হামিংবার্ড পর্ব ৩৫
তাসমিয়া তাসনিন প্রিয়া
রোদ উঠেছে। আলোয় ধীরে ধীরে ভরে উঠছে চারদিক। রাস্তায় গাড়ির শব্দ, মানুষের হাঁটার তাড়া – শহর জেগে উঠেছে নিজের চেনা ব্যস্ততায়। দোকানপাট খুলছে, চায়ের স্টলে ভিড় বাড়ছে, অফিসমুখো মানুষের মুখে তাড়া।
রান্নাঘরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন রোকসানা মল্লিক। নাস্তা তৈরি হয়ে গেছে প্রায়। নয়না নাস্তা সেড়ে, স্কুলে যাওয়ার জন্য ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। সোলাইমান মল্লিক মাত্র রেডি হয়ে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করলেন। পরনে ফর্মাল পোশাক, মুখে হালকা চাপদাড়ি উনার।
“ আজকে আমি তোকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসবো। “
চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন সোলাইমান।
“ আমি তো একাই চলে যেতে পারবো বাবা। তোমার আবার কষ্ট করতে হবে না। “
“ সে আমি বুঝবো। পাকা বুড়ি একটা। “
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আহ্লাদী স্বরে বললেন তিনি। নয়না মুচকি হাসল। এরমধ্যে রোকসানা খাবার হাতে ডাইনিং রুমে এলেন।
“ কী কথা হচ্ছে, বাবা-মেয়ের মধ্যে হুহ?”
“ তেমন কিছু না, মা। আমাকে আজ বাবা স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসবে। “
“ তাহলে তো ভালোই। “
রোকসানা মল্লিক বাপ-মেয়েকে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছেন। সোলাইমান মল্লিক খাবার খেতে শুরু করলেন।
“ প্রায় মাস দুই হবে অরাকে দেখি না সেই যে এলো, তারপর আর কোনো খোঁজ নেই মেয়েটার৷ “
“ আমার সাথে ফোনে কথা হয়, মাঝে মধ্যে। বলল তো সবকিছু ঠিকঠাক চলছে এখন। আরিশ আগের থেকে বদলে গেছে। ওর খেয়ালও রাখছে৷ “
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
বললেন রোকসানা। সোলাইমান মনোযোগ দিয়ে শুনলেন সব। নয়নাও কথা শুনতে শুনতে খাওয়া শেষ করলো।
“ যাক তাহলে ভালোই আছে। আমার সাথে তো আরিশের খুব একটা দেখা হয় না। আমাদের কাজ কেবিনের মধ্যেই, মাসে একবার হয়তো বসের কাছে যেতে হয়। “
“ হুম, বুঝতে পেরেছি। ভাবছি, আরিশকে কল করব। কল করে বলব মেয়েটাকে নিয়ে দু’দিন থেকে যেতে। “
সোলাইমান খাবার শেষ করে পানিটুকু খেয়ে বললেন,
“ এতো ভালোও কি হয়েছে সে? মানে আরিশ কি এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে, বললেই অরাকে নিয়ে আসবে?”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন রোকসানা। নয়না এরমধ্যে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।
“ ভাইয়া অনেক ভালো, বাবা। দেখো, আপুকে নিয়ে ঠিক বেড়াতে আসবে। “
নয়নার কথায় মুচকি হাসলেন রোকসানা।
সোলাইমান বললেন,
“এলেই ভালো। আজ তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে –সেদিকে কারো খেয়াল আছে? নাকি অরা আর পড়াশোনাই করবে না?”
নয়না ও রোকসানা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো একবার। রোকসানা বললেন,
“ আমি অরার সাথে কথা বলে দেখবো। যদিও তোমার মেয়ে লেখাপড়া অপছন্দ করে কিন্তু গ্রাজুয়েট তো কমপ্লিট করবে অন্তত! “
সোলাইমান ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,
“ হ্যাঁ, বলে দেখো। আমি এলাম। নয়না আয় তাড়াতাড়ি। “
“ হ্যাঁ বাবা, চলো। “
নয়না মা’কে ইশারায় বিদায় জানিয়ে বাবার সাথে বেরিয়ে গেলো।
ডাইনিং টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা ভুনা মাংসের প্লেটটা রাখতে গিয়ে তামান্না হঠাৎ থমকে গেল। পাশ থেকে পানির গ্লাস তুলতে গিয়ে অরা হঠাৎ কেঁপে উঠল, বিষয়টা তামান্না খেয়াল করেছে।
” ভাবি? আপনি ঠিক আছেন?”
