Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৯
তানিয়া হুসাইন

এই মানসিক যন্ত্রণা থেকেই তিনি বার বার অসুস্থ হয়ে পড়েন।
___তাকে কেউ সামলাতে পারে না।
এর মাঝে তিনি আরেক জেদ ধরেন,
তাকে কেউ-ই বুঝিয়ে উঠতে পারছে না।
___বাড়ির ভেতরে একটা অদ্ভুত নিরবতা।
সবার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ।
___সোফায় বসে আছেন সায়মা বেগম, মুখ শুকনো, চোখে অনবরত জল।
হঠাৎ তিনি ভাঙা কণ্ঠে পুনরায় পুরো পরিবারকে বলেন,

___আমি যেটা ঠিক করেছি, সেটাই হবে।
তোমরা বুঝবেনা আমার কষ্ট, রেহেনার একটা মেয়ে আমি নিয়ে আসবো।
এটা যত দ্রুত সম্ভব আমি করবো।
আমি ওকে ইশায়ার মতো করে রাখবো,
আমার ঘর আবার ভরে উঠবে।
আমার বেঁচে থাকার কারণ হবে।
আমি একটু শান্তিতে বাঁচতে পারবো।
এভাবে আমি মরে যাচ্ছি।
আমি আর পারছি না এই যন্ত্রণা সহ্য করতে।

_____তার কথা শুনে সবাই থমকে যায়।
প্রথমেই আপত্তি করেন আদনান সাহেব।
___সায়মা,
তুমি বুঝছো না,
মেয়ে পাল্টে ফেললে কি ইশায়ার শূন্যতা পূরণ হবে? মেয়ের অভাব তো মনের মধ্যে, অন্য কাউকে এনে তো সেই জায়গা পূরণ হয় না।
___আবির,
এগিয়ে এসে মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে,
আম্মু!প্লিজ,
আমরা সবাই আছি তোমার জন্য।
আরেকটা মেয়ে এনে তুমি শুধু নিজের কষ্টটাই বাড়াবে।
ওকে তুমি কখনোই ইশায়ার জায়গা দিতে পারবে না।
ইশায়া আমাদের বোন মা,
ওর জায়গা কখনো কেউ নিতে পারবে না।

____কিন্তু সায়মা বেগম নাছোড়বান্দা।
তিনি শূন্য চোখে উপরের দিকে তাকিয়ে বলেন,
__তোরা বুঝবি না,
যার কোল খালি হয়ে যায়, তার বুকের ভিতরের শূন্যতা কেউ বোঝে না।
আমি আমার মেয়ে হারিয়েছি,
আমার জোয়ান ছেলেটা মরার মত করে বেঁচে আছে।
তোরা কেউ বুঝবিনা এগুলো।
বলেই কান্না করতে থাকেন সায়মা বেগম।
___তার কান্ন কেউ আটকায় না।
এক এক করে সবাই হাল ছেড়ে দেয়।
মুখে কিছু না বললেও, সবার হৃদয়ে একটা চাপা ব্যথা।
আদনান সাহেব লম্বা একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলেন,
___ঠিক আছে,
তোমার যা ভাল মনে হয় তুমি তাই কর।
___আদনান সাহেবের কথায় সায়মা যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গেলেন,

মারিয়া এলেনা দাড়িয়ে আছেন ইশায়ার মাথার কাছে।
___ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করে দিয়েছে,
একটু পর জ্ঞান ফিরবে তার।
হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে পরে যায় ইশায়া।
সবাই ভয় পেয়ে গেছে কি হলো এটা ভেবে,
সাথে সাথেই মারিয়া এলেন ডাক্তার আনেন।
এই স্যালাইনটা সম্পূর্ণ শেষ করবেন।
শরীরের দুর্বলতার কারণে জ্ঞান হারিয়েছেন।
ডাক্তার আর ও কিছু মেডিসিন লিখে দেন।
___ ওনার খাওয়া-দাওয়ার দিকটায় একটু খেয়াল রাখবেন।
না হয় পরবর্তীতে আরো সমস্যা হবে, ওনার শরীর খুব দুর্বল।
বলে তিনি উঠে যান।

___মারিয়া এলেনা পড়েছে বিপদে,
একদিকে ক্যাটালিনা বলে দিয়েছেন এই মেয়েকে নিয়ে কোন আদিক্ষেতা না করতে।
মরে গেলে মরে যাক,
আপদ বিদায় হবে।
এসব রাস্তার আবর্জনা আমার বাড়িতে শোভা পায় না।
___অন্যদিকে ভীরের কথার নড়চড় হলে সে সবকিছু ধ্বংস করে ফেলবে।
তাদের কাউকে আস্ত রাখবে না।
সামান্য ঐদিন ইশায়া মাথায় একটু আঘাত পাওয়ার কারণে,
কি নৃশংস ভাবে ওই গার্ড গুলোকে মেরে ফেলেছে ভীর,
ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসে মারিয়া এলেনার।
আর এই দিকে এই মেয়ে সে তো আস্তে আস্তে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে।
তিনি একা কোনদিক সামলাবেন, এটা ভেবেই দিশেহারা।
___মারিয়া এলেনা শুধু ভীরের আসার দিন গুনছেন।

