Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৫০

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫০

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫০
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

ঘড়ির কাটা বলছে ঝড়জলের এই রাত আজ বুঝি বেশ দীর্ঘই হতে চলেছে। সবে সময় রাত একটা বেজে উনচল্লিশ মিনিট। বেড সাইট টেবিলে রাখা ঈশান আরশাদ দেওয়ানের দামী, বিদেশি ঘড়িটা টিকটিক করছে। তবে সেটা নিঃশব্দে। সে শব্দ কানে আসার মতোন নয়। আর যদি তাঁবুর ভিতরে কোনো যন্ত্র বা কিছুর শব্দ শোনাও যেতো, সেটাও বুঝি শোনার মতো মানুষ এই মূহুর্তে এই তাঁবুর ছায়াতলে নেই। উত্তপ্ত দুই মানব-মানবী তো সেই কখন থেকে মানবজাতীর আদিম ,বন্য চাহিদায় মত্ত হয়ে আছে। দিন, কাল, সময়,পরিস্থিতি কোনো কিছু তাদের হিসেবের মধ্যেই নেই এখন, থাকার কথাও নয় হয়তো।

প্রকৃতি রুষ্ট, নাকি প্রেমে মত্ত দুই নরনারীকে প্রশ্রয় দিতে এমন উথাল-পাতাল আবহাওয়ায় ঠেকে আছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। যদিও আবহাওয়া অধিদপ্তর এ ধরনের সতর্কতা বহু আগেই দিয়ে রেখেছিলো। রাতের আঁধারে ঘনঘন দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ ঝলকানি। নদীর পরিষ্কার টলটলে পানিতে চাঁদের আলোর মতো আছড়ে পরছে সেই আলো। জঙ্গলের ভারি ভারি গাছগুলোর ডালপালা গুলো এখনো এলোমেলো ভাবে হেলে পরছে একে অপরের ওপর।
শক্ত করে গেঁথে রাখা তাঁবুটাও হেলেদুলে যাচ্ছে বারংবার। তবে এখন অবধি সেরকম ঘূর্ণির কবলে না পরায় দিব্যি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে দেখে যাচ্ছে ঝড়জলের তান্ডব আর ভিতরে! ভিতরে সাক্ষী হচ্ছে একজোড়া মানব- মানবীর মত্তচিৎকারের।
গোটা তাঁবুর ভিতরটা জুড়ে চাপা আর্তনাদ। ঘন নিঃশ্বাস, শিৎকারের আবেদনময়ী শব্দ। সে সবটা যখন খানিকের জন্য নিস্তব্ধ হলো তখন সময় এগিয়েছে আরও খানিকটা। বাইরের বাতাস বন্ধ হয়ে অনূভব করা যাচ্ছে শুধু বারিধারার ঝমঝম আওয়াজ।

তাঁবুর ভিতরে বিছানার এককোনার দিকে মাঝারি একটা টেবিল ফ্যান। ভোঁ ভোঁ শব্দ করে ঘুরছে সেটা। প্রচন্ড বাতাস সেটায় । তার ওপর আজকের প্রকৃতি গায়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মতো শীতল। অথচ দরদর করে ঘামছে ঈশান -তিতির। আর কোনো গোঙানির শব্দ না পাওয়া গেলেও ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ এখনো শিথিল হয়নি।
বস্ত্রহীন দুটো মানব-মানবী একে অপরকে আকড়ে পরে আছে এলোমেলো বিছানার ওপর। দু’হাতে তিতিরের কোমড় আঁকড়ে ঈশান মুখ গুঁজে আছে তিতিতের বুকের ভাজে। তিতির থরথর করে কাঁপছে এখনো। মেয়েটাকে খানিক স্থির করার প্রচেষ্টায় হাতের বাধন বারবার দৃঢ় করলো ঈশান। তাতে অবশ্য কাজ হচ্ছে না। তিতিরের দূর্বল হাতজোড়া জড়িয়ে রাখা ঈশান পিঠে। শান্ত হচ্ছে দু’জনেরই। এতো এতো দিনের অপেক্ষা, কাছে চাওয়ার কামনা-বাসনা। সব পূর্ণতা পেলো আজকে। পূর্ণতা পেলো তাদের বিবাহিত জীবন। পূর্ণতা পেলো তিতিরের নারীত্ব। আজ থেকে নতুন করে বিবাহিত জীবন শুরু হলো বুঝি!
তিতিরের চোখের কার্নিশ গড়িয়ে অনবরত নোনাজল গড়িয়ে পরছে। বক্ষ জোড়ার ভাজে স্বামীর তপ্ত মুখের ছোঁয়া আর তপ্ত শ্বাসে শরীর ঝিমঝিম করছে তার।
নিজেকে ধাতস্থ করে বেশ সময় নিয়ে সেখান থেকে মুখ তুললো ঈশান। তাকালো স্ত্রীর মুখের দিকে। টকটকে লাল দেখাচ্ছে মুখটা। নাকের ডগা, দু গাল,কানের লতি অস্বাভাবিক লাল বর্ণ ধারণ করে আছে। লজ্জারা ডানা ঝাপটাচ্ছে মেয়েটার সুশ্রী মুখমন্ডলজুড়ে। ঈশান প্রশান্তির হাসি হাসলো। তার গোটা শরীরহ জুড়ে বইছে সেই প্রশান্তির রেশ। হালকা গলায় বললো,