তামান্নার কণ্ঠে উদ্বেগ। অরা জবাব দিলো না। কিংবা জবাব দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই সে। তার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে, চোখের পাতা ভারী, হাঁটু কেঁপে উঠলো হঠাৎ। তামান্না কিছু বলার আগেই অরার এতটুকু দেহটা ধপ করে নিচে পড়ে গেল। তামান্না আঁতকে উঠে ছুটে গেল তার কাছে।
” ভাবি! ভাবি! চোখ খুলুন!”
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে অরার। নিঃশ্বাস চলছে, কিন্তু খুব ধীরে, যেন একেকটা নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
আরিশ তখন নিজের ঘরে রেডি হচ্ছিল। কেমন হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ শুনে দরজা খুলতেই তামান্নার চিৎকার ভেসে এল কানে। এরমধ্যেই তামান্নার ডাক শুনতে পেলো আরিশ।
” ভাইয়া! জলদি আসেন! ভাবি… ভাবি অজ্ঞান হয়ে গেছে!”
তামান্নার কথায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো আরিশের। ছুটে ডাইনিং রুমে গেলো সে। তামান্না ঘাবড়ে গিয়ে ওড়না দিয়ে অরার মুখে পাখার মতো করে বাতাস করছে। ইতিমধ্যে ডাইনিং রুমে পৌঁছে গেছে আরিশ। সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে, অরার মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“ পানি নিয়ে আয়, রুমে পানি আছে কি-না জানি না। কপালে জলপট্টি দিতে হবে। “
তামান্না আরিশের কথামতো পানি আনতে গেলো। আরিশ এক মুহূর্তও দেরি করল না। পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রীন ট্যাপ করেই বলল,
“ডা. রায়হান, জরুরি– এখনই আমার বাসায় আসুন। এক মুহূর্তও দেরি করবেন না।”
ওপাশ থেকে কিছু বলতেই আরিশ কণ্ঠ চেপে বলল,
“আমি লোক পাঠাচ্ছি আপনাকে আনতে। সময় নষ্ট করবেন না। আমার ওয়াইফ সেন্সলেস হয়ে গেছে। ”
কথা শেষে অরাকে কোলে তুলে নিয়ে বেডরুমের দিকে এগোল আরিশ। তামান্না পিছুপিছু পানির গ্লাস ও বাটি নিয়ে যাচ্ছে। সাবিহা ও তাসলিমা দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছে কেবল।
“ চল তো, একবার গিয়ে দেখে আসি। নয়তো পরে আবার আরিশ কিছু মনে করতে পারে। “
রাগে অসহ্য লাগছে সাবিহার। সব সময় আরিশকে সমীহ করে চলতে হচ্ছে তাদের। এই অনুগত্য ভালো লাগে না তার।
“ চলো দেখি, কী হলো বেডির। “
“ বাচ্চাকাচ্চা হবে না তো?”
