রাজনীতির রংমহল ৩ শেষ পর্ব
সিমরান মিমি
আর্শি থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শামসুল সরদারের রুম থেকে বের হলো। ভীষণ লজ্জাও লাগছে। মাত্র’ই সে দুঃসাহসিক একটা কাজ করে ফেলেছে। বাবার কাছে গিয়ে বলেছে ফেলেছে সে পাভেলকে বিয়ে করতে রাজী। বাবা যেনো এ ব্যাপারে খুশিমনে রাজি হয়। অবশ্য করবে নাইবা কেনো? এ কদিনে পাভেলের যন্ত্রণায় আর অমত করার উপায় আছে। এটা সেটা বলে, বারবার কল করে মান ভাঙিয়েই ফেললো অবশেষে ।
শামসুল এই মুহুর্তে হতাশ হয়ে চেয়ারে বসে আছে। চোখের পাতা বন্ধ। তবে এটাই কি ছিলো তার ভাগ্যে? শেষ পর্যন্ত চিরশত্রুর ঘরেই আদরের মেয়ে দুটোকে বিয়ে দিতে হবে? সেখানেই রাখতে হৃদয়ের টুকরো গুলো! এতোটা দুঃসাহসিক কাজ কি সে করতে পারবে? পারলেও ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে পারবে? সর্বক্ষণ মস্তিষ্কের মধ্যে ঘুনেপোকার ন্যায় কেউ একজন বলবে – এই বুঝি তোর মেয়েকে অত্যাচার করছে, কথা শোনাচ্ছে, বাপের বাড়ি নিয়ে খোটা দিচ্ছে। উফফ! শামসুল এমন ভাগ্য নিয়ে কেনো জন্মালো! যার পরিণতি মেয়েদেরকেই ভোগ করতে হবে?
তার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ঝুলেই রইলো। মেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে তিনি আর টু শব্দটুকুও করবেন না। অসম্মতিও জানাবেন না, আবার সম্মতিও দেবেন না। ভাবনা মতে, তিনি নিশ্চুপ’ই রইলেন। কোনো আয়োজনে থাকবেন না প্রাণ খুলে। যার যা ইচ্ছা করুক।
পাভেল নিজেই পরিবারকে আর্শির সম্মতি থাকার ব্যাপারে বলেছে। সোনালীর সাথে কথা হয়েছে পিয়াশার। তিনি ম্লান মুখে বলেছেন,
মেয়ে যদি রাজি থাকে তবে নিয়ে যান বিয়ে করে। আমরা চাই না পুণরায় জনসম্মুখে অপমানিত হতে। নিজে নিজে বিয়ে করার চেয়ে বাড়ির মধ্যেই নাহয় কবুল টা বললো।
অবশেষে আংটি বদল অর্থাৎ পাকা দেখার দিন ধার্য হলো। আগামীকাল ঠিক বিকেলের দিকে ও বাড়ি থেকে লোক এসে আর্শিকে আংটি পড়িয়ে যাবে। এরপর বিয়ে।
সোভাম এতোসব আয়োজন সহ্য করতে পারছে না। শামসুল বেজায় ভেঙে পড়েছে দেখে আরো বেশি রাগ হচ্ছে। বাবার একই কথা – তার মেয়েদেরকে কৌশলে নিজের কাছে বন্দি করছে শিকদার’রা। ওদের মন নরম দেখে ফাঁসিয়ে নিয়েছে। তিনি কি করে আদরের মেয়েদের দূর্দশা সহ্য করবে। সোভাম সেদিন প্রথম বাবার কষ্ট টা অনুভব করতে পারলো। রক্তের টান বুঝি এমনই হয়। এই যে শামসুলের কষ্ট দেখে সোভামের কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে, তবু মুখে কিছু বলতে পারছে না — এটা এর আগে কখনো হয়নি। সে বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,
– আপনার মেয়েরা তো অবুঝ নয় আব্বু।
শামসুল মানলেন না। শিকদারদের দোষারোপ করে বললেন,
– তুমি বুঝতো পারছো না বাবা। ওদের মন নরম, আবেগ বেশি। আর সেটার সুযোগ নিয়েই ওদেরকে দাবার গুটি বানাচ্ছে আমজাদ শিকদার।
সোভাম ক্রুর হাসলো। বললো,
– চিন্তা কোরো না আব্বু। মন্ত্রী এখনো আমার হাতে।
– মানে?
সোভাম আর খোলাশা করলো না। বললো না গত দুদিন ধরে সে খেলায় অংশগ্রহণ করেছে। রুম ত্যাগ করতে করতে জানালো,
– কাল আংটি বদল তাই না? দারুণ একটা সারপ্রাইজ আছে। অপেক্ষা করো।
আংটি বদলের দিন খুব একটা জমকালো হলো না। ড্রয়িংরুম টা সামান্য গোছগাছ করা হয়েছে। আর্শিকে একটা শাড়ি পড়িয়ে টুকটাক সাজিয়েছে হুমায়রা। এছাড়া অতিথিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা। এইতো এতোটুকুই। ড্রয়িংরুমে সরদার বাড়ির কোনো পুরুষ উপস্থিত নেই। এমনকি সোভামকেও দেখা যায়নি সকাল থেকে।
শিকদার বাড়ির প্রত্যেকে এসেছে আজ। শুধুমাত্র আমজাদ শিকদার এবং প্রেমা ছাড়া। মেয়েটাকে কয়েকবার জোর করলেও আসেনি। অবশ্য পরশ নিজেই তাকে বাড়িতে থাকতে বলেছে। ভেবেছিলো এখানে আনলে সোভামকে দেখে আবারো দূর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু সে বুঝতেইপারলো না বাড়িতেই রাখাটাই কাল হয়ে দাঁড়াবে।
আংটি বদলের অনুষ্ঠান প্রায় সমাপ্ত! এরমধ্যেই ঠোঁটে চওড়া হাসি নিয়ে দুয়ারে দাঁড়ালো সোভাম। পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে প্রেমা। শক্ত করে হাত ধরে আছে সোভামের। দুজনের গলায় কাঁচা ফুলের মালা। ঠিক যেনো কয়েক সপ্তাহ আগের স্পর্শী-পরশের প্রতিচ্ছবি। তাদের কে একসাথে এভাবে দেখে উপস্থিত সকলে স্তব্ধ হয়ে গেলো। এই আশ্চর্যের রেশটুকু আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে সোভাম এগিয়ে গেলো ভেতরে। মিষ্টির প্লেট পরশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
– দুটো খাও। কারন খুশির খবরও দুটো।
স্পর্শী ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আশ্চর্য নিয়ে বললো,
– তোরা বিয়ে করেছিস?
