সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৫
তানিয়া হুসাইন
ইশায়ার ভেতরে তখন শুরু হয় এক নিঃশব্দ যুদ্ধ।
এলিজার কথাগুলো তার মাথার ভেতরে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে।সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করছে তার ভেতরে।সে বারবার সেই স্বপ্নগুলোর কথা ভাবতে থাকে।র*ক্তমাখা হাত, অন্ধকার করিডোর, দূরে কারো চিৎকার অস্পষ্ট কিছু মূহুর্ত,পরিবারের সাথে সুন্দর কিছু মূহুর্ত খুনসুটি সবকিছু চোখের সামনে আসে, কিন্তু ঝাপসা,আবছা।কিছুই পরিষ্কার না। সবকিছু কি তার অতীতের সাথে জড়িত।
কি সত্যি, কি মিথ্যে ইশায়া কিছুই আলাদা করতে পারে না।মাথার ভেতরটা ভারী হয়ে আসে,চাপ অসহ্য চাপ।
কারোর সাথে কোনো কথা না বলে ইশায়া সোজা নিজের রুমে চলে যায়।দরজা বন্ধ করে দেয়।বিছানায় বসে পড়ে মাথায় হাত চেপে ধরে।
অতিরিক্ত ভাবনায়
মনে হচ্ছে তার মাথার ভেতরে কেউ পেরেক ঠুকছে।
____এদিকে ভীর কাজের চাপে সে বুঝতেই পারেনি ইশায়া কতবার ফোন দিয়েছে। ফোনটা হাতে নিয়ে কল লিস্ট দেখে ।একটার পর একটা মিসড কল,হাসে সে।সেদিন সে নিজেই ইশায়াকে নতুন ফোন দিয়েছিলো।
আর ইশায়া তো ইশায়া-ই সে তো ভীর বাইরে থাকলে দুই মিনিট পরপর ফোন দেয়।
না ধরলে তো অভিমান, রাগ,কান্না এগুলো তো আর আছেই।
ইশায়ার এইসব পাগলামির কথা মনে হতেই ভীরের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে।
নিক ভীরকে হাসতে দেখে অবাক হয়।ভীরকে খুব কমই হাসতে দেখেছে সে।
ইশায়াকে নিক সহ্য করতে পারে না কিন্তু ভীরের খুশিতে সে খুশি।আর নিক এটা ভালোভাবেই বুঝে গেছে ইশায়ার মাঝেই ভীরের জীবনের শান্তি লুকিয়ে আছে।এখন আর সে ইশায়াকে নিয়ে মাথা ঘামায় না।
ভীর ইশায়ার নাম্বারে ফোন দেয়।রিং যায়…
কিন্তু বাজতে বাজতে বন্ধ হয়ে যায়।ভীর আবার ফোন দেয়।আবারও সেই একই ব্যাপার।এবার সত্যিই অবাক হয় সে।কারণ ইশায়াকে ফোন দেওয়ার সাথে সাথেই ইশায়া রিসিভ করে সবসময়।আজ করছে না কেন?
