Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৮

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৮

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৮
জাবিন ফোরকান

হাতের ভেতর ছুরিখানা এখনো শক্তভাবে পাকড়াও করে রেখেছে মীরা। ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে তীব্র ঘৃণা এবং বিতৃষ্ণায়। ইচ্ছা করছে কিছু একটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। অথচ নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখেছে সে। ভুলের সময় পেরিয়ে এসেছে, আর নতুন করে কোনো আঘাত নয়।
বেশ খানিকটা দূরে মেঝেতে আসুন করে বসে আছে আয়দান। মীরা তাকে বসার জন্য চেয়ার অবধি সাধেনি। একদম দরজার লাইন ঘেঁষে বসে আছে ছেলেটা। ভেতরে অবধি ঢোকায়নি। হাট করে খোলা দরজা। মীরা চিৎকার করলেই বিল্ডিংয়ের মানুষজন শুনতে পাবে এমন অবস্থা নিশ্চিত করে তবেই এই জন্তুটাকে স্থান দিয়েছে।
আয়দান একদম চুপ করে বসে আছে। তার সুদর্শন তরুণ মুখটা কেমন যেন ভেঙে এসেছে মনে হলো। চোখজোড়া উন্মত্ত। অবয়বে যত্নের অভাব। মাথার চারপাশে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সাবিনের সঙ্গে ছেলেটা নিজেও কম বিপদে পড়েনি মীরা জানে।
অবশেষে অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙলো আয়দান। নিজের কোলের দিকে চেয়েই বলে উঠলো,

“আমি জানি, এখন এসব বলার হয়ত কোনো অর্থ হয়না, তবুও বলছি। আমি দুঃখিত, মীরা।”
মীরার ভীষণ হাসি পেয়ে গেলো। ছু*রির হাতলে আরো শক্তভাবে চেপে বসলো তার হাতের আঙ্গুল। বিষয়টা খেয়াল করলো আয়দান।
“তুমি আমাকে যা শাস্তি দিতে চাও, দিতে পারো। আমি সবকিছু মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। প্রয়োজনে আমাকে মামলা দাও, আমি নিজের সকল দায় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করব। জেল খাটবো। তবুও বলছি, আমাকে মাফ করে দাও।”
ভ্রু উঁচু হলো মীরার। সে কিঞ্চিৎ অবাক হলো। এমন অহংকারী এক ছেলে এভাবে নিজের দায় স্বীকার করে নেবে অবলীলায়, সেটি বিস্ময়কর বটে। তবে সেই রাতের দগদগে স্মৃতি তাকে একটুও নরম হতে দিলোনা। বরং, আয়দানের প্রত্যেকটা কথা তার বুকে জ্বলন্ত নিভু নিভু আগ্রাসনের আগুনকে রূপান্তর করলো দাবানলে। বাঁকা এক হাসি ফুটলো রমণীর ঠোঁটে।
“তাই বুঝি? জেল খাটবে তুমি? মজা লাগলো বেশ। আরো বলো। শুনতে ভালো লাগছে। আর কি কি করতে পারো তুমি?”

মুখটা চুপসে এলো আয়দানের। সে বুঝতে পারছে, এই রমণী পাথরে পরিণত হয়েছে। কোনোকিছু দিয়েই তাকে আর ভোলানো সম্ভব না। তাই সে নয়ন তুলে তাকালো। লুকোচুরির দৃষ্টি গিয়ে পড়ল রমণীর টানা হরিণী নেত্রে। থমকে গেলো আয়দানের হৃদস্পন্দন! মোচড় দিয়ে উঠলো ভেতরের সবকিছু। এই নারীকে সে কিভাবে ধোঁকা দিতে পেরেছিল? ওই মায়াবী চোখজোড়া আজও দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়া করে বেড়ায় তাকে রাত বিরাতে।
“মীরা, আমি মজা করছিনা। বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে বিশ্বাস করো! আমার দিকে অমন করে তাকিও না, আমার যন্ত্রণা হয়।”
না পারতে এবার খিলখিল করে হেসে উঠলো মীরা। উবু হয়ে পড়লো তার শরীর হাসির তোড়ে। হাঁটুতে চাপড় দিয়ে সে হাসতে হাসতে দেখলো অসহায় আয়দানকে।
“তুমি তো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোকার, আয়দান! এখানে কি করছ? সার্কাসে যাও, বহু নাম কামাবে।”
“মীরা…”
“উঁহু! কোলাট্যারাল ড্যামেজ!”
কেঁপে উঠলো আয়দান। শব্দজোড়া তার সমস্ত অস্তিত্বে বুঝি হাজারো কাঁটার আঘাত হানলো। মাথা নুইয়ে নিলো সে। তার নত স্বভাব দেখে মীরার বিনোদন উধাও হয়ে হঠাৎ করেই ভর করল আগ্রাসন। কর্কশ গলায় খেঁকিয়ে উঠলো সে,

