Home প্রিয় বেলিফুল প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৪

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৪

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৪
উম্মে হাবিবা

বউ যদি বলে দেয় তার আর কি কি পছন্দ যেগুলো পেলে এভাবে হুট হাট জড়িয়ে ধরবে আর সাথে ঠুস ঠাস চুমু খাবে। তাহলে প্রতিদিন নিয়ম করে তার জন্য নিয়ে আসতাম। বলবে কি সে!
সোহা লজ্জায় ওয়াসরুমে ঢুকে পড়ে আর রুদ্র বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে।
রৌদের রুম থেকে বেরিয়ে রুদ্র রুমের দরজা খোলা দেখে একটু আড়াল হয়ে ভিতরে তাকিয়ে ছিলো। কিন্তু রুদ্র আর সোহার এমন ভালোবাসাময় আচরণে আদিবা বুঝতে পারে রুদ্র সোহাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে আর সোহার মনেও রুদ্রের জন্য ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে।
আদিবা ভাবতে থাকে এভাবে চললে ওদের আলাদা করতে পারবে না সে। যেভাবেই সোহা আর রুদ্রকে আলাদা করতেই হবে।

এসব ভাবতে ভাবতেই সোজা চলে যায় নিজের মায়ের রুমে। নতুন কোনো ফন্দি আঁটতে।
সোহা ওয়াস রুমে দাঁড়িয়ে আছে লজ্জায় বের হতে পারছে না কিন্তু এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে। তাই নিজেকে শান্ত করে বর হয় রুম থেকে। দরজা খুলতেই দেখে রুদ্র দাঁড়িয়ে ঠিক দরজার সামনে। হঠাৎ পা পিছলে যায় ভয়ে চোখ বন্ধ করো নেয়। সোহা ভাবলো এই বুঝি কোমড়টা ভেঙ্গেগেলো। কিন্তু যখন বুঝতে পারলো সে পড়ে নি তখন সামনে তাকিয়ে দেখে রুদ্র ওর কোমড় আঁকড়ে ধরেছে। সোহা আরেক দফা লজ্জা পায়। রুদ্রকে একভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সোহার কেমন পেট মুচড়াতে থাকে। বুকের ভিতর যেনো কেউ হাতুড়ি দিয়ে পিটছে৷ একেমন অনুভূতি? কই লোকটার কাছাকাছি থাকতে তো তার খারাপ লাগছে না। বরং ভালোই লাগছে। আচ্ছা আমি কি তাহলে উনাকে ভালোবেসে পেললাম।

বিকাল থেকে আকাশটা কেমন গোমট হয়ে আছে৷ সন্ধ্যার পর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে জোরে বাতাসের ঝাপটা৷ রোদ আর সোহা ড্রইং রুমে বসে চানাচুর দিয়ে মুড়ি খাচ্ছে টিভি দেখছে।আশরাফ মেহতাব হাতে থাকা লাঠিতে ভর করে আস্তে আস্তে রৌদের পাশে এসে বসে।
সোহা আশরাফ মেহতাব এর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে__
দাদাজান আপনি ও মুড়ি খান এই নিন।
আমার দাঁত আগের মতো শক্তি নাই গো বড় গিন্নি। দেখা যাবে মুড়ি খেতে গিয়ে দাঁত খুলে পড়ে যাবে।
দুজনেই দাদার কথায় হেসে উঠে। রুনিয়া এক কাপ চা হাতে ড্রইং রুমে আসে। চায়ের কাপ টা আশরাফ মেহতাব এর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠে__
বাবা আপনি আপনার প্রেশারের ঔষুধ টা খেয়েছেন।
আশরাফ মেহতাব দাঁত দিয়ে জিব কেটে বলে__
একদম মনে ছিলো না বউমা।
রুনিয়া কিছু না বলে ঔষুধ আনতে আশরাফ মেহতাব এর রুমে যান। সোহা আশরাফ মেহতাব এর দিকে তাকিয়ে বলে __