একটার পর একটা ভীর টানা ৮টা কল দেয়।
কিন্তু প্রতিবারই ফোন রিং হয়ে কেটে যায়।
ভীরের চোখে অস্বস্তি জমে।
সে ল্যাপটপ খুলে রুমের সিসিটিভি অন করে।
ইদানীং এগুলো আর তেমন চেক করা হয় না।
সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।
আগের মতো কিছুই নেই এই বিশ্বাসটাই ছিল।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ইশায়ার রুম।ইশায়া চুপচাপ শুয়ে আছে উপুড় হয়ে।
বেডসাইড টেবিলে ফোনটা রাখা।
উপুড় হয়ে শোওয়ায় ভীর ঠিক বুঝতে পারে না ইশায়া ঘুমাচ্ছে, না জেগে আছে।একটু তাকিয়ে থেকে ভাবে,
ঘুমাচ্ছে হয়তো।ভীর আর মাথা ঘামায় না।
সে আবার নিজের কাজে মন দেয়।
—সিন্ডিকেটের যারা বাকি ছিলো তাদের শেষ করে ভীর।পোর্ট আমাদের কন্ট্রোলে।
ডিয়েগো ফাইল এগিয়ে দেয়
___ব্যাংকিং চ্যানেল ক্লিন করতে হবে। মানি ফ্লো এখনো পুরোপুরি আমাদের না।
ভীর চোখ তুলে তাকায়।
___২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব আমার কন্ট্রোলে চাই।
নিক হালকা হেসে বলে,
___ একদিনে পুরো সিস্টেম।ভীর কিছু বলে না।
ফোনটা বারবার বাজছিল।
কিন্তু ইশায়ার সেদিকে কোনো ধ্যান নেই।
তার মন তখন অন্য এক জগতে আটকে গেছে স্বপ্নে আসা সেই জিনিসগুলো নিয়ে।কখনো কখনো তার অনেক কিছু মনে পড়ে।অচেনা ঘর, অচেনা স্পর্শ, অচেনা ভয়।কিন্তু কোনো কিছুরই বাস্তবিক ব্যাখ্যা নেই।কারণ বাস্তবতা তো তার চোখের সামনে,সবকিছু পানির মতো স্পষ্ট।এই জন্যই সে এতদিন এই সব অনুভূতিকে মনের ভুল বলে সরিয়ে রেখেছে।
নিজেকে বুঝিয়েছে এসব কেবল স্বপ্ন, কল্পনা, ভয়ের প্রতিফলন।কিন্তু এলিজার কথাগুলো সেই দেয়ালে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে।
ইশায়ার কানে বার বার বাজতে থাকে কথাগুলো, এগুলো আপনার অতীতের সাথে সম্পর্কিত।
আপনার চোখের সামনে যা দেখছেন সবকিছুই কি সত্যি? এই কথাগুলোর মানে কী?
যা সে দেখছে তা কি মিথ্যে?তার জীবনের কোন অংশটা সত্যি, আর কোনটা সাজানো?
ইশায়া চোখ বন্ধ করে নিজের স্বপ্নে দেখা প্রতিটা দৃশ্য মনে করার চেষ্টা করে। কিন্তু মুখগুলো ঝাপসা।
চেনা মনে হয়, আবার চেনা লাগে না।
ঘটনাগুলো টুকরো টুকরো কোথাও কোনো ধারাবাহিকতা নেই।ইশায়া যত ভাবতে থাকে, মাথার ভেতরটা তত ভারী হয়ে আসে।চাপ বাড়ে ব্যথা শুরু হয়।ইশায়া মাথা চেপে ধরে শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
বিছানার চাদর মুঠোয় ধরা।
শ্বাস ভারী শেষ পর্যন্ত উঠে ওয়াশরুমে যায়।
লম্বা একটা শাওয়ার নেয় ঘন্টা ধরে বসে থাকে পানির নিচে।পানির ধারায় যেন মাথার ভেতরের শব্দগুলো ধুয়ে ফেলতে চায়।কিন্তু কিছুই ধোয় না।শাওয়ার শেষে আবার এসে শুয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত ব্যথায় ছটফট করতে থাকে।
চোখ জ্বলে, মাথা ফেটে যাওয়ার মতো লাগে।একসময় ক্লান্তি আর যন্ত্রণা মিলেমিশে ইশায়াকে টেনে নিয়ে যায় অচেতনতার ভেতর। সে ঘুমিয়ে পড়ে।
এই নীরবতার ভেতরেই, অজান্তে ইশায়া আরও গভীরে ডুবে যায় নিজের অতীতের দিকে,যে সত্যিটা এখনো তার অজানা।
_____অনেকক্ষণ পরেও আর ফোন না আসায়,
এবার ভীরের একটু সন্দেহ হয়।সে আবার ও ফোন নেয়। এবারো রিং হতে হতে… কেটে যায়।
ভীরের মেজাজ খারাপ হতে থাকে।
এতক্ষণ ধরে ইশায়ার গলা শোনেনি সে।তার সাথে কোনো কথা হয়নি।এই নীরবতা এখন আর তার সহ্য হয় না।ভীরের সামনে ইশায়া সারাদিন বক বক করবে এইটাই তো তার শান্তি।এই জ্বালানোতেই সে স্বস্তি পায়।
ভীর ল্যাপটপ অন করে। সিসিটিভির ফুটেজ চালু হয়।
স্ক্রিনে দেখা যায় ইশায়া ঘুমিয়ে আছে।
তার জামা বদলানো। চুল ভেজা।
ভীর বুঝে সে শাওয়ার নিয়েছে।মানে, সে উঠেছিল।
তাহলে আমাকে কল ব্যাক কেন করল না?
