সে আমার বন্দিনী পর্ব ২১
তানিয়া হুসাইন
নিকো মারিয়া এলেনাকে ইশারা করে,
___ওকে রেডি করো।
বলে নিকো বেরিয়ে যায়।
____গার্ডরা আগে থেকেই সবকিছু ডালা নিয়ে প্রস্তুত।
ভীরের নির্দেশ মানে এটা হবেই,
এটা হতে হবে এখন যা কিছু হয়ে যাক না কেনো।
ইশায়ার জন্য সবকিছু প্রস্তুত করা হয়।
___মারিয়া এলেনা ও লুসিয়া এসে ইশায়াকে তুলে ফ্লোর থেকে।
ইশায়ার ভেঙে পড়া বিধ্বস্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে বসায়,
রাজকীয় ড্রেসিং টেবিলের সামনে।
___ইশায়ার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে অনবরত।
কিন্তু এতে কোন গার্ড দের কিছু যায় আসে না তারা তাদের কাজে নিয়ে ব্যস্ত।
প্রথমে ওর মুখ ধুয়ে দিলো ঠান্ডা গোলাপ জল দিয়ে।
হালকা মেকআপ করে দেওয়া হয় ইশায়াকে,
চোখে হালকা কাজল,
ফ্যাকাসে ঠোঁটগুলোতে হালকা গোলাপি লিপ গ্লস।
সুন্দর চেহারাটা মলিন হয়ে গেছে তা মেকাপের আড়ালে ঢাকা হচ্ছে।
__ঘরটা নরম, সোনালী আলোয় ভরা।
মারিয়া এলেনা গিয়ে ডালা থেকে গাউন টা নিয়ে ধীরে এসে ইশায়ার সামনে দাঁড়ায়।
মারিয়ার কণ্ঠ নরম,
___আজ আপনি কেবল কোনো সাধারন মেয়ে নন,
আজ আপনি হবেন এই রাজ্যের রানী।
মহারানী।
আমাদের বসের রানী।
___ইশায়ার দৃষ্টি অদূরে, যেন কিছুই স্পষ্ট দেখছে না।
সবকিছু ঝাপসা,
তার কারো কথায় কোনো ধ্যান নেই।
এই কয়টার দিন প্রত্যেকটা মুহূর্ত সে গুমড়ে গুমড়ে মরেছে এই দিনের ভয়ে, যখন এই লোকটা আসবে তখন কি হবে, আজ কে সেই দিন এসে গেছে,
ইশায়া নিজের ভেতর শক্তি খুঁজে নেয়।
তার যে করার কিছু নেই।
কি করবে সে, তার চোখের সামনে ওই ছোট্ট মাসুম বাচ্চাটার চেহারাটা ভেসে উঠছে।
_____একটা সাদা গাউন আনা হয়,
গলা অবধি বন্ধ, কমোর ছোঁয়া ফিটিং, আর নিচে ঢেউখেলানো।
___ইশায়া পড়ে আসে গাউন টা।
তার শরীরের সাথে ভীষণ মানায় সাদা রং।
লম্বা চুলগুলো স্ট্রেট করে সেখানে একটা মাথা পাট্টি সেট করে দিয়েছে,
এর উপর লাল দুপাট্টা।
নরম, পাতলা জর্জেটের, সোনালী বর্ডার দিয়ে সারা কিনারা মোড়া।
দুপাট্টাটা মাথার উপর টেনে লাগানো হয়।
ঠিক যেন মাথায় একটা আগুনের মুকুট।
______
ড্রয়িংরুমে এক ভয়ংকর নীরবতা।
চওড়া আর রাজকীয় ডিজাইনের সোফার একেবারে মাঝে বসে আছে ভীর।
তার শরীরের ভাষায় কেমন এক তীব্র হিংস্রতা ফুটে আছে।
চোখদুটো লাল হয়ে আছে রাগে আর উন্মত্ত চাওয়ায়।
তার চারপাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে ভারী অস্ত্রধারী বডিগার্ডরা।
____ড্রয়িংরুমের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাটালিনা এস্কালান্তে ও ইসাবেলা।
ক্লান্ত অথচ আতঙ্কিত মুখে দুজনেই তাকিয়ে আছে সামনে ঘটে চলা এই নাটকের দিকে।