—’কষ্ট হচ্ছে?’
তিতির লজ্জা পাচ্ছে। ভীষন লজ্জা পাচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে ফেললো। বুজে ফেললো আখিজোড়া। ঈশান নিজের শান্ত শরীর টেনেহিঁচড়ে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে ঠেকলো তিতিরের ঠোঁট ছুঁই ছুঁই হয়ে। টুপ করে চুমু খেলো রক্তাক্ত ঠোঁটজোড়াতে। নিচের বাঁ পাশের অংশটায় কেটে রক্ত শুকিয়ে আছে বেশ খানিকটা। ফুলে গিয়েছে। সেখানে আঙুল ছুয়িয়ে বললো,
—’কষ্ট দিয়ে ফেলেছি কি বেশি?’
ঈশান আজ রাতে প্রথম যে মূহুর্তে কাছে টানলো তিতিরকে। তারপর থেকে ঠিক কতটা সময় পার হয়ে গিয়েছে তার হিসেব কি রেখেছে মানুষটা। বাইরের কালবৈশাখীর সাথে পাল্লা দিয়ে তার গোটা শরীরে যে এরইমধ্যে কয়েকদফা ঝড় বয়িয়ে দিয়েছে সে-সব কি মনে নেই নাকি! তিতির অভিমানি কন্ঠে বললো,
—’নাহ তো। আমি তো রোবট। আমার কষ্ট হবে ক্যানো! আরও করুন অত্যাচার।’
ঈশান বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ক্রমাগত স্লাইড করে যাচ্ছে তিতিরের তুলতুলে ঠোঁটের ওপর। গাঢ় লাল লিপস্টিক স্টেইনের কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই আর। শুধুমাত্র রক্তিম আভা বাদে। ঈশান হাস্কিস্বরে বললো,
—’অত্যাচার মনে হয়েছে? হু? এনজয় করিসনি? তোর রেসপন্সে আমার তো কেনো যেনো গোটাটা সময় মনে হচ্ছিলো আমি যতটা এনজয় করিছি, তুই ও ঠিক ততটাই করেছিস। যেভাবে খামচে ধরে মিশিয়ে নিচ্ছিলি নিজের সাথে। আর যেভাবে আমার নাম চিৎকার ধরে ডাকছিলি।’

—’থামুন। প্লিইজ।’
নিজের দু’হাতে ততক্ষণে কান চাপা দিয়েছে তিতির। বন্ধ চোখের পাপড়ি যুগল তিরতির করে কাঁপছে। ঈশান থামবে? এতো সহজে! বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,
—’ তোর কন্ঠে স্বরবর্ণের টান চুম্বকের মতো টানছিলো আমাকে। মরে যাচ্ছিলাম তোকে তীব্র থেকে তীব্রতর কাছে টানার প্রয়াসে। আমার কি দোষ?’
তিতির মুখ ঘুরিয়ে রেখেই মিহি কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’প্রয়াস পূরণ হয়নি বুঝি?’
—’ এ প্রয়াস আজীবন থেকে যাবে।’
তিতির মিটমিট করো আখি মেললো। ঈশানের মাতাল দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। দু’হাতে ঈশানের পিঠ জড়িয়ে শান্ত স্বরে বললো,
—’আমি আমার গোটা জীবনে আপনি ছাড়া আর কোনো পুরুষকে , আমার দেহ স্পর্শ করার অনুমতি দেইনি, ঈশান ভাই। সজ্ঞানে তো নয়ই।’
ঈশান মেয়েটার পাতলা ঠোঁট হাতে চেপে ধরলো। শূন্যের মতো আকার হলো। নিজের ঠোঁট সেখানে ছুয়িয়ে বললো,

—’ ভাই? ‘
তিতির ঝটপট শুধরে নিয়ে জবাব দিলো,
—’ঈশান…’
—’ ভাই ডাকলে ডোজ একটা বাড়বে। আরও একদফা সহ্য করতে হবে আমাকে। মুখে ধমকাবো না। এরপর যতবার ভাই ডাকবি, ততবার আমাকে সহ্য করতে হবে। বিছানায়…’
ঠোঁট কামড়ে ধরলো তিতির, ইতস্তত সুরে বললো,
—’ভুলে বলে ফেলেছি।’
—’এরপর ভাই ডাকলে ধরে নেবো আমার আদর চাইছিস ইশারা ইঙ্গিতে। লজ্জায় সেটা চাইতে না পেরে ভাই ডেকে মনে করিয়ে দিচ্ছিস আমাকে।’
—’ইশশ ছিহ্। কখনো না।’
—’তাহলে কি সোজা ডাকবি কাছে? আজ যেমন ডাকলি? হুম? ডাকবি? আকুল স্বরে আদর চাইবি। গোটাটা সময় যেমন লাল, নীল হয়েছিস ব্যাথায় তবুও সরতে দিসনি আমাকে। উল্টো দুরত্ব ঘুচিয়েছিস নিজ ইচ্ছায়?’
তিতিরের শান্ত দেহ আরেকদফা ঝঙ্কার তুললো। লাজুল মুখে প্রশ্ন ছুড়লো,

—’চাইতে হবে?’
—’তোর মুখে শুনতে ভালো লাগে। পাগল হয়ে যাই আমি। আজ যতবার বলেছিস আরও আদর চাই তোর। ততবার মনে হয়েছে আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি। দুনিয়ার সব আদর, সব রকম ভাবে দিয়ে দেই তোকে।’
বুকের ওঠানামা পুনরায় দ্রুত হয়ে এসেছে তিতিরের। পাতলা একটা চাদর ঈশানের কোমড় অবধি। কোনোমতে জড়িয়ে আছে সেটা দু’জনকে। উর্ধ্বাংস উন্মুক্ত দু’জনেরই। যদিও তিতির ঢাকা পরে আছে ঈশানের উদাম বুকের নিচে। পিষে আছে তার নারী শরীর। তিতির মিহি গলায় বলে,
—’ আপনার আগে কোনো পুরুষ আমাকে স্পর্শ করার দুঃসাহস করেনি। প্রমান পেয়েছেন? এই সতিত্ব আপনার জন্য তোলা ছিলো। প্রমান লাগবে আরও? আপনি কিন্তু প্রশ্ন তুলেছিলেন কোনো একদিন।’
মুখের হাসি মিলিয়ে গেলে ঈশানের। বুকটা ভারি লাগলো বুঝি। চাপ অনূভব করলো কঠিন ভাবে। তার দাম্পত্যের শুরুর দিনগুলোতে কাটিয়ে আসা কিছু মনে না রাখার মতো মূহুর্তের উল্লেখ করলো তিতির। বলেছিলো সে? বলেছিলো তো। রাগের মাথায় বলে ফেলেছিলো। তিতিরের জেদ আর তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে কি বলে ফেলেছিলো এটা!

