সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৭
তানিয়া হুসাইন
রুমের ভেতর সবাই ভীরের অপেক্ষায়।
এদিকে নিক গেইটের মেইন ফটকের প্রায় পঞ্চাশজন গার্ডকে সু*ট করেছে।সবাই এই মূহুর্তে ভয়ে তটস্থ।
কারো মুখে কথা নেই, চোখে শুধু আতঙ্ক।এই ভুলের মাশুল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সবাই তা জানে।
নিকো ওদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, কিন্তু কেউ-ই কোন উত্তর দিতে পারেনি।এনরিকো নিজে সব চেক করে।কোথা থেকে ঢুকেছে সে?কিন্তু কোন ক্লু পায় না।
এই মূহুর্তে তারা এটা বুঝে যে ওই ছেলে এখানে আজ আসে নি,সে আগে থেকেই এখানে গার্ডদের ছদ্মবেশে ছিল। তারমানে এটা অনেক দিনের পরিকল্পনা। তাদের লোকদের মধ্যেই মিশে আছে শত্রুপক্ষের লোক।
নিকো এটাই ভাবছে সে একা ছিল না, অন্য কেউ আছে তার সাথে।
কিন্তু সে ঢুকলো কিভাবে এটাই সবথেকে বড় প্রশ্ন। আইডি চেকের সময় ও চোখ এড়াল কীভাবে?
তাদেরই গার্ডদের সাথে মিশে গিয়েছিল আর তারাই খোঁজ পায়নি ।
ডিয়েগো এখন আবার নতুন করে সুরক্ষা বাড়ানোর কথা বলছে।মেইন গেইটে ডাবল লেয়ার সিকিউরিটি।প্রতিটা শিফটে গার্ড রোটেশন।ফেস রিকগনিশন স্ক্যান বাধ্যতামূলক।ইনার ও আউটার পেরিমিটারে আলাদা কমান্ড।কাউকে একা চলাফেরার অনুমতি নয়।ভেতরের লোকের উপরেও নজরদারি এই সব আলোচনাই চলছিলো। আয়ুষের বিষয়টাই নিয়ে সবাই একটু বিচলিত।
কিন্তু ভীর ছাড়া তারা নিজে কিছুই করতে পারবেনা।সবাই ভীরের অপেক্ষায় কিন্তু ঘন্টা পরিয়ে গেলেও ভীরের দেখা মেলে না।
___ভীর রুমে ঢুকতেই সবার কথা থেমে যায়।সে গিয়ে তার জন্য বরাদ্দকৃত চেয়ারে বসে।চেয়ারটা একটু পিছনে ঠেলে দেয় এই ছোট্ট শব্দটাই পুরো রুমে কেমন করে গেঁথে যায়।সবাই চুপ চারপাশের পরিবেশ ভারী, গম্ভীর।কেউ চোখ তুলতে সাহস পাচ্ছে না।
সবাই শুধু একটা কথাই ভাবছে ভীর কী করবে?
কাউকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতেও ভীর এক মুহূর্তও দেরি করবে না।ভীর এর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কতোটা চটে আছে।
ভীরকে কী জবাব দেবে এই প্রশ্নেই তাদের মাথা কাজ করছে না।কারণ এখানে ভুল উত্তর মানেই… শেষ।
রুমটা নিঃশ্বাসহীন হয়ে ওঠে।
ভীর চুপচাপ বসে আছে।আর এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
নীরবতার দেয়াল ভেঙে প্রথমে নিক বলে,
___হতে পারে… আমরা যখন মিশনে গিয়েছিলাম, ঠিক তখনই ও ভেতরে ঢুকেছে।
ভীর চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, চোখ আধখোলা, কণ্ঠ একেবারে ঠান্ডা,
