Home শ্রাবণ ধারা শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৭

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৭

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৭
অনামিকা তাহসিন রোজা

কথায় আছে, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। আর এই প্রবাদবাক্যের উপর দৃঢ় বিশ্বাস রেখে সামিউল শেখ আরাম করে বসে বসে গরম চায়ে সিপ দিতে ব্যস্ত। চোখের সামনে টেলিভিশনে প্রিয় নিউজ চ্যানেল চলছে। দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ব্যবসা সব নিয়ে তিনি গভীর মনোযোগী হওয়ার অভিনয় করছেন, যদিও বাস্তবে তিনি চায়ের সাথে বিস্কুটের সঠিক অনুপাত বজায় রাখার জটিল গবেষণায় ব্যস্ত। এক হাতে দু’খানা বিস্কুট ও আরেক হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। জীবনের মহা শান্তির এক সময় পার করছেন ভদ্রলোক। অবশ্য হবেই বা না কেন? তাঁর অতি ভদ্র ছেলে সাতদিন ধরে বাড়িতে ছিল না এবং একজন বাবা হিসেবে তিনি চিন্তাও করেন নি। কারন তিনি উপলব্ধি করলেন হতচ্ছাড়াটা বাড়িতে না থাকলে বেশ শান্তি শান্তি লাগে।
সত্যি বলতে সামিউল শেখ এই সাতদিনে একটা জিনিস নতুন করে আবিষ্কার করেছেন, সংসারে শান্তি নামক বস্তু বাস্তবেই আছে। আর সেই শান্তির প্রধান শর্ত হলো, তার একমাত্র পুত্র যেন সাময়িকভাবে অদৃশ্য থাকে। তাই ভদ্রলোক এই মুহূর্তে দিব্যি আরাম করে বসে আছেন।

কিন্তু হুট করে চা খাওয়ার মত এত সুন্দর একটা সময়েও ছায়া পড়ল সামনে। সামিউল শেখ ভ্রু কুঁচকালেন। চোখ তুললেন। তারপর চশমাটা একটু নাকের ডগায় নামিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটা মানবাকৃতি পর্যবেক্ষণ করলেন। একটা ল্যাম্পপোস্টের মত দাঁড়িয়ে তার ছেলে শ্রাবণ। চোখ বসে গেছে, চুল উস্কোখুস্কো, দাড়ি, মুখ শুকনা। দেখে মনে হচ্ছে সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের উপর গবেষণা করতে করতে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে। পাশে জিহান। আর একটু দূরে নীল, যে ইতোমধ্যেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছে এবং দেয়ালের সাথে নিজেকে এমনভাবে মিলিয়ে ফেলেছে যেন সে আদৌ এখানে আসেনি।
সামিউল শেখ বিস্কুটে কামড় দিলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন,
—”আরে? তুমি?”
ছেলেকে উপস্থিত হতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন তিনি। কি আশ্চর্য! খালি হাতে ফিরে এলো কেন? হতভাগা খুঁজে পায়নি তাহলে? পাওয়ার কথাও না। সামিউল শেখ খুব ভালো করে জানেন শ্রাবণ কোনোভাবেই ধারাকে খুঁজে পাবে না। তিনি এটাও জানেন আহাম্মকটা পুরো বনানী খুঁজলেও তাদের ফ্লাটে যাবে না। শ্রাবণ কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। সামিউল শেখ আরো একবার দেখলেন। তারপর কাপ নামিয়ে বললেন,

—” খালি হাতে?”
শ্রাবণ নীরব রইল। সামিউল শেখ মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—” আফসোস। আমি ভেবেছিলাম অন্তত সাতদিন পর মানুষ হয়ে ফিরবে।”
শ্রাবণ নড়ল না। জিহান কাশি দিল। নীল আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেল। যেকোনো সময় রান্নাঘর থেকে বটিটা এনে তাড়া করতে পারে তার ভাইজান। তেমনটা হলে দৌঁড়ানোর প্রস্তুতি নিয়ে থাকা ভালো।
সামিউল শেখ এবার গম্ভীর মুখে আবার চায়ে সিপ দিলেন,
—” তা বলো, এবার কী উদ্দেশ্যে আগমন?”
কেউ কিছু বলল না। সামিউল শেখ তাকিয়ে রইলেন। তারপর চোখ সরু করলেন।
—” কী ব্যাপার? এমন দাঁড়িয়ে আছো কেন? বিদ্যুতের বিল দিতে এসেছো নাকি?”
শ্রাবণ এবারও চুপ করে শুধু তাকিয়ে রইল। ছেলের এমন দৃষ্টি দেখে ভদ্রলোকের সন্দেহ হলো। তিনি ধীরে কাপ নামিয়ে বললেন,

—” এই যে হতচ্ছাড়া, তুমি আমার দিকে এমন তাকিয়ে আছো কেন?”
শ্রাবণ এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। থামল। দাঁড়িয়ে রইল। সামিউল শেখ ভ্রু তুললেন।
—” কী?”
শ্রাবণ অনেকক্ষণ পর খুব শান্ত গলায় বলল,
—” বাবা…”
সামিউল শেখ সঙ্গে সঙ্গে আড়চোখে সালমা বেগমের দিকে তাকালেন, যিনি রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে উদ্বিগ্ন মুখে সব দেখছেন। তারপর সন্দেহভরা গলায় বললেন,
—” কী দরকার? বলো।”
শ্রাবণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
—” আমি ধারার কাছে যেতে চাই।”
ড্রয়িংরুম নীরব। চায়ের কাপটা সামিউল শেখের হাতে থেমে গেল। তিনি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন। তারপর ধীরে ধীরে কাপটা টেবিলে রাখলেন। চশমা খুললেন। নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন,
—” তো যাও, তোমায় আটকে রেখেছে কে? আমি কি তোমার পায়ে রশি পেঁচিয়ে রেখেছি?”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল,

