Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৫

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৫

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৫
তানিয়া হুসাইন

হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসে তারা।গাড়ির কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরের রাস্তা দেখছে ইশায়া। এখন আবার ফিরতে হবে ভাবতেই তার মুখটা অন্ধকার হয়ে যায়। একটু আগেও মনটা হালকা ছিল, অনেক অনেকদিন পর বাইরে বেরিয়ে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পেরেছে সে।ইশায়ার আগের সেই দিনগুলোর কথা মনে করতে থাকে,সকালে ওঠা স্কুলে যাওয়া বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া।বাইরে ফুচকা খাওয়া,পিকনিকে যাওয়া, কতই না সুন্দর ছিল সে মুহূর্তগুলো,সে যদি জানতো তার জীবনটা এরকম হয়ে যাবে ওই মুহূর্তগুলো আরো ভালোভাবে উপভোগ করতো সে।
ইশায়ার মন খারাপ ভীর সেটা বুঝতে পারে।

একবার আড়চোখে তাকায় ইশায়ার দিকে। মেয়েটার চোখের ভেতরের আলো নিভে যেতে দেখে তার ভালো লাগে না, যদিও সেই অনুভূতিটাকে সে কখনো প্রকাশ করে না।গাড়ি চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যায়।ইশায়া বাইরে তাকায়,
সামনেই মেক্সিকোর এক বিশাল অভিজাত রেস্টুরেন্ট।
গভীর কালচে বাদামি পাথরে তৈরি বিল্ডিংটার দেয়ালে স্প্যানিশ নকশা খোদাই করা। ছাদের কিনারা জুড়ে ঝুলছে উষ্ণ হলুদ আলো, যেগুলো রাতের অন্ধকারে ছোট ছোট আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলছে। প্রবেশপথের দুপাশে বড় বড় টব ভর্তি লাল বোগেনভিলিয়া ফুল, নরম স্যাক্সোফোন বাজছে, আর ফোয়ারার পানির শব্দ মিলেমিশে জায়গাটাকে অদ্ভুত শান্ত অথচ বিলাসী একটা আবহ দিয়েছে।
ভীর ইশায়াকে নিয়ে ভেতরে যায়।
ভেতরে ঢুকতেই ইশায়ার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। চারপাশে ঝাড়বাতির সোনালি আলো, দেয়ালে পুরোনো মেক্সিকান আর্ট সবকিছু এত সুন্দর যে কিছুক্ষণ সে শুধু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকে।
অনেকদিন পর তার সত্যিই ভালো লাগছে।ভীর সেটা দেখছে গভীরভাবে।
একটা টেবিলে গিয়ে বসে তারা। বাইরে দূরের শহরের আলো দেখা যাচ্ছে।
কিছুক্ষন পরবভীর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে,

____বসতে সমস্যা হচ্ছে?
ইশায়া মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। ইশায়া উৎসুক চোখে তাকিয়ে চারপাশ দেখছে ভীরের চোখ থেমে থাকে তার ওপর।সাদা, নরম কাপড়ের ডিলিট লং গাউনে ইশায়াকে অসম্ভব কোমল দেখাচ্ছে। লম্বা চুলগুলো সুন্দর করে বেনি করা, ভীরের ভেতরটায় অদ্ভুত একটা স্বস্তি কাজ করে যখন সে ইশায়াদ দিকে তাকায়।তার পুরো পৃথিবীটা এখন এই একটা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ।এই একজন আর তার শরীরের আরেকজন। ইশায়ার বারন্ত পেটটা এখন স্পষ্ট দৃশ্যমান। মাতৃত্ব যেন তাকে আরও আলাদা এক সৌন্দর্য দিয়েছে।
ভীর চুপচাপ আরেকটা চেয়ার টেনে এনে তার পায়ের সামনে রাখে।