___এত কড়া সিকিউরিটির পর এটা কীভাবে হয়?
কীভাবে আমার প্যালেসে ঢুকে?এত এত লোক কিসের জন্য?এত টাকা দিয়ে কাদের রেখেছি আমি।
প্রতিটা প্রশ্ন নিঃশব্দে আঘাত করে।রুমের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে যায়।
নিকো কোনো ব্যাখ্যা দেয় না। সরাসরি বলে,
___আমি শেষ করে দিয়েছি।সেখানে থাকা সবগুলো গার্ডকে।
ডিয়েগো ধীরে বলে,
___বস… আমার যতটুকু মনে হচ্ছে, ও মাতেওর লোক।
এনরিকো সঙ্গে সঙ্গে বলে
___দুঃখিত, বস।
আমরা সিকিউরিটি সিস্টেম আরও বাড়ানোর ব্যবস্থা করছি।বাইরে থাকা সবগুলো গার্ড সরিয়ে দেওয়া হবে।
ভীর তখন এক হাত দিয়ে কপালের পাশটা ধীরে ধীরে বুলাতে থাকে।এই ভঙ্গিটা যারা চেনে, তারা জানে ভীর গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছে।
___প্যালেসে ভেতরে না ঢুকে…ম্যাপ পাবে কীভাবে?
একটু থামে ভীর।তারপর তার কণ্ঠ আরও নিচু হয়,
আর বাইরের কোনো গার্ড তো ভেতরে ঢুকতেই পারবে না।বাইরের ভেতরের গার্ড আর তাদের পোষাক পুরোপুরি আলাদা। আর ভেতরে কোন পুরুষের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ।
এই কথাটায় সবাই একটু অবাক হয়।হ্যাঁ ম্যাপ প্যালেসের বাইরে গেলো কি করে রুমের সবাই সেটা বুঝতে পারে এর মানে একটাই ভেতরে কেউ আছে।যে তার সাথে জড়িত।
___এলিজা ওই ঘটনার পর সবার আড়ালে সরে যায়।
স্টাফদের ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দেয়,কারণ প্যালেসে এখন যে অবস্থা, তার ধরা পড়তে সময় লাগবে না।
দরজা ঠেস দিয়ে দাঁড়াতেই তার বুকের ভেতর জমে থাকা সবকিছু বেরিয়ে আসে।
এলিজা শাওয়ারটা পুরো জোরে ছেড়ে দেয়।
পানির তীব্র শব্দ যেন তার বুকফাটা কান্নাকে গিলে নেয়।
কেউ যেনো না শোনে… কেউ যেনো টের না পায় তার এই কান্না।ঠান্ডা পানি গড়িয়ে পড়ছে , কিন্তু তার ভেতরের আগুন নিভছে না।
আয়ুষের নিথর মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখে।
রক্তে ভেজা ঠোঁট, নিঃশ্বাসহীন শরীর শেষবারের মতো তাকানো সেই দৃষ্টি।এলিজার ভেতরটা ছিড়ে যাচ্ছে।ছেলেটা শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত নাম নেইনি শুধু মাত্র তাকে বাঁচানোর জন্য। এলিজার জন্য এসে এই মরণযুদ্ধে নেমেছিল, তার বদলা নেওয়ার জন্য।আজ তার জন্য-ই আয়ুষের এই করুণ পরিণতি এলিজার বুক ফাটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।
এলিজা নিজেকে সামলায় এখন ভেঙে পড়ার সময় না আয়ুষ তাকে একটা সুযোগ করে দিয়েছে নিজের জীবনের বিনিময়ে। তাকে এই কাজটা করতে হবে।
তার হাতে ওরা ম্যাপটা পেয়েছে।মানে ওরা এখন বুঝে গেছে ভেতরের কেউ তাকে সাহায্য করেছে।
ভেতরের কেউ ছাড়া তো আয়ুষ এই ম্যাপটা পাবে না।
ভীর এখন তাকে খুঁজে বের করতে পুরো প্যালেস উল্টে ফেলবে।সে জানে ভীর কেমন শিকার ধরতে নামলে সে সব কিছু ধ্বংস করে দেয়।এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এলিজা আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকায়।
চোখ লাল।ঠোঁট কাঁপছে।
