Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৯
তানিয়া হুসাইন

ইশায়ার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়ে।
বাকরুদ্ধ হয়ে যায় সে এই কথা শুনে।
কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পায় না, শুধু শ্বাসটা ভারী হয়ে আসে।
ইলারা আলভারেয ভারী কণ্ঠে বলতে শুরু করেন,
এটা দেখার পর রিক পুরো স্তব্ধ হয়ে যায়।যে মানুষটা এতটা নির্মম, এতটা শক্ত সে-ই মুহূর্তে পাথর হয়ে গিয়েছিলো।নাজিয়ার এই করুন পরিণতি মানতে পারেনি সে।অস্বীকার করতে চেয়েছিলো বাস্তবতাকে, কিন্তু বাস্তবতা তো কখনো পালিয়ে যায় না আর ভীর।
আমার সোনা বাচ্চা সে তো পুরো শেষ হয়ে যায়।
মা বলতে পাগল ছেলেটা শেষবার মাকে ধরে তার যে আহাজারি।সেই কান্না, সেই ডাক, সেই ভাঙা শব্দগুলো আজও যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়।কত কিছু বলছিলো সে, আঁকড়ে ধরেছিলো পুরোটা সময়।যেন ছেড়ে দিলেই সব শেষ হয়ে যাবে। ভীরের জন্যই নাজিয়াকে সিনালোয়ার প্যালেসের বাগানে মাটি দেওয়া হয়।যেন অন্তত মায়ের কাছাকাছি থাকায় একটা ভরসা পায় সে।

কিন্তু মা ছাড়া ছোট্ট ছেলেটার পৃথিবী পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।কথা গুলো বলতে বলতে চোখের পানি মুছেন ইলারা।
আমার ভীরটা সম্পূর্ণ একা হয়ে যায় এরপর।তার ছোট্ট জীবনে যে একটা মানুষকে ঘিরেই সে বেঁচে ছিল,হঠাৎ করেই সে দুনিয়াটা হারিয়ে ফেলে।মা ছাড়া সে একেবারে শূন্য হয়ে যায়।চারপাশে সব কিছু ছিল, প্রাসাদ ছিল, ক্ষমতা ছিল কিন্তু ছোট্ট ভীর তার পৃথিবীটা ছিল শুধু একজন মানুষ,তার মা! আর সেই মানুষটা আর নেই।
ভীরের হাতে একটা রিং দেখোনি?সবসময় পরে থাকে
ওটা তার মায়ের।ছোট্ট আঙুলে আঁকড়ে রাখা সেই রিংটাই তার শেষ আশ্রয়,শেষ স্মৃতি।
বাকি সব নিয়ে নেয় ক্যাটালিনা।
বলতে বলতে কণ্ঠ আটকে আসে তার।
ইশায়া ইলারা আলভারেয কে সামলায়, শান্তনা দেয়।
কিছুক্ষণ পর ইলারা আলভারেয এর কান্না থামে
ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নেন তিনি।
ইলারা আলভারেযকে শান্ত হতে দেখে ইশায়া জিজ্ঞেস করে,

___উনার সাথে এমন কে করেছে ক্যাটালিনা?
ইলারা আলভারেয একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন,
সেই দীর্ঘশ্বাসে জমে থাকা বহু বছরের ক্লান্তি, কষ্ট আর স্মৃতি।তারপর গম্ভীর গলায় বলেন,
___না…
নাজিয়ার মৃ*ত্যুর পিছে সরাসরি ক্যাটালিনার কোন হাত ছিলো না।কিন্তু ক্যাটালিনা চেয়েছিলো নাজিয়া চলে যাক।তাহলেই এই সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী হবে সে।
কারণ সে ছিলো একজন র*ক্ষীতা।আর নাজিয়া ছিলো রিকের ওয়াইফ,তার সন্তানের মা।
এই দুই অবস্থানের ফারাকই ছিলো তার লোভের আগুন।
তাই ক্যাটালিনা নাজিয়ার কান ভরতো রিকের বিরুদ্ধে।
ধীরে ধীরে বিষ ঢালে তার মনে।
সবসময় নাজিয়ার সামনে রিকের খারাপ দিকগুলোই তুলে ধরতো।বিশ্বাসের ভিতটা নরম হয়ে যায় একদিন নিজেই ভেঙে পড়ে।
আর একসময় ক্যাটালিনা নাজিয়াকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।যদি না নাজিয়া সেদিন প্যালেস থেকে বের হতো।তাহলে এরকম কিছুই হয় না।সম্ভবত আজও সবকিছু অন্যরকম হতো।

