৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (৩)
রুপান্জলি
গোটা করে ফটোসেশন শেষ হতেই মেহেদী অনুষ্ঠান শুরু হলো। রাতকে আজ খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। পরনে গোল্ডেন ব্লাউজের সঙ্গে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি, খোঁপায়, কানে, গলায়, মাথায় তাজা গাঁদা ফুলের গহনা। মুখে নানান প্রকার প্রসাধনীর সঙ্গে এক গাল হাসি। এই হাসিটুকুই প্রমাণ করে দিচ্ছে, সে এই বিয়েটা নিয়ে ঠিক কতটা খুশি। অপরদিকে অরুণের অবস্থাও একই। কখনো মেহেদী না পরা ছেলেটাও আজ দুহাত ভর্তি করে মেয়েদের মতো মেহেদী পরছে। এই তো কিছুক্ষণ আগের কথা। অরুণের এক কাজিন ভিডিও কল দিয়ে রাতকে অরুণের অবস্থা দেখালো। বিষয়টা নিয়ে এখনো সোরগোল চলছে সবার মাঝে। একেকজন রাতকে একেকভাবে খেপাচ্ছে। বিনিময়ে মেয়েটাও এক গাল লাজুক হেসে নিজের মনের আনন্দটুকু প্রকাশ করছে।
প্যান্ডেলের ঠিক মাঝখানটায় রাতকে নিয়ে আসর বসেছে। মেহেদী আর্টিস্ট আছে দুজন। একজন রাতের হাতে মেহেদী পরাচ্ছে, আরেকজন পারশীর হাতে। ইরাদ পরাচ্ছে মেধার হাতে। মেধার পাশে বসে আছে বিহান। সে প্রতিবারের ন্যায় বসে বসে বউয়ের মেহেদির ডিজাইন কতটা পারফেক্ট হচ্ছে তাই পরখ করছে। আশেপাশে একতলা, দোতলা ও চারতলার ছেলে-মেয়ে ভিড় করে বসে আছে। সবাই কিসব গেম খেলায় যেন ব্যস্ত। হয়তো ট্রুথ অর ডেয়ার খেলছে। এই খেলাটা বিয়ে বাড়িতে ইদানীং বেশ কমন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পল্লবটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কই গিয়েছে কে জানে? সবার এই হই-হুল্লোড়ের মাঝে একমাত্র নির্বিকার ইরাদ। সে চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছে। মেয়েটাকে দেখলে বড্ড অন্তর পোড়ে অর্পনার। ইরাদ তো তার থেকেও বেশি শূন্য। তার তো একটা পাপ্পা আছে, একটা ভালোবাসার দ্বীপ আছে আর একটা ভরপুর শ্বশুরবাড়ি আছে। ইরার তো কিছুই নেই। ভালোবেসে ভরসা করার মতো একটা মানুষ নেই, যার ওপর ভরসা করে নিজের দায়িত্বটুকু ছেড়ে দেওয়া যায়। যেই বয়সে স্বামী-সংসার নিয়ে বাঁচার কথা, সেই বয়সে নিজেকে চালানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ইরাদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করল অর্পনা। আরণ্যককে কোলে নিয়ে সে কিছুটা দূরে বসে আছে। রোমানা বেগম তাকে পইপই করে মেহেদী অনুষ্ঠানে যেতে নিষেধ করেছেন। মেহেদী, কাঁচা হলুদ, রং এসব নাকি বদ জ্বীনদের নজরে বেশি থাকে। এটা আজকে থেকে নয়। অর্পনা যখন থেকে কনসিভ করেছে, তখন থেকেই রোমানা বেগম তাকে হাতে মেহেদী ছোঁয়াতে নিষেধ করেছেন। এরপর থেকে মেহেদী পরা বন্ধ করেছে সে। নয়তো এর আগে দ্বীপ পছন্দ করে বিধায় সর্বদা হাতে মেহেদী পরে থাকত।
অর্পনার ভাবনার মাঝেই ঘুমন্ত আরণ্যক হাত-পা ছড়িয়ে কেঁদে উঠল। হকচকিয়ে গেল মেয়েটা। ঠোঁট ভেঙে কাঁদতে থাকা আরণ্যককে ঝাঁকিয়ে শান্ত করতে চাইল, কিন্তু বিধিবাম! ছেলে কাঁদবে তো কাঁদবেই। একপর্যায়ে আরণ্যক মুখে আঙুল দিতেই অর্পনা বুঝে গেল, ছেলের খিদে পেয়েছে। ফের তপ্ত শ্বাস ফেলল মেয়েটা। রাত্রির ডানপাশে বসে মেহেদী পরতে থাকা মা আর বউয়ের পাশে বসে বসে মেহেদীর ডিজাইন পরখ করতে থাকা বাবাকে দেখিয়ে বলল—
— কার জন্য কাঁদিস, আব্বা? ওই যে দেখ, তোর বাপ-মা কী করছে! কে বলবে, এদের একটা বাচ্চা আছে? কী মাখোমাখো প্রেম, বাবাগো! তোর মাকে কোনোরকম মানা গেলেও তোর বাপের ঢং দেখলেই আমার গা-পিত্তি জ্বলে যায়। বুঝলি?
আরণ্যক কী বুঝল কে জানে! শুধু শুধু কান্না থামিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল ছেলেটা। অর্পনার যেন বিষয়টা ভালো লাগল না। সে বাপ-মায়ের নামে বিচার দিচ্ছে, আর এই ছেলে কিনা হাসছে! সে রেগেমেগে বিহানকে কল করল। কিন্তু বিহানের বাচ্চা ফোন উঠাচ্ছে না। অর্পনার কল দেখে বারবার কেটে দিচ্ছে। ভাবা যায়, কত বড় বেয়াদব! ছেলেটা যে তার কাছে আছে, এটা কি ভুলে বসেছে নাকি? অর্পনা আবার কল করল। একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বিহান মোবাইলটা মেধার হাতে দিয়ে উঠে এলো। রেগেমেগে একাকার হয়ে অর্পনার সামনে এসে বলল—
— কী সমস্যা? বারবার কল দিচ্ছো কেন? দেখছো না, বিজি আছি?
আরণ্যক বাবাকে দেখে যেন খুশি হলো। সে আরও শব্দ করে হাত-পা ছুড়ে হাসতে লাগল। বিহানের সঙ্গে এত মাখোমাখো ভাব দেখে আরণ্যককে চোখ রাঙাল অর্পনা। পরপর বিহানের উদ্দেশ্যে আরণ্যককে দেখিয়ে বলল— এটা যে আপনাদের বাচ্চা, এটা মাথায় আছে?
বিহান দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝিয়ে বলল— নেই। এসব আমরা মনে-টনে রাখার প্রয়োজন মনে করছি না আজকাল। আজ থেকে বিয়ে শেষ হওয়া পর্যন্ত এই ছেলে তোমার আর তোমার স্বামীর। একদম আমাদের বিরক্ত করতে আসবে না। থাপ্পড়ে গাল লাল করে দেব!