__পা তুলে রাখো।
ইশায়া কিছু না বলে পা রাখে সেখানে।
তার ভেতরে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।
এর মাঝেই একজন ওয়েটার এসে টেবিলে রাখে বিশাল একটা আইসক্রিম গ্লাস Choco Volcano Supreme Sundae উপরে গলতে থাকা ডার্ক চকলেট, ভ্যানিলা স্কুপ, স্ট্রবেরি সিরাপ আর চারপাশে ছোট ছোট চকোলেট কিউব।
আরেক পাশে রাখা হয় Molten Aztec Chocolate Delight গরম চকলেট লাভা কেকের ওপর গলতে থাকা চকোলেট সস আর বাদামের কুচি।
এগুলো দেখে ইশায়ার চোখ চকচক করে ওঠে।
ভীরের জন্য এতদিন তাকে কত কিছু খেতে হয়েছে, যেগুলোর একটুও তার ভালো লাগত না। নিয়ম, ডায়েট সব মিলিয়ে খাবারও যেন শাস্তির অংশ হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এখন সে সত্যিই খুশি।ভীর এগিয়ে দেয় তার দিকে।ইশায়া ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি এনে আইসক্রিম খেতে শুরু করে।
অনেকদিন পর তাকে এমন নির্ভার লাগছে।ভীর তাকিয়েই থাকে।
মেয়েটা যখন খুশি হয়, তখন তার চোখের কোণে ছোট ছোট আলো ফুটে ওঠে এটা সে আগেও দেখেছে, কিন্তু এত শান্তভাবে কখনো দেখেনি।
ভীর আবার বলে,

___আর কি খাবে? অর্ডার করো। যা ভালো লাগে করতে পারো।
ইশায়া খেতে খেতেই তাকায় ভীরের দিকে।এই রাক্ষসটা আজ এত ভালো কীভাবে হয়ে গেল কিভাবে।
ভাবতেই তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
নিককে কিছু নিয়ে চিন্তিত দেখে ভীর উঠে দাড়ায়।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিকের দিকে এগিয়ে যায় সে।
এর মাঝেই ওয়েটাররা একে একে বাকি অর্ডার করা খাবারগুলো এনে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে শুরু করে।
গরম ধোঁয়া ওঠা মেক্সিকান গ্রিল, চিজে ভরা এনচিলাডা, মশলাদার টাকো আর বিভিন্ন ডেজার্টে পুরো টেবিল ভরে যায়।ভীর-ই সব অর্ডার করেছে। চারপাশে তখনও নরম মিউজিক বাজছে।
ইশায়া আইসক্রিমের চামচটা মুখে নেওয়ার মাঝেই হঠাৎ বিকট একটা বিস্ফোরণের শব্দে পুরো জায়গাটা কেঁপে ওঠে।চারপাশের কাঁচ থরথর করে কাঁপে,কয়েকটা গ্লাস মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে যায়।

এক মুহূর্তেই শান্ত পরিবেশটা ঝড়ে পরিণত হয়।বিশাল বড় হোটেল হওয়ায় মানুষ ও ছিলো সেখানে।মানুষজন চিৎকার করতে করতে ছোটাছুটি শুরু করে।
কেউ টেবিলের নিচে লুকাচ্ছে, কেউ দরজার দিকে দৌড়াচ্ছে।ইশায়া ভয়ে জমে যায়।
তার হাত থেকে চামচটা পড়ে গিয়ে ঠক করে শব্দ করে মেঝেতে লাগে।ভীরের লোকেরা মুহূর্তের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।কেউ ওয়াকি-টকি কানে চেপে কথা বলছে, কেউ ব*ন্দুক বের করে পজিশন নিচ্ছে।
নিক দ্রুত বন্দুক বের করে সামনে এগিয়ে যায়। তার চোখে তখন রক্ত নামা হিংস্রতা।ভীরের মুখ মুহূর্তেই বদলে যায়।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে মানুষটা শান্ত ছিলো , এখন সে আবার সেই ভয়ংকর মাফিয়া রুপে ফিরে যায়।।
সে গর্জে ওঠে,

