হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫৪
তামান্না ইসলাম শিমলা
আরিশ আর তিতলির জন্য আজ আকিকার অনুষ্ঠান রাখা হয়েছে। তেহরাবের ইচ্ছে ও কথা মতো নিজেরে টাকা দিয়েই গরু কিনেছে আকিকা দেওয়া হচ্ছে।
সব কাজ শেষের দিকে এখন শুধু ভাগ বাটোয়ারা করে যার যার বাগিতে পাঠিয়ে দেওয়ার পালা। তেহরাব ঘেমে নেয়ে নিজের ঘরে আসে। পরনে ঘামে লেপ্টে থাকা টি শার্টটা খুলে বসে পরল বিছানায়। বড্ড অস্থির লাগছে। ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ছাড়ল।
“তেহরাব একটু তনয়ার কাছে যা তো বাবা। আমার ইরা যে কোথায় গিয়েছে। আমার রান্না পুড়ে যাবে, দ্রুত যা।”
তাসলিমার কন্ঠ শুনে দরজার দিকে তাকায় তেহরাব। তাসলিমা দ্বিতীয়বার তাড়া দিয়ে নিচে চলে গেল। তেহরাব যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে আসার পর থেকে এক মুহুর্তের জন্য তনয়াকে আলাদা পায়নি তেহরাব। না পেড়েছে কথা বলতে। এই চারটি দিন তাসলিমার সাথেই ছিল তনয়া, সেই রুমেই। মূলত তাসলিমায় আসতে দিচ্ছিল না। দুটো বাচ্চা নিয়ে রাতে সামলাতে হিমসিম খাবে তনয়া এই ভেবেই।
তেহরাব কিছু একটা ভেবে ক্রুর হাসলো।
বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। পরনে থাকা লুঙ্গী ভাজ করে কোমরে গিট লাগাল। অতংপর পা বাড়াল তনয়ার অবস্থানকৃত রুমে। দরজার সামনে এসে কনুই-এ ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তাকাল ভেতরে।
তনয়া আরিশকে খাওয়াচ্ছে। তিতলি ঘুমিয়ে আছে পাশেই। তেহরাব তনয়াকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে নিল কয়েকবার। একটু দুষ্টু হেসে বলল,
“আসতে পারি?”
হঠাৎ পুরুষালী কন্ঠ পেয়েই চমকে উঠলো তনয়া। দ্রুত আরিশকে খাওয়া বাদ দিয়ে তাকাল দরজার পানে। তেহরাব ক্রুর হাসলো আবারো।
তনয়া চোখ নামিয়ে নিল। এদিকে আরিশ আবারো কান্না শুরু করেছে। ছেলেটা ভারি জ্বালাতন করছে তনয়াকে। তিতলি তো জ্বালায় না।
বাচ্চার কান্না শব্দ কর্নপাত হওয়া মাত্র তেহরাবের মুখদ্বয় গম্ভীর হয়ে উঠে। প্রবেশ করে ভেতরে।
“আমার ছেলেকে কাঁদাচ্ছিস কেন? খাওয়া ওকে।”
তনয়া আরিশকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে বলে,
“আ আপনি বাইরে যান।”
তেহরাব ভ্রুক্ষেপহীন বিছানায় বসল। পানির বোতলটা হাতে নিয়ে খুলতে খুলতে বলল,
“আজব আমি কেন বাইরে যাব? আমার বাড়ি, আমার বউ, আমার বাচ্চাকাচ্চা। আমাকে যেতে বলছিস কেন?”
তেহরাব পানি মুখে দেয়। তনয়ার অস্বস্তি হচ্ছে। আর অস্বস্তির কারনেই তেহরাবের সামনে আরিশকে খাওয়াতে পারছে না। মাথা নিচু করেই তনয়া বলল,
“প্লিজ যান। আমি ওকে খাওয়াব।”
“তো? আমি না করেছি? খাওয়া।”
তনয়া করুণ চোখে তেহরাবের দিকে তাকায়। তেহরাব ভ্রু উচিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করে। তনয়া জবাব দেয় না। হুট করেই কান্না থেমে যায় আরিশের। তনয়া মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া দিতে থাকে। তেহরাব এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তনয়ার দিকে। কিছু সময়ের মাঝেই আরিশ ঘুমিয়ে যায়। তনয়া আরিশকে তিতলির পাশেই শুয়িয়ে দেয়। কোমর ধরে এসেছে তনয়ার। তার উপর আজ সেলাই খুলে দিয়ে গিয়েছে। সেলাই এর জায়গাতেও টান লাগছে।
তনয়া বিছানা থেকে নামতে নিলে তেহরাব তাকে ধরে দাঁড় করায়।
“খারাপ লাগছে?”
