Mad for you 2 part 29
তানিয়া খাতুন
লাল টুকটুকে একটি শাড়ি পড়েছে রুহি। যদিও শাড়িটি সে নিজে পরেনি, আয়েশা তাকে যত্ন করে পরিয়ে দিয়েছে।
অন্য দিনের তুলনায় আজ নিজেকে অনেক বেশি সাজিয়েছে সে।
যেন নিজের সৌন্দর্যের কোনো খুঁতই রাখতে চায়নি।
চোখে গাঢ় কাজল টেনে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল রুহি।
একবার ডানদিকে ঘুরে দেখে, আবার বামদিকে। শাড়ির আঁচলটা ঠিক আছে কি না, চুলের খোঁপা ঠিকঠাক বসেছে কি না, কপালের ছোট্ট লাল টিপটা ঠিক বসেছে কি না—সবকিছুই বারবার পরীক্ষা করছে।
নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই তার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে।
আজ তাকে দেখে ক্ৰিশের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
মানুষটা কি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে?
নাকি আগের মতোই নির্লিপ্ত মুখে বলবে, “ভালো লাগছে”?
এই কথাগুলো ভাবতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি অনুভব করে রুহি।
লজ্জায় তার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে ওঠে। নিজেরই অবস্থা দেখে আবার মৃদু হেসে ফেলে সে।
কিছুক্ষণ আগেই নীলকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে ক্ৰিশ।
বলেছে, সে এসে রুহিকে নিয়ে যাবে।
সেই থেকে আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেনি রুহি।
কতবার যে জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়েছে, তার হিসেব নেই।
হঠাৎ নিচ থেকে মোটরবাইকের পরিচিত শব্দ ভেসে আসতেই রুহির বুক ধক করে ওঠে।
এক মুহূর্তও দেরি না করে তাড়াতাড়ি আয়নার সামনে গিয়ে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নেয় সে।
আঁচলটা আরেকবার ঠিক করে কানের পাশের এলোমেলো চুলগুলো গুঁজে দেয়।
“আমি কি বেশি সাজলাম?” নিজের মনেই ফিসফিস করে বলে সে।
পরক্ষণেই মাথা নেড়ে সেই চিন্তা ঝেড়ে ফেলে।
আজ সে শুধু ক্ৰিশের জন্যই সেজেছে।
মুখে লাজুক হাসি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রুহি।
ফ্লাটের দরজা পেরিয়ে বাইরে আসতেই তার পদক্ষেপ থমকে যায়।
বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ক্ৰিশ।
সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, এলোমেলো চুলে বিকেলের হাওয়া খেলা করছে। এক হাতে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল সে।
ঠিক তখনই ক্ৰিশের দৃষ্টি এসে থামে রুহির ওপর।
আর পরের মুহূর্তেই তার বলা কথাগুলো যেন গলায় আটকে যায়।
চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে রুহির মুখে।
লাল শাড়িতে মোড়ানো মেয়েটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন ভাষা হারিয়ে ফেলে ক্ৰিশ।
আর ক্ৰিশের সেই বিস্মিত দৃষ্টি দেখে রুহির বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে ওঠে।
সে বুঝতে পারে, আজকের সাজটা বৃথা যায়নি।
হঠাৎ করেই ক্ৰিশ এগিয়ে আসে তার চোখে তখন অদ্ভুত এক মুগ্ধতা, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লাল শাড়ির মেয়েটার দিক থেকে চোখ সরাতেই পারছে না।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নিজের হাতের হেলমেটটা তুলে নেয় সে।
রুহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ৰিশ খুব সাবধানে হেলমেটটা তার মাথায় পরিয়ে দেয়।
রুহি ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই ক্ৰিশ সামান্য ঝুঁকে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে যায়।
গরম নিঃশ্বাস এসে লাগে রুহির কানের পাশে।
— আমার আদরে তাহলে দিন দিন এত তাজা হয়ে উঠছো বাটারফ্লাই।
কথাটা বলেই মৃদু হেসে ওঠে সে।
রুহির গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে যায়।
ক্ৰিশ আরও একটু ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলে,
— তবে তোমার সৌন্দর্য দেখার অধিকার শুধু আমার। পুরো রাস্তা হেলমেট খুলবে না, কেমন?
রুহি লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে।
যেন মানুষটার প্রতিটি কথা সে মন দিয়ে শুনেছে, আর সেগুলোই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান নির্দেশ।
ক্ৰিশ সন্তুষ্ট হয়ে হালকা হাসে।
রুহি তখন কৌতূহলী চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমরা কোথায় যাচ্ছি?
