হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৭+৪৮
তোয়া নিধী দোয়েল
আদনানের খবর পেয়ে ছুটে এসেছে বাড়ির সবাই। হুমাইরা কে সামলানো যাচ্ছে না। যতই সবাই বোঝাচ্ছে— ও ভালো হয়ে যাবে কিন্তু, মায়ের মন সায় দিচ্ছে না। বিধ্বস্ত অবস্থায় আদনানের কেবিনের সামনে বসে রয়েছে তুর্কি। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে৷ ওকে বুকে আগলে রেখেছে উপমা। মুজাহিদ, রেজুয়ান পায়চারি করে যাচ্ছে।
আদনান যখন তুর্কির জন্য ফুল কিনতে গিয়েছিলো— তখন ছোট একটা বাচ্চা হুট করে রাস্তায় ছুটে এসেছিলো। বাচ্চাটার মা-বাবা খেয়াল করেনি। ঐ সময় একটা প্রাইভেট কার ছুটে আসছিলো। আদনান ফুল কিনে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলো। তখন ঐ বাচ্চাটাকে ছুটে আসতে দেখে— ও ছুটে বাচ্চা টা কে বাঁচাতে গেছিলো। বাচ্চাটা সরাতে গিয়ে প্রাইভেট কারটি এসে ওকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। মাথায়, হাতে আঘাত লেগেছে।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর— মুজাহিদ-রেজুয়ান গিয়ে দেখে এসেছে। নার্স আজ রাতে আর কাউকে দেখা করতে দিবে না। তাই, বাকি দের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারলে ও; তুর্কিকে কেউ নিতে পারে নি। ও আদনানের কাছেই থাকবে।
রেজুয়ান- মুজাহিদ কেবিনের বাইরে থাকবে। আর তুর্কি, আদনানের কেবিনে। আদনানে ঘুমে৷ ওর ব্যান্ডেজ করা কপাল দেখে ওর বুক কেঁপে ওঠে৷ চোখ ছাপিয়ে উষ্ণ জলের ঝর্ণা বয়। ও চুপচাপ গিয়ে আদনানের পাশে বসে। ব্যান্ডেজ করা হাত ছুঁয়ে দেয়। কপালে ছুঁয়ে উষ্ণ এক চুম্বন করে৷ কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলে—
— তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যান, স্যার। আল্লাহ্ আপনাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দিক।
আর কথা বলতে পারে না। ফুঁপিয়ে ওঠে। ধীর পায়ে হেঁটে সোফায় শুতে যায়। তবে পাশ ফিরে শুধু আদনানের দিকেই তাকিয়ে থাকে
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
আদনান জেগে ওঠলে সবাই আসে ওর কাছে। হুমাইরা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে ছেলেকে। আদনান মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে— ওর তেমন কিছুই হয়নি। এত চিন্তা করার কোনো কারণ নেই৷ ধীরে-ধীরে সবাই চলে গেলে— ক্লান্ত তুর্কিকে নিজের কাছে ডাকে আদনান। মেয়েটা এক দিনে চেহারার কী হাল করেছে! চুলের কী অবস্থা। তুর্কি পাশে বসলে ও হেসে বলে—
– কী হয়েছে, বেগম সাহেবা? এই কী অবস্থা তোমার?
তুর্কি কিছু বলার আগেই ওর কান্না পায়। ও ফের ফুঁপিয়ে ওঠে। আদনান ডান হাত বাড়িয়ে ওর মুখ ছুঁয়ে দেয়। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে—
– কেঁদো না। এই তো আমি একদম সুস্থ। তুমি ভেঙে পড়লে আমি শক্তি হারিয়ে ফেলি। দূর্বল হয়ে যাই।
– সরি, স্যার।
– কীসের জন্য?
-জানিনা। কিন্তু, সরি।
আদনান মৃদু হেসে ওর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
-আমি অনেক ভয় পেয়ে গেছিলাম, স্যার। আপনি…আপনি আর আমার সাথে অভিমান কইরেন না। আপনি যখন যা বলবেন— আমি তখন তাই শুনবো। আর কখনো কোনো কিছু নিয়ে বায়না করবো না। আপনি শুধু আমাকে রেখে কোথাও হারিয়ে যাইয়েন না!
আদনান ক্ষীণ কণ্ঠে বলে—
-ট্রাস্ট মি— তোমার ওই বাচ্চামো গুলোই আমার সব চেয়ে পছন্দের, বেগম সাহেবা!