ভীরের চোখ বেডসাইড টেবিলের দিকে যায়।
ফোনটা এখনো আগের জায়গায় পড়ে আছে।
তার কপালে ভাঁজ পড়ে।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ভীর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
মারিয়া এলেনাকে ফোন দেয়, সে জানায় সব কিছু-ই ঠিক আছে।কিন্তু এর পরেও ভীরের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে আছে।
ভীর আর দেরি করে না। সে তখনই নিককে ডেকে পাঠায়।নিকো আসলে তাকে বলে,
___মেক্সিকো ব্যাক করবো।
নিকো চমকে ওঠে।
___এত তাড়াতাড়ি? সে সঙ্গে সঙ্গে বাধা দেয়,
এখানে এখনো অনেক কাজ বাকি আছে।
ভীর ঠান্ডা গলায়৷ বলে,
___এগুলো যা আছে, ডিয়েগো দেখে নেবে।
তুমি যাওয়ার ব্যবস্থা করো। আর হ্যাঁ তুইও আমার সাথে যাবি।
ভীরের কথায় নিক আর কিছু বলে না।
সে ভীরকে ভালোভাবে চেনে।এই মুহূর্তে কথা বাড়ানো মানে আগুনে হাত দেওয়া।
__প্রাইভেট জেট প্রস্তুত করা হয়।কোস্টারিকার রানওয়েতে আলো ঝলমল করছে।
ইঞ্জিনের গভীর শব্দ বাতাস কাঁপিয়ে তোলে।ভীর জেটে ওঠে।নিক তার পাশে।কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা রওনা দেয়।কোস্টারিকা থেকে মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা পৌঁছাতে প্রায় চার ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
এই চার ঘণ্টায় ভীর এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করে নি।ল্যাপটপের স্ক্রিনে দৃষ্টি স্থির। জেট গুয়াদালাহারার সীমানায় ঢোকে।নিচে শহরের আলো জ্বলছে।জেট ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে।পাহাড় ঘেরা শহরটা ঘুমিয়ে আছে,কিন্তু ভীরের প্যালেস জেগে।
রানওয়েতে চাকা ছোঁয়। ইঞ্জিন থামে।ভীর এক মুহূর্তও দেরি না করে নামে।
গুয়াদালাহারার সেই পরিচিত প্রাসাদ আলোয় মোড়া, নিঃশব্দ, অথচ ভয়ংকর।আজ যেন একটু বেশি-ই ভয়ংকর।
____এলিজা ধীরে সাবধানে এক পাশে এসে দাঁড়ায়।
কণ্ঠ নামিয়ে, ঠোঁট নড়ার আগেই চারপাশ একবার স্ক্যান করে নেয় ক্যামেরার ব্লাইন্ড স্পট, সেন্সরের সীমা, আলো কম এমন জায়গা।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সাবধানের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,
___ম্যাপটা আমি বাইরে গার্ডেনে একটা ফুলের টবের নিচে রেখে এসেছি।
এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ তোলেনা সে।
ফুলের টবে তীর চিহ্ন আঁকা আছে। ওখানে পেয়ে যাবে।
খুব সাবধানে, সুযোগ বুঝে এটা সরিয়ে নিও। কোনো ভুল যেন না হয়।
এলিজা শেষ বাক্যটা বলে ফিসফিস করে। আর এটা পাওয়ার সাথে সাথেই ডন লুকার কাছে পৌঁছে দিও।
এরপর আর কোনো কথা বলেনা।কণ্ঠনালী নড়ে না। চোখে কোনো সংকেত নেই।এলিজা ধীরে এগিয়ে যায়।
করিডোরের এমন একটা জায়গায়, যেখানে আলো কম, ক্যামেরার ন্যাচারাল ব্লাইন্ড স্পট আছে।
সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়ায় হাতের সেলাই করা চামড়ার ভেতরে লুকানো ক্ষুদ্র চিপটা টের পায়।