প্রশ্নটা শুনে ক্ৰিশের হাসিটা মিলিয়ে যায়।
মুখে নেমে আসে এক ধরনের গম্ভীরতা।
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে হঠাৎ রুহির হাত ধরে টেনে নেয় নিজের কাছে।
রুহি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়।
পরের মুহূর্তেই ক্ৰিশ তাকে নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়।
ক্ৰিশের হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত।
যেন ভেতরে কোনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
রুহি অনুভব করতে পারে, আজ কিছু একটা আলাদা।
খুব আলাদা।
ক্ৰিশ চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নিচু গলায় বলে,
— আমি তোমাকে আজ অনেক কথা বলব, বাটারফ্লাই।
রুহি নিঃশব্দে তার বুকের ওপর মাথা রেখে শোনে।
— এমন কিছু কথা… যেগুলো জানার পর হয়তো তুমি আমাকে আর আগের মতো দেখবে না।
তার কণ্ঠে স্পষ্ট কষ্ট।
— সত্যিটা জানার পর হয়তো তুমি আমাকে বিশ্বাসও করবে না। হয়তো ঘৃণাও করতে পারো।
রুহি চমকে উঠে মুখ তোলে।
ক্ৰিশ তার দিকে তাকায় না।
দৃষ্টি দূরে কোথাও স্থির।
— কিন্তু আমি চাই তুমি সব জানো। আমার জীবনের প্রতিটা অন্ধকার, প্রতিটা লুকানো সত্য।
তারপর হঠাৎই ক্ৰিশ দুই হাতে রুহির মুখটা ধরে।
চোখের গভীরে তাকিয়ে বলে,
— একটা কথা দাও আমাকে।
— কী কথা?
— যাই শুনো না কেন… আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না।
ক্ৰিশের গলায় এমন অসহায়তা আগে কখনো শোনেনি রুহি।
মুহূর্তের জন্য তার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
রুহি ধীরে ধীরে ক্ৰিশের দুই হাত নিজের হাতে চেপে ধরে।
তার চোখে জল চিকচিক করে ওঠে।
— আপনাকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।
ক্ৰিশ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তার উত্তর শোনে।
রুহি মৃদু কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— আমার মৃত্যু ছাড়া আপনাকে আমি কোনোদিন ছাড়ব না।
কথাটা বলেই সে ক্ৰিশের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে।
ক্ৰিশ নীরবে চোখ বন্ধ করে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
কারণ সে জানে, যে সত্যগুলো আজ বলতে যাচ্ছে, সেগুলো তাদের দুজনের জীবনই বদলে দিতে পারে।
তবুও এই মুহূর্তে রুহির কথাগুলো তার অস্থির হৃদয়কে একটুখানি শান্তি এনে দেয়।
বেশ অনেকটা দূরে নিরিবিলি একটি নদীর পাড়ে রুহিকে নিয়ে এসেছে ক্ৰিশ।
জায়গাটা ভীষণ সুন্দর। নদীর পাড়জুড়ে ছোট-বড় কয়েকটি ঘাট রয়েছে।
সেখানে দূরে দূরে কয়েক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকাকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজ করছে।
নদীর বুকে বিকেলের আলো ঝিলমিল করছে, আর হালকা বাতাস বারবার এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে দুজনকে।
ক্ৰিশ রুহির হাত ধরে একটি ফাঁকা ঘাটের সিঁড়িতে গিয়ে বসল।
রুহিও তার পাশে বসে পড়ল। তারপর শাড়িটা সামান্য তুলে নিজের দুটি পা নদীর জলে ডুবিয়ে দিল।
ক্ৰিশও একইভাবে পা ডুবিয়ে বসে রইল।
রুহি কিছুক্ষণ জলের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ দুহাতে খানিকটা জল তুলে ক্ৰিশের মুখের দিকে ছুড়ে মারল।
ঠান্ডা জলের ছিটায় ক্ৰিশ একটু চমকে উঠতেই রুহি মুচকি হেসে বলল,
— বলুন, কী বলবেন?
ক্ৰিশ কোনো উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে নিজের এক হাত রুহির কোমরে জড়িয়ে ধরল।
তারপর এক টানে তাকে তুলে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল।
হঠাৎ এমন কাণ্ডে রুহি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
সে দ্রুত চারপাশে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
— কী করছেন ? কেউ দেখে ফেললে কী ভাববে?