তুর্কি ছলছল চোখে মৃদু হেসে বলে—
– আর কখনো আমাকে ছেড়ে যাওয়ার ভয় দেখাইন না। প্লিজ।
আদনান মৃদু হেসে ওকে নিজের দিকে আসতে বলে। তুর্কি একটু নিচু হলে ও ওর কপালে সুখের পরশ এঁকে দেয়। তুর্কি ও গতকালের আদনানের সেই ইচ্ছে পূরণ করে দেয়। আর বলে—
– সরি, স্যার গতকাল আপনার ইচ্ছে টা পূরণ করতে পারে নি। অনেক-অনেক সরি।
– হায়রে…! আবার সরি? এই দিকে আসো।
বাড়ি ফিরে এসেছে আদনান। শরীরের অবস্থা আগের থেকে ভালো। একে-একে প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন দেখে যাচ্ছে। রাত্রি গভীর হলে— তুর্কি, আদনানকে খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দেয়। আদনানের শরীরে কাঁথা টেনে দেয়। নিজে নিচে গিয়ে খাবার খেয়ে আসে। খেতে ভালো লাগে না বেশি৷ যতদিন না আদনান সুস্থ হচ্ছে— মনে শান্তি নেই। রুমে এসে দেখে আদনান ঘুমিয়ে গেছে৷ ও লাইট অফ করে এসে আদনানের পাশে শোয়। একবার ভাবে আদনানের উপর হাত রাখবে। আবার ভাবে যদি ওর শুতে সমস্যা হয়। তাই ভেবে আর দেই না। কিছুক্ষণ পর আদনান ওকে ডেকে ওঠে—
– বেগম সাহেবা।
তুর্কি দ্রুত আদনানের দিমে ফিরে। নিশ্চয়ই কোনো দরকার।
– কিছু লাগবে?
– নাহ্। আমার বুকে মাথা রাখো।
তুর্কি কপালে ভাঁজ ফেলে বলে—
– যদি আঘাত লাগে?
– লাগবে না আসো৷
তুর্কি একটু এগিয়ে গিয়ে আদনানের বুকে মাথা রেখে। আদনান এখাতে ওকে সন্তর্পণে জড়িয়ে ধরে। লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে—
– শান্তি।
তুর্কি মৃদু হাসে। পরপরই হাসি থামিয়ে বলে—
– জানেন স্যার, আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম। ভেবেছিলাম— হয়তো আপনাকে হারিয়ে ফেলেছি।
– আর ভয় পেও না, পাগলি। তোমার সব ভয় আমার বুকের ভেতর ঢেলে দেও। মাঝে-মাঝে সৃষ্টিকর্তা ছোট-ছোট বিপদের মাধ্যমে অনেক বড় বিপদ কাটিয়ে নেয়৷ তাই, হাজার বিপদ আসলে কখনক ভেঙে পড়তে হয় না। নিরাশ হতে হয় না।
তুমি এখন চোখ বন্ধ করো। শান্তির একটা ঘুম দেও। অনেক ক্লান্ত তুমি। অবেক ধকল গেছে। এখন কথা না বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করো।
তুর্কি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে। আদনান ওর পাশে থাকলে ও আর কিছুই চাই না। এ মানুষ টা ঘিরে ওর সব আশা ভরসা।
জানালার সামনে বসে রয়েছে উপমা। স্নিগ্ধ রাতের বাতাস ছুঁয়ে দিচ্ছে ওকে। চাঁদের আলো জানালার গরাদ ভেদ করে ভেতরে ঢুকেছে। রুমে কোনো আলো জ্বেলে নেই। রেজুয়ান এখনো আসে নি। সেইদিনের জোড়াজুড়ি করে জানতে পেরেছিলো— রেজুয়ান অভ্রর বাবার ক্রোসিং সেন্টারে পড়াচ্ছে। খুব জোর করে কাজ টা ও নিয়েছে। আর এর পাশাপাশি চাকরির জন্য পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছে। যে ভাবেই হোক— এই বছরের মধ্যে যে কোনো না কোনো চাকরি পেতে হবে। সকাল সাতটা থেকে বারোটা পর্যন্ত ক্লাস। তার পর আবার তিনটা টিউশনিতে ও নিয়েছে। সেটা পড়াতে-পড়াতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। তবে আজ এত রাত হয়ে যাওয়ার পড়ে ও ছেলেটার কোনো পাত্তা নেই।
কিছুক্ষণ পর, দরজা ঠেলে ভেতরে আসে রেজুয়ান। দেখে ধরে আলো নেই। উপমা জানালে সামনে। ওর হাতে একটা কাঠগোলাপ। ও ধীর পায়ে হেঁটে উপমার পাশে বসে৷ উপমা টের পায় ওর খোঁপায় কেউ কিছু গুঁজছে। কাঠগোলাপ টা খোঁপায় গুঁজা শেষ হলে উপমা প্রশ্ন করে—
– আজ এত দেরি হলো?
-অভ্রর সাথে একটু আড্ডা দিচ্ছিলাম।
– খাবার নিয়ে আসি?
এই বলে ওঠতে যায় উপমা। কিন্তু, রেজুয়ান ওর হাত টেনে নিজের কাছে বসায়। এতে উপমা কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে যায়। ও রেজুয়ানের দিকে তাকায়। শান্ত মুখশ্রী। ক্লান্ত চোখ দু’টি ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ও ধীর কণ্ঠে বলে—
– খেয়ে এসেছি। একটা কথা বলবো?
-কী?
– ভাবিজান কে দেখলে তোমার খারাপ লাগে?
উপমা কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে। মনে দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করে—
– মানে? কামরুন কে দেখলে খারাপ লাগবে কেনো?
– এই যে, ভাই তো প্রতিষ্ঠিত। ভাবির কোনো কিছুতে কমতি রাখে নি। যখন যা চায় সেই ইচ্ছে পূরণ করতে পারে। আর আমি? বিয়ের এত দিন হলো— কখনো একটা সূতা ও তোমাকে দিতে পারে নি। অসহ্য লাগে না আমাকে?