ভীরের প্যালেসে শুধু সিসিটিভি না আছে RF সিগন্যাল স্ক্যানার, আর বায়োমেট্রিক ট্র্যাকিং সিস্টেম।
যেটা চিপ শরীরে থাকলে তার হার্টবিট, লোকেশন, এমনকি মাইক্রো টেম্পারেচারও ধরা পড়ে।
আজ যখন আয়ুষ ধরা পড়েছে, নিশ্চয়ই ডিয়েগো পুরো সিস্টেম ফুল-স্ক্যান করবে।হ্যাঁ করবেই।
একবার যদি চিপের অস্বাভাবিক সিগন্যাল ধরা পড়ে সে শেষ।এলিজা আর কিছু ভাবেনা,ছু*ড়ি টা বের করে,তারপর দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত করে,
চোখ বন্ধ করে।এক সেকেন্ড…দুই সেকেন্ড আর তারপর নিজের হাতের চামড়া কেটে
ভেতর থেকে বের করে ছোট্ট সেই ট্র্যাকিং চিপ।
রক্ত গড়িয়ে পড়ে সাদা টাইলসে।
কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই।চিপটা কমোডে ফেলে ফ্লাশ টেনে দেয়।পানির ঘূর্ণিতে মিলিয়ে যায় তার পরিচয়।
এলিজা জানে এখন আর তার বাঁচার সুযোগ নেই।এভাবেও বাচবে না সে আর,ভীর খুজে না পেলে প্রয়োজনে প্যালেসের সব গার্ড কে শেষ করে দিবে।
ধরা সে পড়বেই।কিন্তু তার আগে তাকে কাজটা শেষ করতেই হবে।এলিজার ভেতরের জেদ আরো দ্বিগুন বেরে যায়।প্রতিজ্ঞা করে নেয় সে ইশায়ার মাথায় এমন বিষ ঢুকাবে যাতে সে নিজেই ভীরকে শেষ করে।ভীরকে তার ভালোবাসাই শেষ করবে।বিশ্বাসেই হবে তার পতন।
এলিজা হাতের রক্ত মুছে।
কমোর থেকে একটা কাগজ আর কলম বের করে।
হাত কাঁপছে তার তবুও লিখতে শুরু করে।
এলিজা ধীরে ধীরে চিঠির পাতায় কলম চালাতে থাকে।লেখতে থাকে একটার পর একটা নির্মম সত্য, যা ভীর লুকিয়ে এসেছে ইশায়ার কাছ থেকে চারটা মাস।
যেই স্মৃতিগুলো মুছে দেওয়ার বিনিময়ে সে পেয়েছে ইশায়ার ভালোবাসা, তার জীবন তার শান্তি ইশায়া।
সেই নির্মম সত্যি গুলো একটা একটা করে লিখে যায় এলিজা।
ইশায়ার অতীত, ভীর কী কী করেছে তার সাথে,
আর সেই সত্যগুলোর ফাঁকে ফাঁকে সে বানিয়ে লেখে আরও কিছু কথা।
এমন মিথ্যা, যেগুলো শুনলে যে কোনো মেয়ের বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
এমন বিষ, যা ধীরে ধীরে ঢুকে রক্তে মিশে যায়।
তার উদ্দেশ্য একটাই ইশায়ার মন পুরোপুরি বিষিয়ে দেওয়া ভীরের প্রতি।
এলিজার মাথায় শুধু এই চিন্তাই ঘুরছে যেভাবেই হোক, এই চিঠিটা ইশায়ার কাছে পৌঁছাতেই হবে।
সব সত্যের মাঝে এই মিথ্যাগুলোও ইশায়া বিশ্বাস করে নেবে।কারণ বিশ্বাস ভাঙার জন্য শত মিথ্যার দরকার হয় না,একটা ঠিকঠাক বলা মিথ্যাই যথেষ্ট।
এমনিতেই ইশায়ার আস্তে আস্তে সবকিছু মনে আসছে।
ভাঙা স্মৃতিগুলো জোড়া লাগছে একে একে। আর যে ইনজেকশন তাকে ভুলের ঘোরে আটকে রেখেছিল তার মেয়াদ একেবারে শেষের পথে। এলিজা চিঠিটা লিখে শেষ করে,কলম থামে।তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে শয়তানি হাসি।চিঠিটা যত্ন করে রেখে দেয়। তারপর বের করে একটা ঔষধের কৌটা। কৌটাটার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলে আপন মানুষ হারানোর কষ্ট এবার তুমি বুঝবে, ভীর। তার চোখে তখন আর ভয় নেই।শুধু প্রতিশোধ।
____ভীরের কথায় ডিয়েগো, নিক সবাই গভীর ভাবনায় ডুবে যায়।রুমের ভেতরটা আবারো নিঃশব্দ হয়ে ওঠে,এটা ঝড়ের আগের স্থবিরতা।
ভীরের কণ্ঠস্বর বরাবরের মতো ঠান্ডা।