—” আবার কোথায় পাঠিয়েছো ওকে? বলো ও কোথায়?”
সামিউল শেখ চোখ তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
—” কেন?”
ভ্রু কুঁচকাল শ্রাবণ,
—” কেন মানে?”
চোখ পিটপিট করে সামিউল শেখ বললেন,
—” তুমি ওকে খুঁজে পেলে না কেন আশ্চর্য। ও তো বনানীতে ছিল।”
—” আমি কীভাবে জানব তুমি এত বড় কারসাজি করেছো। ওই ফ্লাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে ছিল। কোনো মানুষ ওখানে থাকবে এটা কীভাবে জানতাম?”
সামিউল শেখ নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারো বিস্কুটে কাঁমড় দিয়ে বললেন,
—” সেটা তোর সমস্যা বাপ। আমি তো আর মেয়েটাকে মঙ্গল গ্রহে পাঠাইনি। বাসা থেকে বের করে নিয়ে শুধু অন্য বাসাতে রেখে এসেছি। চোখের সামনেই ছিল, তুই যদি না পাস তো সেটা কি আমার দোষ! ধুর ছাই বিস্কুটটা চায়ের ভেতরে পড়ে গেল। ও শ্রাবণের মা? আরো দু’খানা বিস্কুট দাও তো। আল্লাহ তোমার ছেলের মঙ্গল করবে। বলো আমিন।”
নীল সুরেলা কন্ঠে জবাব দিলো,

—” আমিন আমিন।”
শ্রাবণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলতেই আবারো মিইয়ে গেল ছেলেটা। অন্য দিকে তাকানোর ভান করে মাথা চুলকোতে শুরু করল। এদিকে ধারাকে স্বয়ং সামিউল শেখ লুকিয়ে রেখেছিল শুনে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া সালমা বেগম কোনোমতে বিস্কুট আনতে আবারো রান্নাঘরে গেলেন। দুই মিনিটের মধ্যে বিস্কুটের প্যাকেট এনে টেবিলে রাখলেন। সামিউল শেখ শ্রাবণকে পাত্তা না দিয়ে আবারো বিস্কুট খাওয়া শুরু করলেন।
শ্রাবণ এবারে আর সহ্য করতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা সাতদিনের ক্লান্তি, ভয়, অপমান, অনুতাপ সবকিছু যেন একসাথে গলায় এসে আটকে গেল। সবকিছু ভুলে বড় করে শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল সে। তারপর ধীরে চোখ খুলে বাবার দিকে তাকিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলতে থাকল,
—” ইনাফ! ইটস ইনাফ বাবা। অনেক হয়েছে। তুমি জানো আমি সাতদিন কী করেছি? তোমার কী মনে হয় আমি বসে বসে নাটক করেছি? আমি পুরো শহর খুঁজেছি বাবা। রাস্তা রাস্তা ঘুরেছি। প্রতিটা মোড়ে থেমেছি। বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন, হাসপাতাল, দোকান, ফুটপাত, যেখানে মনে হয়েছে ও থাকতে পারে, গিয়েছি। গাড়িতে ঘুমিয়েছি। পানি খেয়ে থেকেছি। দুদিন ফোন বন্ধ করে খুঁজেছি। আমি… আমি বুঝতেই পারিনি কখন আমি মানুষ খোঁজা বন্ধ করে নিজের প্রাণ খোঁজা শুরু করেছি। তোমার কী মনে হয় আমি বসে ছিলাম? ”
নীল আর জিহান চুপ হয়ে গেল। শ্রাবণ থামল না। কপালে আঙুল ঘষে বলল,

—” আমি জানতাম না একটা মানুষ না থাকলে এমন লাগে। জানতাম না বাড়ি ফাঁকা হয়ে যেতে পারে। জানতাম না কেউ খেয়েছে কিনা না জেনেও মাথা ব্যাথা হয়। আমি ওকে কখনো বুঝিনি বাবা। ও কথা বললে বিরক্ত হয়েছি। অপেক্ষা করলে অবহেলা করেছি। ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভেবেছি। আর ও… ও তবুও এতদিন চাতক পাখির মত আশা বেঁধে ছিল।”
শ্রাবণ শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে হাসল,
—” জানো? এখন বুঝি। এখন বুঝি কেন ও বারবার এসে জিজ্ঞেস করত আমি খেয়েছি কিনা। কেন রাত জেগে বসে থাকত। কেন আমার রাগ সহ্য করত। কারণ ও ভালোবাসত।”
ঘরে পিনপতন নীরবতা। শ্রাবণ হাত মুঠো করল,

—” আর আমি দেরি করে ফেলেছি। আমি জানি না আমি ভালো স্বামী হতে পারব কিনা। আমি জানি না ও আমাকে ক্ষমা করবে কিনা। আমি এটাও জানি না ও আমাকে আর মানুষ হিসেবে সম্মান করে কিনা। কিন্তু আমি এটা জানি…আমি ওকে ছাড়া আর পারছি না। আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
সালমা বেগমের চোখ ভিজে উঠল। খুশিতে ঠোঁট চেপে হাসলেন তিনি। শ্রাবণ দাঁত চেপে আবার বলল,
—” আমি শিক্ষা পেয়েছি বাবা। খুব বাজেভাবে পেয়েছি। তুমি যা চেয়েছিলে হয়েছে। আমি আর ওকে বদলাতে চাই না। ও যেমন, তেমনই থাকুক। রাগ করুক। আমার সাথে কথা না বলুক। আলাদা রুমে থাকুক। আমার দিকে না তাকাক। আমি কিছু বলব না। শুধু বাড়িতে থাকুক। আমার চোখের সামনে থাকুক।”
জিহান গলা খাঁকারি দিয়ে নীলের কর্মকাণ্ড দেখতে থাকল। ছেলেটা মুখ উঁচিয়ে শ্রাবণের মুখ দেখার চেষ্টা করছে। কেননা সে তার ভাইজানের হতাশ মুখখানা দেখতে ইচ্ছুক। জিহান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে নীলের মাথায় গাট্টা মেরে পাশে এনে দাঁড় করাল।
শ্রাবণ মাথা নিচু করে ভাঙা কন্ঠে বলল,