ক্যাটালিনা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেনা কিছু।
____এক কোণে ছোট্ট একটা টেবিলের উপর রাখা, পুরানো ধাঁচের এক মোটা কালো চামড়ার খাতা খুলে বসে আছেন কাজী,
গম্ভীর মুখে।
তিনি মুসলিম রীতি অনুযায়ী বিয়ের কাজ সম্পন্ন করতে এসেছেন।
___ভীর গম্ভীর মুখে বসা।
মেরিয়া এলেনা কে খবর পাঠানো হয়েছে দ্রুত আসার জন্য।
___ঠিক তখন দরজার সামনে দেখা যায়, ধীর পায়ে দুজন মহিলা গার্ডের সাহায্যে এগিয়ে আসছে ইশায়া।
___ইশায়ার গায়ে পড়ানো হয়েছে এক ভারী, মেক্সিকো স্টাইল আর আরবীয় ডিজাইনের মিশ্রিত একটা গাউন।
দুধ সাদা, লম্বা ঘাগরা স্টাইলের গাউন,
মখমলের উপর হাতের সূক্ষ্ম সোনালি জরির কাজ।
গাউনের নিচের অংশ মেঝেতে লেপ্টে আছে,
যেন এক শুভ্র নদী তার সাথে বয়ে আসছে।
তার মাথা ঢাকা, গাঢ় লাল রঙের এক নরম ও পাতলা দুপাট্টায়, যার চারপাশে সোনার জরির কারুকাজ করা।
দুপাট্টা মাথার উপরে এমনভাবে সেট করা যেন মুখ পর্যন্ত নেমে এসেছে,
__ভীর একবার চোখ তুলে তাকালো ইশায়ার দিকে।
তার ভেতরে থাকা আগুন তাকে দেখে আরো উন্মাদ হয়ে উঠে।
তার গালে কেঁপে উঠলো মাংসপেশী।
চোখদুটোতে ঘনীভূত হলো এক পাগলামো মিশ্রিত মালিকানা।
সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসে, যেন সামনের সৌন্দর্যটাকে পুরোপুরি গিলে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
তার ভেতরে একটা অদম্য ক্রোধ আর অস্থিরতা জমে উঠে,
এই মেয়েটা তার।
___ইশায়াকে প্রায় টেনে এনে বসানো হয় ভীরের ঠিক সামনে।
ইশায়ার পা যেন চলছিল না প্রতিটি কদম ছিল তার জীবনের শেষ পথে হাঁটার মতো।
তার সমস্ত শরীরের প্রতিটি কোষ জানত কী ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে।
বসে পড়ার সময় তার ছোট্ট শরীরটা এতই কাঁপছিল যে মনে হচ্ছিল সে এখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়বে।
তার বুকের ভেতর কান্নার ঢেউ জমে গেছে, দম আটকে আসছে,
বাবা-মার কথা মনে পড়ছে শুধু।
চোখ থেকে অঝোরে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু কিন্তু শব্দ করার সাহস নেই।
ওইদিনের সেই ঘটনা উঁকি দিচ্ছে মনে।
____নিকো কাজীকে বিয়ে পড়ানোর জন্য তাড়া দেয়।
____কাজী বিয়ের কার্যক্রম শুরু করে।
ভীরকে কবুল বলতে বললে,
_ভীর কোনো দ্বিধা ছাড়াই, সোজা বলে ওঠে,
__কবুল!
তার কন্ঠে কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল শুধু এক ধরনের হুকুমের ভয়াল রূপ।
___কাজি এবার ইশায়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলেন,
ইশায়া রহমান, আপনি রাজভীর আলভারেয সাহেবকে কাবুল করছেন কি?