বলেই যেভাবে এসেছে, সেভাবে চলে গেল। অথচ পিছনে ফেলে গেল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকা নারীকে। অর্পনা দাঁতে দাঁত চাপল। কই, ভেবেছিল ডেকে এনে দুটো কথা শুনিয়ে দেবে! অথচ হয়েছে তার উল্টো। বিহানের বাচ্চা তাকে কত বড় মুখঝামটা দিয়ে গেল। কোনোভাবে যদি বিহানকে চকবাজারে নিয়ে বিক্রি করে আরও একটা ভালো মানের ভাই আনা যেত, তাহলে অর্পনা বেশ খুশি হতো। বেঁচে যেত একপ্রকার।বিহান চলে যেতেই আরণ্যক আবারও মুখে আঙুল দিয়ে চপচপ শব্দ করে কাঁদতে লাগল। অর্পনা এবার কল করল দ্বীপকে। কিন্তু কোনো রূপ ভালো ফলাফল পেল না। দ্বীপ দুদিন ধরেই এই বিয়ে নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত। শালির বিয়ে বলে কথা! আরশাদ জামান যেখানে যাচ্ছেন, সেখানেই দ্বীপকে সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন। দ্বীপ ব্যস্ত জেনেও অকারণে গাল ফুলাল অর্পনা। কল কেটে আরণ্যককে বলল—
— কী বুঝলি, ফরেস্ট? মোট কথা হচ্ছে, তোর বাপ-চাচা একটাও ভালো না। এদের সঙ্গে আজ থেকে তোর আর আমার কথা বলা বন্ধ। দেখলেই মুখ ঝামটা দিয়ে দূরে সরে যাবি। ঠিক আছে?
বলতে বলতে ছেলেকে সোজা করে লিফটের দিকে চলে গেল। লিফটের বাটনে তিনতলা চাপতেই আরণ্যকের কান্নার তোপ বাড়ল। ছেলেটা লিফটে উঠলেই কাঁদে। তিনতলায় এসে লিফট থামতেই অর্পনা ফ্ল্যাটে ঢুকে সোজা কিচেনে চলে গেল। ছাদে আর গ্রাউন্ড ফ্লোরে আয়োজন হওয়ায় আপাতত ঘরে কেউ নেই।অর্পনা এদিক-ওদিক খুঁজে আরণ্যকের ফিডার আর ফ্লাক্সটা নিল। মেধা আগেই দুধ গরম করে রেখেছে দেখে খুশি হলো মেয়েটা। সে এসব দুধ পরিমাপ করে গরম-টরম করতে পারে না। তবে শিখতে হবে। পেটের ভেতর বড় হওয়া দ্বীপ মির্জার ফটোকপি এখনই যে পরিমাণ জ্বালায়, বের হলে যে বাপের দুই কাঠি ওপরে হবে, তা আর বুঝতে বাকি নেই অর্পনার।
আরণ্যককে দাঁড় করিয়ে কাঁধে শুইয়ে ফ্লাক্স হতে ফিডারে দুধ ঢালতে নিতেই আকস্মিক পিছনে এসে দাঁড়াল কেউ। অর্পনা পিছনে না তাকিয়েই বলল—— ঢং না করে ফরেস্টকে ধরুন। আমি ফিডার রেডি করে আসছি।
সেই কথা কানে তোলার প্রয়োজন মনে করল না দ্বীপ। তার নজর আরণ্যকের দিকে। অর্পনা সব চুল একসঙ্গে পেঁচিয়ে খোঁপা করে রেখেছে, যার ফলে কাঁধ কিছুটা উন্মুক্ত। ছোট্ট আরণ্যক খিদের তোপে অর্পনার উন্মুক্ত কাঁধে মুখ ঠেকিয়ে রেখেছে। বিষয়টা একটুও পছন্দ হলো না দ্বীপের। সে কপাল কুঁচকে এক আঙুলে আরণ্যকের মাথাটা সরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে শব্দ করে কেঁদে উঠল ছেলেটা। অর্পনা সেটা বুঝতে পেরেই চোখ রাঙাল—
— ছেলেটাকে কাঁদাচ্ছেন কেন? আপনি কি বাচ্চা?
বলেই আরণ্যককে হালকা ঝাঁকিয়ে শান্ত করতে চাইল। ছেলেটা শান্ত হতেই আবারও মুখ ঠেকাল অর্পনার কাঁধে। দ্বীপের এবারও পছন্দ হলো না তা। সে কেমন বিরক্তিভরা কণ্ঠে বলল— ওকে তোমার কাঁধ থেকে সরাও।
অর্পনা এবার দাঁতে দাঁত চেপে দ্বীপের দিকে তাকাল। অর্পনাকে এভাবে তাকাতে দেখে এক ভ্রু উঁচু করল দ্বীপ, যেন জানতে চাচ্ছে “মেডামের এভাবে তাকানোর মানে কী?” প্রত্যুত্তরে ঠাস করে দ্বীপের দিকে আরণ্যককে এগিয়ে দিল অর্পনা। আকস্মিক কাণ্ডে ভয় পেয়ে হাত-পা ছুড়ে কেঁদে উঠল আরণ্যক। দ্বীপ প্রথমে নিতে না চাইলেও জোর করে দ্বীপের হাতে আরণ্যককে ধরিয়ে দিল অর্পনা। ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে বিদ্রূপমাখা হাসি উপহার দিয়ে বলল—
— এটুকু ছেলেকে নিয়েও যখন আপনার এত হিংসা, তখন নিন, নিজের কাছেই রাখুন। সামলান ওকে।
দ্বীপ কেমন হুটোপুটির ন্যায় কোলে নিল ছেলেটাকে। এই প্রথম বাচ্চা কোলে নিল মানব। এর আগে কোনোদিন বাচ্চা কোলে নেওয়া তো দূরের কথা, ছুঁয়েও দেখেনি। অনেকটা বাবার মতো দেখতে লোকটার কোলে গিয়ে কান্নার গতি কিছুটা কমিয়ে দিলো আরন্যক।দ্বীপ কেমন উসখুস দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকাল। বেচারা বোধহয় নিজের কর্মের জন্য অনুতপ্ত। আগে জানলে এটুকু বাচ্চাকে নিয়ে হিংসা হলেও সেটা বউয়ের কাছে প্রকাশ করত না। অর্পনা ফিরেও তাকাল না। পাত্তাই দিল না দ্বীপকে। মূলত বাচ্চা কীভাবে ধরতে হয় কিংবা কোলে নিতে হয়, সেই বিষয়ে ধারণা নেই দ্বীপের। এই কারণেই অর্পনার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে। যদি মেডামের কাজ শেষ হয় আর তার ওপর একটু মেহেরবানি করে আরণ্যককে কোলে নেয়।
কিন্তু দ্বীপের ভাবনা মাফিক কিছুই হলো না। মেয়েটা ওদের চাচা-ভাতিজার পাশ কাটিয়ে ফিডার হাতে বসার ঘরের দিকে চলে গেল। তাড়া দিয়ে বলল—
— ফরেস্টকে নিয়ে আসুন। আমি আবার যেতে পারব না।
দ্বীপ তপ্ত শ্বাস ফেলল, তবে উত্তর করল না। রয়ে সয়ে আরণ্যককে কোলে নিয়ে এগিয়ে গেল বসার ঘরে। সোফার কাছে গিয়ে আরণ্যককে ধীরে ধীরে অর্পনার কোলে রেখে বলল— ফোন দিয়েছিলে কেন?