তনয়া দুদিকে মাথা নাড়ে। যার অর্থ খারাপ লাগছে না।
“কোথায় যাবি?”
তেহরাবের প্রশ্নে তনয়া সোফার দিকে তাকিয়ে বলে,
“সোফায় বসব।”
তেহরাব তনয়াকে সোফায় বসিয়ে দেয়। নিজেও বসে পরে তনয়ার পাশে। তনয়া তেহরাবের দিকে তাকাতেই বিস্মিত হয়। এতটা সময় সে তেহরাবকে ভালোমতো খেয়াল করেনি। তবে এখন করেছে।
তেহরাব উদাম শরীর তার পাশেই বসে আছে। অদ্ভুত নেশাভরা চাহনি নিক্ষেপ করে রেখেছে তার দিকে।
“ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে তনয়া। সুস্থ হবি কবে?”
তনয়া মৃদু কেঁপে উঠল। শুকনো ঢোক গিলে কিছুটা পিছিয়ে গেল। তবে পরমুহূর্তেই তেহরাব তনয়াকে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। তনয়ার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“একটা চুমু খাই? কতদিন হয়ে গেছে তোর কাছে আসি না। তোকে চুমু খাই না, তোর…..
তনয়ার শ্বাস প্রশ্বাস ভারি হয়ে উঠছে। তনয়া তেহরাবের মুখে হাত রাখল৷ উহু, এখন সে তেহরাবের কোনো কথায় শুনতে চাচ্ছে না।
তেহরাব তনয়ার হাত নামিয়ে নিল। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“চলে যাব?”
তনয়ার দৃষ্টি তেহরাবের চোখের দিকে। তেহরাব কি বুঝতে পারছে তনয়ার অবস্থা?
“ঠিক আছে। আসছি।”
তেহরাব উঠতে নিলে তনয়া তাকে আটকে নেয়। তেহরাব তনয়ার দিকে ঘুরে তাকায়। তনয়া দুদিকে মাথা নেড়ে ইশারায় যেতে মানা করে।
“বোবা তুই? কথা বলছিস না কেন? মুখে বল যা বলার।”
তনয়া মিনমিনে স্বরে বলে,
“আমি আব্বুর বাসায় যাব।”
কথাটি কর্ণপাত হওয়া মাত্র কপাল কুঁচকে নিল তেহরাব। গম্ভীরতা ভর করল চেহারায়।
“কি বললি?”
তনয়া মাথা নিচু করে বলে,
“ভালো লাগছে না কিছুই। কয়েকটা দিন থেকে আসি?”
তেহরাব উঠে দাঁড়াল। কোমরে হাত দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ও বাড়ি গেলে ভালো লাগবে?”
তনয়া কিছু বলে না। সে মাথানত করেই বসে আছে। তেহরাব কিছুসময় চুপ থেকে বলে উঠল,
“আব্বাকে বলিস এসে নিয়ে যেতে। থেকে আয় এই মাস। সুস্থ হয়ে ফিরিস।”
তনয়া বুঝল না তেহরাব কি রেগে গিয়ে কথাটি বলল নাকি সত্যি। তাই জিজ্ঞেস করেই বসল,
“সত্যি যাব?”