দাদাজান আপনি ঠিক মতো ঔষুধ খাচ্ছেন না কেনো? এভাবে চললে তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
হুম ভাবি দাদাভাই আজকাল সব কিছুতে অনিয়ম করছে।
আমার কথা বাদ দাও গিন্নিরা আমি আজ আছি কাল নাও থাকতে পারি। শুধু ইচ্ছে যাওয়ার আগে যেনো সবাইকে এই ভাবেই হাসিখুশি দেখে যেতে পারি।
রৌদ তার দাদাকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বলে__
এভাবে বলো না দাদাভাই। তোমাকে কোথাও যেতে দিবো না। তোমাকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো বলো।
এসব কথা আর বলবেন না দাদাজান। তাহলে কিন্তু আমি আপনার সাথে আর কখনো কথা বলবো না।
আচ্ছা আচ্ছা আর বলবো না। তা তোমার পায়ের এখন কি অবস্থা। ব্যথা কি কমেছে।
ব্যথা থাকলে তো কমবে। পায়ে ব্যথা পেলে কি এইভাবে ধেই ধেই করে হাঁটতে পারতো।
পাশথেকে রাজিয়া চৌধুরীর বিক্ষিপ্ত কন্ঠে বাক্য শুনে সবাই তার দিকে তাকায়।
রাজি এসব কেমন ধরনের কথা তোমার।
কি ভুল বললাম আমি?

ঠিকিতো নানাভাই আম্মু কি ভুল বলেছে। এই মেয়েটার সবটুকুই অভিনয় ছিলো।
ডোহা ঠোঁটে কোনে হাসি রেখে রাজিয়াকে বলে __
আমি অভিনয় করছি আপনারা কিভাবে জানলেন? তাহলে কি আমি যখন পড়ে গিয়েছি তখন আপনারা সেখানেই ছিলেন আর আমার অভিনয় সবটাই দেখছিলেন?
রাজিয়া থতমত খেয়ে বলে,, আমি কেনো দেখতে যাবো। তোমার হাঁটার ধরন দেখেই বুঝা যায় তুমি ব্যথা পাওয়ার অভিনয় করছিলে।
আচ্ছা তাই নাকি। আমি ব্যথা পেয়েছি এটা বুঝানোর জন্য কি এখন আমার এটা লাঠিতে ভর দিয়ে হাটা উচিত। দাদাজান আপনার লাঠি খানা দিন তো আমি একটু হাঁটি।
সোহার কথায় রৌদ আর আশরাফ মেহতাব দুজনেই হেসে উঠে।
রৌদ তার ফুপির দিকে তাকিয়ে বলে _
এখনো কিন্তু জানা যায়নি সিঁড়িতে তেল কে পেলেছে। সেটা যদি জানা যায় তাহলে ভাইয়া নিশ্চয়ই চুপ করে থাকবে না।কি বলো ফুপি।
রাজিয়া চৌধুরী থতমত খেয়ে বলে__

তু-তুই এসব আমাকে বলছিস কেনো।সিঁড়িতে তেল আমি ফেলেছি নাকি।
আমি তো সেটা বলিই নি,, তুমি কেনো নিজের দিকে টানছো?
রুনিয়া ঔষধ আর পানি নিয়ে আশরাফ মেহতাবকে দেন। কি হয়েছে এখানে __
কিছু না ভাবি এমনি আমরা কথা বলছিলাম।
তাদের কথার মাঝ খানে সোহার ফোন খানা বেজে উঠে। তাকিয়ে দেখে রাইসা কল করছে।
সোহা উঠে নিজের রুমে চলে আসে। পিছন থেকে রাজিয়া চৌধুরী রুনিয়াকে বলে_
দেখেছো ভাবি মেয়েটা কতো বড় বেয়াদপ। বড়োরা বসে আছে আর সে ফোন নিয়ে উপরে চলে গিয়েছে৷
ওর কল এসেছে রাজিয়া। সবারই ব্যাক্তিগত একটা জীবন আছে।তাতে হস্তক্ষেপ করা কি আমাদের সাজে।
কিন্তু ভাবি ঐ মেয়েটার বুঝতে হবে ও এখন এই বাড়ির বউ। ওর প্রায়োরিটি লিস্টে সবার আগে এই পরিবার থাকবে। আর কিসের এতো ব্যক্তিগত জীবন।
যা বুঝো না তা নিয়ে তর্ক করো না। ওর কি গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকতে পারে না। যাই হোক তোমার সাথে এই বিষয়ে আর কথা বাড়াতে চাইনা। আমার মাথা ধরেছে রুমে যাচ্ছি আমি আর তোমার ভাই আসলে আমাকে ডেকে দিও।
বলেই রুনিয়া নিজ রুমে চলে যায়।রাজিয়া এবার নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে তার আগেই তিনিও উঠে চলে যায়।
এই মেয়েটার জন্য সবার চোখে খারাপ হচ্ছি আমি। একে এই বাড়ি থেকে বের না করে আমি রাজিয়া এই বাড়ি থেকে নের হবো না।