ওর কথায় উপমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর চোখ তুলে ওর কপালে লেপটে থাকা ঘর্মাক্ত চুল গুলো মুছে ওর বক্ষস্থলে মাথা ঠেকায়। এতে রেজুয়ান কিঞ্চিৎ থমকে যায়। উপমা, রেজুয়ানকে আলতো স্পর্শে জড়িয়ে ধরে বলে—
– তুমি বললে হয়তো বিশ্বাস করবে না— আমি ও কয়েকজন ভাগ্যবতী নারী দের মাঝে একজন!
রেজুয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে—
– কীভাবে?
-তুমি ধনী হও গরিব হও তবুও— আমার স্বামী। এই যুগে তো অনেক মেয়েই আছে— যার স্বামী ভীষণ বড়লোক। কিন্তু, কোনো সুখ নেই বা স্বামী ভালো না। অথচ, আমি তাদের তুলনায় কত সুখী। আমার স্বামী শুধুই আমার। এর থেকে বেশি আমার কিছুই চাই না। তাই নিজেকে আমার ভীষণ ভাগ্যবতী মনে হয়— যখন ভাবি আমার ভালবাসার মানুষ টা একান্তই আমার। তার মনে শুধু আমিই আছি!
উপমার কথা শান্তির শ্বাস ফেলে রেজুয়ান। ও-ও জড়িয়ে ধরে ওকে। উপমা ফের বলে—
– আর কামরুন ওই রকম মেয়েই না। তুমি জানো না কী পরিমাণ ভালো!
-হুম জানি। আমার ভাইয়ের মাথা খেয়ে শেষ করে দিচ্ছে।
উপমা ওর বুক থেকে মাথা তুলে বলে—
– একদম আমার বোনের নামে নিন্দে করবে না।
রেজুয়ান মৃদু হেসে বলে—
– ওই দূর রাস্তায় হাঁটতে যাবে?
উপমা জানালার বাইরে চোখ মেলে বলে—
-এই রাতে?
– হুম। দিনে তো সময় দিতে পারি না। এখন চলো।
আদনানের রুমে আড্ডা দিচ্ছে সবাই। আগের থেকে বেশ সুস্থ এখন। রেজুয়ানের টিপ্পনীতে উচ্চস্বরে হেসে ওঠছে আদনান। মুজাহিদ দু’ ঘা বসিয়ে দিলেও ওর কোনো লজ্জাই নেই। এদের মাঝে তুর্কি হাজির হয় চায়ের ট্রে নিয়ে। আর উপমা কিছু ভাজাভুজি নিয়ে। যেমন— সিংগাড়া,পেঁয়াজু আর সমুসা।
আদনান বিছানায় আধশোয়া অবস্থা বসে রয়েছে। মুজাহিদ চেয়ারে বসে বিছানায় পা মেলেছে। রেজুয়ান, মুজাহিদের কোলে মাথা রেখে শুয়েছে।তুর্কি এসে চেয়ার টেনে মুজাহিদের পাশে বসে। উপমা বিছানায় রেজুয়ানে যেখানে শুয়েছে তার পাশে বসে। তুর্কি সবার জন্য চা ঢালতে-ঢালতে বলে—
– চাচ্চু, আজ সবাই মিলে আড্ডা দিবো।
রেজুয়ান চোখ উল্টিয়ে বলে—
– আমার ভাইয়ের মাথা খেয়ে; এখন আমাদের মাথা ও খাবে।
আদনান ওকে মৃদু লাথি দিয়ে বলে—
-আয়, তোরটা আমি ও খেয়ে দেই।
একে-একে সবার হাতে চা দেয় তুর্কি। সবাই সমুসা, সিংগাড়া নেয়। বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা শুরু করে। হাসি-ঠাট্টা করতে-করতে পেরোতে থাকে সোনার মূহুর্ত।
সময় নিজ গতিতে বহমান।
পানির স্রোতের মত ভেসে চলে যায়। কত হাসি- কান্না, সুখ-দুঃখ নিয়ে পেরিয়ে গেছে কত দিন। সবাই নিজের মত ব্যস্ত। রেজুয়ানের চাকরি হয়ে গেছে। সে উপমাকে নিয়ে সাভার থাকে। তুর্কি-আদনান ঢাকা-উত্তরা থাকে। আদনানের ঢাকা ট্রান্সফার হয়ে গেছে। বাড়ি টা এখন মৃত মনে হয়। ওদের হৈ-হুল্লোড়ে সব সময় মেতে থাকতো বাড়ি। আজ একদম জন শূন্য। মুজাহিদ জানালার সামনে বসে পুরোনো স্মৃতি গুলো বিচরণ করছিলো। দুই ভাতিজার সাথে কাটানো মূহুর্ত গুলো। আবার কবে ওদের দেখা হবে কে জানে।
তুর্কি ব্যালকনিতে থম মেরে বসে রয়েছে। কিছু একটা নিয়ে ও ভীষণ নার্ভাস। হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে দেখেছে একটা জিনিস। রাত প্রায় অনেকটা। আজ তো ওর মেডিকেলের রেজাল্ট দেওয়ার কথা। কিন্তু, আদনান তো এখনো কিছু জানালো না। ওর কি চান্স হয়নি। তাই লোকটা রাগ করে রয়েছে? কিন্তু ওর তো আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানিয়েছে ওর চান্স মেডিকেলেই হবে। তাহলে?
