Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫২

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫২

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫২
তানিয়া হুসাইন

রাতের আকাশটা আজ ভিন্ন রকম।
চাঁদের আলোও যেন রক্তিম,
ধোঁয়ায় ভরা বাতাসের ফাঁক গলে ছড়িয়ে পড়েছে নিঃসাড় আলো।
বর্ডার সাইটের চারপাশে গা ছমছমে নীরবতা, কোথাও একটা শুকনো পাতা পড়ে যাওয়ার শব্দেও যেন মনে হচ্ছে গোলাগুলি শুরু হয়ে যাবে।
ভীরের গার্ডরা তখন চারদিক থেকে পুরো এলাকাটা ঘিরে ফেলেছে।
আলোয় আসে এক বন্দিনী।
এক নারী, যে আলো-অন্ধকারের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে এক নৃশংস মাফিয়া যার হাত থেকে পালিয়ে এসেছে সে।
অন্যদিকে এক অসহায় মায়ের হাহাকার যে কাঁদছে তার সন্তানের প্রাণের আশায়।
সে জানে, এই দুই নিরপরাধ মানুষের প্রাণ বাঁচাতে তাকে ফিরতেই হবে আগুনে।
নিজেকে সে সমর্পণ করে দেয়, ওদের জন্য।
আলো ম্লান হয়ে আসে চারপাশে, কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে সামনে আসে ইশায়া।
তার কালো পোশাক দেহে আঁটসাঁট হয়ে লেপ্টে আছে,
হাঁটু সমান ঘন চুলগুলো বাতাসে উড়ছে এলোমেলোভাবে।
তার সেই মুখ যেটা দেখলে মুহূর্তে হাজারটা রাজ্য ধ্বংস করে দিতে চায় কোনো পুরুষ, সেই রূপ যেন কোনো মৃত্যুদূতের চেয়েও বিষাক্ত আবার পবিত্র।
ভীর সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

___ইশায়াকে ঘিরে দাঁড়ায় সহস্র গার্ড,
পুরো গোল হয়ে ঘেরাও করে পুরো জায়গাটা এক বিন্দু পরিমাণ ফাঁক রাখে না,
সবাই অ*স্ত্র তাক করে ধরে সোজাজি,
তাদের করা রাস্তাটা শুধুমাত্র ভীর পর্যন্তই যায়।
___সবার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরুষ, রাজভীর আলভারেয,
মেক্সিকোর বিপজ্জনক বেপরোয়া মাফিয়া বস।
তার শরীরটা শক্ত হয়ে আসে, কাঁধ ফুলে ওঠে,রক্তিম চোখদুটো আগুনের মতো জ্বলছে।
ভীর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঝাপসা হয়ে আসা সেই রমণীর দিকে।
প্রায় দুই দিন সে দিশেহারা হয়ে ছুটেছে, ঘুমহীন, ক্ষুধার্ত, উন্মাদ হয়ে এই মেয়েটার জন্য।
প্রতিটা সেকেন্ড যেন বিষ হয়ে ঢুকেছিল তার রক্তে।
এই মেয়েটার অনুপস্থিতি তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে।
আজ, সে তার সামনে।
যাকে একটি বার ছুতে না পারার কষ্ট তাকে ভিতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিলো এখন সে তার সামনে।
তাকে দেখে মুহূর্তে সক্রিয় হয়ে ওঠে চারপাশের নিরাপত্তা।
সান্তিয়াগো, এনরিকো, ডোমিনিকো তিনজন বডিগার্ড সামনে আসে।
কিন্তু তাদের কেউ-ই ইশায়াকে স্পর্শ করতে পারবে না।
কিন্তু তবুও এক বিন্দু ফাঁক রাখে না কেউ, যেন বাতাসও না যেতে পারে তার শরীর ছুঁয়ে।
ভীর কোনো শব্দ করে না, শুধু চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে।
তার ভেতরে রাগ, সেই জ্বলন্ত আগুন ।

