নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩১
রূপন্তী সরকার
রাতের নিঝুম অন্ধকারে ঘরে ইয়াশফা একা বসে আছে। ওর কোলের ওপর কুঁকড়ে শুয়ে আছে ওর বিড়াল ম্যাও।
ছোট্ট অবলা প্রাণীটার শরীরটা আজ বেশ খারাপ, সকাল থেকে কিছুই মুখে তোলেনি।
হয়তো নিজের গ্রাম ছেড়ে হঠাৎ এই নতুন বাড়িতে আর অচেনা পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারছে না বলেই এই দশা। ওদিকে পিপাই আর বাঘারা অবশ্য বাইরের
বাগানটাতেই নিজেদের মতো আস্তানা গেঁড়ে নিয়েছে।ইয়াশফা ম্যাওয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল,
কিন্তু ম্যাওয়ের শরীরটা ক্রমাগত ভীষণভাবে কাঁপছিল। ওর এই অবস্থা দেখে ইয়াশফার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। ও বিড়ালছানাটাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে করুণ সুরে বললো, ”
মা রে এমন করিস না! আর একটুখানি ধৈর্য ধর, সকাল হলেই তোকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। একটু কষ্ট কর পাখি, মা আছি তো”
ইয়াশফা নিজের মতো করে বকেই যাচ্ছে, ওর মনে হচ্ছে কেউ কলিজা ছিড়ে নিচ্ছে।
ইতিমধ্যেই ম্যাও দু-দুবার বমি করে ফেলেছে। ম্যাওয়ের নেতিয়ে পড়া শরীর দেখে ইয়াশফার বুকের ভেতরটা ভয়ে আরো দুরুদুরু কাঁপতে লাগলো।
ও কিছুতেই বুঝতে পারছিল না এই রাতে ও কী করবে। ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো জ্যোতি আর রুহি। ইয়াশফাকে ওভাবে উসকোখুসকো চুলে বসে থাকতে দেখে জ্যোতি দ্রুত এগিয়ে এলো। ও উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে বুনু? এমন করছো কেন? তোমার বিলাইটার কী হয়েছে?”
ইয়াশফা আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারলো না। ও প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় জ্যোতির দিকে তাকিয়ে বললো,
“দেখো না আপু! ও কেমন করছে! আমি এখন কী করবো, কোথায় যাবো এত রাতে? আমার বাচ্চাটার যে খুব কষ্ট হচ্ছে!”
পাশ থেকে রুহি পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, “তুমি একদম প্যানিক করো না ইয়াশফা! দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি বড় পাপাকে কল করছি। পাপা ওকে এক্ষুনি অ্যানিমেল হসপিটালে নিয়ে যাবে।”
রুহি চটপট ফোন বের করে রিদকে ডায়াল করলো, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রিদের ফোন তখন অন্য লাইনে ব্যস্ত ওয়েটিং দেখাচ্ছিল। রুহি আর সময় নষ্ট না করে তালিকায় থাকা পরবর্তী নাম, অর্থাৎ ঋষভকে কল দিয়ে বসলো। ঋষভ তখন বাড়িতে ছিল না, কোনো এক জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিল। রুহির কল স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই ও ফোন রিসিভ করে সরাসরি কাজের কথায় এলো,
“কী হয়েছে?”
রুহি ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস করলো, “ভাইয়া, তুমি কোথায় এখন?”
ঋষভ শান্ত গলায় জবাব দিল, “বাইরে একটা কাজে এসেছি। অ্যানি প্রবলেম?”
রুহি আর কোনো ভূমিকা না করে মুখ ফস্কে হুট করেই বলে ফেললো,
“ভাইয়া ইয়াশফা খুব কাঁদছে!”
“হোয়াট?!”
ওপাশ থেকে ঋষভের শান্ত কণ্ঠস্বর এক সেকেন্ডে বজ্রের মতো গর্জে উঠলো।
ব্যাকুল হয়ে একনাগাড়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন কাঁদছে ও? কোথাও কি আঘাত পেয়েছে? অনেক ব্যথা পেয়েছে রুহি? দাঁড়া আমি এক্ষুনি আসছি!”