ঈশান নিঃশব্দে মুখ গুঁজল তিতিরের কন্ঠদেশে। মত্ত হলো কঠিন আদরে। অসংখ্য কালসিটে সেখানটা। জ্বালা করছে তখন থেকে। আরেকদফা সেখানটায় ঈশানের ঠোঁট আর দাঁতের দংশনে দ্বিগুণ হলো জ্বালাপোড়া। দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বুঝে সহ্য করে নিলো স্বামীর আদর। ঈশান আদরের মাঝেই কেমন একটা কম্পিত কন্ঠে হিসহিসিয়ে বললো,
—’ চুপ। একদম চুপ। ভুল হয়েছিলো আমার। বিশ্বাস কর। কথাগুলো আমি কল্পনা তেও আনিনি কখনো। কিন্তু তোর জেদ আর… ভুলে, রাগে বলে ফেলেছিলাম। আমি তোর জীবনের প্রথম পুরুষ। যার কাছে তুই তোর সতিত্ব বিলিয়েছিস। আমিই তার প্রমাণ। একজন পুরুষের কাছে, স্বামী হিসেবে এর থেকে সুখের মূহুর্ত হয়না। একদম হয়না…’
দু’হাতে তিতিরকে আগলে উঠে বসলো ঈশান। চোখমুখ খিচে এলো তিতিরের। তলপেটে তীব্র খিঁচুনি দিয়ে উঠলো। ঈশান চাদর টা টেনে তিতিরের বুক অবধি টেনে দিয়ে বসালো নিজের কোলের ওপর। মেয়েটার অবশ পা ‘দুটো টেনে আনো একপাশে৷
তিতিরের পেটে নিজের হাত রাখতে রাখতে বললো,

—’বেশি কষ্ট হচ্ছে।’
—’হলে কি করবেন?’
—’হাত বুলিয়ে দেবো?’
—’ক্ষত সারাতে গিয়ে পুনরায় খেই হারাবেন। জানি সেটা।’
—’ তাহলে? এরই মধ্যে সব জেনেও গেছিস? ‘
—’জানা বাদ আছে বুঝি কিছু?’
—’অনেক কিছু।’
—’জানতে চাই।’
—’সময় হোক।’
—’আজকের দিনও সে সময় নয়? আর কত? আমার সময় হলো, অথচ আপনার সেই সময় এখনো এলো না। কি এমন কথা যেটা আমি জানিনা?’
ঈশান মলিন হেসে তিতিরের ফুলো ফুলো গাল ধরে টানলো।

—’এখন দুনিয়ার সব আলাপ-আলোচনা বন্ধ। মনমেজাজ ভালো এখন। নষ্ট করতে চাচ্ছি না। ‘
জোর করতে গিয়েও ক্যানো যেনো থেমেই গেলো তিতির। ঈশান যখন এই মূহুর্তে বলতে চাচ্ছে না থাকুক না হয়। তিতির নড়েচড়ে উঠলো। ঈশানের কোল থেকে সরে যাওয়ার প্রচেষ্টা খানিকটা। যদিও নড়াচড়া বেশ কষ্টকরই লাগছে তার কাছে। ঈশান গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,
—’এখানে কি অসুবিধা হচ্ছে?’
—’আ…আসলে ফ্রেশ হতাম। ঘুমাবেন না?’
—’আজ ঘুমানোর মতো ওয়েদার?’
তিতির মাথা ঝুকিয়ে ফেলে খানিকটা। কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলে,

—’ওয়েদারের ফায়দা তো তুললেনই। ঘুম দরকার না?’
—‘আমার দরকার নেই। আমার যেহেতু দরকার নেই,তোরও ঘুম হচ্ছে না আজকে।’
তিতিরকে অতি সাবধানে বিছানায় বসিয়ে ঈশান হাত বাড়িয়ে তোয়ালে টা নিলো। কোমড়ে পেঁচিয়ে নিলো সেটা। নিজের কালো শার্ট টা তিতিরের গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললো,
—’ আই থিংক আজকে বৃষ্টিতে ভেজাটা রোমান্টিক লাগবে। ভিজতে চাস?’
—’এই না না। এতো রাতে এমন জায়গার…দরকার নেই।’
ঈশান কিছু শুনলে তবে তো! তিতির কে আলগোছে তুলে নিলো পাজাকোলে। তাঁবুর চেইন খুলে এসে দাড়ালো বাইরে। বেশ বৃষ্টি এখনো। মুষুলধারেই বলা যেতে পারে হয়তো। তিতিরকে নিজের পায়ের ওপর দাড় করিয়ে অন্য হাতো তাঁবুর পর্দাটা তুলে দিলো ওপরের দিকে। ভিতরের সাদা আলো টা জ্বালতেই বাইরে টা আলোকিত হলো বেশ। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। শরীর শিরশির করে উঠলো। কাটা দিলো গোটা শরীরে। তিতির বিড়ালছানার মতো মিয়িয়ে গেলো ঈশানের বলিষ্ঠ গায়ের ভিতর। অথচ মানুষটা সম্পূর্ণ উদাম গায়ে। শীত লাগছে না! তাঁবুর ছাওনি থেকে বাইরে এগিয়ে যেতেই হুড়মুড়িয়ে ভিজে গেলো দু’জনের সর্বাঙ্গ। তিতির আঁতকে ওঠা কন্ঠে বললো,

—’খুব ঠান্ডা তো।’
—’গরম করে দেই শরীর।’
—’ভিতরে চলুন। জ্বর এসে পরবে এখন ভিজলে। দেখছেন না বাতাস কি রকম। শীত করছে।’
—’আই নিড সাম অ্যাডভেন্চার। কো অপারেট মি।’
তিতির কি সাহায্য করবে সেটা জিজ্ঞেস করা হলো না। কারণ ঈশান নদীর তীরের এই বালুচরে দাঁড়িয়ে রইলো না। দ্রুত পায়ে নেমে গেলো স্বচ্ছ পানিতে। ঈশান কোমড় অবধি পানিতে নামতেই তিতিরের পায়ের পাতা স্পর্শ করলো নদীর জল। বৃষ্টির পানি নদীর জলে পরে নৃত্য তুলছে যেনো। নিকষ অন্ধকার চারিদিকে। সামান্য দূরের কিছুও চোখে পরে না। নেহাৎ তাঁবুর ভিতরের আলো বাইরে আসছে বলে একে অপরকে দেখতে পারছে মোটামুটি। তিতিরের মুখ রক্তশূণ্য হয়ে এলো যেনো। অজানা কারণে পানিতে ভয় তার। সাঁতার শেখা হয়ে ওঠেনি। সুতরাং এই দূর্যোগের রাত্রিরে কোন বুদ্ধিতে নদীর জলে গা ভাসায় কেউ, জানা নেই তার। তিতির আতঙ্কিত হলো। কাঁপা গলায় বললো,

