লান্তি।
বুকের গভীরে জমে থাকা হাহাকারটা চাপা দিয়ে উঠে পড়ে।
শরীরে ওই অমানুষটার স্পর্শ লেগে আছে এটা ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে তার।

____স্নানঘরের দরজা খুলে একদম নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে,
শাওয়ার অন করে নিচে বসে,
ঠান্ডা জলের নিচে নিজেকে ধুয়ে ফেলতে চায়।
শরীরে ওই মানুষরূপী জানোয়ার এর সব স্পর্শ শরীর থেকে মুছে ফেলতে চায়,
ইশায়া জোরে জোরে শরীর ডলে ডলে ঘষে।
নিজে নিজে বিড়বিড়িয়ে বলে,
___তুমি মরে গেলে বলেই বেঁচে গেছো আপু,
আমি বেঁচে গিয়েই মরে গেছি।
আজ আমাকে এত অসম্মান সহ্য করতে হচ্ছে।
কেন আমি সেদিন তোমার সাথে মরে গেলাম না।
___তুমি কেন আমাকে একা ফেলে চলে গেলে,
আমাকে নিলে না কেনো,এখন আমি কি করবো বলে আহাজারি করতে থাকে ইশায়া।
__ইশায়াকে অনেকক্ষণ দরজা খুলতে না দেখে গার্ডরা এসে এবার দরজা ধাক্কা দিতে শুরু করে।
ইশায়া ওঠে নিজেকে সামলে নেয়।
কোনমতে শেষ করে শাওয়ার।

___শাওয়ার শেষে গার্ড এর এনে দেওয়া পোশাকটা হাতে নেয়।
___মেক্সিকান ঐতিহ্যবাহী ফ্যাশনের একটি ফ্লোর-লেন্থ ফ্রক, যা কোমরে বেল্ট দিয়ে বাঁধা। ফ্রকটির রঙ হালকা গোলাপি, ঝরঝরে কাপড়ে বানানো, সূক্ষ্ম ফুলের এমব্রয়ডারি করা। হাতার প্রান্তে ও ঘাড়ের কাছে লেসের কাজ,
___আগের ইশায়া হলে এই জামা তাকে কেউ দিলে সে খুশিতে পাগল হয়ে যেতো।
কিন্তু এখন এসব কিছুই আর তাকে ছুতে পারে না,
অনুভূতিহীন হয়ে গেছে সে।
ইশায়া ড্রেসটা পরে নেয়।
___তার শরীরের সাথে জড়িয়ে যেনো ড্রেসটার সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে।যেনো,
সদ্য ফোটা নিষ্পাপ একটা ফুটন্ত গোলাপ।
___আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায় তারপর চুলগুলো শুকিয়ে নেয়।

একজন কে বলে,
___জায়নামাজটা এনে দিতে পারবেন আমাকে?
চোখ নামিয়ে গার্ডকে বলতেই সে দ্রুত মারিয়া এলেনাকে খবর দেয়।
___কিছুক্ষণের মধ্যে মারিয়া এসে তার হাতে একটা নতুন জায়নামাজ তুলে দেয়।
ইশায়া ধীর পায়ে ওযু করে নেয়, তারপর জায়নামাজ পেতে জোহরের নামাজে দাঁড়িয়ে যায়।
এই চার দেয়ালের ভেতর, এই বন্দীত্বের মাঝেও সে খুঁজে নেয় একটু প্রশান্তি, একটু মুক্তি।
ভেতরের সব কষ্ট সব কিছু উগড়ে দেয় সে মোনাজাতে,
দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে।
____নামাজ শেষ করে সে জায়নামাজ ভাজ করতে গিয়েই দেখে, একজন গার্ড তার জন্য ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
_খাওয়ার সময় হয়েছে,ম্যাম।
বস আপনাকে সবকিছু টাইম টু টাইম করতে বলেছে।
—তার কণ্ঠে কড়া রাশিয়ানি শিষ্টাচার, কিন্তু মুখে সহানুভূতির ছাপ।