রুহিকে আর কোনো উত্তর দেওয়ার বা পুরো ঘটনাটি খুলে বলার ন্যূনতম সুযোগ না দিয়েই ঋষভ কলটা কেটে দিল। ওপাশে রুহি ফোনটা কানের কাছে ধরে একদম থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
কল কাটার ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড়ের গতিতে রায়ান কুঞ্জের সদর দরজায় একটা গাড়ি এসে ব্রেক কষলো।
গাড়ি থেকে নেমে ঋষভ সিঁড়ি ভেঙে হন্তদন্ত হয়ে ওপরে ছুটে এলো। ওর চুলগুলো উসকোখুসকো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর চোখে-মুখে এক চরম অস্থিরতা।
ও কোনোমতে ইয়াশফার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই সোজা ইয়াশফার দিকে ছুটে গেল। বাকিদের উপস্থিতির তোয়াক্কা না করে ও এক ঝটকায় ইয়াশফাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ওর হৃৎপিণ্ড তখন কামারের নেহাইয়ের মতো পিটছে।
ও ইয়াশফার মুখটা দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে উঠলো, “কী হয়েছে ইয়াশ?! কোথায় ব্যথা পেয়েছো দেখি?”
ইয়াশফা দুই চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে রইলো। ও মনে মনে ভাবলো
এই লোকটা কি পাগল হয়ে গেছে? ও আবার কখন ব্যথা পেলো! ইয়াশফা একটু থতমত খেয়ে ঋষভের হাত দুটো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বললো, “আমি কোথাও ব্যথা পাইনি। আমার ম্যাও খুব অসুস্থ!”
ইয়াশফার কথা শুনে ঋষভের উন্মাদের মতো আচরণ হঠাৎ থমকে গেল। ও হুট করেই রেগে গেলো ইয়াশফার গাল ধরে বললো “ইডিয়েট”
এবার ওর নজর এবার নিচে নামতেই দেখলো, ইয়াশফার কোলের ওপর একটা ছোট্ট নেতিয়ে পড়া বিড়ালছানা কাঁপছে। ও এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো।
ঠিক তখনই ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা রুহি আর জ্যোতি মুখ টিপে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো। রুহি তো আর সুযোগ হাতছাড়া করলো না। ও নিজের দুই হাত কোমরে দিয়ে, মুখটা ভীষণ রকম বাঁকিয়ে হুবহু ঋষভের গলার স্বর নকল করে ভেংচি কেটে উঠলো,
“হুহ! আমি ওকে বউ বলে মানি না! ও আমার বউ নাহ”
ঋষভ এক সেকেন্ডে আগের সেই কাঠখোট্টা রূপে ফিরে এলো। ও চোখ দুটো সরু করে কটমটানি চাউনি নিয়ে রুহির দিকে তাকালো। রুহি অবশ্য ভয় না পেয়ে জ্যোতিকে নিয়ে আরও একটু হাসলো। ঋষভ এবার গলার স্বর গম্ভীর করে ইয়াশফাকে জিজ্ঞেস করলো,
“কী হয়েছে ওর?”
ইয়াশফা বিড়ালের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
“অনেক অসুস্থ! একটু আগে দুইবার বমি করেছে আর এখন খিঁচুনির মতো উঠছে। ওকে এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।”
ঋষভ আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে এক পা এগিয়ে এসে বললো, “ঠিক আছে, দাও ওকে আমার কাছে। আমি যাচ্ছি।”
ইয়াশফা চট করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বললো, “না, আমিও যাবো আপনার সাথে!”
