হামিংবার্ড পর্ব ১৪
তাসমিয়া তাসনিন প্রিয়া
“কী রে নয়না? এখানে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি না মেরে চাচার সামনে গিয়ে কুশল বিনিময় কর।”
রোকসানার কণ্ঠে বিরক্তি নয়, বরং এক ধরনের তাগিদ ছিল। মকবুল চৌধুরীকে বসার ঘরে রেখে, ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা কিছু বের করছিলেন তিনি।
নয়নার গলা যেন শুকিয়ে কাঠ। কান যেন শব্দ নিচ্ছে না। শরীরটা ভার হয়ে এসেছে।
চোখে ধরা পড়ছে একটা চাপা ভীতি, একটা গোপন অস্বস্তি। রোকসানা চায়ের জন্য চুলোয় পানি বসাতে বসাতে আবারও ডাকলেন,
“নয়না!”
“জি, মা… যাচ্ছি।”
নয়নার কণ্ঠে যেন একটা ঘুম ভাঙা বিস্ময়। স্বরে অনিচ্ছা স্পষ্ট। ধীর পায়ে বসার ঘরের দিকে এগোয় সে। পা যেন ভারী হয়ে উঠেছে।
মকবুল চৌধুরীর মুখে একটুখানি হাসি,
“নয়না! বেশ বড়ো হয়ে গেছ দেখছি। তা কেমন আছো মামুনি?”
নয়নার গলা শুকিয়ে আসে। তার দৃষ্টি মেঝের এক বিন্দুতে আটকে থাকে। চোখ তুলে তাকাতে পারছে না সে।
“জি ভালো। আপনি বসুন, মা আসছেন। আমি স্কুলে যাবো।”
শব্দগুলো ঠোঁট থেকে বেরোলো, মন থেকে নয়।
মকবুল হালকা হেসে বললেন,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আরে একটু বসো তো। কত বছর পর এলাম তোমাদের বাড়িতে! চকলেট খাবে না?”
নয়না এবার চোখ তুলে তাকায়। লোকটার ঠোঁটের কোণে একধরনের বিকৃত আনন্দ। সে হাসছে, কিন্তু নয়নার শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। তার গলার স্বর হঠাৎ করে আটকে যায়। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। ঠিক তখনই রোকসানা মল্লিক এসে পড়েন। হাতে খাবারদাবার, সাজানো ট্রে। টি-টেবিলের ওপর রেখে মকবুলের দিকে তাকলেন। মকবুল মৃদু হেসে বললেন,
“এগুলোর আবার কী দরকার ছিল,রোকসানা ?”
“সামান্য কিছু বানিয়েছি। খেয়ে নিন। রাতে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হবে।”
বললেন রোকসানা।
” আমি এখুনি চলে যাবো রোকসানা। অন্য একদিন আসব আবার। ”
মকবুল চোখ নামিয়ে খাবারের দিকে তাকালেন। মুখে আবার সেই হাসি। এই হাসির আসল মানে রোকসানা বুঝলেন না, কিন্তু নয়নার রক্তে তা আগুন ছড়াচ্ছে।
রোকসানা ও মকবুলের কথোপকথনের মধ্যেই নয়না স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো
বসার ঘরে তখন রোকসানা বলছিলেন,
“আপনার বন্ধু শুনলে খুব রাগারাগি করবে। প্লিজ আজকে থেকে যান।”
মকবুল হেসে বললেন,
“ঠিক আছে।”
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন রোকসানা। বিকেলে বাজারে যেতে হবে। দুপুরবেলা যা আছে বাসায়, সেগুলো দিয়েই চলে যাবে। সোলাইমান মল্লিক বাসায় ফিরবেন সেই সন্ধ্যায়। সেজন্য রোকসানাকেই বাজার করতে যেতে হবে।
ওদিকে নয়না স্কুলব্যাগ পিঠে, মাথা নিচু করে হাঁটছে। সামনের রাস্তাটা ঝাপসা লাগছে তার কাছে। চোখে অকারণ জল, বুকের ভেতর গুমোট চাপা এক আতঙ্ক। অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তায় হাঁটছে নয়না। চারপাশে যত কোলাহল, তার কানে কিছুই ঢুকছে না। চোখমুখ শুকিয়ে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। গলার ভেতর যেন কাঁটা, এক টুকরো শব্দও সহজে গিলে নিতে পারছে না সে। বারবার জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে, যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইছে—সব ঠিক আছে।