কলম্বিয়ার আকাশের নিচে, বিজয়ের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে।
বহু রক্ত, ঘাম আর অসংখ্য রাতের জেগে থাকা শেষে ভীর অবশেষে তার উদ্দেশ্য পূর্ণ করলো।
কো*কেনের রুট, যে রুট দিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার ঘরছাড়া হতো,
এখন তার হাতে।
পুরো কলম্বিয়ার মাফিয়া সিন্ডিকেট এখন ভীরের নাম শুনলে থমকে দাঁড়ায়।
এখন সব কিছু তার হাতের মুঠোয়।
__ভীর এরপর একে একে জায়গাগুলো নেয়,
প্রথমে একটা প্রোডাকশন ল্যাব দখল করে নেয় তার লোকজন।
সেখানে সে উন্নত প্রযুক্তির কো*কেন তৈরির ফর্মুলা চালু করে,
দ্বিতীয়ে, সে ট্রান্সপোর্ট রুট গুলো নিজ হাতে নেয়।
নতুন এয়ার রুট, নতুন কোডেড ডেলিভারি প্যাকেজিং
সব ভীরের তৈরি।
এরপর সে স্থানীয় চাষিদের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তাদের নিরাপত্তা দেয়, টাকা বাড়িয়ে দেয়,
তারা আর পুরনো লর্ডদের চায় না।
নিজেই হয়ে ওঠে কিংমেকার

___ভীর তখন নতুন মিটিং কল দেয়,
সবাইকে জানায়,
আমার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তোমার গাছ থাকবে না,
তোমার ট্রাক চলবে না,
তোমার পরিবার ঘুমাবে না।
আর যদি আমার পাশে থাকো,
তবে শুধু কলম্বিয়া না, আমেরিকা পর্যন্ত তোমার মাল যাবে।
লোকেরা নতজানু হয়ে পড়ে।
তিন মাসের মাথায়
ভীর কলম্বিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি হয়।
তাকে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলে না,
তার নাম নেয় ভয়ে কাঁপা গলায়,
কারণ সবাই জানে,
ভীর কাউকে শেষ করে না,
সে তোমার অস্তিত্বটাই মুছে দেয়,জীবন থেকে, ইতিহাস থেকেও।

___আনন্দের আমেজ চলছে আজ।
সবাই উল্লাস করছে,
তাদের নতুন জয়ের।
বড় করে সেলিব্রেট করছে নিকো,
সবার হাতে গ্লাস,সবাই ড্রিংক করছে।
তাদের এতোদিনের পরিশ্রমের ফল।
___এর মাঝে শোনা যায় ভীরের রাশভারি গলার আওয়াজ।
মেক্সিকো ফেরার প্রস্তুতি নাও।
___হঠাৎ ভীরের এরকম কথায় অবাক হয় সবাই।
নিকো বলে ওঠে,
___কি বলছো ব্রো!
আজ-ই?
___ভীর ঠান্ডা গলায় বলে,
হুম।
আজকেই।
এই মুহূর্তেই।

___ডিয়েগো এগিয়ে এসে বলে,
কিন্তু বস এখনো আমাদের এখানে অনেক কাজ রয়ে গেছে।
এই মূহুর্তে আমরা যেতে পারিনা। এতে…
___ভীর ডিয়েগো কে থামিয়ে বলে,
যা কাজ আছে এনরিকো সামলে নিবে।
___আমরা আজ-ই ফিরছি প্রস্তুতি নাও।
বলে কাওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ভীর চলে যায়।
___নিকো হতাশ হয়,
কই ওই কার্টেলের গ্যাংস্টারকে মেরে তার গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে এসেছে দুটো দিন এনজয় করবে,আর কই তাকে এখন সব ছেড়ে ছুড়ে যেতে হচ্ছে।
বেজায় বিরক্ত নিকো ভীর এর উপর।
এতদিন এত প্রেশার নিয়েছে কই এখন তার একটু রিফ্রেশমেন্ট এর প্রয়োজন।
কিন্ত কিছু করার নেই,
ভীর যখন বলেছে তখন যেতে তাকে হবেই।
___নিকোকে রেখে ভীর কখনো ব্যাক করবেনা।
___তাই ভীরের কথা মতোই সবাই প্রস্তুতি শুরু করে আজ-ই রওনা দিবে তারা মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে।

