সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৪২
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
বাইরে তখন রঙিন আকাশের ঝলকানি। প্রকৃতির সবুজ গাছগুলোও নিরব হয়ে দাঁড়িয়ে৷ উদাস আকাশে গাঙচিল ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই। শুধু সতেজ পাতার ছায়ায়, ডালে বসে বসে ঘুঘু ডাকছে কখনও।
আচ্ছা,ওরাও কি টের পেলো পৃথিবীর বুকে কোনও এক মানুষের স্তম্ভিতের রেশ? কারো উষ্ণতায় মোড়ানো শ্বাস-প্রশ্বাস যে বক্ষপিঞ্জরেই আটকে গেছে,বুঝে নিলো তা?
কে জানে!
এই প্রশ্নের উত্তর যেমন নেই,তেমন নেই তীব্রর অনুভূতির ব্যখাও। সে শুধু বুঝতে পারছে মাথার তালু হতে পায়ের তলা অবধি অবশ। বলিষ্ঠ দেহে এক ফোঁটা নড়ার শক্তি নেই।
বক্ষপটে হামলে পড়া এক রূপসীর ক্ষুদ্র, তুলোর ন্যায় শরীরটাও আজ যেন হাজার টন ভারী। যেই ভারে বলবাণ দেহের পুরুষ অবধি কেঁপে উঠল,নৈসর্গে ঠিকড়ে পড়া বজ্রের ন্যায়।
তীব্র শুকনো কাঠের মতো গলাটাকে ছোট্টো একটু ঢোকে ভিজিয়ে,খুব আস্তে করে ডাকল,
“ ভীতু মেয়ে!”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পুষ্পিতার কানে সেই ডাক পৌঁছায়। কিন্তু কাঁদতে ব্যস্ত মেয়েটা মাথা তুলল না। বরং শখের পুরুষের বুকের কাছটা ভেজাতে বহাল তার চোখ। তীব্রর পিঠ গলে হাতদুটো ছুটে গিয়ে সাদা শার্ট শক্ত করে খামচে ধরেছে।
অদূরে দাঁড়ানো নূহা নিজেও এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিল। তারপর মিটিমিটি হেসে অন্য দিকে সরে গেল সে৷ নিভৃতের এই সময়টা লিখে দিলো কেবল ওদের দুজনের নামে।
কিন্তু তীব্রর বুকের ঘূর্নিঝড় সেসব উপভোগ করতে পারছে না। বরং কোনও এক কারণে তার দেহ নিথরের মতো লাগছে। শ্বেত রঙা মুখখানা ভ্রমের কবলে অনেক বেশি পাংশু।
ও নিজে থেকেই আস্তে করে পুষ্পিতার হাত দুটো ছাড়িয়ে দিলো। উন্মাদের মতো হৃদয় খাবলে নেয়া তরুণীর ভেজা টইটম্বুর চোখে- চোখ অবধি রাখল না। যেমন
হাওয়ার বেগে এসেছিল,তেমন করেই বেরিয়ে গেল আবার। প্রকোপে কাঠের দোর বাড়ি খায় এপাশে। অমনি হুশ ফিরল পুষ্পিতার। ঘোর ভাঙতেই বোধে এলো,আবেগের বশে ও কী করে ফেলেছে! লজ্জায় মেয়েটার মাথায় আকাশ ভাঙার দশা হলো তখন। গায়ের সাথে পায়ের জমিন অবধি সেই কুণ্ঠার তল পেলো হয়ত।
জ্বিভ কেটে চোখ খিচে নিলো পুষ্পিতা। এভাবে স্যার কে জড়িয়ে ধরল! স্যার কি কিছু মনে করলেন? খারাপ ভাবলেন ওকে? ইস,কী বেহায়াপনাটাই না করে বসলি পুষ্পিতা!