—’আরেহ্ সাতার জানিনা আমি। ডোবাবেন নাকি?’
ঈশান এরইমধ্যে এগিয়েছে আরও খানিকটা গভীরে। তিতিরের মোমের মতো পা হাঁটু অবধি বিলীন হয়েছে অতলে। ঈশান এক হাত আলগা করে তিতিরের গ্রীবা স্পর্শ করলো। পরিষ্কার কন্ঠে বললো,
—’হোল্ড মি ব্যাক, বেইব। ডোন্ট প্যানিক। আমি আছি তো নাকি? যা ডোবার, ডুবেছি খানিক আগেই। আর ডোবার ভয় কিসের? আজকের পর থেকে যতবার ডুববি, সেটা শুধু আমার আদরে। গট ইট? এখন আমি যা চাই দে সেটা। ‘
পানি অত্যন্ত শীতল। তার ওপর বরফের কণার মতো পরছে বারিকণা। কাটার মতো এসে বিঁধছে যেনো! সে দু হাতে শক্ত করে ধরে আছে ঈশানের গ্রীবাদেশ। তার পা যদিও এখনো মাটি স্পর্শ করেনি। ভাসছে বলা যায়। আমতা আমতা কন্ঠে বললো,
—’কি চাই এখানে এসে?’
—’তোকে।’
—’পাগলামি করবেন না। কেমন অন্ধকার চারিদিকে। ভয়ে হাত পা কাঁপছে আমার। ছাড়বেন না কিন্তু আমার কোমড়।’
বৃষ্টির তীব্রতায় তাকিয়ে থাকা কষ্টকর। এলেমেলো চুলগুলো বারবার কপাল থেকে সরাতে হচ্ছে। দূরের আলোয়, মেয়েটার ভেজা ঠোঁটজোড়া জ্বলজ্বল করছে। তিতিরের কোমড় চেপে শূন্যে উঁচিয়ে ধরলো ঈশান। ঝুঁকে এলো তিতিরের মাথা। আশেপাশে তাকাতেও ভয় লাগছে। ঈশান গম্ভীর গলায় আদেশ ছুড়লো,

—‘ কিস মি, রাইট নাউ।’
ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকালো মেয়েটা। গা ছমছম করছে। দাঁতে দাঁত লেগে কটকট শব্দ হবে,এমন ঠান্ডা লাগছে। দ্রুত বললো,
—’ সব দেবো, আগে উঠুন এখান থেকে। ‘
ঈশান যেনো মুখিয়েই আছে মেয়েটাকে কাবু করতে। তিতিরের কথার পিঠে ঝটপট বললো,
—’আমাকে দেওয়ার মতো আর কি বাদ আছে তোর? ওয়ানা ট্রাই নিউ পজিশন? হু? এটার কথা বললি কি?’
খানিক আগে তাঁবুর ভিতরে ঘটে যাওয়া তান্ডবের কথা চোখে ভেসে উঠলো যেনো মেয়েটার। আবার কাছে আসলে আজ মরে যাবে সে। শরীরটা ব্যাথায় টনটন করছে। পা দুখানা অবশ এখনো অবধি। দু হাতের অবস্থাও নাজুক। কোমড়ের নিচ থেকে তো যন্ত্রনায় কান্না পাচ্ছে তার। খানিকটা ব্যাকুল গলাতেঔ বললো,
—’আজ রুহ বের করে ফেলবেন আপনি আমার। সব ট্রাই করবো। এখান থেকে তীরে উঠুন আগে।’
—’ এখানে ট্রাই করতে সমস্যা কি? মাথার ওপর খোলা আকাশ। সে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। কোমড় অবধি নদীর পানিতে ডুবে আমরা বাসর করছি। ক্যান ইউ ইমাজিন? করিসনি তো ইমাজিন? করতে হবে না। বাস্তবে দেখাই চল। লেটস মেক লাভ। ‘
তিতির হতভম্ব নয়নে তাকিয়ে রয়। গায়ে ঈশানের শার্ট। সেটার আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে তার তনু দেহ। ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,

—’এখানে না। প্লিজ। আমার প্রচন্ড ভয় পানিতে।’
—’আরও অনেক কিছুতেই তো ভয় ছিলো। সেগুলো যখন আজ কেটেছে, এ আর এমন কি?’এগেইন হোল্ড ইও্যর ব্রেথ। শেষবার প্লিইজ।’
ঈশান পানির আরেকটু গভীরে গিয়ে তিতিরকে নিচে নামাতে যাওয়ার আগেই তিতির নিজের নগ্ন পা দু পায়ে পেঁচিয়ে ধরলো ঈশানের নগ্ন কোমড়। ঈশানের মোহিত দৃষ্টি অপলক তিতিরে নিবদ্ধ। তিতির আতঙ্কিত কন্ঠে কাঁপতে কাঁপতে বললো,

—’এই বৃষ্টিতে এভাবে বাইরে? আবার? বৃষ্টির মধ্যে পানিতে, তাও আবার এমন অন্ধকারের মধ্যে। আমার ভয় করছে। তারাতাড়ি ফিরে চলুন। এ-এখানে না। ওখানে গিয়ে যা করার করবেন। বাঁধা দেবো না। সত্যিই।’
কথাগুলো বলার মাঝেই অনূভব করলো কিছু একটা। আতঙ্কিত কন্ঠে কিছু বলতে গিয়েও গলায় আঁটকে এলো কথা। ঈশানের কোমড়ে পেঁচিয়ে থাকা তোয়ালেটা অসভ্য পুরুষ এরইমধ্যে ছুড়ে দিয়েছে তীরে। এতো এতো পানির স্পর্শে থেকেও নিজেকে রীতিমতো তৃষ্ণার্ত অনূভব করলো ঈশান। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। তিতির ভীষন বিপজ্জনক পজিশনে পেঁচিয়ে আছে তার কোমড়। তিতিরের হৃদস্পন্দন ছোটাছুটি করা শুুরু করে দিয়েছে। বলাবাহুল্য শীত লাগছে না তার। কেমন কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে গোটাটা শরীর। ঈশানের হাত এখন ছুঁয়ে আছে তার কোমড়ের নিম্নাংশ। কেমন ঘোর ঘোর লাগলো তিতিরেরও। কোনো প্রতিবাদ উচ্চারন হলো না। ঈশান হেঁচকা টানে তিতিরকে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। দু’হাতে তিতিরের কোমড়ের বাঁকানো খাঁজে হাত চেপে আরও গভীর করলো স্পর্শ। ভয়ংকর আবেশে পিছনে মাথা এলিয়ে গেলো তিতিরের। ঈশান অন্য হাতে তিতিরের ভেজা কেশরাশি হাতে পেচিয়ে বক্ষ বিভাজনের মাঝে নিগুঢ় চুমু এঁকে, বৃষ্টি ছাপিয়ে মাতাল করা কন্ঠে গেয়ে উঠলো,