___একটাও যেন প্রাণ নিয়ে ফিরতে না পারে!
চারপাশ স্তব্ধ হয়ে যায় তার কণ্ঠে।ভীরের চোখ লাল হয়ে ওঠে ক্রোধে।চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
___ওরা আমার জানে আঘাত করতে চেয়েছে, ওদের কলিজা ছিঁড়ে আনবো আমি!
কথাগুলো বলতে বলতেই সে দ্রুত ফিরে আসে ইশায়ার কাছে।কারণ এখন তার প্রথম কাজ-ই ইশায়াকে সেফ রাখা।হোটেলের ভেতরে কেউ ঢুকতে পারেনি।সংঘর্ষ শুরু হয়েছে বাইরেই।
বাইরে একের পর এক গু*লির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
কালো গাড়িগুলোর হেডলাইট জ্বলছে, লোকজন দৌড়াচ্ছে, আর রাতের অন্ধকারে ব*ন্দুকের আগুন বারবার ঝলসে উঠছে।পেছন দিক থেকে ডিয়েগো এনরিকোও এসে পৌঁছায়।তার হাতে লম্বা ব*ন্দুক, চোখে ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা।সামনে নিক, রাফা, মোন্দেজা, রোসাস সবাই পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।যেন পুরো যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি হয়ে গেছে কয়েক মিনিটের মধ্যে।
ভীর ইশায়াকে ভেতরে নিরাপদ জায়গায় রেখে বলে এখানে থাকবে,সবাই আছে। বলে বাইরে যেতে নেয়।
কিন্তু হঠাৎই ইশায়া তার শার্ট খামচে ধরে।ভীর থেমে যায়।
তাকায় তার দিকে।মারিয়া এগিয়ে এসে ইশায়াকে শান্ত করতে চায়।
ইশায়ার চোখ ছলছল করছে।ভয়ে তার ঠোঁট কাঁপছে।
সে মাথা নেড়ে “না” বোঝায়।
মানে তাকে একা রেখে যেতে না।
সেই চোখের ভেতরের ভয়টা দেখে ভীরের বুকের ভেতর কেমন য মোচড় দিয়ে ওঠে।
এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে ইশায়াকে বুকে টেনে নেয়।তার বড় হাতটা আলতো করে ইশায়ার মাথায় বুলিয়ে দেয়।
নিচু, আশ্বাসভরা গলায় বলে,

___ ভয় পেয়ো না… কিছু হয়নি।কিছু হবে না।
আমি আছি… রিল্যাক্স জান।
ভীরের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয় ইশায়া।বাইরে তখনও গু*লির শব্দ থামেনি, চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে।ভীর যেতে চায় বাইরে কিন্তু এই মুহূর্তে ইশায়া তাক ছাড়ছে না।একটুও না। আর ভীর ও পারছেনা ইশায়াকে এই অবস্থায় ছেড়ে দিতে।
ইশায়াকে এতটা ভয় পেতে দেখে ভীরের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে অস্থির হয়ে ওঠে।মেয়েটার পুরো শরীর কাঁপছে, নিশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে, চোখদুটো আতঙ্কে ভরে গেছে। বাইরে গু*লির শব্দ থামলেও তার শরীরের কাঁপুনি থামছে না।ভীর মারিয়া এলেনাকে ইশারা করতেই সে চুপচাপ ছোট্ট একটা মেডিসিন কেস বের করে।একটা ঘু*মের ওষুধ হাতে নিয়ে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয় ইশায়ার দিকে।
ভীর নরম গলায় বলে,

___এটা খাও। তুমি ঘুমাও, ইশায়া ভালো লাগবে ।
ইশায়া কিছু বলতে চেয়েও পারেনা।ভীরের চোখের দিকে তাকিয়ে ওষুধটা খেয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ পরেই তার চোখ ভারী হয়ে আসে।
ভীর তাকে আলতো করে হোটেলের বড় নরম বিছানায় শুইয়ে দেয়।কম্বল টেনে দেয় শরীরের ওপর।
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড ও মারিয়ার দিকে তাকায়,ভীর শক্ত গলায় বলে,
___ওর খেয়াল রাখবে।দরজা লক করো।
সবাই মাথা নিচু করে জি বস বলে।
ভীর কোমরের পাশে গুঁজে রাখা ব*ন্দুকটা বের করে হাতে নেয়।কালো ধাতব অ*স্ত্রটার ওপর আলো পড়ে চিকচিক করে ওঠে।তার মুখে তখন আর কোমলতা নেই।হিংস্রতা ফুটে ওঠেছে,
ভীর চায় না ইশায়ার সামনে তার এই দিকটা আর বের হোক।বাইরে সে যা-ই করুক না কেন,ঘরে সে এসবের ছায়াও আনবে না।ইশায়াকে সে সবকিছুর আড়ালেই রাখবে।র*ক্ত, মৃ*ত্যু, এই অন্ধকার দুনিয়ার সবকিছু থেকে দূরে।
ভীর দরজা ঠেলে বাইরে বেরোতেই দেখতে পায় করিডোরের নরম আলোয় ওয়েটারের পোশাক পরা দু’জন লোক তার দিকে এগিয়ে আসে।

