Home এই অবেলায় এই অবেলায় পর্ব ৩৮

এই অবেলায় পর্ব ৩৮

এই অবেলায় পর্ব ৩৮
সুমনা সাথী

“ডাক্তার। ওর কি রক্ত লাগবে?”
হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমের ঠিক বাইরে। করিডোরের থমথমে বাতাসে শান্তর কাতর কণ্ঠস্বরটা আছড়ে পড়ল। ভেতরে তখন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে কলরব। বাইরে বিবর্ণ মুখে দাঁড়িয়ে আছে অনন্ত, শান্ত আর অভিক। কলরব যখন কাল রাতে বাইক নিয়ে ঝড়ের বেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। অনন্ত তখন তাকে আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারেনি। অথচ আজ রাতে ওদের কত আয়োজন ছিল! ক্লাব ঘরে একসাথে বসে আড্ডা দেওয়ার কথা ছিল সবার। কলরব নিজেই ফোন করে সবাইকে ডেকেছিল। কিন্তু সেই আড্ডার মধ্যমণিকেই না পেয়ে ওরা দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে। শেষমেষ যখন রাত গভীর হলো। চারপাশের নিস্তব্ধতা গ্রাস করল চারদিক। তখন এক অজানা আশঙ্কায় তিন বন্ধুই আলাদা আলাদা পথে কলরবকে খুঁজতে বের হয়। শান্তই প্রথম খুঁজে পেয়েছিল তাকে। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে শান্তর কলিজাটা কেঁপে উঠেছিল। চারপাশটা ভেসে যাচ্ছিল তাজা র ক্তে। সেই দৃশ্য সইতে না পেরে সেখানেই একবার বমি করে ফেলেছিল সে। কলরবের শরীর থেকে অত র ক্ত ঝরে যেতে দেখে এখন বারবার শান্তর মাথায় শুধু র ক্তের ভাবনাই ঘুরপাক খাচ্ছে। ডিউটিতে থাকা ডাক্তার ওদের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার সুরে বললেন,

“আপাতত দরকার নেই। প্রয়োজনীয় র ক্ত আমাদের ব্লাড ব্যাংকেই মজুত আছে। তাছাড়া ভিতরে কাব্য স্যার নিজে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছেন। যদি বাড়তি কোনো গ্রুপের প্রয়োজন হয়। উনি নিশ্চয়ই জানাবেন।”
শান্ত তবুও যেন আশ্বস্ত হতে পারল না। সে আকুল হয়ে বলল,
“ওর শরীর থেকে সব র ক্ত বের হয়ে গেছে ডক্টর। ব্লাড ব্যাংকের র ক্তে যদি কম পড়ে। দয়া করে আমাদের বলবেন। আমরা যেকোনো মূল্যে র ক্তের ব্যবস্থা করে দেব। শুধু ওকে বাঁচিয়ে দিন।”
ডাক্তার মৃদু মাথা নাড়লেন। উনি মূলত বাইরে এসেছিলেন আরও একজন নার্সকে ভেতরে ডেকে নেওয়ার জন্য। অভিকও অত্যন্ত কাতর গলায় বলল,

“ডক্টর, ও বাঁচবে তো? প্লিজ… প্লিজ ওকে বাঁচিয়ে দিন। ও আমাদের খুব ভালো বন্ধু।”
ডাক্তারের নাম সীমান্ত। এই হাসপাতালে জয়েন করেছেন বছর দুয়েক হলো। কর্মদক্ষতায় ইতিমধ্যেই বেশ নামডাক হয়েছে তাঁর। এই অল্পবয়সী ছেলেগুলোর বন্ধুর প্রতি এমন নিঃশর্ত ভালোবাসা আর আকুতি দেখে সীমান্তর মনটা বেশ দমে গেল। ভেতরে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ জাগল। কিন্তু ভেতরের নির্মম আর ভয়াবহ সত্যটা তো তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। এদের কী করে বোঝাবেন যে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবটুকু চেষ্টা চললেও কোনো কিছুই আসলে মানুষের হাতে নেই। সীমান্ত এক মুহূর্ত চুপ থেকে। কিছুটা আমতা আমতা করে অত্যন্ত ভারী গলায় বললেন,
“রোগীর অবস্থা আসলেই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এক্সিডেন্টের পর প্রথম দিকে যদি প্রপার চিকিৎসা হতো। তবে হয়তো ঝুঁকি কিছুটা কমত। ওর মাথায় খুব বড়সড় একটা চোট লেগেছে। যার ফলে মস্তিষ্কে র ক্তক্ষরণ হয়েছে। এখনো জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। আমি বলব তোমরা এখন আর ভেঙে না পড়ে প্রার্থনা করো। এই মুহূর্তে মিরাকল ছাড়া ওকে ফেরানো বড্ড কঠিন।”

কথাটা বলেই সীমান্ত দ্রুত পায়ে করিডোর ধরে চলে গেলেন। তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে অনন্ত, শান্ত আর অভিক তিনজনই কেমন যেন নিথর, নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারও বেশ খানিকটা সময় পর ওটির দরজা ঠেলে বাইরে বের হয়ে এল কাব্য। ততক্ষণে হাসপাতালের করিডোরে এসে পৌঁছেছেন অলেখা, নবনী, আরশাদ তালুকদার আর কুহু। কাব্যকে বের হতে দেখেই যেন পুরো পরিবারটা তার ওপর একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। এর আগে বহুবার কাব্য এই ওটির দরজা ঠেলে বাইরে বের হয়েছে। বহু রোগীর আপনজনদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে। অবলীলায় মুখের ওপর বলে দিয়েছে ‘আই অ্যাম স্যরি। হি অর শি ইজ নো মোর।’ কিন্তু আজ? সাধারণ দুটো কথা বলতে গিয়েও তার নিজের গলাই যেন এক অদৃশ্য ফাঁসে আটকে যাচ্ছে। বুকটা থরথর করে কাঁপছে। ভেতরে ওটি টেবিলের আলোয় নিথর শুয়ে থাকা মানুষটা যে তার ছোট ভাই কলরব। এটাই এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না কাব্য। সবসময় তিরিং-বিরিং করে পুরো বাড়ি মাথায় রাখা চঞ্চল ছেলেটা আজ কেমন অসাড় হয়ে পড়ে আছে। কাব্য আজ ওর সাথে কত রাগারাগি করেছে। কত বাজে কথা বলেছে। অথচ ছেলেটা আজ কোনো কথার উল্টো তর্ক পর্যন্ত করল না। আরশাদ তালুকদার ওঁর এই নীরবতা দেখে আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“কী হলো কাব্য। কথা বলছ না কেন? কলরব ঠিক আছে তো, বাবা? জ্ঞান ফিরেছে ওর?”
বাইরে আরশাদ তালুকদার নিজেকে যতই কঠোর দেখান না কেনো। দিনশেষে তিনি একজন বাবা। কলরবের প্রতি ক্ষোভ-অভিমান যতই থাকুক। নিজের সন্তানের এই অবস্থায় বুক তো তাঁরও পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। কাব্য নিজের ভেতরের প্রবল ঝড়টাকে কোনোমতে চেপে রেখে থমথমে গলায় বলল,

“চাচ্চু, আমরা আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ওর মূল চোটটা লেগেছে মাথায়। আমি তো নিউরোসার্জন নই। তাই আমাদের হাসপাতালের যিনি হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট। উনি নিজে ওকে দেখছেন। আঘাতের তীব্রতা বেশি হওয়ায় ও হয়তো এই মুহূর্তে কোমায় চলে গেছে। মাথায় একটা ইমার্জেন্সি অপারেশন করতে হবে। আমরা ঢাকার অন্য বড় হাসপাতাল থেকেও আরও একজন নামী নিউরোসার্জন স্পেশালিস্টকে খবর দিয়েছি। উনি কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছাবেন। তোমরা প্লিজ চিন্তা কোরো না। কলরবের কিচ্ছু হবে না।”
কথাগুলো বলার সময় কাব্যর নিজের ভেতরেই এক প্রবল অপরাধবোধ আর সংকোচ কাজ করছিল। কারণ কলরবের ভেতরের আসল অবস্থা যে কতটা আশঙ্কাজনক। তা একজন ডাক্তার হিসেবে তার চেয়ে ভালো আর কেউ এই মুহূর্তে বুঝতে পারছে না। কাব্যর মুখে কোমার কথা শুনে আরশাদ তালুকদার উত্তেজিত ও দিশেহারা হয়ে উঠলেন। তিনি চিৎকার করে উঠলেন,

“চিন্তা করব না? কীভাবে চিন্তা করব না শুনি? এতক্ষণ ধরে তাহলে কী করেছ তোমরা এখানে? এই এত বড় হাসপাতাল। দেশজোড়া এত নামী দামী ডাক্তার। এসব দিয়ে আমার কী লাভ হবে যদি আমার ছেলেই সুস্থ না হয়? এখনই দেশের সেরা ডাক্তারদের নিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করো! নয়তো যদি তোমরা না পারো। তবে সোজা ছেড়ে দাও। আমি এখনই আমার ছেলেকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাব!”
কাব্য আরশাদ তালুকদারের হাত দুটো চেপে ধরে অনুনয়ের সুরে বলল,
“চাচ্চু শান্ত হও। এই অপারেশনটা টেকনিক্যালি এতটা জটিল নয়। আর আমাদের নিউরোসার্জনও যথেষ্ট অভিজ্ঞ। সবচেয়ে বড় সমস্যা যেটা। তা হলো অলরেডি অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ওকে স্থানান্তরিত করতে গেলে ধকল সইতে পারবে না। বড্ড দেরি হয়ে যাবে। আর… আর সত্যি বলতে। অপারেশন ছাড়া এই অবস্থায় ওর সার্ভাইভ করার চান্স বড়জোর আর বারো ঘণ্টা।”
অলেখা হুহু করে কেঁদে উঠলেন। আরশাদ তালুকদার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তাঁর আগেই অলেখা স্বামীর ওপর ক্ষোভে-দুঃখে চিৎকার করে উঠলেন,