একের পর এক ধাক্কায় শরীরী ভাবে যতটা ক্লান্ত মিথিলা? মানসিক ভাবে ততোধিক বিধ্বস্ত যেন! কিছুদিন ধরে নাহিদকে সে হন্যে হয়ে খুঁজছে। খুঁজছে বিট্টু মাস্তানের পুরো দলবলকেও। যারা করিমের টং দোকানে আড্ডার মেলা বসাত। কিন্তু পায়নি। করিম জানিয়েছেন,ওরা এখানে অনেকদিন আসে না।
নাহিদের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, এ নামে তিনি কাউকে চেনেন না।
মিথিলার মাথা জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ওতো শুনেছিল বিট্টু মাস্তান তার জিপ নিয়ে এখানেই বসতো। হ্যাঁ,নাহিদের আনাগোনা হয়ত কম ছিল,সেজন্যে দোকানদার চেনেন না। কিন্তু হুট করে এতগুলো লোক উবে গেল কোথায়?
সবার কথা বাদ। গোল্লায় যাক দুনিয়া। শুধু নাহিদকে যে মিথিলার খুব প্রয়োজন। তাকে না পেলে তো বিবেকের এই দংশন কিছুতেই থামবে না। আর না পাওয়া হবে সব প্রশ্নের উত্তর। মিথিলা যে দুটো বছর বড্ড কাছ থেকে দেখেছে মানুষটাকে। সে জানে,আর যাই হোক না কেন,পৃথিবী উলটেপালটে গেলেও অমন অসভ্যের মতো ম্যাসেজগুলো নাহিদের লেখা নয়। এ নির্ঘাত অন্য কারো কাজ।
কী ভেবেছিল পলাশ? ওকে ছেড়ে দিলেই ও পানিতে ভেসে যাবে?
তার জন্যে এখনও নাহিদের মতোন মানুষ আছে। মিথিলার বিশ্বাস,একবার হাতদুটো ধরে ক্ষমা চাইলেই সব ভুলে যাবে নাহিদ। মন থেকে খুব নরম গোছের মানুষ তো ও!
কিন্তু কোথায় পাবে ওকে? নাহিদের বাড়িটাও চেনে না। সিম থেকেও ব্লকড করে রাখা।
মিথিলা মন খারাপ করে বাড়ি ফিরল। দরজা খুলতেই সালমা শুধোলেন,
“ কোথায় গেছিলি?”
ও ঠোঁট ডোবাল জ্বিভে।
“ একটু বাইরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম। বাসায় ভালো লাগছিল না।”
সালমার বুকখানা হুহু করে ওঠে। মেয়েটা কদিনেই কেমন শুকিয়ে গেছে। রাতে তো ঠিকঠাক ঘুমোয়ই না। অবশ্য সংসার ভাঙলে কার চোখেই বা ঘুম আসে! বললেন নরম সুরে,
“ এই রোদের মধ্যে কেউ হাঁটতে যায়! বোস,পানি দেই।”
সিড়ি ভেঙে ওঠায় মিথিলা হাঁপাচ্ছিল একটু! সোফায় বসল ক্লান্তি নিয়ে। সালমা ফ্রিজ থেকে পানি আনতে গেলেন। এর মাঝেই ঘরের ভেতর হতে ছুটে এলো রাহাত। গ্রীষ্মের তাবদাহে তার স্কুল বন্ধ এখন।
বোনের হাত ধরে বলল,
“ আমার গাড়ির রিমোর্টটায় কী যেন হয়েছে! একটু ঠিক করে দাও না।”
মিথিলার কণ্ঠে শ্রান্তি,
“ বাবার কাছে নিয়ে যা।”
“ বাবা ঘুমোচ্ছে। আম্মু বারণ করল তুলতে।”
“ তাহলে পরে দিস।”
রাহাত বায়না করল,
“ তুমি দাও না।”
“ আমার এখন ভালো লাগছে না!”
“ প্লিজ,দাও না।”
হাঁটু ধরে ঝাঁকাতেই চোখ রাঙাল মিথিলা। ধমকে বলল,
“ বললাম না ভালো লাগছে না? সব সময় এতো জেদ কেন তোর?”
রাহাতের মুখটা ছোট হয়ে গেল৷
যখনই কিছু বলে, ভালো লাগছে না। একটা রিমোর্ট দেখে দিতে আর কতক্ষণ লাগতো? ছোটাপু হলে কত ভালো হোতো এখন!