___সব সিকিউরিটি চেক করো।তার চোখ দুটো শক্ত হয়ে আসে। দৃষ্টি এক বিন্দুতে স্থির, কণ্ঠে কোনো আবেগ নেইএকটা ক্যামেরাও বাদ যাবে না।সব গার্ডের পরিচয়, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, বায়োমেট্রিক লগ সব।কে কখন ডিউটিতে ছিল, কার শিফট কে বদলেছে,কে কোন করিডোরে ঢুকেছে সব বের করো।
ডিয়েগোর দিকে তাকিয়ে ভীরের গলা আরও নিচু হয়ে যায়,
__RF স্ক্যান ফুল রেঞ্জে চালু করো।
প্রথমে তারা বাইরের সেক্টরটাই চেক করতে শুরু করে।
একটা একটা করে রিপোর্ট আসে, কিন্তু কিছুই ধরা পড়ে না।
ভীর আবারো বলে,
___পুরো প্যালেসের সিকিউরিটি চেঞ্জ করতে হবে।
শত্রুদের হাতে কিছু পৌঁছেছে কি না ডোন্ট নো।
বাট এরপরও সবকিছু বদলাতে হবে।গার্ড ডবল করে দাও।এই সব করতে করতেই সময় গড়িয়ে যেতে থাকে।
কিন্তু হাজার হাজার গার্ড, অগণিত ডাটা, এতো দ্রুত এতো কিছু সম্ভব না।
আর বাইরে কি লিক হয়েছে সেটার ও ধারনা নেই তাদের।যা করার দ্রুত করতে হবে।
তখন নিক হঠাৎ বলে ওঠে,
___প্যালেসে নতুন গার্ড নিয়োগ হয়েছিল গুয়াতেমালা রাজ্য দখলের পর।
এর আগে এমন কিছু হয়নি।
বাদবাকি সব আমাদের পুরনো গার্ড বহু বছর ধরে আছে।
তাই…এরপর যে গার্ডগুলো নিয়োগ করা হয়েছে,
তাদের সবাইকে জড়ো করো।নিকোর কথায় ডিয়েগো মাথা নেড়ে সায় দেয়।
ভীর কিছু বলে না।
সে চুপচাপ বসে থাকে।
কিন্তু এই নির্লিপ্ততা, এই নীরবতাই তার সম্মতি।
আর তার সম্মতি মানেই কাউন্টডাউন শুরু।
এক এক করে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ভীর তার চেয়ারে বসেই থাকে।পিঠ ঠেকানো, চোখ স্থির।নিক যায় না।
কিন্তু বাকিরা নিজেদের কাজে লেগে পড়ে।
___ডিয়েগো প্রথমে সিকিউরিটি কন্ট্রোল রুমে যায়।পুরো প্যালেসের ইন্টারকম সিস্টেমএনক্রিপ্টেড চ্যানেলে চালু করা হয়। সরাসরি ঘোষণা নয় শুধু নির্দিষ্ট আইডি কোডে মেসেজ পাঠানো হয়।
Batch Guatemala
এই কোডে চিহ্নিত সব নতুন গার্ডদের কাছে সিগন্যাল যায়।
কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে সেই জন্য ঘোষণা দেওয়া হয় রুটিন অডিট নামে।
বাইরে থেকে প্রথমে কাজ শুরু হয়।বাইরের সেক্টর লকডাউন করা হয়।
ইনার করিডোরগুলো সিল।
মুভমেন্ট রেস্ট্রিক্টেড।
নতুন গার্ডদের একজন একজন করে আনা হয়,একসাথে না।
প্রথমে বায়োমেট্রিক রি-স্ক্যান।তারপর ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচিং।
তারপর লাইভ পলিগ্রাফ প্রশ্ন।তাদের ফোন, কমিউনিকেশন ডিভাইস, ব্যক্তিগত অ*স্ত্র সব বাজেয়াপ্ত করা হয়।
RF স্ক্যান দিয়ে চেক করা হয় কোনো ট্র্যাকার বা হিডেন চিপ আছে কি না।
তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নিচের ইন্টারোগেশন হলে।এভাবেই চলছে কাজ একজন একজন করে যাচ্ছে।
সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর রুমে শুধু থাকে ভীর আর নিক।
নিক ধীরে বলে,
___ইশায়া কোথায়?
ভীর ঠান্ডা গলায় উত্তর দেয়,
__রুমে।
ওকে এখন একা রেখে এলে কেন?যদি কিছু করে ফেলে?