“তুমি একদম চুপ করো! তোমার জন্যই আজ আমার ছেলের এই অবস্থা! তোমার ওই কঠোরতা আর জেদের জন্য আমার কলরব রাতে ওভাবে ঘর ছেড়ে চলে গেল! এখন আর এখানে দাঁড়িয়ে দরদ দেখাতে হবে না।”
কথাগুলো বলেই অলেখা ঘুরে কাব্যর হাত দুটো খপ করে ধরে ডুকরে উঠলেন,
“কাব্য, সোনা বাবা আমার… ও তোর ছোট ভাই না রে? তুই তো ভালোবাসিস ওকে। প্লিজ বাবা, ডাক্তার হিসেবে নয়। ভাই হিসেবে তুই তোর ভাইটাকে আমার কোলে ফিরিয়ে দে! আমার সোনাটাকে একটু বাঁচিয়ে দে বাবা!”
কাব্য চরম অসহায় বোধ করল। নিজের জন্মদাত্রী সম চাচির এই আকুতি সহ্য করা কঠিন। সে কোনোমতে চোখের পানি সামলে বলল,

“বড় আম্মু, আমার নিজের সাধ্যে থাকলে কি আমি ওকে ওভাবে ওটি টেবিলে নিথর ফেলে রাখতাম? তোমরা প্লিজ একটু ধৈর্য ধরো। আল্লাহর কাছে দোয়া করো। আর করিডোরে এভাবে ভিড় কোরো না। এখানে চেঁচামেচি করলে ভেতরের ডাক্তারদের মনোযোগ নষ্ট হবে। আমি নিজে ভেতরে সব তদারকি করছি।”
কথাটা বলেই দ্রুত পায়ে করিডোরের একটা বাঁক পেরিয়ে ওটির পেছনের করিডোরের দিকে চলে গেল কাব্য। ঠিক তখনই নবনীর তীক্ষ্ণ নজর একটা বিষয়ে আটকে গেল। কাব্য একা যায়নি। ওটির পেছনের দরজা দিয়ে তার ঠিক পেছন পেছন ওটি ড্রেস পরা আরও একজন ডাক্তার এগিয়ে যাচ্ছেন। গায়ে সবুজ রঙের ডাক্তারি পোশাক। মাথায় সার্জিক্যাল ক্যাপ আর মুখটা সাদা মাস্কে সম্পূর্ণ ঢাকা। লোকটাকে প্রথম দেখার পর থেকেই নবনীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করছিল। বিশেষ করে ওই চোখ দুটো! করিডোরে আসার পর থেকে নবনী যতবারই তীক্ষ্ণ, সন্ধানী দৃষ্টিতে ওই লোকটার দিকে চেয়েছে। লোকটা ততবারই অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিয়েছে বা আড়াল করেছে নিজেকে। নবনীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এ তো অন্য কেউ হতে পারে না! মনের ভেতরের সন্দেহ আর তীব্র আকুলতা চেপে রাখতে না পেরে নবনীও বাড়ির সবার অলক্ষ্যে ধীর পায়ে ওই লোকটার পিছু নিল। করিডোরের নির্জন অংশে পৌঁছাতেই লোকটা যখন কাব্যর চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। তখন নবনী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে গিয়ে পেছন থেকে মৃদু কণ্ঠে ডাকল,

“দিব্য, শুনুন!”
ডাকটা শোনামাত্র লোকটার বাড়িয়ে দেওয়া পা দুটো যেন মেঝেতেই জমে গেল। সে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে রইল। নবনীর ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। চোখের মণি জোড়া এক চরম অবাস্তব অবিশ্বাসে আর আনন্দে চকচক করে উঠল। দিব্য নিজের পিঠ ফিরিয়েই বুঝতে পারল সে কত বড় বোকামিটা করে ফেলেছে! আপাতত সে বাড়ির আর কারও সামনে আসতে চায়নি। সবটা আড়ালে রাখতেই চেয়েছিল। কিন্তু নিজের ছোট ভাই এমন আশঙ্কাজনক অবস্থায় সে হাত গুটিয়ে বসে থাকে কী করে?হাসপাতালে ছুটে না এসে তার কোনো উপায় ছিল না। দিব্য নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও পা বাড়াতে চাইল কিন্তু নবনী ছিটকে এসে তার সামনে পথ আগলে দাঁড়াল। তার চোখের ভেতরের জমানো অভিমান। তপ্ত গলায় বলল,
“এসবের মানে কী, হ্যাঁ? আশ্চর্য! চারিপাশে এসব কী হচ্ছে? আপনি নিজে মুখ ফুটে সবটা বলবেন। নাকি আমি এখনই চিৎকার করে সবাইকে ডেকে বলব যে এটা আপনি?”
দিব্য এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চারপাশের করিডোরে চোখ বুলিয়ে অত্যন্ত নিচু, গাম্ভীর্যপূর্ণ গলায় বলল,
“আমার সাথে এসো।”

কথাটা বলেই সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। নবনী আর এক সেকেন্ডও দ্বিধা না করে ওর পিছু নিল।করিডোরের শেষ মাথায় একটা ফাঁকা কেবিনে ঢুকে পড়ল দিব্য। নবনী ভেতরে পা রাখামাত্র সে পেছনের দরজাটা আলতো করে লক করে দিল। তারপর মাথা থেকে সবুজ সার্জিক্যাল ক্যাপটা নামিয়ে মুখের সাদা মাস্কটা পুরোপুরি খুলে ফেলল। কিন্তু নবনী তখনো যেন নিজের মনকে শতভাগ সান্ত্বনা দিতে পারছিল না। সে চট করে বলল,
“আপনার ডান হাতটা দেখি!”
দিব্যর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে খুব নিরীহ মুখ করে নিজের ডান হাতটা নবনীর সামনে বাড়িয়ে দিল। নবনী আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে সেই পোড়া দাগটার ওপর নিজের হাত রাখল। আলতো করে একটু চাপ দিয়ে নিশ্চিত হতে চাইল। দাগের খসখসে অনুভূতিটা আঙুলের ডগায় লাগালো৷ এটা আসল। আর কোনো কিছু না ভেবেই এক ঝটকায় ঝাঁপিয়ে পড়ল দিব্যর চওড়া বুকের ওপর। নবনীর কাছ থেকে এমন আকস্মিক জড়িয়ে ধরাটা একদম আশা করেনি দিব্য। সে ভীষণভাবে চমকে উঠল। অবলীলায় পিছিয়ে গেল এক পা। কিন্তু নবনীর হাতের বাঁধন আলগা হলো না। সে দিব্যর বুকটা মাথাটা চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার বুকের ভেতরটা এতক্ষণের তীব্র আতঙ্কে আর আশঙ্কায় তছনছ হয়ে যাচ্ছিল। এখন যেন এক নিমেষে একটা বিশাল ভারী পাথর তার বুক থেকে নেমে গেল। কাঁপা গলায় বলল,

“এটা আপনিই? এটা আপনিই তাই না?”
দিব্য আলতো করে নবনীর পিঠে হাত রাখল। চুলে বিলি কেটে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কীভাবে বুঝলে?”
“আমি আপনাকে চিনি। আমার মন বলছিল এটা আপনি। আমি ঠিকই ধরেছি!”
নবনী অনবরত কেঁদে চলেছে আর নাক টানছে। কান্নায় ভেঙে পড়া নবনীর এই রূপ দেখে দিব্যর কেমন যেন একটু হাসি পেয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আমার ওপর এত বিশ্বাস? তুমি তো আমাকে অতটা ভালো-টালো বাসো না, তাই না?”
নবনীর কান্না যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। সে দিব্যর বুক থেকে মুখ তুলে সোজা তার চোখের দিকে তাকাল। অত্যন্ত আকুল কণ্ঠে বলল,
“খুব ভালোবাসি!”