___ট্রেতে রাখা আছে একপ্লেট Torta (মেক্সিকান স্যান্ডউইচ), Tamales, আর Chilaquiles Verdes সব মেক্সিকোর স্থানীয় খাবার, সুস্বাদু আর রঙিন। পাশে একগ্লাস ফলের জুসও রাখা।
___ইশায়ার খুব ক্ষিদে পেয়েছে, কিছু খায়নি সে,
এই কয়দিন যাবত তার উপর দিয়ে কি ঝড় গেছে সেটা সেই জানে।
স্যালাইনের উপর-ই বেঁচে ছিল সে।
খিদের জ্বালায় আর না করেনি।
___ একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে আস্তে আস্তে খেতে শুরু করে। নরম রুটির মাঝে ভাজা মাংস আর সবজির স্বাদ যেন মুখে গলে যায়।
কিন্তু…
এক কামড় খেতেই অজান্তেই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একটা জলকণা।

___বাবা-মাকে কবে দেখেছি শেষবার? ক’দিন পেরিয়ে গেছে?
তারা কেমন আছে তাকে ছাড়া।
বাবার কি শরীর ভালো আছে,
কে দেয় এখন তাকে নিয়ম করে ঔষধ।
আমাকে কি তুমু আস্তে আস্তে ভুলে যাবে বাবাম
আর সাফা আপু… সাফা আপু তো আর নেই।
বুকের গভীর থেকে এক অদৃশ্য হাহাকার ছুটে আসে। সে কোনোভাবে পানির চুমুক দিয়ে খাবারটা গিলে নেয়।
___তখনই আরেকজন মহিলা গার্ড নীরবে তার দিকে ওষুধ এগিয়ে দেয়।
___আপনার ওষুধ,ম্যাম।
দয়া করে খেয়ে নিন।
ইশায়া চুপচাপ তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। মাথা নাড়ে না, কোনো শব্দ করে না।
ওষুধের দিকে একবার তাকায়, তারপর চোখ ফিরিয়ে নেয়। গার্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, তারপর ধীরে ধীরে পেছনে সরে যায়।
___ইশায়া শুয়ে পড়ে এক কোণে। ঘরের আলো ফিকে। মনে হয় সময় যেন থেমে আছে,
সকাল দুপুর না রাত কিছুই বোঝা যায় না,

ভীর যখন কলম্বিয়ায় পা রাখে, তখন সে জানতো—এই মাটি শুধু রক্তে ভেজা না,
এই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে কোটি টাকার কো*কেন,
আর উপরে বসে আছে সেইসব ড্রাগ লর্ড যারা কাউকে ভয় করে না, শুধু ভয় পায় শক্তির।
আর আজ সেই শক্তির নতুন নাম হবে ভীর আলভারেজ।

ভীর এসেছিল তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে,
কিন্তু সেটা এতো সহজে হওয়ার না,
এজন্য তাকে দিনের পর দিন,মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।
এটা তার অনেক দিনের স্বপ্ন, অনেক মাসের পরিকল্পনা।
অনেক সময় ইনভেস্ট করেছে ভীর এই প্রজেক্টে।
___কিন্তু অন্য সব মিশন ভীর সহজ ভাবে নিলেও এটায় তাকে অনেক বাধার সসম্মুখীন হতে হয়।
এর কারন ছিলো ভীরের অন্যমনস্কতা।
সে কিছু নিয়ে খুব ডিস্টার্ব ছিলো।
আর এজন্য-ই সে হুটহাট রেগে যায়।
কাজগুলো এলোমেলো হয় এর ফলে অনেক বড় একটা কাহিনি ঘটে যায়।
ভীরের অনেক সৈনিক মারা পড়ে।