—” প্লিজ বাবা। বলো, ও কোথায়? ”
সামিউল শেখ একবার আড়ালে ঘড়ির দিকে তাকালেন। আবারো বিস্কুট মুখে পুড়ে মনে করতে লাগলেন ধারাকে ক’টার সময় ট্রেনের টিকেট কেটে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ঠিকঠাক মনে করতে পারলেন না। এদিকে সামিউল শেখের নির্বিকারতা দেখে শ্রাবন অবশেষে মাথা উঁচু করে জোর গলায় বলল,
—” আমি ধারাকে ভালোবাসি বাবা।”
সালমা বেগম হাসতে গিয়েও হাসলেন না। সামিউল শেখ চোখ সরু করলেন। শ্রাবণ এবার তার চোখে চোখ রেখেই বলল,
—” আমি আমার বউকে চাই। তাড়াতাড়ি বলো কোথায় ও? আমি ওকে নিয়ে আসব। দ্রুত বলো বাবা প্লিজ। আমি আর কখনো তোমার কাছে কিছু চাইবো না। আমার সংসার নিয়ে টানাটানি করো না। তাড়াতাড়ি বলো ও কোথায়?”
সামিউল শেখ আধখাওয়া বিস্কুটটা হাতে নিয়েই স্থির হয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে চায়ের কাপ নামালেন। চশমাটা খুললেন। একবার ছেলের দিকে তাকালেন। আরেকবার সালমা বেগমের দিকে তাকালেন। আবার তাকালেন শ্রাবণের দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটল। বললেন,

—” ঠিক আছে। বিশ্বাস করলাম।”
আর কিছু বললেন না। শুধু হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা আরেকটা বিস্কুট তুলে মুখে দিলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন,
—” সালমা, ছেলেটার জ্বর এসেছে নাকি দেখো তো। সাতদিন না ঘুমালে মানুষ কী কী বলে ফেলতে পারে তার লাইভ উদাহরণ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
নীল মুখ চেপে উল্টো দিকে ঘুরে গেল। তার ঠোঁট ও দাঁত তার সাথে প্রতারনা করেছে। যেকোনো সময়ে সে অট্টহাসি দিতে পারে। জিহান মাথা নিচু করে কাঁধ কাঁপাচ্ছে। এবার তারও হাসি পাচ্ছে আর সামিউল শেখ? তিনি ভেতরে ভেতরে সন্তুষ্ট হলেও মুখে একফোঁটা প্রকাশ না করে শুধু বললেন,
—” তা ভালোবাসো যখন, প্রমাণ দাও। মুখে বললে হবে?”

শ্রাবণ এবারে সত্যি সত্যি শীতল চোখে তাকাল।সেই দৃষ্টি দেখে সামিউল শেখ ভেতরে ভেতরে হালকা সন্তুষ্ট হলেন। বাপ হয়ে ছেলেকে চিনবেন না এমনটা হতে পারে না। ছেলে যতই মায়ের মতো চেহারা পাক, রাগটা কিন্তু একশো ভাগ বাবার। আর এই মুহূর্তে ছেলেটার চোখে যে জেদ দেখছেন, সেটা তিনি খুব ভালো করেই চেনেন।তাই আর কথা বাড়ালেন না তিনি। আরেকবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” সাড়ে এগারোটায় ট্রেন ছেড়ে দেবে। ট্রেনে ওঠার আগেই যদি ফিরিয়ে আনতে পারো তো যাও।”
শ্রাবণের চোখের পাতা কেঁপে উঠল। কথাটা মাথায় ঢুকতে দুই সেকেন্ড সময় লাগল যেন। তারপর চোখ চকচক করে উঠল। যেন সাতদিন পর কেউ মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে পানি দেখিয়েছে। জিহান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নীল প্রথমে বুঝতেই পারল না। তারপর চোখ বড় বড় করে বলল,
—” ওয়েট ওয়েট ওয়েট, তাহলে ট্রেন স্টেশনে?”
কেউ উত্তর দিল না। শ্রাবণ স্থির দাঁড়িয়ে আছে৷ সামিউল শেখ ভ্রু তুললেন,
—” কী হলো?”
কেউ নড়ল না। তিনি এবার বিরক্ত হলেন,

—” আরে যাও! আমি কি ট্রেন ধরে রাখব নাকি?”
কথা শেষ হতে না হতেই শ্রাবণ হাত তুলে ঘড়ি দেখল। এখন এগারোটা বাজতে পনেরো মিনিট বাকি। যেতে তো আধঘন্টারও বেশি সময় লাগবে। তার বুক ধক করে উঠল। এক ঘন্টাও সময় নেই হাতে। দ্রুত যেতে হবে। একপা দুপা করে পেছাতে পেছাতে রীতিমতো ছুটে বেরোতে থাকল। সালমা বেগম ডাকলেন, শ্রাবণ থামল না। জুতোও পুরো ঠিকমতো পরল না। দরজা খুলে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল। পেছন থেকে নীলও দৌড় দিল,
—” ভাইজান! আমারে ফেলে যেও না। আমি রোমান্টিক দৃশ্য লাইভ দেখতে চাই..
জিহান কলার ধরে ঝাঁকুনি দিল,
—” চুপ শয়তান! মে’রে বালিচাপা দিয়ে দেবে তোকে। দ্রুত চল।”
নীল অপমানিত মুখে বলল,
—” আমি সাপোর্ট সিস্টেম জিহান ভাই।”
—” তুই সর্বনাশ সিস্টেম!”
তিনজনই বেরিয়ে গেল। গাড়ির সামনে এসে নীল আবার বলল,
—” ভাইজান, একটা কথা। যদি ভাবি রাগ করে থাপ্পড় দেয়, আগে বলে দিও। আমি পাশে দাঁড়াব না। আমি নিরপেক্ষ।”
শ্রাবণ গাড়ির দরজা খুলতে খুলতে প্রথমবার তাকাল তার দিকে। খুব শান্ত গলায় বলল