খুবই চালাকের সহিত।অনেকদিনের পরিকল্পনার
শুধু একটাই সংকেত।সময় খুব কম।
আর এই সংকেতই আলভারেয এস্টেটের নিখুঁত নিরাপত্তার ভেতর দিয়ে নীরবে পৌঁছে যায় মাফিয়া জগতের আরেক দানব এর কাছে।
_____ভীর সোজা নিজের রুমের দিকে যায়।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই দেখে ইশায়া বসে আছে।
ইশায়া ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে গেছে।বিছানার ওপর চুপচাপ বসে আছে সে।
চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো শূন্যে আটকে আছে কোনো অনুভূতির ছাপ নেই মুখে।
অন্যদিন হলে ভীরের উপস্থিতি টের পেতেইছুটে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরে ইশায়া।কিন্তু আজ ভীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেওতার কোনো হেলদোল নেই।
এতটাই অন্যমনস্ক যে ভীর এসে দাঁড়িয়েছে এই দিকেই তার কোনো খেয় নেই।ভীরের রাগ উঠে,
এক মুহূর্ত দেরি না করে গটগট করে এগিয়ে যায় সে।
সাইড থেকে ফোনটা নিয়ে সজোরে দেয়ালে ছুড়ে মারে।
শব্দটা পুরো রুমে প্রতিধ্বনিত হয়।
ইশায়া চমকে ওঠে।ভীরের এমন আচরণে সে ঘাবড়ে যায়।সে আসলেই একটু অন্যমনস্কই ছিল।
হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এসে দ্রুত বলে ওঠে,
___কি হয়েছে? আপনি কখন এলেন?
ভীর দাঁত চেপে গর্জে ওঠে,
___ফোন দিলে যখন পাওয়া যায় না,তাহলে তোর এই বা*ল ব্যবহার করার দরকার নেই।
এক মুহূর্তে ইশায়ার মুখ চুপসে যায়।
চোখ নামিয়ে ধীরে বলে সে,
___দুঃখিত…
আসলে আমি খেয়াল করিনি।আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম।
কিন্তু ভীর থামে না।
আবারো চিৎকার করে ওঠে সে,
__ঘুম থেকে উঠে দেখলি না কেনো?তোর তো কোনো কাজ নেই আর।এর পরেও কেনো এতো অন্যমনস্ক তুই?
হ্যাঁ?কিসের চিন্তা তোর বল?তোর প্রয়োজনের আগে সব কিছু আমি তোর পায়ের কাছে এনে দেই। তাহলে
কিসের এতো ভাবনা তোর আমি ছাড়া? ভীর থামে না সে চিৎকার করতে থাকে।আর ইশায়া একেবারে চুপ।
কোনো জবাব নেই। কোনো প্রতিবাদ নেই।
ভীরের এতো রাগারাগিতে ইশায়ার চোখের কোণে জমে ওঠে পানি।নীরবে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা।
ভীর ইশায়ার চোখের কোনে পানি দেখে থেমে যায়।
আর কিছু বলে না। রাগ টা গিলে নেয় সে,
কারণ ইশায়ার চোখের পানি সে সহ্য করতে পারে না।
ভীর নিজেকে কন্ট্রোল করতে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।রুমটা আবার নিঃশব্দ হয়ে ওঠে।
___ভীরের যাওয়ার পর ইশায়া চুপচাপ উঠে নিচে নামে
ভীরের জন্য কফি বানাতে।কিচেনে ঢুকে নিজের হাতেই ভীরের জন্য ব্ল্যাক কফি বানাতে শুরু করে।
ঠিক তখনই এলিজা এগিয়ে আসে।এলিজাকে দেখেই ইশায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।সরাসরি বলে ওঠে,
___তখন তুমি আমাকে কি বলেছিলে, পরিষ্কার করে বলো।কি আমার অতীতের সাথে সম্পর্কিত?এমন কি আছে যা আমি জানিনা?
আমার চারপাশে সব কিছু মিথ্যা এর মানে কি?
