৪ বছরের চুক্তির মা পর্ব ৪৬
সারা চৌধুরী
সন্ধ্যা সাত টা বাইশ ।শুভ্রদের পর পর তিন টা গাড়ি এগিয়ে চলেছে রেইনকোট ক্যাফের উদ্দেশ্যে। শুভ্র ড্রাইভ করছে পাশে সারা
শুভ্রদের পরের গাড়িতে শ্রাবন অহনা মিসেস সুমনা অরু আর মিসেস আনিতা।আর পরের গাড়িতে ফারুক তালুকদার আর অর্ক আর পিছনে ফাতিহা আর আনিশা আর অন্তু।।
আনিশার মন টা প্রচন্ড খারাপ। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে যদিও। গাড়ির ভিতরের লাইট অফ থাকাই সেটা কারোর চোখে পড়ছে না।তবুও অর্কের দৃষ্টি বুজে গেল আনিশার কান্না।তবে কোনো মাথা ঘামাল না সে।আনিশা চোখে ভেসে উঠলো সেই মুহুর্ত..
ফ্লাসব্যাক….
আনিস তালুকদার এর বকা শুনে মিসেস সুমনার কাছে বাধ্য হয়ে সাজতে বসেন।ব্লু কালারের গাউন পরে চুল ছেড়ে রেখেছে।আর কিছুই না।তার মন ভালো না।শরীর ভেঙে আসছে।বুকের ভিতরে অসম্ভব পিড়া দিচ্ছে।এইতো কিছুক্ষন আগে আনিশা রুম থেকে বেরিয়ে সিড়ি বেয়ে নিচে আসে।তখন ফারুক তালুকদার আনিশাকে রেডি হয়ে নিতে বলে।আনিশা কারন জিজ্ঞাসা করলে তিনি সারপ্রাইজ এর কথা বলেন।আনিশা চাইলেও কাওকে জিজ্ঞাসা করতে পারে নি শ্রাবন আর অহনার কথা।
আনিশা সিড়ি বেয়ে উপরেই আসছিলো ঠিক তখনই অন্তু পিছন থেকে এসে বলে..
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“আপু জানিস অহনা আপু বড় ভাইয়ার বউ।
অন্তুর কথা শুনে আনিশার পা থেমে যায়। চলতে চেয়েও পারে না।আনিশা অন্তুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে..
-“কি আজে বাজে বলছিস..?
অন্তু কিছু বলার আগেই মিসেস আনিতা বলে উঠে..
-“হ্যা রে মা সত্যি। কিছুদিন আগে ওর জন্য মেয়ে খুজেছি আর আজ কত বড় সারপ্রাইজ হয়ে গেছি।
কথাটা শোনা মাত্র এক মুহুর্তের জন্য আনিশার পায়ের নিচের মাটি সরে গেলো।গলা শুকিয়ে গেলো।চোখ৷ টলমলিয়ে উঠলো। কন্ঠ ভেদ করে কোনো কথা বের হচ্ছে না।নিজের কানকেও জেনো বিশ্বাস করতে পারছে না।আনিশা উল্টো ঘুরে ছুটে নিজের রুমে চলে আসলো এসে দরজা লাগিয়ে দিলো।
আনিশার ছুট দেখে আনিতা হাসলেন।মনে মনে বলেও ফেললেন “পাগল মেয়ে একটা খুশিতে লাফিয়ে উঠছে।
ফারুক তালুকদার সবাইকে গুছিয়ে রেডি হতে বলেছেন।কারন এখন বলবেন না তবে আজ বাইরে যাবে।শুভ্র আগে ভাগে এসে মিসেস সুমনার কাছ থেকে বাক্স টা গাড়ির ডিকিতে রেখে দিয়েছে।
আনিশা ঘরে গিয়েই বিছানার পাশে বসে ঢুকরে কেদে উঠে।বুকের ভিতরে চিনচিন ব্যাথা করছে।মনে হচ্ছে তার দোম বন্ধ হয়ে যাবে।আনিশার মনে হতে থাকে সেই সব ঘটনা যে গূলো তার জিবনে জড়িয়ে আছে শ্রাবন এর সাথে। তাহলে কি শ্রাবন ভাই তাকে এই জন্যই পাত্তা দিতো না।আচ্ছা আমি কি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছি।ঘুম ভেঙে সব আগের মতো হয়ে যাবে।আনিশা নিরবে চোখের পানি ফেলছে। কিছু ভালোবাসা প্রকাশ করার আগেই মরে যায়।যেমন তার ভালোবাসা।
একটু পর অন্তু এসে আনিশাকে ডাকলে আনিশা কাঠকাঠ ভাবে বলে দেয় যাবেনা। ঠিক সে সময় আনিস তালুকদার দরজায় নক করে।আনিশা তাড়াতাড়ি চোখ মুখ মুছে দরজা খুলে দেয়।আনিস তালুকদার বেশ কড়া কন্ঠেই বলে..