ঋষভ এবার চোখ রাঙিয়ে কড়া গলায় ধমকে উঠলো, “একদম না! দেখেছো এখন রাত কইটা বাজে? অনেক রাত হয়েছে বাইরে। আমি একাই সামলাতে পারবো, তুমি চুপচাপ বাসায় থাকো।”
কিন্তু ইয়াশফা জেদ ধরে কোল থেকে ম্যাওকে শক্ত করে ধরে চোখের জল মুছে বললো, “না, আমি যাবোই যাবো! ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না, আমি না থাকলে ওর আরও বেশি কষ্ট হবে!”
ইয়াশফার এই কান্নামাখা জেদ ঋষভ আর না করতে পারলো না। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি চাবির রিংটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে করিডোরের দিকে পা বাড়ালো। ইয়াশফাও ম্যাওকে বুকে আগলে নিয়ে ওর পেছন পেছন গাড়ির দিকে রওনা হলো।
গাড়ি স্টার্ট দিতেই মাঝরাতের নিস্তব্ধ আর নিঝুম রাস্তা চিরে ওদের গাড়ি ছুটে চললো একটি চব্বিশ ঘণ্টা খোলা অ্যানিমেল ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে।
চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে হেডলাইটের আলোয় রাস্তাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ক্লিনিকের ভেতরে ঢুকতেই ডিউটি ডাক্তার দ্রুত ম্যাওকে টেবিল শুইয়ে ওর প্রাথমিক চেকআপ শুরু করে দিলেন।
এদিকে ইয়াশফার চোখে তখন ভর করেছে রাজ্যের ঘুম। গত কয়েকদিনের ধকল আর মাঝরাতের এই ছুটাছুটিতে ওর শরীর আর দিচ্ছিল না।
ক্লান্তিতে চোখের পাতা দুটো যেন ভারী পাথরের মতো ভেঙে আসছিল, তবুও ও খুব কষ্ট করে নিজেকে জাগিয়ে রেখে ম্যাওয়ের মাথাটা আলতো করে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। মাথাও ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে,
ঋষভ এক কোণায় দাঁড়িয়ে ইয়াশফার এই ঢুলুঢুলু অবস্থা আর ক্লান্ত মুখটার দিকেই গভীর মনোযোগে খেয়াল করছিল। ও বুঝতে পারলো মেয়েটা যেকোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে।
ও আর দেরি না করে আলতো করে ইয়াশফার হাত ধরে কেবিন থেকে বের করে বাইরের ওয়েটিং জোনে নিয়ে আসলো। ভেতরে তখন ডাক্তার একা একা ম্যাওকে ইনজেকশন দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ঋষভ ইয়াশফাকে ওয়েটিং জোনের একটা নরম সোফায় বসিয়ে দিল, তারপর নিজেও ওর ঠিক পাশে এসে বসলো। কিন্তু ইয়াশফা আর এক মুহূর্তের জন্যও নিজের চোখ খোলা রাখতে পারছিল না। একদিকে ম্যাওয়ের জন্য ভেতরে ছটফটানি, অন্যদিকে অনবরত কান্নার ধকলে ওর মাথা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। ও দুই হাত দিয়ে শক্ত করে নিজের মাথাটা চেপে ধরে রইলো, ব্যথার চোটে সোজা হয়ে মাথাটা তোলার মতো শক্তিও ওর শরীরে অবশিষ্ট নেই।
ইয়াশফার ছটফটানি দেখে ঋষভ আর কোনো কিছু না ভেবে হুট করেই ইয়াশফাকে নিজের বুকের মধ্যে তুলে নিলো। তারপর বাচ্চাদের মতো ওকে কোলে নিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াতে লাগলো। ইয়াশফা নিজের দুই হাত দিয়ে ঋষভের গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করলো।