কথাটা শুনে এবার দিব্য নিজেই থমকে গেল। সে বুঝতে পারলো। গত কয়েক ঘণ্টার ঝড় এই শান্ত মেয়েটাকে কতটা কাঁপিয়ে দিয়েছে। কতটা ভয় পাইয়ে দিয়েছে। নিজেকে সামলে নিয়ে একটু হালকা করার জন্য বলল,
“খুব ভালোবাসো? আমি কিন্তু দেখতে তেমন একটা সুন্দর নই নবনী।”
নবনীর চোখের পানি তখনো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু তার দৃষ্টিতে এখন আর কোনো সংশয় নেই।
“আপনার মনটা অনেক বেশি সুন্দর।’
“আমি কালো।”
দিব্য মৃদু হেসে নিজের গায়ের রঙের দিকে ইঙ্গিত করে পুরোনো কথাটা বলল। নবনী একটুও হাসলো না। মুগ্ধ চোখে চেয়ে বলল,
“ব্যক্তিত্ব মানুষকে আলাদা করে। রূপ নয়।”

দিব্য এবার হোহো করে হেসেই ফেলল। নবনীর গাল দুটো আলতো করে টিপে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, তুমি নিশ্চিত তো যে তুমিই নবনী? আমি কিন্তু সেই নবনীর সাথে এই নবনীর কোনো মিল পাচ্ছি না!”
নবনীর এবার সত্যি সত্যিই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেল তার ওপর দিয়ে। আর এই মানুষটা এখনো রসিকতা করে চলেছে! সে চোখ রাঙিয়ে তপ্ত গলায় বলল,
“ফাজলামি রাখুন তো! আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন হ্যাঁ? একটা ভয়ঙ্কর বহুরূপী লোক আমাদের বাড়িতে দিব্যি আপনি সেজে ঢুকে পড়েছে। আর আপনি এখানে শান্তিতে লুকিয়ে আছেন! লোকটা যদি বাড়ির কারও কোনো বড় ক্ষতি করে দিত? যদি ওকে আমি সময়মতো চিনতে না পারতাম। তখন কী হতো?”
কথাটার শেষের দিকে এসে নবনীর গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল। এতক্ষণের শক্ত হয়ে থাকা মেয়েটার ভেতরের সেই অবদমিত আতঙ্কটা এবার টের পেল দিব্য। সে আর কথা বাড়াল না। নবনীর মাথায় হাত রেখে তাকে আবার শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। আশ্বস্ত করা গলায় বলল,

“তাহলে আমি তার আগেই চলে আসতাম, নবনী।”
“একেবারে ফালতু কথা!”
“ট্রাস্ট মি। আমার মনে এই বিশ্বাসটুকু ছিল যে তুমি ওকে ঠিকই চিনে ফেলবে। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, নবনী। আচ্ছা দিয়া কোথায়? ওকে তো করিডোরে দেখলাম না?”
নবনী এবার দিব্যর বুক থেকে মাথা তুলল। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কোণার পানি টুকু মুছে নিয়ে ধরা গলায় বলল,
“দিয়া এখন ওই লোকটার কাছেই আছে। লোকটা মেইন গেটে তালা মেরে রেখেছিল। আমাদের অনেক কষ্টে হাসপাতালে আসতে দিয়েছে। কিন্তু আসল কথা বলুন তো। ওই লোকটা কে? ও আলমারি, ওয়ারড্রোব সব ঘেঁটে আপনার কোনো একটা গোপন ফাইল খুঁজছিল। ও আমাদের হুমকি দিয়ে বলেছিল আপনি নাকি ওর কাছে বন্দী! আমার যে কী ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল। বিশ্বাস করুন। সারারাত আমি একটা মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারিনি।”

দিব্যর চোয়ালটা মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে উঠল। তবে নবনীকে অভয় দিতে নরম গলায় বলল,
“আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি। আমি এখনো পুরোপুরি জানি না ও কে। তবে আর একদম ভয় পেও না। আমি তো চলে এসেছি।”
নবনী ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সায় দিল। এবার ভালো করে লক্ষ্য করতেই সে দেখল। দিব্যকে বড্ড অগোছালো লাগছে। তার চিরচেনা সেই পরিপাটি, ক্লিন শেভ করা মুখে এখন খোঁচা খোঁচা দাড়ি গজিয়েছে। চোখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। অদ্ভুত লাগছে লোকটাকে। নবনী চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে বলল,
“আপনি এভাবে লুকিয়ে আছেন কেন? পুলিশকে কিছু জানাননি?”
দিব্য নিচু স্বরে বলল, “পুলিশকে সব জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো ও এখন আমাদের বাড়ির ভেতরে অবস্থান করছে। আর ওর কাছে অস্ত্র আছে। তা ছাড়া বাড়ির বাইরেও নিশ্চয়ই ওর কোনো লোক কড়া নজর রাখছে। এই অবস্থায় পুলিশ সরাসরি একশনে গেলে ও বাড়ির কারও বড় ক্ষতি করে বসতে পারে। তাই আমাদের খুব সাবধানে চাল চালতে হবে। নবনী, আমি তোমাকে এখন যা বলব। তুমি কি ঠিকঠাক ভাবে সেটা করতে পারবে?”

নিযানা সোফায় বসে আছে নিথর হয়ে। বিশাল ড্রয়িং রুমের দেয়ালে ঝুলানো বড় পর্দার টেলিভিশনটা চলছে আপন নিয়মে। তবে সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। নিস্পৃহ হাতে ফোনটা ধরে সে শুধু তাকিয়ে আছে শূন্যতায়। আজকাল কোনো কিছুই আর ভালো লাগে না তার। চারপাশের সবকিছুতেই এক জমাটবদ্ধ বিষাদ। তার নিজের জীবনটা তো অন্যরকম হতে পারত। অনেক সুন্দর হতে পারত। তবে কেন এমন হলো? নিযানা ভেবেছিল কলরব আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। ওভাবে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর। ওখানেই সবকিছুর ইতি ঘটেছিল। তবে গতকাল কেন আবার ফিরে এলো সে? শুধু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে? কিন্তু নিযানার কাছে তো তার কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। নিযানা যখন ডিভোর্সের কথাটা উচ্চারণ করল। তখন বুঝি ছেলেটার পুরুষতান্ত্রিক অহংকারে বড্ড আঘাত লেগেছিল! কিন্তু কাল চলে যাওয়ার আগে শেষ কথাটা বলে কলরব যখন চোখ মুছেছিল। সেটা কি নিযানা ভুল দেখেছিল? ছেলেটা কি সত্যিই কাঁদছিল? নিযানার মন কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে চায় না। পাষাণ কলরবও কাঁদতে জানে? ভাবনার এই গোলকধাঁধায় আচমকাই হাতের ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল কায়েফের নাম। নিযানা কিছুটা চমকে গেল। একটা সময় ছিল যখন কায়েফের ফোন আসাটা খুব স্বাভাবিক ছিল। প্রায়ই তাদের কথা হতো। কিন্তু কলরবের সাথে নিযানার বিয়ের পর থেকেই কায়েফ কেমন যেন একটা অদৃশ্য দূরত্ব বজায় রেখে চলে। অবশ্য কলরবের সাথে তার যে একটা শীতল যুদ্ধ চলছে। সেটা বাড়ির কারও অজানা নয়। তবে আজ হুট করে কায়েফ ফোন করতে গেল কেন? নিযানা দ্বিধা ঝেড়ে ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কায়েফের কণ্ঠ,

“শুনছিস?”
নিযানা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ। কেমন আছো তুমি?”
“ভালো। তুই ভালো তো?”
নিযানা ছোট করে জবাব দিল, “হুমম।”
এক মুহূর্তের স্তব্ধতা ভেঙে কায়েফ সুধাল, “একবার হাসপাতালে আসবি না?”
কথাটা শুনে নিযানার মনে হলো সে বুঝি ভুল শুনেছে। ভ্রু কুঁচকে সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“হাসপাতালে যাওয়ার কথা বললে? মানে?”
“তোকে এখনো কেউ কিছু বলেনি?”
কায়েফের গলায় স্পষ্ট অবাকতা। নিযানা বলল, “কে কী বলবে? কী হয়েছে বলো তো?”
ওপাশ থেকে কায়েফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আসলেই তো। বাড়ির পরিস্থিতি এখন যে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। তার ওপর কলরবের এই জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে সবাই এতটাই দিশেহারা যে কারও মাথার ঠিক নেই। নিযানা তো এই বাড়িরই বউ। কলরবের আইনগত স্ত্রী। তার জানার অধিকার সবার আগে। নিযানা জানলে নিশ্চয়ই এভাবে ঘরে বসে থাকত না। কায়েফ নিজের গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল,

“কলরবের খুব বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে নিযানা। কাল মাঝরাতে। অবস্থা ভীষণ সিরিয়াস। এখন ও আমাদের হাসপাতালেই ভর্তি আছে।ওটিতে অপারেশন চলছে।”
কথাটা শোনামাত্র নিযানার বুকের ভেতরটা যেন এক তীব্র আঘাতে ধক করে উঠল। চোখের সামনের চেনা ড্রয়িং রুম। সচল টেলিভিশন। সবকিছু যেন এক লহমায় তীব্র বেগে দুলে উঠল। কায়েফ ওপাশে আরও কী কী যেন বলে যাচ্ছিল। নিযানার কান পর্যন্ত সেসব পৌঁছাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু তার মস্তিষ্ক তখন কেবল একটা বাক্যেই আটকে গেছে। কলরবের এক্সিডেন্ট হয়েছে। অবস্থা সিরিয়াস! শব্দগুলো তীরের মতো এসে বিঁধল তার বুকে। কানের পর্দায় বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল এক ভয়ঙ্কর সাইরেনের মতো। হাতটা আচমকাই অবশ হয়ে এলো নিযানার। আঙুলের ফাঁক গলে দামি ফোনটা ছিটকে পড়ে গেল মেঝের কার্পেটে। সেই শব্দে নিযানা যেন সবিস্ময়ে বাস্তবে ফিরে এলো। সে তড়িঘড়ি করে। কাঁপাকাঁপা হাতে মেঝে থেকে ফোনটা তুলে আবার কানের কাছে ঠেকাল। ওপাশ থেকে কায়েফ তখনো মরিয়া হয়ে ডেকে চলেছে,
“নিযানা! হ্যালো… নিযানা, শুনছিস তুই?”