অর্পনা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করল না। আরণ্যককে কোলে নিয়ে মুখে ফিডার ধরে পা নাড়াতে নাড়াতে বলল— তেমন কিছু না। ফরেস্টকে একটু কোলে নেওয়ার জন্য।
দ্বীপ কেমন ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল। ভেবেছে, অর্পনা বোধহয় তাকে দেখতে না পেয়ে মিস করছে কিংবা কোনো অসুবিধা হয়েছে। তাই সব কাজ ফেলে, শ্বশুরকে উপেক্ষা করে ছুটে এসেছে। অথচ এখানে এসে দেখছে অন্য কাহিনি। তপ্ত শ্বাস ফেলল মানব। কিছু না বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল। দ্বীপের কাণ্ডে চুপসে গেল অর্পনা। ফিডারে মুখ গুঁজে রাখা আরণ্যকের দিকে তাকিয়ে বলল— তুই কি তোর বড় আব্বুর মতো রাগী হবি? হোস না বাপ, বউয়ের জান-জীবন কয়লা হয়ে যাবে।
সকাল ১০টা ছুঁইছুঁই।
তিনতলার ফ্ল্যাটটায় বর্তমানে মহা ব্যস্ততা। সবাই মিলে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে কাজ করছে। সন্ধ্যার দিকে অরুণদের বাড়ি থেকে লোক আসবে। সঙ্গে এই বাড়ির ম্যাক্সিমাম মেহমানরাই উপস্থিত থাকবে। এত এত মানুষের জন্য সন্ধ্যায় আয়োজনটা একটু গাঢ়ভাবেই করা হবে, তাই সবাই মিলে হুটোপুটির ন্যায় একটার পর একটা কাজ সামলে যাচ্ছে।বাড়িতে এত কাজ, অথচ এই বেলায় পল্লবের দেখা মিলল। ছেলেটার পরনে কলাপাতা রঙের নরমাল শার্ট, কালো প্যান্ট। চুলগুলো কেমন উশকোখুশকো, চোখটা লাল হয়ে ফুলে আছে। দেখে মনে হচ্ছে অনেকটা সময় নিয়ে কেঁদেছে, অথচ চোখে-মুখে ঘুমের রেশ। মাত্রই ঘুম থেকে উঠে এসেছে বোধহয়।পল্লবকে দেখেই শাড়ির আঁচলখানা ভালো মতো টেনে ছুটে এলেন সুহাসিনী। ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন—
— এসেছো তুমি? এত দেরি করলে কেন? কত কাজ বাড়িতে!
সুহাসিনী আন্টির আকস্মিক ডাকে পল্লব বোধহয় একটু হকচকালো, তবে তা প্রকাশ করল না। শান্ত কণ্ঠে বলল— দুঃখিত, আন্টি। ঘুম থেকে উঠতে লেট হয়ে গিয়েছে। কী করতে হবে বলুন, করে দিচ্ছি।
— রাতকে নিয়ে একটু পার্লারে যাও না, বাপ। ওর এখনো নাক ফোঁড়ানো হয়নি। পার্লারিস্ট বলল সকাল সকাল ফোঁড়াতে। এতে করে আগামীকাল নাকে ফুল পরানো সহজ হবে।
সুহাসিনীর কথায় কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল পল্লব। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে খোঁজার প্রয়াস চালিয়ে বলল—
— ইরাদ কোথায়? ও নিয়ে গেলে ভালো হতো না? লেডিস পার্লারে আমি ছেলে মানুষ…
সম্পূর্ণ কথাটা শেষ করার সুযোগ দিলেন না সুহাসিনী। তাড়া দিয়ে বললেন— তোমাকে ভেতরে যেতে হবে না। তুমি শুধু ওকে পার্লারের সামনে নামিয়ে দেবে, তারপর ও নাক ফোঁড়িয়ে ফিরে এলে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। পারবে না?
এরপর আর কিছু বলার মতো ভাষা পেল না ছেলেটা। রাত্রিকে আসতে বলে নিচে চলে গেল।মিনিট পাঁচেক পেরুতেই ওড়না দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে লিফট এরিয়া থেকে বেরিয়ে এলো রাত। পরনে ল্যাক্স কালারের একটা কুর্তি। ওড়নাটা এক সাইড থেকে দেওয়া। চুলগুলো ভেজা, যা পিঠ ছাড়িয়ে কোমর পর্যন্ত অবাধে ছড়িয়ে আছে। মেয়েটা হয়তো সাজার সময় পায়নি, তাই মুখে কোনো প্রসাধনী নেই। বড্ড স্নিগ্ধ আর সতেজ লাগছে দেখতে।তবে এই স্নিগ্ধ রূপ দেখার প্রয়োজন মনে করল না পল্লব। তার হাতে সিগারেট। নিচে এসেই ধরিয়েছে। সেই সিগারেটে অবাধ্যের ন্যায় আরও একটা টান বসিয়ে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
পল্লবের ভাবাবেগ না হলেও রাত্রি এগিয়ে এসে আকস্মিক পল্লবের বাহুতে চাপড় মেরে বলল
— নেশাখোর! অর্পনাকে ডাকব?
পল্লব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। পরপর রাতের দিকে দৃষ্টি রেখেই সিগারেটে লম্বা টান দিল। সম্পূর্ণ ধোঁয়াটা মুখে বন্দি করে হুট করেই রাত্রির মুখের ওপর ছেড়ে দিল।
রাত বোধহয় প্রস্তুত ছিল না এর জন্য। ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে খুকখুক করে কেশে উঠল। অনেকটা সময় নিয়ে কাশার পর কিছুটা স্বাভাবিক হতেই পল্লবের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাল রাত্রি। তবে এতেও ভাবাবেগ হলো না ছেলেটার। কেমন তিক্ত স্বরে আওড়াল—
— ডিস্ট্যান্স বজায় রেখে বসবি। গায়ে যেন একটুও টাচ না লাগে। টাচ লাগলে ধাক্কা দিয়ে বাইক থেকে ফেলে দেব।
পল্লবের কথায় খুব অপমানিত বোধ হলো রাত্রির। তবে বিষয়টা চাপিয়ে রাখল না। সোজাসাপ্টা জিজ্ঞেস করল— তুই আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করিস কেন, পল্লব? অর্পনা আর ইরার সঙ্গে তো এমন করিস না। আমাতে তোর এত প্রবলেম কেন?
পল্লবের কী যে হলো! অতিরিক্ত রাগে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে আওড়াল— কারণ তোকে আমার সহ্য হয় না। দেখলেই রাগ হয়, আর মেরে ফেলতে ইচ্ছা করে। তারপর নিজেও…
পল্লবকে রাগান্বিত মুখভঙ্গিতে বিড়বিড় করতে দেখে কপাল গুটাল রাত্রি। পল্লব কথাটা বলেছে ঠিকই, কিন্তু সে শুনতে পায়নি। রাত্রি কেমন বিরক্তিভরা কণ্ঠে শুধাল— মনে মনে কী বলিস? জোরে বল। আমার সঙ্গে এমন করিস কেন?
পল্লব গাঢ় নিশ্বাস ফেলে নিজের রাগ দমন করে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। রাত্রির কপালে তিন আঙুলের সাহায্যে টোকা দিয়ে বলল—
— কী করেছি তোর সঙ্গে? শুধু দূরে বসতে বলেছি। কাছে বসার অধিকার কার থাকে? বল। একমাত্র বউয়ের। কিন্তু তুই তো আমার বউ না। তুই আমার শত্রু। শত্রুকে কাছে বসিয়ে বউয়ের হক নষ্ট করব? আমি এরকম ছেলে না।
অন্যদিন হলে দুটো কথা শুনিয়ে দিত রাত্রি। কিন্তু আজকের এই ভালো মুহূর্তটা ঝগড়া করে কাটাতে চাইল না। আপাতত মুখ বাঁকিয়ে যথেষ্ট ডিস্ট্যান্স রেখে উঠে বসল। সঙ্গে সঙ্গে বাইক স্টার্ট দিল পল্লব। ছুটে গেল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। ভাঙা রাস্তার টুকটাক ঝাঁকি লাগলেও রাত্রি নিজের জায়গায় অটুট থেকেছে। কখন না জানি সত্যি সত্যিই পল্লব তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। তখন আবার আরেক বিপদ ঘটবে। আগামীকাল সকাল সকাল নিউজফিডে তার ছবি দিয়ে বড় বড় করে লেখা থাকবে “”বিয়ের জন্য নাক ফোঁড়াতে গিয়ে আহত হয়েছেন এক সাড়ে তেইশ বছরের রমণী!””ডেঞ্জারাস ব্যাপার-স্যাপার! আপাতত এত বড় রিস্ক নেওয়ার মতো সাহস করল না মেয়েটা।
পার্লারের সামনে এসে পল্লব বাইক থামাতেই রাত্রি ভেতরে চলে গেল। ফিরে এলো পাক্কা ৪৫ মিনিট পর। তখনো পল্লবের হাতে সি*গারেট। রাত্রি মনে মনে নাক সিটকালেও কিছু বলল না। যেখানে অর্পনার ভয় দেখানোর পরও ছেলেটা তার সামনে এসব খায়, সেখানে অহেতুক কথা নষ্ট করা মানে শুধুই কথা নষ্ট।
নাক ফোঁড়ানোর ফলে রাত্রিকে একটু অন্যরকম লাগছে। সরু, চিকন, খাড়া নাকটায় ওয়ান-টাইম পিয়ার্স লাগানোর ফলে মেয়েটাকে বেশ বড় বড় লাগছে। বিবাহিত-বিবাহিত একটা আভা ছড়িয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ মুখাবয়বে। লোকে বলে, মেয়েদের সৌন্দর্য নাকি বিয়ের পর কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সেটা বোধহয় এই নাকফুলের কারণেই বলা হয়। নয়তো একটু আগের সেই এলোমেলো রাতটা হুট করেই এমন অপ্সরা বনে গেল কী করে? পল্লব তাকিয়ে থাকল কিয়ৎক্ষণ। মনে মনে অরুণকে ভাগ্যবান বলে আখ্যা দিতেও ভাবল না দুবার।পল্লবকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাত্রি ভ্রু নাচাল—
— খুব সুন্দর লাগছে, তাই না?
