Home মেজর ওয়াসিফ মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৯

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৯

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৯
ঐশী রহমান

লুইপা আর জুই মিলে ধারাকে ওয়াসিফের ঘরে নিয়ে এলো। ঘরটা লাল গোলাপ আর সাদা রজনীগন্ধা দিয়ে চমৎকার করে সাজানো হয়েছে। বিছানার ঠিক মাঝখানে লাল বেনারসি পরিহিতা ধারাকে বসিয়ে দিয়ে লুইপা কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
‘ আজকের রাতে নমনীয় হয়ে থাকবি, ভাইজান এলে সালাম দিয়ে কথা বলবি, বুঝতে পেরেছিস’?
ধারা ওড়নার নিচ থেকে মাথা তুলে চাইলো আপার দিকে। আলতো করে একটা হাসি দিয়ে পরপর আবার মাথা নুইয়ে রাখল । জুই আর লুইপা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে দিল।
ঘরের ভেতরে এখন শুধু ধারা। ওর বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো শব্দ হচ্ছে। মাথায় জড়োয়া গহনার ভার, নাকি আজ নতুন করে শুরু হওয়া সম্পর্কের ভার—কোনটা বেশি, ও বুঝতে পারছে না। দুহাতের তালুর দিকে তাকাল ও। মেহেন্দির সেই কালচে খয়েরী রঙে এখনো জ্বলজ্বল করছে ‘ওয়াসিফ’ নামটা।

হঠাৎ দরজার লক খোলার শব্দ হলো। ধারার পুরো শরীর এক নিমেষে শক্ত হয়ে গেল।
ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করল মেজর শাহেদ ওয়াসিফ। দরজাটা লক করে ও কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল বিছানার দিকে তাকিয়ে। লাল ওড়নায় মোড়ানো ওই রূপসী নারীটি আজ সত্যি সত্যিই ওর ঘরের লক্ষ্মী হয়ে এসেছে।
ওয়াসিফ গায়ের পাঞ্জাবির কুঁচকে যাওয়া কলারটা ঠিক করে এগিয়ে এলো। তারপর খুব ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বসল ধারার ঠিক মুখোমুখি, বিছানার এক কোণে।
ঘরজুড়ে তখন শুধু রজনীগন্ধার সুবাস আর ঘড়ির টিকটিক শব্দ। ওয়াসিফ হাত বাড়িয়ে ধারার থুতনিটা আলতো করে ধরে ওড়নাটা সামান্য ওপরে তুলল।
চোখাচোখি হতেই ধারা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ওয়াসিফের গম্ভীর অথচ তীব্র ভালোবাসায় ভরা দৃষ্টি ওকে আটকে দিল। ওয়াসিফ ধারার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল, যেখানে ওর নাম লেখা আছে খুব অধিকার নিয়ে।

মেহেদি রাঙা হাতটায় আলতো করে একটা চুমু খেয়ে ওয়াসিফ খুব নিচু, ভারী গলায় বলল,
‘আজ থেকে তুমি শুধু আমার গল্পের প্রেয়সী নও মুমতাহিনা .. তুমি আমার জীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসের অংশ। কবুল বলার সময় তোমার কাঁপা কণ্ঠটা আমার বুক ছুঁয়ে গেছে।’
ধারার চোখ দুটো টলমল করে উঠল ভালোবাসার আতিশয্যে। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মাথাটা আলতো করে নামিয়ে দিল ওয়াসিফের চওড়া বুকের ওপর। ওয়াসিফও দুহাতে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এই আলিঙ্গনে পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেমে যায়।
ওয়াসিফের শক্ত বুকের ওপর মাথাটা রাখতেই ধারার মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত ঝড়-ঝাপটা বুঝি এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। এই পুরুষটার বুকের ভেতর যে ও কতটা নিরাপদ, তা ও বিগত কয়েক বছরে প্রতিটা মুহূর্তে টের পেয়েছে। কিন্তু আজকের এই অনুভূতিটা একদম আলাদা। আজ কোনো লুকোচুরি ছাপ নেই, কোনো হারানোর ভয় নেই। ও এখন পূর্ণ অধিকার নিয়ে এই বুকে মিশে থাকতে পারে। আগেও ঠিক যেমন ছিলো।
ওয়াসিফ ধারার মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে গভীর একটা শ্বাস নিল। রজনীগন্ধা আর বৌয়ের চুলের সুবাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ঘরটায়। ও ধারার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে সরাসরি ওর কাজল কালো চোখের দিকে তাকাল।