-” যাবে না কেন..?
আনিশা চুপ হয়ে যায়।বাবার মুখের উপর কোনো কথা বলার সাহস নেই তার।চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।আনিস তালুকদার ধমকে বলে উঠে..
-“পাচ মিনিটের মাঝে আম্মুর কাছে গিয়ে রেডি হয়ে বের হও কোনো কথা শুনতে চাই না।
আনিস তালুকদার নিজের সাথে করেই আনিশাকে নিয়ে যায় সুমনার কাছে।বেগত্যা কান্না চেপে রেডি হয়ে নেয় আনিশা।
সন্ধ্যা ছয়টা বিশ। তালুকদার বাড়ির ড্রয়িং রুমে সোফাই বসে কথা বার্তা শেষ করলেন ফারুক তালুকদার। পুলিশের ভাস্য মতে আগামী সাত দিনের মধ্যে রিহান মোল্লা কে খুজে বের করবে।যেহেতু রিহানের নামে আহে থেকে দোটো কম্পলেইন আছে থানায় তাই ফারুক তালুকদার এর কথা শুনে তারা বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
পুলিশ চলে যেতেই ফারুক তালুকদার সবার উদ্দেশ্য বলে উঠে…
-“আজ আমার পরিবারের বেশ খুশির দিন। তিন তিন টা সারপ্রাইজ আছে সবার জন্য। প্রথম দুইটা সবার জানা থাকলেও তৃতীয় টা সিক্রেট। প্রথমত আজ আমি ঠিক করেছি প্রথমে আমাদের শ্রাবন আর অহনার বিবাহ সম্পন্ন করতে। সবাই নিশ্চুপ আনিশার চোখে পানি টলমলিয়ে উঠে।আর দিত্বীয়ত আজ সারার জন্মদিন এটা সারা বাদে সবাই জানে।শুভ্রই নিষেধ করেছে তাকে বলতে।
শুভ্র অর্কের থাকতে জানতে পারে পাঁচ ডিসেম্বর সারার জন্মদিন যদিও বর্তমান কাগজ পত্রে অন্য কিছু। তবে অরিজিনাল সব কাগজে পাচ তারিখ সেই হিসেবে সারার জন্মদিন। আর তৃতীয়ত ফারুক তালুকদার শুভ সারাকে আবার বিয়ে দিবেন।তবে সেটা কেও জানে না।গোপন রেখেছে সবার থেকে।
এক এক করে সকলে বের হয়ে যায় বাইরে গাড়ির দিকে শুভ্র আজ কালো প্যান্ট এর সাথে স্কাই ব্লু শার্ট ইন করে পরেছে।উপরের দুটো বোতাম খোলা।হাতে ঝুলছে দামি ঘড়ি।চুল গুলো স্টাইল করে রাখা।আর সারার পরনে স্কাই ব্লু রঙের একটা ঘের ওয়ালা গাউন।সবাই জার জার গাড়িতে উঠে পড়ে।আনিশা রুমে নিজের মোবাইল টা নিতে যায় তাড়াতাড়ি। যদিও তার আর প্রয়োজন নেই।
বাড়ির সকলের বের হওয়ার পর শ্রাবন আর অহনা বের হয় দুজনকেই বেশ মানিয়েছে।শ্রাবন অহনার ঘাড়ে হাত দিয়ে সামনে আগাতে থাকে।সিড়ি থেকে নিচে নামতে নামতে চক্ষু আটকে যায় আনিশার সেদিকে।চলমান পা থমকে যায়।জমে থাকা পানি টুকু গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে।আনিস তালুকদার এর বাইরে থেকে ডাকার কারনে আনিশা নিজের চোখ মুছে নাক টেনে বেরিয়ে যায়। বাড়ি থেকে।
আনিশা গাড়ির পিছনে সিটে বসে জানালার ধারে।গাড়ি চলতে শুরু করে।সাথে আনিশার চোখের পানিও বেড়ে চলেছে।কোথেকে ভেষে এলো গানের কিছু লাইন যা আনিশার বুকে তিরের মতো বিধছে।আনিশাও এক বুক চাপা কষ্ট আর এক পক্ষিক না বলা ভালোবাসার জন্য গানের লাইন গুলো মনে মনে গুনগুনিয়ে গাইতে শুরু করলো..