কিন্তু মকবুলের সেই হাসি, সেই সুরে বলা ‘চকলেট খাবে না?’—তাকে ফিরে নিয়ে যাচ্ছে অনেক বছর পেছনে।
তখন সে খুব ছোট—মাত্র পাঁচ কি ছয় বছর বয়স।
তাদের পুরো পরিবার গিয়েছিল গ্রামে। সবাই ছিল খুশি, হইহুল্লোড়ে ভরা সেই সফর। নয়না তখন দুধে-আলতা শিশুময়, প্রাণবন্ত এক ফুটফুটে মেয়ে।
একদিন বিকেলে পুকুরপাড়ে নিয়ে গেলো মকবুল চাচা।
“চাচ্চু, আমরা এখানে কেন এসেছি? চকলেট তো দোকানে থাকে, পুকুরপাড়ে না।”
নয়নার নিষ্পাপ প্রশ্নে মকবুলের মুখে ফুটে ওঠে এক ঠান্ডা, অদ্ভুত হাসি।
চারপাশ শুনশান। এদিকটায় সচরাচর কেউ আসে না।
মকবুল পকেট থেকে তিনটে চকচকে মোড়কের চকলেট বের করে নয়নার দিকে বাড়িয়ে দেয়,
“এই যে তোমার চকলেট।”
নয়না খুশিতে চোখ বড় বড় করে চকলেটগুলো হাতে নেয়।
“চকলেট খুলে দাও না, চাচ্চু,” বলে সে।
মকবুল নিজে হাতে চকলেট খুলে তার হাতে দেয়। নয়না খেতে শুরু করে। মকবুল ওকে কোলে তুলে নেয়।
“নয়না মামুনি, চাচ্চু তো তোমায় চকলেট দিলো… তুমি কি চাচ্চুকে একটু আদর করবে না?”
শিশু নয়না নিষ্কলুষ হাসি হেসে তার কপালে চুমু দেয়। এক মুহূর্তের জন্য সব কিছু খুব স্বাভাবিক, নিরাপদ মনে হতে পারে। তারপর, আচমকা নয়নার মুখ থমকে যায়। সে কুঁকড়ে ওঠে অস্বস্তিতে। কিছু একটা ঠিকঠাক লাগছে না।
“চাচ্চু! আমার ব্যথা লাগছে… তুমি কী করছো?”
তার কণ্ঠে ভয়।
মকবুল শান্ত, ধীর কণ্ঠে বলে,
“আরে বোকা, কিছু হয়নি। তোমাকে তো আদর করছি। ব্যথা একটু হতেই পারে, না?”
আরও একটা চকচকে মোড়কের চকলেট বের করে ওর মুখের সামনে ধরেন মকবুল।
“এই নাও, এটা খাও। খুব মজা। মন খারাপ কোরো না।”
নয়নার চোখ জলে টলমল, ঠোঁট কাঁপে। কিন্তু কিছু বলে না। পুকুরপাড়ে তখনো কেউ আসে না।পুকুরের পানি নীরব, আকাশ থমথমে। শুধু এক শিশুর ভিতর থেকে আসা ঘূর্ণিপাক–নীরবে, নিঃশব্দে।
নয়না অস্বস্তি অনুভব করে, ব্যথা পায়। কিন্তু চকলেট পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য সেসব ভুলে যায়। গ্রামে আসলে প্রায়ই এমনভাবে মকবুল নয়নার সাথে এসব করতো। নয়নার শিশুসুলভ মন কাউকে কিছু বলতেও পারতোনা। তবে নয়না যখন একটু বড়ো হয়ে ওঠে, তখন সে মকবুলের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে। যদিও তখনো পুরোপুরি বুঝতে পারে না, ঠিক কী হচ্ছে, কিন্তু অন্তত এটুকু সে বুঝতে পারত যে, এটি কিছু ভালো ব্যাপার নয়। তাই, মকবুলের কাছ থেকে সে নিজেকে আড়াল করতে শুরু করেছিল।
“এই নয়না! আরেকটু হলেই তো গাড়ির নিচে চাপা পড়তি। মন থাকে কোথায়?”
রাণীর কথায় হুঁশ ফেরে নয়নার। আনমনে হাঁটার ফলে সে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটছিল। রাণী তৎক্ষণাৎ নয়নাকে পাশে নিয়ে আসে।
“সরি রে, কিছু না। চল, চল। লেট হয়ে যাচ্ছে।”
“হ্যাঁ, চল।”
গতরাতের ঘটনার পর থেকে অরার মন-মানসিকতা একেবারে বদলে গেছে। আরিশের পাগলামি ও অত্যাচার সে আর সহ্য করতে পারবে না। এখন তার একটাই সিদ্ধান্ত, সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাবে, যেতেই হবে।
খাবার টেবিলে বসে আছে অরা, কিন্তু খেতে তার কোনো ইচ্ছে নেই। সাবিহা মন দিয়ে খাচ্ছে, কারণ গ্রামে তো এমন রাজকীয় খাবারদাবার ছিল না। তালহা অল্প খেয়ে আরিশের সঙ্গে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। তাসলিমা খাতুনও নিজের মতো খেতে ব্যস্ত। কিন্তু অরার মন কোনো কিছুতে নেই, তার মনে শুধু একটাই চিন্তা—কীভাবে পালাবে।
“ভাবি? কিছু খাচ্ছেন না কেনো?”