দেখতে সাধারণ স্টাফদের মতো লাগলেও তাদের চোখের ভেতরের হিংস্রতা এক সেকেন্ডেই ধরে ফেলে ভীর।
লোক দুটো আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়তে যায় তার ওপর।
কিন্তু তারা কিছু করার আগেই ভীরের ব*ন্দুক থেকে বের হওয়া গু*লিটা সরাসরি একজনের বুকে গিয়ে লাগে।লোকটা পেছনে ছিটকে পড়ে যেতেই,
অন্যজন মুহূর্তেই হাতে থাকা ধারালো ছু*রিটা ভীরের উপর চালাতে নিলেই ভীর বিদ্যুৎগ তিতে তার কবজি চেপে ধরে।পরের সেকেন্ডেই ছু*রিটা ঘুরিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে দেয়, লোকটার মুখ দিয়ে র*ক্ত বেরিয়ে আসে।
ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
ভীরের চোখে মুখে ফুটে ওঠে হিংস্রতা।
ঠিক সেই সময়ই দ্রুত পায়ের শব্দ তুলে নিক দৌড়ে উপরে এসে পৌঁছায়।ব্রো ঠিক আছো তুমি।
ভীর কিছু না বলে বাইরে যায়।বা*রুদের গন্ধ চারপাশে।মাটিতে ছড়িয়ে আছে র*ক্ত, ভীরের লোকেরা একে একে সবাইকে শেষ করেছে।যারা বেঁচে ছিল, তারা প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে।ভীরের চোখ দুটো রক্তলাল হয়ে আছে।মুখের পাশের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে রাগে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডিয়েগোর দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে,

__কাল সকাল হওয়ার আগেই সবকটাকে আমার সামনে চাই।নাহলে সবকটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবো।
সে দ্রুত মাথা নিচু করে বলে,
___জ্বি, বস।
ভীর দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে।রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে।কারণ সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে
আজকের টার্গেট সে ছিল না।টার্গেট ছিল ইশায়া।
এই ভাবনাটাই তার ভেতরের দানবটাকে আরও উন্মত্ত করে তুলছে।
ভীর নিজের রক্তমাখা শা*র্টটা খুলে দূরে ছুঁড়ে মারে।
তার বুক ওঠানামা করছে ভারী শ্বাসে।হাতের আঙুলগুলো শ*ক্ত হয়ে আছে, কিছুক্ষণ পর সে আবার ভেতরে ফিরে আসে।

রুমের ভেতর তখন নিস্তব্ধতা।নরম আলোয় বিছানার ওপর ঘুমিয়ে আছে ইশায়া।ওষুধের প্রভাবে সে গভীর ঘুমে মগ্ন।মুখটা শান্ত, নিঃশ্বাস ধীর।ভীর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর এগিয়ে গিয়ে ইশায়াকে আগলে কোলে তুলে নেয়।এতো যত্ন তার প্রতিটা স্পর্শ-এ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা সে বুকে আগলে রেখেছে।
ঘুমের মাঝেও ইশায়া ভীরের বুকে নাক ঘসে।
ভীরের দৃষ্টি এক মুহূর্ত নরম হয়ে আসে।
তারপর ইশায়াকে কোলে নিয়েই গাড়ির দিকে এগিয়ে যায় সে।
দূরে কোথাও সাইরেন বাজছে।
কিন্তু ভীরের পুরো পৃথিবী তখন তার বুকে, ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটাকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ।ভীর বিরবির করে বলে,