আগের ঘটনা ভুলে গেছো?
ভীরের মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।
___ঘুমের ঔষধ দিয়েছি।ঘুমে এখন আর উঠবে না।
নিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
__কিন্তু কেনো? তুমি ওকে সামলাতে পারতে।
পরবর্তীতে ওর মস্তিষ্কে যদি নেগেটিভ ধারণা তৈরি করে তখন কী করবে?
ওই সময়টা কিছু একটা করে বুঝিয়ে দিতে পারতে, ব্রো।তুমি তো ভালোই ম্যানিপুলেট করতে পারো তাহলে আজকে কী হলো?
ভীর সিগারেট বের করে।ধীরে আগুন ধরায়।
তারপর একটা লম্বা টান নিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলে,
___তখন মাথা ঠিক ছিল না।
খু*ন চড়ে ছিল।তখন কিছু বললে ও উল্টো পালটা কথা বলতো।তখন মেজাজ হারিয়ে ওকেই আঘাত করে বসতাম।তাই কথা বাড়াইনি।
একটু থামে চোখ আধখোলা তারপর আবার বলে,
__ওকে পরে এমনিতেই সামলে নেবো।আর মেডিসিন তো আছেই।
ভীরের কথায় নিক হালকা হেসে ওঠে।
___এদিকে বাইরে এত কিছু চলতে থাকায় এলিজার বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে ওঠে।চারপাশে গার্ডদের দৌড়ঝাঁপ, ফিসফিসে কথা, হঠাৎ হঠাৎ থেমে যাওয়া চলাফেরা সব মিলিয়ে অন্যরকম একটা পরিবেশ।
এলিজা বুঝে বাইরের ইনভেস্টিগেশন শেষ হলেই ভেতরের শুরু হবে।আর ভেতরের মানে
এটা ভাবনাতেই এলিজার শরীর কাঁপতে থাকে।
হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে আসে।ঘাড়ের পেছনে ঘাম জমে।
যে করেই হোক তাকে আগেএই চিঠিটা ইশায়ার কাছে পৌঁছাতেই হবে।সময় ফুরিয়ে আসছে।
আর যদি দেরি হয় তাহলে আর কোনো সুযোগ থাকবে না।এলিজা করিডোরের দেয়ালে হেলান দেয় এক মুহূর্ত।
চারপাশে তাকায় কেউ দেখছে কি না।প্রতিটা শব্দ এখন সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।প্রতিটা পায়ের আওয়াজে বুকটা ধক করে ওঠে।একদিকে ডিয়েগোর কাজ চলছে পূর্ণ গতিতে।স্ক্যান, রিপোর্ট, চেকলিস্ট সব একসাথে।
গার্ডরা একে অন্যের সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে।
কেউ কারও দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না।
চোখে চোখ পড়লেই যেন ভয় বেড়ে যাচ্ছে।
পুরো প্যালেস জুড়ে একটা অদ্ভুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।এটা এটা নিঃশব্দ মৃত্যুভয়,এলিজা সেই ভয়ের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে।শরীরে লুকানো চিঠি।আর ঔষুধের কৌটো।আর মনে শুধু একটাই নাম ইশায়া।
তার কাছে পৌঁছাতে পারলে হয়তো সব বদলাবে।
আর না পারলে… এই রহস্যের সাথে এলিজাও হারিয়ে যাবে।
