Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৭

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৭
তানিয়া হুসাইন

ইশায়ার চোখ দরজার দিকে যায়।কিন্তু তার মনের ভেতর যে ক্ষীণ আশাটা জন্মেছিল,
মুহূর্তেই সেটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।যখন দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে নিকো।নিকোকে দেখেই ভয়ে সিটিয়ে যায় ইশায়া।তার শরীর শক্ত হয়ে আসে।মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়ে যায় সেই বিষাক্ত অতীত।সাফাকে তার হাত থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য,
সেই অসহায় চিৎকার,
তার মাকে আ*গুনে পু*ড়িয়ে মারতে চাওয়ার সেই ভয়ংকর মুহূর্ত।সবকিছু আবার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে।
ভয়ের সাথে সাথে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তীব্র রাগ।
চোখে জমে ওঠে আগুনের ঝিলিক,কিন্তু সেই আগুন নিভে যেতে বাধ্য হয় বাস্তবতার চাপে।
ইশায়া কি নিয়ে প্রতিবাদ করবে?তার হাত শিকলে বাধা,এই চার দেয়ালের ভেতর সে সম্পূর্ণ অসহায়।চারপাশে সবকিছু শূন্য,কোনো অ*স্ত্র নেই,কোনো পথ নেই।আরও একটা কারণ তার ভয়কে আরও গভীর করে তোলে ভীর নেই।ভীর ছাড়া কে রক্ষা করবে তাকে।
ইশায়া নিজেকে শাসায় সে তার বিপদে তার জীবনের সব থেকে বড় শত্রুকেই মনে করছে।এই দুটোই সমান অপরাধী তার কাছে।

___নিকো ধীর পায়ে এগিয়ে আসে।।
এসে ঠিক ইশায়ার সামনে রাখা ডিভানে বসে পড়ে সে।
হালকা ঝুঁকে নির্বিকার, গম্ভীর চোখে তাকায় ইশায়ার দিকে।সে খুব সহজেই বুঝে
ইশায়ার চোখে মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি।ভয়,রাগ,অসহায়তা সবকিছু একসাথে মিশে আছে তার অভিব্যক্তিতে।
____কেন এরকম করলে?
শক্ত গলায় বলে নিকো। তুমি কি মনে করেছো, ভীরকে তুমি মারতে পারবে? আর ভীরকে মারলে তুমি বেঁচে যাবে এটা ভাবছো তুমি? মুক্তি পেয়ে যাবে? এতো বোকা তুমি ইশায়া।বলে হাসতে থাকে নিক।
এতোদিন এখানে থেকেও তুমি কিছুই বুঝে উঠতে পারোনি ইশায়া।
___ইশায়া কোন কথা বলেনা।
নিকোর চোখ দুটো অস্বাভাবিক ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা রাগ স্পষ্ট।
ভীরের কিছু হলে তুমি তো মরবেই… সাথে তোমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে ফেলবো আমি। পৃথিবীর বুকে অস্তিত্ব রাখবো না কারোর, বুঝেছো?
নিকোর উদ্দেশ্য ছিলো ইশায়াকে ভয় দেখানো।
কিন্তু ইশায়া তার চোখে ভয় আছে, কিন্তু সেই ভয়কে ঢেকে রেখেছে এক অদ্ভুত জেদ।সে মাথা তোলে,
চোখের পানি মুছে, তারপর শক্ত গলায় বলে,

__এসব বলে আর আমাকে ভয় দেখাতে পারবেনা। প্রয়োজনে ম*রে যাবো।
কিন্তু এই পাপকে মেনে নেব না। এই পাপকে, এই পাপের সাম্রাজ্যকে আমি ধ্বংস করবো।
তার কণ্ঠে কাঁপন থাকলেও কথাগুলো ছু*রির মতো ধারালো।
ইশায়ার কথা শুনে নিকোর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে।
তার ভেতরের পশুটা যেন হঠাৎ জেগে ওঠে।
এক মুহূর্তে তার হাত নিজের অজান্তেই রি*ভলবারের দিকে চলে যায়।তার মন চাচ্ছে এখনই ট্রিগারটা চেপে রি*ভলবারের প্রতিটা গুলি ইশায়ার পেটে চালান করে দিতে তারপর সব শেষ হয়ে যাবে।কিন্তু সে পারে না।
পারার পরও পারে না।
কারণ সে জানে ভীরের আদেশের বাইরে গিয়ে কিছু করা মানে নিজের মৃ*ত্যুকে নিজেই ডেকে আনা।আর ভীর সে নিজেই পাগল হয়ে যাবে।নিকো গভীর একটা শ্বাস নেয়।নিজেকে জোর করে থামায়।
তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়, আবার ছেড়ে দেয়।
কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ নীরব থাকে।তারপর সে মাথা একটু কাত করে, চোখ সরু করে ইশায়ার দিকে তাকায়।
তারপর ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে,