__যে-ই তোমার দিকে হাত বাড়াবে,ভীর তার নামটা ও পৃথিবী থেকে মুছে ফেলবে।তার অস্তিত্ব আমি পৃথিবীর বুকে রাখবো না।
____ভীর প্যালেসে ফিরে সোজা নিজের রুমে আসে।
ইশায়াকে খুব সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দেয় ।
ঘুমের ওষুধের প্রভাবে মেয়েটা তখনও গভীর ঘুমে মগ্ন। মুখটা শান্ত, নিঃশ্বাস ধীর,কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে ভীর।
তারপর ওয়াশরুমে চলে যায়।শাওয়ারের ঠান্ডা পানি গড়িয়ে পড়ে তার শরীর বেয়ে।কিন্তু মাথার ভেতরের আগুনটা কিছুতেই নিভছে না।আজকের ঘটনাগুলো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
লম্বা সময় ধরে শাওয়ার নেওয়ার পর ভীর রুমে ফিরে আসে।তার দৃষ্টি আবারো গিয়ে থামে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা ইশায়ার ওপর।
হঠাৎ তার চোখ পড়ে ইশায়ার জামায়।সাদা কাপড়ের ওপর ছিটে ছিটে লেগে আছে র*ক্তের দাগ। তার গা থেকে লেগে গিয়েছে ইশায়ার জামায়।
ভীরের ভ্রু কুঁচকে যায়।
ভীর ক্লোজেট খুলে কাপড় নেয় বিছানার পাশে বসে
খুব সতর্ক হাতে ইশায়ার জামাটা বদলে দেয়, যেন তার ঘুম না ভাঙে।চেঞ্জ করিয়ে সুন্দর করে ইশায়াকে বিছানায় শুইয়ে দেয় সে।

তারপর আলতো করে ব্ল্যাংকেট টেনে শরীরের ওপর জড়িয়ে দেয়।একবার ঠিক করে দিয়ে আবারও টেনে দেখে কোথাও ফাঁকা রইলো কিনা।
এরপর ইশায়ার দুই পাশে কোলবালিশ রাখে
কারণ এই ম্যাডামকে তার এক বিন্দুও বিশ্বাস নেই।
ঘুমের মধ্যেও এমন নড়াচড়া করে যে কখন বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে নতুন কোনো অঘটন ঘটাবে, বলা যায় না।
কিন্তু বারবার নাড়াচাড়ায় বিরক্ত হয়ে ওঠে ইশায়া।
ঘুমের মধ্যেই তার কপালে হালকা ভাজ পড়ে।
লাল ঠোঁট দুটো অস্ফুটে বির বির করে কি যেন বলে। ভীর তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তার পর ভীর ঝুঁকে ইশায়ার ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু খায়।কপালেও একে দেয় ভালোবাসার নরম পরশ।কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করেই থাকে ভীর। এই শান্ত মুহূর্তটাকে সে নিজের ভেতর বন্দি করে রাখতে চাইছে।
ক্লান্ত ছিলো ভীর অনেক তাই শুয়ে পরে।ইশায়াকে বুকের মাঝে আগলে রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় ভীর।

____তখন মাঝরাত।রুমের অন্ধকারে কেবল জানালার ফাঁক গলে চাঁদের ম্লান আলো এসে পড়ছে। ঘুমের ঔষধের প্রভাব ধীরে ধীরে কাটতেই ইশায়ার চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে তার, শরীরটাও ভারী লাগছে। কিন্তু প্রচণ্ড ক্ষুধায় আর ঘুম ধরে রাখা গেল না।ইশায়া একটু নড়তেই তার মাথা গিয়ে ঠেকে শক্ত, উষ্ণ এক বুকে।
সে মাথা সরিয়ে তাকাতে চাইল ভীরের মুখের দিকে।
ঘুমের মাঝেও ভীর যেন টের পেয়ে যায় তার নড়াচড়া। বাচ্চাদের মতো আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় ইশায়ার মাথায়, আবার ঘুম পাড়িয়ে দিতে চাইছে তাকে। তারপর আধো ঘুমেই ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় তার চুলের ভাঁজে।
ইশায়া অভ্যস্ত এইসব স্পর্শে।ভীরের এই অবচেতন আদরে।এগুলো-ই হয় যখন সে সাথে থাকে।
ভীর নিজের নগ্ন বুকে আরও জোরে চেপে ধরে তাকে গভীর ঘুমের মধ্যেই।ইশায়া বহু কষ্টে নিজেকে ছাড়ায় তার কাছ থেকে। তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামে, এক হাত নিজের পেটের উপর রেখে।
কিন্তু নামার সময় অসাবধানতাবশত তার হাত লেগে সাইড টেবিলের গ্লাসটা নিচে পড়ে যায়।ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে পুরো মেঝেতে।হঠাৎ শব্দে ভীর হুড়মুড় করে উঠে বসে।ঘুম জড়ানো হাতদুটো অন্ধকারে ইশায়াকে খুঁজতে থাকে,ইশায়া…পাশে না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে সাইড লাইটটা অন করে।
আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠে,