—’ খেলাটা আকাশের, খেলাটা মেঘেদের
কিছুটা বৃষ্টির মতই…
ভিজে যেতে যেতে যেতে ভালোবাসে যারা!
অজুহাত খুঁজে মন সারাদিন,
কত আর বোঝাবো নিজেকে?
চলো বসা যাক, ভালোবাসা যাক।
যেন আর কিচ্ছু পারি না…
চলো ভাসা যাক, ভালোবাসা যাক
যেন আর কাউকে চিনি না…’
এমন পরিবেশে বৃষ্টি মাথায় ঈশানের মাতাল কন্ঠে থমকে রইলো তিতির। শ্বাস নিতে ভুলে গেলো যেনো। হৃদপিণ্ড খাঁচা ছেড়ে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে। তিতির আশকারা দিলো। না চাইতেও দিলো।
মেয়েটার শার্টের ওপরের অংশ আধখোলা । বিপজ্জনক অংশটা চোখে লাগছে বেশ করে। তিতিরের কোমড়ে দু হাত চেপে হিসহিসিয়ে বললো,

—-‘ আমার আদরের গভীরে দেখলি, নীল জলের অতল কেমন হয় দেখেছিস কখনো? ‘
ঈশান সময় নষ্ট করলো না। তিতিরকে কিচ্ছু বুঝে ওঠার সময়ও দিলো না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঝড়ের বেগে ডুব দিলো নদীর জলে। বন্ধ চোখজোড়া বড় বড় হয়ে খুলে গেলো তিতিরের। তবে আশেপাশে দেখার সাহস করলো না। ঈশানের চোখে চোখ মেলালো।
পানির ওপরে উঠতেই শ্বাসকষ্টের রুগীর মতো হা করে শ্বাস টানলো তিতির। হতভম্ব হয়ে গিয়েছে সে। ঈশান বাঁকা হাসলো মেয়েটার মুখাবয়ব দেখে। ভ্রু তুলে বললো,
—‘এখন আমার অতলে ডুববি আবার।’
কেমন এলোমেলো পা ফেলে তীরের কাছাকাছি চলে এলো। পায়ের গোড়ালি থেকে খানিক উঁচু অবধি পানি। বালুর ওপর পানির আস্তরণ। নিচের ঝলমলে বালুকনা, তার ওপরের সাদা পাথরগুলো চিকচিক করছে। বড়সড় একটা পাথরের ওপর আধোশোয়া করে বসালো তিতিরকে। ঝুকে এলো মেয়েটার ওপর।
—’ভয় পাওয়ার জন্য আশেপাশে তাকাতে হয়। তোর দৃষ্টি হয় আমাতে থাকবে নয়তো বন্ধ। এর বাইরে কোত্থাও যেতে পারে না।’

তাকাতে পারছে না তিতির। লজ্জায় যতটুকু, তার থেকেও বেশি বৃষ্টির কারণে। পাথরের ওপর মাথা ঠেকেছে তার। সর্বাঙ্গে আঘাত হানছে জলরাশি।
ঈশান হাত বাড়িয়ে তিতিরের পা খানা তুলে চুমু খেলো আঙুলের ডগায়। স্পর্শ ধীরে ধীরে অগ্রসর হলো ওপরের দিকে। আঁকড়ে ধরার কিছু না পেয়ে সাপের মতো মুচড়ে উঠলো মেয়েটা। ঈশানের উন্মাদনায় বরাবরের মতো এলোমেলো হয়ে যায় মেয়েটা।
নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। ঈশান উঠে এসে ঠোট ছোয়ায় তিতিরের ওষ্ঠপুটে। গভীর আশ্লেষী ভঙ্গিতে টেনে নেয় নিজের মধ্যে। পাগল হয়ে যাবে আজ তিতির। শরীর জানান দিচ্ছে ক্লান্ত সে, পুনরায় ঘন্টাভর ঈশানকে সহ্য করার মতো শক্তি তার দূর্বল দেহের নেই। অথচ সেই একই শরীর অবাধ্যতাও করছে। ঝংকার তুলে ফেলেছ। ঈশান কন্ঠদেশে নাক ঘষতেই মৃদু শিৎকার বের হয়ে এলো তিতিরের গলা চিড়ে। কোমড় ছেড়ে পুরুষালি হাতটা উঠে এসেছে নারী দেহের সেই কোমল,আকর্ষণীয় নিষিদ্ধ স্থানে। শার্ট গলিয়ে হাত চলে গিয়েছে ভিতরে। ক্রমাগত ভিজতে থাকা শরীর বোধহয় এবার তপ্ততায় ঘামতে শুরু করবে। তিতিরের গায়ে নিজের শার্টটা অসহ্য লাগলো এই মূহুর্তে ঈশানের। মুখ তুলে বললো,

—’খুলে ফেলি হ্যা? পাঁচ মিনিট পর এই বৃষ্টিতেও গরম লেগে যাবে তোর। প্রমিজ।’
মেয়েটার ঘোলা দৃষ্টি নজরে এলো না ঈশানের। তবে খানিক পরেই পাথরের ওপর থেকে প্রায় সোজা হয়ে বসলো তিতির। তলপেটে চাপ পরতেই নীল হয়ে এলো মুখটা। তবে মন, শরীর অন্য কিছু চাইছে। আরেকটু ব্যাথা স্বইচ্ছায় পেতো ইচ্ছে করছে। তিতিরের হাতটা এরইমধ্যে ছুঁয়েছে তার ওপর ঝুঁকে থাকার ঈশানের তেলতেলে পেশল বুকটা। বাঁ পাশে হাত ছোঁয়াতেই খেয়াল হলো সেখানকার দ্রিম দ্রিম শব্দ। কেমন মোহনীয় হাসি হাসলো তিতির। বাঁকা স্বরে বললো,