এলিজা চারপাশে তাকিয়ে দেখে।তারপর নিচু স্বরে বলে,
___ম্যাম, আপনি এই বিষয়ে এখন কাউকে কিছু বলবেন না।আমি সুযোগ বুঝে আপনাকে সব কিছু জানাবো।আপনার-ই আস্তে আস্তে সব কিছু মনে পড়বে।
একটু থেমে, আরো কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে,
___শুধু একটাই কথা ম্যাম
আপনাকে নতুন কোন ঔষধ দিলে আপনি খাবেন না।
আপনাকে ওরা ঔষধ দিয়ে সবকিছু ভুলিয়ে রাখছে।
নাহলে আপনি সুস্থ মানুষ আপনাকে কেনো সবসময় ঔষধ দেয়?
ইশায়ার বুকটা কেঁপে ওঠে।সে আরো কিছু বলতে যাবে
তার আগেই এলিজা দ্রুত বলে ওঠে,
___ম্যাম, আপনি আমার উপর বিশ্বাস রাখেন।
আমি আপনাকে সব সত্যি খুলে বলবো।আপনি উপরে যান ম্যাম।বস রেগে যাবেন।
আর যদি কেউ এটা বুঝে যায়তাহলে সব শেষ।
আপনার আর এই সত্যিটা কখনো জানা হবে না।
সারা জীবন এই মিথ্যের মাঝেই বাঁচতে হবে।
আমারও বাঁচা হবে না।তাই আমাকে একটু সুযোগ দিন।আমি নিজেই আপনাকে সব কিছু জানাবো।
ইশায়া আর কিছু বলে না।উপর থেকে ভীরের ডাক ভেসে আসে।কাঁপা হাতে কফির কাপ তুলে নেয় ইশায়া, দ্রুত উপরের দিকে চলে যায়।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে এলিজা। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে।তার কাজ শেষ।ম্যাপ সে সরিয়ে দিয়েছে।
আর ইশায়ার মনে ও সন্দেহ ঢুকিয়ে দিয়েছে।
এখন যা হবার হবে।
এলিজা ফিসফিস করে বলে,
___রাজভীর আলভারেয…
তোকে তোর দুর্বলতা দিয়েই শেষ করবো আমি।
ইশায়াকে তোর বিরুদ্ধে এমনভাবে নিয়ে যাব,
যে ওই-ই তোর ধ্বংসের কারণ হবে।
____এদিকে ভীরের মেজাজ আজ এমনিতেই খারাপ।
শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে দেখে ইশায়া রুমে নেই।
এর মাঝে কফির কাপ হাতে রুমে ঢোকে ইশায়া।
ইশায়াকে রুমে ঢুকতে দেখেই ভীরের চোখ দুটো অগ্নিশিখার মতো জ্বলে ওঠে। রাগি গলায় সে বলে ওঠে,
___তোকে বলিনি আমি রুমে থাকা কালীন বাইরে যাবি না? আজকাল খুব বেশি করছিস না? কথা কানে যায় না তোর? ভালোভাবে বলি দেখে সহ্য হচ্ছে না তাই না?