___কি হয়েছে?
বলতে বলতেই দ্রুত বিছানা থেকে নেমে আসে।
ইশায়া ভয় মেশানো গলায় বলে,
___হাত লেগে পড়ে গেছে গ্লাসটা।
ভীর এক মুহূর্তও দেরি না করে তার হাত-পা ধরে চেক করতে শুরু করে। কোথাও কেটেছে কি না, ব্যথা পেয়েছে কি না।
তারপর রাগি গলায় বলে ওঠে,
___তুই নামলি কেনো, হ্যাঁ? একটু সময় চুপচাপ থাকতে পারিস না? শরীরে শান্তি নেই তোর! সবসময় ছটফট করিস কেন এভাবে?
ইশায়া চোখ-মুখ ছোট করে গোমড়া স্বরে বলে,
___আমার ক্ষিদে লেগেছে, ঘুম আসছে না।
কথাটা শুনে ভীর চোখ বন্ধ করে ফেলে এক মুহূর্তের জন্য।নিজেকে সংবরন করে।
হ্যাঁ… বিকেল থেকে কিছুই খায়নি মেয়েটা।ক্ষুধা তো লাগবেই।সে কিভাবে এটা ভুলে গেল?
ভীর উঠে দাঁড়ায়। তারপর নিজের রুমের কিচেন কর্নারের দিকে যায়।তার বিশাল রুমের একপাশ জুড়ে ছোট্ট একটা আধুনিক কিচেন। ইলেকট্রনিক সবকিছুই আছে সেখানে। দুটো বড় ফ্রিজ একটা কিচেনের জন্য, আরেকটা পুরোপুরি ইশায়ার পছন্দের জিনিসে ভর্তি আইসক্রিম, মিষ্টি, চকোলেট, জুস।
ভীর ফ্রিজ খুলে দেখে কি কি আছে।তারপর লম্বা গলায় ডাক দেয়,

___ইশায়ায়ায়ায়া।
ভীরের ডাক শুনে ইশায়া কমোরে এক হাত রেখে ধীরে ধীরে এসে দাঁড়ায় তার পেছনে।
ইশায়া আসতেই ভীর ঘুরে দাঁড়িয়ে তার কোমর ধরে উপরে তুলে বসিয়ে দেয় কিচেনের ডেক্সের উপর।
আচমকা এমন করায় ইশায়া ভয় পেয়ে ভীরের ঘাড় খামচে ধরে।
ভীর ভ্রু কুঁচকে নিজের ঘাড়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
___কালকে নখ কাটবে।
তারপর একটা বড় চকলেট এগিয়ে দেয় তার হাতে।
ইশায়া চকলেট খুলে মুখে নেয়।এই ফ্রিজটা এখন লক থাকে।
ইশায়া খুলতে পারেনা। কাউকে বললেও কেউ তাকে খুলে দেয় না,আর এই লোককে সে বলেনা কেন বলবে এই তো করেছে যা করার।
ভীর ইশায়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

___কি খাবে?
ইশায়া চুপ।সে বসে বসে চকলেট চিবোচ্ছে আর ভাবছে…
___কি হলো? কি খাবে?
বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,
কয়বার বলতে হয় তোমাকে এক কথা?এক বার বলার পর উত্তর দিবে দেরি পছন্দ না আমার।
ইশায়া মুখ বাঁকায় তার ধমকে।তোর পছন্দ দিয়ে আমি কি করবো,নিজের কাছেই রাখ তোর পছন্দ।
আমার পছন্দ নায়ায়ায়া….
ভীরের কথা আওড়িয়ে মনে মনে তাকে ভেঙায় ইশায়া।
বুঝেছো….
ধ্যান ভাঙে ইশায়ার,সে নরম গলায় বলে,

___চিকে…..
কথাটা শেষ করার আগেই ভীর কড়া স্বরে বলে ওঠে,
___নো।
মুহূর্তেই থমথমে হয়ে যায় ইশায়ার মুখ।ভীর এবার তাড়া দিয়ে বলে,
___অন্য কিছু বলো। ফাস্ট।
ইশায়া মুখ ছোট করে বলে,
___খাবো না আমি কিছু আ…
ভীর শক্ত চোখে তাকায় তার দিকে।সেই চাহনিতে ইশায়ার মুখটা আরও চুপসে যায়।
কিছুক্ষণ ভেবে শেষে বলে,