ক্ৰিশ মৃদু হেসে নিজের তর্জনী আঙুল রুহির ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল।
— শশ… তুমিই তো আমার বউ। প্রেমিকা নও। এটা একদম স্বাভাবিক।
কথাটা শুনে রুহির মুখ আরও লাল হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দূরে বসে থাকা কয়েকটি যুগলের দিকে তার দৃষ্টি চলে গেল।
অস্বস্তিতে সে নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করলেও ক্ৰিশ তাকে শক্ত করে আগলে রাখল।
ঠিক তখনই ক্ৰিশ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
তার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো নদীর জলের দিকে স্থির হয়ে রইল।
— বাটারফ্লাই… তুমি যদি জানতে পারো আমি ক্ৰিশ খান নই, তাহলে কী করবে?
প্রশ্নটা শুনে রুহি যেন মুহূর্তেই জমে গেল।
তার ভ্রু কুঁচকে উঠল।
সে অবাক হয়ে ক্ৰিশের মুখের দিকে তাকাল।
— কী?
রুহি অপ্রস্তুত হাসি দিয়ে বলল,
— আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন?
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
তার মুখে কোনো হাসি ছিল না।
— না। আমি মজা করছি না। সত্যিটাই বলছি।
আমি ক্ৰিশ খান নই, রুহি।
রুহির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
হঠাৎ করে চারপাশের সবকিছু যেন থেমে গেল।
নদীর শব্দ, বাতাসের স্পর্শ—সবকিছু দূরে সরে যেতে লাগল।
সে অস্ফুট স্বরে বলল,
— মানে?
ক্ৰিশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর অনেক কষ্টে কথাগুলো উচ্চারণ করল।
— আমি ক্ৰিশ খান নই। আমি ক্ৰুশ আলতাফ।
রুহি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মনে হলো মাথার ওপর যেন বজ্রপাত হয়েছে।
সে বিশ্বাসই করতে পারছে না ক্ৰিশ কী বলছে।
যে মানুষটাকে সে এতদিন ধরে চিনেছে, ভালোবেসেছে, যার প্রতিটি পরিচয় তার কাছে সত্যি বলে মনে হয়েছে—সেই মানুষ আজ বলছে, সে আসলে অন্য কেউ!
— মিস্টার শরিফুল খান আমার আব্বু নন। তিনি আমার বাবা নন, রুহি।
আমার আসল বাবা আমি খুব ছোট থাকতেই মারা গিয়েছিলেন।
রুহির ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল।
চোখদুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠছে।
সে ফিসফিস করে বলল,
— আপনি… আপনি আমাকে এতদিন মিথ্যে বলেছেন?
ক্ৰিশ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
সে মাথা নিচু করে রইল।
কারণ সে জানে, আজকের পর সবকিছু বদলে যেতে পারে।
কিন্তু আজ আর লুকিয়ে থাকার উপায় নেই।
আজ তাকে সব বলতে হবে।
রুহি দুহাতে ক্ৰিশের মুখটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।
রুহির কণ্ঠ কাঁপছিল। চোখ দুটো বিস্ময়, অভিমান আর অজানা ভয়ের মিশেলে ভরে উঠেছে।
দূরে কোথাও একটা নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে।
চারপাশে এত শান্ত পরিবেশ, অথচ রুহির বুকের ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সে ক্ৰিশের শার্টের কলার শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
— আর কী কী মিথ্যে বলেছেন আমাকে? বলুন… সব বলুন। আমি সব জানতে চাই।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখদুটো লাল হয়ে উঠেছে।
এতদিন ধরে বুকের ভেতর চাপা রাখা সত্যিটা আজ বলতে গিয়ে তার নিজেরই গলা শুকিয়ে আসছে।
ধীরে ধীরে সে রুহির হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
— আমি কখনো তোমাকে ঠকাতে চাইনি, বাটারফ্লাই।
বিশ্বাস করো, কখনোই না। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছিল।
রুহি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
— পরিস্থিতি? কারো নাম, পরিচয় চুরি করে বাঁচার নাম পরিস্থিতি?