ভীরের এই আচরণ ইশায়ার কাছে নতুন কিছু না। পান থেকে চুন খসলেই এই লোকটার ব্যবহার বদলে যায় এগুলো সে বহুদিন আগেই মেনে নিয়েছে। লোকটার সব কিছুই সে আপন করে নিয়েছে।
ইশায়া শান্ত পায়ে এগিয়ে এসে নরম গলায় বলে,
___আপনার জন্য কফি বানাতে গিয়েছিলাম।
ভীর রাগে জমাট বাঁধা দৃষ্টিতে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর কফির কাপ হাতে নেয়। উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয় ভীর সামনের ডিভানে গিয়ে বসে পড়ে।
ইশায়া আর কিছু না বলে চুপচাপ বিছানার এক কোণায় গিয়ে বসে। অথচ তার মাথার ভেতরে তখন ঝড়। কিছুতেই প্রশ্নগুলোকে সরাতে পারছে না সে। সত্যি তো সে একেবারেই সুস্থ একজন মানুষ, তার তো কোনো সমস্যা নেই। তাহলে কেন তাকে এত ওষুধ খেতে হয়? কেন এই নিয়ন্ত্রণ, এই অদৃশ্য শিকল?
এই সময় ভীর একটা জরুরি কল রিসিভ করে। ফোনে কথা বলতে বলতে তার চোখ বারবার ইশায়ার দিকে চলে যায়। হাতের ইশারায় ইশায়াকে ডাকলেও ইশায়ার সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই।
সে নিজের ভাবনার ভেতর ডুবে আছে।
ভীর ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ বলে ওঠে,
___ওয়েট।
তারপর ফোনটা কানের পাশ থেকে সরিয়ে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলে,
___ডাকছি দেখছো না? এদিকে এসো।
ভীরের হঠাৎ কথায় ইশায়ার ধ্যান ভেঙে যায়। চমকে উঠে দ্রুত পায়ে সে ভীরের দিকে এগিয়ে আসে।
ভীর আবার ফোনে কথা বলা শুরু করে। ইশায়া কাছে আসতেই সে চোখের ইশারায় বোঝায় কোলে বসতে।
ইশায়া কিছু বলে না, ভীরের কথামতো তার কোলেই বসে। সঙ্গে সঙ্গে ভীর এক হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়।
কিছুক্ষব কথা বলার মাঝেই ভীর বলে ওঠে,
___পরে কথা হবে এ নিয়ে।
এই কথা বলেই ফোন কেটে পাশে রেখে দেয়। তারপর দু’হাতে ইশায়াকে আগলে নিয়ে ঘাড়ে মুখ গুজে।
ভীর ইশায়ার ঘাড়ে মুখ গুজে ছোট ছোট চুমু খায়।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। ভীরের স্পর্শে ভালোবাসার চেয়ে ও অধিকার মিশে থাকে সবসময়।কিন্তু আজ ইশায়ার ভেতরটা অদ্ভুত ভারী। মাথার মাঝে অনেক কিছু ঘুরছে প্রশ্ন অস্বস্তি… সে নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারছে না। আর এই সময় এভাবে কাছে আসা ক ঠিক।
ভীর যখন ইশায়ার আরো কাছে আসে, তখন ইশায়া তাকে থামিয়ে দেয়। কণ্ঠে দ্বিধা, তবু স্পষ্ট করে বলে,
___আমার না ভালো লাগছেনা।আজকে না প্লিজ।
হঠাৎ এরকম কথায় ভীরের ভ্রু কুচকে আসে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। চোখে বিরক্তি,