—’কনট্রোল নেই ক্যানো নিজের ওপর? কাছে এলেই এমন শব্দ করতে হবে? থামতে বলুন আপনার হৃদপিন্ড টাকে। আমারও অসুবিধা হচ্ছে ওর ধুকপুকে।’
ঈশান এ যাত্রায় স্পষ্ট দেখলো তিতিরের চোখের মাদকতা। বেবিহেয়ার গুলো চোখমুখ ছেয়ে আছে। আসমান থেকে ধেয়ে আসা বাড়িকনা অনবরত গড়িয়ে পরছে মেয়েটার গোটা শরীরে। লোমকূপ খাড়া হয়ে গেলো ছেলেটার। সে নিজে এগোলে যতটুকু প্রশান্তি কাজ করে। খেয়াল করে দেখেছে, তিতির নিজ থেকে কিছু করলে, বা চাইলে সেই প্রশান্তির মাত্রা আকাশ ছুঁয়ে দেয় যেনো।
তিতির কাছে টানলো ঈশানকে। হাত গলিয়ে দিলো ছেলেটার গ্রীবাদেশে। মাথা উচিয়ে ঠোঁট ছোয়ালো ছেলেটার কন্ঠদেশের অ্যাডামস্ অ্যাপেলটার ওপর। আলতো চুমু দিয়ে ঠোঁট সরালো না মেয়েটা। বরং ঈশানকে অবাক করে নিয়ে শুষে নিতে থাকলো সেখানটা। চোখবুঝে এলো ঈশানের। আবেশে,উন্মাদনায় জর্জরিত সে। মুখ দিয়ে বের হয়ে এলো কিছু শব্দ। তিতির মুখ তুলে কামড়ও বসালো সেথায়। ঈশান এক ঝটকায় শক্ত পাথর থেকে নামিয়ে শুয়িয়ে দিলো ভেজা বালুচরে। হিসহিসিয়ে বললো,
—’চাইছিস তো আমাকে? স্ব ইচ্ছেতে? অ্যাম টোটালি অন। এখানে ঠিক আছে? নাকি বেডে যাবি? ‘
—’এখানে…’
—‘সিও্যর?’
—‘হু।’

অমোঘ চোখে তাকিয়ে রইলো ঈশান। সহধর্মিণীর ভেজা চোখ, ঠোঁট, দেহতে চোখ বুলালো সে। বৃষ্টির গতি সামান্য কমেছে কি? বোঝা যাচ্ছে না। ঝমঝম শব্দ করে পরছে। নিজেদের কন্ঠস্বর উঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। না হলে কর্ণগোচর হচ্ছে না কথাগুলো। ঈশান বাকা হেসে ভ্রু উচিয়ে পুনরায় হাস্কিস্বরে বললো,
—’ডু ইউ লাইক ইট দ্যাট মাচ? হা? না হলে ভয় পাচ্ছিস না এখন? আই থিং দ্যাট রাইড ওয়াজ সো পারফেক্ট…
তিতির ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। এতো আলাপচারিতা অসহ্য লাগছে বোধহয়। কামুক কন্ঠে বললো,
—’আই লাভড দ্যাট রাইড অ্যান্ড নাউ আই ওয়ান্ট দ্যাট রাইড ওয়ান মোর।’
ঈশানের শান্ত মুখ কেমন অশান্ত হয়ে গেলো নিমেষেই। আজকের তিতির তার কাছেও বড্ড অচেনা। যে মেয়েকে কাছে টানলে মিয়িয়ে যেতো, কে জানতো সে মেয়ে তাকে কাছে পেতে এতোট মরিয়া! আজ ঈশানের স্বর্গসুখের দিন বোধহয়। কোনো স্ত্রী যদি নিজ ইচ্ছেয় সাড়া দেয়, কাছে টানে স্বামীকে, সন্তুষ্ট হয় স্বামীর আদরে। আর কি চাই একটা পুরুষ মানুষের। ঈশান চোখেমুখে বিষ্ময়ের ছাপ নিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’ইউ ওয়ান্ট দিস রাইড এগেইন? হাহ্? আর ইউ সিও্যর? ‘
মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা ঝাকালো তিতির। দু হাত বাড়িয়ে ঈশানকে কাছে আসতে ইশারা করতেই দুরত্ব ঘোচালো ঈশান। মেয়েটার উরুতে হাত রেখে হিসহিসিয়ে বললো,
—’দ্যান অ্যাম মেইক ইউ ফ্লাই। বি প্রিপেয়ারড।’

গত রাতে প্রকৃতির তান্ডব যখন থামলো তখন প্রায় শেষ রাত। সময় দেখা হয়নি। সম্ভবত সাড়ে তিনটে বাজে। সকাল হতে শুরু করবে আরও খানিকটা পর থেকেই। বৃষ্টি থামাতে কানে এসে বাজছে ওদিকের জঙ্গলে হাকডাক করতে থাকা নানা ধরনের প্রাণিদের। এই মূহুর্তে সবথেকে বেশি যেটা কানে বাজছে সেটা কুনোব্যাঙের ডাক। ঘা ঘু শব্দ করতে করতে মাথা ধরিয়ে ফেলেছে।
তিতিরের জ্ঞানহারা নিস্তব্ধ, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া শরীরটা নদীর শীতল পানিতে ধুয়ে মুছে তাঁবুতে নিয়ে এলো ঈশান। বিছানার অবস্থা বেহাল। সফেদ চাদরে ছোপ ছোপ রক্তিম দাগ। বুকের বা পাশটা শব্দ করে উঠলো ঈশানের। বুঝতে বাকি রইলো না কিসের চিহ্ন ওগুলে। কোলের মধ্যে থাকা নিস্তেজ রমনীকে আরও খানিকটা চেপে ধরলো নিজের বুকের সাথে। ঈশান টের পেলো চোখ জ্বালা করছে তার। এক হাতে বিছানার চাদর সরিয়ে পাশে রেখে তিতিরকে শুয়িয়ে দিলো সেথায়। ঝটপট নিজের কোমড়ে জড়িয়ে নিলো একটা ট্রাউজার। তিতিরের নগ্ন শরীরে তার একটা শার্ট জড়িয়ে টেনে নিলো চাদরের নিচে৷ মেয়েটার শরীর কেমন জমে গিয়েছে। আলতো চুমু আঁকলো কপালে। ফিসফিস করে বললো,