___তোমার ভীরের উপর এতো রাগ কেনো…?
ইশায়ার চোখ-মুখ হঠাৎ শক্ত হয়ে ওঠে।ভেতরে জমে থাকা সব ক্ষোভ বেরিয়ে আসে,
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
___রাগ! যে আমার জীবনটা নষ্ট করে ফেলেছে। আমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে ফেলেছে, তার জন্য রাগ না, ঘৃণা শুধু ঘৃণা আছে আমার মনে।
নিকো এক হাত তুলে নিজের কপালে আঙুল বুলিয়ে নেয়, সে ধৈর্য ধরে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছে।
তারপর কাটা কাটা গলায় বলে,
___ভীর কিভাবে? যা করার আমি করেছি। তোমার স্মৃতি শক্তি কি এতোটাই দুর্বল ইশায়া?কি দেখে বিয়ে করেছে ভীর তোমাকে।
নিক একটু ঝুঁকে আসে,
মনে নেই তোমার? ভীর তোমাকে এনেছিলো। ভীরের উদ্দেশ্য ছিলো একমাত্র তুমি।
তোমার বোনকে আমি এনেছিলাম, ভীর না।
ভীর বলেনি আমাকে আনতে। সে বলেছিলো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি যে আড়ালে ছিলো তাকে তুলে আনতে,সেটা ছিলে তুমি।
আমার নজরে পড়েছিলো তোমার বোন।বুঝেছো আমার নজরে।
তার গলায় কোনো অনুশোচনা নেই, বরং একটা অদ্ভুত নির্লিপ্ততা,

___ভীরের উদ্দেশ্য ছিলে শুধু তুমি, আর কিছুই নয়। সে কখনোই বাড়তি ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না।সে যেটা চায় তার নজর শুধু সেটায় সীমাবদ্ধ থাকে।
নিক একটু থামে, তারপর আরও নির্মম স্বরে বলে,
___তোমার বোনকে তোমার কাছ থেকে নিয়ে যাই আমি, আমার থেকে বাঁচতে সে নিজেকে শেষ করে দেয়।
ইশায়া নিজের মাথা চেপে ধরে।সে সহ্য করতে পারছেনা এগুলো।
নিক আবারো বলে,
___এখানে ভীরকে জড়ানোর মানে কি? আমি করেছি যা করার, আমার জন্য হয়েছে সব।তোমার বোন মরেছো আমার জন্য।ভীরের জন্য না।ভীরের উদ্দেশ্য খারাপ থাকলে সে কখনো তোমাকে বউয়ের মর্যাদা দিতো না।
এই কথাগুলো ইশায়ার কানে যেতেই তার ভেতরের আগুনটা যেন আরও দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।
পুরোনো ক্ষতগুলো আবার নতুন করে রক্ত ঝরাতে শুরু করে।
নিকো থামে না,
__তোমার ভাইয়ের ছেলেকে মারার ভয়ও আমি-ই দেখিয়েছিলাম, মনে আছে?তোমাদের কিচেনে আগুন ও আমার কথায় ধরানো হয়েছিলো।যা যা হয়েছে… সব কিছু আমি করিয়েছি। ভীর না।ভীর এগুলো।জানে ও না,
তার চোখ সরু হয়ে আসে,

___তাহলে তোমার রাগ, ক্ষোভ, ভীরের উপর কেনো?
তোমার যদি প্রতিশোধ নিতে হয় আমার উপর নাও,ভীরকে কেনো জড়াচ্ছো।
___ইশায়ার চোখ বেয়ে তখন নিরবধি পানি গড়িয়ে পড়ছে।তার বুকটা কাঁপছে, গলা ভেঙে যাচ্ছে,
ইশায়া কাপা কাপা গলায় বলে,
___আমার বাবাকে কেন মারা হলো? সে কি করেছে?
এই প্রশ্নে নিকোর কপালে ভাঁজ পড়ে।
___তোমার বাবাকে, মানে?
ইশায়া চিৎকার করে ওঠে, তার গলা কেঁপে ওঠে ব্যথায় আর ক্রোধে আমার বাবাকে মেরেছো তোমরা! কেন? কেন করলে এমন? সে কি করেছিলো?
নিকো এবার পুরোপুরি গম্ভীর হয়ে যায়।তার কণ্ঠে আর আগের সেই বিদ্রুপ নেই,
___কে বলেছে এ কথা? তোমার বাবাকে কিছুই করা হয়নি। সে ঠিক আছে।
ইশায়া মাথা নাড়ে, চোখে অবিশ্বাস স্পষ্ট,
___না… আমি জানি। সব কিছু জানি আমি।
নিকো একটা গভীর শ্বাস নেয়, নিজেকে সামলায়।
তারপর শান্ত গলায় বলে,