ঋষভ ইয়াশফাকে বুকে লেপ্টে ধরে ধীর পায়ে একবার করিডোরের সামনে হেঁটে আসছে, আবার দোল খাওয়াতে খাওয়াতে পেছনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। হসপিটালের ওই নিঝুম করিডোরে দীর্ঘক্ষণ ধরে ও এভাবেই
ইয়াশফাকে বুকে আগলে হেঁটে হেঁটে ঘুম পাড়াতে লাগলো। ঋষভের নিজেরই বারবার মনে হতে লাগলো, ও মনে হয় কোনো বাচ্চাকে ঘুম পাড়াচ্ছে। আর ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই, ইয়াশফা গভীর ঘুমে তলিয়ে পড়লো।
ঋষব ওকে নিয়ে আলত করে সোফার ওপর বসলো, ও ইয়াশফাকে নিজের কোলের মধ্যে গুছিয়ে তুলে নিলো। ইয়াশফা শরীরী গঠনে অনেকটা ছোটখাটো আর পুঁচকে হওয়ায় ঋষভের মস্ত বড় কোলের ভেতর ওকে দেখতে ঠিক যেন একটা ঘুমন্ত ছোট্ট বাচ্চার মতোই লাগছিল। ইয়াশফা একদম নিশ্চিন্তে, কোনো রকম দ্বিধা ছাড়া ঋষভের চওড়া বুকে মুখ গুঁজে আরও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
ঋষভ বাঁ হাত দিয়ে ইয়াশফাকে শক্ত করে আগলে রাখলো, যেন ও কোনোভাবে পড়ে না যায়। আর ডান হাত দিয়ে নিজের ফোন বের করে স্ক্রল করতে লাগলো, কিন্তু ওর মন আসলে ফোনের স্ক্রিনে ছিল না, ছিল ওর বুকে লেপ্টে থাকা মেয়েটার ওপর। এর মধ্যেই প্রায় মিনিট বিশেক পর কেবিনের দরজা খুলে ডাক্তার বের হয়ে আসলেন। ও ঋষভ আর ইয়াশফাকে ওভাবে ওয়ান পিস হয়ে সোফায় বসে থাকতে দেখে একটু মুচকি হাসলেন। তারপর নিছু স্বরে বললেন, “ভয় পাওয়ার একদম কিছু নেই। নতুন জায়গায় আসার কারণে বিড়ালটার তীব্র ফুড পয়জনিং আর ডিহাইড্রেশন হয়েছিল, শরীর থেকে পানি কমে যাওয়ার কারণেই অমন খিঁচুনি দিচ্ছিল। আমি স্যালাইন আর ইনজেকশন দিয়ে দিয়েছি, এখন ও শান্ত। তবে সেফটির জন্য আজকে রাতে ও এইখানেই অবজারভেশনে থাকুক, স্যালাইনটা শেষ হতে সময় লাগবে। আপনারা কাল সকালে এসে ওকে নিয়ে যাবেন।”
ঋষভ মাথা নাড়িয়ে ডাক্তারের কথায় সায় দিল। ও ঘুমন্ত ইয়াশফাকে এক হাতে পাঁজাকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিলো। অন্য হাতে ইয়াশফার জুতা নিলো
ইয়াশফার গভীর ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটলো না, ও ঋষভের শার্টের কলারটা ছোট ছোট আঙুল দিয়ে খামচে ধরে ওভাবেই রইলো। ঋষভ ওকে ওভাবেই কোলে নিয়ে হেঁটে গিয়ে হসপিটাল থেকে বের হলো এবং গাড়ির সামনের সিটের দরজা খুলে ইয়াশফাকে নিয়ে একসাথে বসলো।
ও এক মুহূর্তের জন্যও ইয়াশফাকে নিজের বুক থেকে আলাদা করলো না।
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৩০
ঠিক তখনই যেন প্রকৃতির রূপ এক মুহূর্তে বদলে গেল। মেঘের ঘনঘটা আর আকাশ জুড়ে বিজলীর চমকানি শুরু হলো। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আচমকা চারপাশ কাঁপিয়ে শুরু হলো প্রচণ্ড ধূলিঝড় আর মুষলধারে বৃষ্টি। গাড়ির কাচে আছড়ে পড়তে লাগলো বড় বড় পানির ফোঁটা, বাইরে যেন এক প্রলয় শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ঝড়ের রাতেও গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা ছিল একদম শান্ত