_____ ইশায়া যেন পাথর হয়ে গেছে।
শরীর জমে আছে ভয়ে।
মুখ খুলতে চায়, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
শুধু কান্নার দমক আর কাঁপুনির শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
___কাজি একবার, দুবার, তিনবার ডাকলেন,
বিবি, উত্তর দিন।
___কিন্তু ইশায়া চুপ।
__পাশে থাকা মারিয়া এলেনা তাকে অনুরোধ করছে বার বার বলার জন্য
___ইশায়ার এই চুপ থাকা ভীর আর সহ্য করতে পারেনা।
সে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত চুপচাপ বসেছিল,
দেখছিল ইশায়ার কর্মকাণ্ড।
ভীরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়,
ভীর মুহূর্তেই কোমর থেকে পিস্তল বের করে ,
চোখের দৃষ্টি এতটাই হিংস্র যে কারো সাহস হয়নি তাকে থামাতে।
বিনা দ্বিধায় চারপাশের কাঁচের ঝাড়বাতি, ফুলদানি, ম*দ রাখার তাক,
সবকিছুতে টার্গেট করে গুলি চালাতে শুরু করে,
___ঠাশ,ঠাশ,ঠাশ!
একটার পর একটা কাঁচের ঝলক ভেঙে পড়ছে মেঝেতে,
চারদিকে কাচের ছড়াছড়ি,
ঘরটা যেন কেঁপে উঠলো ভয়ের কম্পনে।
___ইশায়া চিৎকার দিয়ে উঠে, চোখ বন্ধ করে মারিয়া এলেনার কোমর আঁকড়ে ধরে।
এই লোকের হিংস্রতা সে নিতে পারেনা।
সে জানে না কীভাবে এই পিশাচকে স্বামী রূপে কবুল করবে।
তার মন, শরীর, আত্মা,সব ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
ভীরের দৃষ্টি পাগলের মতো, লাল হয়ে গেছে চোখ।
তার কণ্ঠের ভয়ংকর হুঙ্কার ছড়িয়ে পড়লো পুরো ঘরজুড়ে,
____ডিয়েগো!
তার গলায় কোনও দ্বিধা নেই,
শেষ করে দা…
ভীরের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঠিক সেই মুহূর্তে
একটা চিকন, ভাঙা কণ্ঠের আওয়াজ ঘরের শীতলতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ে,
___কবুল… কবুল… কবুল!
তিনবার টানা বলে ফেলে ইশায়া।
কণ্ঠ এতই ভাঙ্গা, এতই ফাঁপা যে মনে হয় বুকের গভীর থেকে শেষ শক্তি খুঁড়ে বের করে আনছে শব্দগুলো।
_____ভীরের রাগ এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল।
ইশায়ার গলা শুনে।
তার চোখের আগুন ম্লান হলো না, বরং তৃপ্তির এক ভয়ানক হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটের কোণে।
সে জানে,
এখন থেকে এই মেয়ে তার।
পুরোপুরি তার।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে।
ভীর এখন রয়েছে প্রাসাদের এক নির্জন অংশে,
এটা একটা গোপন কক্ষ। চারপাশে ঘন মখমলি পর্দা ঝুলছে, নরম হলুদ আলোয় চারপাশ ডুবে আছে, আর দেয়ালের ওপরে মেক্সিকোর সিনালোয়া ও গুয়াদালাহারা অঞ্চলের প্রতীকী প্রতিচ্ছবি খোদাই করা।
দূরে বিশাল একটা রাউন্ড টেবিল, আর পাশে ছোট্ট একটা বার কাউন্টার।
ভীর সেখানে দাঁড়িয়ে হাতে একটা ভারী ক্রিস্টাল গ্লাস ধরে হালকা করে ঘুরাচ্ছে, ভেতরে গাঢ় রঙের হু*ইস্কি ঢেউ খেলছে।
তার চোখ যেন শূন্য, মুখের
অভিব্যক্তি স্থির।
____নিকো এগিয়ে এসে হালকা হাসে, তার ঠোঁটের কোণে মজা মেশানো প্রশংসা,
Congratulations, Bro. Finally, you’re a married man!