___ঠিক আছে,প্রমাণ দিলে বিশ্বাস করবে তো?
এই কথায় ইশায়া থেমে যায়।তার ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে ভয়, আশা, অবিশ্বাস সব একসাথে।
সে কিছু বলে না। শুধু চুপ করে থাকে।
নিকো এবার অনেকটা স্থির স্বরে বলে,
___ঠিক আছে,আমি তোমাকে তোমার পরিবারের লাইভ ফুটেজ দেখানোর ব্যবস্থা করছি।
এই কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো লাগে ইশায়ার ভেতরে।তার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়।নিক এভাবে বলছে,
মানে কি সে মিথ্যা বলছে না?এরা তো মিথ্যা বলে না, ফুটেজ দেখাবে নিজে থেকে বলছে তাহলে কি
তার বাবা বেঁচে আছে?ইশায়ার চোখ বেয়ে টুপটাপ করে পানি পড়ে।
তার ঠোঁট কাঁপে, গলায় অবিশ্বাস মিশে যায়,
___আমার বাবা,সত্যিই বেঁচে আছে?
নিকো এবার কাট কাট গলায় দৃঢ়ভাবে বলে,
___তোমার পরিবারের সবাই বেঁচে আছে, এবং একদম সুস্থ আছে।এর প্রমাণ একটু পর তুমি নিজের চোখেই দেখতে পারবে।
ইশায়া একটা লম্বা শ্বাস নেয়।তার বুকটা হালকা হয়ে আসে, আবার ভারীও লাগে।চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে,

___আলহামদুলিল্লাহ।তার চোখের পানি থামে না,
কিন্তু এই প্রথম এই কান্নার মধ্যে একটু আশার আলো মিশে যায়।সে শুকরিয়া আদায় করে।
ইশায়াকে তার ভাবনায় বীভর দেখে নিকো উঠে দাঁড়ায়।
তার ভেতরের চাপা রাগ, অস্বস্তি সবকিছু আবার মুখোশের আড়ালে ঢেকে ফেলে সে।
দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে থেমে যায়।
পেছনে না তাকিয়েই, ইশায়াকে উদ্দেশ্য করে আবার বলে,
___আমি জীবনে কখনো কাউকে কৈফিয়ত দেই নি, আজ দিলাম। তাও শুধু মাত্র ব্রো’র জন্য।
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা।ভীর যেদিন প্রথম তোমাকে দেখেছে, সেদিন-ই ঠিক করে নিয়েছিলো তোমাকে তার চাই।তার উদ্দেশ্য সবসময় তুমি-ই ছিলে।
ব্রো কখনো তোমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করে নি, করতে চায়ও নি।
নিকো মাথা ঘুরিয়ে ইশায়ার দিকে তাকায়।
তার চোখে এবার আগের মতো হিংস্রতা নেই বরং একটা চাপা সত্যের ভার।

___শুধু… তোমার বোনের উপর আমার নজর পড়েছিলো।
আর তার সাথে যেটা হয়েছে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আমার।এখানে ভীরের কোনো হাত নেই।
হ্যাঁ, ও তোমাকে আটকে রাখে… সবার নজরের আড়ালে।
এর পিছনে কারণ হলো ওর অতীত।অতীতের কিছু জিনিসের জন্য ও আজও ট্রমাটাইজড।এজন্যই সবসময়, শুরু থেকেই তোমাকে নজরে রাখে সে।
সব সময় গার্ড থাকে তোমার আশেপাশে।
অতীতে এমন কিছুর জন্য ও তার মাকে হারিয়েছে।
সে চায় না তোমার সাথে এরকম কিছু হোক।
এরকম কিছু হতে দিতে চায় না বলেই এরকম আচরণ করে।
নিকোর এই কথাগুলো ইশায়ার ভেতরে এক নতুন ঝড় তোলে।
সে অবাক কণ্ঠে বলে ওঠে,
___কি হয়েছে অতীতে? কি হয়েছিলো ওনার মায়ের?
নিকো কিছুক্ষণ চুপ থাকে।তারপর শান্ত গলায় বলে,
___এগুলো তোমার জানার প্রয়োজন নেই।
দরজার হাতলে হাত রেখে থামে সে।
___আর ফুটেজ, তুমি পেয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।
এরপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না,বেরিয়ে যায় নিকো।
কিন্তু ইশায়ার মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন,বুকে ধড়ফড় করছে অজানা এক অনুভূতি।