তবে ও মোটেও মেডিকেলের রেজাল্ট নিয়ে নার্ভাস না। অন্য একটা কারণ!
হাতে একটা কেক, এক গুচ্ছো গোলাপ নিয়ে তুর্কির পিছনে এসে দাঁড়ায় আদনান। ব্যালকনিতে থাকা টেবিলে কেক, ফুলের তোড়া রাখে। তুর্কির নাকে আদনানের পারফিউমের ঘ্রাণ ভেসে আসলে ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। আদনান ওর পাশে দাঁড়িয়ে কেক আনবক্সিং করছে। তুর্কি অস্থির কণ্ঠে বলে—
– স্যার, রেজাল্ট কি দেই নি? কিছু তো বললেন না।
আদনান কোনো উত্তর দেয় না। তুর্কি ওর উত্তর না পেয়ে আরও নার্ভাস হয়ে যায়। হাত রাখা ছোট বস্তু টিকে শক্ত করে চেপে ধরে ওড়নার আড়ালে লুকায়। আদনান কেকের উপর টু ইয়ার্স লিখে তুর্কির সামনে আসে। সাথে গোলাপের তোড়া টা ও। কাটায়-কাটায় ১২ টা ১ মিনিট বাজার সাথে-সাথে তুর্কির মুখোমুখি বসে বলে—
– হ্যাপি অ্যানিভার্সারি, বেগম সাহেবা। আরও শত বছর আমার সাথে চলার জন্য আমন্ত্রণ রইলো!
আজ ওদের বিবাহবার্ষিকী। ও বেমালুম ভুলে গেছে। ও লম্বা করে আসে। আদনান ফের বলে—
– এন্ড কংগ্রাচুলেশনস মাই, ডক্টর ওইয়াফ! আপনার শেরে-বাংলা মেডিকেল কলেজে চান্স হয়ে গেছে!
কথাটি শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। অবশেষে ও আদনানের সমান- সমান হতে পারবে। ও একটু এগিয়ে এসে আদনানের গলা জড়িয়ে ধরে। আদনানের এক হাতে কেক, আর অন্য হাতে তোড়া থাকার কারণে ও ধরতে পারে না। তুর্কি আনন্দের সহিত বলে—
– আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ। অবশেষে, অবশেষে আমি আপনার সমান-সমান হতে পারবো৷ উফফ্ কী যে আনন্দ হচ্ছে আমার বলে বোঝাতে পারবো না। আমি ভাবতে পারছি না— আমার মত গণ্ডমূর্খ নাকি মেডিকেলে চান্স পেয়েছে!
আদনান মৃদু হেসে বলে—
– সব পরিশ্রমের জন্য, বেগম সাহেবা। পৃথিবীতে মেধা বলতে কিছু হয় না। যে যতবেশি পরিশ্রমী; সে ততবেশি মেধাবী।
– হ্যাঁ। তবে চলার পথে একজন সঠিক মানুষ দরকার। যে পথ দেখিয়ে দিবে৷ আর আপনি সেই অসাধারণ মানুষটি আমার জীবনে। থ্যাঙ্কিউ, স্যার।
– মোস্ট ওয়েলকাম, ম্যাডাম। এখন কেক কাটিং করো চলো।
তুর্কি, আদনানের গলা ছেড়ে দেয়। ফুলের তোড়া নিয়ে এক পাশে রাখে। আদনান ছুরি আনতে গেলে তুর্কি লম্বা করে একটা শ্বাস নেয়৷ সব সময় তো আদনান ওকে সারপ্রাইজ দিয়েছে। আজ আদনানকে ও বিশাল বড় একটা গিফট দিবে। যা আদনানের জীবনে বেস্ট একটা জিনিস হবে।
আদনান ছুরি নিয়ে ফিরে এসে তুর্কির পাশে বসে। কেক হাতে নিয়ে বলে—
– এইটার গিফট তোলা রইলো। আজ আমরা ( যেহেতু রাত ১২ টা হয়ে গেছে) মানিকগঞ্জ যাবো। মোহনা-সূচনার বিয়ের ডেট পড়ে গেছে৷ আবার তোমার চান্স হলো। সব মিলিয়ে বাড়ি একটা উৎসব হবে।
মোহনা-সূচনার বিয়ে অনেক আগেই ঠিক হয়ে ছিলো। শুধু তুর্কির অ্যাডমিশনের জন্য বিয়ের তারিখ পিছানো হয়েছে। আদনান, তুর্কির পিঠের পাশ দিয়ে হাত দিয়ে তুর্কির কাঁধে রাখে। সামনে কেকে রেখে তুর্কির হাতে হাত রেখে কেক কাটতে যায়। তবে তার তুর্কি বাঁধা দেয়। ও আদনানের দিকে তাকিয়ে বলে—
– আপনার গিফট নিবেন না?
আদনান উপরে-নিচে মাথা নাড়ায়। ওর চোখে- চোখ রেখে বলে—
-কেক কাটিং এর আগেই?
-হুম। চোখ বন্ধ করে হাত দিন।
আদনান ভ্রু কুঁচকে বলে—
– কেনো?