পল্লব চোখ উল্টে মুখ বিকৃত করে বলল— বাদিনীদের মতো দেখাচ্ছে। আয়, দ্রুত উঠে বস। বাড়িতে বহুত কাজ পড়ে আছে।
রাত্রির মুখটা চুপসে এইটুকুনি হয়ে গেল। পল্লবকে ঠেলে-ঠুলে দূরে সরিয়ে বাইকের আয়নায় নিজের মুখটা দেখে নিল। নাহ! মাশাআল্লাহ, তাকে ভীষণ প্রিটি লাগছে। রাত্রির কাণ্ডে চরম বিরক্ত হলো পল্লব। মেয়েটাকে যত দূরে থাকতে বলে, ততই অবাধ্য হয় এই নারী। আর পরিস্থিতি যেন আরও বেপরোয়া। বারংবার তাকে রাত্রির কাছাকাছি নিয়ে আসে। মুখ দেখা শেষ হলে আবারও আগের ন্যায় বাইকে উঠে বসল রাত্রি। পল্লব বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
চলতি পথে আকস্মিক হাড়েই এক মুড়ি বিক্রেতার দেখা পেল দুজন। রাত খেয়াল না করলেও পল্লব স্বভাবসুলভ বাইক থামাল। হাত উঁচিয়ে ডাকল মুড়ি বিক্রেতাকে। লোকটা সকালের প্রথম রোদ যেমন হেসে ওঠে, তেমন করে হেসে তাদের দিকে এগিয়ে এলো।
এই পর্যায়ে এসে খেয়াল হলো রাত্রির। মুড়ি বিক্রেতাকে দেখে মেয়েটা কী যে খুশি হলো, তা মিররের দিকে তাকিয়ে থাকা পল্লব ব্যতীত আর কেউ বুঝেছে কিনা সন্দেহ। মুড়ি বিক্রেতা কাঁধে থাকা মুড়ি তৈরির সরঞ্জামগুলো নামাতেই পল্লব রাতের উদ্দেশ্যে বলল—
— শেষবারের মতো খাওয়াচ্ছি। বেশি বেশি খেয়ে নে।
রাত্রি কিছুটা মজার ছলেই বলল— কেন? মরে-টরে যাবি নাকি?
— যেতেও পারি। হায়াত-মওতের কথা তো বলা যায় না। কে কখন কোথায় চলে যায়!
— এরকমভাবে বলতে গেলে আমিও তো মরে যেতে পারি। যেহেতু হায়াত-মওত আল্লাহর হাতে।
— তুই কেন মরবি, গাধা? তোর মতো সুখী আর কেউ আছে? ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করছিস বলে কথা।
— তোরও তো কোনো কষ্ট নেই। তাহলে তুই কেন মরবি?
— বলদের বাচ্চা! তোকে বলেছি আমি মরব?
— তোর ১৪ গুষ্টি বলদ!
— তোকে না নিষেধ করেছি গুষ্টি তুলে কথা বলতে?
— বলবই। কী করবি তুই?
— পাগল ছাগল, নাদানের বাচ্চা!
— তুই পাগল ছাগল। তোর বাপ-মা ১৪ গুষ্টি…
হুট করেই ধমকে উঠল পল্লব— চুপ! আরেকবার মুখ চালালে গাল বরাবর টাটিয়ে একটা দেব। মামা, একটু দ্রুত বানান তো। বিরক্ত লাগছে।
রাত্রির মনটা খারাপ হয়ে গেল। মুখজুড়ে নামল ঘন আধার।তখনই তাদের পাশ কাটিয়ে একটা রিকশা যাচ্ছিল। রাত্রি ডেকে নিল রিকশাটা। অত্যন্ত পছন্দের মুড়ি মাখার দিকে ফিরেও তাকাল না। চলে গেল রিকশায় করে।পল্লব দাঁতে দাঁত চেপে দেখল সবটা। কিছু বলল না, আটকেও না। উল্টো মুড়ি বিক্রেতার বানানো মুড়িটা নিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলল। পরপর মুড়ি বিক্রেতাকে টাকা দিয়ে নিজের মতো যেদিকে ইচ্ছা চলে গেল।অন্যের বউয়ের রাগ ভাঙানোর কোনো ঠেকা নেই তার। ভালোবাসবে একজনকে, বিয়ে করবে একজনকে, আর অভিমান করবে তার সঙ্গে। কী আসে যায় পল্লবের? জীবন তো ক্ষণিকের। এই ক্ষণিকের জীবন একা একা কাটিয়ে দেওয়া কি খুব কঠিন? একদমই না।
সেই দুপুরের পর পার্লার হতে দুজন মেয়ে এসেছে। এখন সন্ধ্যা হতে চলল, তবুও রাত্রির সাজগোজ শেষ হওয়ার নাম নেই। এদিকে সবাই সাজগোজ করে রেডি। সবার পরনে লাল, হলুদ, কমলা মিক্সড পাড়ের কলাপাতা রঙা শাড়ি, সঙ্গে আর্টিফিশিয়াল হলুদের গহনা। বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রতিটি রমণীকেই অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ছেলেদের পরনেও কলাপাতা রঙা পাঞ্জাবি, সঙ্গে সাদা পাজামা। ছেলে আর মেয়ের কম্বিনেশনে বেশ ঝমঝমপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিয়েবাড়ি।এত এত সাজগোজের মাঝে অর্পনার পরনে প্রতিদিনকার ন্যায় চিকন সুতির কাপড়ের গাঢ় বাদামি রঙের ম্যাক্সি, আর অর্পনার অসভ্য মির্জার পরনে গাঢ় বাদামি রঙের ওভারসাইজ টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। এই লোক এখন ছাদের কর্নারে, যেদিকে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে, সেদিকে বসে আছে। একদিক থেকে দেখতে গেলে অর্পনা আর দ্বীপ ম্যাচিং ড্রেসই পরেছে। এখন এটা কো-ইনসিডেন্টালি নাকি দ্বীপ ইচ্ছে করেই পরেছে, সে বিষয়ে জ্ঞাত নয় অর্পনা। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ছাদে অনাহিতার আগমন ঘটল, সঙ্গে স্বামী-সন্তান। ছেলেকে স্বামীর কোলে দিয়ে ছুটে এলো মেয়েটা। এক লহমায় অর্পনাকে বুকে জড়িয়ে নিল।
ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করে ইরাদের খোঁজ করতেই অর্পনা জানাল, ইরাদ রাত্রির সঙ্গে নিচে সাজগোজ করছে। কখনো সাদা ব্যতীত অন্য রং না পরা রমণী আজও সাদা শাড়ি পরবে বলেই ঠিক করেছে। ইরার এই সাদা-প্রীতি নিয়ে মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় অর্পনার। তবে অন্য কারও পার্সোনাল সিদ্ধান্তে নাক গলানো পছন্দ নয় বিধায় কিছুই বলে না। অনাহিতা এবার রাত্রির খোঁজ করতেই দোতলার কর্নারের রুমের সন্ধান দিয়ে দিল অর্পনা। বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার দরুন এই কয়েকদিনের জন্য একতলা থেকে চারতলা আমার বাড়ি, তোমার বাড়ি বলতে কোনো কথা নেই। সম্পূর্ণ ফ্ল্যাট জুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে মেহমানরা। যেখানে যেই কাজটা করতে সুবিধা হচ্ছে, সেখানেই কাজগুলো করা হচ্ছে। এতে কেউ কোনো রূপ আপত্তি প্রকাশ করছে না। রাত্রির খোঁজ পেতেই অনাহিতা হুড়মুড় করে সেদিকে চলে গেল, পিছনে রেখে গেল তার স্বামী আর সন্তানকে। অর্পনা হতাশার নিশ্বাস ফেলে অনাহিতার স্বামী-সন্তানের সঙ্গে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষ করে বসার জন্য জায়গা করে দিল। এর মধ্যে ছুটে এলো বিহান, কোলে আরণ্যক। একদম হনহন করে হেঁটে তার সামনে এসে আরণ্যককে এগিয়ে দিয়ে বলল—