_____নিকোর কথামতো অপেক্ষা করতে থাকে ইশায়া।
সে তার বাবাকে দেখবে, তার বাবা বেঁচে আছে ইশায়ার মাথার ভেতর এই কথাগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে।
আশা আর আতঙ্ক একসাথে তার বুকের ভেতর ধাক্কা দিচ্ছে।সে শুধু অপেক্ষা করছে কখন সেই মুহূর্তটা আসবে।কখন সে নিজের চোখে সত্যিটা দেখবে,
এটা কি সত্যিই সত্যি।

রহমান ভিলা…
সায়মা রহমান আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না।
এভাবে দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ কোনো পরিবর্তন নেই, এটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না।
তাই তিনি এবার ঠিক করেন,এবার তাকেই করতে হবে যা করার। আদ্রিয়ানকে না জানিয়েই তিনি সব ব্যবস্থা শুরু করে দেন।কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন,
আদ্রিয়ানকে বললে সে আজ না কাল করবে,
দ্বিধায় থাকবে, পিছিয়ে যাবে বার বার সময় চাইবে।
কিন্তু এখন আর দেরি করার সময় নেই।একবার যখন মত দিয়েছে তাহলে আর পিছু হটার সুযোগ নেই।
সায়মা রহমান রাহির মতো মেয়েকে হারাতে চান না।
রাহি-ই একমাত্র ভরসা তার,
সে-ই তার ছেলেকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারবে।
তার কথা অনুযায়ী সব কিছুর ব্যবস্থা করা হয়।

ঘরোয়া আয়োজনেই এনগেজমেন্টের সব ব্যবস্থা করেন।বাড়ির ভেতর ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় বাড়তে লাগেপরিচিত আত্মীয়স্বজন, কাছের মানুষজন সবাই ব্যস্ত প্রস্তুতিতে।
কিন্তু এই সাধারণ ভিড়ের মাঝেই অদৃশ্যভাবে মিশে যায় নিকোর লোকেরা।
তারা আবারও ইশায়ার বাড়ির প্রতিটি কোণায় ছোট ছোট স্পাই ক্যামেরা বসিয়ে দেয়।
আবির আর জান্নাত মিলেই সব আয়োজন সামলাচ্ছে।
তাদের ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় নেই এই বাড়ির ভেতরে কতটা চাপা কষ্ট জমে আছে।
কিন্তু এইসব আয়োজনের মাঝেই আদনান রহমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন এক কোণে।তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।তার ছেলের এনগেজমেন্টের দিনটা সেই দিন,যেদিন তিনি হারিয়েছিলেন তার একমাত্র আদরের মেয়ে ইশায়াকে,আর সাফাকে তার বোনের একমাত্র মেয়ে।
মুহূর্তটা হঠাৎ করেই অতীত আর বর্তমানকে একসাথে জড়িয়ে ফেলে।
আদনান রহমান ধীরে ধীরে তার চশমাটা খুলেন।
কাঁপা হাতে চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু মুছে ফেলেন।চারপাশে এত মানুষ, এত আলো, এত আয়োজন তবুও তার ভেতরটা শুধু অন্ধকারে ভরে আছে। গভীর এক অন্ধকারে।
রাহির মা-বাবা, বোনেরা সবাই রাহিকে ঘিরে বসে আছে।
সাফার বাবা-মাকেও সবকিছু জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা আসেনি। আসার মতো শক্তি ছিল না তাদের।
এই দৃশ্য তারা কিভাবে দেখবে?যে জায়গাটায় তাদের মেয়ের সংসার হওয়ার কথা ছিল… সেখানে অন্য কাউকে দেখতে পারবেনা,তা সহ্য করা তাদের পক্ষে অসম্ভব।আদ্রিয়ানের পাশে অন্যকেউ সেটা মেনে নেওয়া টা ও সম্ভব না। তাই তারা আসেনি।