—” নীল?”
—” জ্বি?”
শ্রাবণ আঙুল তুলে শক্ত কন্ঠে সতর্কবাণী দিল
—” খবরদার তুই আমার বউয়ের দিকে তাকাবি না। ওর থেকে দুরে থাকবি ননসেন্স। ওর সাথে কথা বললে তোকে খু/ন করে আমি লা”শ ট্রেনে তুলে গ্রামে পাঠিয়ে দেব।”
নীল বাধ্যের মত মাথা নাড়ল। হাসি আটকাতে মুখ চেপে পিছনের সিটে উঠে বসল। জিহান উঠে বসে সিটবেল্ট বাঁধল। ইঞ্জিন স্টার্ট হলো। গাড়ি গর্জে উঠল।ম। আর শেখ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সামিউল শেখ দুই হাত গুটিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
—” এদিকে না হয় সবকিছু ক্লিয়ার হলো। কিন্তু ওদিকে কীভাবে কী যে হবে। বেচারি ধারা আবার হার্ট অ্যাটাক করে কিনা।”
সালমা বেগম পেছন থেকে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন,

—” সে কি! কেন?”
—” ধারা তো আর জানে না ওকে আমি লোক-দেখানি টিকেট কেটে দিয়েছি। ও যে যেতে পারবেনা সেটা নিজেই জানে না ও। আমি ধারাকে বুঝিয়ে বলেছি, শ্রাবণ একটা বেয়াদব। তুমি গ্রামে চলে যাও। আমি কয়েকদিন পর কিছু একটা করব। শ্রাবণকে উচিত শিক্ষা দিয়ে তোমায় ফিরিয়ে আনব। কিন্তু প্লানটা ঠিকমত এগোলো না। এখন ওরা ঠিক সময়ে না পৌঁছালে মেয়েটা যদি সত্যি সত্যি ট্রেনে উঠে পড়ে, তাহলে তো বিপদ। আর…
—” আর?”
—” হুট করে ধারা খুব জেদি হয়েছে। সেদিন আমাকে বলল, ‘আপনার ছেলে যদি ডিভোর্স লেটার পাঠাতে চায়, গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েন বাবা।’
অবাক হলেন সালমা বেগম,
—” কীহ? ধারা ডিভোর্সের কথা বলেছে?”
—” হুম। মনে মনে সব আশা ছেড়ে দিয়েছে। ওকে এত সহজে মানানো যাবে বলে মনে হয়না। তোমার ছেলেকে আরো বেগ পোহাতে হতে পারে।”
সালমা বেগম হতবাক হয়ে মুখ বাঁকালেন,

—” যত্তসব আজব কারবার করেছো তুমি! কি দরকার ছিল এমন করার। ধারার কানে তুমিই বিষ ঢেলেছো তাহলে। তোমাদের বাপ-ছেলের জেদ আর বাচ্চামো কোনোদিনও কমবে না। ধুর!”
বলেই ভদ্রমহিলা বিরক্ত হয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন।
সামিউল শেখও দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে ঢুকতে চাইলেন। কিন্তু হুট করে তার মনে পড়ে গেল, তিনি তো শ্রাবণকে ট্রেনের সময় ভুল বলেছেন। আয়হায়! ট্রেন তো সাড়ে এগারোটায় না. বরং… এ কি সর্বনাশ! দ্রুত সামিউল শেখ হাঁক ছুঁড়লেন
—” গিন্নি! কই গো গিন্নি? তৈরী হয়ে নাও তো। চলো আমরাও যাব। তোমার ছেলে একা পারবে না। একটা ভুল হয়ে গেছে! ”

কথায় বলে, মানুষ যখন সত্যি কাউকে হারানোর ভয় পায়, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সে কয়েকদিনেই পেয়ে যায়। কিন্তু একটা জিনিস বাস্তব। উপলব্ধি আর সুযোগ কখনো একসাথে আসে না। বেশিরভাগ সময় মানুষ বুঝে তখন, যখন মানুষটা চলে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গুছিয়ে ফেলে। আজ শ্রাবণেরও তাই হয়েছে। সাতদিন ধরে সে একটা জিনিস শিখেছে, ভালোবাসা মানে কাউকে ধরে রাখা না, কিন্তু হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনাটাও মানুষ সহ্য করতে পারে না। আর আজ তার হাতে সময় আছে, কিন্তু খুব সামান্য। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না, আর ট্রেনও না।
গাড়িটা প্রায় উড়ে চলেছে। রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট গুলো একটার পর একটা পিছিয়ে যাচ্ছে। নীল সামনে ঝুঁকে বারবার ঘড়ি দেখছে। জিহান ফোনে সময় দেখছে। শ্রাবণ কিছু বলছে না। তার দুই হাত স্টিয়ারিংয়ে। কিন্তু হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। রাতের রাস্তা ফাঁকা হলেও পুরোপুরি নয়। দুয়েকটা সিগন্যাল, কয়েকটা বাস, কিছু ট্রাক -সবকিছুই আজ তার কাছে শত্রু মনে হচ্ছে। একবার একটা সিগন্যালে গাড়ি থামতেই শ্রাবণ স্টিয়ারিংয়ে ঘুষি মারল।