____হাসাহাসি, আনন্দে ভরা সময়টা যেন মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায়।তার উপর বাড়ি থেকে আসা অনবরত ফোন, মেয়েটাএ ড্রাইভারকে তাড়া দেওয়া, দ্রুত চালান আংকেল লেইট হয়ে যাচ্ছে।
গাড়ির ভেতর তখনও দু’জনের কিশোরী হাসি লেগে আছে, কিন্তু অদৃশ্য এক আশঙ্কা কেমন ধীরে ধীরে বাতাস ভারী করে তুলছে।হঠাৎ কোথা থেকে যেন হালকা ধোঁয়া উঠতে শুরু করে,চোখ জ্বালিয়ে দেওয়া সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে একে একে অনেকগুলো গাড়ি এসে ঘিরে ফেলে তাদের।সে ওই মেয়েটাকে ঝাপটে ধরে দাঁড়িয়ে, তার বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন কানে বাজছে।চারপাশে ব*ন্দুক হাতে অনেক লোক।কালো পোশাক, মুখে অদ্ভুত কঠিন অভিব্যক্তি।
ঘুমের মধ্যেই ইশায়ার কপালে ঘাম জমতে থাকে।
সে ছটফট করতে থাকে।শ্বাস ছোট হয়ে আসে।
তারপর গু*লি চলেচিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, ধোঁয়ার গন্ধ, র*ক্ত।তাদের নিয়ে যাওয়া হয় অচেনা এক জায়গায়।
একটা রুম। সে একটা মেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, ওই মেয়েটা তাকে বুকে আগলে সামলাচ্ছে,সামনে অনেক লোক।
দু’জনের শরীর কাঁপছে, কিন্তু একজন অন্যজনকে সাহস জোগাচ্ছে তখনই দরজা ধাক্কা মেরে ঢোকে সেই লোকটা।ভী….র ভীর ঠান্ডা চোখ,সেই মুখ।
আরেকটা লোক
সে ওই মেয়েটাকে টেনে নিয়ে যায়।
ইশায়ার হাত ফসকে যায়। সে ধরে রাখতে পারেনা
চিৎকার করে ডাকলেও গলা যেন বেরোয় না।
তারপর…তারপর অনেকক্ষণ কেটে যায়।
সময় থেমে থাকে।
নাকি সময়ই তাকে শাস্তি দেয় সে বুঝতে পারে না।
এরপর কয়েকজন লোক সেই মেয়েটার মৃ*ত শরীর নিয়ে আসে,শরীর নিথর।চোখ বন্ধ।ঠোঁটের কোণে শুকনো র*ক্ত।মাথায় র*ক্ত
ঘুমের মধ্যেই ইশায়ার শরীর কেঁপে উঠছে বারবার।
গলা শুকিয়ে কাঠ।বুকের ভেতর কাঁটার মতো ব্যথা।
তারপর ওই মেয়েটাকে ঘিরে তার আর্তনাদ, কান্না, ছটফট নিজেকে আছড়ে ফেলা মেঝেতে, ওকে ফিরিয়ে … প্লিজ ফিরিয়ে দাও।
আরো অনেক কিছু অস্পষ্ট চিৎকার, ভারী বুটের শব্দ, লোহার দরজা বন্ধ হওয়ার বিকট আওয়াজ…
হঠাৎ ইশায়া হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে।
জোরে জোরে শ্বাস নেয়।সারা শরীর ঘামে ভেজা।হৃদস্পন্দন এত দ্রুত যেন বুক ফেটে বেরিয়ে আসবে।এরকম স্বপ্ন সে প্রায়ই দেখে।
কিন্তু কখনো কারো মুখ স্পষ্ট দেখেনি।আজ দেখেছে।একটা মুখ অত্যন্ত স্পষ্ট।আর তার মনে হচ্ছে এই চেহারাটা তার খুব পরিচিত।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৬
এই পরিচিতির অনুভূতিটাই তাকে আরো বেশি ভীত করে তোলে।ইশায়া মাথা চেপে ধরে বসে থাকে কিছু সময়।আঙুলগুলো কপালের দু’পাশে চেপে ধরে যেন স্মৃতিটাকে ঠেলে সরাতে চায়।
নিজের দিকে খেয়াল যেতে দেখে এখনো বাথরোব জড়ানো।এক এক করে মনে পড়ে ইশায়ার কাল রাতের ঘটনা।ভীরের করা কাজগুলো।শুকনো গাল মুহূর্তেই ভেজে ওঠে তার।চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।প্রথমে নিঃশব্দ, তারপর ফোঁপানি।
তারপর তা রূপ নেয় বুকফাটা আর্তনাদে।