ক্ৰিশ মাথা নিচু করে ফেলল।
— হ্যাঁ… হয়তো তোমার কাছে তাই মনে হবে।
— তাহলে সত্যিটা বলুন।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নদীর বয়ে চলা জলের দিকে। কিন্তু সে যেন নদীকে দেখছে না, দেখছে বহু বছর আগের সেই ভয়াবহ রাতটাকে।
সে গভীর শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো
— আমার নাম ক্ৰুশ আলতাফ। যখন আমার বয়স মাত্র সাত বছর, তখন আমার আব্বু মারা যান।
আর সেদিন থেকেই আমাদের সংসারে নেমে আসে অভাব।
কথাগুলো বলতে গিয়েই তার গলা ভারী হয়ে উঠল।
— আম্মু হাতের কাজ বলতে শুধু সেলাই জানতেন। সেই সেলাইয়ের কাজ করেই কোনো রকমে আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে নিয়ে সংসার চালাতেন।
কত কষ্ট করেছেন মানুষটা, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না।
ক্ৰিশের চোখের কোণে জল জমে উঠল।
— অনেক সময় এমনও হয়েছে, ঘরে খাবার কম আছে।
তখন আম্মু নিজে না খেয়ে আমাদের জন্য খাবার তুলে রাখতেন।
আমরা যাতে বুঝতে না পারি, তাই হাসিমুখে বলতেন উনার ক্ষুধা নেই।
কিন্তু রাতে ঘুম ভেঙে দেখতাম, মানুষটা চুপচাপ পানি খেয়ে আবার শুয়ে পড়েছেন।
রুহির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে নিঃশব্দে ক্ৰিশের হাত চেপে ধরল।
— ধীরে ধীরে আমরা বড় হতে লাগলাম। সংসারের অবস্থা তখনও খুব একটা ভালো ছিল না।
তাই ছোট বয়সেই আমি একটা দোকানে কাজ ধরি। ভাই তখন অনেক ছোট ছিল।
ওকে আমরা খুব আদর করতাম। বিশেষ করে আম্মু। ও ছিল আম্মুর চোখের মণি।
একটু থেমে ক্ৰিশ ম্লান হেসে বলল,
— ওকে কখনো কষ্ট করতে দিইনি আমরা।
— আমি আর আম্মুর আয়ে কোনো রকমে ভালোভাবেই দিন চলে যাচ্ছিল।
কষ্ট ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল। আমাদের ছোট্ট সংসারটা সুখেরই ছিল।
কথাটা বলেই ক্ৰিশ থেমে গেল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
মনে হলো কোনো ভয়ংকর স্মৃতি তাকে গ্রাস করে ফেলেছে।
নদীর ওপরে বয়ে যাওয়া বাতাস হঠাৎ যেন আরও ঠান্ডা লাগতে শুরু করল।
— কিন্তু সেই রাতটা…
তার গলা কেঁপে উঠল।
— সেই রাতটাই সব শেষ করে দিয়েছিল।
রুহি নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছে।
ক্ৰিশচোখ বন্ধ করল।
দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখের কোণ বেয়ে।
— সেদিন রাতে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশে একের পর এক বজ্রপাত হচ্ছিল।
চারদিকে এমন শব্দ হচ্ছিল যে নিজের কথা নিজেই ঠিকমতো শুনতে পারছিলাম না।
সে ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতরে ডুবে যেতে লাগল।
— হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে ধাক্কার শব্দ হলো।
— আমি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম। দেখি দুইজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
— আমি জিজ্ঞেস করলাম, কারা?
— তখন তারা বলল, তারা নাকি আমার আব্বুর অফিসের বন্ধু।
— তারা বলল, আব্বু নাকি অফিস থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই টাকা ফেরত নিতে তারা এসেছে।
ক্ৰিশ তিক্ত হেসে মাথা নাড়ল।
— ছোট ছিলাম। কিছুই বুঝিনি। যা শুনেছি, তাই বিশ্বাস করেছি।
— আমি আম্মুকে ডেকে আনলাম।
— আম্মু তাদের দেখে অবাক হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভদ্রতা করে ঘরের ভেতরে বসতে বললেন।
— তারপর নিজের হাতে তাদের চা বানিয়ে দিলেন।
— আর আমি…সে থেমে গেল।
গলার কাছে জমে থাকা কান্না যেন কথাগুলো বেরোতে দিচ্ছিল না।
— আমি আবার ভাইয়ের কাছে ফিরে গেলাম। ওকে নিয়ে বসে পড়তে লাগলাম।
এরপর আর কথা বলতে পারল না ক্ৰিশ।
তার বুকটা হু হু করে উঠল।
বহু বছর আগের সেই রাতের স্মৃতি যেন আজও তাকে ছিঁড়ে ফেলে।
ক্ৰিশ চোখ বন্ধ করতেই টলটল করে জল গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
রুহির নিজের চোখও ভিজে উঠেছে।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দু’হাতে ক্ৰিশের মুখটা আলতো করে তুলে ধরল।
তারপর নিজের আঁচলের মতো মমতা দিয়ে ক্ৰিশের গাল দুটো স্পর্শ করে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— শান্ত হোন…
— সবটা বলুন। আমি শুনছি।
সে আরও একটু কাছে সরে এল।
— প্লিজ… থেমে যাবেন না।
— এতদিনের কষ্ট আর বুকের ভেতর চেপে রাখবেন না।
রুহি ক্ৰিশের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
— আমি আছি।
— আপনার প্রতিটা কথা শুনব।
— তাই বলুন… তারপর কী হয়েছিল সেই রাতে…?