—” ধুর!”
নীল চুপ করে বসে থাকল। কিছু বললে গালে সপাটে চড় পড়বে। জিহানও কিছু বলল না। এটা সেই শ্রাবণ না, যে হারলে রেগে যেত। এটা সেই মানুষ যে ভয় পাচ্ছে। অবশেষে শত চেষ্টা করে ত্রিশ মিনিটের একটু আগে গাড়ি ঢুকল স্টেশনের সামনে। সময়, এগারোটা ছাব্বিশ। আর চার মিনিট আছে? শিট! তিনজন প্রায় একসাথে নেমে পড়ল। স্টেশনের সামনে বিশৃঙ্খল একটা পৃথিবী। কোথাও চায়ের দোকান, কোথাও কুলি মাল তুলছে, কোথাও বাচ্চা কাঁদছে। কেউ বিদায় দিচ্ছে। কেউ এসে জড়িয়ে ধরছে। কেউ ফোনে চিৎকার করছে। মাইকের ভাঙা আওয়াজ কানে ভেসে আসল,
– যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে।
শ্রাবণ শুনল না। সে সরাসরি দৌড় দিল। প্ল্যাটফর্ম এক। সে হাঁপাতে হাঁপাতে সামনে এগোল। জিহান অন্য দিকে আর নীল উল্টো দিকে ছুটল। সবাই যে যার মত করে এই ভিড়ের মাঝে ধারাকে খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একবার শ্রাবণ থামল। চারপাশে তাকাল। না। নেই। বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। আর তখনই, মাইকে ঘোষণা ভেসে এলো,
” যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, আন্তঃনগর ট্রেনটি পাঁচ মিনিটের মধ্যে প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে।”

শ্রাবণের বুক ধক করে উঠল। পাঁচ মিনিট। শুধু পাঁচ মিনিট। সে আবার দৌড়াল। এবার আরো সামনে মানুষ সরিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ সে থেমে গেল। শরীর জমে গেল। অনেক দূরে প্ল্যাটফর্মের প্রায় শেষ দিকে ধারাকে দেখতে পেল শ্রাবণ। তার পাশে একটা মাঝারি ব্যাগ রাখা। মেয়েটা প্ল্যাটফর্মের কিনারার কাছে দাঁড়িয়ে। চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে। মাথা সামান্য নিচু। স্থির, চুপচাপ, একদম একা। দূরত্ব অনেক। মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
তবুও, শ্রাবণ চিনে ফেলল। কারণ কিছু মানুষকে মুখ দেখে না, অনুভূতি দিয়ে চেনা যায়। তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সে আর কোনো কিছুই পরোয়া করল না। পুরোদমে ছুটতে শুরু করে।
রীতিমতো জানপ্রাণ লাগিয়ে ছুটে ধারার নিকট এসে থামল শ্রাবণ। দু-হাত দিয়ে হাঁটুতে ভর করে মাথা নিচু করে ক্লান্তিতে হাঁপাতে লাগল সে। ধারা অদূরে তাকিয়ে ছিল। পাশে কেও এসেছে বুঝে আস্তেধীরে চোখ তুলে তাকাল। শ্রাবণও হাঁপাতে হাঁপাতে চোখ তুলে তাকাল ধারার দিকে। দৃষ্টি মিলল। একজনের বুকে শান্তি মিললেও ধারা তটস্থ হলো। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে চোখ বুঁজে বিরক্তির শ্বাস ফেলল। পাশে রাখা ব্যাগটা তুলে নিয়ে আবারো অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করতে চাইল। কিন্তু শ্রাবণ দ্রুত ধারার ব্যাগটা ধরে ফেলল।
ধারা পেছনে না তাকিয়ে ব্যাগের হাতলটা আরো শক্ত করে ধরল, ঠান্ডা কন্ঠে বলল,

—” ব্যাগ ছাড়ুন।”
শ্রাবণ কিছু বলল না। হাঁপাচ্ছে এখনো। সাতদিনের ক্লান্তি, আধঘন্টার দৌড়, বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় সব মিলে মনে হচ্ছে বুকটা ফেটে যাবে। অথচ আশ্চর্য, মেয়েটাকে সামনে দেখার পর প্রথমবার তার মনে হলো সে বোধহয় এখনো বেঁচে আছে। সে ব্যাগ ছাড়ল না। ধারা এবারও তার দিকে তাকাল না। শান্ত, ঠান্ডা গলায় বলল,
—” আমি কিন্তু পুলিশ ডাকব। চেঁচাতে বাধ্য করবেন না। ব্যাগ ছাড়ুন বলছি।”
শ্রাবণ পাত্তা দিল না হুমকিতে। শুকনো গলায় বলল,
—” বাড়ি চলো।”
ধারা এবারে পিছু ঘুরে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ব্যাগটা টেনে নিল। শ্রাবণ চমকে গেল ধারার এমন ব্যবহারে। চোখে ঘৃণা অবজ্ঞা অবহেলা স্পষ্ট দেখতে পেল সে। সাথে সাথে শ্রাবণ শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” আমার দিকে এভাবে তাকিও না।”
ধারা আরো বেশি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

—” তাকাতেই চাইনি আপনার দিকে।”
এই স্বরটাই বেশি ভয়ংকর। শ্রাবণের বুকটা ধক করে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
—” আমাকে একটু সময় দাও। কথা শোনো। একটু শোনো।”
ধারা এবার ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো আবেগ নেই। অদ্ভুত শান্ত ও অদ্ভুত দূরত্ব।
—” আমার কোনো কথা নেই। পথ ছাড়ুন।”
শ্রাবণ থেমে গেল। এই কথাটা সে আগে শুনেছে। সেদিন দরজার সামনে। কিন্তু আজ কেন যেন কথাটা অনেক বেশি বাস্তব লাগছে। ধারা আবার ব্যাগটা নিজের দিকে টান দিল। উল্টো ঘুরে চলে যাবে বুঝতেই শ্রাবণ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে অনাকাঙ্ক্ষিত কাজটা করেই বসল। দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসে ধারাকে জড়িয়ে ধরল সে৷ ধারার কোঁমড় দুহাতে চেপে রীতিমতো হাউমাউ করে কেঁদেই উঠল,