___ইশায়ার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় নিকো,
সেও ভেতরে আগুন হয়ে আছে।
কম দৌড় করায় নি এই মেয়ে তাদেরকে।
তার চোখ বলে দিচ্ছে,
তুমি কীভাবে সাহস করলে পালানোর?
এত দ্রুত ভুলে গেছো বোনের পরিণতি।
___কিন্তু এই মুহূর্তে রাজভীর এর আগে কেউ কথা বলে না।
আর কাউকে দেখে না।
ভীর শুধু তাকিয়ে আছে তার সামনে হাঁটতে থাকা সেই নারীটির দিকে,
যার প্রতিটা পা যেন তার হৃদয়ের ওপর এসে পড়ে, বারবার।
তার চোখে তখন আর দুনিয়া বলে কিছু নেই।
শুধু সেই রমণী যে তার।
ইশায়া এগিয়ে আসে।

সে জানে তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতা অপেক্ষা করছে সামনে।সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা যা সে মানতে চায় না কিন্তু মানা ছাড়া তার কাছে কোন উপায় নেই, সে বাধ্য মানতে।
ভীরের চোখ আরও কঠিন হয়ে যায়।
তার মুখে ধরা পড়ে হিংস্র প্রেমের ছায়া।
যা এক ধরণের প্রেম, যা মারতে জানে, পুড়িয়ে দিতে জানে, বন্দি করে রাখতে জানে।
রাগ, জেদ আর ক্ষোভের ধোঁয়ায় যেন দপ দপ করে জ্বলছে ভীর এর ভেতরটা।
তবে সেই আগুন বাইরে নয়, তার ভেতরেই জ্বলছে, নিঃশব্দে, নিঃসীমে, ধ্বংসের পূর্বাভাস নিয়ে।
তার ঠোঁটে কোনও শব্দ নেই, চোখে কোনও চঞ্চলতা নেই
তবুও সেই চাহনিতে এতটা ওজন, এতটা আগুন যেন তার দৃষ্টি ছুঁলেই কেউ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
ভীর চুপ।

অতিরিক্ত রাগে মানুষ যেমন ঠান্ডা হয়ে যায়,ভীরের ক্ষেত্রে হচ্ছে তার থেকেও ভয়ংকর কিছু।
সে জানে না সে কী করবে তবে এটুকু জানে, তার ভেতরে এখন যা জন্ম নিচ্ছে, সেটা মানুষ নয়,
সেটা জন্তুরও একধাপ ওপরে, ভয়ংকর কিছু।
ভীর চোখ সরিয়ে নিতে পারছে না ইশায়ার দিক থেকে।
তাকে যেন প্রথমবারের মতো নতুন করে দেখছে,
তবে ভালোবাসার চোখে নয়, ঘৃণার চোখেও নয়,
এক ধরণের হতবাক যন্ত্রণার চোখে,রাগের চোখে।
যেন প্রতিটা স্মৃতি, প্রতিটা মুহূর্ত,যা সে পেছনে ফেলে এসেছে, হঠাৎ ঝড় হয়ে ফিরে এসেছে মাথার মধ্যে।
গত দুই দিন ধরে তার হৃদয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে,
সে মেয়েটাকে চোখের সামনে না পাওয়ার প্রতিটা মুহূর্ত কেমনভাবে তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বিধেছে,
তা যেন একে একে তার স্মৃতির দরজায় ধাক্কা মারছে।
মাথার মধ্যে রক্ত টগবগ করে ফুটে ওঠে, সে নিজের শরীরটাই আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না।