____কিন্তু ভীর কোনো উত্তর দেয় না।
সে নিঃশব্দে গ্লাসটা তার আঙুলের ভেতর ঘুরিয়ে চলেছে, যেন গ্লাসের ভেতরের ঘূর্ণিতে নিজের মনকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
____নিকো আবার হাসে, একটু নিচু গলায় বলে,
ক্যাটালিনার কথা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না।
বেশি বাড়াবাড়ি করলে একবারে সিনালোয়া পাঠিয়ে দেব। সেখানে গেলে নিজে থেকেই ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
____ভীর আবারো চুপ।
সে আসলে ক্যাটালিনার ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।
এগুলো নিয়ে ভাবার সময় নেই তার।
তাদের এক্সিসটেন্স ও তার ম্যাটার করে না তার কাছে।
___ভীরের মনে শুধু একটা চিন্তা বারবার ঘুরছে,
ইশায়া।
এই মেয়েটাকে সে যখন প্রথম দেখেছিল, তখন এমন কিছু ভাবেনি।
তার ভাবনায় ও ছিল না যে, কোনোদিন সে নিজের পৃথিবীতে কাউকে এতটা জোর করে টেনে নেবে।
কিন্তু এখন এখন তার সমস্ত মস্তিষ্ক জুড়ে এই মেয়ে।
___গত তিনটা মাস সে কিভাবে পার করেছে সেটা শুধুমাত্র সেই জানে।
একটা মুহূর্তের জন্য এই মেয়েকে সে মাথা থেকে বের করতে পারেনি, প্রতিটা মুহূর্ত ছটফট করেছে।
একটাবার দেখার তৃষ্ণায় সে কতটা তড়পেছে সেটা শুধুমাত্র সেই জানে।
___ক্যাটালিনার কিছু কথা তার গর্বকে সামান্য চূর্ণ করলেও, আসল ভাবনা অন্যখানে,
ইশায়ার চোখের নিঃশব্দ বিদ্রোহ তাকে অস্থির করে দিচ্ছে।
___এই মেয়ের এই তেজ তার সহ্য হচ্ছে না।
তার সাথে ত্যাড়ামি সে কখনো মেনে নিবে না।
তার রাজ্যে তার সাথে বিদ্রোহ চলবে না।
বরং বাঁচতে হলে আমার কথা মেনেই বাঁচতে হবে।
___ভীর এগুলো ভাবছে আর একের পর এক ড্রিঙ্ক করে যাচ্ছে।
___এদিকে ইশায়া এখনো তার আগের রুমে ফিরে যেতে চাচ্ছে।
ওর মনে হচ্ছে আগের রুমের ভেতর ছিল তার শেষ মুক্তির ছায়া।
ওখানে সে একটু হলেও শান্তি পেয়েছে।
কিন্তু এই লোকের সাথে থাকলে সে মরে যাবে,
ওই লোকের ছোঁয়া ঐ লোকের স্পর্শে তার মৃত্যু হবে।
কিন্তু ভীর স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে,
___ইশায়া তার রুমে থাকবে।
সে যেনো তাকে তার রুমেই পায়।
ভীরের আদেশ না মানলে অনর্থ হয়ে যাবে।
সবাই এই ভয়টাই পাচ্ছে।
___কিন্তু ইশায়াকে কেউ মানাতে পারছে না
ইশায়া আপত্তি করছে, রীতিমতো কান্নাকাটি করছে, কিন্তু শেষমেষ ডিয়েগোর নির্দেশে একপ্রকার জোর করেই তাকে ভীরের ব্যক্তিগত রুমে আনা হয়।
___ডিয়েগো ঠান্ডা কণ্ঠে তখন বলেছিল,
তুমি কি মনে করছো, এসব করে তুমি বাঁচবে?
ভীর তোমাকে ছাড়বে না।
উল্টো, তোমার এই একগুঁয়েমি তোমার পুরো পরিবারকে হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
ভাবো ইশায়া, অহেতুক জেদ করে লাভ কি?
তুমি কি চাওনা তোমার ফ্যামিলি ভালো থাকুক।
নাকি সাফার…
____ইশায়া চুপ হয়ে যায়
তার চোখ ভরা ছিল আতঙ্ক, কিন্তু ভেতর থেকে অনড় এক জেদ।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ২০
মারিয়া এলেনা ও অন্যান্য নারী গার্ডরা পুরো রুমটা সাজিয়েছে।
সাদা এবং লাল গোলাপের সমাহার,
ক্যান্ডেল জ্বালানো হয়েছে।
সুগন্ধি মোমবাতির উষ্ণ আলোয় রুমের প্রতিটি কোণ এক রহস্যময় পরিবেশে ডুবে গেছে।
বিছানাটা ফুলের পাপড়িতে ঢাকা, যেন এক প্রেমেরমঞ্চ।কারুকাজ করা কার্পেটের ওপর দিয়ে মোমবাতির নরম আলো ছড়িয়ে পড়ছে।