___ওয়াট দ্যা **** ভালো লাগছেনা মানে কি?
ইশায়া আমতা আমতা করে বলতে নিয়েও থেমে যায়।কি বলবে,তার চোখ এড়িয়ে যায় ভীরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। গলা শুকিয়ে আসে।
__আসলে… আমার শরীরটা ভালো নেই।
ইশায়ার এমন কথায় ভীর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকে। তার চোখে সন্দেহের রেখা একধরনের হিসেবি ভাব। সে মনে করে হয়তো সত্যিই শরীর খারাপ।
ভীর আর কথা বাড়ায়নি। অন্য কিছু তার মাথায়ও আসেনি।
ভীর গভীর গলায় বলে,
___আচ্ছা, যাও। বিছানায় গিয়ে ঘুমাও। আমি আসছি একটু পর।
কথাগুলো বলার ভঙ্গিতে আদেশ আছে, তবু আগের মতো আগ্রাসন নেই। সে সাময়িকভাবে নিজের ইচ্ছেকে থামিয়ে রেখেছে।ইশায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার বুকের ভেতরটা এখনও কাঁপছে। সে জানে ভীর সবসময় যা চায়, তা পেতেই অভ্যস্ত। আজ সে না বলেছে।মিথ্যে বলেছে। এই না বলাটা কত বড় ঝড় ডেকে আনবে তা সে জানে না।
______এলিজার কথা অনুযায়ী আয়ুষ সুযোগ খুঁজছে কিভাবে ম্যাপটা সরাবে।তার চোখে এখন শুধু একটাই লক্ষ্য। ভুলের সুযোগ নেই। এই কাজ সফল হলে অনেক হিসেব বদলে যাবে।ঠিক মধ্যরাতে, যখন গার্ড বদল হয় প্যালেসের ভেতরের সবাই তখন গভীর ঘুমে মগ্ন।
রাতটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। দূরে ফোয়ারার পানি পড়ার শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। আকাশে আধো চাঁদ, তার আলো পাথরের দেয়ালে পড়ে এক ধরনের শীতল সাদা আভা তৈরি করেছে। চারদিকে সিসিটিভি, মোশন সেন্সর, সশস্ত্র পাহারা।
আয়ুষ আগে থেকেই সময় হিসেব করে রেখেছিল। গার্ড বদলের সময়টুকুই একমাত্র ফাঁক যখন পুরোনো টিম সরে যায় আর নতুন টিম পুরোপুরি অবস্থান নেয়নি।
কালো পোশাকে ঢাকা শরীর,গার্ডদের ড্রেস কোড।
ধীরে ধীরে সে গার্ডেনের দিকে আসে।বড় বড় মার্বেলের টব, বিদেশি গাছ, ছাঁটা ঘাস সবকিছুই নিখুঁত। কিন্তু তার চোখ খুঁজছে একটাই জিনিস।অনেক খুঁজে অবশেষে ঐ তীর চিহ্ন আঁকা টবটা খুঁজে বের করে।
মৃদু চাঁদের আলোয় চিহ্নটা স্পষ্ট।আয়ুষ চারপাশ দেখে নেয়। তারপর টবটা ধীরে ধীরে সরাতেই নিচে পেয়ে যায় ম্যাপটা।আয়ুষের মুখে ফুটে ওঠে শয়তানি হাসি।
অবশেষে এটা তার হাতে এসেছে।এখন এটা জায়গা মতো পৌঁছাতে পারলেই তার কাজ শেষ।
ঠিক তখনই একটা টব পরে যায়। এদিকে শব্দ শুনে একজন গার্ড এগিয়ে আসে।
আয়ুষ দ্রুত উঠে ম্যাপটা রাখবে ঠিক তখনই একজন গার্ড বলে ওঠে,
___এখানে কে?
আয়ুষ দ্রুত ম্যাপটা লুকিয়ে ফেলে কাপড়ের ভেতরে।
গার্ড এগিয়ে এসে টর্চের আলো ফেলে তার মুখের দিকে।
___এখানে কি করছো ? কি লুকালে তুমি?
পরিস্থিতি খারাপ বুঝে আয়ুষ এক সেকেন্ডও দেরি করে না।সাথে সাথে ওই গার্ডকে আক্রমণ করে ছু*ড়ি দিয়ে।ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
কিন্তু সেই শব্দেই আশপাশ থেকে আরো কয়েকজন গার্ড এখানে এসে পড়ে।
এরকম অবস্থা দেখে সবাই আয়ুষকে ধরতে যায়।
আয়ুষ মরিয়া হয়ে লড়াই করে। তার হাতে ভীরের দুইটা গার্ড মারা যায়।
কিন্তু বাকিরা মিলে শেষমেশ আয়ুষকে ধরে ফেলে।
চারদিক থেকে অস্ত্র তাক করা। হাত মুচড়ে পেছনে বাঁধা। হাঁটুতে লাথি মেরে তাকে মাটিতে ফেলা হয়।
খবরটা দ্রুত এনরিকোকে জানায় একটা গার্ড।
এনরিকো কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে এসে পৌঁছায়।
তার চোখ প্রথমেই পড়ে আয়ুষের ওপর রক্তাক্ত শরীরে বসা একজন।
তারপর আয়ুষ কে তল্লাশি করে ম্যাপটা বের করা হয়।
ম্যাপটা হাতে নিতেই এনরিকোর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।এই জিনিসটা এখানে কিভাবে আসলো?