​সোহা নিজের রুমে এসে বিছানায় আরাম করে বসে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাইসার উচ্ছ্বসিত গলা ভেসে এলো, “কিরে সোহা! ফোন তুলতে এতো সময় লাগে? কী করছিলি শুনি?”
​সোহা একটু হেসে বলল, “আরে ড্রইং রুমে সবার সাথে বসেছিলাম রে। তো বল, কী খবর তোর?”
​”খবর তো একটা আছে…” রাইসার গলার স্বর হুট করেই কেমন যেন নরম আর লাজুক শোনাল।
​সোহা সেটা ধরে ফেলে বলল, “কী ব্যাপার ম্যাডাম? গলার সুর এমন পালটে গেল যে বড়? কিছু কি লুকোচ্ছিস?”
রাইসা ওপাশ থেকে একটু আমতা আমতা করে বলল, “আসলে… আজ কলেজে রাফিন স্যার আমাকে একটা ক্যাডবেরি সিল্ক চকলেট দিয়েছেন। তুই কয়দিন ধরে কলেজে যাচ্ছিস না তো, তাই স্যার তোর কথা জিজ্ঞেস করলেন। তুই কেমন আছিস, কেন আসছিস না—এসব জানতে চাইলেন। আর তারপর হঠাৎ করেই পকেট থেকে চকলেটটা বের করে আমার হাতে দিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলো।
কথাটুকু বলেই রাইসা ওপাশে রীতিমতো লজ্জায় কুঁকড়ে গেল।

সোহা ফোনের ওপাশেই রাইসার লজ্জাটা টের পেয়ে বেশ মজা পেল। ও একটু খোঁচানোর সুরে বলল, বাহ কোনো কারণ ছাড়াই চকলেট। রাফিন স্যার তো তাহলে ভারী দয়ালু! তা তোর মন কী বলছে শুনি?
রাইসা আরও লজ্জা পেয়ে বলল, “আরে ধুর, তুই সবসময় বেশি ভাবিস।
​সোহা বুঝতে পারল, রাইসা হয়তো মনে মনে রাফিন স্যারকে একটু পছন্দ করতে শুরু করেছে। এখন এই ব্যাপারে না গাটাই ভালো। হয়তো রাইসা নিজেও বুঝতে পারছে না।আগে মেয়েটা বুঝুক তার পর এসব নিয়ে কথা বলা যাবে।
কিছুক্ষণ দু বান্ধবীর আড্ডার পর ফোনটা রেখে সোহা মাত্রই একটু সোফায় বসেছে, এমন সময় রুদ্র রুমে ঢুকল।
কোথায় গিয়ে ছিলেন আপনি?