____রিক খোঁজ লাগায় অনেক।নিজের সব শক্তি, সব লোকবল, সব ক্ষমতা ব্যবহার করে সে পাগলের মতো খুঁজতে থাকে নাজিয়াকে কারা মে*রেছে।
____কে মেরেছিলো খোজ পাননি,জানতে চায় ইশায়া।
নাজিয়াকে মারে ভীরের বিরোধী পক্ষের এক মাফিয়া।তাদের হাতেই পড়ে যায় নাজিয়া,আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার শেষ অধ্যায়।
ক্যাটালিনার বিরুদ্ধে কোন প্রমান পায় নি রিক।যদি পেতো রিক ওকে কখনোই ছাড়তো না।কারণ সবকিছুর পরেও নাজিয়া ছিলো তার সন্তানের মা।
আর নাজিয়া যখন মারা যায় তখনও সে প্রেগন্যান্ট ছিলো।একটা নয়, দুটো প্রাণের সমাপ্তি হয়েছিলো সেদিন।
রিক অনেক ভেঙে পড়ে এই ঘটনার পর।তার ভেতরের শক্ত, নির্মম মানুষটাও কোথাও গিয়ে চূর্ণ হয়ে যায়।
সে তাদের খোঁজে বের করতে সব কিছু লাগিয়ে দেয়।
কিন্ত কিছুই পায়না। এভাবেই যেতে থাকে সময় কিন্তু ভীর অনেক অসুস্থ হয়ে যায় দিন দিন।
শুধু শরীর নয় তার ভেতরের ভাঙনটা ধীরে ধীরে তাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিলো।কিছুতেই ভীরকে সামলাতে পারেনি কেউ।ডাক্তার, ওষুধ, যত্ন সব কিছুই ছিলো,কিন্তু যে ক্ষতটা তার মনে তৈরি হয়েছিলো,
তার কোনো চিকিৎসা ছিলো না।রাতের পর রাত ঘুম ভেঙে গেলে উঠে মাকে খুঁজতো।তাকে কেউ সামলাতে পারতোনা।সারাটাক্ষন মা, মা করতো।
শেষমেশ হার মানতে বাধ্য হয় রিক।পরে রিক তাকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়…
এই নরক থেকে, এই স্মৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিতে
হয়তো ভেবেছিলো, দূরত্বই তাকে বাঁচাবে।কিন্তু মাকে হারিয়ে ভীর বাবার থেকে ও দূরে চলে যায়। দিন দিন যত সময় যেতে থাকে আরো বেপরোয়া আরো হিংস্র হয়ে উঠতে থাকে ভীর।তার সেই বাচ্চামো স্বভাব আবদার আনন্দ সব বদলে যায়।

___এদিকে নাজিয়ার খুনিদের খুঁজে বের করতে তার অনেক সময় লাগে রিকের।অনেকগুলো বছর…
বছরের পর বছর ধরে খোঁজ, অনুসন্ধান,
রক্ত, প্রতিশোধ আর অন্ধকারের ভেতর দিয়ে পথচলা।কিন্তু শেষ পর্যন্ত, খুঁজে সে বের করে।
আর তাদেরকে শেষ করতে গিয়ে আমার রিকও শেষ হয়ে যায়।
ইলারা আলভারেয এর গলা শক্ত হয়ে আসে,
প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করতে তার ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
প্রতিশোধ সে নিয়েছিলো,
কিন্তু সেই প্রতিশোধের আগুনেই পুড়ে গিয়েছিলো তার নিজের অস্তিত্ব।
ততদিনে আমার ভীর বড় হয়।ছোট্ট, ভাঙা সেই ছেলেটা আর আগের মতো নেই তার চোখে তখন আর কান্না নেই,।আছে শুধু আগুন।
সে তার বাবা-মায়ের বদলা নেয়।এক এক করে, হিসেব মেটায় যারা তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছিলো, তাদের কাউকেই ছাড়েনি সে।
আবারো সিনালোয়া নিজের দখলে আনে।রক্ত আর ক্ষমতার খেলায় ফিরে পায় নিজের জায়গা।
তারপর।গুয়াদালাহারা, একটার পর একটা অঞ্চল তার নিয়ন্ত্রণে আসে।
আর ধীরে ধীরে পুরো মেক্সিকোর বাদশাহ হয়ে ওঠে সে।
একটা নাম, একটা ভয় যার উচ্চারণেই কেঁপে ওঠে অন্ধকার জগত।একে একে ছড়িয়ে পড়ে তার সাম্রাজ্য।সীমান্ত পেরিয়ে, শহর পেরিয়ে তার ছায়া ছড়িয়ে যায় সবখানে।সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে সে।
হাপিয়ে ওঠেন ইলারা ভয়ংকর সেই অতীতের কথা বলতে বলতে।
ইলারা আলভারেয ইশায়ার দু’হাত নিজের হাতে তুলে নেন, তার আঙুলগুলো কাঁপছে যেন বহু বছরের জমে থাকা ভয় আর অসহায়তা সেই স্পর্শে প্রকাশ পাচ্ছে।
নরম ভাঙা গলায় তিনি বলেন,