রাহাত কালো মুখে ফিরতে নেয়। অমনি হাতটা টেনে ধরল মিথিলা। ঠোঁটে হাসি এনে বলল,
“ রাগ করিস না। নিয়ে আয়, ঠিক করে দেই।”
“ ভালো লাগছে না বললে তো!”
“ এই ভালো বোধ হয় কোনওদিনও লাগবে না। বাদ দে। নিয়ে আয় যা।”
রাহাতের চেহারায় আলো জ্বলে ওঠে। তুরন্ত ছুটে যায় ঘরে।
মিথিলা রিমোর্টের ব্যাটারি উল্টেপাল্টে দিচ্ছে। কিন্তু মাথার মধ্যে তার তখনও নাহিদ। দু বছরের প্রেমে ছেলেটার যা সে কোনওদিন ফিরেও দেখেনি,আজকে সেই হাসি মনে করে করে মন পুড়ে যায়। নাহিদের শেষ কথা,
‘তুমি আমাকে ছেড়ে বিয়ে করে ফেলবে মিথিলা!’ ভেবেই মেয়েটার বুক ঠেসে কান্না উথলে এলো।
অন্যমনস্ক চিত্তে কোনও কাজই ঠিকঠাক হচ্ছিলো না। রাহাত কিছুক্ষণ খেয়াল করল তাকে। বোনের শ্যামলা মুখখানা দেখল নিবেশন দিয়ে। আপুর মনে হয় মন খারাপ। না। ও এখন জোর না করলেই ভালো হোতো!
কিছু বলার আগেই মিথিলা জিজ্ঞেস করল,
“ পুষ্পিতাকে খুব মনে পড়ে তোর,তাই না রে!”
নিষ্পাপ ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল রাহাত।
“ আম্মু কেন খোঁজেনি বলতো! একটু থানায় টানায় ডায়েরি করলেই তো পাওয়া যেত।”
“ আম্মু খুঁজতে চায় তো। কিন্তু এ বাড়িতে আসুক তা চায় না। এলেই যদি তোমরা আবার আপুর সাথে খারাপ ব্যবহার করো,তাই!”
মিথিলার মুখবিবরে আঁধার ঘনিয়ে আসে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল,
“ সেই! মেয়েটার সাথে তো কম অন্যায় করিনি।”
মুখে বলল,
“ তুই ওকে খুব ভালোবাসিস তাই না?”
রাহাত সব দাঁত বের করে হাসল এবার। মাথা ঝাঁকাল সানন্দে । মিথিলার বুক মোচড় দেয়। যেভাবে পুষ্পিতাকে ভালোবাসার প্রসঙ্গে রাহাত স্ফূর্ত জবাব দিলো? তেমনটা কি ওর ব্যাপারেও জিজ্ঞেস করলে হবে?
হবে না। ও আর পুষ্পিতা কী এক না কি!
পুষ্পিতা রাহাতকে পারলে মাথায় করে রাখতো। সেখানে ও!
তার মলিন মুখ দেখে রাহাতের মায়া হয় ভীষণ। ভাবল,পুষ্পিতার জন্যে হয়ত ওর মতো আপুর কষ্ট হচ্ছে।
বলল আগ বাড়িয়ে,
“ তুমি কষ্ট পেও না। ছোটাপু ঠিক চলে আসবে।”
মিথিলা মৃদূ হাসল। পুষ্পিতা আর ফিরবে না সেতো জানা কথা। ফিরলে কি এতদিন সময় নিতো? রাহাতটা ওকে মিছিমিছি সান্ত্বনা দিচ্ছে। বলল এমনি এমনি,
“ পুষ্পিতা তোকে বলে গেছে?”
“ অন্য একজন বলেছে।”
“ কে বলেছে? “
সহসা সচেতন ভঙ্গিতে চুপ করে গেল রাহাত। এইরে, তীব্র তাকে বারণ করেছিল এসব কাউকে না বলতে। আরেকটু হলেই তো বলে দিচ্ছিল । তার চেহারার চোর চোর ভাবটা দেখেই, মিথিলা সজাগ চোখে চায়।
“ কে বলেছে,বল?”