___চিংড়ি মাছ… আর মাসরুম খাবো।
ভীর আর কিছু বলে না, ফ্রিজ থেকে বের করে আনে চিংড়ি আর তাজা মাসরুম।ইশায়া তাকিয়ে থাকে তার দিকে।সে এখনো বুঝতে পারছে না ভীর আসলে কি করতে চাইছে।সে কি রান্না করবে নাকি আমার জন্য।কাউকে বললেই তো হতো।একটা মাফিয়া বস..
আর তার জন্য রান্না করছে! ভাবাই যায় না।
ভীর একে একে সবকিছু বের করে কাউন্টারে সাজিয়ে রাখে।
ইশায়া গভীর চোখে পর্যবেক্ষণ করছে ভীরের করা প্রতিটা কাজ।পড়নে কালো ট্রাউজার। উন্মুক্ত শরীরের উপর সাদা আলো পড়ে চকচক করছে ঘামে ভেজা ত্বক। শক্ত বাহুর শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইশায়া চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
ঘুম থেকে ওঠায় ইশায়ার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে।হাতে ধরা চকলেটটা ছোট ছোট কামড়ে খাচ্ছে সে।আর তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ভীর রান্না করতে করতেই মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়।তারপর ভ্রু সামান্য উঁচু করে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করে,

___কি?
ইশায়া হঠাৎ ধরা পড়ে যায়।দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয় অন্যদিকে।কিন্তু ভীর তার দৃষ্টি সরায় না।
তার চোখদুটো নেমে আসে ইশায়ার ঠোঁটের কোণে।সেখানে এখনও লেগে আছে চকলেটের দাগ।
ভীরের সেই দৃষ্টির মানে বুঝতে এক মুহূর্তও লাগে না ইশায়ার। তার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।
শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে আসে মুহূর্তেই।ইশায়া অস্থির হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকে, যেন কোথাও পালানোর জায়গা খুঁজছে।কিন্তু ভীর তাকে সেই সুযোগ দেয় না। এগিয়ে আসে সে।
পরের মুহূর্তেই ভীর দুহাত ডেস্কের দুপাশে রেখে ইশায়াকে নিজের মাঝে আটকে ফেলে,ঝুঁকে পড়ে ইশায়ার ঠোঁটের উপর।

হঠাৎ শরীরের ধাক্কায় ইশায়া আরও পিছিয়ে যায়,ভীর একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কোমর।
ইশায়ার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা চকলেট ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁটে মুছে দেয় ভীর।তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তে থাকে ইশায়ার মুখজুড়ে।
ভীরের এমন স্পর্শে পুরো শরীর জমে আসে ইশায়ার।তার আঙুলগুলো কেঁপে ওঠে।শ্বাস আটকে আসে বুকের মাঝে।
ইশায়া ভীরকে সরাতে চাইলে ভীর তার দুহাত পেছনে আটকে ফেলে একহাতে।আরও কাছে টেনে নেয় তাকে নিজের সাথে গভীর, উন্মত্ত এক আবেশে ডুবে যায়।
অনেকক্ষণ পরে ভীর ধীরে ধীরে সরে আসে।
দুজনেই তখন জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।
ইশায়ার গাল লাল হয়ে উঠেছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে।আর ভীর সে যেন কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবার ফিরে যায় রান্নার দিকে।
এদিকে ইশায়া এখনও বুকে হাত দিয়ে বসে আছে।
তার মাথা ঘুরছে যেন।কি থেকে কি হয়ে গেল!
লোকটা সবসময় এমন হুটহাট করে তাকে এলোমেলো করে দেয়।এক মুহূর্তে শান্ত, আর পরের মুহূর্তেই ভয়ংকর রকম অস্থির।
মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে ইশায়া,

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৪

___অসম্ভব বর্বর লোক একটা।
ভীর প্যানে বাটার ছাড়ে।রসুন দিয়ে হালকা নারে,তারপর সেই গরম বাটারে চিংড়িগুলো ছাড়ে, এরপর স্লাইস করা মাসরুম, সামান্য গোলমরিচ, চিলি ফ্লেক্স আর ক্রিম মিশিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করতে থাকে সে।ক্রিমি গার্লিক বাটার শ্রিম্প উইথ মাসরুম।
রান্নার গন্ধে পুরো রুমটা ভরে যায়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৬