___আমার ভীর অনেক কষ্ট পেয়েছে জীবনে।একদিনে হয়নি ও এমন।তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।আমার মুখের কথায় এগুলো বুঝানো যাবে না।
___আমি শুধু এতটুকুই বলবো তোমাকে আমার ভীরকে মেনে নাও। ওকে একটু আগলে রেখো, তার কণ্ঠে অনুরোধ আমার শেষ ভরসা তুমি।
ওর জীবনে ভালোবাসার খুব অভাব,ভালোবাসার কাঙাল ছিলো ভীর। যানো ভীর তার মায়ের শাড়ি নিয়ে ঘুমাতো রাতে।মায়ের গন্ধ টা পাওয়ার জন্য।এই কষ্টগুলোই ভীরকে এমন বানিয়েছে।
কথা গুলো শুনে ইশায়ার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আসে।
রাজভীর আলভারেয এই শক্ত, ভয়ংকর নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ছোট্ট শিশুর গল্প।বাবার থেকে দূরে থাকলেও, সে তার বাবাকে ও খুব ভালোবাসতো। বাবার ভালোবাসা যা সে কখনো ঠিকমতো পায়নি,।তবুও নিজের মতো করে আঁকড়ে রেখেছিলো।
রিক ছেলেকে না বোঝালেও তার সব কিছু ছেলের নামে দিয়ে যায়।এজন্য-ই তো ক্যাটালিনা এখনো এখানে পড়ে আছে। ইলারা আলভারেয এর কন্ঠে একটা ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের ভেতর থেকে।

__আমি হয়তো থাকবো না, ইশায়া।শেষ সময়ে এসে যেন আমি আমার ভীরকে একটু খুশি দেখে যেতে পারি। আমার এই কথাটা তুমি রেখো।
ইশায়া কিছু বলেনা চুপচাপ শুনে যায় ইলারা’র কথা।
তার চোখে নীরবতা,মনে অজস্র অনুভূতির ঢেউ কিন্তু ঠোঁট বন্ধ, কিছু কিছু মুহূর্তে কথা বলার থেকে নীরব থাকা ভালো।
ইশায়াকে চুপ থাকতে দেখে ইলারা আর কিছু বলে না।চলে যান রুম থেকে।
___নাজিয়ার জন্য তার ভেতরে একটা অজানা কষ্ট জমে ওঠে।খারাপ লাগছে তার খুব।ভীরের কথা গুলো মনে হতেই চোখের কোনে পানি জমে ইশায়ার,কিন্তু তা গড়িয়ে পরবার আগেই মুছে ফেলে ইশায়া।
ভীরের প্রতি কোনো অনুভূতি সে নিজের মনে আর আনতে চায়না। ভীরের ছোটবেলার কথা বাদ দিলেও ইশায়ার কাছে ভীরকে অনেকটা তার বাবার মতোই মনে হয়।যেমন ছিলেন তার বাবা, ভীরও ঠিক তেমনই এক প্রতিচ্ছবি একই স্বভাব।