“ বলব না।”
“ তাহলে কিন্তু রিমোর্ট ঠিক করে দেব না।”
রাহাত বলল,
“ লাগবে না। আমি পড়তে বসি যাই।”
তারপর দৌড়ে ঘরে চলে গেল। মিথিলা আশ্চর্য হলো খুব!
এক্ষুনি এতো বায়না করছিল যা নিয়ে,সেটা ফেলেই চলে গেছে? রাহাতের হাবভাব তো ঠিক লাগছে না। পুচকিটা পুষ্পিতার ব্যাপারে নির্ঘাত কিছু জানে!
আগুন ঝরা রোদ! মাটি,নদী, ফসলের গায়ে এক রকম খা খা শূন্যতা। প্রখর উষ্ণতায় মাথার তালু অবধি টগবগ করতে চাইছে। নিবিড়, নিস্তব্ধ কোলাহলহীন দুপুর। অথচ ওই তুখোড় রোদ্দুর গায়ে মেখে খোলা পার্কের বেঞ্চে থম মেরে বসে আছে তীব্র। উত্তাল সুনামি বুকের ভেতর।
সমস্ত শরীর চুপচুপ করছে ঘামে। ফরসা মুখখানা তপ্ততায় রক্তিম।
কিন্তু তীব্রর এসবে কিচ্ছু যায় এলো না। কুয়োর মতো শান্ত,নিষ্প্রাণ দুটো চোখ তার একভাবে মাটির ওপর লেগে। মানস্পটে ভাসছে,পুষ্পিতার ছুটে এসে বুকে আছড়ে পড়ার দৃশ্য। আর ততবার ভেতরটা সহ দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তার।
এই এক জড়িয়ে ধরায়, মেয়েটার এই একটু ছোঁয়ায় তীব্রর চোখের সামনে যে গোটা দুনিয়াই বদলে গেছে আজ!
আচমকা ভিন্ন এক সত্তা জেগে উঠেছে আত্মায়। অনুশোচনা আর পরিতাপে চৌচির মাথায় নিরন্তর কেবল একটা কথাই বাজছে।
এতোগুলো মাস, নিজের পরিচয় লুকিয়ে, একের পর এক নাটক করে সে যে পুষ্পিতাকে নিজের প্রেমে ফেলল, সেসব কি ওকে ঠকানো হলো না? সেদিন তো নূহাও এই একই কথা বলেছিল। তীব্র তাকে ঠকাচ্ছে!
হ্যাঁ তাইতো,ঠকাচ্ছেই তো। ভালোবাসায় যে কোনও মিথ্যে থাকতে নেই। ভালোবাসা আয়নার মতো সুন্দর আর স্বচ্ছ হতে হয়। যেভাবে পুষ্পিতা তাকে অবলম্বন ভেবে আকড়ে ধরল আজকে? সেই তাপে ঝলসে যাচ্ছে তীব্রর সমস্ত মিথ্যেরা।
টোকা পড়েছে বিবেকের দোরে। ওরা বোঝাল,বলল,
ভালোবাসলেই তার সাথে যা খুশি তুই করতে পারিস না তীব্র। এত পবিত্র বন্ধনের শুরুটা তোর মিথ্যে দিয়ে হবে?
তীব্র ঝট করে উঠে দাঁড়াল। হাত উলটে কব্জি দিয়ে ঘাম মুছল কপালের। বুকের মাঝে আতঙ্কের দামামা। সব তীব্র ঠেসে রাখল উচিত-অনুচিতের চাপে। মুখ শক্ত করে জীবনের সব থেকে কঠিন সিদ্ধান্তটাই নিয়ে ফেলল তারপর!