—’ একটা নারীর সবথেকে দামী জিনিস তুই আমাতে সমর্পণ করেছিস ,তিতির। তুই আমার পবিত্র সদ্যফোটা পুষ্প। তোর গভীর অবধি প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিস আমাকে তুই। আমিই প্রথম পুরুষ তোর। আমি কৃতজ্ঞ। আমি কৃতজ্ঞ তোর প্রতি। আমার হক, আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিস তুই। হেফাজতে রেখেছিলি নিজেকে। তোর পুরোটা আমার। আজকের পর থেকে পুরোটা আমার। মনের দখল দিয়েছিলি, আজ দেহের! খোদা ছাড়া আর আমাদের আলাদা করার সামর্থ্য কার! কারোর না। আমার অমানিশার জীবনে তোকে স্বাগতম। তবে আগলে রাখবো আমি তোকে। কোনো অন্ধকার এ জীবনে তোকে স্পর্শ করতে পারবে না। আমি দেবো না। কথা দেওয়া রইলো।’

ভোরের আলো ফুটছে সম্ভবত। ধরনী এখন শান্ত। তিতিরের জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগেই। চোখমুখ কুঁচকে শুয়ে আছে। তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। জ্ঞান ফেরা মাত্র ঈশান উঠে গিয়ে খাবার খায়িয়েছে মেয়েটাকে। গতরাতে খাওয়া দাওয়া হয়নি দু’জনের কারোর। তার ওপর সারারাতের ধকলে শেষ অবধি জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা৷ দূর্বল শরীরে এতো চাপ একদিনে না নিতে পারাটাই স্বাভাবিক। তবে তিতিরের বুঝি আত্মসম্মানে লেগেছে বিষয়টা। ওমন মূহুর্তে জ্ঞান হারিয়ে নিজেকে দুর্বল প্রমান করে, দারুন ভাবে লজ্জিত সে। তাকাতেই পারছে না ঈশানের দিকে। ঈশানও ডাকেনি আর। অপরাধবোধ তার মধ্যেও হচ্ছে বেশ করে। উদাম শরীরের নাভির বেশ নিচ অবধি ট্রাউজার টা অবহেলা লেপটে আছে। মাসলওয়ালা শরীরটা দেখতে চাচ্ছে না তিতির। বেহায়া মন ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। অথচ উচিত ছিলো গত রাতের ঈশানের করা উন্মাদনায় যে পরিমাণ ক্ষত গোটা শরীর জুড়ে। সেই ব্যাথায় ওই মানুষটা থেকে কমপক্ষে মাসখানেক দূরে থাকা। কিন্তু তা হচ্ছে না। এতো নির্লজ্জ, নিয়ন্ত্রণহীন সে আবার কবে থেকে হয়ে গেলো! অথচ তার তীব্র অহংকার ছিলো নিজের আত্মসংযমের জন্য।
ঈশান এরইমধ্যে পেইন কিলার খায়িয়ে দিয়েছে তিতিরকে। গম্ভীর গলায় বললো,

—’ বাকি ওষুধ বাড়ি গিয়ে দিচ্ছি। ওটা এখানে আনা হয়নি। এটায় পেইন কমে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।’
বাকিওষুধ বলতে ঈশান কি বোঝালো সেটা ধরতে পারলো না তিতির। চট করে প্রশ্নও করে বসলো,
—’আর কিসের ওষুধ? ‘
থমকে তাকিয়ে রইলো ঈশান। খুক খুক করে কেশে নরম কন্ঠে বললো,
—’বার্থ কনট্রোল পিল।’
মুখটা রাঙিয়ে এলো মেয়েটার। দৃষ্টি ঝুকিয়ে ফেললো। পায়ের ওপরে চাদর টা আরও খানিকটা ওপরের দিকে তুলে নিলো। ঈশান হালকা ভাবে বললো,
—’ আই ডিডেন্ট ইউজ অ্যানি কাইন্ড অফ প্রটেকশন লাস্ট নাইট। সো ইউ নিড দ্যাট।’
ঝংকার খেলে গেলো তিতিরের গোটা শরীরে। পরের টুকু না বললেও তো চলতো নাকি! সে হুট করে ওষুধের কথাটা তোলায় না হয় খেয়াল করে উঠতে পারেনি। তাই বলে এত ব্যাখ্যা দেওয়ার কি আছে! যা ব্যবাস্থা নেওয়ার সে নিজেই তো নিতো। বিষয়টা খেয়াল আছে তার। তিতির জবাব দেয়না। তাবুর ভিতরের আলো নেভানো দিনের আলোয় আলোকিত লাগছে বেশখানিকটা। ঈশান বাইরের দিকে তাকিয়ে কি যেনো ভাবলো। তিতিরের দিকে ফিরে প্রশ্ন ছুড়লো,

—’সানরাইজ দেখবি?’
মাথা নাড়লো তিতির। ঈশানকে কিছু বলতে হলো না। ছেলেটা আলগোছে তিতিরকে তুলে নিলো কোলে। তিতিরের মাথা চক্কর কেটে উঠলো। অস্বাভাবিক দূর্বল লাগছে শরীর। আর মনে হচ্ছে গোটা শরীরটা টানা কয়েকদিন হলো এক ভাবে বেঁধে রাখা। মাথা টা আলতো করে হেলিয়ে দিলো ঈশানের উদাম বুকে। গলা পেঁচিয়ে ধরার প্রয়োজন বোধ করলো না। দরকার নেই সেটার।
ওদিকটায় ভারত- বাংলাদেশ বর্ডার। এপাশে বাংলাদেশ, ওপাশে ভারতের মেঘালয়। মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে সব পাহাড়গুলো। সবুজে ঘেরা সবকিছু। সারারাতের তান্ডবের রেশ মাত্র নেই এখন আর। সবকিছু ঝকঝকে,পরিষ্কার। সতেজ হয়ে আছে গাছপালা। ধুলোময়লা ধুয়েমুছে সাফ একদম। বুক ভরে শ্বাস টানলো ঈশান। গত রাতে ঘুমায় নি এক সেকেন্ডের জন্য। শরীরের এনার্জি লস হয়েছে গোটা রাত ভর। অথচ বিন্দুমাত্র ক্লান্ত লাগছে না তার। কোলের মধ্যে একটা নরম শরীরের অস্তিত্ব। সেও চোখবুজে শ্বাস টানছে। পরিষ্কার বাতাস, মস্তিষ্ক অবধি চলেমযায়। কি যে শান্তি! দূর থেকে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে গড়িয়ে আসছে স্বচ্ছ পানি। গতকাল রাতের অন্ধকারে ওই ঝড়না টা চোখে পরেনি ওদের। বৃষ্টির শব্দে ঝড়নার পানির আওয়াজও কানে আসেনি। এখন দেখলো। মুগ্ধ করা সৌন্দর্য। হা হয়ে গিয়েছে তিতির।