সে আর দেরি না করে নিকোকে ফোন দেয়।
রাতের নিস্তব্ধতা ভারী হয়ে ওঠে।কারণ এখন বিষয়টা শুধু একজন অনুপ্রবেশকারীর নয়, এটা ভীরের সাম্রাজ্য ধ্বংস করার জন্য এসেছে। এটা একটা নিখুঁত পরিকল্পনা। কারন আলভারেজ প্যালেসের ম্যাপ বের করা এতো সহজ না।
___নিকো এসে এগুলো দেখে অবাক হয়ে যায়।
তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময়।
তার মাথার উপর দিয়ে যায় সব কিছু।তাদের প্যালেসে তাদের লোকের ছদ্মবেশে শত্রুপক্ষের কেউ ঢুকেছে আর সেটা তারা টেরও পায়নি কেউ।এই প্যালেসে যেখানে একটা পাখি ডানা ঝাপটালেও খবর পৌঁছে যায় সেখানে একজন অচেনা লোক ঢুকে ম্যাপ পর্যন্ত হাতে পেয়েছে!
আর বাইরের গার্ড তো প্যালেসের ভিতরে ঢোকার কথা না।তাহলে ম্যাপটা কিভাবে পেল?
নিকোর চোখ রক্তবর্ণ হয়ে ওঠে।নিক আয়ুষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়ুষের তখন হাত বাঁধা, মুখে রক্ত, তবু চোখে অদ্ভুত এক জেদ।
নিকো কোনো সময় নষ্ট করে না সে আয়ুষকে অনেক মারধোর করে জিজ্ঞেস করে
___কার লোক তুই?এখানে কিভাবে এসছিস?কে তোকে ঢুকিয়েছে?প্রতিটা প্রশ্নের সাথে ঘু*ষি, লা*থি, চ*ড় আঘাত করতে থাকে নিক একের পর এক।
মার্বেলের মেঝেতে রক্তের দাগ ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু আয়ুষের মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয় না।
নিকো দাঁড়িয়ে হাঁফাতে থাকে।বিষয়টা তার হাতে রাখার মতো নয়। এটা ভীরকে জানাতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত নেবে কি করবে।নিকো তখন ভীরকে ফোন দেয়,
এদিকে ভীর ইশায়াকে বুকে নিয়ে গভীর ঘুমে।তার এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে আছে ইশায়ার কোমরে।
রাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ ফোনের শব্দ হয়।
বারবার ফোনের শব্দে ভীরের ঘুম হালকা হয়ে আসে।
ভীর বিরক্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নেয়। আধো ঘুমে রিসিভ করতেইনিকোর কণ্ঠ ভেসে আসে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভীরের মুখের ভাব বদলে যায়।তার চোখের ঘুম মুহূর্তে উড়ে যায়,দ্রুত উঠে বসে।
সব শুনে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। চোখের মণি অস্বাভাবিক স্থির।
একটা শব্দও না বলে ভীর কল কেটে দেয়।তারপর ড্রয়ার খুলে ভেতর থেকে রি*ভলভার বের করে নেয়।
ধাতব অ*স্ত্রটা হাতে নিয়েই তার শরীরের ভেতরের হিংস্রতা যেন জেগে ওঠে।
এক মুহূর্তও দেরি না করে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে ভীর।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৪
ভীর রুম থেকে যেতেই ইশায়া ধীরে ধীরে উঠে বসে।
এতো রাতে হঠাৎ একটা ফোন আসার পর ভীর এভাবে রেগে বেরিয়ে গেলো কেনো?
কিছু বুঝতে না পেরে ইশায়া কম্ফোটার সরিয়ে বিছানা থেকে নেমে আসে।