তীব্রর ফ্ল্যাটে মিটিং বসেছে।
আলোচনার নয়,চিন্তার। চার বন্ধু পুরো ঘর জুড়ে অংশ নিয়েছে তাতে। বারবার দেয়াল ঘড়ি দেখছে নাহিদ। রাত এগারটা ছাড়াল, নিচের মেইন গেইটেও তালা ঝুলিয়েছেন দারোয়ান। কিন্তু তীব্র এখনও ফেরেনি।
পরপর দুদিন দেরি,অফিস কামাইয়ের কারণে নাহিদের চাকরিটা আর নেই। সেজন্যে সারাদিন মিরাজদের সাথে আড্ডায় ব্যস্ত ছিল ঘরে। সিরিজ দেখেছে,তাস খেলেছে,খিচুড়ি খেয়েছে দুপুরে। কিন্তু রাত বাড়তেই যেন তীব্রর না ফেরার দুশ্চিন্তা জেঁকে বসল মাথায়!
আরমান এই নিয়ে হাজার বার কল করেছে ওকে। প্রথম দিকে রিং হলেও,এখন সুইচড অফ বলছে। তীব্র তো এমন কখনও করে না। নাহিদ আর ছটফটে চিত্তে বসে থাকতে পারছে না। সব মুসিবত সব সময় তার ওপরেই ফেলা হয় কেন?
এদিকে তীব্র আসেনি। ওদিকে আবার নূহাও কথা বলছে না ওর সাথে। বিকেলে একবার দেখা হয়েছিল। নাহিদ ডাকল, কিন্তু একটি বার ফিরেও চায়নি মেয়েটা।
এখনও রেগে আছে নিশ্চয়ই! আর এনিয়েই নাহিদের যত খটকা। মেশিনের ব্যাপারটা নিয়ে ও সারাদিন ভেবেছে। শেষে এসে মনে হলো, টাকার মেশিনের কথা বলেছিল মিরাজ। টাকা না থাকলে যে আজকাল বউ রাখা যায় না। কিছু মেয়ে তো ভালোবাসা বলতে ঐ অর্থ-বিত্তই চেনে। এই যে তার টাকা নেই দেখে মিথিলাও ছেড়ে গেল।
পরপর মন বলছে ওর ধারণা ভুল। ব্যাপারটা এতো সোজা হলে নূহা অত চটে যেতেন? অশ্লীল, অসভ্য এসব বলতেন? মিরাজ নির্ঘাত খারাপ কিছু বলেছে। নাহিদ আর কিছু ভাবতে পারছে না। কেমন অসাড়ের মতো টলতে টলতে এসে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল খাটে।
মশকফিক বলল,
“ একবার নিচে নেমে দেখব,যদি আসে!”
মিরাজ বলল,
“ তালা লাগিয়েছে তো। এলে ফোন করতো আমাদের।”
মাথা নাড়ল ওরা। যুক্তি হাজারটা থাকলেও বন্ধুর চিন্তায় কাহিল মনের স্বস্তি মেলে না কিছুতেই।
এপাশের ফ্ল্যাটের অবস্থা তার থেকেও করুণ। পুষ্পিতা গলা কাটা মুরগির মতো হাঁসফাঁস করছে শুধু।
সেই যে স্যার বেরিয়ে গেলেন,সারাটা দিন দেখা নেই। নাহিদের কাছে শুনেছে ঘরেও ফেরেননি উনি। ফোনটাও নাকি বন্ধ!
আচ্ছা, কোনও বিপদ হলো না তো!
মেয়েটা দিশেহারার মতোন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে। নূহা পাশেই ঘুমিয়ে। পুষ্পিতা মাখোমাখো অন্ধকারেই দেয়াল ঘড়ির জ্বলজ্বলে কাঁটা দেখল। স্যার কি এখনও ফেরেননি? এতো দেরি তো কখনও করেন না। তবে কি তখন ওভাবে জড়িয়ে ধরায়…
পুষ্পিতার হৃদযন্ত্র শঙ্কায় থেমে থেমে যাচ্ছে।
ফ্যাসফ্যাসে চিত্ত যখন ভয়ে ডুবছে,আচমকা তারস্বরে মুঠোফোন বাজল। প্রকোপে ভূমিকম্প তুলল মাথার বালিশ। পুষ্পিতা অবাক হলো একটু! নূহা আর আয়েশা ছাড়া ওকে ফোন করার কেউ নেই। আর না কেউ ওর এই সিমের নম্বর জানে। তাও এতো রাতে! কৌতূহলে ও ফোন এনে সামনে ধরল। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর দেখে বিভ্রান্ত হয় মেয়েটা। বিরস চিত্তে রিসিভ করে তাও। ওপাশ থেকে তাকে ‘হ্যালো’ বলারও সময় দেয়া হলো না। কেউ একজন কণ্ঠে মায়া মিশিয়ে ডাকল,
“ ভীতু মেয়ে!”