শরীরে জ্বর এসে হানা দিয়েছে। শীত লাগছে বেশ। ঈশান আরও একটু গভীরে জড়িয়ে নিলো। ঈশানের উদাম শরীরের তপ্ততায় ওম খুঁজে পেলো যেনো মেয়েটা। গুটিশুটি মেরে আছে সেখানটায়। পাহাড়ের পিছন থেকে সবে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। তিতির চাতকপাখির মতো তাকিয়ে সেদিকে। ঈশান মৃদু হাসলো মেয়েটার মুখের উচ্ছ্বাস দেখে। ওকে বুকে জড়িয়েই সটানে শুয়ে পরলো শুকনো বালুর ওপর। তিতির পরে রইলো ওর বুকের ওপর। মেয়েটার চুলগুলো এলোমেলো খোঁপা করে রাখা। ঈশানই করেছে। সেটা অবশ্য খুলে যাবে যাবে ভাব। শরীরে ঈশানেরই একটা শার্ট জড়ানো। ঈশান মেয়েরা টার মাথা হাত বুলিয়ে বললো,
—’ এখন একটু ভালো লাগছে কি? ‘
তিতির অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,

—’লাগছে।’
দু’জনেই দৃষ্টি এখন পূবের আকাশে। লাল আভা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। পরিষ্কার আকাশের কোলে মাথা বের করে দিয়েছে লাল সূর্য। দু দুটো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে দেখা যাচ্ছে সেটাকে। ভীষন সুন্দর মূহুর্ত।
ঈশান সহজে কোনো কিছুতে মুগ্ধ হয়না। তবে আজ হচ্ছে। নাহ, ওই উদীয়মান সূর্যমামাকে দেখে নয়। সূর্যের হলুদ আভা ঠিকরে পরেছে তিতিরের ফর্শা মুখের ওপর। মেয়েটা মুগ্ধ দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে আছে ওদিকটায়। চোখের রাজ্যের সন্তুষ্টি। ঈশানের দৃষ্টি তো এই নারীর ওপরে নিবদ্ধ। দুনিয়ার আর কোনো কিছু তাকে এতো সহজে, এতো গভীর ভাবে মুগ্ধ করতে পারেনি আর না তো কখনো পারবে। ঈশান মৃদু্স্বরে ডেকে উঠলো,
—’তিতির?’
—’হুম।’
—’আমাদের জীবনে এরকম মূহুর্তে বোধহয় আজকেই প্রথম। তোর সাথে এই প্রথম সূর্যোদয় দেখলাম বোধহয়। তাই-না? ‘
তিতির শান্ত বাচ্চার মতো ঈশানের বলিষ্ঠ, উদাম শরীরের ওপর শুয়ে আছে। ঈশানের শক্তপোক্ত হাতটা তার কোমড় চেপে রাখা। মিহি গলায় জবাব দিলো,

—’প্রথম। প্রথম সূর্যোদয় দেখা আমাদের। ‘
—’ আমার জীবনের শেষ সূর্যোদয় টাও তোর সাথে কাটানোর ভাগ্য হোক। প্রতিটা দিন, প্রতিটা মূহুর্ত তোর সাথে কাটিয়ে যেতে চাই। আমৃত্যু… এ পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য্য তোর ভিতরে খুঁজে পাই আমি। তুই আজীবন থেকে যাস। ‘
—’ আমিও চাই। বাকিটা জীবনের প্রতিটা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। আমি আপনার বাহুডোরে ঠিক এভাবে থেকে যেতে চাই। আমি ওপরে ওপরে যতটা শক্ত, ভিতরে ঠিক ততটাই ভাঙাচোরা। আপনি সেই একমাত্র মানুষ যার কাছে আমি আমার ভাঙাচোরা রুপটা অনায়াসে তুলে ধরতে পারি। এই বুকে মুখ লুকিয়ে যতটা প্রশান্তি, নিরাপদবোধ হয়। এ অনূভুতি আমি কখনো বোঝাতে পারবনা…’
ঈশান শব্দ করে চুমু আঁকলো তিতিরের তপ্ত ললাটে। শান্ত সুরে বললো,

—’উহু, সূর্যাস্ত নয়।’
—’কেনো?’
—’ সূর্যাস্ত মানে দিনের সব সৌন্দর্য রাতের আধারে হারিয়ে যাওয়া। আঁধারে কঠিন ভাবে বিদ্বেষ আমার। তুই জীবনে আসার পর থেকে তাই সূর্যাস্তে আমার ভীষন ভয় আজকাল। ‘
তিতির টু শব্দ অবধি করলো আর । ঈশান টের পায় অন্যকিছু। তার উদাম বুকে শীতল, সিক্ত স্পর্শ। তিতির কাঁদছে! মেয়েটা কাঁদছে কেনো! ঈশান গম্ভীর গলায় শুধালো,
—’কাঁদছিস কেনো?’
—’ভালোবাসার ভরসায়। আপনাকে পাওয়ার প্রাপ্তিতে।’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৯

ঈশান অবাক হয়, সাথে থমকায়ও। তিতিরকে ভালোবাসি বলা হয়নি এখনো। তবুও মেয়েটা হিসেব কষে ফেলেছে। তার ভালোবাসার অতল স্পর্শ করে ফেলেছে খানিকটা। মেয়েটাকে ভালোবাসি বলা উচিত কি? একটা সময় ছিলো যখন ভালোবাসা শব্দটার কূল কিনারা ধরা দিতো না তার মস্তিষ্কে। আজকাল দেয়। তার কাছে ‘ভালোবাসার আরেক নাম ‘তিতির।’ এই মায়া থেকে তাকে বের করার সাধ্যি কার!

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here