____ এদিকে ভীরের রাগে দিশেহারা অবস্থা। তার চোখের সামনে থেকে তার শিকারকে শেষ করে দিয়ে গেল।এটা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না।তার সামনে এসব হলো আর সে কিছুই করতে পারলোনা। চারপাশে আগুন জ্বলছে।ভীর পুরো আস্তানা পুড়িয়ে দিয়েছে।কিন্তু সেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে তার ভেতরে। রাগে, অপমানে, ক্ষোভে ভীর দিশেহারা হয়ে উঠেছে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে তার সব লোককে নামিয়ে দেয়। নির্দেশ স্পষ্ট ওদের খুঁজে বের করো, যেভাবেই হোক ধরে নিয়ে আসো। শহরের প্রতিটা কোণা, প্রতিটা ছায়া, প্রতিটা গলি সবখানে তার লোক ছড়িয়ে পড়ে।
ভীর দাঁত চেপে বলে ওঠে,
___তোকে আমি ছাড়বো না, মোটেও না। পাতাল খুঁড়ে হলেও তোকে বের করবো। এভাবে কয়দিন লুকিয়ে থাকবি? সামনে তো আসতেই হবে। আর তোদের সাথে আর কে কে জড়িত আছে সেটা বের করতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
___কিন্তু বাকিরা এমন আক্রমণে সবাই ভয় পেয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এটা তারা বুঝতে পারছে। ভীরের এই অবস্থায় এখানে থাকা ঠিক হবে না, এই ভাবনাটাই ঘুরপাক খেতে থাকে সবার মনে।
রোসাস নিচু স্বরে বলে,
___নিক স্যারকে জানানো দরকার।
কিন্তু রাফা সাথে সাথে না করে দেয়। তার ভয় এতে ভীর আরও রেগে যাবে।এমনিতেই রেগে এখন তাকে আরও উসকে দেওয়া মানে আগুনে ঘি ঢালা।
তবুও রোসাস থামে না। তার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা।
___বসের এখানে এখন এভাবে থাকা ঠিক হবে না।
তারা কেউই বসকে সরাসরি কিছু বলতে পারবে না এই সীমাবদ্ধতা তাদের আটকে রাখে। তাই শেষ পর্যন্ত রোসাস নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়।
আর কোনো উপায় না পেয়ে সে ফোনটা হাতে তুলে নেয়।নিকের নাম্বার ডায়াল করে।
___কল কানেক্ট হতেই এক নিঃশ্বাসে মিশনের সবটা খুলে বলে রোসাস কীভাবে কি হয়েছে।
তার কণ্ঠ আরও নিচে নেমে আসে যখন সে বলে,
নাম নেওয়ার সময় যাতে কেউ সত্যটা জানতে না পারে, সেই কারণেই তারা নিজেদের দলের একজনকেই মেরে ফেলে দিয়েছে।
কথাগুলো শেষ হতে না হতেই নিকের শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে যায়। চোখের সামনে যেন এক মুহূর্তে ভেসে ওঠে অন্য এক সম্ভাবনা।যদি ওই গুলিটা সেই লোকটার দিকে না গিয়ে ভীরের দিকে যেত তাহলে কী হতো?
এই চিন্তাটাই তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়।
নিক আর নিজেকে সামলাতে পারে না। রাগে তার চোখ লাল হয়ে ওঠে। গার্ডদের চিৎকার করে ওঠে,

___তোরা কি করছিস? কিভাবে এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল? তোরা কেন ওই লোকদের ধরতে পারলি না? যদি গুলিটা ভীরের লাগতো তাহলে কী হতো, একবার ভেবেছিস?তার গলার প্রতিটা শব্দে আগুন ঝরে। চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।ওপাশে রোসাস একেবারে চুপ। তার বলার মতো আর কিছুই নেই।
নিকের মাথা রাগে ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা। এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সে ফোনটা কেটে দেয়। তারপর দ্রুত ভীরকে ফোন লাগায়।
একবার… দুইবার… রিং হয়, কিন্তু ভীর ফোন ধরে না।
নিক আবার ফোন করে। এদিকে ভীর একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। হাতে গ্লাস ড্রিং*ক করছে সে। তার চোখে দূরের এক অন্ধকার চিন্তার ছায়া কিছু একটা ভাবছে সে।
হঠাৎ ফোনের শব্দে বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে যায়।
তবুও স্ক্রিনে নিকের নাম দেখে কলটা রিসিভ করে।
ফোন ধরতেই নিকের কণ্ঠ ভেসে আসে