___অন্যদিকে, ইশায়া ঠায় দাঁড়িয়ে আছে পাথরের মূর্তির মতো।
ভয়ের চূড়ান্ত রূপ মানুষকে নড়তে দেয় না,
শ্বাস নিতে দেয় না, চোখ তুলতে দেয় না,
ইশায়ারও সেই অবস্থা।
তার চোখের পাতা কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, গলার নিচে একটা ভারি বল যেন আটকে গেছে।
সে জানে না আজ তার কী হবে।
ভীর কী করবে, তার নিজের জন্য কোন চিন্তা নেই,
তার ভয় এখন ডেলমা আর তার ছেলের জন্য।
সে জানে ভীর কী করতে পারে।
সে জানে এই মানুষটা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে,
আর এই মুহূর্তে, তার ভেতরের অন্ধকারটা পুরোপুরি মুক্ত।
____ইশায়া ভয়ে উপরের দিকে তাকাতে অবধি পারছেনা,
সে জানে ওই ভয়ংকর চোখ দুটো তার দিকেই নিবদ্ধ।
এই চোখের দিকে তাকানোর মতো সাহস তার নেই।
তবুও,তবুও ইশায়া এক ফোঁটা সাহস কুড়িয়ে তার থমকে থাকা চোখদুটো উঠিয়ে তাকায় একটু উপরে,
সেই চোখ…সেই দৃষ্টি…
যেন আগ্নেয়গিরির গভীরে জ্বলতে থাকা লাভার বুকে জন্ম নেওয়া চোখ,
যেখানে লুকিয়ে আছে জ্বলে ওঠা রাগ,
অভিমান আর অন্ধকার এক ভয়াল আকাঙ্ক্ষা।

___ইশায়া মুখ ফুটে কিছু বলতে চায়,
শব্ধ খুঁজে পাচ্ছে না সে।
কি হবে সামনে সে জানে না,তার শরীর অবশ হয়ে আসছে।
আপ…..আ..ইশায়া মুখ ফুটে কথা বলতে নিয়েও ঠোঁট ভেঙ্গে ফুফিয়ে ওঠে,
তার শ্বাস তীব্রভাবে ওঠানামা করছে,
বুক কাঁপছে, বাঁচার আকুতি নিঃশ্বাসে ভাসছে।
ভীর গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।
তার সেই নরম ঠোঁট যেটা এখন কাঁপছে,
তার ওপর সেই ছোট্ট তিলটা জ্বলজ্বল করছে।এই ঠোঁট সে অগণিতবার ছুঁয়েছে,
কিন্তু গত দুইদিন তাকে না দেখার যন্ত্রনা তাকে না ছুঁতে পাওয়ার কষ্ট তার বুকে তীরের মত বিধেছে।
সে মুখ, সেই চোখ,
এই মেয়েটা, যাকে সে নিজের চোখের আড়াল হতে দেয়নি কখনও,আর সে নিজেই তাকে চোখের আড়ালে ফেলে রেখেছিল দুইটা দিন।
মাত্র দুইটা দিন,
কিন্তু সেই দুই দিনের প্রতিটা মুহূর্ত ছিল ভীরের জন্য মৃ*ত্যুর চেয়েও ভয়ংকর।
না দেখার যন্ত্রণা, না ছোঁয়ার কষ্ট,আর সেই অজানা শূন্যতা,
যা প্রতিটা মুহূর্তে তার হৃদয়কে রক্তাক্ত করে রেখেছে।

___যা করার আমি করেছি, ওদের দোষ নেই,ওদেরকে ছেড়ে দিন, যা করার আমার সাথে করুন।
ইশায়ার কণ্ঠ কাঁপছে, চোখের কোণে জমে থাকা জলরাশি এবার গড়িয়ে পড়লো। সেই চোখে ছিল অনুরোধ, মিনতি, ভয় এবং তীব্র অপরাধবোধের ছাপ।
ভীর দাঁড়িয়ে আছে নীরব, পাথরের মতো নিঃশব্দ। কিন্তু তার দৃষ্টির গভীরে আগুন জ্বলছিল।
ইশায়ার মুখে ওদের কথা বিশেষ করে টিয়েগোর কথা যেন রাগে ঘি ঢালার মতো কাজ করলো,
ভীরের চোখ ঠাণ্ডা কিন্তু ভয়ঙ্কর। সে কিছু বলল না,
শুধু একবার তাকায় নিকোর দিকে,
এই একটিমাত্র ইশারাতেই যেন ঝড় নেমে এল জায়গাটাতে।
নিকো এবং ভীরের আরও কয়েকজন মানুষ একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে টিয়েগোর উপর।
ঘুষি, লাথি, ধাক্কা, হকি স্টিক দিয়ে এক মুহূর্তেই বেধড়ক মারতে শুরু করে তাকে।
সে গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে, কিন্তু থামেনি কেউ।
তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে যন্ত্রণায়।