মায়ের এমন কথায় চমকাল সাবিহা। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল,
“ আরে না। তা হবে কীভাবে! ওদের মধ্যে তো স্বামী- স্ত্রী’র সম্পর্কই নেই। সেদিন অরার জামাকাপড় চেঞ্জ করার জন্য তামান্নাকে ডেকেছিল আরিশ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বউয়ের পোশাক বদলাতে অন্য কাউকে কি ডাকত? “
“ তা-ও ঠিক। তোর কথায় যুক্তি আছে। চল,চল। “
“ হুম। “
অরাকে কোলে তুলে সোজা নিজের রুমে নিয়ে এসেছে আরিশ। তামান্না হাতে বাটি আর পানির গ্লাস নিয়ে আসছে। আরিশ অরাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে কপালে ঠান্ডা পানির পট্টি চেপে ধরল।
” নিচে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাক। ডাক্তার এলেই সোজা রুমে নিয়ে আসবি, লেট করবি না। ”
তামান্না মাথা নেড়ে দ্রুত পা চালিয়ে ঘর বেরিয়ে গেলো।
“অরা… প্লিজ… চোখ খোলো পাখি। ”
অরার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আরিশের অস্থির লাগছে, এতটা অস্থির এ জীবনে কখনো লাগেনি তার। কেমন মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসছে । অরার কপালে, গালে পরপর কয়েকটা চুমু খেলো সে। চোখ টলমল করছে তার।
” এই অরা? কী হয়েছে তোমার? কথা বলো, আমার জানবাচ্ছা। দেখো, এই রাগী ভূতটা কেমন ভয় পাচ্ছে – তার হামিংবার্ডকে হারানোর ভয় হচ্ছে তার৷ একটিবার কথা বলো? ”
আরিশ একা একা বকতে লাগলো। সাবিহা ও তাসলিমা ঘরে এলেন। আরিশকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে দু’জনেই ভীষণ অবাক হয়েছে। তবে কেউ কোনো কথা বলছে না। কী জানি আরিশের মনমেজাজ কেমন! কিছু জিজ্ঞেস করলে যদি ফোঁস করে ওঠে? তার থেকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকাই বেটার।
পনেরো মিনিট পর ডাক্তার রায়হান আরিশের রুমে প্রবেশ করলেন। চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু আরিশের ফোন পেয়েই তিনি সব ফেলে চলে এসেছেন।
“ মি. আরিশ, কোথায় রোগী?”
“এইদিকে। দ্রুত দেখুন প্লিজ, এখনো জ্ঞান ফেরেনি।”
ডাক্তার কাছে গিয়ে অরার প্রেশার মাপলেন, পালস চেক করলেন। একদম পেশাদার ভঙ্গি। তারপর মুখ গম্ভীর করে বললেন,
“ব্লাড প্রেশার বেশ নিচে নেমে গেছে। হিমোগ্লোবিন সম্ভবত খুব কম। অ্যানিমিয়ার কারণে এমনটা হতে পারে। এখনই একটা ইনজেকশন দিচ্ছি। স্যালাইন দিতে হবে একটু পরই। ইনজেকশন দেওয়ার পর প্রেসার একটু উঠুক, তারপর স্যালাইন। এরপর কিছু ব্লাড টেস্ট লাগবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য।”
আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো।
“ ঠিক আছে, আপনার যা ইচ্ছে ঔষধ দিন কিন্তু আমার অরাকে ঠিক করুন, প্লিজ!”
“ আপনি শান্ত হোন। ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে উনার। তারপর আমি নার্সকে পাঠিয়ে স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। “
“ ওকে। “
ডাক্তার তার কাজ করতে থাকলেন। আরিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কই এর আগেও তো অরার শরীর খারাপ হয়েছে। সেই শরীর খারাপের কারণ অবশ্য আরিশ নিজেই। তখন তো এতো কষ্ট হয়নি, অরার জন্য অস্থির লাগেনি তার। তবে আজ কী হলো? অরার অসুস্থতায় আরিশের গোটা দুনিয়া যেনো অন্ধকার লাগছে। মনে হচ্ছে আরিশের প্রাণপাখিটা অরার ভেতর বসবাস করছে। লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল আরিশ। অরার মাথার পাশে বসে, কপালে হাত রাখল একবার। এরমধ্যে ডাক্তার অরাকে ইনজেকশন দিয়েছেন।
“ আপাতত আমার কাজ শেষ, মি. আরিশ। নার্স পাঠিয়ে দেবো, স্যালাইন দেওয়ার পর কিছুটা স্টেবল হবে আশা করি। তবে আগামীকাল অবশ্যই চেম্বারে নিয়ে আসবেন। “
“ ওকে, ডক্টর । থ্যাংক ইউ। “
“ নো নো, ইট’স মাই ডিউটি। আসছি আমি। “
“ ওকে। “
ডাক্তার চলে গেলেন। সাথে সাথে সাবিহা ও তাসলিমাও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তামান্না দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো এতক্ষণ। ডাক্তারের সাথে সাথে নিচে গেলো মাত্র। আরিশ তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করে বসে আছে, কখন অরার জ্ঞান ফিরবে। মেয়েটার চোখমুখ কেমন ফ্যাকাসে লাগছে। বিয়ের পর থেকে নিজের দিকে কোনো খেয়াল রাখেনি সে। আর রাখবে কীভাবে? দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল আরিশ। তার জন্যই আজ অরার এই হাল। ঠিকমতো যত্ন নিলে মেয়েটার এমন অবস্থা হতোনা। অরার কপালে সময় নিয়ে চুমু খেলো আরিশ। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলো।
জ্ঞান ফিরছে অরার। আরিশ পাশে শুয়ে আঙুল দিয়ে তার ছোটো চুলগুলো মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। ঠোঁটের কোণে একটুকু মুচকি হাসি। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অরার শান্ত মুখটার দিকে।
নড়েচড়ে উঠল মেয়েটা। পুরো চোখ না মেলেও বুঝে গেল, আরিশ আছে, একেবারে কাছে। অরা চোখ বন্ধ রেখেই ধীরে ওর বুকের ভেতর ঢুকে গেল– চুপচাপ, নিরাপদে।
“ হামিংবার্ড! তুমি ঠিক আছো তো ?”