— এইযে মেয়ে! বেকার বসে না থেকে অরণ্যকে রাখো। ওদিকে আমার মেধা রানীর শাড়ির কুচি এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তোমাদের ছেলের জ্বালায় কিছুই ঠিক করে দিতে পারছি না।
বলেই হনহন করে চলে গেল। অর্পনা সেদিকে তাকিয়ে থেকেই আরণ্যককে ওপরে তুলে নিল। বাচ্চাটার পেটে নাক দিয়ে সুরসুরি দিতেই আরণ্যক খিলখিল করে হেসে উঠল। তবে অর্পনার মুখে হাসি নেই। সে মুখটা সিরিয়াস করে আরণ্যককে বলল— কে বলে তোর বাপের নাম বিহান? এর নাম তো মীরজাফর হওয়া উচিত। কীভাবে সুযোগ বুঝে তোকে ত্যাজ্য করে আমার সন্তান বানিয়ে দিল, দেখলি? আজ থেকে তোর বাপের নাম মীরজাফর আর তোর বড় বাপের নাম রায় দুর্বল। বেয়াদব লোক আমার স্বামী হয়ে আমার শত্রুর সঙ্গে মিলেমিশে থাকে।
বলেই আবারও নাক ডুবিয়ে দিল ছেলেটার পেটে। এর মধ্যে পাঁচতলার ছাদে এসে লিফট থামল। লিফটের ডোর ওপেন হতেই দেখা মিলল একঝাঁক শাড়ি পরিহিত রমণী আর যুবকদের। ওদেরকে আসতে দেখে ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে থাকা একটা ছেলে সেটআপ করা লাইটের সুইচ অন করে দিল। মুহূর্তেই কয়েক রকম আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল লিফট হতে বের হওয়া প্রতিটি মানব-মানবীর মুখ। সঙ্গে সঙ্গে সবাই প্ল্যানমাফিক নিজেদের জায়গা দখল করে নিল। চারজন ছেলে চারদিক থেকে রাত্রির মাথার ওপর রঙিন কাপড়ের সামিয়ানা ধরে রেখেছে। মেয়েদের হাতে রয়েছে নানান ধরনের ফল, মিষ্টি, ডেজার্ট, কেক। মেধার হাতে কুলো আর অনাহিতা আপুর কাঁখে মাটির কলস। সবার মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাত্রি।মেয়েটার পরনে পল্লবের দেওয়া হলুদ জামদানি কারচুপি ওয়ার্ক করা শাড়ি। দেড়-দুই হাজার টাকায় দেবে বলেও পুরো আট হাজার টাকায় শাড়িটা কিনেছে পল্লব। অরুণের পাঞ্জাবি কিনেছে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায়। এই টাকাগুলো পল্লবের নিজের। রাত্রি আর অরুণের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর টানা ছয় মাস টিউশন করিয়েছিল। সেই টাকায়ই কিনেছে এসব। শাড়িটাতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে।
কানে, গলায়, কপালে শোভা পাচ্ছে তাজা গোলাপের গহনা। মাথার লাল পাড়ের হলুদ দোপাট্টাটাও পল্লবের দেওয়া। ভারী সাজে চাঁদের মতো সুন্দর রাত্রিকে এতটাই অপরূপ লাগছে যে তার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি রমণীর সাজ বড্ড ফিকে লাগছে। সবার নজর শুধু রাত্রিতেই নিবদ্ধ। সবাই ঠিক হয়ে দাঁড়াতেই ক্যামেরাম্যান মৃদু স্বরে “স্টার্ট” শব্দটা উচ্চারণ করতেই সাউন্ড সিস্টেমে “সাইয়া সুপারস্টার” গানটা বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে রাত, পরশী, অহমিকা সহ বাকি মেয়েরা নাচতে শুরু করল। গান শেষ হতেই আরও কিছুটা এগিয়ে এলো সবাই। আবারও সাউন্ড সিস্টেমে “সাজন জি ঘর আয়ে, দুলহন ভি শরমায়ে” গান বেজে উঠল। সব মেয়েরা আবারও স্টেপ বাই স্টেপ নাচ করল। একের পর এক গান প্লে করা হচ্ছে আর সবাই মিলে নাচছে। নাচানাচির পর্ব চুকাতেই রাত্রিকে প্যান্ডেলের ভেতর আসনে বসানো হলো। বাকিরা সবাই চলে গেল দর্শকদের সারিতে। এর মধ্যে অরুণদের বাড়ি থেকেও লোক চলে এলো। সবাইকে একে একে দায়িত্ব নিয়ে বসানোর ব্যবস্থা করছে পল্লব আর আরশাদ জামান। দ্বীপ দেখছে খাবারের দিকটা। নিজেদের ছেলে নেই বিধায় মেয়ের জামাই আর পল্লবটাই ভরসা।খাবার খাওয়ানোর বেলায় অবশ্য ফ্ল্যাটের ছেলেপুলেরাই থাকবে। সবাই বসে পড়তেই রাত্রির হলুদ অনুষ্ঠান শুরু হলো।
ক্যামেরাম্যান সর্বপ্রথম কনের বাবা-মাকে ডাকল। না চাইতেও যেতে বাধ্য হলেন দুজন। আরশাদ জামানের পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর সুহাসিনীর পরনে ক্রিম রঙা শাড়ি। দুজনকেই খুব সুন্দর মানিয়েছে আজ।দুজন এগিয়ে গিয়ে রাত্রির দুপাশে বসে পড়লেন। প্রথমে রাত্রির গালে হলুদ ছোঁয়ালেন সুহাসিনী বেগম, এরপর এক চামচ ক্ষীর এগিয়ে দিলেন মেয়ের দিকে। রাত্রি সহাস্যে খেয়ে নিল সেটা। এরপর আরশাদ জামান হলুদ ছোঁয়ালেন। রাত্রির চোখজোড়া কেমন ছলছল করে উঠল। এই মাম্মা-পাপ্পাকে ছেড়ে সে সারাজীবনের জন্য পরের বাড়ি চলে যাবে ভাবতেই ফুঁপিয়ে উঠল। মেয়েকে কাঁদতে দেখে সুহাসিনীও কেঁদে উঠলেন। দুই মা-মেয়েকে কাঁদতে দেখে ব্যথিত হলেন আরশাদ জামান। গত আট মাসে রাত্রির ওপর বড্ড মায়া পড়ে গিয়েছে যে, তিনি মেয়েকে টেনে বুকে জড়িয়ে নিলেন। মেয়েটা এবার শব্দ করে কেঁদে দিল। তক্ষুনি অহমিকা টিস্যু হাতে ছুটে গেল। এভাবে কান্নাকাটি করলে মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে, তখন ছবি সুন্দর আসবে না। ছবির কথা মাথায় রেখে কান্নাকাটি থামিয়ে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছল রাত্রি।