তেহরাব ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মনে মনে কিছু একটা ভেবে নিজের চুলে এলোমেলো ভাবে হাত বুলাল। অতংপর বলল,
“হ্যাঁ হ্যাঁ যা। কাছে থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল। দূরেই থাক কয়েকদিন, তারপর ফিরে আসার পর নাহয় সব একসাথেই উশুল করা যাবে।”
তনয়ার চোয়াল ঝুলে পরেছে। সে তেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“আপনি আসলেই অসভ্য। “
তেহরাব শব্দ করে হেসে উঠল।
“হ্যাঁ শুধু তোর জন্য।”
তনয়া মুখ ভেঙায়। তেহরাব তনয়ার দিকে ঝুঁকে তনয়াকে কিছু বুঝে উঠার সুযোগ না দিয়েই তার অধর নিজের দখলে নিয়ে নিল। তনয়া থ মেরে বসে আছে। তবে সে আটকাল না তেহরাবকে। সেও যে অনুভব করছে তেহরাবের স্পর্শ গুলো।
তেহরাব ছেড়ে দেয় তনয়াকে। হাত দিয়ে নিজের মুখ মুছতে মুছতে বলে,
“না হচ্ছে না। তুই আমাকে পাগল করে দিচ্ছিস। কন্ট্রোলেই থাকতে দিচ্ছিস না। যাই গোসল দিয়ে আসি।”
তনয়া জবাব দেয় না। তেহরাব চলে যায় রুম থেকে। হুট করেই টনক নড়ে তনয়ার। সে শব্দ করে ডেকে উঠে তেহরাবকে,
“তেহরাব।”
অতঃপর নিজেই নিজের চোখ মুখ খিঁচে বিড়বিড় করে বলে,
“ইশ কি অসভ্য। একটা নির্লজ্জ লোক।”
তেহরাব দরজা দিয়ে উঁকি মেরে বলে,
“হ্যাঁ। চল প্রমাণ দেখাই, যাবি?”
তনয়া দরজার দিকে তাকাল। তেহরাবকে দেখে রেগে গিয়ে বলল,
“আপনি আসিয়েন আমার কাছে শুধু। অসভ্য একটা।”
তেহরাব শব্দ করে হাসতে হাসতে আবারো চলে যায়। তনয়া নিজেই নিজের মতো বসে বসে বিলাপ করতে ব্যস্ত।
সময় তার নিজের স্রোতে প্রবাহিত হয়। কখনোই কারো জন্য অপেক্ষা করে না উল্টো মানুষ অপেক্ষা করে সময়ের জন্য।
তেহরাব তনয়ার জীবনেও কেটে গিয়েছে বেশ কয়েকটা বছর। এক দুটো না পুরো তিনটি বছর।
তনয়া এখন পাক্কা গিন্নির মতো সংসার, বাচ্চা, স্বামী ও নিজের পড়াশোনা সামলাচ্ছে।
তনয়াকে পরের বছরই পরিক্ষায় বসিয়েছিল তেহরাব। তনয়া নিজেও আর দ্বিমত করেনি, না করেছিল তার মা। আর তার চেষ্টার জোরে মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছে সে। এখন একটু চাপে থাকতে হচ্ছে তবে সেসব তেহরাবই সামলে নিচ্ছে। চার বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। শুধু বদলায়নি তেহরাব। ছেলেটা আগের মতোই নিজের মতোই, ভবঘুরে। আর তনয়ার জন্য পাগল।
“আম্মু তুমি দাবে না?”
তিতলির প্রশ্নে মাথা ঘুরিয়ে তাকায় তনয়া। সুন্দর করে সেজে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে সে। তনয়া তিতলির গালে হাত বুলিয়ে বলে,
“আমি যাব না তোমরা যাও। একদম দুষ্টুমি করবে না ঠিক আছে?”
তিতলি খিলখিল করে হেসে উঠে।
“আমি তো দুষ্টু করি না। আরিত দুষ্টু করে।”
তনয়া হাসে। হাঁটু গেঁড়ে বসে তিতলির সামনে, চুল গুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলে,
“আরিশ কোথায়?”