সোভাম মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। একবার প্রেমার দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই বললো,
– হ্যাঁ, তোর ননদ টা বেশ দেখতে। ভাবলাম দ্বিতীয় শুভ কাজ টা আমিই সেরে ফেলি।
পিয়াশা মুর্ছা গেলেন। হয়তো এতোটা মানসিক চাপ সামলাতে পারেন নি। নাজনীন ক্ষিপ্ত পায়ে এগিয়ে এসে প্রেমার গাল চেপে ধরলো। বললো,
– আহাম্মক! তুই এটা কি করেছিস? এই বয়সে বিয়ের শখ জেগেছে তো আমাকে বলিস নি কেনো?
পরশ দুহাতে মাথা চেপে ধরলো। হঠাৎ ভীষণ যন্ত্রণা উঠেছে। এক্সিডেন্টের পর থেকে মাঝেমধ্যেই অসহনীয় যন্ত্রণা ওঠে। স্পর্শী দ্রুত পায়ে এসে তার পাশে বসলো। অস্থির কন্ঠে বললো,
– আপনি ঠিক আছেন? কি হয়েছে, মাথা ধরেছে?
পরশের অসহ্য লাগছে। সে স্পর্শীর হাত সরিয়ে এগিয়ে গেলো প্রেমার দিকে। বললো,
– কেনো করলি এটা?
প্রেমা কেঁপে উঠলো ভয়ে। উত্তর দিতে পারলো না। সোভাম তাকে সরিয়ে পরশের মুখোমুখি দাঁড়ালো। বললো,
– ভালোবেসে করেছে। ও আমায় ভালোবাসে, জিজ্ঞেস করো। প্রেমা, আমায় ভালোবাসো না তুমি?
উপর নিচ মাথা নাড়ালো প্রেমা। এরপর কিছুটা শক্ত হওয়ার ভান ধরে বললো,
– ভাইয়া, তুমিও তো এটাই করেছো। তাহলে আমাকে দোষারোপ করছো কেনো?
পরশ নিতে পারলো না। ইচ্ছ করলো চড়িয়ে দাঁত ফেলে দিতে। কিন্তু পারলো না। এরইমধ্যে বাঁধা হলো সোভাম। ক্রুর হেসে বললো,
– উহুম! একদমই না। আমার বউয়ের গায়ে হাত দিতে গেলে আগে আমায় মোকাবেলা করতে হবে।
– কেনো করলে এমন? শোধ তুলেছো আমার উপর?
সোভাম ফিসফিস করে উত্তর দিলো। বললো,
– হ্যাঁ, করেছি। ঠিক তুমি যেভাবে আমার বোনের মগজ চিবিয়েছো। সেভাবেই প্রেমাকে বশে নিয়েছি। কিন্তু তাতে কি এসে যায় পরশ? প্রেমা আমার বউ।
প্রকৃতিতে বর্ষা এসেছে অল্পদিন। তবে এ বছর বৃষ্টির তেমন প্রকোপ নেই। হুটহাট আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। বড় বড় বিদ্যুতের ঝলকানি, বজ্রপাত, ঘূর্ণি বাতাসের দেখা সচারাচর মিললেও বৃষ্টি তেমন নেই বললেই চলে। বিগত বছর গুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায় এ বছর বর্ষা ঋতু বৃষ্টিকে অগ্রাহ্য করছে। তবে কখনো সখনো এমন বিধ্বস্ত রুপ নিয়ে উপস্থিত হয় যে তাকে স্বাভাবিক বৃষ্টি বলা যায় না। একে বলে ঘূর্ণিঝড়। ভয়ংকর, প্রলোয়ংকারী রুপ তার। গাছ-পালা ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়ে যায়।
আজকেও আকাশে মেঘ জমেছে। চাঁদ, তারা, জোনাকি পোকারা হারিয়ে গেছে কিছুক্ষণ পূর্বেই। সোভাম সরদার মধ্যরাতের কালো মেঘাচ্ছন্ন আকাশটার দিকে চেয়ে বিরক্ত হলো। এই বিরক্তি সহ্য করতে পারলো না মেঘেরা। সেকেন্ডের মধ্যে ভিজিয়ে দিলো তাকে। আকস্মিক বৃষ্টির ছাঁটে অর্ধভেজা কাক হয়ে নেমে গেলো ছাদ থেকে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সাড়ে বারোটা। বাড়িতে কারোর সারাশব্দ নেই। লাইট নিভিয়ে সকলেই শুয়ে পড়েছে। সোভাম এগিয়ে গেলো নিজের রুমে। শার্ট ঝেড়ে পানির ফোঁটা ফেলতে ফেলতে প্রবেশ করলো ভেতরে। এরইমধ্যে তাড়াহুড়ো করে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে দাঁড়ালো প্রেমা। বোকা প্রেমিকা মিষ্টি করে হাঁসলো। বললো,
“ খাওয়ার সময় লিপস্টিক মুছে গেছিলো। তাই আবার পড়ছিলাম।”
সোভাম জোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আজ তাদের বাসর রাত। বাড়ির সকলে নিয়ম মেনেই তাঁজা ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়েছে। সে খাটের দিকে একবার তাকিয়ে বাথরুমে চলে গেলো। ফিরলো পোশাক বদলে। দৃঢ় পায়ে খাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় ছড়িয়ে রাখা ফুলগুলো দুহাতের মুঠোয় নিলো। টেবিলের উপর রেখে আলগোছে শুয়ে পড়লো একপাশে। বললো,
– লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।
প্রেমা চমকালো। এই অদ্ভুত কথা সে আশা করেনি। এতোক্ষণ ধরে সোভামের প্রতিটা পদক্ষেপ লক্ষ্য করে অবশেষে প্রতিক্রিয়া জানালো।
– ঘুমাবো মানে! বাসর রাতে কি কেউ ঘুমায়?
শেষ প্রশ্নটাই যথেষ্ট ছিলো সোভামকে চমকে দিতে। সে তৎক্ষণাৎ শোয়া ছেড়ে উঠলো। হতভম্ব হয়ে প্রেমার মুখের দিকে তাকালো। মেয়েটা এখনো বধুবেশে দাঁড়িয়ে। দেখতে মিষ্টি লাগলেও সে জোরালো ধমক মারলো।
“এতো কথা তো শুনতে চাচ্ছি না। আর তাছাড়াও, তুমি এমন অভদ্র আচরণ কেনো করছো?”
প্রেমা লজ্জা পেলো। খারাপও লাগলো ভীষণ। চোখের কোণ দুটো ভরে উঠলো অশ্রুতে। মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বললো,
– তবে বাকিদের কথাই কি ঠিক? ভাইয়াকে অপমান করার জন্যই বিয়ে করেছেন আমায়। এসব ভালোলাগা, মায়া, টান সবকিছুই মিথ্যে!
সোভাম দুহাতে মাথা চেপে ধরলো। আজ দিশার কথা মনে পড়ছে ভীষণ। তাকে নিয়ে সাজানো স্বপ্নগুলোর কথা মনে পড়ছে। এক একটা ফুল, প্রেমার সাজসজ্জা পূর্বের স্মৃতি গুলোকে স্পষ্ট করছে। সে নিজেকে শান্ত করলো। ধীর পায়ে হেঁটে প্রেমার নিকট গেলো। ঝোঁকের বশে বিয়ে করলেও এখন আফসোস হচ্ছে। এইটুকু একটা মেয়ে। সদ্য অনুভূতি চিনতে শুরু করেছে। তাকে কি করে ঠকাবে সোভাম। কি করেই বা বিশে পা রাখার পূর্বেই ডিভোর্স লেটার হাতে ধরিয়ে বলবে, – প্রেমা, আমায় ক্ষমা করে দাও। তোমার ভাইয়ের উপর জেদ ধরে এই সম্পর্ক বুনেছি। এখন চলে যাও নিজের স্থানে।
সোভাম তা পারবে না। হঠকারী সিদ্ধান্তের ফল এতোটা তেঁতো কেনো হয়!
“ প্রেমা, আমার কথা শোনো। একদম বাচ্চামি করবে না।
সোভমের নরম স্বরে প্রেমা চেয়ারে বসলো। নাক টেনে প্রশ্ন রাখলো,
– আমি কি বাচ্চামি করেছি?
– করেছো। এই যে না ঘুমিয়ে জেদ ধরে বসে আছো, এটা ভীষণ দৃষ্টিকটু। দেখো, আমরা বিয়ে করেছি বলেই যে অন্য পাঁচটা হাসবেন্ড – ওয়াইফের মতো সংসার করতে হবে এমনটা নয়। তুমি বড্ড ছোটো। মাত্র এইচএসসি শেষ হলো। এখন এডমিশন প্রিপারেশন নিয়ে ভালো কোনো ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। আমি সম্পুর্নভাবে হেল্প করবো তোমায়।
ফের বাধা দিলো প্রেমা। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে বললো,
– আজব! এমন করছেন যেনো আমরা রেজিস্ট্রি পেপারে নয়, আপনাকে টিউটর হিসেবে রাখার এগ্রিমেন্টে সাইন করেছি। এ কদিন তো সারাক্ষণ তোষামোদ করেছেন বিয়ে করার জন্য, তবে আজ প্রথম রাতেই আমার লেখাপড়া নিয়ে পড়েছেন কেনো? আমার ভালো লাগছে না।
সোভামের মেজাজ আবার চটে গেলো। শক্ত কদমে আবার খাটে ফিরে এলো। বললো,
– আমার ভালো লাগছে এসব বলতে। শোনো প্রেমা, বিয়ে আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তে করেছি বেশ ভালো কথা। কিন্তু আগে তোমার গ্রাজুয়েশন কম্পিলিট হবে, দু-বাড়ির সকলে এই সম্পর্কে মানবে, তারপর আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। এর আগে একদমই নয়। ভালো লাগলে থাকো, নাহলে চলে যাও।
সোভাম শুয়ে পড়লো পাশ ফিরে। তার থেকে কয়েকহাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে প্রেমা। ক্ষিপ্ত হয়ে মাথার ওড়না ছুড়ে মারলো ফ্লোরে। রাগে ফোসফাস করতে করতে খুলে ফেললো গয়না। জেদ নিয়ে টান মারলো চুলের খোপা। বেশকিছু চুল ছিড়ে এলো তাতে। তবুও দমলো না। লাইটের কড়া আলোয় সোভামের কপালের চামড়া ভাঁজ হয়ে আছে। তা দেখে সশব্দে সুইচবোর্ড টিপলো। আলো নেভানোর পরেও প্রেমা ঘুমালো না। তার ভীষণ রাগ হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত সে কখনোই মানবে না। লোকটা ধমকাবে? তো ধমকাক। কিন্তু কতদিনই বা মুখ ফিরিয়ে থাকবে। প্রেমা কি কম সুন্দরী! তুড়ি মেরে এই সরদারের সিদ্ধান্তকে মুচড়ে দেবে। বিয়ে করে সন্যাস নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা ঘুচিয়ে দেবে।
সে রাতে দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না। ঘুমিয়ে পড়লো একে অন্যের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে।
পরদিন সকালে সোভামের ঘুম ভেঙে গেলো খুব ভোরে । নিঃশ্বাসের সঙ্গে নাকের ভেতর কিছু একটা ঢুকছে – বের হচ্ছে। একসময় দম বন্ধ হয়ে এলো। মুহুর্তেই চোখ মেলে তাকালো। কিন্তু সামনে সবটা অন্ধকার। হাত দিয়ে সরিয়ে দেখলো কয়েক গোছা চুল। তার মুখের উপর পড়ে ছিলো সারাটা রাত। বুকটাও ভারী হয়ে আছে। একটু খেয়াল করতেই দেখলো প্রেমার মাথাটা তার বুকের উপর। এক পা গায়ের উপর দিয়ে আরেক হাত দিয়ে কোমড় জড়িয়ে ধরেছে। সোভাম স্তব্ধতায় মুড়িয়ে গেলো। কি বলবে, কিভাবে রিয়াক্ট করবে তার দিশা পেলো না। ভাষা হারিয়ে সজোরে টেনে হিচড়ে দূরে সরিয়ে দিলো। প্রেমার ঘুম ভেঙে গেলো তাতে। বোকা বোকা চাহনি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো পুরোটা। এরপর লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো। শাড়ির আঁচল খুলে একাকার। সে দুহাতে পেঁচিয়ে নিলো ওড়নার মতো। আড়ষ্ট হয়ে বললো,
– আমি কোলবালিশ ছাড়া ঘুমাতে পারি না।
সোভাম উঠে পড়লো বিছানা ছেড়ে। বুকের কাছটাতে লিপস্টিকের দাগ স্পষ্ট হয়ে আছে। ইচ্ছে করে চুমু না দিলে এতোটা গাঢ় দাগ লাগে না। সে নিশ্চিত, প্রেমা এসব ইচ্ছে করে করেছে। সোভাম হঠাৎ কিছু ভেবে জমে গেলো বরফের ন্যায়। তার ঘুমানোর সুযোগ নিয়ে প্রেমা কি আর কিছু করেছে? সে তো গেঞ্জি, ট্রাউজার পড়েই শুয়েছিলো। অসভ্য মেয়েটা কোনো ছবি-টবি তুলে নি তো আবার? পাছে ব্লাকমেইল করবে ভেবে করতেও পারে। উফফফ! চিন্তায় মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম সোভামের। সে কি বেহুশ হয়ে ঘুমিয়ে ছিলো কাল। নাহ, এই মেয়েটার সাথে আর বেডশেয়ার করা যাবে না।
সোভাম গেঞ্জি খুলে ফেললো। ট্রাউজার খুলতে যাবে অমনি বাথরুমের দরজা খুলে গেলো। দুহাতে শাড়ি পেঁচিয়ে হুরমুর করে ঢুকলো প্রেমা। তাকে দেখতেই সোভামের চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। সশব্দে চিৎকার করে উঠলো। ধমক দিয়ে বললো,
– বেয়াদব মেয়ে! দেখোনি আমি ভেতরে ছিলাম। কোন সাহসে ভেতরে ঢুকেছো?
প্রেমা ভয়ে, লজ্জায় জড়সড় হয়ে রইলো। ক্ষীণ কন্ঠে জানালো,
– আমি খেয়াল করি নি। বাথরুমের দরজা খোলা ছিলো, তাই ঢুকেছি। আপনিও বা ভেতর থেকে আটকে নেননি কেনো?
ফিরতি অভিযোগ পেয়ে সোভামের মাথা আরো চটে গেলো। সে হাত ধরে টেনে বের করে দিলো প্রেমাকে। ধড়াস শব্দে দরজা বন্ধ করে তাকিয়ে রইলো আয়নার দিকে। তখন আনমনা থাকায় দরজা আটকাতেই ভুলে গেছিলো। ইশশ! একটুর জন্য প্যান্ট’টা খুলে ফেলেনি। নাহলে লজ্জায় এতোক্ষণে ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার উপক্রম হতো।
এভাবে কেটে গেলো চারদিন। এর মধ্যে তাদের সম্পর্কের কোনো পরিবর্তন হলো না। প্রায়সময় বাড়িতে অনুপস্থিত থাকে সোভাম৷ খাওয়া- গোসল এবং ঘুম ছাড়া অন্যসময় বসে থাকে স্টাডিরুমে। তবে বিপত্তি বেঁধেছে অন্য ক্ষেত্রে। ইদানীং প্রেমা ভীষণ জেদ দেখাচ্ছে। তাকে হাজার বার শাড়ি পড়তে বারণ করলেও শোনেনি। তার একই যুক্তি — নতুন বউদের শাড়ি পড়া উচিত। এটা নিয়ে সোভামের আপত্তি থাকতো না, যদিনা সে একটু কেয়ারফুল হতো। মেয়েটা সারারাত এলোমেলো, আঁচলবিহীন হয়ে শুয়ে থাকে তার পাশে। কতক্ষণই বা সামলানো যায়? গুছিয়ে দিতে গেলেও তো হাত কাঁপে।
এইতো আজ ভোরেই ঘটেছে আরেক ভয়ংকর ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে বসতেই সোভামের নজর পড়েছিলো প্রেমার দিকে। গায়ের হলুদ ফিনফিনে শাড়িটা গুছিয়ে হাঁটুর উপর উঠেছিলো। বুকের আঁচল সারা বিছানায় ছড়িয়ে ছিলো। ধবধবে ফর্সা চিকন পা দুটো, জৌলুস পূর্ণ মেদহীন নগ্ন পেট, গলা, কামুক নাভিকূপ দেখে দম বন্ধ হয়ে গেছিলো সোভামের। পাথরের মূর্তির ন্যায় তাকিয়ে ছিলো অনেকক্ষণ। চৌম্বকের মতো আকর্ষণ করেছিলো তাকে। অতি কষ্টে, নিজেকে বরাবরের মতো বুঝিয়ে সেই যে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে, আর ঢোকেনি। এভাবে কতক্ষণ সামলানো যায়? শেষে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেললে এর দায় কে নেবে? বাড়ির সবাই কি বুঝবে, ওইটুকু একটা মেয়ে জেদ নিয়ে তাকে দিনরাত নাচাচ্ছে। বশ করার চেষ্টা করছে।
সোভামের বিয়ের আজ পঞ্চম দিনে পড়লো। অবশ্য এখন রাত। খাবার খেয়ে সকলে ঘুমিয়েও পড়েছে। তবে সে বের হয় স্টাডিরুম থেকে। ইচ্ছে করেই সকলের সামনে প্রেমাকে অগ্রাহ্য করছে। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা। সে চাইলেই গেস্ট রুমে গিয়ে ঘুমাতে পারে। কিন্তু বেহায়া মন তা চায় না। বারংবার অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে রুমে টানছে। এ অবশ্য বাহানা। সোভাম নিজেই নিজের ইচ্ছেকে দমাতে পারছে না। শেষমেশ বেহায়ার মতো লাজলজ্জা হারিয়ে চলে গেলো দোতলায়। মাথা চুলকে নিজের রুমে ঢুকে আঁড়চোখে প্রেমাকে দেখলো। মেয়েটা আধশোয়া হয়ে ফোন স্ক্রল করছে। তার দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত।
সেসবে পাত্তা দিলো না সোভাম। ভেতর থেকে দরজা আটকে শার্ট খুলে ফেললো। ভেতরে ভেতরে চমকে গেলেও তা প্রকাশ করলো না প্রেমা। বললো,
– এমনিতে তো শার্টটাও বাথরুমে গিয়ে চেঞ্জ করেন। আজ সেসব লজ্জা গেলো কোথায়?
সোভাম ক্রুর হেসে জবাব দিলো – তুমি শাড়ি খুলে ঘুমাতে পারো। আর আমি শার্টটাও খুলতে পারি না?
ভড়কে গেলো প্রেমা। অসস্তিতে পড়ে সবটা অস্বীকার করলো। বললো,
– মিথ্যে কথা। আপনার চরিত্র ভালো না, তাই সারারাত না ঘুমিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি ঘুমিয়ে পড়লে সুযোগ খোঁজেন।
– বেশ! আজ তাহলে ঘুমানোর আগেই সুযোগ নেই।
প্রেমা পলক ফেলতে পারলো না। এর পূর্বেই লাইট নিভে গেলো। হাতের ফোন টেনে নিয়ে ছুড়ে ফেললো টেবিলে। এরপর? এরপর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর পুর্বেই তার দম বন্ধ হয়ে এলো। যখন অনেকটা সময় পর জোরে নিঃশ্বাস টানলো, তখন সোভামকে আরেকটু ক্ষেপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
– ছাড়ুন। গ্রাজুয়েশন কম্পিলিট করার পর আমার কাছে আসবেন। এখনো প্রায় পাঁচ বছর।
সোভাম ছাড়লো না। বরং আরো দৃঢ় হয়ে মিশে গেলো স্ত্রীর শরীরের ভাঁজে। ঘোর লাগানো কন্ঠে বললো,
– উমমম! বিরক্ত করবে না একদম।
একটানা পাঁচদিন সময় লাগলো ধাতস্থ হতে। আমজাদ শিকদার এখনো স্তব্ধ। মেয়ের সঙ্গে কথা বলেন না পর্যন্ত। তবুও সময় থেমে থাকে না। স্পর্শী, পরশ, সোভাম, প্রেমার জন্য বারবার পাভেল-আর্শির বিয়ে থেমে যেতে পারে না।
আজ তাদের বিয়ে। পরপর দুটো ধাক্কা সহ্য করতে না পারায় খুব একটা জমকালো আয়োজন হয়নি দু বাড়িতে। একেবারে ছোটো খাটো ঘরোয়া আয়োজন। কিছুক্ষণ পূর্বেই পাভেল শিকদারের নামে কবুল পড়েছে আর্শিয়া। এরপর চিরপরিচিত নীড় ছেড়ে আবেগঘন ঘটনার সাক্ষী হয়ে, স্বামীর হাত ধরে শিকদার বাড়িতে এসেছে।
এ বাড়ির সকলে সন্তুষ্ট। তবে প্রেমার ঘটনার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনো। সেজন্যই খুব একটা হাস্যমুখ দেখা গেলো বিয়ে বাড়িতে। পাভেলের রুমটা বেশ সুন্দর করে সাজিয়েছে স্পর্শীয়া। আর তো কিছুক্ষণের অপেক্ষা। এরপরই নবদম্পতিকে দেওয়া হবে একঘরে।
আপাতত সকলে বসে আছে ড্রয়িংরুমে। বেশ কিছু আত্মীয়রা এসেছে বিয়ের জন্য। পাভেলের কাছের কয়েকজন বন্ধুরাও রয়েছে। সকলে হঠাৎ চেপে ধরলো তাকে। বিয়ের পর থেকে পাত্র-পাত্রী দুজনের মুখেই কুলুপ এটানো। কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। লজ্জায়, আড়ষ্টতায় দুজনেই তাকিয়ে রইলো ফ্লোরে, আসবাবপত্রের দিকে। হঠাৎ নবীন জোরাজুরি করলো। বললো,
– ভাইইই, কিছু তো বল। একটু পর তো ঠিকই লজ্জা-টজ্জা উবে যাবে। যত ঢং শুধু আমাদের সামনে।
পাভেল চেষ্টা করলো এড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু সক্ষম হলো না। হঠাৎ তীব্র সাহস নিয়ে দুঃসাহসিক একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেললো। আর্শিয়ার সামনে গিয়ে হাটু মুড়িয়ে বসে তার হাতের উল্টোপিঠে চুমু খেলো। আবেগ নিয়ে বললো,
– আমার জীবনে আসার জন্য তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমাকে এতোটা যত্ন করে ভালোবাসার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমাকে আগলে রাখার ইচ্ছে জানানোর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। সবশেষে, তুমি আমার জীবনে হঠাৎ ফিরে আসা সৌভাগ্য ; যাকে পাওয়ার দুঃসাহস আমি কল্পনায়ও করিনি।
দরজা বন্ধ করে বসে আছে সোভাম। লজ্জায় মুখ দেখানো যাচ্ছে না। তা দেখে বাড়িসুদ্ধ সবাই হেঁসে কুটিকুটি। বিয়ের দেড় মাসের মধ্যেই প্রেমা প্রেগন্যান্ট। এ কথা শুনে সোভাম জ্ঞান হারাবে প্রায়। রাগ দেখিয়ে প্রেমাকে বললো,
– একটা বাচ্চা বিয়ে করেছি। একটু কি সাবধানে থাকা যেতো না?
আচার খেতে খেতে মুখ ভেংচি মারলো প্রেমা। উল্টো দোষারোপ করে বললো,
– বাহ! সব দোষ আমার। আর আপনি একদম সাধু, তাইতো? অসভ্য লোক, স্নাতক শেষ করার আগে আমার কাছে কেনো এসেছিলেন?
পরশ রাগের তুঙ্গে চলে এসেছে। সারা ঘর ময় পায়েচারি করছে, আর স্পর্শীয়াকে শাসাচ্ছে। লজ্জায় তেমন কিছু বলাও যাচ্ছে না। সে আবারো রাগ দেখালো স্পর্শীর উপর। বললো,
– আমার বোন এতোটা ছোটো! এসব জেনে শুনেই ইচ্ছে করে তোমায় ভাই এমনটা করেছে। ওর যদি কিছু হয়ে যায় না, তো তোমার ভাইকে জেলের ভাত খাওয়াবো?
স্পর্শী নাক কুচকালো। কিছু না জানার ভান ধরে বললো,
– কেনো, কি করেছে আমার ভাই?
পরশ রাগে গিজগিজ করে উঠলো।
– কি করেছে মানে? আর কয়েকটা বছর পর বাচ্চা নেওয়া যেতো না?
স্পর্শী অগ্রাহ্য করলো। ভুল শুধরে দিয়ে বললো,
– অদ্ভুত কথাবার্তা! বাচ্চা কি আমার ভাই এনেছে নাকি? আল্লাহর জিনিস আল্লাহ দিছে। ওদের ভাগ্যে ছিলো।
স্পর্শীয়ার ডোন্ট কেয়ার ভাবটা বড্ড জ্বালা দেয়। এমনিতেও সারা শরীরে রাগ আলোর গতিতে দৌঁড়াচ্ছে। পরশ দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরলো স্পর্শীকে। চোয়াল শক্ত করে বললো,
– বেশ! তাহলে আমিও প্রতি বছর একটা করে নেবো।
স্পর্শী হেঁসে উঠলো। বললো,
– শোধ তুলবে? হাহ! তোমাদের দুই শালা-ভগ্নিপতির প্রতিশোধের চিপায় পড়ে কবে যেনো আমি নিজেই টপকে যাই।
নিস্তব্ধ বিকেল। নীলাভ আকাশ। তার মাঝে সাদা সাদা পুঞ্জীভূত মেঘ। ঠিক যেন ফুল ফুটেছে। পিপাসা উদাস হয়ে বসে আছে ছাদে। পড়নে নীল শাড়ি। আচলটা চেয়ার ভেদ করে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। শামসুল সরদার গোপনে, অত্যন্ত যত্নের সহিত আচল তুলে দিলো। পিপাসা চমকালো। পিছু ঘুরে শামসুলকে দেখে আবারো আনমনা হলো।
চেয়ার টেনে ঠিক পাশাপাশি বসলো শামসুল। ম্লান কন্ঠে বললো,
– কাল যাচ্ছো?
– হুম
– থেকে গেলে কি হতো?
– অধিকার নেই।
শামসুল দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বললো,
– তুমি নিজেই সেই অধিকার ছিন্ন করে চলে গেছিলে। আর তাছাড়াও, আমিতো ডিভোর্স পেপারে সই করিনি।
পিপাসা চাইলো শামসুলের দিকে। বললো,
– কিন্তু আমি তো করেছি।
এরপর আবারো নিস্তব্ধতা। প্রায় দীর্ঘ সময় চুপ থাকার পর শামসুল আক্ষেপ নিয়ে বললো,
– যদি এমন কোনো দিন আসে, যখন আমি মুমূর্ষু! এইতো যে কোনো সময় মরে যাবো। ওমন সময়ে তোমায় যদি শেষ কদিন কাছে পাওয়ার অনুরোধ করি, তবে কি থাকবে তৃষ্ণা?
পিপাসা চোখ নামিয়ে নেয়। ম্লান কন্ঠে বলে,
– মৃত্যুর নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। আমিও মরে যেতে পারি, যেকোনো সময়।
এই চরম সত্যটা হঠাৎ উপলব্ধি করলো শামসুল। বুকটা ফুলে উঠলো যন্ত্রণায়। তখনই সে চেয়ার ছেড়ে তৃষ্ণার সামনে বসলো। ফ্লোরে। দুহাত জড়িয়ে ধরে আকুল কন্ঠে বললো,
– আমি এভাবে একবুক হাহাকার নিয়ে মরতে পারবো না তৃষ্ণা। পুরোটা জীবন শেষ। আর তো মাত্র কদিন। থেকে যাও না। অন্তত সন্তানদের স্বার্থে। ওরা যখন বাবা-মাকে একসাথে দেখবে তখন গত দুই যুগের ব্যর্থতা ভুলে যাবে। তুমি কি চাওনা?
পিপাসা কতক্ষণই বা নিজেকে শক্ত রাখবেন। শক্ত-পোক্ত মানুষটাকে এই বয়সে এসে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে বুক ভেঙে যায়। তিনি তবুও আপত্তি করলেন। বললেন,
– অনেক বছর আলাদা। আমাদের কোনো সম্পর্ক অবশিষ্ট নেই।
– তবে চলো, বিয়ে করি।
এমন প্রস্তাবে চোখ বড় বড় করে ফেললো তৃষ্ণা। আর্তনাদ করে বললো –
এই বয়সে! ছেলেমেয়ের সামনে? ইয়া আল্লাহ! কি বলছেন এগুলো?
বাধা মানলো না শামসুল। বললো,
– স্পর্শীয়া আগেই আমাকে এ ব্যাপারে জানিয়েছে। শুনলে ওরা খুশিই হবে। তুমি প্লিজ আর দ্বিমত কোরো না। এখনো যদি বিয়ে না করতে চাও, তবে কবে করবে? নাতি- নাতনি আসার পর?
পৌষের মাঝামাঝি সময়। ধরণীতে তখন হাড়কাঁপানো শীত। সূর্যের নরম রোদ খোলা দরজা, জানালা দিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকেছে। সেই মিষ্টি উত্তাপ নিয়েই বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে সারা ঘরময়। প্রত্যেকের পড়নে মোটা আঁটসাটে সোয়েটার। হঠাৎ তিন্নি পা থামিয়ে দিলো। ছুটে গেলো বড় মামার কাছে। আট বছরের আদুরে ছিমছাম গড়নের বালিকা দুহাত দু দিকে মেলে আবদার করে বসলো। বললো,
“ অনেক শীত করছে মামা। আমায় কোলে নাও। ”
পরশ চমকে পেছনে তাকালো। গোলগাল মুখখানা দেখে ঠোঁটে হাঁসি ফুটালো। নিচু হয়ে ঝুঁকে কোলে নিলো ভাগনীকে। সরদার এবং শিকদার পরিবারের সবথেকে বড় এবং আদরের নাতনী হলো তিন্নি। তার বাচ্চা বোনের একমাত্র
বাচ্চা। সারা বাড়ির সকলে কোলে নিয়ে আদর করলেও তার মন ভরে না। একমাত্র এই ব্যস্ত বড় মামার আদর পাওয়ার জন্যই ওঁৎ পেতে বসে থাকে।
হঠাৎ বাচ্চাদের মধ্যে ছুটতে থাকা আরেকজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। পাঁচ বছরের আদরের দুলাল ক্ষোভ নিয়ে তাকালো তিন্নির দিকে। সে তার বাবার কোলে উঠেছে। স্পর্শ জেদ নিয়ে থমথম করতে করতে সোফায় গিয়ে বসলো। সামনেই তার জন্মদিনের কেক সাজাচ্ছে কাকিয়া। কিছুক্ষণ আগে এটা নিয়ে বেশ উৎফুল্ল থাকলেও এখন ভালো লাগছে না। হঠাৎ-ই চিৎকার করে উঠলো। বড়দের মতো করে গাল ফুলিয়ে বললো,
– আমার কোনো বার্থডে লাগবে না। আমি এখন ঘুমাবো।
আর্শি কেক সাজানো বাদ দিয়ে ছুটে এলো স্পর্শের কাছে। আদুরে হাতে মাথা ছুঁয়ে বললো,
– কেনো বাবা? এখন ঘুমাবে কেনো? শরীর খারাপ লাগছে?
উত্তর দিলো না স্পর্শ। বাবা এখনো তিন্নিকে কোলে নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একবার নামিয়েও দিচ্ছে না। তার চোখ ছলছল করে উঠলো অভিমানে। হঠাৎ দুহাতে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়লো সোফায়। কাঁত হয়ে অসহায়ের মতো মাথা লুকিয়ে ফেললো। উপস্থিত সকলে এক মুহুর্তের জন্য চমকে যায়। একে একে সকলে জিজ্ঞেস করতে থাকে কারন। কিন্তু স্পর্শ আগের মতোই নিরুত্তর।
বাঁ হাত দিয়ে তলপেটের ভারসাম্য রেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো স্পর্শীয়া। ফোলা ফোলা মুখ চোখ নিয়ে উৎকন্ঠা জানালো। তার গর্ভের বয়স নয় মাস। এই তো আর মাত্র ক-টাদিন। এরপর আবারো একটা প্রাণ আসবে তার কোলে। সে এগিয়ে গিয়ে ছেলের পাশে বসলো। দুহাতে তুলে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। বললো,
– কি হয়েছে আব্বু? রাগ কেনো করেছো?
মায়ের মিহি, আদুরে স্বরের সামনে স্পর্শের অভিমান টিকলো না। হু হু করে কেঁদে দিলো। বাকিরা তাকে কাঁদতে দেখলে লজ্জা পাবে বলে, মায়ের বুকের সঙ্গে আরো গুটিয়ে নিলো নিজেকে। ফিসফিস করে বললো,
– আম্মু কোলে নাও না। বাবাও নেয় না। বাবা শুধু তিন্নি শাকচুন্নিকে কোলে নেয়, ইশি -তিসি কলমের ঠুসিকে আদর করে। আমাকে একটুও কোলে নেয় না।
স্পর্শীর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। ইশশ! কতটা কষ্ট পেয়েছে তার নারী ছেঁড়া ধন। কতগুলো মাস হয়ে গেলো স্পর্শকে সে কোলে নেয় না। ঠিকমতো যত্নও করতে পারে না। কিভাবেই বা করবে। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর থেকেই শরীরটা ভেঙে পড়েছে। সারাক্ষণ অসুস্থতা লেগেই থাকে। হাত পায়ে পানি জমে ফুলে ওঠে। পরশের প্রতি তার অভিমান জমলো। লোকটা সারাক্ষণ রাজনীতি নিয়েই থাকে! ছেলেটাকে একটু সময় দিলে কি হয়? কিছুদিন পর তো আরেকটা প্রাণ আসবে। তখন স্পর্শ আরো হীনমন্যতায় ভুগবে। এসব কি বুঝতে পারে না লোকটা?
পরশ হতভম্ব হয়ে গেলো। দ্রুত কোল থেকে তিন্নিকে নামিয়ে দিলো। এরপর এগিয়ে গিয়ে বসলো সোফার সামনে। স্পর্শকে একপ্রকার টেনে নিজের কোলে নিলো। পরপর দুটো চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললো,
– ইশশ! আমার ছেলে মেয়েদের মতো কাঁদছে? ছিহ! তুমি না বাবার মতো সাহসী হবে? তবে এইটুকুতে কেনো কাঁদছো?
– আমি তোমার কোলে থাকবো না। তুমি ওই বুড়ো শাকচুন্নিকে নাও।
পরশ হেঁসে দিলো। ছেলেকে কাঁধে তুলে বেরিয়ে গেলো উঠোনে। গুরুগম্ভীর ভাব ধরে বেশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসলো। বললো,
– শোনো বাবা, তুমি পুরুষ। সিংহের মতো। তুমি কেনো কাঁদবে? ইশি, তিন্নি তো মেয়ে। ওরা একটুতেই কেঁদে দেয় ভয়ে। তাই তো আমি কোলে নেই, যাতে ভয় না পায়। বুঝেছো?
স্পর্শ বুঝেও বুঝলো না। অন্যত্র তাকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বললো,
– আমার সঙ্গে কথা বলবে না!
– বেশ! কে যেনো ড্রাইভ করা শিখতে চেয়েছিলো, সে কথা না বললে আমিও তাকে শেখাবো না।
পাঁচ বছরের স্পর্শের চোখের সামনে ভেসে উঠলো বাবার প্রতিচ্ছবি। সে বাতাসের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাইক চালিয়ে যায়। এটা তো ছোট্ট স্পর্শের দারুণ লাগে। সে চোরাচোখে বাবার দিকে তাকালো। বললো,
– আমি কথা বলি তো।
– বেশ। তুমি যদি এখন ভদ্র ছেলের মতো কেক কাটো তবে গুলি করাও শেখাবো। শিখবে?
আনন্দে আটখানা হয়ে উঠলো স্পর্শ। বাবার কাঁধে চড়ে ঘোড়ার ন্যায় লাফালো। বললো,
– শিখবো, শিখবো!
বাপ-ছেলের বোঝাপড়া শেষে স্পর্শকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো পরশ। সঙ্গে সঙ্গেই হাঁসির শব্দ পাওয়া গেলো। গোল গোল চশমা পরিহিত একটা সাত বছরের মেয়ে স্পর্শের দিকে তাকিয়ে হাসলো। খুবই স্পষ্ট স্বরে বললো,
– আমাকে আর তিন্নি আপুকে কাকাই কোলে নেয় বলে তুই কেঁদেছিস স্পর্শ? ছিহ! তুই একটা হিংসুটে।
স্পর্শ কি বলবে খুঁজে পেলো না। তাই ক্ষ্যাপাটে কন্ঠে ইশিকে রাগিয়ে দিতে বলে উঠলো,
– ইশি তিশি কলমের ঠুশি!! ইশি তিশি কলমের ঠুশি।
বিকেলের নরম রোদ গায়ে মাখার জন্য বারান্দায় বসে আছেন শামসুল সরদার। আরামকেদারায় শরীর এলিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সামনে বসে থাকা রমনীর দিকে। পঞ্চাশোর্ধ পিপাসা চায়ের কাপ স্বামীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে মৃদু হাসলেন। বললেন,
“কেনো যে ছেলেমেয়ের সামনে পাগলামি করেন! আমার হাতেরই চা খেতে হবে, এমনটা কোথাও লেখা আছে?”
শামসুল উত্তর দিলেন না। চায়ের কাঁপ রেখে স্ত্রীর হাত মুঠোয় নিলেন। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ ছাপ পড়া মুখশ্রীর দিকে। ভীষণ আফসোস করে বললেন,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫২
“ আমি কখনো আল্লাহকে বলিনি, আমায় দীর্ঘ আয়ু দিন। তবে আজকাল এই আকাঙ্ক্ষা দৃঢ় হচ্ছে তৃষ্ণা। তোমার সাথে অনন্তকাল বাঁচতে ইচ্ছে করে। অথচ দেখো, গোটা জীবনটা তোমায় রেখে পার করতে হলো। যদি আরেকটা জীবন কাটানোর সুযোগ পেতাম, তবে ক্ষীণ ত্রুটিও করতাম না। তোমায় নিয়ে কাঁটিয়ে দিতাম সাদামাটা জীবন।”
তৃষ্ণা হারিয়ে গেলো অতীতে। মিহি কন্ঠে বললো,
“আরেকটা জীবন আমাকে নিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা করলে সর্বপ্রথম যে রাজনীতি ছাড়তে হতো৷
“যদিও সে সুযোগ নেই। তবে আমি অবশ্যই এই রংমহল বিসর্জন দিতাম। শুধু তোমার জন্য।
সমাপ্ত