___খুব কাছের আত্মীয়দেরই শুধু জানানো হয়। সবকিছু সীমাবদ্ধ পরিসরে।আর সবচেয়ে বড় কথা সবকিছু করা হয়েছে আদ্রিয়ানের অগোচরেই।
সব আয়োজন শেষ হওয়ার পর, আবির নিজে গিয়ে অফিস থেকে জোর করে নিয়ে আসে আদ্রিয়ানকে।
ফেরার পর চারপাশের এই সাজসজ্জা, মানুষের উপস্থিতি সব দেখে অবাক হয়ে সে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আদ্রিয়ান কিছুই বলে না। একটা প্রশ্ন ও না।এদিকে রাহির অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো।ভয়ে তার বুক কাঁপছে।আদ্রিয়ান যদি রেগে যায়?যদি সব ছেড়ে চলে যায়?যদি তাকে অস্বীকার করে, বিয়ে করতে রাজি না হয়?এইসব চিন্তা একসাথে মাথার ভেতর ঝড় তুলছে।
প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিলো
কিন্তু রাহির সব ভয় ভুল প্রমাণ করে দেয় আদ্রিয়ান।
সে কিছু না বলে, কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা উপরে নিজের রুমে চলে যায়।রুমে ঢুকেই দেখে সব প্রস্তুত। জামা-কাপড় সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা। সব কিছু ঠিক করে রাখা হয়েছে তার জন্য।
আদ্রিয়ান চুপচাপ একটা টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।শাওয়ার নেয়,জল গড়িয়ে পড়ে শরীর বেয়ে কিন্তু তার ভেতরের অনুভূতিগুলো জমাটবাঁধা, অচল।

কোনো রাগ নেই, কোনো উচ্ছ্বাস নেই শুধু এক অদ্ভুত নিরবতা।
শাওয়ার শেষ করে রেখে যাওয়া জামা-কাপড় পরে নেয়।আয়নায় একবার নিজের দিকে তাকায়,তাচ্ছিল্যভাবে হাসে নিজের দিকে তাকিয়ে,তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
তারপর কোনো কথা না বলেই নিচে নেমে আসে।
নিচে তখন সবাই অপেক্ষা করছে তার জন্য অনেক আশা নিয়ে।
রাহির চোখ বারবার আদ্রিয়ানের দিকে যাচ্ছে,তার হৃদস্পন্দন যেন কানে শোনা যাচ্ছে।এতো দিনের স্বপ্ন আজ পূরন হবে বলে
আর তারপর সব নিয়ম-কানুন মেনে, সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ করে সম্পন্ন হয় এনগেজমেন্ট।
কিন্তু এই সম্পূর্ণতার ভেতরেও একটা অপূর্ণতা রয়ে যায় কারণ এখানে ভালোবাসার চেয়ে বেশি ছিল বাধ্যতা।আদ্রিয়ান বাধ্য হয়েছে মেনে নিতে।

____ইশায়া স্থির হয়ে বসে আছে, চোখ দুটো আটকে আছে স্ক্রিনে চলতে থাকা ফুটেজে।
তার চোখের সামনে সবকিছু একেবারে স্পষ্ট, জীবন্ত অথচ সে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
তার বাবা,তার মা,তার পুরো পরিবার সবাই সেখানে, তার সামনে।কইশায়া নিঃশব্দে দেখতে থাকে। বুক ভরে একটা দীর্ঘ শ্বাস নেয় সে যেন অনেকদিন পর প্রথমবারের মতো শ্বাস নিচ্ছে।তার বাবাকে সুস্থ দেখে তার ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে আসে।এতদিন ধরে বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনটা একটু হলেও কমে।একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে তার ভেতরে।সে শুধু তাকিয়েই আছে,কতদিন পর দেখছে তাদের,সময়ের হিসাব যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।হঠাৎ করেই একটা তীব্র রাগ এসে চেপে বসে তার ভেতরে সে কিভাবে তাদের ভুলে গিয়েছিল।
তার এতো সুন্দর ভরা পরিবারকে ভুলে সে এই জা*নোয়ারকে আপন মনে করেছে।
____ইশায়া যখন বুঝতে পারে ওখানে কি চলছে,তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।তার ছোটদা ভাই
আর রাহি একসাথে বসে আছে।দৃশ্যটা তার সহ্য হয় না।
মনে পড়ে যায় সেই দিনটাযেদিন সে আর সাফা পার্লার থেকে বের হয়েছিল।গাড়িতে উঠেছিল বাড়ির উদ্দেশ্যে।
সবকিছু স্বাভাবিক ছিল তখন।কিন্তু তাদের আর বাড়ি ফেরা হয়নি,সেই একটা দিন একটা ভুল সময়, একটা ভুল মুহূর্তসবকিছু বদলে দেয়।তার মনে হতে থাকে সেদিন যদি সব ঠিক থাকতো তাহলে আজকে রাহির জায়গায় সাফা থাকতো।কি থেকে কি হয়ে গেলো।
গলার ভেতরটা শুকিয়ে আসে তার, চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু।কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না।
নিজেকেই বোঝায় সে।আদ্রিয়ান ভাইয়ের বাকি জীবন কিভাবে কাটবে?সাফাপু তো আর কোনো দিনও ফিরে আসবে না।এই কঠিন সত্যগুলো ভেবেই নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে ইশায়া।ভেতরের ঝড়টা চেপে রাখে।