—” এমন কোরো না ধারা। দোহাই তোমার। আর কষ্ট দিও না প্লিজ। এমন করে তাকিও না, এভাবে কথা বলো না আমার সাথে। আমি তোমার কন্ঠে, তোমার চোখে নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা দেখে আর নিতে পারছি না। বুক ফেটে যাচ্ছে আমার। নিজেকে কীভাবে শাস্তি দিলে তুমি শান্তি পাবে বলো! তুমি যা বলবে তা-ই করব প্রমিজ। একটাবার কথা বলার সুযোগ দাও। আমাকে অনুভূতি প্রকাশ করার সুযোগটা দাও ধারা। অনেক ঋন জমে গেছে বিশ্বাস করো। অন্তত যে ভালোবাসা দিয়েছো, তার অর্ধেকটুুকু দেয়ার সুযোগটা দাও। এমন করে ফেলে রেখে যেও না। প্লিজ ধারা, প্লিজ।”
শ্রাবণের হঠাৎ এই কান্ডে ধারা আহাম্মক বনে গেল। সে জমে গেল রীতিমতো। ভাবতেও পারেনি এমন কিছু হবে। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল অনেকে এদিকে তাকাচ্ছে। ধারার বুক কাঁপল। যা-ই হোক না কেন, নিজের স্বামীকে জনসম্মুখে অপমান করতে চায়না সে। সে নিজের কোঁমড় থেকে শ্রাবণের হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে চাপা কন্ঠে বলল,

—” কী করছেন এসব? উঠে দাঁড়ান। ছাড়ুন। মানুষজন দেখছে। উঠুন বলছি। ছাড়ুন আমায়।”
শ্রাবণ আরো বেশি চেপে ধরে মাথা দুদিকে নেড়ে বলল,
—” না। ছাড়ব না। আগে প্রমিজ করো আমার কথা শুনবে। আমার আগের লক্ষ্মী ধারার মত চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার কথা শুনবে কথা দাও। নইলে ছাড়ব না তোমায়। ছেড়ে দিলেই তো চলে যাবে, মুখ ফিরিয়ে নেবে।”
ধারার অস্বস্তি হচ্ছে। সে এই শ্রাবণকে চেনে না। প্রিয় মানুষটার এমন অবস্থা দেখলে যে কারোরই বুক কেঁপে উঠবে। উল্টো কান্না পেল মেয়েটার। তবে কাঁদা যাবে না। খুব কাঁদিয়েছে এই লোকটা। সেসব তো ভুলে যাবেনা সে। ধারা আবারো শ্রাবণের বাহু শক্ত করে ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করল,
—” আমি বলে শুধু মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি শেখ সাহেব। আমার জায়গায় অন্য কেও থাকলে অনেক আগেই ছেড়ে চলে যেত।”
শ্রাবণ চোখ বুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উল্টো আরো চেপে ধরে বলল,

—” এজন্য তোমার জায়গায় অন্য কেও নেই। সবাই তো তুমি হবে না। সবাই তো এই হতভাগা শ্রাবণকে ভালোবাসবে না।”
ধারা শুকনো ঢোক গিলে এবারে বিরক্তির ভঙ্গিতে জোরজবরদস্তি করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল আর শ্রাবণকে দাঁড় করাল,
—” কে ভালোবাসে আপনাকে? কে বলেছে আমি ভালোবাসি? ভালোবাসি না আমি। কখনোই বাসিনা। এখন প্লিজ আমার সময় নষ্ট করবেন না। চলে যান। নিজেও শান্তিতে থাকুন, আমাকেও শান্তি দিন।”
শ্রাবণ দুর্বল চিত্তে তাকিয়ে রইল। তার এলোমেলো অবস্থা, অদ্ভুত ক্লান্তি দেখে ধারা সর্বোচ্চ কঠিন মুখভঙ্গি করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। প্লাটফর্মে ঝুলতে থাকা বড় ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল,
—” তিন মিনিট আছে। যা বলার দ্রুত বলুন। এরপর চলে যান।”
শ্রাবণ শুকনো ঢোক গিলে ভেজা চোখ মুছল। নিজেকে শক্ত করে শার্টের কলার ঠিক করল। অনেক সাহস নিয়ে বলল,

—” আমি ভালোবাসি তোমায়।”
তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাল না ধারা। সেভাবেই না তাকিয়ে হেসে জবাব দিল,
—” এই বাজে মিথ্যে দিয়ে শুরু না করলেও পারতেন।”
শ্রাবণ দুদিকে মাথা নাড়াল, ধীর স্বরে বলতে শুরু করল,
—” না। মিথ্যে বলছি না। আমার চোখের দিকে তাকাও। আমার বুকে হাত রাখো। একবার তাকিয়ে দেখো। মিথ্যে বলছি না আমি। সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়। তুমিই তো বাধ্য করলে। তুমিই তো মে’রে ফেললে আমায়।”
ধারা ফিক করে হাসল। তাচ্ছিল্যের সেই হাসি নিয়ে বিষাদ সুরে বলল,

—” রাস্তার কুকুরের মত পিছু পিছু ঘুরেছি। বারবার একটুখানি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য হাজারো অপমান সহ্য করেছি। যখন নিজের সবকিছু ভুলে গিয়ে আপনাকে পাগলের মত চেয়েছি, তখন আপনি দেখেন নি। যখন আমি নেই, যখন আমি চলে গেলাম, তখন আপনি আমায় ভালোবেসেছেন? এই চরম মিথ্যেটা কীভাবে মানা যায়? আমার অনুপস্থিতিতে কীভাবে আমায় ভালোবাসলেন? নাকি আমার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন?”
শ্রাবণ ধারার কথা ও হাসির ভেতরের তীব্র ক্ষতটা স্পষ্ট দেখতে পেল। সে এক পা এগিয়ে গেল ধারার দিকে। তার চোখ বেয়ে আবার অশ্রু নেমে এলো, কিন্তু এবার সে চোখ মুছল না। ধারাকে খুব কাছ থেকে দেখে ভাঙা, কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল,

—” হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছ ধারা, আমার মতো অহংকারী আর অন্ধ মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তোমার এই অনুপস্থিতিরই দরকার ছিল। কিন্তু এটাকে শুধু ‘প্রয়োজনীয়তা’ বলে ছোট কোরো না, দোহাই তোমার! এটা বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি। তুমি জানতে চেয়েছ না, এই আমি কীভাবে তোমাকে ভালোবাসলাম? তুমি বিশ্বাস করো, তুমি হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমি উপলব্ধি করেছিলাম। সেদিন রাতে তোমায় সবকিছু বলার জন্য বাড়িতে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম আজ আর কোনোকিছু চাপা রাখবনা। ক্ষমা চাইবো। সব ঠিক করে নেব। কিন্তু আমার ভাগ্য খারাপ। আমি বাড়িতে এসে দেখি তুমি নেই। ইতোমধ্যে চলে গেছো। ঠিক তখনই ঘরের চারদিকের দেয়ালগুলো আমাকে গিলতে আসল।

সাতটা দিন আমি এক ফোঁটা ঘুমাইনি ধারা। যখনই চোখ বন্ধ করতে গিয়েছি, তখনই চোখের সামনে ভেসে উঠেছে তোমার সেই জলভরা চোখ দুটো, যা আমি প্রতিদিন অবহেলা করেছি। আমি খেতে পারিনি, কারণ আমার কানে তখন বাজত তোমার সেই চিরচেনা প্রশ্নটা- ‘ আপনি খেয়েছেন? খাবার আনব?’ যে প্রশ্নে আমি প্রতিদিন বিরক্ত হতাম, সেই প্রশ্নটা শোনার জন্য এই সাতদিন আমি ভিক্ষুকের মতো ছটফট করেছি। রাস্তায় যখন গাড়ি নিয়ে পাগলের মতো ঘুরেছি, প্রতিটা ট্রাফিক সিগন্যালে, প্রতিটা অচেনা মেয়ের অবয়বে আমি শুধু তোমাকেই খুঁজেছি। যখনই কোনো মেয়েকে দেখতাম চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, আমার বুকটা ধক করে উঠত, এই বুঝি আমার ধারা! আমি কখনো জানতাম না ধারা, একটা মানুষের না থাকা এতটা ভয়ংকর হতে পারে। তুমি আমার জীবনে অক্সিজেনের মতো ছিলে, যা এতকাল আমি নিজ থেকে পেয়েছি বলে কোনোদিন তার মূল্য বুঝিনি। আর যখন তুমি বাতাসটুকু কেড়ে নিলে, আমি দম আটকে ম’রে যাওয়ার উপক্রম হলাম। তুমি বলেছ না, তুমি রাস্তার কুকুরের মতো আমার পেছনে ঘুরেছ? বিশ্বাস করো, আমি যদি পারতাম নিজের বুকটা চিরে তোমাকে দেখাতাম, এই সাতদিনে আমি প্রতিটা সেকেন্ড নিজের অহংকারকে লাথি মেরেছি, নিজের অতীতকে ঘৃণা করেছি। তুমি আমাকে ভালোবাসতে, আর আমি সেটাকে আমার অধিকার ভেবে অহংকার করেছি। আমি ভেবেছিলাম শ্রাবণ শেখকে ছেড়ে যাওয়ার সাধ্য কারও নেই। কিন্তু তুমি যখন সত্যিই চলে গেলে, তখন বুঝলাম শ্রাবণ শেখ আসলে একটা খড়কুটো ছাড়া আর কিছুই নয়। তুমি ছিলে বলেই এই উন্মাদের একটা পরিচয় ছিল।

আমি তোমাকে ভালোবেসেছি তোমার এই চলে যাওয়ার জেদ দেখে নয় ধারা। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি সেই শূন্যতার মাঝে, যেখানে তুমি ছাড়া আর কোনো পৃথিবীর অস্তিত্ব নেই। আজ যদি তুমি আমাকে ক্ষমা না করো, আমি এই প্ল্যাটফর্মেই ম’রে যাব, তবুও তোমাকে ছাড়া ওই শূন্য বাড়িতে আমি আর এক কদমও ফিরব না। আমি তোমাকে বদলাতে চাই না, আমি কিচ্ছু চাই না। শুধু আমার চোখের সামনে থাকো। আমায় শাস্তি দিতে চাও তো? বাড়িতে শাস্তি দিও। সারাজীবনের জন্য এই আমিকে তোমার নামে কুরবান করে দেব। আমাকে একটুখানি ভালোবাসার সুযোগ দাও, যে ঋণের পাহাড়ে আমি ডুবে আছি, তা শোধ করার একটা সুযোগ অন্তত আমায় দাও…।”

কথাগুলো বলতে বলতে শ্রাবণ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। তার দুই হাঁটু ভেঙে এলো। সে ধারার দুই হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ধারা যেই দৃঢ় মনোভাব নিয়ে এসেছিল, তা বাহ্যিকভাবে থাকলেও চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ল। সে চায়নি শ্রাবণ শেখকে শাস্তি দিতে। সে তো শ্রাবণের হাসি দেখতে পছন্দ করে, তাকে খুশি রাখতে পছন্দ করে। সবসময় কি আর ভালোবাসা দুদিক দিয়ে হয়? এক তরফা ভালোবাসলে কি ভালোবাসা হয়না? ধারা তো ভেবেছিল তার ভালোবাসা এক তরফাতেই সুন্দর। যেই মানুষটাকে সে ভালোবাসে, তার চোখের পানি কীভাবে সহ্য করা যায়, জানা নেই ধারার। ধারা আকুল দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে অস্থির হয়ে ভেঙে পড়া শ্রাবণকে দেখল। এই শ্রাবণকে চেনে না সে। তবুও যেন আবারো প্রেমে পড়ল। আবারো হেরে গেল। আবারো নিজেকে তুচ্ছ করে দিল। এ কি অন্যায়? আসলেই শ্রাবণের চোখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু বুঝে ফেলল সে। এও বুঝল এখন যদি সে নিজের ভেতরে চেপে রাখা অনুভূতি গুলো প্রকাশ করে তাহলে এখন দুজনেই কান্নাকাটি জুড়ে দিতে পারে। অবিশ্বাস্য!
নীল ও জিহান অনেকক্ষণ আগেই এসে দাঁড়িয়েছে। লুকিয়ে কিছুটা দুর থেকে তারাও দেখল পুরো দৃশ্যটা। জিহান ভেজা চোখে হাসল। নীলও তৃপ্তির শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল,