নিযানার ভেতর থেকে একঝাঁক প্রশ্ন তীব্র বেগে উপচে আসতে চাইল। কিন্তু মুখের কাছে এসে সব শব্দ কেমন যেন জট পাকিয়ে গেল। হাত দুটো অবাধ্যের মতো কাঁপছে। কোনোমতে কম্পিত গলায় বলল,
“কায়েফ! ও… ও… কলরব! কেমন আছে এখন ও?”
“ভালো না রে। শেষ চেষ্টা হিসেবে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকানো হয়েছে ওকে। তবে! কাব্য ভাইয়া বলেছে এই অপারেশন যদি সাকসেসফুলি শেষও হয়। তাও ওর স্মৃতিশক্তি হারানোর একটা বড় সম্ভাবনা আছে। আর যদি অপারেশন সফল না হয়। তবে প্রাণটাই…!”
কায়েফ আর কথা শেষ করতে পারল না। তার নিজের চোখ দুটোও নোনা জলে ভিজে উঠেছে। গলা কাঁপছে তীব্র অপরাধবোধ আর শোকে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

“ফুপিকে নিয়ে পারলে জলদি আয়। রাখছি আমি।”
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর নিযানা সোফার ওপর নিথর হয়ল বসে রইল। এক তীব্র দমবন্ধ করা অপরাধবোধ এসে চেপে বসল তার বুকের ওপর। মনে হলো। এই সবকিছুর জন্য কোথাও না কোথাও সে নিজেই দায়ী। কিন্তু সে তো এমনটা চায়নি! স্রষ্টা সাক্ষী। সে কখনো কলরবের এমন পরিণতি চায়নি! ও চেয়েছিল কলরব তার ভুলের শাস্তি পাক। অনুতপ্ত হোক। কিন্তু তার প্রাণটাই চলে যাবে? এমন ভয়ঙ্কর কথা তো নিযানা দূরতম স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। দুটি গাল বেয়ে অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল সম্পূর্ণ নিঃশব্দে। চারপাশের চেনা ঘরটা যেন এক নিমেষে এক অন্ধকার কুঠুরিতে পরিণত হলো। নিজের ভেতরটা পাগল পাগল ঠেকতে লাগল তার। কোনোমতে চিৎকার করে ডাকল,

“মাহমুদা! মাহমুদা আপু… এদিকে এসো জলদি!”
মাহমুদা রান্নাঘরে দুপুরের কাজের তদারকি করছিল। নিযানার এমন কাতর কণ্ঠস্বর শুনে সে হাতের কাজ ফেলে একছুটে ড্রয়িং রুমে চলে এলো। নিযানার এই বিধ্বস্ত দশা দেখে সে আঁতকে উঠে বলল,
“কী হয়েছে আপু? তুমি এমন করছ কেন? কী হয়েছে তোমার?”
“মাম্মাকে কল করো। প্লিজ, মাম্মাকে একটা কল দাও!”
মাহমুদা অবাক হয়ে নিযানার হাতের দিকে তাকাল। ফোন তো তার নিজের হাতেই ধরা। তবে সে কেন মাহমুদার ফোন থেকে কল দিতে বলছে? মেয়েটার চোখ-মুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সে যেকোনো মুহূর্তে জ্ঞান হারাবে। মাহমুদা নিচু গলায়। কিছুটা ভয় পেয়ে বলল,

“আপু, ফোন তো আপনার হাতেই আছে। আপনার কি শরীর খুব খারাপ লাগছে? পানি দেব? কিছু দরকার আপনার?”
মাহমুদার কথায় নিযানা নিজের হাতের দিকে তাকাল। সত্যিই তো ফোন তো তার মুঠোতেই বন্দি। সে কাঁপা আঙুলে দ্রুত স্ক্রিন আনলক করে আনতাসাকে কয়েকবার ডায়াল করল। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। হয়তো কোনো জরুরি বিজনেস মিটিং বা কনফারেন্সে আছেন তিনি। মায়ের এই চিরকালের ব্যস্ততার ওপর এবার তীব্র রাগ হলো নিযানার। এক প্রচণ্ড ক্ষোভ জন্মাল নিজের ওপর। সে আর সময় নষ্ট না করে পরের কলটা দিল বাবা নওয়াজ চৌধুরীকে। ওপাশ থেকে রিং হতেই নওয়াজ চৌধুরী প্রায় সাথে সাথেই ফোনটা রিসিভ করলেন। ভেসে এলো আদুরে কণ্ঠস্বর,

“কী হয়েছে মা? তুমি এই অসময়ে ফোন দিলে যে? শরীর ঠিক আছে তো তোমার? অফিস থেকে ফেরার সময় তোমার জন্য কিছু নিয়ে আসব? বলো, তোমার কী চাই?”
নিযানা এক হাত দিয়ে মুখের অশ্রু মুছে নিজের গলার কাঁপনটুকু কোনোমতে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল। তারপর ভাঙা গলায় বলল,
“পাপ্পা, ওই। কলরবের খুব বড় একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে। অবস্থা ভীষণ সিরিয়াস জানো? এখন ওটিতে ওর অপারেশন চলছে। আমি এখনই হাসপাতালে যাব পাপ্পা। প্লিজ, তুমি ড্রাইভার আঙ্কেলকে একটু বলো না গাড়িটা বের করতে? উনি সকালে না জানিয়ে কোথায় যেন চলে গেছেন। আর যদি সম্ভব হয়। তুমি নিজেই প্লিজ চলে এসো।”
নওয়াজ চৌধুরী ফোনের ওপাশ থেকে মেয়ের কণ্ঠস্বরের চরম অস্থিরতা আর আকুলতা স্পষ্ট টের পেলেন। তিনি নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত ও গম্ভীর গলায় বোঝানোর সুরে বললেন,

“শান্ত হও সোনা। এতটা বিচলিত কেন হচ্ছো তুমি? তুমি তো ডাক্তার নও মা। তুমি হাসপাতালে গেলেই যে কলরব সুস্থ হয়ে যাবে। বিষয়টা তো তেমন নয়।ড্রাইভার আঙ্কেল আজ দুপুরের পর একটা জরুরি দরকারে ছুটিতে গেছেন। তুমি বরং এখন একা একা বের না হয়ে বাড়িতেই অপেক্ষা করো। আমার একটা অত্যন্ত জরুরি মিটিং চলছে। আর মিনিট কুড়ি লাগবে এটা শেষ হতে। আমি ঘণ্টাখানের মধ্যেই বাসায় এসে তোমাকে নিজের সাথে করে নিয়ে যাব।”
বাবার এই ধীরস্থির যুক্তি নিযানার ভেতরের জ্বলতে থাকা আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিল। সে মরিয়া হয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল,

“পাপ্পা, প্লিজ আন্ডারস্ট্যান্ড! হিজ কন্ডিশন ইজ ভেরি ভেরি সিরিয়াস! আই হ্যাভ টু গো নাও!”
“নিযানা, একদম জেদ কোরো না। এই অবস্থায় একা একা রাস্তাঘাটে কীভাবে যাবে তুমি? আমি যেটা বলেছি। ঠিক সেটাই শোনো। আমি তো বললামই যে আমি আসছি।”
নওয়াজ চৌধুরী বোধহয় লাইনে থেকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু নিযানা আর কোনো যুক্তি শোনার মতো অবস্থায় ছিল না। সে এক ঝটকায় ফোনটা কেটে দিল। আর এক ঘণ্টা ঘরে বসে অপেক্ষা করা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এক অজানা ছটফটানি আর তীব্র অস্থিরতায় তার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। সে সোফা ছেড়ে ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়াল।
“মাহমুদা আপু! প্লিজ, আমাকে একটা রিকশায় তুলে দাও জলদি।”
মাহমুদা এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে নিযানার ফোনের সব কথাই শুনছিল। নওয়াজ চৌধুরীর অমতের কথা জানতে পেরে সে মনে মনে বেশ ভয় পেয়ে গেল। কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলল,
“আপু, চাচা আর চাচিআম্মা যদি জানতে পারেন যে আপনি ওনাদের কথা না শুনে এভাবে একা একা চলে গেছেন। তাহলে কিন্তু…! ‘
নিযানা ধমক দিয়ে বলল, “তোমাকে আমি এই মুহূর্তে যেটা বলেছি। ঠিক সেটাই করো!”