__তুমি এক্ষুনি গুয়াদালাহারা ব্যাক করবে, ব্রো। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না।
ভীর শান্ত গলায় বলে,
___সম্ভব না… আমার এখানে কাজ আছে।
নিক মানে না। সে আগেই ঠিক করে রেখেছে, আজ আর ছাড় দেবে না।সে তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে,
__যা কাজ আছে, আমরা সামলে নিবো। ওখানে তুমি থাকবে না, ব্রো। তুমি প্যালেসে ব্যাক করো, আমি আসছি এখানে।
নিকোর কথায় তার কোন পরিবর্তন দেখা দেয় না, ভীর স্বভাবসুলভ ঠান্ডা গলায় বলে,
___আমি তোমাকে যেটা বলেছি, সেটা করো।
এই এক বাক্যই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়।নিক রেগে যায়,তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে,
___কার থেকে পালাচ্ছো, ব্রো?
তুমি তার মধ্যে এমন কী পেয়েছো? যে দিন দিন নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলছো। নিজেকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এনে দাঁড় করাচ্ছো তুমি।
কথাগুলো ছুরি হয়ে আঘাত করে ভীরের মস্তিষ্কে,
ভীর কিছু বলে না। একদম চুপ হয়ে যায়।
মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খায়,

__সত্যিই কি পেয়েছে সে?
ওপাশে নিক অবিরত বলে যাচ্ছে, কিন্তু ভীরের আর সেদিকে কোনো ধ্যান নেই। তার চিন্তা অন্য কোথাও আটকে গেছে।
নিক আবারো বলে ওঠে,
___তুমি আসবেনা, ব্রো…?
একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে দুজনের মাঝখানে।
ভীর গম্ভীর গলায় উচ্চারন করে।তার কন্ঠে ক্রোধ স্পষ্ট।
___নিক।
শুধু এই একটি শব্দেই নিক থেমে যায়।আর কিছু বলার সাহস পায়না। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়।
ভীর শক্ত গলায় বলে,
__ওদিকের সব কিছু খেয়াল রাখিস। ক্যাটালিনার দিকে স্পেশালি… কিছু রং মনে হলে সাথে সাথে আমাকে জানাবি।কথাগুলো বলেই আর এক সেকেন্ড সময় নেয় না সে।কল কেটে দেয়।
ওপাশে নিক স্থির হয়ে থাকে, আর এপাশে ভীর
নিজের তৈরি অন্ধকারেই ডুবে যায়।
ফোনটা কেটে যেতেই নিক নিজের ভেতরের রাগ ধরে রাখতে পারেনা। সে নিজের চুল শক্ত করে খামছে ধরে।রাগ, হতাশা আর ভয় মিশে তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।ভীরের এইসব কাজ তার একদমই পছন্দ না। অকারণ ঝুঁকি নেওয়া, একা সবকিছু সামলাতে চাওয়া,
সবই তাকে ভিতর থেকে অস্থির করে তোলে।

কিন্তু এভাবে বসে থাকলে চলবে না, তাকে কিছু একটা করতেই হবে।এভাবে ভীরকে বিপদের মুখে ফেলে সে কখনোই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবে না।
ওদের আসল টার্গেট ভীর। আর ওরা জানে ভীর কোথায় আছে।
না না কিছু হবেনা আমি এমন কিছু হতে দিবো না।
এই নিক বেঁচে থাকতে, কিছুতেই ভীরের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।নিক ডিভানে বসে মাথা এলিয়ে দেয়,ধীরে ধীরে সে চুপ হয়ে যায়। চোখ দুটো বন্ধ করে রাখে কিছুক্ষণ,গভীর চিন্তায় ডুবে যায় সে। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু তার ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে কিছু একটা ভাবছে সে।
কিছুক্ষণ পর চোখ খোলে।
তার দৃষ্টিতে তখন আর আগের সেই অস্থিরতা নেই বরং আছে এক অদ্ভুত স্থিরতা।ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক বাঁকা রহস্যময় হাসি।
মনে মনে বলে ওঠে,
___ওকে, ব্রো… ভালোভাবে শুনলে না, তাই না? এখন যা হবে তাতে আমার কোন দোষ নেই।
এবার দেখো, আমি কী করি।তার চোখে একটাই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট ফিরতে তো ভীরকে হবেই যেভাবেই হোক।