“ হুম।”
অরার সংক্ষিপ্ত উত্তর। আরিশের বুকের মাঝে লুকিয়ে আছে সে। আরিশ এখনও মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।
“ সত্যি, ঠিক আছো? “
“ হ্যাঁ, ঠিক আছি। “
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আরিশ।
“ শরীর খারাপ নিয়ে রান্নাঘরে গিয়েছিলে কেন? আর তোমার যে এনেমিয়া আছে সেটা তো বলোনি আগে!”
অরা মাথাটা একটু বের করে আস্তে আস্তে বলল,
“ বলব কীভাবে? আপনি তো আগে এতটা ভালো ছিলেন না।”
“ তারমানে আমি আগে খারাপ ছিলাম?”
“ নাহ, নাহ। মানে…. আসলে…..”
অরার এলোমেলো কথাগুলো আরিশের ঠোঁটের স্পর্শে থেমে গেলো। মায়া মায়া দৃষ্টিতে আরিশের পানে তাকিয়ে আছে সে। আজকে আরিশের ঠোঁটের স্পর্শ একদম আলাদা ছিলো। শান্ত, নরম, ভালোবাসার ছোঁয়া। কোনো হিংস্রতা, যন্ত্রণা ছিলো না।
“ আর কথা বলতে হবে না। এখন চুপচাপ শুয়ে থাকো। তামান্না নাস্তা দিয়ে গেলে খেয়ে নিও। আমাকে অফিসে যেতেই হবে, সেটা তুমি জানো। তবে আমি তাড়াতাড়ি ফিরবো। “
মনটা খারাপ হয়ে গেলো অরার। লোকটা আরেকটু ভালোবাসলে কী হতো? আরেকটু ভালোবাসলে আজকে অফিসে যেতো না হয়তো। অরার মনে অনুভূতিরা লুটোপুটি খাচ্ছে। ইচ্ছে করছে না আরিশকে ছাড়তে। কিন্তু কী আর করার!
“ ঠিক আছে। “
“ আর শোনো, নার্স এলে ভালো মেয়ের মতো স্যালাইন দিতে দিবে। “
চমকাল অরা, চোখ বড়ো বড়ো করে ফেলল।
“ আমি ভয় পাই ওসব। কী ভয়ংকর সুচ! “
“ এরচেয়েও কয়েক গুণ বড়ো সুচ যখন নিতে পারো, তাহলে অতটুকু সুচও পারবে। ইচ্ছে থাকতে হবে, বেবি। “
শোয়া থেকে উঠে বসলো আরিশ। অরা লজ্জায় অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা মাঝে মাঝে বড্ড অসভ্য কথাবার্তা বলে। অরার নীরবতা দেখে আবারও বলল আরিশ,
“ আমি দুপুরের মধ্যে ফিরবো। তখনই সাথে করে নার্সকে নিয়ে আসবো। বিকেলে স্যালাইন দিবে। আমি থাকবো পাশে। ঠিক আছে এখন?”