কলরবের অপারেশন শেষ হয়েছে। সমস্ত আশঙ্কা আর জটিলতাকে পেছনে ফেলে অস্ত্রোপচারটা সফলভাবেই সম্পন্ন করেছেন ডাক্তাররা। এমনকি ওটি থেকে বের করার কিছুক্ষণের মধ্যেই একবার চোখের পাতা মেলেছিল সে। সাময়িকভাবে ফিরেছিল চেতনাও। তবে তার স্মৃতিশক্তির ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে। তা পূর্ণাঙ্গভাবে জ্ঞান ফেরার পরেই কেবল নিশ্চিত হওয়া যাবে। হাসপাতালের চওড়া করিডোর ধরে দিশেহারার মতো এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে এগিয়ে আসছিল নিযানা। তার চোখ দুটো মরিয়া হয়ে খুঁজছিল পরিচিত কাউকে। হঠাৎই করিডোরের এককোণে কুহুকে দেখতে পেয়ে সে প্রায় ছুটে গেল সেখানে। নিযানাকে এই অবস্থায় হঠাৎ হাসপাতালে উপস্থিত হতে দেখে কুহু যেমন অবাক হলো। তেমনই এক তীব্র অপরাধবোধ আর আফসোস এসে গ্রাস করল তাকে। এই এত বড় বিপদের মুহূর্তে নিযানাকে একটা খবর দেওয়ার কথা যে তার নিজের মাথাতেও আসেনি। এই ভেবে সে মনে মনে লজ্জিত হলো। নিযানা কুহুর দুটো হাত খপ করে ধরে কাঁপানো গলায় শুধাল,

“কলরব কোথায়? ও… ও ঠিক আছে তো, কুহু?”
নিযানার কণ্ঠস্বর আতঙ্কে কাঁপছে। একা একা এই মেয়েটা কীভাবে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এলো। কুহু অবাক হলো। কিছুটা শান্ত করার উদ্দেশ্যে বলল,
“রিলাক্স নিযানা। ভাইয়া এখন অনেকটাই ঠিক আছে। জ্ঞানও ফিরেছিল একটু আগে। আপাতত চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ডাক্তাররা ওকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। জানিস নিযানা। আর একটু ওলটপালট হলে হয়তো আজ ভাইয়াকে আমরা চিরতরে হারিয়েই ফেলতাম!”

কথাটা শেষ করতেই আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না কুহু। নিযানার বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলল। কুহুর মুখে ‘ঠিক আছে’ শব্দ দুটো শোনামাত্র নিযানার মাথা থেকে যেন এক বিশাল পর্বতসম পাথর নেমে গেল। এতক্ষণের জমে থাকা দমবন্ধ করা অবশ ভাবটা কেটে গিয়ে বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস। তবে পরক্ষণেই তার বুকে এক অভিমানের চাদর জড়িয়ে গেল। সে অত্যন্ত আহত গলায় বলল,
“এত বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল অথচ কেউ অন্তত আমাকে একটা খবর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলি না? আমি কি তোদের কাছে এতটাই পর হয়ে গেছি? এতটাই খারাপ আমি, কুহু?”
পাশের একটা কেবিনেই অলেখারা বসেছিলেন। করিডোরে নিযানার কণ্ঠস্বরের আওয়াজ পেয়েই বোধহয় তিনি কেবিনের দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এলেন। নিযানাকে এভাবে হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বেশ অবাকই হলেন। সেই সাথে তাঁর নিজের মনের কোণেও সামান্য অনুতপ্ততা জেগে উঠল। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় নিজের মাথা ঠিক ছিল না সত্য। কিন্তু কলরবের বউ হিসাবে মেয়েটাকে অন্তত একটা খবর দেওয়া তো উচিত ছিল। কুহু আমতা আমতা করে বলল,

“আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি রে। আমার মাথায় তখন এত কিছু ঘুরছিল যে তোর কথা আসলেই একদম খেয়াল ছিল না।”
অলেখা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাকে এই খবর কে দিল?”
নিযানা চকিতে তাকাল সেদিকে। অলেখা তখনো তার দিকে তীক্ষ্ণ, অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন। নিযানা হঠাৎই খেয়াল করল নিজের পোশাকের দিকে। তাড়াহুড়োয় বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় পরনের জিন্স আর লেডিস শার্টটা বদলানোর কথা তার মাথাতেই আসেনি। সে বেশ আড়ষ্ট আর অস্বস্তিবোধ করল। মাথা নিচু করে। নিচু গলায় জবাব দিল,
“কায়েফ ফোন করেছিল।”
অলেখা চারপাশটা একবার ভালো করে চেয়ে দেখলেন। নিযানার পেছনে আর কোনো চেনা অবয়ব চোখে পড়ল না। তিনি কিছুটা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি একা এসেছো? আর কেউ আসেনি তোমার সাথে?”

নিযানা কেবল ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সায় দিল যে সে একাই এসেছে। অলেখা আর কথা বাড়ালেন না। তিনি কেবল নিজের একটা আঙুল উঁচিয়ে বিশেষ কেবিনটা দেখিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“কলরব ওই কেবিনটাতেই আছে। তবে এখন ভেতরে যাওয়ার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে ডাক্তারদের। তুমি চাইলে ওই কাঁচের ওপাশ থেকে বাইরে দাঁড়িয়েই ওকে একবার দেখে নিতে পারো।”
নিযানা কোনো কথা বলল না। প্রায় ছুটে গেল কেবিনের ওই বন্ধ দরজাটার কাছে। মনে হলো এই তীব্র ব্যাকুলতার অপেক্ষাতেই সে এতক্ষণ ছটফট করছিল। দরজার ঠিক মাঝখানটায় চারকোনা কাঁচের একটা ছোট্ট আবরণ রয়েছে। যেখান থেকে ভেতরের পুরো কক্ষটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভেতরে বেডের ওপর নিথর হয়ে শুয়ে আছে কলরব। তার মুখের ওপর চেপে বসেছে একটা কৃত্রিম অক্সিজেন মাস্ক। পুরো মাথা জুড়ে সাদা রঙের ভারী ব্যান্ডেজ মোড়ানো। একপাশের স্ট্যান্ড থেকে ড্রপ বাই ড্রপ স্যালাইন চলছে তার অবশ ডান হাতে। দৃশ্যটা দেখামাত্র নিযানার ডাগর চোখ দুটো আবার নোনা জলে ছলছল করে উঠল। সে কাঁচের ওপর একটা হাত রেখে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। এই ছেলেটাই তো। ঠিক কালকে এই সময়টায় তার ঘরে গিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য কতটা পাগলামি করছিল। কতটা অধিকার নিয়ে কথা বলছিল! আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাসে সে আজ এভাবে জ্যান্ত লা শের মতো শুয়ে আছে। পেছন থেকে অলেখা নিস্তব্ধ করিডোরে দাঁড়িয়ে পুরো বিষয়টা খেয়াল করলেন। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আলতো করে একটা হাত রাখলেন নিযানার কাঁধের ওপর। আকস্মিক ছোঁয়ায় নিযানা চমকে লাফিয়ে উঠল। অলেখার মুখের দিকে তাকাতেই সে আর নিজের ভেতরের কান্না ধরে রাখতে পারল না। শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,

“আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি মামি! সব আমার জন্য হয়েছে। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। এত বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে!”
কান্নার তীব্র তোড়ে নিযানার কথাগুলো গলার কাছে আটকে যেতে লাগল। অলেখা নিজের মনের কোণে জমে থাকা সবটুকু অভিমান এক নিমেষে ভুলে গেলেন। তিনি মুখে কিছু না বলে। নিযানার মাথাটা টেনে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে নিলেন। মায়ের মতো সেই বুকটার সান্নিধ্য আর ওম পেতেই নিযানা ছোট বাচ্চার মতো শব্দ করে কাঁদতে লাগল। অলেখা নিজের চোখের জল আড়াল করে ধরা গলায় বললেন,
“তোমার কোনো দোষ নেই। নিজেকে আর অপরাধী ভেবো না। বাদ দাও ওসব পুরোনো কথা। এখন শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করো। যেন ওর পুরোপুরি জ্ঞান ফেরার পর সবকিছু ঠিকঠাক থাকে। ডাক্তাররা বলেছে। ব্রেনের আঘাতটা বড্ড গুরুতর ছিল। তার ওপর এত বড় একটা জটিল অস্ত্রোপচার হয়েছে। এই মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি না থাকলেও। হয়তো জ্ঞান ফেরার পর ও নিজের স্মৃতিশক্তি চিরতরে হারিয়ে ফেলতে পারে।”

স্মৃতিশক্তি হারানোর কথা শুনতেই নিযানা চমকে মুখ তুলে চাইল। তার চোখে এক আকাশ বিস্ময় আর অজানা আতঙ্ক। কলরব তাকে ভুলে যাবে? এর বেশ অনেকটা সময় পর। নওয়াজ চৌধুরী আর আনতাসা চৌধুরী হাসপাতালে এসে পৌঁছালেন। তাঁরা বেশ কিছুক্ষণ অলেখা আর আরশাদ তালুকদারের পাশে বসে সান্ত্বনা দিলেন। রাত তখন বেশ গভীর হয়েছে। কাব্য ওটি ড্রেস বদলে বাইরে এসে সবাইকে বলল যে। আপাতত সে নিজে আজ রাতে হাসপাতালে থাকবে। তাই বাকি সবাই যেন এখন হাসপাতালে অহেতুক ভিড় না করে বাড়ি চলে যায়। করিডোরের একপাশের প্লাস্টিকের চেয়ারে একদম চুপচাপ। গুটিসুটি মেরে বসেছিল নিযানা। তার চোখ দুটো তখনো কলরবের কেবিনের দিকেই স্থির। আনতাসা চৌধুরী মেয়ের কাছে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রেখে আদুরে গলায় বললেন,
“বেবি, চলো। অনেক রাত হয়েছে। আমরা বরং এখন বাসায় যাই।”
নিযানা মায়ের দিকে চোখ তুলে চাইল। নিরস গলায় বলল,