রুদ্র দুষ্টু হেসে বলে,, কেনো মিস করছিলে নাকি।
আমার তো আর কাজ নাই আপনাকে মিস করতে যাবো।
তা থাকবে কেনো, সব সময় আর কাজ তো বান্ধবীকে ঘিরে তার সাথেই কথা বলো।
সোহা চোখ বড় বড় করে বলল, “আপনি আড়ি পেতে শুনছিলেন নাকি?”
আড়ি পাতার কী আছে? তোমার হাসির আওয়াজ তো একদম বেলকনি পর্যন্ত যাচ্ছিল,” রুদ্র সোহার কাছাকাছি এসে বসল। তারপর সোহার বই-খাতাগুলো টেনে নিয়ে বলল, “অনেক তো ফাঁকিবাজি হলো, এবার পড়তে বসো। দেখি, কালকের পড়াটা কতটা মনে আছে
সোহা একটু মুখ বাঁকিয়ে পড়তে বসল। রুদ্র যখন বুঝিয়ে দিচ্ছিল, সোহা তখন পড়া বাদ দিয়ে রুদ্রর তীক্ষ্ণ নাকের দিকে তাকিয়ে ছিল। রুদ্র হঠাৎ সোহার দিকে তাকিয়ে বলল, “পড়াশোনায় মন নেই কেন? খাতায় মন দাও, আমার মুখে কোনো সূত্র লেখা নেই”।
সোহা থতমত খেয়ে বলল, “আমি… আমি তো পড়াই দেখছিলাম।”
রুদ্র একটু ঝুঁকে সোহার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “মিথ্যে বলো না। তোমার চোখ বলছিল তুমি অন্য কিছু দেখছিলে।” সোহার কান দুটো মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল রুদ্রর এই আকস্মিক খুনসুটিতে।

ছাদে দাঁড়িয়ে মাইশার সাথে কথা বলছিলো তমাল। কথায় কাথায় মাইশা বার বার রুদ্রের বিষয় জিজ্ঞেস করে যেটা একদম পছন্দ হয় না তমালের।
মাইশা আর তমালের সম্পর্কটা গড়ে উঠেছিল নিজেদের স্বার্থ আর এক অদ্ভুত আক্রোশ থেকে। স্বভাবগতভাবেই দুজনেই বেশ কুটিল আর লোভী।
​তমাল ওপাশ থেকে একটু রোমান্টিক সুরে বলল, “মাইশা, আজ সারাদিন তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। কবে যে তোমাকে নিজের করে পাবো!
মাইশা কিন্তু তমালের কথায় পুরো মন দিতে পারছিল না। তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে একটু অবহেলার সুরে বলল, “পাবে পাবে, এতো তাড়াহুড়োর কী আছে? আচ্ছা তমাল, সোহা আর ওর হাজবেন্ড কি আর বসেনি ঐ বাড়িতে বেড়াতে?
না,কিন্তু তোমার আজ কি হয়েছে বলোতো, বার বার ওদের ব্যাপারে কেনো জানতে চাচ্ছো।
ভাবছি সোহার মতো কালো একটা মেয়ে রুদ্রের মতো একজনকে কখনোই ডির্জাব করে না। রুদ্র ওকে মনে নিলো কি করে?

আরে কিসের মনে নিছে। চাহিদা মিটে গেলেই ওকে চিড়ে ফেলে দিবো।
তবে যাই বলো, রুদ্রকে আমার কাছে জোশ লাগে। রুদ্র পার্সোনালিটি, আলাদা একটা ব্যাপার আছে।
মাইশার মুখে অন্য পুরুষের, বিশেষ করে রুদ্রর প্রশংসা শুনে তমালের মেজাজটা চট করে বিগড়ে গেল। সে রেগে গিয়ে বলল, আবার রুদ্র! যখনই ফোন করি, তুমি ওই রুদ্রর গুণগান গাইতে বসো। ভালো না লাগলে কথা বলো না!বলেই তমাল ওপাশ থেকে খট করে কলটা কেটে দিল।
মাইশা ফোনটা কানের কাছ থেকে সরিয়ে বিরক্ত হয়ে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। স্বগতোক্তি করে বলল, “উফ! এই ছেলেটা একটা আস্ত গাধা। তবে যাই বলো, রুদ্রর ওই ব্যক্তিত্ব, ওই রাজকীয় ভাব… ওটার পাশে শুধু আমাকেই মানায়। যেভাবে হোক, রুদ্রর সাথে দেখা করার একটা উসিলা বের করতেই হবে। ওর কাছাকাছি আমাকে পৌঁছাতেই হবে।