____এনগেজমেন্ট শেষ হওয়ার পর একে একে সবাই চলে যেতে থাকে।
কিছুক্ষণ আগেও যেখানে মানুষের কোলাহল,চাপা উত্তেজনায় ভরা ছিল সেই বাড়িটা অল্প সময়েই নীরব হয়ে যায়।আদ্রিয়ান তখনও কিছু বলেনি।পুরো সময়টাতেই সে ছিল অস্বাভাবিক শান্ত, কোনো আপত্তি করে নি।কিন্তু রাতে খাওয়ার সময় ডাইনিং টেবিলে সে বলে,
___তোমরা চেয়েছো এটা আমি তোমাদের কথা মতো করেছি।তারপর স্পষ্ট জানিয়ে দেয়,
কিন্তু এখন বিয়ে করবো না আমি।
সবাই যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল এই কথার জন্য।
তাই কেউ কিছু বলেনি।কেউ-ই তার ভেতরের ঝড়টার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায়নি।
__কিছু না বললেও সায়মা রহমান এখন একটু স্বস্তি অনুভব করছেন।এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে।এইটুকুই তার জন্য যথেষ্ট।বিয়ে এখন হোক বা পরে তাতে তার কোনো আপত্তি নেই এখন।অন্তত ছেলেটা তো রাজি আছে এই ভাবনাতেই তিনি নিজেকে শান্ত করেন।

___এরপর সময় গড়াতে থাকে নিজস্ব নিয়মে, নিজের গতিতে।দিনগুলো একটার পর একটা কেটে যায়।
ইশায়ার কাছে সময় এখন অন্যরকম।
সে এখন তার পরিবারের ফুটেজ দেখেই সময় কাটায়।
স্ক্রিনের ওপারে থাকা সেই পরিচিত মুখগুলো তার একমাত্র স্বস্তি।আগের থেকে একটু হলেও শান্ত হয়েছে সে।কিন্তু সেই শান্তির নিচে লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য অস্থিরতা।তার ভেতরটা সবসময়ই কেমন যেন অস্থির হয়ে থাকে।সেদিন রাতের পর থেকে ভীর আর ফিরে আসেনি প্যালেসে।ইশায়া জানে না সে কোথায়।জানে না সে কেমন আছে, কি করছে।তার কোনো খবর নেই।
ইশায়া কখনো জিজ্ঞেসও করে না,কিন্তু ভেতর ভেতর ছটফট করে।সে চায় না এমন হোক কিন্তু তবুও তার ভেতরটা পুড়ে যায়।একটা অজানা কষ্ট, অস্বস্তি তাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়।সে যতই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করুক কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারে না।
এই ঘড়টা এখন আরও ফাঁকা লাগে।নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
ইলারা আলভারেযও এখন আর আসে না তার কাছে।
আগে প্রায়ই আসতো, কথা বলতো, খোঁজ নিতো,অনেক গল্প করতো তার সাথে নিজের হাতে খাইয়ে ও দিতেন।
কিন্তু এখন।হয়তো ভীরকে আঘাত করেছিল ইশায়া…

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৬

সেই কারণেই আর আসে না। সে রেগে আছে,
হয়তো,এই দূরত্বটাই এখন তার শাস্তি।
সব মিলিয়ে ইশায়ার ভেতরের অস্থিরতাটা আরও গভীর, আরও অসহনীয় হয়ে ওঠছে দিনকে দিন।
তবুও ইশায়া কাউকে জিজ্ঞেস করে না একবারো ভীরের কথা,আর সে করবে ও না এই জেদ নিয়েই থাকে সে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৮