-আরে করুন না।
আদনান ওর পিঠে রাখা হাত সরিয়ে ওর সামনে পেতে চোখ বন্ধ করে। তুর্কি আবারও লম্বা করে শ্বাস নিয়ে ওর মুঠোয় থাকা বস্তুটি আদনানের হাতে দেয়। আদনানের কানের দিকে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে—
– কংগ্রাচুলেশনস, স্যার! ইউ উইল বি ফাদার!
কথাটি বলে দূরে সরে যায় তুর্কি। ওর বুকে মৃদু কম্পন হচ্ছে। আদনান দ্রুত চোখ মেলে তাকায়। হাতে প্রেগন্যান্সি পজিটিভ কিট দেখতে পায়! ও ভাষাহীন হয়ে গেছে। সত্যি, কেউ আসছে! ও তুর্কিকে টেনে বুকের মাঝে চেপে ধরে। চোখ থেকে আনন্দশ্রু গড়িয়ে নামে। কম্পিত কণ্ঠে বলে—
– সত্যি, বেগম সাহেবা? সত্যি?
– ইয়েস, স্যার! আপনি বাবা হচ্ছেন।
– আমি তোমাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না এ আনন্দে কথা! মানে…মানে…!
ও তুর্কিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ভাসা-ভাসা কণ্ঠে বলে—
– আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, বেগম সাহেবা। এত তাড়াতাড়ি আমাদের একটা ছোট পুঁচকো আসছে।
তুর্কি কপালে ভাঁজ ফেলে বলে—
– আপনার জন্যই তো। আমার তো প্রথম থেকেই ইচ্ছে ছিলো— ওই মুরব্বিদের কথা শোনার। যারা কয় দিন পর-পর এসে বলে যেতো— কী গো বউ, পুলাপান লইয়া ফালাও। তাড়াতাড়ি পুলাহান লওয়া ভালো। আমার বাবু, সংসার ভীষণ পছন্দের। তাই তো আগে-ভাগে বিয়ে করে ফেলেছিলাম। কিন্তু, তখন আপনি যে ধাতু দিয়ে তৈরি ছিলেন। মা গো মা! সব সময় খ্যাঁক-খ্যাঁক করতেন।
আদনান মৃদু হেসে বলে—
– মা হতে চললে, তবুও বাচ্চামি স্বভাব টা আর গেলো না?
– না। এ জীবনে যেতে দিবো না।
অতঃপর দীর্ঘক্ষণ আলিঙ্গনের পর কেক কাটে দু’জন। একে উপর কে ফের শুভেচ্ছা জানিয়ে সুন্দর একটা মূহুর্ত উৎপাদন করে।
বাড়ি ফিরিয়েই তুর্কি ফের সেই হুড়োহুড়ি শুরু করে দিয়েছে। সবাইকে এত দিন পর পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছে। আদনান শতবার ওকে চোখ রাঙানি দিচ্ছে এত দৌড়াদৌড়ি না করতে। এত হৈ-হুল্লোড় না করতে। কিন্তু, এই মেয়ে কথা শোনার নয়। মা হতে চললো তবুও এর মাঝে বিন্দু মাত্র ম্যাচুরিটির লেশ মাত্র নেই। উপমা-রেজুয়ান কিছুক্ষণ আগে এসে পৌঁছিয়েছে। ওরা আসতেই আরেকটা সুসংবাদ উপস্থিত হয়েছে বাড়িতে। উপমা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা! এত দিন মৃত মাস্টার বাড়ি আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় চলছে৷ ধীরে-ধীরে আত্মীয় -স্বজন সব আসছে৷ মোহনা- সূচনার এক বাড়ি হচ্ছে। বড় কথা হলো তাঁরা ও দুই যমজ ভাই!
রেজুয়ান, আদনান আর মুজাহিদের পাত্তা নেই। নিশ্চয়ই আবার সেই আড্ডায় বসেছে৷ রেজুয়ান- আদনান, মুজাহিদের কোলে মাথা রেখে শুয়েছে। একটু পরপর উচ্চস্বরে হেসে ওঠছে। রেজুয়ান স্বভাবতঃ মুজাহিদ কে টিপ্পানী কাটছে—
– বাপের ভাই , এ জীবনে তোমার বিয়ে আর হলো না। নাতি-নাতনি চলে আসলো। তুমি সিংগেলই থাকো।
মুজাহিদ চোখ রাঙিয়ে বলে—
– বিয়ে করবো না মানে? আমার দুই নায়কা আসতে চলেছে। এবার দেখ এক সাথে দু’টাকে পটিয়ে ফেলবো।
আদনান, রেজুয়ানের উদ্দেশ্যে বলে—
-কখনোই এই রকম একটা বুড়া জামাই আমরা মানবো না। এর থেকে ভালো হবে— আমার একটা মেয়ে হবে; আর মীমের একটা ছেলে। তার পর আমরা ওদের বিয়ে দেবো। তা না হলে— আমার একটা ছেলে হলে ওর একটা মেয়ে হবে৷ তারপর ওদের বিয়ে দিয়ে দিবো। ফাইনাল!
মুজাহিদ অবাক কণ্ঠে বলে—
– এএএ! আমি এত দিন এই দুই নাইকার জন্য সিংগেল৷ আর তোরা তোদের মেয়ের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিস? বেইমানের দল!