তামান্নার প্রশ্নে অরা কিছু বলার আগেই সাবিহা তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
“কুকুরের পেটে তো ঘি হজম হয় না, তামান্না। জীবনে এতো রিচ খাবার খেয়েছে না-কি? হুহ্।”
অরার বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। এতটা অপমানিত সে কখনো হয়নি। সবকিছুই এই লোকটাকে বিয়ে করার জন্য হচ্ছে, অথচ তাকে এই পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তামান্না রাগে ফুঁসছে, কিন্তু কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। তাসলিমা খাতুন অবশেষে বললেন,
“সাবিহা, অহেতুক ঝামেলা সৃষ্টি করিস না। নিজের খাবারে মনোযোগ দে।”
সাবিহা মুখ ঝামটি দিয়ে আবার নিজের খাবারে মনোযোগ দিলো। অরার গলা দিয়ে আর খাবার নামছিল না। তার ভেতর এক ধ্বংসাত্মক অনুভূতি ফুটে উঠছিল। সে নিঃশব্দে খাবারের প্লেট রেখে নিজের ঘরে চলে গেল।
বিছানায় শুয়ে কখন যে চোখ লেগে এসেছিল, অরা বুঝতেই পারেনি। হঠাৎ ঠোঁটে চেনা স্পর্শ অনুভব করে জেগে ওঠে সে। আরিশ! আরিশ তার পাশে বসে, আঙুল দিয়ে তার ঠোঁট স্পর্শ করছে। অরা তাড়াতাড়ি উঠে বসলো, চোখে প্রশ্ন ও অস্থিরতা।
“আপনি আমাকে বিয়ে কেন করলেন?”—অরা তার কণ্ঠে এক ধরনের অস্বস্তি, ক্ষোভ আর কষ্ট মিশিয়ে প্রশ্নটি করল।
আরিশ অরার আচরণের কারণ বুঝতে পারছে না। তবে সে কিছু একটা ঘটেছে, সেটা অন্তত অনুভব করছে। সে ধীরে ধীরে অরাকে কোলে তুলে বসাল। তারপর অরার লম্বাচুলগুলো হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল, যেন কোনোভাবে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু অরা কিছুতেই শান্ত হতে পারছিল না।
“আমার পুরুষত্ব প্রমাণ করতে হবে। সোজা কথায়, শারীরিক সম্পর্কের জন্য। প্রতিটা রাতে এটা বোঝাতে, তাজরিন খান আরিশের মেশিনের শক্তি কতটা। তোমার মতো করেই বললাম, হামিংবার্ড। ”
অরার চোখে ঘৃণা, মুখে বিদ্রুপের হাসি। রাগ, অভিমান, অপমানবোধ—সব কিছু তাকে ঘিরে ধরেছে।
“এটা বোঝানোর জন্য আমাকে এই জেলখানায় আনলেন? শুধুমাত্র এসবের জন্য?”
“হ্যাঁ। ভালোবাসা, প্রেম—এসব বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আই অনলি হ্যাভ ফিজিক্যাল নিডস। আর তুমিও জানো, তোমারও রয়েছে। আমি তোমাকে এমন সুখ দেব, যে তোমার মনে হবে আর কোনো পুরুষের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
“ওওহ।”
অরা চুপ করে গেল। আরিশের সাথে কথা বলার কিছু নেই। সে জানে, লোকটা ভয়ানক। খুবই খারাপ। অরার চোখে জল আসছে, কিন্তু সে কাঁদছে না। এখানে থেকে পালাতে হবে তাকে। যেকোনোভাবে।
আরিশ অরার চুলগুলো খোঁপা করে দিয়ে বলল, “রেডি হয়ে নাও।”
“কেন? কোথায় যাচ্ছি?”
হামিংবার্ড পর্ব ১৩
“শপিং করতে যাবো। গতকাল তো বলেছিলাম।”
অরা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর হাসিমুখে বলল, “ঠিক আছে, রেডি হয়ে আসছি।”
“ওকে, হামিংবার্ড। আই অ্যাম ওয়েটিং ফর ইউ। ”