—” জিহান ভাই, ভাইজান কাঁদতেও জানে?”
জিহান মুখ কুঁচকে তাকাল,
—” তোর ভাইজান রোবট না। মানুষ। কাঁদতে জানবে না কেন।”
ধারা শুকনো ঢোক গিলে অন্যদিকে তাকিয়ে চোখের পানি মুছলো। যথাসম্ভব শক্ত কন্ঠে বলল,
—” হয়েছে আপনার কথা? এবার চলে যান।”
শ্রাবণ ভাঙা কন্ঠে বলল,
—” এভাবে কথা বোলো না ধারা। তোমায় এভাবে মানায় না। আমি আমার ধারাকে ফেরত চাই।”
—” আপনি কথা বলার সময় চেয়েছেন। দিয়েছি। এবার প্লিজ চলে যান। আর কথা বাড়াবেন না।”
শ্রাবণ চোখ মুছে বলল,
—” কী করলে তোমার রাগ ভাঙবে? যা করতে বলবে তাই করব।”
ধারা সরু দৃষ্টিতে তাকাল,
—” এতে কী লাভ হবে?”
ধারার ত্যাড়া কথা শুনে হতাশ হলো শ্রাবণ,

—” তুমি না আমায় ভালোবাসো ধারা। এ কেমন তোমার ঠুনকো ভালোবাসা? আমায় রেখে চলে যেতে যাও কোন সাহসে? একটুও কষ্ট হচ্ছে না? একটুও মায়া লাগে না? ভালোবাসলে কি আসলেই ছেড়ে চলে যাওয়া যায়? তুমি কীভাবে পারছো? আমি তো পারব না। আমি পারবনা তোমাকে ছাড়া থাকতে। হয় তুমি আমায় এখানে খু!ন করে রেখে যাও, আর নইলে আমায় শাস্তি দিয়ে বাড়ি ফিরে চলো। তবে যেতে হলে আমার লা’শের উপর দিয়ে যেতে হবে তোমায়।”
ধারা শ্রাবণের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” এতদিন তো আপনি আমার লা’শের উপর দিয়েই বেঁচে ছিলেন। জিন্দা লা’শ হয়ে ছিলাম, মনে নেই?”
শ্রাবণ মাথা নিচু করল। তার কিছু করার নেই। সে কী করবে? আসলেই কি শুধু ক্ষমা চেয়ে সবকিছু ঠিক করা সম্ভব? আসলেই কি ধারা এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? কীভাবে একটা মানুষ এতটা বদলে যেতে পারে? শ্রাবণ হতাশ ভঙ্গিতে চোখ বুঁজল। মনে মনে ভেবেই নিল ধারা যদি সত্যি সত্যি তাকে এখন ছেড়ে চলে যায়, সে এখানেই আত্মহ”ত্যা করবে। নেহাতই ছেলেমানুষী চিন্তাভাবনা। কিন্তু এই মুহুর্তে তার মাথায় কিছুই আসছে না। শুধু একটা কথাই তার মাথায় ঘুরছে, ধারাকে চাই।
শ্রাবণ নির্লজ্জ হলো। আবার আকুতিভরা বলল,

—” যেও না ধারা। এভাবে আমায় খু’ন করে তুমি যেও না। দোহাই তোমার, একটাবার সুযোগ দাও। আর কখনো তোমায় কষ্ট দেব না। সত্যি! আর কখনো কষ্ট দেব না তোমায়। তুমি না হয় শাস্তি হিসেবে আমায় সারাজীবন কষ্ট দিও। কিন্তু আমার কাছে থাকো। আমার বুকে মাথা রেখে পিঠে ছু’রি চালিয়ে দিও। তবুও কাছে থাকো। যেও না। এভাবে এত বাজেভাবে আমায় তোমার মায়ায় জড়িয়ে এখন তুমি ছলনা করতে পারোনা। এ অন্যায়! আমি নিতে পারছিনা। ম’রে যাব আমি। পায়ে ধরি তোমার, আমায় ছেড়ে যেও না।”
শ্রাবণ সত্যি সত্যি হেলে গিয়ে ধারার পা ধরতে চাইল। ধারা ছিটকে সরে শ্রাবণের বাহু ধরে সরিয়ে দিল। চোখে মুখে আঁতকে ওঠাটা স্পষ্ট হলেও সে কিছু বলল না। বড় চোখে শুধু শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে রইলো। ছি ছি! এটা তো নেয়া যাবে না। এটা অন্যায়।

এ কেমন ভালোবাসা? এ কেমন আকুতি? কতটা ভয় পেলে, কতটা কষ্ট পেলে শেষে কিনা পা ধরতেও দ্বিধাবোধ করছে না? ধারা তো নিজেই পারতো না এ কাজ করতে। ধারার মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে। সে ভাবল শ্রাবণকে কিছু বলবে, কিন্তু তখুনি ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৬

ধারা তটস্থ হয়ে দেখল ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকে গেছে এবং এও খেয়াল করল শ্রাবণ আঁতকে উঠেছে। ধারার দিকে তটস্থ নয়নে আকুল আবেদন নীরবে প্রকাশ করছে। ধারা স্থির দৃষ্টিতে ট্রেনের প্রবেশ করা দেখল। এরপর শ্রাবণের দিকে তাকাল। শ্রাবণ ভয়ার্ত ও আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। আস্তেধীরে হাত বাড়িয়ে লুকিয়ে দুই আঙুল দিয়ে বাচ্চাদের মত ধারার ওড়নার এক কোণ চেপে ধরল। অস্ফুটস্বরে বলল,
—” যেও না।”

শ্রাবণ ধারা পর্ব ২৭ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here