সবাই রাতের খাবার খাওয়ার জন্য বসেছে। তুর্কি দুই হাত ভরে মেহেদি পড়েছে। উপমা সবাইকে মেহেদি পড়িয়ে দিচ্ছে৷ আদনান উপর থেকে নেমে এসে প্লেটে খাবার নিয়ে তুর্কির সামনে বসে। এক লোকমা খাবার তুলে তুর্কির মুখের কাছে নেয়৷ উপস্থিত সবাই সশব্দে হেসে ওঠে। কেউ কেউ বলে—
– হাইরে! বউটারে চোখে হারায়।
তুর্কি এতে বিব্রত হয়ে বলে—
– স্যার, কী হচ্ছে? সবাই এখানে উপস্থিত৷ সরুন এখান থেকে।
-সরুন মানে? হাতে মেহেদি খাবে কীভাবে? চুপচাপ হাঁ করো। দেখুক সবাই। তুমি তোমার খাবার শেষ করো। আর আমি মোটেও তোমার খাওয়ার জন্য জোর করছি না। যে আসছে তার খিদে পেয়েছে। তার জন্য এত কিছু করছি।
তুর্কি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। দাঁতে-দাঁত চেপে বলে—
– ঢং দেখে বাঁচি না। যতসব।
রেজুয়ান এসে দেখে উপমার সবাইকে মেহেদি পড়াচ্ছে। আদনানকে, তুর্কিকে খাইয়ে দেখতে দেখে ও উপমার পাশে গিয়ে বসে। ওর হাত দেখে বলে—
-তোমার হাতে মেহেদি কই? দেখো ভাই কী সুন্দর ভাবিকে খাইয়ে দিচ্ছে! তোমার হাতে মেহেদি থাকলে আমি ও দিতাম। ধুরু লস হয়ে গেলো।
উপমা হেসে ওর হাতে মেহেদির কোণ দিয়ে বলে—
– খাইয়ে দিতে হবে না। তুমি আমায়ার হাতে বরং মেহেদি পড়িয়ে দেও।
রেজুয়ান মেহেদির কোণ দেখতে-দেখতে বলে—
– আমি তো পারি না।
-আরে ফোন দেখে-দেখে দিবে।
রেজুয়ান ফোন দেখে-দেখে দেওয়া শুরু করে। এক ফুল আঁকতে ও দশ বার ফোন দেখে। এই নিয়ে সবাই ঠাট্টা-তামাশা করে। মুজাহিদ ব্যথিত কণ্ঠে বলে—
– এই সব দেখতে-দেখতে আমার জীবন যাবে!
সাড়ে সাত মাস চলছে তুর্কি। গর্ভাবস্থায় দিন গুলো ভালো-খারাপ মিলিয়েই কাটতে ওর। তবে, সর্বক্ষণের সঙ্গী হিসেবে থেকে ওর স্বামী। আদনান কলেজ থেকে এসে ওর খাওয়া, গোসল, ঘুম, যত্ন যাবতীয় সব। মনবল হারিয়ে ফেললে বুকে চেপে সাহস জুগিয়ে দেয়। একজন মেয়ের জীবনে সব চেয়ে কষ্টের সময়, যদি তার স্বামী তার পাশে থাকে— তাহলে আর কী লাগে?
মাত্র আদনান ওকে খাবার খাইয়ে চুল আঁচড়ে বেণী করে দিয়ে বালিশ টেনে দেয়। তুর্কি শুয়ে পড়ে৷ আদনান ঘরের আলো নিভিয়ে ওর পাশে আসে। আদনানের হাত টেনে ওর পেটে হাত রাখে। চোখ-মুখ খিঁচে বলে—
– স্যার, দেখছেন ও কেমন নড়াচড়া করছে?
আদনান পেটে হাত বুলিয়ে বলে—
– ওর দোষ কী? দোষ তোমার। তুমি যে পরিমাণ দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি করো— ও সব তোমার থেকে শিখছে।
তুর্কি অন্ধকারে আদনানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে—
– মোটেও আমি দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি করি না। ও সব আপনার থেকে শিখছে।
আদনান ওর কপালে চুম্বন করে বলে—
– হয়েছে। প্যাঁচাল না পেরে এখন ঘুম আসো।
– স্যার!
একটু অদ্ভুত স্বরে ডাকে তুর্কি। আদনান বলে—
-হুম?
– একটা কথা বলবো?
– বলো।
– স্যার, আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে। যদি আমার কিছু…
মুখ চেপে ধরে আদনান। ওকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরে রাগান্বিত স্বরে বলে—
– মুখ বেশি ছুটছে তোমার। কানের তিন আঙুল নিচে মারা দরকার। ফালতু কথা ভাবতে মানা করছি না? কিচ্ছু হবে না। আল্লাহ্ উপর ভরসা রাখো। আর আমি আছি তো। দোহাই লাগি এই সব বলো না। প্লিজ!