ডেলমা, ছেলেকে বাঁচাতে যায় ওদের হাত থেকে।
কিন্তু তার কণ্ঠ কাউকে ছুঁতে পারলো না।
বিপরীতে, সে নিজেও ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায় নিচে, লুটিয়ে পড়ল মার খেতে খেতে।
এই ভয়াবহ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারলো না ইশায়া।
সে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটুর ওপর বসে পড়ে ভীরকে মিনতি করে বলে,
দয়া করে ওদের ছেড়ে দিন। ওরা কিছু করেনি, প্লিজ প্লিজ!
কিন্তু ভীর নীরব।
তার ঠোঁট সোজা রেখা হয়ে আছে, চোখে অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা।
সে যেন আজ পণ করেছে আজ কোনো কথা বলবে না। শুধু প্রতিশোধ নেবে।
এক চুল পরিমাণ ছাড় দিবে না কাউকে।
সবকিছু এক মুহূর্তে থেমে যায় যখন নিকো ছু*রি হাতে তুলে নেয়।
ইশায়ার বুক কেঁপে উঠে,

সে বুঝে যায় এখন কি হতে চলেছে।
সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠে,
না,প্লিজ! এমন করবেন না। এটা অন্যায়।
এত বড় অপরাধ করবেন না, আল্লাহর ভয় করুন!।
বলতে বলতে সে ছুটে যেতে নেয় নিকোর দিকে, ছু*রি থামাতে।
এক পা সামনে দেওয়ার সাথে সাথেই,
একটি শক্তিশালী হাত ইশায়ার বাহু চেপে ধরে।
শক্ত থাবায় আবার নিজের কাছে টেনে আনে।
ভীরের চোখ রক্তচক্ষুতে পরিণত হয়েছে।
তার মুখের চোয়াল শক্ত, শিরাগুলো ফুলে উঠেছে।
এই মেয়েটা, যার জন্য ভীর আজ এই সীমাহীন অবস্থায় পৌঁছেছে, সেই মেয়েটা এখন অন্য একজনকে বাঁচাতে মরিয়া।অন্য পুরুষের জন্য কান্না করছে ওর জন্য মিনতি করছে।
___Why do you have so much affection for another man?
Am I not enough to satisfy you?
আমাকে দিয়ে হচ্ছে না তোর।
কি জন্য এমন করলি বল?
চিৎকার করে বলে ভীর। হাতের চাপ আরো দৃঢ় হয়।

___ইশায়া ব্যাথায় চোখ মুখ কুচকে নেয়।
ইশায়া হাত ছোটানোর চেষ্টা করে বলে,
ছাড়ুন অসভ্য জানোয়ার লোক একটা।
আপনাদের মত নরপশু কিভাবে বুঝবে পরিবার কি আপন জন কি।
পরিবার হারানোর কষ্ট কী? আপনজন হারানোর যন্ত্রণা কী জিনিস?
ইশায়ার গলা কেঁপে উঠছে, তার চোখ থেকে ঝরছে লেলিহান অশ্রু, তীব্র কষ্টে ফেটে পড়া চিৎকার যেন আকাশ বিদীর্ণ করে দেয়।
ভীর দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সামনে, একপলক তাকিয়ে সে বলে ওঠে,