____ম্যাটিয়াস সবার চোখের আড়ালে প্যালেসের সীমানা পেরিয়ে আরও একটু দূরে আসে একটা নির্জন, গোপন জায়গায়। চারপাশে একবার ভালো করে তাকায়, কেউ আছে কি না নিশ্চিত হয়। তারপর লুকিয়ে রাখা ফোনটা বের করে।
তার আঙুলগুলো কাঁপছিল, তবুও দেরি করে না,দ্রুত লুকাকে ফোন লাগায়।
দুইবার রিং বাজতেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হয়।
ম্যাটিয়াস হন্তদন্ত হয়ে বলে ওঠে,
___কি খবর ওদিকের? ভীর নাকি ঘাঁটি আক্রমণ করেছে?ওপাশে লুকার গলা ঠান্ডা, কিন্তু তাতে চাপা রাগ স্পষ্ট,
__তুমি আমাদের আগে জানাওনি কেন ভীরের অবস্থান সম্পর্কে?
ম্যাটিয়াস থেমে যায় এক মুহূর্ত। তার গলা কেঁপে ওঠে
ভীর কোথায় গেছে, কেউ জানত না নিকও না।
তার কণ্ঠে ভয়ের ছাপ লুকোনো যাচ্ছিল না।
লুকা একটু নরম হয়ে বলে,
___ভয় পেও না… তোমার নাম সামনে আসেনি।
এই কথাটা শুনতেই ম্যাটিয়াস যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরের চাপটা কিছুটা হলেও কমে আসে।
তবুও সে থামে না। দ্বিধা নিয়েই বলে,
__বিয়ানকিকে মেরেছে, ঠিক আছে… কিন্তু এই সুযোগে ভীরকে শেষ করল না কেন? এতো বড় সুযোগ ছিল।
ম্যাটিয়াসের কথা শেষ হতেই ওপাশে হালকা নড়াচড়া শোনা যায়। তারপর ফোনটা লুকার হাত থেকে নিয়ে নেয় মাতেও।
তার কণ্ঠ শক্ত, কড়া,
___এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি এসেছো রাজভীরকে শেষ করতে? রাজভীর একা নাকি এই খেলায়?
ম্যাটিয়াস চুপ হয়ে যায়।মাতেও থামে না
বিয়ানকিকে টার্গেট করে, কপাল ভালো থাকায় ওরা ফিরতে পেরেছে। যদি ধরা পড়ত, সব খেলা সেখানেই শেষ হয়ে যেত।আর যদি বিয়ানকিকে শেষ করার আগেই নাম বলে দিত?
তখন ভীর থেকেও আমাদের জন্য বেশি বিপদজনক হয়ে উঠত বিয়ানকি।
__তোমার নাম সামনে চলে আসলে সব প্ল্যান শেষ।
প্রথমে ভীরকে টার্গেট করলে বিয়ানকিকে শেষ করা যেত না। তার আগেই বাকিরা ধরে ফেলত ওদের।
আর ধরলেও তোমার নাম সামনে আসত।ম্যাটিয়াস নিঃশব্দে সব শুনতে থাকে।
ভীরকে শেষ করলেই কি সব শেষ হয়ে যাবে?
সবচেয়ে বড় গুটি হলো নিক। ওকে শেষ করতে হবে। ডিয়েগো আছে… আরো অনেকে আছে।এরা একজন আরেকজনের চেয়ে বেশি ডেঞ্জারাস।তাই এই সময় এটাই ঠিক ছিল।
ম্যাটিয়াস ধীরে মাথা নাড়ে,
ভীর নিক দুটোকে একসাথেই শেষ করতে হবে।
নাহলে একজনকে শেষ করলে পরের জন আরো ভয়ংকর হয়ে উঠবে।

_____নিকোর রুমে দাঁড়িয়ে আছে মারিয়া এলেনা আর রানিয়া।দু’জনের মুখেই অস্বস্তির ছাপ।
মারিয়া এলেনা ভয়ে কাঁপছে। নিকোর বলা কথাগুলো তার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে, তাকে পুরোপুরি নাজেহাল করে ফেলেছে।এটা করলে তার মৃ*ত্যু নিশ্চিত সে ভালো করেই জানে। ভীর তাকে ছাড়বেনা। আর নিকের কথা না মানলে সেও তাদের ছাড়বেনা।কি করবে সে এখন।
মারিয়া এলেনা সাহস জোগাড় করে কাঁপা গলায় বলে উঠে,
___আমি এটা করতে পারব না, স্যার।
বস আমাকে শেষ করে ফেলবেন।
নিক রাগে শক্ত করে উত্তর দেয়,
___কিচ্ছু হবে না। আমি আছি না? আমি সব বলবো ভীরকে।
কিন্তু তবুও ভয় কাটে না মারিয়া এলেনার। সে আবারও দ্বিধাভরা কণ্ঠে বলে,
___কিন্তু স্যার… বস কারোর কথা শুনবেন না।
উনিই….
নিক তাকে থামিয়ে দেয়,