“তোমরা চলে যাও মাম্মা। কলরবের পুরোপুরি জ্ঞান ফিরুক। তারপর আমি বাড়ি যাব।”
নিযানা নিজেও জানে না কেন কিন্তু এই মুহূর্তে হাসপাতাল ছেড়ে, কলরবকে এই অবস্থায় ফেলে তার কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। ওই সারাক্ষণ কথা বলা, জেদ করা, হাসানো ছেলেটাকে এভাবে চুপচাপ, নিস্পন্দ হয়ে থাকাটা একদম মানায় না। ওর মুখ থেকে নিজের নামটা শেষবারের মতো শোনার জন্য নিযানার মনের ভেতর যে কী রকম এক প্রলয়ঙ্কারী তোলপাড় চলছে। সেটা এই হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকেই কোনো ভাষা দিয়ে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। মেয়ের এমন অদ্ভুত জেদ দেখে নওয়াজ চৌধুরী কিছুটা চিন্তিত মুখে এগিয়ে এলেন। তিনি নিযানার হাতটা ধরে বোঝানোর সুরে বললেন,
“এটা কেমন কথা মা? কাব্য তো নিজেই বলল এখানে এত রাতে থেকে কোনো লাভ নেই। ডাক্তাররা ছাড়া কাউকে ভেতরে ঢুকতেও দেবে না। আমরা বরং সকাল সকাল আবার চলে আসব। তা ছাড়া মাহমুদা বলল, তুমি দুপুর থেকে পেটে একটা দানাপানিও দাওনি। এখন তো ঘড়িতে রাত দশটা বাজতে চলল। শরীর তো এমনিতেই খারাপ করবে। চলো।”

অলেখা একটু এগিয়ে এসে নিযানার মাথায় হাত রাখলেন। স্নেহার্দ্র গলায় বললেন,
“হ্যাঁ, তুমি বরং তোমার আব্বু-আম্মুর সাথেই এখন বাসায় চলে যাও। আমরাও তো আর এখানে থাকছি না। এখন সবাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।”
নিযানা আনমনে বলে বসলো, “তাহলে… তাহলে আমি তোমার সাথে তোমাদের বাড়িতে যাই মামি?”
কথাটা শুনে অলেখা কিছুটা অবাক হয়ে নিযানার দিকে তাকালেন। ওদিকে নওয়াজ চৌধুরী কিংবা আনতাসা। কারোরই মেয়ের এই আকস্মিক প্রস্তাবটা বিশেষ পছন্দ হলো না। তাঁদের চোখে-মুখে একটা মৃদু অস্বস্তি ফুটে উঠল। নিযানা কথাটা মুখ দিয়ে বলে ফেলার পরমুহূর্তেই নিজের ভেতর একটা তীব্র আড়ষ্টতা অনুভব করল। লজ্জায় সে যেন নিজেই চুপসে গেল। সে কি একটু বেশিই করে ফেলছে? যে বাড়ি থেকে সে এক বুক অভিমান আর ক্ষোভ নিয়ে বের হয়ে এসেছিল। আজ সেই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য এত আকুলতা প্রকাশ করাটা কি আদেও তাকে সাজে? এতটা আবেগপ্রবণ হওয়া হয়তো তার ঠিক হচ্ছে না। অলেখা মনে মনে বেশ চিন্তিত বোধ করলেন। নিযানা যে নিজে থেকে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে চাইছে। এটা তাঁর ভালোই লাগার কথা। কলরবের সাথে নিযানার দূরত্বের আসল কারণ। কেন নিযানা ওভাবে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সেই সত্যটা এখন আরশাদ তালুকদারের এই পরিবারের সবারই জানা। ছেলের ভুলের কথা ভেবে অলেখার নিজের বুকেও কম কষ্ট হয়নি। ভুল যেটা সেটা তো ভুলই। অন্যায়কে তো আর প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। তবে আজ এই বিপদের দিনেও মেয়েটার ডাগর চোখে তিনি নিজের ছেলের জন্য শুধু পুঞ্জীভূত রাগ বা ঘৃণা দেখেননি বরং এক চিলতে অকৃত্রিম দরদ আর ভালোবাসা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের বাড়ির যে ভয়াবহ অবস্থা। এক খুনে দানব যেখানে দিবারাত্রি ওত পেতে বসে আছে। সেখানে মেয়েটাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ মনে হলো না তাঁর। অলেখা নিজের ভেতরের আশঙ্কা গোপন করে মুখে একটা কৃত্রিম ম্লান হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“না মা, তুমি বরং এখন আব্বু-আম্মুর সাথেই ওদের বাসায় যাও। কলরব আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরুক। তারপর না হয় তোমরা দুজন একসাথে হাত ধরে আমাদের বাড়িতে যেও।”
এই কথাটা শোনার পর নিযানার মনের কোণেও চট করে একটা ভাবনা খেলে গেল। সত্যিই তো। এটাই হয়তো সবচেয়ে ভালো হবে। তারা দুজন তো একসাথেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলো বোধহয়। তাহলে আজ কলরবকে এই নিথর অবস্থায় ওটি বেডে ফেলে রেখে সে একা কেন ওই শূন্য ঘরে পা বাড়াবে? যদি ফিরে যেতেই হয়। তবে কলরব সুস্থ হয়ে উঠুক। তারা গেলে একসাথেই যাবে। নওয়াজ চৌধুরী মেয়ের চেহারার এই দোলাচল বুঝতে পেরে দ্রুত পরিস্থিতির রাশ টেনে নিলেন। মেয়ের কাঁধে হাত রেখে গম্ভীর গলায় বললেন,
“হ্যাঁ সোনা, উনি একদম ঠিক কথা বলেছেন। চলো এখন জেদ না করে বাড়ি চলো।”

নিযানা আর কোনো তর্ক না করে বাধ্য মেয়ের মতো মৃদু মাথা নাড়ল। করিডোরের একপাশে অলেখার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল নবনী। তার সন্ধানী মন নওয়াজ চৌধুরীর এই অতি-তৎপরতার ভেতরের অন্য একটা রূপ দেখতে পেল। নবনীর কেন যেন মনে হলো। নওয়াজ চৌধুরী কোনো এক অজ্ঞাত কারণে নিযানাকে এই মুহূর্তে তালুকদার বাড়ির লোকজনের সাথে থাকতে দিতে চান না। এমনকি নিযানার হাসপাতালে ছুটে আসাটাকেও তিনি খুব একটা সহজ বা ইতিবাচকভাবে নিতে পারছেন না। হাসপাতালে আসার পর থেকেই তাঁর চোখে-মুখে জামাতার প্রতি সহানুভূতির চেয়ে এক ধরনের চাপা বিরক্তি আর অস্বস্তিই বেশি ফুটিয়ে তুলছিল। নওয়াজ চৌধুরী অবশ্য মনে মনে নিযানাকে ওই বাড়িতে পাঠাতে অলেখার এই অসম্মতির পেছনে একটা নিজস্ব মনগড়া কারণ দাঁড় করালেন। তিনি ধরে নিলেন। অলেখা হয়তো নিজের ছেলের এই মুমূর্ষু অবস্থার জন্য পরোক্ষভাবে নিযানার ওপরই রাগ করে আছেন। নিযানাকেই দায়ী মনে করছেন। আর সেই কারণেই বোধহয় তিনি নিজের ছেলের এই ঘোর বিপদের দিনে বউকে নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন না।

ড্রয়িং রুমের কার্পেটের ওপর বসে আপন মনে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে ইহান, ইভান আর ছোট্ট দিয়া। বাচ্চাদের সেই খুনসুটির ঠিক পাশেই সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছে নকীব। আর তার ঠিক মুখোমুখি অন্য একটা সোফায় বসে আছে কায়েফ। কায়েফের এই সার্বক্ষণিক উপস্থিতি আর আড়চোখে চেয়ে থাকাটা নকীবকে চরম বিরক্ত করে তুলছে। এমনিতে সকাল থেকে তার মনের ভেতরের পারদ চড়ছে। দিব্য তালুকদারকে যে বিশ্বস্ত লোকগুলোর ডেরায় কড়া হেফাজতে রাখা হয়েছিল। তাদের কাউকেই সে ফোনে পাচ্ছে না। একের পর এক রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। নকীবের অপরাধী মন পরিষ্কার আন্দাজ করতে পারছে। কোথাও একটা বড়সড় গণ্ডগোল ঘটে গেছে। পরিকল্পনার সুতোটা হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে ভেবে রাগে আর উৎকণ্ঠায় তার মাথার রগগুলো দপদপ করছে। তার ওপর কায়েফের এই তীক্ষ্ণ নজরদারি যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালল। সে আর নিজের মেজাজ ধরে রাখতে না পেরে তিরিক্ষি গলায় বলে উঠল,