“কী ব্যাপার? আমার বাঘিনী আজ এতো শান্ত কেন? একটা কথাও যে বলছিস না?” ওয়াসিফের কণ্ঠে সেই পরিচিত গম্ভীর টোনের মাঝেও মিশে আছে গভীর এক আদর।
ধারা চোখ দুটো পিটপিট করে তাকাল। ওড়নার লাল আভা ওর গালে এসে পড়েছে। ও খুব নিচু স্বরে বলল,
“আজ কথা বলার দিন নয়… আজ শুধু অনুভব করার দিন। আপনি সত্যিই আজ আমার হয়ে গেলেন তো, যাকে আমি আমার জীবনে ষোলেোতে চেয়েছিলাম, পরে আর চায়নি, তাকে আবার পেয়েছি, আমি একটু চুপ থাকতে চাই, অনুভব করতে চাই আপনাকে’
ওয়াসিফ একটু হাসল। সেই চেনা, ভুবনজয়ী হাসি। ও ধারার দুই হাতের তালু নিজের চোখের সামনে তুলে ধরল, যেখানে মেহেন্দির রঙে ‘ওয়াসিফ’ আর ‘Owashif’ নাম দুটো এখনো স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে। ওয়াসিফ বাংলায় লেখা নামটার ওপর নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“আমি তো অনেক আগেই তোর হয়ে গিয়েছিলাম মুমতাহিনা । এই যে এখানে লিখে রেখেছিস না? শুধু হাতে নয়, আমি জানি এটা তোর মনেও লেখা আছে।”
ধারার ফর্সা মুখখানা লজ্জায় আরও লাল হয়ে উঠল। ও ঝট করে ওয়াসিফের বুকের মধ্যে মুখ লুকাল। ওয়াসিফ ওকে আরও শক্ত করে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল। বাইরে তখনো মেঘের গুরুগুরু ডাকের সাথে টুপটাপ বৃষ্টি ঝরে চলেছে, যেন প্রকৃতির এই শান্ত সুর আজ এই দুটো মনের মিলনকে আরও মায়াবী করে তুলছে।
পরদিন সকাল।

সারা রাতের বৃষ্টির পর সকালের আকাশটা একদম পরিষ্কার, স্নিগ্ধ রোদ উঠেছে। বিয়ের বাড়ির সকাল মানেই একটা অন্যরকম ব্যস্ততা। লুইপা আর লোপা মিলে রান্নাঘরে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। মইনুল সাহেব এবং পরিবারের বাকি বড়রা ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছেন আর রাতের মেহমানদের বিদায় ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে কথা বলছেন।
লুইপা হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে বের হতেই দেখল সামির ডাইনিং টেবিলের এক কোণায় দাঁড়িয়ে মোবাইল স্ক্রল করছে। লুইপাকে দেখেই ও চারপাশটা একটু দেখে নিয়ে ইশারা করল কাছে আসার জন্য।
লুইপা কাছে গিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“আবার কী? সকাল সকাল বড়রা সবাই জেগে গেছেন, এখন একদম দুষ্টুমি করবেন না বলে দিচ্ছি!”
সামির মুচকি হেসে লুইপার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“দুষ্টুমি করছি কোথায়? আমি তো শুধু দেখতে এলাম আমার বউয়ের রাতের ঘুম ঠিকঠাক হয়েছে কি না। তাছাড়া, কাল রাতে তো আমাদের ঠিকঠাক কথাই হতে দিলে না।”
লুইপা মুখে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,