___নিকো ভীরের এই পরিবর্তন গুলো ভালো ভাবেই লক্ষ্য করছে।
___ভীর নিজের সব ভাবনা মাথা থেকে ঝেরে ফেলে কাজে মনযোগ দেয়,
কিন্তু দিনশেষে ঘুড়েফিরে তার মস্তিষ্ক জুড়ে চলতে থাকে,ওই রমনী,সে দিন তার চোখ, সেই চেহারা।
___ভীর এই কাজ শেষ না করে ফিরতেও পারবেনা।
___তাই দ্রুত সবকিছু করার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
প্রথমেই সে কলম্বিয়ার তিনটি প্রধান কোকেন প্রোডাকশন জোন,
Putumayo, Narino, এবং Norte del Valle,.এই জায়গাগুলোর উপর নজর দেয়।
প্রতিটি জায়গা একেকটা ড্রা*গ লর্ডের নিয়ন্ত্রণে।
এদের নাম বললে CIA-ও চুপ করে যায়।
ভীর জানে প্রথমে তাদের তথ্য চাই, পরে তাদের মাথা।
নিকো একটা লোকাল ফার্মের আড়ালে গড়ে তোলে তার কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি
আসলে সেটাই ছিল তার ইনফরমেশন হাব।
সেখান থেকে বের হয় একেকটা নাম, একেকটা ট্রাক রুট, একেকটা প্রোডাকশন হাবের মেপিং।

__ কোন রাতে মাল পাচার হয়,
ভীর সব জেনে নেয়।
আর তখনই শুরু হয় নিঃশব্দ ছোবল।
একটা ল্যাব রাতের আঁধারে বিস্ফোরণে উড়ে যায়।
এক ডিলারের গাড়ি গিরিখাদে পড়ে যায়।
এক হাই লেভেল ডিলার হঠাৎ নিখোঁজ।
___এই সবকিছুর পিছনে ছিলো ভীর।
যা সবার অজানা।
—আগুন দিয়ে আগুন নিভানো
পুরোনো কো*কেন বসদের মধ্যে বিভেদ ছড়াতে থাকে ভীর।
একদলকে সে বলে, আরেক দল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
আরেক দলের লোককে ধরে বলে, তোমার বসকে আমি শেষ করব, তুমি পাশে থাকলে তুমি বাঁচবে।
এভাবেই টাকা দিয়ে সবাইকে কিনে নেয় সে।
হয় টানা নাহয় ভয়।
এই গেম এ ভীর কারো ঘর নিজে ভাঙে না, সবাইকে দিয়ে নিজেরাই নিজেদের শেষ করায়।

____মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে, এক বিশাল কো*কেন ল্যাবের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভীর।
হাতে সিগারেট,
চোখে কোনো তাড়া নেই, তবুও তার আশপাশে সবার হৃৎস্পন্দন দ্বিগুণ।
ভীরের চোখের ইশারায় একেকটা গ্রুপ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
__এখন সে নিজেই একেকটা টেরিটোরিতে গিয়ে “মালিক” হিসেবে প্রস্থান নিচ্ছে।
লোক তার ভয়ে রাত্রে ঘুমায় না।
দুইটা গ্যাং শেষ করে দিয়ে, এখন সে একদম শেষ ল্যাবের ওপর ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে।
____তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক চাষি মাথা নিচু করে ফিসফিসিয়ে বলে,
__আমরা আপনার লোক, এখন থেকে শুধু আপনার প্রোডাকশনই করবো,
ভীর তার দিকে তাকায় না, শুধু বলে,
___সব জায়গায় আমার লোক থাকবে, যাতে কেউ ভুলেও বেইমানির সাহস না পায়।
—।।
দিনের পর দিন,রাতের পর রাত পেরিয়ে গেল ইশায়ার ঘরে সূর্য কবে উঠেছে জানে না সে।
ঘরটা যেন এক বিলাসবহুল অনামিশা।
চারপাশে ছয়জন গার্ড, প্রতিটা ইনচিতে সিসিটিভি,
আর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে আরও তিনজন।
রুমের বাইরে আর পুরো বাড়ি জুড়ে হাজার হাজার গার্ড।

___এখানের রোবোটিক জীবনযাপন, ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসে,
বাঁচতে চায় না সে,
কিন্তু মরতেও পারবে না,
তার এক জীবনের সাথে সাথে তার পরিবারের সবার জীবন চলে যাবে জানে সে।
__কিন্তু এরপর ও সে মানতে পারেনা,
রাগে কষ্টে দুঃখে দেয়ালে মাথা ঠুকে, নিজেকে আঘাত করার চেষ্টা করেছে বহুবার,করেছে ও।
__কড়া নজর দারিতে থাকার কারণে বড় কোনো ধরনের ক্ষতি না হলেও আঘাত পেয়েছে অনেক।
___এখানে শুধু মারিয়া এলেনা একটু মানবিক,
যিনি খাবার আনেন সবসময়, ওষুধ আনেন, কখনো কখনো কথা বলেন।
ইশায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