আবারও ফটোসেশন, ভিডিও শুট শুরু হলো। অর্পনার শ্বশুর, বড় চাচা-শ্বশুর, শাশুড়ি, ছোট চাচা-শ্বশুর, ছোট চাচি-শাশুড়ি, পল্লবের বাবা-মা, ফ্ল্যাটের তিন আন্টি ও তাদের স্বামী, ছেলে-বউ, সন্তানেরা, বিহান-মেধা, অনাহিতা-অনাহিতার স্বামী, অহমিকা, পরশী, আরাফাত-আরিব, আরও নানান মেয়েরা একে একে এগিয়ে গিয়ে রাত্রির গালে হলুদ লাগিয়ে মিষ্টিমুখ করিয়েছে। এবার এগিয়ে যাচ্ছে অরুণদের বাড়ির লোকজন। এসব দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে পল্লব। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে বেশ ভালো হতো। একটার জায়গায় একসঙ্গে দুটো হলেও মন্দ হতো না। কিন্তু অর্পনা রয়েছে এখানে। কিছুটা দূরেই আরণ্যককে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে তাকে সিগারেট খেতে দেখলে মেয়েটা নিশ্চয়ই কষ্ট পাবে।নাহ! অর্পনাকে দুঃখ দেওয়া যাবে না। অর্পনা অসুস্থ আর খুব ইম্পরট্যান্ট। ভেবেই ঠোঁট কামড়ে নিজেকে দমন করল পল্লব। তখনই রাত্রির সঙ্গে চোখাচোখি হলো। মেয়েটা কেমন উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বোধহয় কিছু বলতে চায়। পল্লব সকালের রাগ ধরে না রেখে একটা ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল “কি হয়েছে?” রাত্রি হাত নাড়িয়ে ওর কাছে যেতে বলল। হয়তো গালে হলুদ ছোঁয়ানোর জন্য।
পল্লব দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করল, মানে সে যাবে না। ওদিকে ইরারও একই মতামত। সে ক্যামেরার সামনে যেতে চাচ্ছে না। অর্পনাও প্রেগন্যান্ট, তাই হলুদের আশপাশও ঘেঁষতে পারবে না। অরুণ তো তার হাসব্যান্ডই, সেও আসবে না। রাত্রি কেমন হুট করেই কেঁদে দিল। এতগুলো প্রাণের চেয়েও প্রিয় বন্ধু, অথচ তার এমন মুহূর্তে কেউ আসতে রাজি না। রাত্রিকে কাঁদতে দেখে অহমিকা আবারও ছুটে গিয়ে টিস্যু এগিয়ে দিল, কিন্তু মেয়েটা নিল না। জেদ ধরে কাঁদতে লাগল। সাধে কি আর পল্লব এটাকে পাগল-ছাগল, নাদান বলে ডাকে? এরকম আধপাগলের মতো কাণ্ড করে বলেই ডাকতে বাধ্য হয় সে। তপ্ত শ্বাস ফেলে এগিয়ে গেল পল্লব। সঙ্গে ইরার হাত ধরে ওকে টেনে নিয়ে গেল রাত্রির কাছে। দুজনেই এবার রাত্রির দুপাশে বসে পড়ল। প্রথমে হলুদ লাগাল ইরা। রাত্রির গালের এপাশ-ওপাশ সবখানে হলুদে লেপ্টে দিল মেয়েটা।
রাত্রি জ্বলজ্বল চোখেই কেমন হেসে ফেলল। পরক্ষণেই ইরাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। কতগুলো দিন ধরে তারা একসঙ্গে একই বাড়িতে, এই বিছানায় থেকেছে। কত কত সুন্দর স্মৃতি রয়েছে তাদের! রাত্রির ঘুমের বেশ দোষ আছে। হুটহাট লাথি বসায়। ইরা যে কয়বার লাথি খেয়ে বিছানা থেকে পড়েছে, তার হিসেব করা বারণ। ইরা যখন রাতভর সিড আর তার মেসেজগুলো পড়ে কাঁদে, তখন রাত্রি কতবার নীরবে তাকে জড়িয়ে ধরেছে, তার খোঁজ করাটাও যে বড্ড অশোভনীয় হবে।
খেতে গিয়ে খাবার ভাগাভাগি করা থেকে শুরু করে এটা-ওটা নিয়ে খোঁচাখুঁচি, মারামারি কত কী যে মানসপটে ভেসে উঠল, তার ইয়ত্তা নেই। ইরাও হুট করেই কেঁদে ফেলল। দুজনকে এরকম গলায় জড়িয়ে কাঁদতে দেখে বড্ড বিরক্ত হলো পল্লব। ঠাসিয়ে দুটোকে চড় বসাতে পারলে মন্দ হতো না। সে হাত বাড়িয়ে রাত্রির হাত টেনে ধরে এক ঝটকায় ইরার থেকে সরিয়ে আনল। এহেন কাণ্ডে হতভম্ব হয়ে পড়ল রাত্রি। পল্লব চোখ রাঙাতেই কেমন মায়া-মায়া নজরে তাকাল ওর দিকে। এই পর্যায়ে এসে পল্লব নামক মানবটি বোধহয় ভড়কাল। কী করবে, কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে একটা শক্তপোক্ত ঢোক গিলে একটু হলুদ হাতে নিয়ে রাত্রির চোখের পানিতে ভেজা গালটায় ছুঁইয়ে দিল। সেই ফাঁকে পল্লবের অবাধ্য হাতটা একটু অবাধ্য হলো বোধহয়। কোনো অনুমতি ব্যতীত পল্লবের বৃদ্ধাঙ্গুলখানা বিচরণ করল রাত্রির গালে। সুনিপুণ হস্তে মুছে দিল গালে জমা পানিটুকু। মুখে এক অদম্য হাসি ফুটিয়ে বলল— ন্যাকার বাচ্চা! এভাবে কাঁদলে সব মেকআপ তো উঠে যাবে। তখন ছবিগুলো কতটা বাজে আসবে, ভাবতে পারছিস?
রাত্রি এবার হেসে ফেলল।পল্লব এক টুকরো কেক নিয়ে রাত্রির মুখের দিকে এগিয়ে দিতেই রাত্রি হা করল। কিন্তু পল্লব সেটা দিল না। উল্টো ঠোঁটে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে রাত্রির গালের একপাশে লাগিয়ে দিল। ঐ অবস্থাতেই রাগে পল্লবের চুল টেনে ধরল মেয়েটা। পল্লব এবার অন্য গালেও মাখিয়ে দিল। আরও রেগে গেল রাত্রি। দুটোকে থামাতে ইরা এবার রাত্রির হাত টেনে ধরল। তৎক্ষণাৎ ক্যামেরায় বন্দি হলো কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ অমর স্মৃতি। রাত্রি পল্লবের চুল ছেড়ে দিতেই পল্লব এক হাতে চুল ঠিক করে রাত্রির চোখে চোখ রেখে নরম স্বরে বলল— এই হাসিটা যেন সারা জীবন থাকে। তোকে কাঁদতে দেবে না বলে একজন সারাজীবনের জন্য কান্না বেছে নিল। তোর বড্ড সাহস, রাত। তার সামনেই চোখের পানি ঝরাচ্ছিস?
রাত্রি বুঝল না, তাই শুধাল— কে? কার কথা বলছিস?