___হুঁশ,গলার রগ ছিঁড়ে ফেলব। আওয়াজ নামা। ভুলে যাস না, কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস।
তার কণ্ঠে এমন ঠান্ডা, যে ঠান্ডার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল কিছু
শিক্ষা হয়নি তোর? বোনকে হারিয়ে, ভাইয়ের পাগলপ্রায় অবস্থা দেখে?
আরেক ভাই তো মরার মুখ থেকে ফিরে এসেছে, তাও শিক্ষা হয়নি তোর?
তাহলে এবার কি তোর ভাবীকে নি…
কথা শেষ করার আগেই,
সাফার মৃত্যু , তার ভাইয়ের যন্ত্রনা।
ছোট্ট মাসুম বাচ্চাটাকে মারার প্ল্যান, বড় ভাইকে কিডন্যাপ আর এখন ভাবীকে নিয়ে এমন কুৎসিত কথা!
ইশায়ার চোখ অন্ধকার হয়ে আসে
বুকের ভিতরে এমন কিছু ছ্যাঁকা দেয় যেন শরীরের সব রক্ত জ্বলে ওঠে।
সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে ভীরকে মারার জন্য হাত তোলে।
কিন্তু মুহূর্তেই,

চারপাশের সব গার্ড ইশায়ার দিকে ব*ন্দুক তাক করে ধরে!
সেকেন্ডের মধ্যে গর্জে ওঠে হুমকি আর আতঙ্ক।
ইশায়ার ছোট্ট হাতটা ভীরের গাল স্পর্শ করার আগেই ভীর তার হাত চেপে ধরে,
অন্য হাতে সজোরে একটা ঠাসসস করে থাপ্পড় বসায় ইশায়ার নরম গালে।
চোখে আগুন ভীরের,
ইশায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরও একটা ভয়ংকর থাপ্পড় সেই একই গালে পড়ে।
এক মুহূর্তে তার গাল লাল হয়ে যায়, কান জ্বলে ওঠে, মাথা ঘুরতে থাকে।
সে দুলে ওঠে কিন্তু ভীরের শক্ত হাতে সে আটকে আছে।
নিকো এক ইশারায় গার্ডদের শান্ত হতে বলে, তারা বন্দুক নামিয়ে পিছিয়ে আসে।
ভীর রাগে হিস হিস করছে। শরীর কাঁপছে অতিরিক্ত আগে ।
আমার সঙ্গে গলা বাজি করিস!
চিৎকার করে কথা বলিস আমার সাথে?
তোর এই দুঃসাহসের মূল্য কী তা তুই দেখবি।
শুধু অপেক্ষা কর,
তোকে আমি এমনভাবে ভাঙব, এতটা নিঃস্ব করে দেব
তুই আর কিছুই দেখবি না, কিছুই পাবি না শুধু আমিই থাকব তোর সামনে।
আমার ছায়া ছাড়া তোর কাছে আর কিছুই থাকবে না।।
বলে ইশায়াকে জোরে ধাক্কা দেয়।
সে ছিটকে যায় কিছুটা।

ভীর এগিয়ে যায়,
সান্তিয়াগো কোনো কথা না বলে কু*ড়াল এগিয়ে দেয়।
ভীর সেই কুড়াল হাতে নিয়েই যায় টিয়াগোর দিকে।
আর কোনো কথা না বলে সে এলোপাতাড়ি কু*ড়াল চালাতে শুরু করে।
তাজা র*ক্ত ছিঁটকে আসে
প্রতিটি আঘাতে মাংস ছিন্ন হয়, র*ক্ত ছিটকে পড়ে চারপাশে।
টিয়াগোর আর্তনাদ একসময় স্তব্ধ হয়ে যায়,
আর ভীর চলতেই থাকে যেন প্রতিটি আঘাতে তার উগড়ে দিচ্ছে।
ডেলমা চিৎকার করতে করতে তার মুখ থেকে র*ক্ত বেরিয়ে আসে ,
কিন্তু তাকে ধরে রাখে এক গার্ড,
আর তিনি চিৎকার করে কাঁদছে,
থামো আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও! দয়া করে!
আমার আর কেউ নেই। আমার ছেলেটা ব্যাথা পাচ্ছে ওকে ছেড়ে দাও।