সোহা কে আমি কখনোই সুখে থাকতে দিবো না।
রাতের খাবারের সময় মেহতাব ভিলার ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে জড়ো হলো। পরিবেশটা এতক্ষণের ঝামেলার পর বেশ শান্তই ছিল। রেদওয়ান মেহতাব প্লেটে ভাত নিতে নিতে সোহার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, মা সোহা, তোমার পায়ের ব্যথাটা এখন কেমন আছে? একটু আগে শুনলাম রাজিয়া বলছিল তুমি নাকি লাঠি নিয়ে হাঁটছ?
​সোহা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। তবে রাজিয়া চৌধুরীর মুখটা তখন তিতকুটে হয়ে গেল। রৌদ তার বাবার কথার মাঝখানে চামচ দিয়ে তরকারি তুলে নিতে নিতে বেশ শান্ত কিন্তু শক্ত গলায় বলল, ভাবির পায়ের ব্যথা অনেকটাই কমেছে বাবা। আর লাঠির কথা বলছ? ওটা তো আসলে সিঁড়িতে কে তেল ঢেলেছিল, তাকে একটু পরোক্ষভাবে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য একটা ছোট্ট কৌতুক ছিল। অপরাধী তো নিশ্চয়ই মনে মনে বেশ ভয় পাচ্ছে, তাই না ফুপি?
রৌদের সরাসরি ফুপিকে করা এই খোঁচায় রাজিয়া চৌধুরী আর আদিবা দুজনেরই গলার ভাত যেন আটকে যাওয়ার জোগাড় হলো। রেদওয়ান মেহতাব রৌদের কথার ইশারা বুঝতে পেরেও টেবিলের শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতে বললেন, “হুম, সাবধানে থেকো মা। আর সিঁড়িতে যেনো আর কেউ তেল না ফেলে রুনিয়া তুমি খেয়লা রেখো ।” রুনিয়া বেগম মাথা নাড়লেন। ব্যস, এরপর আর কোনো ঝামেলা ছাড়াই রাতের খাবার শেষ হলো।
খাবার শেষে সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেল। সোহা আর রুদ্রও তাদের রুমে ফিরে এসেছে। ঘরের আবহাওয়াটা এখন বেশ অন্যরকম। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ ঘরের ভেতর একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।

হঠাৎ সোহার কেমন যেনো অস্বস্তি লাগছিলো ভাবলো শাওয়ার নিলে হয়তো একটু ভালো লাগতো। তবে এই রাতের বেলা শাওয়ার নিলে আবার ঠান্ডা না লেগে যায়। এসব ভাবতে ভাবতেই সোহা ওয়াশরুমে চলে যায়। শাওয়ার নেয়ার পর এখন একটু ভালো লাগছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দিতেই কোমর সমান লম্বা চুলগুলো বেয়ে দু-এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। আয়নায় নিজের শ্যামলা মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে ও যখন চুলগুলো একপাশে সরাচ্ছিল, ঠিক তখনই রুদ্র পেছন থেকে এসে দাঁড়াল।
দুজনের মাঝের সম্পর্কটা এখনো একদম নতুন, তাই বাতাসে একটা মৃদু লাজুক উত্তেজনা। রুদ্রর আচমকা এত কাছে চলে আসায় সোহার হাত থেকে চিরুনিটা টুপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। সোহা চিরুনিটা তুলতে মাথা নিচু করতেই রুদ্রও একসাথে ঝুঁকলো। আর তখনই ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত সেই রোমান্টিক মুহূর্তটা।
দুজন একসাথে উঠতে গিয়ে সোহার মাথাটা গিয়ে ঠেকল রুদ্রর চিবুকে। ভারসাম্য হারিয়ে সোহা পড়তে গেলে রুদ্র ক্ষিপ্র হাতে সোহার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সোহার পিঠের কোমর সমান লম্বা ভেজা চুলগুলো রুদ্রর হাতের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। এত কাছাকাছি এর আগে তারা কখনো আসেনি। রুদ্রর উষ্ণ নিশ্বাস সোহার গালে আছড়ে পড়ছিল, আর সোহার মায়াবী চোখের কাজল-কালো দৃষ্টি থমকে গেল রুদ্রর চোখের গভীরে। দুজনেই স্তব্ধ, দুজনেরই হৃদস্পন্দন তখন দ্বিগুণ বেগে ছুটছে। মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা না বললেও, এই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে তাদের মনের টানটা যেন তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়ে গেল। রুদ্রর হাত সোহার কোমরে আরও একটু চেপে বসল—