পল্লব মুচকি হেসে বলল— তোর মায়ের কথা বলছি। ঐ যে দেখ, ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করছেন। আর কাঁদিস না। উনার কষ্ট হচ্ছে, ম্যাবি।
রাত্রি এবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুহাসিনীর দিকে তাকাল। সত্যিই মাম্মা কাঁদছে। রাত্রিকে তাকাতে দেখে সেখান থেকে প্রস্থান নিলেন রমণী। রাত্রি একবার যেতে চাইল, কিন্তু তখনই স্টেজে অরুণের আন্টি আর আঙ্কেল উঠে এলেন। পল্লব আর রাত্রিও সরে পড়ল নীরবে। অর্পনা আরণ্যককে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে সেসব। সে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছুক্ষণ হলো। অরুণদের বাড়ি থেকে যারা এসেছে, সবাইকে বসতে দিয়ে চেয়ার ফাঁকা ছিল না। সব চেয়ার সিঁড়িঘরে রাখা আছে। বসতে হলে সেখান থেকে এনে বসতে হবে। মেহনত করা লাগবে বিধায় চেয়ার না এনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। চোখজোড়া জ্বালা করছে। যদিও সে ইম্যাচিউর নয়, তবুও কেমন কান্না পাচ্ছে। অর্পনা নাক টেনে কান্না দমাল। ওদিকে আবারও নাচের মুহূর্ত শুরু হয়েছে। এই পর্যায়ে বিহান আর মেধা কাপল ড্যান্স করছে। সবার নজর ওদিকেই তাক করা। অর্পনার নজরও সেদিকেই ছিল, কিন্তু আরণ্যকটা দূর থেকে বাবা-মাকে দেখে কাছে যাওয়ার জন্য কেঁদে উঠল। অর্পনা আরণ্যককে নিয়ে স্টেজের পেছনে চলে গেল। তখনই কানে বাজল কারও শিস বাজানোর শব্দ। যেন তাকে উদ্দেশ্য করেই কেউ বাজাচ্ছে। অর্পনা এদিক-ওদিক তাকিয়ে শিস বাজানো লোকটাকে খুঁজল। তখনই কানে এলো—
— এই যে! এই যে সুন্দরী! এদিকে!
,,অর্পনা চোখ ছোট ছোট করে বখাটেদের মতো টিজ করতে থাকা লোকটার দিকে তাকালো। কত বড় বদমাশ, ভাবা যায়? তার মতো এক বাচ্চার মাকে কিনা এভাবে টিজ করছে! সেই সঙ্গে কোলে এখনো একটা বাচ্চা রয়েছে। মানছি বাচ্চাটা তার নয়, কিন্তু ফোলা পেটটাও কি নজরে আসছে না? অর্পনা হন্তদন্ত পায়ে লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। লোকটার দিকে তর্জনী আঙুল তাক করে বলল—
— এই যে! আপনি আমাকে উত্ত্যক্ত করছেন? আপনার তো সাহস কম না! আপনি আমার স্বামীকে চেনেন? পোড়া বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পিসপিস করে কেটে এসিডে চুবিয়ে একদম সমুদ্রের পানিতে ভাসিয়ে দেবে।
লোকটা কেমন বিদ্রূপের হাসি হাসল— তাই নাকি, সুন্দরী? তো কোথায় আপনার সেই সুপুরুষ স্বামী? বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সেই কখন থেকে। পায়ে ব্যথা হচ্ছে না? আপনার স্বামীকে বলুন বসার ব্যবস্থা করে দিতে। নয়তো আমার উরুর ওপর এসে বসতে পারেন। আমি বড্ড আরাম বোধ করব।
অর্পনা আরণ্যককে অন্য পাশের কোলে নিয়ে নাক সিটকে বললো— আপনি অত্যন্ত অসভ্য প্রকৃতির মানুষ। আপনার কাছে যাওয়া মানে নিজেকে হারানো।
লোকটা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। ডান হাতটা বাড়িয়ে বলল— আজকে আর হরণ করব না। আসো, এখানে এসে বসো।
বলেই হাঁটুর অংশটা দেখাল। অর্পনা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দুপা পিছিয়ে গেল।— একদম না। কী বলেন এসব! সবার সামনে আমি আপনার কোলে বসলে লোকে নানান কথা বলবে।
,,দ্বীপ একটু ঝুঁকে অর্পনার হাত টেনে কাছে আনল। সে প্লাস্টিকের চেয়ারের ওপর বসে আছে। দুপা দুদিকে ছড়িয়ে অর্পনাকে টেনে এক পায়ের ওপর বসিয়ে দিল। এক হাতে অর্পনার কোমর জড়িয়ে আরণ্যককে অন্য হাঁটুতে বসিয়ে অন্য হাতে আরন্যককে জড়িয়ে রাখল।
দূরে খাবার প্যাক করতে থাকা লোকগুলো আড়চোখে তাকাতেই দ্বীপ চোখ রাঙাল। চোখ নামিয়ে যে যার কাজে মত্ত হলো। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদেরও একই হাল। দ্বীপের কিছু একটা মনে আসতেই সে অর্পনার উদ্দেশে বলল— প্যান্টের পকেটে হাত দাও তো। যা আছে বের করে আনো।
অর্পনা বাধ্য মেয়ের মতো দ্বীপের প্যান্টের পকেটে হাত দিল। চকলেট দেখে কিছুটা খুশি হলো। দুটো নিয়ে একটা ছিঁড়ে আরণ্যকের হাতে দিল। এটা মিল্কের তৈরি, কোনো সাইড ইফেক্ট নেই। অর্পনা রাখল চকলেট ফ্লেভারেরটা। ছিঁড়ে মুখে পুরতে নিয়েও পুরল না। দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল — রাত করে খেলে যদি বদনজর পড়ে? আমি খাব না।
দ্বীপ অল্প একটু ঝুঁকে অর্পনার গালে ছোট করে চুমু দিয়ে বলল— এবার আর লাগবে না। খাও।
দ্বীপের কাণ্ডে অর্পনার মুখে অটোমেটিক হাসি ফুটল। ঠোঁটে হাসি রেখেই চকলেট খুলে মুখে পুরল। আরণ্যক দ্বীপের পেটে হেলান দিয়ে চকলেট খাচ্ছে। ইতিমধ্যে মুখের আশপাশে ভরিয়ে ফেলেছে ছেলেটা। অর্পনা ওড়নার আঁচল টেনে মুখটা মুছিয়ে দিয়ে দ্বীপের কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিল। দ্বীপ অর্পনার কোমরখানা আরেকটু শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে শুধাল—
— এভাবে বিয়ে করার শখ ছিল তোমার?
অর্পনা ঘাড় বাঁকিয়ে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে বলল— আমার তো বিয়ে করারই কথা ছিল না আবার এসব।
— কখনোই বিয়ে নিয়ে ভাবোনি?
— সময় পেয়েছি নাকি? পাগল-টাগল হয়ে গিয়ে,,
অর্পনার কথা সম্পূর্ণ করার আগেই থামিয়ে দিল দ্বীপ।— বুঝেছি, আর বলতে হবে না। খাও।
,,, অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইলো, দ্বীপ আবারও ঝুকে কপালে চুমু খেলো, সুধালো– বিরিয়ানি খাবে?
,,, অর্পনা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — আপনার গালে একটা চুমু খাই?