-“তুমি জানতেই পারোনি..!
কত গল্প উড়ে যায়..!
-“তুমি চিনতে পারো নি..!
আমাকে হায়..!
-“কি করে বলবো তোমায়..!
আসলে মন কি যে চাই..!
আনিশার বুক ফেটে কান্না আসে।আসলে গানের প্রতিটা শব্দ আজ তার বুকে বেধে যাচ্ছে তার খুব কষ্ট হচ্ছে আজ।
শুভ্র ড্রাইভ করছে আর সারার দিকে তাকাচ্ছে। মহারানি তার তার দিকেই চেয়ে আছে।সে কি বুজছে না এতে তার গাড়ি চালাতে কষ্ট হচ্ছে।নিজেকে কেমন কেমন লাগছে শুভ্রর তার মহারানী তার পাশে বসে।আগে এই ফিলিংস টা শুভ্র পাইনি।আজ একটু বেশিই বড় বড় লাগছে সারাকে।শুভ্র অর্ক কে দিয়ে বলিয়ে সারার বাবা মাকে আগেই ক্যাফে তে পাঠিয়েছে। নাম ক্যাফে হলেও জায়গা বিশাল।সাথে তাদের ডেকোরেশন।
শুভ্র গাড়ি চালাচ্ছে আর সারাকে তার ছোট বেলার গল্প শোনাচ্ছে সারাও বেশ মনযোগ দিয়ে শুনছে। শুভ্রদের গাড়িটি এবার হাইওয়ে রাস্তাই উও তবে আজ যানযট কম। কিছু দূর পরপরই ট্রাফিক।আর চার রাস্তার মোড়।শুভ্র গাড়ি চালাচ্ছে।শ্রাবন দের গাড়ি আগে গিয়েছে তারা মাঝে আর পিছনে অর্কদের গাড়ি।গাড়ির জানালা খোলা থাকায় হটাৎ বাতাশের ধাক্কা সারার চোখে কিছু একটা ঢুকে যায়।সাথে সারা আউচ করে উঠে।
শুভ্র সারার দিকে তাকিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রেখেই বলে উঠে..
-“কি হয়েছে দেখি।
শুভ্র গাড়ি স্লো করে আগের থেকে সারার চোখে দিকে তাকায়।লাল বর্ন ধারন করেছে।শুভ্র সারার চোখে ফু দিতেই কোথা থেকে এক মাল ভর্তি এসে পড়লো ঠিক তাদের গাড়ির সামনে । শুভ্র প্রথমে খেয়াল না করায় বিপদটা আরো বেড়ে গেলো আর যতক্ষণে শুভ্র সামনে তাকালো ততক্ষণে শুভ্রর হাতে করার মতো কিছুই ছিলো না গাড়ির গতি কম থাকলেও সামনে থাকা গাড়িটির ব্রেক আউট ছিলো। শুভ্র এক মুহুর্তের জন্য থেমে দ্রুত সিটবেল্ট খুলে সারার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর ভয়ঙ্কর এক শব্দ। শব্দের পরই নিস্তব্ধতা… ভয়ানক নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতা যেন এক নরকীয় ব্যাথা দিচ্ছিলো হৃদয়ে।
শুভ্র অল্প অল্প করে চোখ মেলে তাকালো প্রচন্ড মাথায় আঘাত লেগেছে তার।শুভ্র নিজের বুকে জড়িয়ে ধরা সারার দিকে তাকালো রক্তে ভিজে গেছে গাউন সহ শুভ্র শার্ট।চারিপাশে ধোঁয়া উড়ছে।কাচের টুকরো ছড়িয়ে আছে সব দিকে চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া গাড়িটার ভিতরে তারা দুজন।রক্তেরাঙা সারা পুরো নিস্তেজ।শুভ্রর জেনো নিজের প্রেয়সীকে এভাবে দেখে শ্বাস আটলে গেলো তার মাথা আর ঘাড় থেকে টগবগিয়ে রক্ত পড়ছে।
শুভ্র কোনো মতে নিজের মাথা চেপে ধরে সারাএ মুখে হাত দিয়ে বলে উঠে..