তিতলি ছোট্ট ছোট্ট করে জবাব দেয়,
“দাদুর সাতে বেরিয়ে গেচে। আমিও যাব একন।”
এমন সময় তিতলিকে ডাকতে ডাকতে ঘরে আসে তাসলিমা।
“আমি তোকে খুঁজতেছি কখন থেকে। তনয়া দেখে থাকিস। যেতে বললাম গেলি না।”
তনয়া উঠে দাঁড়ায়।
“নাহ মা যাও তোমরা। আমি পড়তে বসি। সামনের সপ্তাহ থেকেই পরিক্ষা।”
তাসলিমা কিছু বলে না, তিতলি তনয়াকে চুমু খেয়ে বলে,
“আম্মু তাতা।”
তিতলি আর তাসলিমা চলে যায়। আজ ইরার স্বাদের অনুষ্ঠান। সবাই থাকবে সেখানেই আজ। তিতলি আর আরিশ দাদু দীদা বলতে পাগল। এই বিষয়টার জন্য তনয়ার এতটা ঝামেলায় পরতে হয় না।
বাইরে ঝড় হচ্ছে।
আজ গোটা বাড়ি ফাঁকা। তনয়ার চোখ যায় ঘড়ির দিকে। দশটার উপরে বাজে, এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠে। মুচকি হাসে তনয়া। তেহরাব এসেছে। দরজা খুলতেই ভেজা অবস্থায় প্রবেশ করে তেহরাব। পরনের সব কিছু ভিজে একাকার অবস্থা।
“এভাবে ভিজে আসার কি প্রয়োজন ছিল? আগে আসলেই তো পারতেন।”
তেহরাব শার্ট খুলতে খুলতে বলে,
“বাড়ির সকলে কই?”
তনয়া দরজা লাগিয়ে দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। যেতে যেতে বলে,
“আজ ইরা আপুদের বাসায় থাকবে ওরা।”
“তার মানে বাড়ি ফাঁকা? “
তনয়া থেমে যায়। তেহরাবের উদ্দেশ্য টের পেতেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তনয়া। হঠাৎ নিজের কাছে তেহরাবের উপস্থিতি টের পেল তনয়া। তেহরাব তনয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কালকের শাস্তি এখনো বাকি। চল দেওয়া যাক।”
তনয়া কেঁপে উঠে। দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,
“নাহ। সরি প্লিজ, আর হবে না।”
তেহরাব বাঁকা হাসে। হিসহিস করে বলে,
“সেটা কালকে ভাবা উচিত ছিল। আমাকে কন্ট্রোললেস বানিয়ে চলে যাওয়ার সময় এই ভাবনাটা কাজ করলে আজ বেঁচে যেতি। এখন কিছুই করার নেই।”
তনয়া তেহরাবের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তেহরাব তনয়ার কোমর ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তনয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আঁকড়ে ধরল তনয়ার ঠোঁট। তনয়া তাল সামলাতে না পেরে তেহরাবের উন্মুক্ত বুকে হাত রাখে। তেহরাব আরেক হাত দিয়ে তনয়ার চুল গুলো চেপে ধরল।
“প্লিজ ছাড়ুন। আম সরি প্লিজ।”
তেহরাব ভারি শ্বাস নিয়ে বাঁকা হাসে।
“কালকে কে এসেছিল আমার কাছে? এখন আমার কিছু করার নেই।”
তনয়ার ভয় হচ্ছে। তেহরাবকে অন্যরকম লাগছে। আজ তনয়া শেষ। কালকে যে কেন শয়তানি বুদ্ধি প্রয়োগ করতে গিয়েছিল। এখন নিজেই ফেসাদে পরে গেছে।
“আমি আমি কিন্তু চিৎকার করব বলে দিলাম। আজ না প্লিজ……
তেহরাব চট করে তনয়াকে সোফায় ফেলে দিল।নিজের প্যান্টের বেল্ট খুলতে খুলতে বলে,
“যত খুশি চিৎকার কর।”
তনয়া কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলে,
“জ্বর এসেছে আমার। অসুস্থ আমি। আজ না প্লি………
তেহরাব নিজেই তনয়ার উপর উঠে বসল। তনয়াকে কিছু বলতে না দিয়ে তেহরাব তনয়ার হাত দুটো মাথার উপর পিন করে ধরে। আরেক হাত দিয়ে তনয়ার গাল চেপে ধরে। ক্রুর হেসে বলে,
“হুশ।”
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫৩
আর কিছু বলার সুযোগ দিল না তেহরাব। ডুব দিল সে তনয়ার মাঝে। তনয়াও নিজেকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। সে যে দুর্বল। তেহরাবের স্পর্শে সে দুর্বল। সেই দুর্বলতা যে তার এখনো কাটেনি। আর হয়তো কাটবেও না।
তেহরাব তনয়ার ঠোঁটে আলতো চুমু খেয়ে বলে,
“Is it okay if I love you a little more this time?”