অরা ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। আরিশ ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে নিজের চুলগুলো পরিপাটি করছে।
“ আচ্ছা। “
“ গুড গার্ল। আমি গেলাম। “
“ টাটা। “
বাচ্চাদের মতো টাটা বলাতে হাসল আরিশ। কিন্তু অরা ঠিক বুঝতে পারলোনা সেটা। বেরিয়ে গেলো আরিশ। বিছানায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে রইলো অরা।
দুপুরবেলা, রহমান চৌধুরী এবং ফারুক চৌধুরী তাদের অফিসে বসে আছেন, বাতাসে কিছুটা গরম। শহরের ব্যস্ততা একটু দূরে থাকলেও অফিসে চাপপূর্ণ পরিবেশ। জানালার বাইরে রোদ মৃদু ঝলমল করছে, তবে অন্দরমহলে ঠান্ডা, কৃত্রিম আলোয় ভরা। বড় একটা কাঠের টেবিলের চারপাশে বসে আছেন তারা, পাশে এক কাপ কফি রাখা। সম্পর্কে তারা আপন ভাই। রহমান চৌধুরী, বয়স ষাটের কাছাকাছি আর ফরুক চৌধুরীর বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই।
রহমান এবং ফারুক আরিশের বিজনেস রাইভাল। দীর্ঘদিন ধরে আরিশের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাজ করছে তারা, কিন্তু কোনোভাবেই তারা আরিশকে টেক্কা দিতে পারছে না। তাদের সব কৌশল, পণ্য, এবং মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি আরিশের সামনে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তবে তারা শান্ত বসে থাকার পাত্র নয়। তাদের নিজেদের গোপন ব্যবসাও আছে, কিন্তু সেটা পুরোপুরি অবৈধ। তারা জানে, যদি এসব কাজ ফাঁস হয়ে যায়, তারা শেষ হয়ে যাবে। তবে এই মুহূর্তে তাদের একটাই লক্ষ্য – আরিশের ব্যবসায়কে নষ্ট করে নিজের পথ পরিষ্কার করা।
ফারুক কফির কাপের দিকে তাকিয়ে সিগারেট ধরিয়েছেন, ধোঁয়া তার মুখ থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললেন,
“এই আরিশের কিছু একটা করা উচিত এবার ।”
তিনি একটা ঝাপসা হাসি দিলেন, সিগারেটের ধোঁয়া মৃদু ভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে।
রহমান তার হাতে থাকা কিছু কাগজপত্র নেড়ে-চেড়ে বললেন,
“তুমি ঠিক বলেছো। তার ব্যক্তিগত জীবনই এখন আমাদের হাতিয়ার। এই বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি। তবে একটু সময় নেবে। আমাদের পদক্ষেপ খুব সাবধানী হতে হবে। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল তো বাঁকাতেই হবে। ”
তার কণ্ঠে ঠান্ডা এক ধরনের আক্রোশ , মনে হচ্ছে তার লক্ষ্য শুধু আরিশ নয়, তার সমস্ত পৃথিবী ধ্বংস করে দেওয়া।
ফারুক হালকা মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,
“আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা শুধু তার ব্যবসা নয়, তার জীবনের সব কিছু। একবার তার পারিবারিক সম্পর্কগুলো বিপদে পড়লেই তাকে একা পাওয়া যাবে। আর তখন আমরা চাইলে তাকে সহজেই টেক্কা দিতে পারব।”
তিনি কফির কাপটা টেবিলের ওপর রেখে আবারও সিগারেট ধরালেন।
রহমান কাগজগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে খোলামেলা স্বরে বললেন,
“তার ভালোবাসার মানুষদের কাছে যেতে হবে। পেছন থেকে আঘাত আসলে সামনে দাঁড়িয়ে সে কিছুই করতে পারবে না।”
হামিংবার্ড পর্ব ৩৪
“ হ্যাঁ। শুনেছি নতুন বিয়ে করেছে, গ্রাম থেকে তার পরিবারও ঢাকা এসে থাকছে। আগে তো একা ছিলো কিন্তু এখন তার পরিবার আছে সাথে। “
ফারুকের মুচকি হাসলেন রহমান।
“ ঠিক আছে। এবার দেখা যাক। “
তারা দুজনেই চুপ করে গেলো। খান ইন্ডাস্ট্রিকে পথে নামানোই যেন তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