____অন্যদিকে ইশায়া,
সে স্তব্ধ।
শরীর মন একদম জমে গেছে।
চোখের সামনে এমন ভয়াবহ রক্তপাত, তার কারণে এমন মৃত্যু,
সে কিছুই বলতে পারে না।
কান্না নেই, চিৎকার নেই শুধু নিঃশব্দ স্তব্ধতা।
একটা গভীর বোবা যন্ত্রণা তার মুখে ছায়ার মতো ভেসে উঠেছে।
ইশায়া বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেনি এই দৃশ্য এক সময় লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।
মারিয়া এলেনা কে ডাকে নিকো।
___তার শরীর যেন কাঁপছে নিঃশ্বাস নিতে।
___নিকো আদেশ দেয় তাকে গাড়িতে তোলো ওকে এখনই।
____ভীরের চারপাশে র*ক্ত, ছিন্ন দেহের টুকরো,
ভীর মুখ থেকে র*ক্ত সরিয়ে দেখে ইশায়াকে গাড়িতে তোলা হচ্ছে।
শান্তি লাগছে এখন তার এই র*ক্তে।
তার থেকেও বড় শান্তি হচ্ছে পেয়ে গেছে সে তার প্রান কে।
এখন আর কোন শূন্যতা গ্রাস করতে পারবে না তাকে।
সে যাকে চায় সে তার চোখের সামনেই আছে।
এইতো এখনো তার সামনে বাড়িতে গেলেও সে তাকে পাবে।

সবকিছু শেষ।
গাড়ির বহর একে একে বেরিয়ে পড়ছে এলাকা থেকে
সবার চোখে যেন বিজয়ের অহংকার, শাস্তির রূপ, আর প্রতিশোধের তৃপ্তি।
কিন্তু সবার পেছনে রয়ে গেছে একজন ডেলমা।
না, সে এখন আর শুধুমাত্র একজন মা নয়।
সে একজন মৃ*ত সন্তানের ছিন্নভিন্ন শরীর আঁকড়ে ধরা নিঃস্ব আত্মা।
তার কোলের মধ্যে টিয়াগোর বিক্ষত দে*হের অংশগুলো।
রক্তে ভেজা, ছিন্ন, জীবনের স্পন্দনহীন।
এক হাতে ছেলের হাত, অন্য হাতে মাথায় ধরে সে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে।
তার চোখে এখন কান্না নেই।
যা আছে তা হলো এক অসীম শূন্যতা আর
একটা অভিশপ্ত নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।
সে ফিসফিস করে, আবার গর্জে ওঠে,
সন্তান হারানোর এই যন্ত্রনা
আজ আমি যেভাবে ভুগছি একদিন তোরাও ঠিক বুঝবি।
যেভাবে আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম আজ,
তুইও হবি, তোরাও হবি।
তার কণ্ঠে এখন আর কান্না নেই,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫১

আছে ঘৃণা, অভিশাপ, আর এক মায়ের রক্তমাখা হাহাকার।
সে আবার ছেলের মাথা নিজের বুকে চেপে ধরে
আমি মা আমি আজ তোকে বলছি,
একদিন তুইও সন্তান হারানোর কষ্টে কাঁদবি ঠিক এমন করে,
তুইও বুঝবি একটা মায়ের বুক কেমন করে ছিঁড়ে যায়।
তুইও কাঁদবি, ঠিক আমার মতোই। আমি বলছি, আমি বলছি।
বলতে বলতেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ডেলমা
চারপাশে তখন নীরবতা।
রক্ত গন্ধে ভারি বাতাস,
আর দূরে, অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া গাড়ির বহর।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৩