“তোর সমস্যাটা কী শুনি? তোর নিজের কোনো বউ-টউ নেই? ওভাবে সারাক্ষণ হা করে আমাকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছিস কেন?”
কায়েফ নিজের হাতের ফোনটা থেকে চোখ সরিয়ে নকীবের দিকে তাকাল। কথাটা যে তাকেই উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। তা বুঝতে তার বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না। সে একটুও উত্তেজিত না হয়ে ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আপনার আছে?”
নকীব তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে মুখ বাঁকাল, “ওসব বাল-ছাল আমি রাখি না।”
“তার চেয়ে সোজা কথায় বলুন যে আপনার কপালে এখনো বিয়ে, বউ জোটেনি।”
কায়েফ বেশ চড়া সুরেই খোঁচাটা দিল। নকীবের চোখ দুটো রাগে ছোট হয়ে এলো। সোজা হয়ে বসে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
“এই! মুখ সামলে কথা বলবি…!”
“পাপ্পা!”
নকীবের রাগটা ঠিক যখন চরম সীমায় পৌঁছাতে যাচ্ছিল। তখনই দিয়ার সেই আদুরে ডাকটা এসে মাঝপথে বাধা দিল। বাচ্চাদের সামনে নিজের ছদ্মবেশের খোলসটা পুরোপুরি খসে পড়ার ভয়ে সে এক সেকেন্ডের মধ্যে গলার স্বরটাকে জোর করে নরম আর স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,

“কী হয়েছে, মা?”
দিয়া একটা খেলনা ভাল্লুক হাতে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বলল,
“আসো না। আমাদের সাথে খেলবে?”
নকীব একটা শুষ্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুই খেল গে বাবা। আমার এখন খেলার মতো একদম মুড নেই।”
পাশ থেকে কায়েফও একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে খুব ভালো করেই লক্ষ্য করছে নকীবের ভেতরের অস্থিরতা। দিয়া নিজের ছোট্ট ভ্রু দুটো কুঁচকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল পাপ্পার দিকে। তার গোলগাল মুখে এখন এক আকাশ কৌতুহল আর বিস্ময়। নিজের বাবার মুখ থেকে এমন কর্কশ আর অদ্ভুত ভাষা শুনতে সে মোটেও অভ্যস্ত নয়। নকীব মেয়েটার তাকানোর ভঙ্গি দেখে একটু অস্বস্তিতে পড়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী? ওভাবে চোরের মতো কী দেখছিস?”
খেলা ছেড়ে ইভান চোখ-মুখ কুঁচকে বলে উঠল, “তুমি আজ এত পঁচা কথা কেন বলছ চাচ্চু? আম্মু জানলে কিন্তু বকবে।”

বাচ্চাদের এই জেরা নকীবের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও গুঁড়িয়ে দিল। তার চোখের মণি দুটো মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল। সে ইভানের দিকে চেয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা, থমথমে গলায় বলল,
“বেশি কথা বলিস না। এদিকে আয় তুই!”
ইভান গোমড়া মুখে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই নকীব ‘ঠাস’ করে এক প্রচণ্ড চড় বসিয়ে দিল ছেলেটার নরম গালে। আচমকা এই হিংস্রতায় হতভম্ব হয়ে গেল সবাই। কায়েফ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্যথায় আর অপমানে ঠোঁট ফুলিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল ইভান। সে নিজের গালটা হাত দিয়ে চেপে ধরে একরাশ অবাক আর আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রইল তার চাচ্চুর দিকে। ইভানকে ওভাবে কাঁদতে দেখে ছোট্ট দিয়াও প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। সেও চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। নকীব দুই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে চরম বিরক্ত হয়ে বলল,

“চুপ একদম! তোরা কি এই ঘরটাকে মড়াকান্নার আসর বানিয়েছিস? আর তুই। এখন তুই আবার কোন দুঃখে কাঁদছিস শুনি? এমনি এমনি ঘ্যানঘ্যান না করে কাছে আয়। তোকেও একটা গালে বসিয়ে দিই। কান্নার উসুল হোক!”
কায়েফ আর স্থির থাকতে পারল না। সোফা ছেড়ে একঝটকায় উঠে এসে ইভান আর দিয়া দুজনকেই নিজের কোলে তুলে নিল। তার চোখ দিয়ে তখন যেন আগুন ঝরছে। গরম চোখে চিতার মতো তাকাল নকীবের পানে। এই মুহূর্তে কায়েফের ইচ্ছা করছে এই নরপিশাচটাকে এখানেই জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে। কিন্তু বড় কোনো বিপদের আশঙ্কায় সে নিজের ভেতরের সেই হিংস্রতাটুকু চিবিয়ে গিলে ফেলল। দিয়াকে পিঠ চাপড়ে চুপ করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। বাচ্চাদের এমন কান্নার রোল শুনে ততক্ষণে রান্নাঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে মৌনিতা। সে কায়েফের কোল থেকে ইভানকে নিজের কোলে টেনে নিল। ঠিক তখনই হাসপাতাল থেকে নবনীরাও কলরবের অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল দেখে বাড়ি ফিরে এসেছে। ড্রয়িং রুমে পা রাখামাত্র মেয়ের এই অবস্থা দেখে নবনী ছুটে এসে দিয়াকে নিজের কোলে তুলে নিল। অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে বলল,
“কী হয়েছে সোনা? ওভাবে কাঁদছ কেন তুমি? ভাই, কী হয়েছে ওর? কেউ কিছু বলেছে?”
কায়েফকে নিজের মুখ ফুটে আর কিছু বলতে হলো না। নবনীর কোলে মুখ গুঁজে দিয়া নিজেই হড়বড় করে নালিশ করতে লাগল,

“পাপ্পা বকেছে মাম্মা! ইভান কে খুব জোরে মেরেছে! পাপ্পা আজ খুব দুষ্টু দুষ্টু করছে। ইভানের গালটা পুরো লাল হয়ে গেছে জানো? খুব লেগেছে ওর। ও তো এমনিতে কখনো কাঁদে না মাম্মা। ও তো অনেক স্ট্রং। তাও আজ কাঁদছে!”
দিয়ার কথা শুনে নবনীর পুরো শরীরটা রাগে কাঁপতে লাগল। সে নকীবের দিকে ফিরে তীব্র চোখে চেয়ে কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই নকীব নিজের পকেট থেকে হাত বের করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠল,
“এই, সব কয়টা একদম চুপ! আর তুই নিজের মেয়েকে নিয়ে এই সস্তা মেলোড্রামা আর নাটকটা পরে করিস। আগে আমাকে যেটা দেওয়ার কথা ছিল। ঝটপট ওই জিনিসটা বের করে দে। ওটা হাতে পেলেই আমি এই খান থেকে চলে যাব। সহ্য হচ্ছে না তোদের। বেশিক্ষণ থাকলে সবকয়টা লা শ হয়ে যাবি।”
নবনী নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু আড়াল করে শক্ত গলায় বলল,
“ঠিক আছে। আসুন আমার সাথে।”
দিয়াকে আলতো করে আবার কায়েফের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
“চাচ্চুর কাছে আর একটুখানি থাকো সোনা। মাম্মা ঘর থেকে এখনই কাজ শেষ করে আসছে। কায়েফ, ওর একটু খেয়াল রেখো ভাই।”

দিয়াকে কায়েফের কোলে দেওয়ার বাহানায়। সবার অলক্ষ্যে অত্যন্ত গোপনে কায়েফের হাতের মুঠোয় একটা ছোট জিনিস গুঁজে দিল নবনী। কায়েফ টের পেল সেটা কি। কিন্তু সে মুখে কোনো ভাবান্তর প্রকাশ করল না। নবনীর দেখানো পথ ধরে তার শোবার ঘরের দিকেই যাচ্ছিল নকীব। কিন্তু ঘর থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে সে আচমকা কায়েফের মুখোমুখি হতেই থমকে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে অত্যন্ত নিচু, হিংস্র গলায় বলল,
“একটা কথা কান খুলে শুনে রাখিস খোকা। আজকের পর ভুলেও ওইভাবে আমার দিকে তাকাবি না। নয়তো তোর ওই ডাগর চোখ দুটো আমি নিজের হাতে উপড়ে নিয়ে ল্যান্ডিংয়ে লুডু খেলব। গট ইট? দুধের শিশুটাও আমাকে চোখ দেখায়। আয়, হায় গুরু। আমি তো নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব৷”
কায়েফকে কোনো প্রতিবাদের সুযোগ না দিয়েই সে গটগট পায়ে নবনীর পেছনে পেছনে করিডোর ধরে হেঁটে চলে গেল। কায়েফও আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে দিয়াকে মৌনিতার কাছে নামিয়ে দিয়ে অত্যন্ত সতর্ক পায়ে ওদের পিছু নিল। নবনী নিজের শোবার ঘরে পৌঁছেই এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। ঘরের দরজাটা অর্ধেক ভেজানো। নকীব ভেতরে ঢুকেই দুই হাত কোমরে গুঁজে অধৈর্য গলায় বলল,

“কী হলো? দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বের কর ওটা!”
নবনী একটুও না ঘাবড়ে নকীবের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল,
“আমার স্বামীর সাথে কিন্তু আপনি এখনো আমার কোনো কথা বলিয়ে দেননি। আপনি জাস্ট আমাদের হাসপাতালে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এখন উনার কণ্ঠস্বর নিজের কানে না শোনা পর্যন্ত। উনি সুস্থ আছেন তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে ওই ফর্মুলার ফাইল কেন দেব, বলুন?”
নকীব ধীর, হিংস্র পায়ে নবনীর আরও কাছে এগিয়ে এলো। এক ঝটকায় কোমর থেকে সেই কালো রিভলভারটা বের করে নবনীর কপাল বরাবর সোজা তাক করে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“পারবি না মানে? তুই সামান্য একটা মেয়ে হয়ে আমাকে হুকুম করছিস? বেশি চালাকি না করে জিনিসটা জলদি বের কর। নয়তো আমার এমনিতেই মাথা প্রচণ্ড গরম হয়ে আছে। এক সেকেন্ডও ভাবব না। একদম মাথার খুলি উড়িয়ে দেব জাস্ট!”
নবনী শান্ত গলায় বলল, “আমিও পারবো না।”