___আর ইশায়ার জীবন বন্দীর মতো চলতে থাকে।
রুম থেকে বের হওয়ার পারমিশন নেই তার।
_একটা মুহূর্ত একা থাকতে পারে না,
সব সময় চারপাশে লোকজন থাকেই।
ইশায়া ঘুমোনোর পর ও ওরা দাঁড়িয়ে থাকে,
সব সময় নিজের দায়িত্বে নিয়োজিত তারা।
কাজে কোন গাফিলতি দেখায় না।
___ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসে এখানে।পাগলামি করে মাঝে মাঝে বাবা-মা এর কথা যখন খুব বেশি মনে পড়ে তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেনা।
অনেকবার নিজেকে আঘাত করেছে,
____কিন্তু মারিয়া ওকে বার বার বোঝায় ভীরকে তুমি চিনোনা ওর কথার অমান্য করলে ও সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবে, তোমার ফ্যামিলির কাউকে আস্ত রাখবে না।
তোমার জীবন তো আর শেষ হয়ে গেছে তুমি মরে গেলেও তোমার ফ্যামিলি কাউকে ও জীবিত রাখবেনা।
___তাই নিজের জন্য না হলেও নিজের পরিবারের কথা একটু চিন্তা করো।
___দিন দিন ইশায়া আরো দুর্বল হয়ে যাচ্ছে,
আগে থেকেই শুকনো ছিলো।
এখন শরীরের আর গোনা যাবে এরকম অবস্থা,

___ইশায়া বসে আছে জায়নামাজ এ,
নামাজ পড়ে, চোখের কোণ ভিজে ওঠে,
নিজের জন্য না, সাফার, মায়ের,ভাইয়ার, বাবার মুখটা মনে পড়ে যায়।
___ইশায়া প্রতিদিন রোজা রাখে,
ইফতারে শুধু পানি খায় ইশায়া।
সেহরিতে শুকনো এক টা রুটি মুখে দেয়, কোন মতে গিলে নেয়, যেন অন্তত রোজাটা রাখতে পারে।
___এভাবেই না খেয়ে সে নিজেকে শেষ করে দিবে।
ওই জানোয়ার যদি আবার এসে যায়।
___ইশায়া শুধু এই প্রার্থনা করে ওই নরপশু টা আসার আগে যেন সে মরে যায়।
____দিন যাচ্ছে,

ভীর শক্তি গড়ছে, ইশায়া ভেঙে পড়ছে।
কলম্বিয়ায় ভীর নিজের প্ল্যান নিখুঁত করে সাজিয়ে চলেছে।
প্রতিটা এলাকা এখন তার পায়ের নিচে।
কোথাও CIA আছে, কোথাও DEA,
কিন্তু তাদেরও চোখ ফাঁকি দিয়ে সে তার রয়্যাল রুট চালু করেছে,
যেটা দিয়ে সে লাখো ডলার পাচার করতে পারবে।
এই সময় কেউ তাকে বিরক্ত করে না।
এদিকে দিন দিন পরিস্থিতির হাতের বাইরে চলে যেতে দেখে,
লুসিয়া সাহস করে ডিয়েগোকে জানায়।

___ লুসিয়া ডিয়েগো কে ইশায়ার ব্যাপারে সব কিছু বলার পর ও ডিয়েগো ভীরকে জানায়নি।
___লুসিয়াকে শান্ত স্বরে বলে,
এইরকম মানসিক অবস্থা নতুন কিছু না।এগুলো এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে, তোমরা দেখে রেখো যাতে নিজের কোন ক্ষতি করতে না।
ভীর এখন কলম্বিয়ার কেন্দ্রে, ওকে এই টাইমে ডিস্টার্ব করলে তুমি বুঝতেও পারবে না কার মৃত্যু আগে হবে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৬

____কিন্তু এইসব কিছুর মাঝে ঘটে যায় আরো একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
____ভীরের সৎ মা ক্যাটালিনা কে একজন গার্ড জানিয়ে দেয়,
ইশায়ার কথা।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৮