“আজ অনেক কাজ। দফায় দফায় প্রতিবেশিরা আসছে, আপনি যান তো এখান থেকে!”
বৌয়ের কথা শুনে সামির ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
লুইপা খিলখিল করে হেসে দিয়ে দ্রুত পায়ে ওখান থেকে সরে গেল। সামির শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কপাল চাপড়াল, কিন্তু ওর ঠোঁটের কোণের হাসিটা লুকানো গেল না।
এদিকে ওয়াসিফের ঘরে রোদ এসে পড়েছে জানালার পর্দা গলে। ধারা অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। ভারী বেনারসি বদলেছে সেই রাতেই।ও এখন একটা হালকা গোলাপি রঙের সুতি শাড়ি পরেছে। চুলগুলো ভেজা, পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ও যখন নিজেকে দেখতে ব্যস্ত, ঘোমটা ঠিক করায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটি শক্ত হাত এসে জড়িয়ে ধরল ওর কোমর।
ওয়াসিফ আয়নায় ধারার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চিবুকে হালকা দাড়ির স্পর্শ ধারার ঘাড়ে লাগতেই ধারা সামান্য শিউরে উঠল।

“এতো সকালে উঠে যাওয়ার কী দরকার ছিল?” ওয়াসিফ ঘুম জড়ানো গলায় বলল।
“সবাই জেগে গেছেন। আমার খিদে ও পেয়েছে। আমার এখন যাওয়া উচিত,” ধারা লজ্জামাখা গলায় বলল।
‘ কোথায় যাবি’?
‘ কেনো নিচে’
ধারার এই স্বাভাবিকতা আজ যেনো একটু বেশিই চোখে লাগছে ওয়াসিফের। ওয়াসিফ আর প্রশ্ন করে না, সোজা ওকে টেনে এনে ঘুরিয়ে রেখে ওয়াসিফ ধারার কাঁধে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে বলল, “আজকের দিনটা তোকে কেউ কিচ্ছু বলবে না। তুই এখন এই বাড়ির বড় বউ। আর তাছাড়া… এটা শাহেদ ওয়াসিফের হুকুম, এখন কোথাও যাওয়া যাবে না।”
ধারা হেসে ফেলল। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে ওয়াসিফের উদোম বুকে নকশা আঁকতে আঁকতে বলল, ” পুরুষ মানুষের হুকুম শুধু ঘরে’র বাইরে চলে সাহেব, ঘরে নয়। ঘরে কিন্তু এখন থেকে আমার হুকুম চলবে।”
ওয়াসিফ ধারার এই চঞ্চল রূপটা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকাল। ও ধারার কপালে গভীর একটা চুমু খেয়ে বলল, “আচ্ছা, মেনে নিলাম। আজ থেকে এই ঘরে তোর হুকুমই শেষ কথা।”

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৩৮

স্বামীর এমন বাধ্যতায় মেয়েটা ওমনি খিলখিল করে হেঁসে গড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা। ওয়াসিফ কোনো কথা বলে না, চুপচাপ তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি ফেলে শুধু তাকিয়ে দেখে বৌয়ের সরলতার হাসিটুকু। ঠিক এতটুকু খুশি আর আনন্দ এই মেয়েটার হাসিতে খুঁজে পাবে বলে বিগত দিনগুলো কত খাটখড় পোড়াতে হয়েছে তা একমাত্র শাহেদ ওয়াসিফ ই ভালো জানে।
জানালার বাইরে তখন একজোড়া শালিক পাখি কিচিরমিচির করে ডাকছে। নতুন সকালের এই নতুন আলোয় ধারা আর ওয়াসিফের জীবনের এক নতুন, সুন্দর এবং দায়িত্বশীল অধ্যায়ের সূচনা হলো।

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here