“তুই…!”
নকীব কথাটা সে শেষ করতে পারল না। তার আগেই আচমকা পেছন থেকে কেউ একজন এসে তার ঘাড়ে ধারালো কিছু একটা সজোরে ফুটিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে এক তীব্র অবশ করা যন্ত্রণায় মুখ দিয়ে একটা ‘আহ’ সূচক শব্দ বেরিয়ে এলো নকীবের। সে কোনোমতে টালমাটাল শরীরে পেছনে তাকাতেই দেখল। হাতে একটা খালি সিরিঞ্জ নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা চোখে চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কায়েফ। ইনজেকশনের তীব্র ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় নকীবের চোখের চারপাশটা মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকার হয়ে এলো। মাথাটা টলমল করতে লাগল। সে নিজের অবশ হয়ে আসা মুখ দিয়ে কোনোমতে শেষবারের মতো উচ্চারণ করল,
“শীট!”
বন্দুক ধরা হাতটা সে শেষ চেষ্টা হিসেবে নবনীর দিকে তাক করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। কায়েফ এক ঝটকায় নকীবের কবজিটা মুচড়ে ধরে বন্দুকটা ওপরের দিকে তাক করে কেড়ে নিল। এর ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নওরোজ নকীবের শরীরটা সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে মেঝের ওপর ধপাস করে আছড়ে পড়ল। সে পুরোপুরি জ্ঞান হারানোর পর কায়েফ আর নবনী মিলে আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। শক্ত দড়ি দিয়ে নকীবের হাত-পা চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে শক্ত করে বাঁধল ওরা। কাজ শেষ হতেই কায়েফ দিব্যকে কল করলো,

“ব্রো, কাজ শেষ। বেঁধে ফেলেছি ওকে। এখন কী করব?”
ফোনের ওপাশ থেকে দিব্য একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কিছুটা সন্দিহান গলায় বলল,
“ওর মুখে কি কোনো সিলিকন মাস্ক আছে? ভালো করে চেক কর তো।”
কায়েফ নকীবের মুখের চামড়া, কানের পাশটা খুব ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। তারপর বলল,
“নাহ ব্রো। কোনো মাস্ক-টাস্ক নেই। এটা ওর একদম অরিজিনাল ফেস মনে হচ্ছে। এমনিতেও তো কথায় বলে পৃথিবীতে একই চেহারার নাকি সাতজন মানুষ থাকে। কোনো এক অদ্ভুত কুদরতে হয়তো ও দেখতে হুবহু তোমার মতো হয়ে গেছে।”
কায়েফের কথা শুনে দিব্যর কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ পড়ল। একই রকম চেহারা হওয়াটা কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অতীত ইতিহাস? সে কিছু একটা গভীর চিন্তা করে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল,

“কায়েফ, আমি বাড়ি না পৌঁছানো পর্যন্ত তুই কোনোভাবেই ওর ওপর থেকে নজর সরাবি না। আমি আসছি।”
কায়েফ কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে মনে করিয়ে দিল, “কিন্তু ভাইয়া। বাড়ির বাইরে তো ওর লোক ওত পেতে বসে আছে। তুমি যদি এই অবস্থায় হুট করে বাড়ির মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে যাও। ওরা তো এক নজরেই বুঝে যাবে যে ভেতরের নকীব আর বাইরের দিব্য তালুকদার এক নয়! তখন তো ওরাই একশনে চলে যাবে।”
দিব্য আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, “ওরা কিচ্ছু বুঝতে পারবে না কায়েফ। তালুকদার বাড়ির মেইন গেট দিয়ে স্বয়ং নকীব নওরোজ হয়েই প্রবেশ করব!”

ভোর ভোর কলরবের চোখের পাতা দুটো কেঁপে উঠল। ফিরল জ্ঞান। সারারাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করেনি কাব্য। ভাইয়ের শয্যাপাশে বসে প্রতিটা মুহূর্ত কাটিয়েছে চরম উৎকণ্ঠায়। কলরবের জ্ঞান ফিরেছে এবং সে চোখ মেলে চারপাশটা চেনার চেষ্টা করছে দেখে কাব্যর বুকের ভেতর থেকে এক বিশাল পাথর নেমে গেল। কাব্য আলতো হাতে ভাইয়ের মুখের ওপর থেকে প্লাস্টিকের অক্সিজেন মাস্কটা সরিয়ে নিল। কথা বলে বুঝলো সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়। ডাক্তারদের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে কলরবের স্মৃতিশক্তি একদম অক্ষত আছে। কোনো অঘটন ঘটেনি। এতক্ষণের জমে থাকা সমস্ত আবেগ আর ক্লান্তি আড়াল করতে সে বলে উঠল,
“ওঠ বাপ! অনেক জ্বালিয়েছিস সারারাত। এই যে আমাদের জানটা কয়লা করলি। এর শোধ আমি তোর ওপর কীভাবে নেব। সেটাই এখন ভাবছি।”

কলরব পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। চারপাশের সাদা দেয়াল আর চেনা আলোর মাঝে কাব্যর বিধ্বস্ত মুখটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত ক্ষীণ, দুর্বল একটা হাসি ফুটে উঠল। কাব্য আর কথা না বাড়িয়ে আরেক দফায় ওকে পরীক্ষা করে নিল। চোখের মণি দুটো ভালো করে দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মাথায় কোনো তীব্র ব্যথা বা অন্য কোনো অস্বস্তি হচ্ছে তোর?”
কলরব বালিশে মাথা রেখেই আধো-বোঁজা চোখে চাইল। খুব নিচু, ভাঙা গলায় বলল,
“তুই নিজে রাত জেগে আমার সেবা করছিস দেখে বড্ড ভালো লাগছে রে ভাই! আহ, আমার কী বিপুল ভাগ্য! রাজা আসলে এমনই। প্রজাদের কাজ তারা করবে। স্বাভাবিক। তোর অবশ্য অনেক সোয়াব হয়ে গেল।”
“সামনে থেকে হাত-পা নাড়াতে পারছিস না বলে এখন মারতে পারছি না। এটাই যা আফসোস! একবার সুস্থ হয়ে বাড়ি চল। এই হিসেব আমি একবারে সুদ-আসলে পুষিয়ে দেব।”
কলরব চোখ-মুখ কুঁচকে বেশ কাতর মুখ করে বলল,

“ভাই, পেটে একদম ডুগডুগি বাজছে। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার।”
“আপাতত কিচ্ছু সম্ভব না। চুপচাপ একদম মড়ার মতো শুয়ে থাক।”
কাব্য ওকে ধমক দেওয়ার সুরে বললেও তার চোখ তখন আনন্দের অশ্রুতে ছলছল করছে। এই ছেলেটাকে সে ভালোবাসে। সে খুব করে উপলব্ধি করেছে। ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় মৃদু নকের শব্দ হলো। কাব্য এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলতেই দেখল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অভিক আর শান্ত। দুজনেরই মুখ দুটো শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। শান্ত অত্যন্ত আমতা আমতা করে কাঁপা গলায় বলল,
“ভাইয়া… আমরা কি একটু ভেতরে আসতে পারি?”
কাব্য মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, এসো।”
অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথে ভেতরে ঢুকতে ওদের এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। আর ভেতরে পা রাখামাত্রই যখন দেখল কলরব সোজা চোখ মেলে বিছানায় শুয়ে আছে। তখন এক নিমেষে দুই বন্ধুর মলিন চোখ-মুখ আনন্দের তীব্র আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল। অভিক প্রায় বিছানার ওপর ঝুঁকে পড়ে আকুল গলায় বলল,
“তুই ঠিক আছিস তো ভাই? আমাদের চিনতে পারছিস?”

শান্ত গতকাল ডাক্তারের মুখে স্মৃতিশক্তি হারানোর আশঙ্কার কথা শুনেছিল। সেই ভয়টা এখনো তার মন থেকে যায়নি। সে অভিককে এক হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে খুব সিরিয়াস মুখে কলরবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল,
“দাঁড়া, আগে পরীক্ষা করে নিই। আচ্ছা দোস্ত… বলতো। তোর নিজের নাম কী?”

এই অবেলায় পর্ব ৩৭

কলরব প্রথমে বেশ অবাক চোখে বন্ধুদের দিকে তাকাল। ওদের শুকনো মুখ আর চোখের চাউনি দেখে একবারের জন্যও মনে হলো না যে ওরা কোনো ইয়ার্কি করছে। ওদের চেহারায় তখন চিন্তা, গভীর কৌতূহল। বন্ধুদের এই তীব্র উদ্বেগ দেখেই কলরবের দুষ্টু বুদ্ধিটা মাথার ভেতর উঁকি দিয়ে গেল। সে এক মুহূর্তের জন্য নিজের চোখের চাউনিটা একদম ফাঁকা আর শূন্য করে ফেলল। তারপর অত্যন্ত অবুঝ এবং স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ভাঙা গলায় উল্টো প্রশ্ন করল,
“আমার… আমার নাম কী?”

এই অবেলায় পর্ব ৩৯