শাহানা বেগম সকাল থেকেই ভাবছেন কিভাবে বলবেন তিনি তার বোনকে।
___রেহেনা কি রাজি হবে তার প্রস্তাবে,
যদি না হয় এটা ভেবেই তিনি ভয় পাচ্ছেন।
কিন্তু তাকে যে করেই হোক রাজি করাতে হবে,
তার কোলটা খালি হয়ে গেছে,
__আর তার ছেলেটার জন্য ও তাকে কিছু করতে হবে।
এভাবে তার জল জ্যান্ত জোয়ান ছেলেটাকে তিনি তিলে তিলে মরতে দিবেন না।
সাফা তো আর কোনদিনো ফিরবে না।
কিন্তু তার ছেলেটার তো পুরো জীবন পড়ে রয়েছে।

_____এসব ভাবতে ভাবতেই সায়মা বেগম ফোন লাগান তার ছোট বোনকে।
___সায়মা বেগমেত ফোন দেখে তড়িঘড়ি রিসিভ করে রেহেনা।
বড় বোনের এই করুণ অবস্থা সে চোখে দেখতে পারছেনা।
মেয়ে হারিয়ে পাগলপ্রায় সে।
___সালাম দিয়ে বলেন,কী খবর আপা?
তোমার শরীর কেমন আছে এখন।।
___কিন্তু সায়মা বেগম কি বলবেন গলা কাঁপছে তার।
এই অন্যায় আবদার তিনি কিভাবে করবেন,
তিনি ভেঙে পড়েন ফোনের ওপাশেই।
কান্নামিশ্রিত গলায় বলেন,
তোর তো চারটা মেয়ে রেহেনা,
___আমার ছিল একটাই, রে। এখন সে নেই,
আমার বুকটা খালি হয়ে গেছে।
তোর কাছে একটা জিনিস চাইবো দিবি আমাকে।
___ফোনের ওপাশে স্তব্ধতা।
কি বলছো আপা তুমি।
কি হয়েছে তোমার?

___সায়মা বেগম আবারো বলেন,
দে না রে.
তোর একটা মেয়ে আমায় দে।
আমি তাকে আমার ইশায়ার মতো করেই রাখবো, বলনা দিবি।
____রেহেনার গলা ভারী হয়ে আসে।
আপা,এভাবে কেদো না।
___কিন্তু সায়মা রহমানের কান্না থামার নাম নেই।
___আচ্ছা আমি রুপাকে পাঠিয়ে দিবো।
ও কয়দিন তোমার সাথে থাকবে নে।
___সায়মা বেগম তৎখনাত না করে বলেন,
রুপা না রাহি।
তুই রাহিকে দে।
ও আমার ইশায়ার বয়সী,
ও আমার সাথে থাকলে আমার মনে হবে আমার ইশায়া আছে।
___কিন্তু আপা ওর তো সামনে এইচএসসি পরীক্ষা।
এখন…

____রেহেনাকে থামিয়ে দিয়ে সায়মা বলে,
তোর এসব টেনশন করতে হবেনা,
সব কিছু আমি দেখে নেবো,
ওর পড়াশোনায় কোন সমস্যা হবে না,
এক্সামের সময় ওখানে গিয়ে এক্সাম দিবেনে।
____রেহেনা বেগমের বুক ভারী হয়ে ওঠে,
কিভাবে তিনি থাকবেন।
___সায়মা রহমান আবারো বলেন,
আরেকটা কথা আমি শুধু তোকে বলছি,
আমি চাই আমার আদ্রিয়ানের জন্য রাহিকে আনতে।
তুইতো সবকিছুই জানিস,
আমার ছেলেটার জীবন কিভাবে এলোমেলো হয়ে গেছে।
এভাবে তো আর জীবন পার করা যায়না।
ওকে বুঝতে হবে।
এমন কাউকে প্রয়োজন যে ওর জীবনে সাফার জায়গাটা নিতে পারবে।
এখন না মানলেও একসময় তো তাকে মানতেই হবে বাস্তবতা।

___তাই দুটোতে কাছাকাছি থাকলেই ভালো। তোর মেয়েকে আমি সারাজীবনের জন্য নিয়ে আসতে চাই।
___কিন্তু, আপা!
___কোন কিন্তু না,
আমাকে বিশ্বাস করিস তো তুই।
আমি তোর মেয়ের সাথে কখনো খারাপ কিছু হতে দিবো না।
ওকে রাজরানী করে রাখবো।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ১৮

____রেহেনা বেগম একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলেন,
তুমি যা ভালো বুঝো করো আপা, আমি দেবো।
তোমার কোল খালি থাকবে না, কথা দিলাম।
_____সায়মা বেগম চোখের জল মুছেন।
কিন্তু তার হৃদয়ে একটা স্থায়ী ক্ষত সেটা সারাজীবন রয়ে যাবে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ২০