তুর্কি মৃদু হেসে আদনানকে জড়িয়ে ধরে।
-ভয় হয় আমার।
– ধুর বোকা। কোনো ভয় নেই। আল্লাহ্ আছেন তো। তাঁকে বেশি-বেশি স্মরণ করো। দেখবে সব ভয় দূর হয়ে যাবে।
ওদের কথার মাঝে বেজে ওঠে আদনানের ফোন। এত রাতে আবার কে কল করলো? ও হাত বাড়িয়ে ফোন আনে। মুজাহিদ কল করেছে। বাড়ির কোনো সমস্যা হলো না তো। ও দ্রুত ফোন ধরে। ওপাশ থেকে মুজাহিদ অস্থির কণ্ঠে জানায়— উপমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পেইন ওঠেছে। বাড়ির সবাই সাভারের উদ্দেশ্যে আসছে।
আদনান, তুর্কিকে এই কথা জানানোর পর তুর্কি একটু অস্থির হয়ে যায়। উপমার কে অবস্থা কে জানে। আল্লাহ্ যেনো ওকে সুস্থ করে দেয়। এত রাতে আদনান তুর্কি কে ফেলে ঢাকা থেকে সাভার যেতে পারবে না। তাই ও তুর্কিকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। ঘণ্টাখানিক পার হওয়ার পর খবর আসে— রেজুয়ান এক রাজকন্যার বাবা হয়েছে!
তুর্কি তো আনন্দে আত্মহারা। মা, বাবু দু’জনই ও আল্লাহ্ রহমতে সুস্থ আছে।
ব্যস্ত পায়ে হাসপাতালের করিডরে পায়চারি করছে আদনান। তুর্কিকে কিছুক্ষণ আগে অটিতে নেওয়া হয়েছে। ওর পাশে মুজাহিদ, রেজুয়ান। ওরা মানিকগঞ্জ এসেছে অনেক আগে। রেজুয়ানের মেয়ে হওয়ার পরপরই এসেছে। হুমাইরার কড়া আদেশ— সে নাতনি, বউমাকে দূরে রাখবে না। আর তুর্কি ও জেদ ধরেছিলো— এই ঢাকার ব্যস্ত শহরে ও আর থাকবে না। বাড়ি যাবে। সবাই নতুন বাবুকে নিয়ে কত্ত মজা করছে। আদর করছে। আর ও একটা মাত্র খালামণি হয়ে নাকি দূরে থাকবে।
আবার আজ শহিদ হাসান আসছে। আলামিন, মুমিনুল তাকে আনতে গেছেন।
আদনানের অস্থিরতা দেখে মুজাহিদ ওর কাছে আসে। পিঠে হাত বুলিয়ে বলে—
-চিন্তা করিস না, বাচ্চা। আল্লাহ্ কে স্মরণ কর।
আদনান কোনো উত্তর দেয় না। ওর বার বার তুর্কির আর্তচিৎকারের কথা মনে পড়ছে। মেয়েটার সে কী কান্না! কতই না কষ্ট হয়েছে ওর। ও মনে-মনে সৃষ্টিকর্তার নাম জবতে থাকে। এই বিপদের দিনে তিনিই একমাত্র মুক্তির পথ। তিনি একমাত্র ভরসা। তিনি ব্যতীত আর কেউ সাহায্য করতে পারবে না।
বেশ অনেকক্ষণ পর— ছোট বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসে কেবিন থেকে। কেবিনের দরজা খুলে যায়। বাচ্চার কান্নার আওয়াজ এসে বাড়ি খায় আদনানের বুকের পাজরের সাথে। ও স্তব্ধ হয়ে তাকায় সেই দিকে। রেজুয়ান- মুজাহিদ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে—
– আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!
আদনান কী বলবে ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। শুধু তাকিয়ে আছে একজন নার্স— একটা সাদা তোয়ালে মুড়িয়ে একটা ছোট পুতুল নিয়ে আসছে! নার্স এসে আদনানের কোলে দেয় সেই পুতুল টি-কে। আদনান কাঁপা-কাঁপা হাতে কোলে তুলে নেয় তার রাজকন্যা কে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে আনন্দ অশ্রু।
তুর্কি ও আল্লাহ্ রহমতে সুস্থ আছে৷ ও মুজাহিদের কোলে দিয়ে ছুটে যায় তুর্কির কাছে। তুর্কির জ্ঞান কিছুক্ষণ আগে ফিরেছে। আদনান ওর ক্যানুলা পড়া হাত ধরে। তুর্কি ক্ষীণ কণ্ঠে বলে—
– ওয়েলকাম, স্যার! নাও ইউ এ ফাদার।
আদনান ঠোঁটে আঁকা হাসি নিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। কপালে চুম্বন এঁকে ভাঙা কণ্ঠে বলে—
– ইউ টু, ম্যাডাম। নাও ইউ এ মাদার।
দু’জনে-দু’জনের দিকে তাকিয়ে এক সাথে হেসে ওঠে। আদনান ফের বলে—
– এখন কেমন লাগছে?