​ঠিক তখনই দরজায় সজোরে নক করার শব্দ হলো। ঠক,ঠক,ঠক
মুহূর্তেই ঘোর কেটে গেল। সোহা চমকে উঠে রুদ্রর বুক থেকে সরে দাঁড়াল, লজ্জায় ওর ফর্সা কান দুটো লাল হয়ে উঠল। রুদ্রর মেজাজটা এবার চরম বিগড়ে গেল। এমন একটা সুন্দর মুহূর্ত এভাবে নষ্ট হওয়ায় সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল কুঁচকে গিয়ে দরজাটা খুলল।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল আদিবাকে। আদিবা একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “রুদ্র… আসলে আমার রুমের লাইটটা হঠাৎ করে জ্বলছে না। কেমন যেন একটা শর্ট সার্কিট হলো মনে হয়। অন্ধকার রুমে ভয় লাগছিল, তুমি কি একটু এসে দেখবে?”
রুদ্রের ভিষন রাগ হলো এই মেয়েটার উপর। একে তো তার রোমান্সের বারোট বাজিয়েছে। বিরক্তিকর মেয়ে একটা, ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে থাপ্পড় মেরে গাল লাল করে দি। অনেক বেশি রাগ হলোও চিৎকার না করে মুখটা প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি গম্ভীর করে বলে উঠে___
এই মাঝরাতে লাইট নষ্ট হয়েছে তো আমি কী করব? আমি কি এই বাড়ির ইলেকট্রিশিয়ান? নিচে দারোয়ান আছে, কাল সকালে ইলেকট্রিশিয়ান ডাকবে। এখন যাও এখান থেকে!
আদিবা রুদ্রর এমন রুক্ষ ব্যবহারে একটু দমে গেলো, কিন্তু তার চোখ দিয়ে সে ঘরের ভেতরের সোহাকে পরখ করার চেষ্টা করছিল।

​সোহা বুঝতে পারল রুদ্র রেগে গিয়েছে । ও দ্রুত এগিয়ে এসে রুদ্রর হাতটা চেপে ধরল এবং তাকে আলতো করে টেনে একটু পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর নিজে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আদিবার দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি কিন্তু রহস্যময় হাসি দিল।
সোহা শান্ত গলায় বলল, “আদিবা আপু, রুদ্র তো ঠিকই বলেছে। মাঝরাতে ও গিয়ে লাইট ঠিক করতে গেলে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে? তার চেয়ে বরং তুমি আজ রাতে অন্য কোনো রুমে শুয়ে পড়ো, আচ্ছা তোমার রুমে তো একটা ল্যাম্প ও আছে তাহলে ঐটা জ্বালিয়ে রাখছো না কেনো?
আদিবা সোহার এই শান্ত ভাব দেখে মনে মনে আরও রেগে গেল। সে বলল,,, তোমাকে তো কিছু জিজ্ঞেস করিনি সোহা। আমি রুদ্রর কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি। অন্যের সুখে বা সুবিধায় কথা বলাটা তোমার অভ্যাস মনে হয়?
সোহা দরজার চৌকাঠে হাত রেখে একটু ঝুঁকে আদিবার চোখের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও চওড়া হলো। সে একদম নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল___

, অন্যের সুখ দেখে আমার কিছু হয় না আপু। তবে জানো তো আদিবা আপু… অন্য সুখে যাদের পেছন জ্বলে, তাদের কেই মানুষ রুপি জোনাকিপোকা বলে।
নিজের কোনো আলো থাকে না, শুধু অন্যের আলো দেখে ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে মরে। রাত অনেক হয়েছে, এবার নিজের রুমে গিয়ে ঘুমাও। গুড নাইট।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৩

বলেই সোহা আদিবার মুখের ওপর দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। আদিবা দরজার বাইরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, অপমানে আর রাগে তার শরীর কাঁপতে লাগল। আর ঘরের ভেতরে রুদ্র সোহার এই তেজস্বী রূপ দেখে অবাক হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল, তারপর হুট করেই তার মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

প্রিয় বেলিফুল পর্ব ১৫

1 COMMENT

  1. Please please please please please তারাতারি পরের পার্টগুলো দেন।

Comments are closed.