পুষ্পিতা থমকে গেল বিস্ময়ে! শোয়া হতে ত্রস্ত লাফিয়ে উঠল। তীব্র ফোন করেছে। নম্বর কোথায় পেলো! এতো কিছু ভাবার সময় পুষ্পিতার নেই। হড়বড়িয়ে শুধাল,
“ স্যার,স্যার আপনি কোথায়? আপনার ফোন বন্ধ ছিল কেন? সবাই কতো চিন্তা করছে জানেন!”
তীব্র এতগুলো প্রশ্ন বেমালুম এড়িয়ে যায়। কণ্ঠের গতি সুস্থির। কেমন করে বলল,
“ একবার নিচে আসবে!”
অবাক হলো পুষ্পিতা,
“ এখন!”
ওর কণ্ঠে অনুনয়,
“ প্লিজ!”
তারপর খট করে লাইন কেটে গেল। পুষ্পিতা ফোনের ওপর সময় দেখল ফের। বারোটা পার হয়েছে। গাজীপুরের মতো মফস্বলে এখন অনেক রাত! এতো রাতে বাইরে যাবে, তাও বাসার নিচে!
তীব্রর প্রতি তার ছটফটে মন,যেতে এক পায়ে রাজি। কিন্তু কীভাবে যাবে? আন্টি তো ঘরেই ঘুমাচ্ছেন।
পুষ্পিতা কী করবে বুঝতে পারছে না। অসহায় মুখে পাশ ফিরতেই ভরকে গেল কিছু। এক ভ্রু তুলে চেয়ে আছে নূহা। ও থতমত খেয়ে বলল,
“ ঘুমোসনি?”
“ যেই নড়াচড়া করছিলি! বিছানার কাঠগুলোও তোর সাথে দুলছিল। ঘুমাব কী করে?”
পুষ্পিতা মাথা নোয়াল। নূহা নিজে থেকেই প্রশ্ন ছোড়ে,
“ তীব্র ভাইয়া ফোন করেছিলেন?”
ঘাড় নাড়ল সে।
“ কোথায় ডাকছে?”
পুষ্পিতার কণ্ঠ ধীরুজ,
“নিচে।”
“ এই সময়?”
নূহার কপালও গুছিয়ে এলো ভাঁজে।
ও বলল,
“ কী করব এখন? উনি তো মনে হয় অপেক্ষা করছেন।”
“ কী করব মানে, যাবি।”
“ কিন্তু আন্টি…”
“ আমি আছি কী করতে? আয়।”
নূহা ফিসফিস করে বলল। অধরদ্বয়ে চাঁদ হাসছে তার। পুষ্পিতা একটু হলেও হাঁপ ছাড়ে। যাক, নূহা নিশ্চিত কোনও না কোনও ব্যবস্থা করে দেবে!
পেছনে পুষ্পিতাকে নিয়ে সামনে সামনে এগিয়ে যায় নূহা। শব্দের রাজত্ব কমাতে মেঝেতে পা টিপে টিপে হাঁটে।
মায়ের ঘরের সামনে এসে থামল ওরা। নূহা আস্তে করে দরজাটা টেনে বাইরে থেকে লাগিয়ে দিলো। তেমনই সন্তর্পণে সিঁড়িতে এসে বলল,
“ যা। আমি এখানেই আছি, ভয় নেই।”
পুষ্পিতার মুখ দেখে মনেও হলো না সে ভয় পাচ্ছে। সম্পর্কের শুরু হয়নি,হয়নি দীর্ঘ কোনও প্রেমালাপ,অথচ এক পুরুষের ছোট্ট একটু ডাকেই চঞ্চল পায়ে নিচে ছুটল সে৷ এর কারণ কী? বুক উজার করা ভালোবাসা!