-“এই বউ,, বউ,, একবার চোখ খোল
না দয়াকরে,,এই বউ,,এই পিচ্চি পাখি
তাকা আমার দিকে..?
সারা আর তাকাই না।শুভ্ররও মাথা ব্যাথায় চোখ খুলে রাখতে না পারার উপক্রম।কিছুক্ষনের মাঝেই অর্ক দের গাড়ি সহ আর কিছু লোক জন জড়ো হলো।অর্ক উন্মাদের মতো চেপ্টে যাওয়া গাড়িটার কাছে ছুটে গেলো।খুব কষ্টে দুজন কে উদ্ধার করে হসপিটালের উদ্দেশ্য রওনা দিলো।
আনিশা ফাতিহা স্তম্ভিত।গাড়ির পিছনে সুইয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হসপিটালে দিকে দুজনেরই অনেক বেশি ব্লিডিং হচ্ছে সারার কোনো সেন্স নেই।শুভ্রর এখোনো সেন্স আছে।অর্কের কোলের উপর শুভ্র মাথা আর শুভ নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে সারাকে।ড্রাইভার যত দ্রুত সম্ভব এগিয়ে চলছে হসপিটালের দিকে।
ছোট্ট একটা এক্সিডেন্ট এ দুটো অতৃপ্ত হৃদয় আজ ভেঙে গেছে।পুর্নতা পেয়েও অপূর্নতায় ছেয়ে গেলো তাদের এই মিষ্টি নামক কালো অধ্যায়।শুভ্রর নিশ্বাস নিচে কষ্ট হচ্ছে।চোখ দুটো লেগে আসছে।
শুভ্রর মাথা অর্কের কোলে থাকার এখান থেকে সারার একপাশ রক্তে ভেজা মুখটা দেখা যাচ্ছে।সারার নিঃশ্বাস পড়ছে না।নিথর হয়ে পড়ে আছে ছোট্ট দেহটা শুভ্রর বুকে।শুভ্র সেদিকে একবার তাকিয়ে গভীর ভাবে অনুভব করে কিছু তারপর অর্কের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই অর্ক নিজের কান শুভ্রর মুখের কাছে আনতেই শুভ্র কাতর গলায় বলে উঠে..
-“আমার পিচ্চি পাখি কে বকে দিস।আমি আমার কথা রেখেছি। আমার জীবনের শেষ নিশ্বাস অব্দি তাকে বুকের রাখার কথা দিয়ে আমি তা রেখেছি।আমি ওকে সত্যি প্রচন্ড ভালোবাসি।
শুভ্র একটু থামে কথা জড়িয়ে আসছে তার।চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।শুভ্র জোরে একটা শ্বাস নিয়ে বলে উঠে..
-“আমাদের আলাদা করিস না।(কথাটা বলে শুভ্র থেমে যায়,চোখের মনি স্থির হয়ে যায়।
-“এই দোস্ত কি বলছিস তোদের কিছু হবে না আমি কিচ্ছু হতে দিবো এই তাকা আমার দিকে শুভ্র।এই ড্রাইভার গাড়ি তারাতাড়ি চালা।এই শুভ্র তাকা আমার দিকে।
৪ বছরের চুক্তির মা পর্ব ৪৫
আর কথা আসে না।শুভ্রও সারার মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায়।অর্ক জোরে কেদে উঠে। শুভ্রর মুখে ছোট ছোট থাপ্পড় দিয়ে ডাকতে থাকে।তবে শুভ্র নিস্তেজ।এ কেমন নিয়তি এক দিকে নিজের বোন আর এক দিকে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড।আজকের দিনটা তো এমন হওয়ার কথা ছিলো না।বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি নামে।অর্কের কোলে মাথা দেওয়া নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড আর তার বুকের উপর নিস্তব্ধ হয়ে পড়া থাকা নিজের বোনের দিকে একপলক তাকানোর দুঃসাহস অর্কের হয়না।
প্রথম খন্ডের সমাপ্ত

পরের পাঠ গুলো তাড়াতাড়ি দিন, আমি পুরোটা একসাথে শেষ করতে চাই,আমার আবার অপেক্ষা করার মতো সহ্য নেই।