,,, দ্বীপ যেনো অবাক বনে গেলো,, বহুদিন অর্পনা নিজ থেকে ওকে স্পর্শ করেনা। সে যখন অসুস্থ ছিলো তখন অর্পনাকে খুব মারতো,, অর্পনা সেসব সহ্য করেও দ্বীপকে ভালোবাসতো, আদর করতো। সব কথা দ্বীপের মনে নেই তবে বিহান তার খুব বড়ো একটা উপকার করেছে। বিহান যদি সিসি টিভি ক্যামেরা সেট না করতো তাহলে জানতেই পারতো না এই মেয়েটা তাকে কি পরিমান এফোর্ট দিয়েছে। অর্পনার দেওয়া সেই আট মাসের যত্নের কাছে দ্বীপের এটুকু যত্ন আর ভালোবাসা কিছুই না। দ্বীপ আবারও অর্পনার কপালে চুমু আকলো পরপর গাল এগিয়ে দিলো অর্পনার দিকে। অর্পনা সেখানে ছোট করে চুমু খেলো পরপর আরন্যকের গালে চুমু খেলো। আরন্যক ছোট ছোট হাতে অর্পনার নাক খামচে ধরলো, তখনি অর্পনার পেটে থাকা দ্বীপের ফটোকপি লাত্থি বসালো ভিতর থেকে। অর্পনা দ্বীপের হাত টেনে পেটের মাঝখানে রাখলো। দ্বীপ কেমন স্থির হয়ে গেলো পরক্ষনেই আবারও চুমু খেলো অর্পনার কপালে, এই পর্যায়ে আরন্যক ও ভাগ পেলো তার বড়ো আব্বুর আদরের।
,,, নব্বইয়ের দশকের সময়ে কিছু কিছু এলাকায় গায়ে হলুদের রাতে হলুদ ছোঁয়ানোর পর বউকে গোসল করানো হতো, যা আধুনিক যুগে খুব একটা হয় না। অথচ রাত্রি খুঁজে খুঁজে সেই রিচুয়্যালটাই বের করল।আগে বউকে সম্পূর্ণ গোসল করানো হলেও রাত্রির বেলায় এমনটা হবে না। শুধু ভিডিও করার খাতিরে প্যান্ডেল থেকে কেউ একজন ওকে কোলে করে নিয়ে দূরে আল্পনার মাঝখানে রাখা পিড়িতে দাঁড় করিয়ে দেবে, আর কয়েকজন মহিলা মিলে রাত্রির মাথায় এক কলস পানি ঢালবে। এরপর শেষ। আপাতত আর কোনো ভিডিও কিংবা ফটোশুট করা হবে না। যা করার, আবার কাল করা হবে।রাত্রিকে কোলে নেওয়ার কথা উঠতেই সবাই দ্বীপের দিকে তাকাল, কারণ এই কাজগুলো দুলাভাইরাই করে। হিসেবমাফিক রাত্রির দুলাভাই তো দ্বীপ। অগত্যা দ্বীপকেই কোলে নিতে হবে।
সবাইকে এভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল মানব। চকিতে তাকাল অর্পনার দিকে। অর্পনা কিছু একটা বলতে নেবে, তার আগেই দ্বীপ অর্পনার দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—
— একদম আমাকে এসবে টানবে না। তুমি ব্যতীত অন্য কাউকে কোলে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।
মুখ বাঁকাল অর্পনা, তবে কিছু বলল না। একদিক থেকে মনে কিছুটা শান্তির হাওয়া বইছে। লোকটা তার প্রতি বড্ড একরোখা যে, তাই। দ্বীপের মুখভঙ্গি দেখে কেউ আর বলার সাহস করল না। এবার সবাই বিহানের দিকে তাকাল। বিহান সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে মেধার চুল ঠিক করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে বাপু মহা ব্যস্ত মানুষ। বউ ছাড়া অন্য কোথাও তাকানোর সময় নেই তার। যেখানে ছেলেটাকেও সারাক্ষণ অর্পনার কাছে দিয়ে রেখেছে, সেখানে সম্পর্কে বিয়ানকে কোলে নেওয়ার কথা উঠানোও বিলাসিতা। বিহানের হাবভাব দেখে সবাই যা বোঝার বুঝে গেল।
কাউকে রাজি হতে না দেখে মুখখানা মলিন করে নিল রাত্রি। তখনই চারতলায় ভাড়া থাকা ব্যাচেলর ছেলেটা এগিয়ে এলো। ছেলেটা ব্যাংকার। পাঁচতলাতেই জব করে। রাত্রিকে দেখার পর আরশাদ জামানের নিকট বহুবার বিয়ের প্রস্তাব রেখেছে। অরুণের সঙ্গে বিয়ে ঠিক না হলে হয়তো এই ছেলের কপালেই থাকত রাত্রি।
ছেলেটা বেশ সুদর্শন। সেই ছেলেকে এগিয়ে আসতে দেখে কেমন উসখুস করে উঠল রাত্রি। না চাইতেও অসহায় নেত্রে পল্লবের দিকে তাকাল। পল্লব এতক্ষণ ওর দিকেই তাকিয়ে ছিল। ছেলেটা এগিয়ে এসে রাত্রিকে কোলে নিতে চাইলে থামিয়ে দিল পল্লব। এগিয়ে এসে চট করেই কোলে তুলে নিল রাত্রিকে।রাত্রির ঠোঁটে অজান্তেই হাসির রেখা ফুটে উঠল। উৎফুল্ল নেত্রে ক্যামেরার দিকে তাকাল। তৎক্ষণাৎ ফটোশুট হলো কয়েকটা। ধীরে ধীরে রাত্রিকে নিয়ে আল্পনার দিকে এগিয়ে গেল পল্লব।সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে “” আমার বিয়ের লগন এলো রে,, আমার বিয়ের লগন এলো রে””
রাত ১টা ৩৭ মিনিট।
টানা চার ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার পর সবাই এবার ক্লান্ত ভঙ্গিতে গা ছেড়ে দিল। একেকজনের ঘুমে ঢুলুঢুলু অবস্থা। অগত্যা আসর ছেড়ে যে যার মতো নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরের দিকে চলে গেল।রয়ে গেল রাত্রি আর অনাহিতা। রাত্রিরও বেশ ঘুম পেয়েছে, তাই সে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেই পিছু ডাকল অনাহিতা। নরম স্বরে বলল— আমার সঙ্গে একটু আমাদের জন্য ঠিক করা ঘরটাতে যাবে?
রাত্রি মাথা ঝাঁকাল। হাই তুলতে তুলতে এগিয়ে গেল অনাহিতার পিছু পিছু। এই ঘরটাতে সব মেয়েদের একসঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে, আবার অনেকে এখনো সজাগ। ওপর-নিচ সবখানে বিছানা পাতানো থাকার দরুন রাত্রি আর এগোল না। সে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইল।কিছুক্ষণের মাঝেই অনাহিতা একটা নীল শাড়ি নিয়ে বের হলো। রাত্রির সামনে এসে খুব ছোট আকারের, তবে মোটা একটা ডায়েরি শাড়ির ভাঁজ থেকে বের করল। রাত্রি কেমন উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হয়তো বুঝতে চাইছে অনাহিতা আপু কী করতে চাচ্ছে।রাত্রির তাকিয়ে থাকার মাঝেই ডায়েরিটা ওর দিকে এগিয়ে দিল অনাহিতা। ফের নরম স্বরে আওড়াল—
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৫ (২)
— আজ রাতে এটা একটু সময় নিয়ে পড়তে পারবে? প্লিজ। খুব বেশি না, ৩৭ টা কাগজ মাত্র।
রাত্রি কেমন দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ডায়েরিটা নিল।
অনাহিতা আপুকে তার কাছে কেমন যেন রহস্যময় লাগছে। মনে হচ্ছে মনের মাঝে কিছু একটা চাপিয়ে রেখে তার সামনে খুশি থাকার ভান করছে। অনাহিতা এবার শাড়িটাও এগিয়ে দিল। নেওয়ার আগে রাত্রি ভ্রু কুঁচকে শুধাল— এই শাড়িটা কেন দিচ্ছো?
অনাহিতা মুচকি হেসে বলল—
— আমার তরফ থেকে। কাল সকালে পরো।