নূহা মনে মনে হাসল। পুষ্পিতা অন্ধকারে ভয় পায়। একা থাকতে পারে না। কেউ জোরে কথা বললে,বুক ছলকে উঠতো। সেই মেয়ে আজ কোথাকার তীব্রর ডাকে অন্ধকারকে পেছনে ফেলে সাড়া দিতে ছুটছে। আহা প্রেম! একটা মানুষকে কতটা বদলে ফেলে! অমন দাঁড়িয়েই বড়ো করে শ্বাস নিলো নূহা। কাতর চোখ ফেলল একবার পাশের ফ্ল্যাটের দরজার ওপর। ভেতরে একটা মানুষ আছে,যার জন্যে আজকাল তারও ঘুম হয় না। পুষ্পিতার মতো সেও প্রহরে প্রহরে ছটফটিয়ে মরে। শুধু দুজনের গল্পটা আলাদা। একজন ভালোবাসা পেয়েও, না জানার দুঃখে। আর আরেকজন? সেতো এখনও ভালোবাসাই পায়নি।
পুষ্পিতা নিচে এলো কয়েক সেকেন্ডে। মেইন গেইট তখন ঠা করে খোলা। দারোয়ান চাচা সজাগ হয়ে চেয়ার নিয়ে বসে। ওকে দেখেই ঠোঁট টিপে মুচকি মুচকি হাসলেন। পুষ্পিতা যে উন্মাদনা নিয়ে এসেছে, ওসব ছাপিয়ে এইটুকু হাসিতে তিল পরিমাণ অস্বস্তিও মাথা তুলতে পারেনি। তার ব্যগ্র চোখের চাউনী এদিক ওদিক বিক্ষিপ্ত ভাবে ছুটছে। তীব্রকে খুঁজছে তারা । হন্যে নয়নের হদিস দিলেন দারোয়ান নিজেই,
“ স্যার বাইরে।”
পুষ্পিতা অবাক হয়নি। ওই সময়টাও তার কাছে নেই। চড়ুইয়ের মতো চপল পায়ে গেইট পেরিয়ে বাইরে এলো সে। মাথার ওপর কাকতাড়ুয়ার মতো কতগুলো সোডিয়ামের লাইট দাঁড়িয়ে। সেই আলোয় পুষ্পিতা আশপাশ দেখার চেষ্টায়।
আচমকা একটা কালো ছায়া এসে পাশে থামল তার। ঠিক পিঠ বরাবর যার অস্তিত্ব। নিবিড়,শূনশান রজনিতে পুষ্পিতার দৃষ্টি সেই ছায়াতেই বর্তাল। বুঝে নিলো,
স্যার এসেছেন! মেয়েটার সুশ্রী আনন তারার মতো ঝলমলিয়ে ওঠে।
শশকের ন্যায় ব্যস্ত হয়ে পেছন ঘুরে চাইল। মুখের হাসি মিলিয়ে,পিলে সুদ্ধ চমকে উঠল অমনি।
মাস্ক-ক্যাপ পরা, অগোছালো শার্টের চেনা সেই যুবক সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পুষ্পিতার বক্ষস্থল ছ্যাৎ করে উঠল। চিনতে একটুও ভুল হলো না। আবার বিট্টু মাস্তান! এখানে কেন এসেছে? ওকে কি আবার তুলে নিয়ে যাবে?
পুষ্পিতা ঢোক গিলল। চঞ্চলা মুখবিবর ফ্যাকাশে। ভীতসন্ত্রস্ত নজরে বারবার চারপাশ দেখছে । স্যার কোথায়! এখনও আসছেন না কেন?
সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৪১
তার চোখ যখন প্রকট? বুকের গতি জোড়ালো? শরীরে কম্পন,মনে ত্রাস? তক্ষুনি মুখের মাস্ক টেনে খুলে ফেলল মানুষটা। বেরিয়ে এলো পুষ্পিতার রন্ধ্রে মিশে যাওয়া সেই চেহারা, যা ভালোবেসে বিনাদ্বিধায় নিঃস্বর খাতায় সে নাম লেখাতে পারতো।