___এসব তোমাকে দেখতে হবে না। আমি সামলে নেবো। ওকে শুধু ফিরতে হবে এতোটুকুই।
এরপর আর একটা শব্দও বের হয় না মারিয়া এলেনার মুখ থেকে। ভয় আর অনিশ্চয়তা তাকে নিঃশব্দ করে দেয়।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রানিয়া ও ভাবছে এটা করলে ভীর কি করবে।
____ইশায়া শান্তি পাচ্ছেনা কিছুতেই।
ইলারা আলভারেযের বলা কথাগুলোই বারবার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে ইশায়ার।সে চাইলেও সেগুলো ঝেড়ে ফেলতে পারছে না,বরং না চাইতেও ভীরের ছোটবেলার কথা মনে করে তার ভীষণ খারাপ লাগছে।তার বার বার মনে হয় তখন তো তিনি এমন ছিলেন না।
তখন তো সে নিস্পাপ ছিলো , ছোট্ট এক শিশু।
সেই বয়সেই মাকে হারিয়েছে,মায়ের সেই করুন পরিণতি নিজের চোখে দেখেছে।বাবা তাকেও তো কখনো পায়নি।
ইশায়া নিজের জীবনটার সঙ্গে তুলনা করে।
সে তো বাবা-মা থেকে দূরে আছে, তবুও এই দূরত্ব তাকে কষ্ট দেয়।তাহলে ভীর?তার তো কেউ বেচে নেই।
সে তো সবকিছু হারিয়ে বড় হয়েছে।এইসব ভাবতে ভাবতেই ইশায়ার চোখ ভিজে ওঠে।চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।তার মনে পড়ে নিজের ছোটবেলার কথা,বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো সেই উষ্ণ, সুন্দর মুহূর্তগুলো।
এই স্মৃতিগুলো বুকের ভেতর চাপা ব্যথা হয়ে জমে ওঠে।ইশায়ার বুকটা কেমন অদ্ভুতভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে,সে চায় না এসব ভাবতে একদমই চায় না।
কিন্তু তারপরও কেন যেন নিজের অনুভূতিগুলোকে হাজার চেষ্টা করেও দমাতে পারে না।
এর মাঝে ভীরের সাথে সে যেটা করেছে এর পর থেকে তার কোন খোজ নেই,কোথাও নেই সে।

____এদিকে, নিকের কথামতো মারিয়া এলেনা ইশায়ার রুমের সব সিসিটিভি বন্ধ করে দেয়।তার হাত কাঁপছে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি অস্বাভাবিক দ্রুত।
ভয়ে তার রূহ পর্যন্ত কেঁপে উঠছে এর পরিণতি কী হবে, সে কিছুই জানে না।
তাকে যেটা বলা হয়েছে সে করেছে এখন বাকিটা সামলাবে রানিয়া।
ইশায়া বিছানায় শুয়ে ছিল।
ঠিক তখনই রানিয়া নিঃশব্দে রুমে ঢুকে তার দিকে একটি ঔষধ বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
___ম্যাম, আপনার ঔষধ এটা খেয়ে নিন।
ইশায়া ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
___এসময়ে ঔষধ? আমার তো এখন কোনো মেডিসিন নেই।
রানিয়া চুপ হয়ে যায়।
কিছুক্ষণের জন্য সে বুঝতেই পারে না কী বলবে।
তার চোখে-মুখে অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৮

___ডাক্তার দিয়েছে, ম্যাম খেতে হবে। খেয়ে নিন, না হলে বস রাগ করবেন।
ভীরের কথা শুনতেই ইশায়া আর কোনো প্রশ্ন করে না।
কারণ সে জানে ভীর আর যা-ই করুক, তার বাচ্চার ক্ষতি হবে এমন কিছু সে কখনো করবে না।
এটা বললেও ভুল হবে
ইশায়ার নিজের ক্ষতি হবে এমন কোনো কিছুর অস্তিত্ব ও ভীর তার ধারে কাছে রাখতে দেবে না।
আর কিছু না বলে ইশায়া ঔষধটা খেয়ে নেয়,
অজান্তেই নিজেকে সঁপে দেয় এমন এক বিশ্বাসের কাছে, যার গভীরতা সে নিজেও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯০