সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৮
তানিয়া হুসাইন
অতিরিক্ত কান্না করতে করতে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়ে ইশায়া।সারাদিনে মুখে একফোঁটা পানি ও তোলেনি।অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর না খেয়ে থাকার কারণে শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে যায়।শেষ পর্যন্ত কান্না আর ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
কিন্তু অন্ধকারের ভেতর থেকে যেন দুঃস্বপ্নেরা একে একে তাকে ঘিরে ধরে।ভেতরের ভয় অপরাধবোধ আর অতিরিক্ত ভাবনার কারণে হ্যালুসিনেশনের মতো সবকিছু অস্পষ্ট দেখতে থাকে ইশায়া।সে দেখে সাফা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।চারপাশ অন্ধকার।শুধু সাফার চোখ দুটো ভয়ংকরভাবে জ্বলছে।ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি।
ইশায়ার দিকে এগিয়ে এসে সে বলে ওঠে,
___তুই খুব স্বার্থপর, ইশু।
নিজের স্বার্থে আজ তুই সবকিছু ভুলে গেছিস।
কিন্তু আমি ভুলিনি কিছু।স্বামী-সন্তানকে নিয়ে সুখে থাকতে গিয়ে তুই আমার প্রতি করা অবিচার ভুলে যেতে পারিস, কিন্তু আমি পারিনি।আমি আমার বদলা ঠিকই নেব।
ইশায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে।সে পিছিয়ে যেতে চায়, কিন্তু শরীর জমে গেছে তার।
সাফা আবার বলতে থাকে আমার ভালোবাসা থেকে সে আমাকে দূরে সরিয়েছে।আমাদের একটা সংসারের কত স্বপ্ন ছিল, মনে আছে তোর, আমরা ঠিক করেছিলাম আমাদের বাচ্চার নাম কি রাখবো।
কথাগুলো বলতে বলতেই সাফার চোখে উন্মাদনা নেমে আসে।তার হাসিটা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।আমার ভালোবাসা থেকে যে আমাকে দূরে সরিয়েছে আমিও তাকে তার ভালোবাসা থেকে দূরে সরাবো।
ইশায়ার বুক কেঁপে ওঠে।কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলে,
___ঠিক আছে… মেরে ফেলো আমাকে।
সাফা হেসে ওঠে।সেই হাসিতে ভয়ংকর শীতলতা।
___না… তোকে মারবো না আমি।
আমি মারবো তোর স্বামীকে।কথাটা শুনে ইশায়ার বুক মোচড় দিয়ে ওঠে।মনে হচ্ছে কেউ তার বুকের ভেতর থেকে হৃদপিণ্ডটা টেনে ধরেছে।
সাফা ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে,
___আমার ভালোবাসার মানুষকে আমি পাইনি,
সে-ও পাবে না।
ঘুমের মধ্যেই ইশায়ার শরীর ঘামে ভিজে ওঠশ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে তার।হঠাৎ দৃশ্যটা বদলে যায়।
সে দেখতে পায় ডেলমাকে।
ডেলমার চোখভর্তি ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুন।
সে বলে ওঠে,
___আমার একমাত্র সন্তানকে মেরেছে,আমার কোল খালি করেছে,আমাকে নিঃসন্তান করেছে।তার সাথেও এমনটাই হবে।সেও তার সন্তানকে পাবে না।
তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে ওঠে।
___শেষ করে ফেলবো তাকে,কথাটা বলতেই সাফা আর ডেলমা একসাথে ভয়ংকরভাবে হাসতে শুরু করে।
সেই হাসির শব্দ চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
আর ইশায়ার মনে হয় পুরো অন্ধকারটা যেন তাকে গিলে খেতে আসছে।
হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে যায় তার।ধড়ফড় করে উঠে বসে ইশায়া।ভয়ে পুরো শরীর কাঁপছে তার।কপাল ঘামে ভিজে গেছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
ঘরের অন্ধকারে আতঙ্কিত হয়ে চারপাশ দেখতে থাকে সে।
_____এদিকে পপরিস্থিতি আরো করুণ রূপ নিচ্ছে।
চারদিকে বারুদের গন্ধ, র*ক্ত আর মৃ*ত্যুর বিভীষিকা।লুকা, মাতেও আর তাদের লোকেরা একে একে শেষ করে ফেলেছে ভীরের স্পেশাল ইউনিট কিলারফোর্স সহ প্রায় সব গার্ডদের।তাদের মূল লক্ষ্য এখন একটাই
ভীর আর নিককে আলাদা করা।কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে,এই দুইজন একসাথে থাকলে তাদের ভাঙা অসম্ভব।
একজন আগুন হলে আরেকজন সেই আগুনের ঝড়।
ডিয়েগো আর এনরিকো নিজেদের জীবন বাজি রেখে ভীরকে ঘিরে রেখেছে।ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা।
এভাবে চলতে থাকলে ম্যাটিয়াসদের পুরো পরিকল্পনাই ধ্বংস হয়ে যাবে।ঠিক তখনই ম্যাটিয়াস সামনে এসে ভাঙা কণ্ঠে বলে ওঠে,
___সামনের দিকের পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে! ওরা সামলাতে পারছে না নিক স্যারকে যেতে হবে।
নিক সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ে।
___আমি ব্রো কে একা রেখে কোথাও যাচ্ছি না ডিয়েগোও নিজের জায়গা থেকে একচুল নড়ে না।
তার ভেতরটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে ভরে উঠেছে।কেন জানি মন সায় দিচ্ছে না।তার কাছে বসের নিরাপত্তাই সবার আগে।কিন্তু ম্যাটিয়াস এমনভাবে পরিস্থিতি তুলে ধরে যেন সামনে না গেলে পুরো যুদ্ধটাই হাতছাড়া হয়ে যাবে।
তার কথা শুনে রাফা, লুইস, মোন্দেজা আর রোসাস দ্রুত সেদিকে ছুটে যায়।নিক আর ডিয়েগোকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ম্যাটিয়াস আবার বলে ওঠে,
___বসের কাছে আমি আছি স্যার… কিন্তু ওদিকে লোক দরকার। মাতেও ওই দিক থেকেই আক্রমণ করছে।
মাতেও নামটা কানে যেতেই ভীরের চোখে হিংস্র আগুন জ্বলে ওঠে।চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার।
হাতের র*ক্তমাখা চা*কুটার মুঠি আরও শক্ত করে ধরে সে সামনে এগোতে নেয়।
কিন্তু নিক তার পথ আটকে দাঁড়ায়।
___তুমি যাবে না ব্রো।
ভীর তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় তার দিকে।
নিক দৃঢ় গলায় বলে,
___আমি যাচ্ছি। তুমি এখানে থাকো,লুকা সামনে।
এরপর ডিয়েগোর দিকে তাকিয়ে ইশারা করে সে, নিক দ্রুত সেদিকে চলে যায়।
নিক চলে যেতেই চারপাশ আবার র*ক্তাক্ত বিশৃঙ্খলায় ডুবে যায়।ভীর একের পর এক লোকের গলা কে*টে এগোতে থাকে।
হঠাৎ ভীর ডিয়েগোকে বলে,
___নিকের কাছে যাও, ডিয়েগো। ওকে দেখো।ওর যেন কিছু না হয়।
ডিয়েগো সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠে,
____কিন্তু বস, আপনাকে ছে…
কথা শেষ করার আগেই ভীর ঘুরে তাকায় তার দিকে।
ভীরের রক্ত লাল চোখ দেখে ডিয়েগোর বুক কেঁপে ওঠে।আর একটা শব্দ বলার সাহসও হয় না তার।
শেষমেশ বাধ্য হয়ে আদেশ মেনে সেও নিকের দিকে চলে যায়।
আর ঠিক এটাই চেয়েছিল ম্যাটিয়াস।তার ঠোঁটের কোণে অন্ধকার হাসি ফুটে ওঠে।অবশেষে ভীর একা।
এখন এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ।একবার শুধু ভীরকে শেষ করতে পারলেই হবে।নিককে পরে সামলানো যাবে।কিন্তু ম্যাটিয়াস খুব ভালো করেই জানে
সামনা সামনি ভীরের মুখোমুখি হওয়া মানে মৃ*ত্যু ডেকে আনা।ভীর একজন মাফিয়া নয়, সে এক বিভীষিকা।তাই তাকে আঘাত করতে হবে আড়াল থেকে।
ম্যাটিয়াস সতর্ক চোখে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে।তার থেকে কিছুটা দূরেই এনরিকো এখনও লড়ছে, র*ক্তে ভেজা শরীর নিয়েও একের পর এক শত্রুকে শেষ করছে।আর ভীরের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যই ম্যাটিয়াস মিথ্যা লড়াইয়ের অভিনয় করে যাচ্ছে।প্রতিটা আঘাত, প্রতিটা চিৎকার, প্রতিটা পদক্ষেপ
সবটাই সাজানো।যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সে নয়,যে সামনে থেকে লড়াই করে।সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু সে,যে পাশেই দাঁড়িয়ে থেকে আপন মানুষের মৃত্যুর ফাদ তৈরি করে।
নিক লড়ছে একেবারে সিংহের মতো।লুকার ভাইকে মারে নিক।একে একে সামনে আসা প্রত্যেকটা শত্রুকে নির্মমভাবে ঘায়েল করছে সে।কেউ তার আঘাত সহ্য করতে পারছে না।কারও গ*লা কাটা দেহ আছড়ে পড়ছে মাটিতে,কারও বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে গু*লিতে।তার এক হাতে বড় সাইজের র*ক্তমাখা চা*কু,আর অন্য হাতে রি*ভলবার।চোখে ভয়ংকর হিংস্রতা,
নিকের ঠিক একটু পেছনেই ডিয়েগো একই তালে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।একটার পর একটা শত্রুকে শেষ করছে সে।দুই দিক থেকেই সংঘর্ষ চলছে ভয়ংকরভাবে।ভীরের বাহিনীর অর্ধেকেরও বেশি লোক মারা পড়েছে বিষক্রিয়ার প্রভাবে,তবুও কেউ পিছু হটছে না।শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে যাচ্ছে তারা।
সংখ্যায় অনেক বেশি হওয়া সত্ত্বেও মাতেওর লোকেরা কোনো সুবিধা করতে পারছে না।এক এক করে মাতেওর দল ভেঙে পড়ছে।নিকের হাত থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না।প্রতিটা আঘাতে জমে আছে নিষ্ঠুরতা।
ঠিক তখনই সামনে এগোতে গিয়ে হঠাৎ নিচে পড়ে থাকা একটা লোক তার পা চেপে ধরে।নিক মুহূর্তের মধ্যে চা*কু তোলে তাকে শেষ করার জন্য কিন্তু পরে থেমে যায়।লোকটা তাদেরই একজন।র*ক্তাক্ত শরীর নিয়ে মাটিতে পড়ে আছে সে। কিছু বলতে চাইছে সে।
নিক দ্রুত ঝুঁকে আসে লোকটার কাছে।
নিককে এভাবে নিচু হতে দেখে ডিয়েগো সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে ওঠে।এখানে এক সেকেন্ডের ভুল মানেই মৃ*ত্যু।সে চারপাশের শত্রুদের সঙ্গে আরও আগ্রাসীভাবে লড়াই করতে থাকে, যেন কোনোভাবেই কেউ নিকের কাছে পৌঁছাতে না পারে।নিচে পড়ে থাকা গার্ডটা কষ্টে হাপাচ্ছিল।তার বুক উঠানামা করছে দ্রুত।
র*ক্তে ভিজে গেছে পুরো শরীর।সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দ বের হয় না ঠিকমতো।নিক ঝুঁকে বলে
___কি বলছ?
লোকটার ঠোঁট কাঁপেনিক কিছুই বুঝতে পারে না।
শেষে নিক নিজের কানটা তার মুখের কাছে নিয়ে যায়।
আর তারপরই সে শুনতে পায় এমন কিছু
যা তার পুরো পৃথিবী থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
লোকটা ভাঙা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
___ব… বস… ম… ম্যা ম্যাটিয়াস আমাদের মেরেছে,
নিকের চোখ কেঁপে ওঠে।
লোকটা কষ্টে শ্বাস নিতে নিতে আবার বলে
___ও… ও শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়েছে… ও বিশ্বাসঘাতক… ও মাতেও আর লুকার লোক,ও… আমাদের মেরেছে… সান্তিয়াগো স্যারকেও ম্যাট ওদের লোক ভাঙা ভাঙা কথা সসম্পূর্ণ না বুঝলেও সে বুঝেছে সব কিছু।ম্যাটিয়াস নামটা তার মাথায় বাজতে থাকে।
লোকটা কাঁপতে থাকা হাতে নিকের জামা চেপে ধরে।
___আপ..আপনি ওকে ছাড়বেন না বস।
শেষ শব্দটুকু বলার পরই তার নিঃশ্বাস থেমে যায়।
শরীরটা নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।
নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না নিক।
ম্যাটিয়াস?বিশ্বাসঘাতক?
এতো বিশ্বস্ত মানুষ।যে ভীরকে রক্ষা করতে নিজের প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল সে। সময় হাতে নেই তার নিক টলতে থাকা পায়ে উঠে দাঁড়ায়।চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা লাগছে।ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে ডিয়েগোকে।এক মুহূর্তে তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।সে কিছু বলতে চেয়েও বলে না সময় নেই।
যদি কথাগুলো সত্যি হয় তাহলে ম্যাটিয়াস…নিক সামনে এগিয়ে যায় দূরে ভীর দাঁড়িয়ে আছে।
চারপাশে মাতেওর লোকেরা তাকে ঘিরে রেখেছে।
তবুও ভীর একা হাতে দুই-তিনজনকে একসাথে শেষ করে যাচ্ছে। তার চোখ সামনে স্থির।
হাতে অ*স্ত্র। কিন্তু সে বুঝতেই পারছে না তার ঠিক পেছনে এগিয়ে আসছে কেউ।ম্যাটিয়াস ধীরে ধীরে ভীরের দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে ল*ম্বা ধারালো ছু*রি।চারপাশে কেউ নেই।এনরিকো অনেক দূরে।
এই সুযোগটাই চাইছিল সে। এমনভাবে এগিয়ে আসছে, যেন সামনে থাকা ভীর কিছুই টের না পায়।
নিক রি*ভলবার তাক করে তার দিকে ট্রিগার চাপে,কিন্তু কোনো গু*লি বের হয় না। তার শরীর ঝাঁকিয়ে ওঠে আতঙ্কে।চোখ বড় হয়ে যায়।গলার ভেতর থেকে শব্দই বের হয় না আর।সে শুধু দেখে
ম্যাটিয়াস ছু*রিটা উঁচু করে ভীরের একদম কাছে চলে এসেছে।মুহূর্তেই নিক নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দৌড় দেয়।তুফানের বেগে ছুটে, নিককে এভাবে ছুটে আসতে দেখে ডিয়েগোও তার পেছনে দৌড়ায়।
কিন্তু সামনে থাকা দৃশ্য দেখে তার পা থেমে যায়।
সময় যেন ধীর হয়ে পড়ে।
ম্যাটিয়াস সুযোগ বুঝে ছু*রিটা ভীরের পিঠ বরাবর আক্রমন করতেই ঠিক সেই সময় ভীরের সামনে সম্পূর্ণ ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে নিক।
আর তারপরই ঘটে যায় সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনাটা।
ধারালো ছু*রিটা সোজা নিকের পেট ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যায়।নিকের নাক মুখ থেকে র*ক্ত বেরিয়ে আসে।
চোখ দুটো কেঁপে ওঠে তীব্র যন্ত্রণায়।
নিকের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে তীব্র ব্যথাতুর একটা চাপা আর্তনাদ।সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
___ভীর দ্রুত পেছনে ঘুরে তাকায় আর পরের দৃশ্যটা দেখেই তার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
নিকের শরীরটা পড়ে যাচ্ছিল।ভীর এক হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলে।চোখের সামনে তার পেট ভেদ করে ঢুকে থাকা ছুরিটা দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যায়।তারপর পরের সেকেন্ডেই
কি হয়েছে সেটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে ভীরের চোখের ভেতর ভয়ংকর কিছু জেগে ওঠে।
এক উন্মত্ত দানবের চোখে তাকায় সে ম্যাটিয়াসের দিকে,এক মুহূর্তও দেরি না করে হাতে থাকা র*ক্তমাখা ছু*রিটা সজোরে চালিয়ে দেয় সে।এক কো*প।
শুধু এক কো*পেই ম্যাটিয়াসের মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়।রক্ত ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
কা*টা মা*থাটা দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ে মাটিতে।
আর মা*থাহীন শরীরটা ধপ করে লুটিয়ে পড়ে ভীরের সামনে।চারপাশে সব শব্দ থেমে যায়।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কি থেকে কি হয়ে গেল
ডিয়েগো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।তার হাত থেকে ব*ন্দুক পড়ে যায়।
এনরিকো, রোসাস আর লুইস দৌড়ে চলে আসে সেখানে।কিন্তু সামনে থাকা দৃশ্য দেখে তাদের চোখেও আতঙ্ক জমে যায়।নিক ধীরে ধীরে নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দেয় পুরোপুরি ।
ভীর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে নিচে, তাকে সামলিয়ে নেয় বুকের কাছে।নিকের মুখ থেকে র*ক্ত আসছে।ভীর কাঁপতে থাকা হাতে সেই র*ক্ত মুছে দেয়।
তার ঠোঁট কাঁপছে… মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।এই দৃশ্য এই র*ক্ত এই অসহায় অনুভূতি সবকিছু আবার ভীরকে টেনে নিয়ে যায় সেই সতেরো বছর আগের অন্ধকার জায়গাটাতে।
যেখানে সে পেয়েছে তার এই ছায়াকে।আবারো সে তাকে ঋণী করলো।ভীরের মনে হচ্ছে তার কলিজার ভেতর কেউ ছুরি চালাচ্ছে বারবার।
___ব্রো…
নিক কাঁপা কাঁপা গলায় ডাকে।
সেই ডাক শুনে ভীর পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
সে দ্রুত নিকের শরীরটা নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে নেয়।যেন সে এভাবেই তাকে মৃ*ত্যুর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারবে।
____কিচ্ছু হবে না তোর… কিছু হবে না তোররর…
ভীর চিৎকার করে ওঠে।তার কণ্ঠ কাঁপছে।
চারপাশের সব যেন কেঁপে উঠছে সেই চিৎকারে।
___আমি তোর কিছু হতে দেবো না… তুই চিন্তা করিস না… তোর ব্রো আছে… আছে তার গলার স্বর ভেঙে যাচ্ছে,
___তোর ব্রো আছে… তোর কিছু হতে দিবে না সে…
ভীরের চোখ দুটো পুরো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।চোখের কোণে লাল জমাট রক্তের মতো আভা।এটা কান্না না।এ জমে থাকা উন্মত্ততা, ভয় আর অসহায়তার রক্তাক্ত রূপ।তার কাঁপতে থাকা হাত বারবার নিকের মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। সে বিশ্বাসই করতে পারছে না।তার সামনে থাকা মানুষটা সত্যিই নিক।যে নিক সবসময় তার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।যে কখনও তাকে একা ছাড়েনি।
আজও ছাড়েনি।নিজের প্রাণ দিয়ে তাকে বাঁচিয়েছে।
নিক আবারও কষ্টে শ্বাস নেয়।তার ঠোঁট কাঁপে।অসহ্য যন্ত্রণায় ভাঙা গলায় আবার ডেকে ওঠে,
____ব্রো…তোমার চ্যাম্পকে বলো,আমার জন্য সে তার বাবাকে পেলো।
বড় বড় শ্বাস নেয় নিক মুখ খুলে আবারো কষ্ট করে আওরায়,
___আ.. আমাকে ভুলে যেও না ব্রো।
শব্দগুলো ভীরের বুকের তীরের ফলার মতো গিয়ে বিধে।ভীরের পৃথিবী থেমে যায়। নিকোর হাত ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে আসে।
নিক দ্রুত গাড়ি আনতে বলে,
কাপা কাপা গলায় বলে,
___কিছু হবে না তোর আমি আছি বলতে বলতে ভীরের চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে উত্তপ্ত অশ্রু কণা।
তারপর ধীরে ধীরে মাথাটা ঢলে পড়ে ভীরের কোলে।
মুহূর্তের মধ্যেই ভীরের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে যায়।মুখ তার রক্তশূন্য হয়ে যায়।
___নিক!
তার গর্জনমাখা চিৎকার পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু কোনো সাড়া আসেনা।একবারও না।নিক সম্পূর্ণ নিথর হয়ে যায়।
ভীর বিশ্বাসই করতে পারছে না কিছু।
___নিক… নিক…
সে কাঁপা হাতে নিককে ঝাঁকাতে থাকে।তার মুখে হাত বুলিয়ে দেয়।চুলে হাত রাখে,আবার ডাকে,আবার ও।
আরও জোরে।কিন্তু যার মুখে সারাক্ষণ ব্রো শব্দটা লেগে থাকত, সে আজ একেবারে নিশ্চুপ।
ডিয়েগো, এনরিকো, রাফা সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তাদের চোখ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
ভীর মরিয়া হয়ে নিকের পালস পরীক্ষা করে।হার্টবিট শুনতে চেষ্টা করে।তার বুক উঠানামা করছে কিনা দেখে।শ্বাস নিচ্ছে কিনা খুঁজে।কিন্তু….শূন্য সবকিছু শূন্য।চারপাশের পরিস্থিতি,চিৎকার চেচামেচি গু*লির শব্দ হচ্ছে অথচ ভীরের কাছে পৃথিবীটা হঠাৎ থেমে গেছে।সে নিকের নিথর শরীরটা বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে।
___এটা হতে পারে না…তার কণ্ঠ ভেঙে যায়।
এটা হতে পারে না, নিক…চোখের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা আর ধরে রাখতে পারে না সে।
___তুই এভাবে যেতে পারিস না…তুই তোর ব্রোকে এভাবে রেখে চলে যাবি?
___উঠ নিক…
তার কণ্ঠে অসহায়তা।
সেই ভয়ংকর মানুষটার কণ্ঠে আজ শুধুই ভাঙন।
___দেখ… আমি ওদের শেষ করব…তুই দেখবি না?দেখবি না তুই?ভীরের হাত কাঁপছে।তার চোখে অশ্রু আর ক্রোধ একসাথে জ্বলছে।তুই না বলেছিলি আমার বেবির সাথে খেলবি?
বলেছিলি ওকে আমার মতো রাজা বানাবি?তাহলে কেন এমন করছিস।
___উঠ নিক…উঠ!
তার চিৎকারে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবার বুক ফেটে যাচ্ছে।মাফিয়া বসের এমন আচরণ তারা এর আগে কখনো দেখিনি এতটা ভেঙে পড়তে।
ভীরের এত কথার পরও ওপর পাশ থেকে কোনো উত্তর আসে না।সবসময় যে মানুষটা
___ব্রো… ব্রো… করতে করতে তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াত, আজ সে সারাজীবনের জন্য চুপ হয়ে গেছে।
এই সত্যিটা ভীর কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
তার বুকের ভেতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে।
সে জানে আর কখনো সেই পরিচিত কণ্ঠে ব্রো ডাক শুনতে পাবে না।নিকের অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।ভীর রাগ করুক, মারুক, যা-ই বলুক না কেন কিছুক্ষণ পর আবার হাসিমুখে ফিরে আসতো,যেন কিছুই হয়নি।
সেই মানুষটাই আজ আর ফিরবে না।সময় গড়াy,পরিস্থিত খারাপের দিকে যায় একেবারে হাতের বাইরে যাওয়ার মত অবস্থা। অনেকক্ষণ পর ভীর নিজেকে সামলায়।ধীরে ধীরে নিকের মুখে হাত বুলিয়ে দেয়।
তারপর রাফার দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলে,
___আমার ভাইকে নিয়ে যাও।রাফার বুক কেঁপে ওঠে।
কিন্তু সে কিছু বলে না।
কারণ এই মুহূর্তে কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়।ভীর উঠে দাঁড়ায়।তার চোখে এখন অশ্রু নেই।সেখানে অন্য কিছু জন্ম নিয়েছে।আগুন ভয়ংকর আগুন।প্রতিশোধের আগুন।তার চোয়াল শক্ত, হাতমুঠি বন্ধ হয়ে আসে।
তারপর সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
___যাদের জন্য এটা হয়েছে তাদের প্রত্যেকটাকে আমি নিজের হাতে শেষ করব।এমন পরিণতি হবে তাদের,
তুই শুধু দেখিস, নিক,দেখিস আমি কি করি।
কথাগুলো শপথ হয়ে ঝরে পড়ে তার ঠোঁট থেকে।
ভীর আবার অ*স্ত্র তুলে নেয়।যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যায়।
বাইরে তার চোখে আগুন জ্বলছে।
আর ভেতরে ভেতরে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।নিকের শূন্যতা তাকে ভেতর থেকে গ্রাস করছে।তবুও সে থামেনা।যতক্ষণ না এই বিশ্বাসঘাতকতা আর মৃ*ত্যুর হিসাব চুকানো হচ্ছে, ততক্ষণ তার কোনো শান্তি নেই। ভীর এক ভয়ংকর উন্মত্ততার মধ্যে ডুবে যেতে থাকে।ডিয়েগো দূর থেকে সবকিছু দেখছিল।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯৭
তার জীবনে প্রথমবারের মতো সে ভয় অনুভব করে,
শত্রুদের জন্য নয় ভীরের জন্য।
কারণ সে জানে ভীরের ভেতর কি চলছে,যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়েছে।বুক ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে তার রাগ, শোক, কষ্ট আর প্রতিশোধের আগুন মিলেমিশে তাকে অন্য কিছুতে পরিণত করছে।আর ডিয়েগো খুব ভালো করেই জানে,ভীর প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়ে উঠেছে।কিন্তু এখন রাগের বসে কিছু করলে হবে না,তাদের প্রতিটা পদক্ষেপ বুঝে-শুনে ফেলতে হবে।নয়তো নিকের মৃ*ত্যুর পর তারা আরও অনেক কিছু হারাবে।