ক্ৰিশ জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। মনে হচ্ছিল প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
দুহাত মুঠো করে চোখ বন্ধ করল সে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করে নিজেকে সামলে নিল।
রুহি তার হাত শক্ত করে ধরে রইল।
ক্ৰিশ কাঁপা গলায় আবার বলতে শুরু করল,
— পড়তে পড়তে হঠাৎ আমার ছোট ভাইয়ের পানি পিপাসা পেল। ও আমাকে পানি এনে দিতে বলল। আমি উঠে বসার ঘরের দিকে গেলাম।
কথাগুলো বলতে গিয়েই তার কণ্ঠ আবার ভারী হয়ে উঠল।
— তারপর… তারপর যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
ক্ৰিশের দৃষ্টি শূন্য হয়ে গেল।
মনে হচ্ছিল সে আবার ফিরে গেছে সেই ভয়ঙ্কর রাতটিতে।
— আমি দেখলাম আম্মু ভীষণ আতঙ্কিত। আব্বুর সেই কথিত বন্ধুরা আর মানুষ ছিল না, যেন হিংস্র পশুতে পরিণত হয়েছিল।
আম্মু তাদের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন, বারবার অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু তারা কোনো কথা শুনছিল না।
— তারা বলছিল, যদি আম্মু তাদের অন্যায় দাবি মেনে নেন, তাহলে নাকি আব্বুর ঋণের কথা আর তুলবেন না মুকুব করে দেবেন।
ক্ৰিশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— আমি আর সহ্য করতে পারিনি। বাইরে থেকে একটা লাঠি নিয়ে তাদের দিকে ছুটে গিয়েছিলাম।
— কিন্তু আমি তখন একটা ছোট ছেলে। তাদের সঙ্গে লড়াই করার মতো শক্তি আমার ছিল না।
সে তিক্ত হেসে মাথা নাড়ল।
— কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তারা আমাকে আর আমার ভাইকে একটা ঘরে আটকে দিল।
ক্ৰিশের কণ্ঠ ভেঙে গেল।
— আমি দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলাম… চিৎকার করছিলাম… কাঁদছিলাম…
— কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি।
— সেই রাতটায় আমি শুধু অসহায় হয়ে সবকিছু ভেঙে যেতে দেখেছি।
সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।
— আমার আম্মু…
কথাটা বলেই থেমে গেল।
কয়েক মুহূর্ত কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে।
রুহির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।
— আমার আম্মু আমাদের পৃথিবী ছিলেন, রুহি। আমাদের বাঁচার কারণ ছিলেন।
কিন্তু সেদিন কিছু জানোয়ারের কারণে আমরা তাকে হারিয়ে ফেললাম।
ক্ৰিশের গলা কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এলো।
— আমি কিছু করতে পারিনি।
— কিছুই না…
— আজও যখন সেই রাতটার কথা মনে পড়ে, তখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না।
রুহি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে তার মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।
চোখভরা জল নিয়ে বলল,
— না, এমন কথা আর কখনো বলবেন না।
— আপনি তখন অনেক ছোটো ছিলেন।
— ওই অন্যায়ের জন্য আপনি দায়ী নন।
ক্ৰিশ মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল।
রুহি তার কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে বলল,
Mad for you 2 part 28
— আপনার আম্মু নিশ্চয়ই কখনো চাইতেন না যে আপনি নিজেকে দোষী ভাবুন।
— তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনাদের দুজনকে ভালোবেসেছিলেন।
— আর আজও তিনি আপনার মধ্যেই বেঁচে আছেন।
ক্ৰিশ কিছু বলল না।
শুধু মাথা নিচু করে বসে রইল।
রুহি অনুভব করল, ক্ৰিশের বুকের ভেতর এতদিন ধরে জমে থাকা যন্ত্রণার গভীরতা সে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। সেই রাত শুধু তার মাকে কেড়ে নেয়নি, তার শৈশব, তার হাসি আর তার নিরাপত্তাবোধও কেড়ে নিয়েছিল।