– আলহামদুলিল্লাহ।
তুর্কির রিলিজ হয়ে গেছে। মাস্টার বাড়ি আজ আনন্দের ফোয়ারা। উৎসব লেগে গেছে যেনো। বাচ্চা হওয়ার পর সাধারণত মেয়েরা বাপের বাড়ি যায়। কিন্তু, হুমাইরা কিছুতেই তুর্কি কে যেতে দিবে না ওই বাড়ি। সে জুবাইরাকে ধরেবেঁধে নিয়ে এসেছেন এই বাড়ি ছিলেন। শহিদ হাসান ও এসেছেন। রাতের খাবারের আয়োজন করছেন — রচনা। হুমাইরা আপাতত তার দুই নাতনিকে নিয়ে পড়ে আছেন। তাকে সাহায্য করছে জুবাইরা। যদিও রচনা হাজারবার বলেছে সাহায্য করতে হবে না। তবুও করছেন। আলামিন, মুমিনুল, শহিদ আর মুজাহিদ বৈঠকখানায় গল্প করছেন।
থেকে-থেকে বাবু কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে বাড়ি থেকে। একবার আদনানের মেয়ে কান্না করে; তো একবারে রেজুয়ানের মেয়ে। আদনানের মেয়ের নাম এখনো রাখা হয়নি। রেজুয়ানের মেয়ের নাম— রেজুয়ানা ফরাজি উমা। উপমা বেশ যাতাকলে পড়েছে মেয়েটাকে নিয়ে। সারাদিন ফুঁপিয়ে উলটো হয়ে ঘুম পারে। আর রাত হলেই পেঁচা পাখির মত চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। এই যে এখনো উপমা ঘুম পারানোর চেষ্টা করছে; কিন্তু, পাখি টার চোখে ঘুম নেই। রেজুয়ান রুমে আসতেই উপমা এক ধমক দেয় ওকে—
– এই তোমার মেয়ে নিয়ে যাও তো। আমি আর ওকে রাখতে পারবো না। কয়টা বাজে দেখো তো। ওর চোখে এখনো ঘুম নেই৷
রেজুয়ান এসে ওর কোল থেকে রেজুয়ানাকে নিয়ে বলে—
-দেও। রাখতে হবে না আমার মেয়েকে তোমার। যাও কই যাবে চলে যাও। আমি আমার মেয়েকে একাই ঘুম পারাতে পারবো।
উপমা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ওকে দেয়।
– তাড়াতাড়ি ধরো। আমি হাঁপিয়ে গেছি। এত দুষ্টমি ও কীভাবে করতে পারে? আমি কতক্ষণ ধরে ঘুম পারানোর চেষ্টা করছি— অথচ একটু ঘুম নেই চোখে।
– এক দম মায়ের মত হয়েছে।
উপমা ভ্রু কুঁচকে বলে—
– একদম আন্দাজে কাহিনি বলবে না। ও তোমার মত হয়েছে। তুমি যেমন বজ্জাত— মেয়েটাকে ও এই সব শিখছে।
– আচ্ছা? কে যেনো পালিয়ে এসেছিলো?
ঝগড়ায় না পারলে রেজুয়ান এই বলে ওকে দমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু, উপমা ও দমে যাওয়ার মেয়ে নয়। ও- ও বলে—
– কে যেনো আগে প্রপোজ করেছিলো? বেহায়ার মতো আমার পিছু ঘুরতো?
তুর্কি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিছানার শোয়ানো রাখা পুতুল টার দিকে। যে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তুর্কি ভেবে পাচ্ছে না— এত মাস ওর পেটে থেকে আদনানের ফোটোকপি হয়ে কীভাবে বের হতে পারে? আদনান রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। মেয়ের পাশে শুনে জড়িয়ে ধরে কপালে চুম্বন করে। তুর্কি, আদনানের উদ্দেশ্যে বলে—
– স্যার, এইটা কী হলো?
আদনান ভ্রু কুঁচকে বলে—
-কী?
– ও এত দিন আমার পেটে থেকে; আপনার ফটোকপি কীভাবে হলো? এইটা আমি মানিনা।
-আমার রাজকন্যা আমার মত হবে না?
তুর্কি মুখ বাঁকিয়ে ওর মুখ এগিয়ে দিয়ে বলে—
– ওকে একটা চুমা দিয়েছেন। আমাকে ও দিন।
আদনান মৃদু হেসে ওকে নিজের কাছে টেনে নেয়। কানের পিঠে চুল গুঁজে দিয়ে কপালে চুম্বন করে। দুই গালে ও চুম্বন করে। বুকে চেপে ধরে বলে—
-মা হয়ে গেলে, তবুও বাচ্চামি কমে না তাইনা?
তুর্কি ওর বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বলে—
– না। কখনো কমবেনা। কমলে ভালোবাসা ও কমে যাবে। আর আমি আপনাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি আর ভীষণ রকমের ভালোবাসি!
আদনান হেসে প্রত্যুত্তরে বলে—
তোমায় আমি ভালোবাসি,
তোমার থেকেও বেশি,
জানা নেই তোমার,
ওগো আমার অষ্টাদশী…!
দিনের কোলাহল,
রাতের নীরবতায়।
চোখের আড়ালে,
কিংবা স্বপ্নের পাহাড়ে,
তোমারই নাম আমি
লিখি শতবারে।
তুমি আমার প্রার্থনায়,
তুমি আমার ধ্বনি,
তুমি আমার ভালোবাসার
অমলিন স্বর্ণখানি।
বেগম সাহেবা, তুমি জানো না,
হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪৬
তোমায় নিয়ে লেখা যত গল্প, যত কবিতা যত আকুলতা,
প্রতিটি আমার হৃদয়ের সঙ্গোপনে যত্ন করে লেখা!
চিরদিনেই থাকো আমার, চিরসাথী হয়ে।
ইতি
তোমার— অসভ্য আনরোমান্টিক, স্যার।