“তোমার বোধোদয় আর হাতির পাঁচ পা একই! লোলুপ পুরুষেরা কখনো পরিবর্তন হতে পারেনা। আজ ক্ষমা চাইতে চাইতে মরে যাচ্ছ, ঠিক দুইদিন পরেই খোলস পাল্টে আগের রূপ দেখিয়ে দেবে। তোমাদের মতন পুরুষদের জন্য পৃথিবীতে বে*শ্যাগিরি শুরু হয়েছিল। তোমার কত্ত বড় বুকের পাটা আমি শুধু ভাবছি! এতকিছুর পরেও তুমি তোমার জঘণ্য মুখটা নিয়ে এসে আমার সামনে মাফ চাইলেই ভেবেছ আমি তোমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বো? থ্যাংকস টু ইউ, আমি পৃথিবীর আর কোনো পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করিনা!”
কথাগুলো একনাগাড়ে বলে মীরা থামলো। উত্তেজিত হয়ে পড়েছে সে। সামান্য থেমে হাঁপালো খানিক। আয়দান নিঃশব্দে শুনে গেলো। একটুও বাঁধা দিলোনা তাকে। বেশ খানিকটা সময় নীরবে কেটে যাওয়ার পর অবশেষে আয়দান মুখ খুললো। তবে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো।
“ছোটবেলা থেকে অনেক আদর যত্নে মানুষ হয়েছি। কোনোদিন অভাব কি বুঝিনি। মুখ ফুটে চাওয়ার আগেই হাজীর হয়ে গিয়েছে সবকিছু। কেউ কোনোদিন আমার মুখের উপর একটা ধমক অবধি দেয়নি। যেন আমি ছিলাম পৃথিবীর রাজা আর বাকি সবাই আমার ক্রীতদাস।”
নিজের হাঁটু বুকে ঠেকিয়ে বসলো আয়দান। মীরার দিকে আর না তাকিয়ে চেয়ে রইলো সুদূরে। খোলা জানালা বেয়ে বাতাস ঢুকে ঘরের পর্দা এলোমেলো করে দিচ্ছে। মীরা কিঞ্চিৎ কৌতূহল এবং অনেকটা রাগ নিয়ে দেখলো তাকে।
“অথচ আমার বাড়িতেই, আমার পাশেই আরো একটা মানুষ ছিল। পৃথিবীর রাজা তো দূরে থাক, সে আমার বাড়ির একটা ধূলিকণার সম্মান অবধি কোনোদিন পায়নি। অথচ সে নামে ছিল একজন আরেফিন, জায়দান আরেফিন।”

একটু থামলো আয়দান। মনে হলো, তার বুঝি কোথাও একটা কষ্ট হচ্ছে।
“ভাইয়াকে আমি খুব ঘৃণা করতাম, মীরা। কেন করতাম, আমি নিজেও জানিনা। একটা ঘটনা অবশ্য আছে। বান্দরবানে ঘুরতে গিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। হাসপাতালে হাসপাতালে কেটেছে দুইটা বছর। ভাইয়া তখন ছিল, কিন্তু আমায় বাঁচাতে পারেনি। সেই ক্ষোভে আমার মা কেমন যেন হয়ে গেলো। ভাইয়াকে আর সহ্যই করতে পারতোনা। তার ধারণা, সেদিন যা হয়েছে সবকিছু ভাইয়ার দোষ ছিল। আমি তখন এতকিছু বুঝতাম না। ছোটবেলা থেকে মাম্মি আমাকে এটা শিখিয়েই বড় করেছে, যে আমার বড় ভাই একটা মনস্টার!”

মীরা কোনো প্রতিক্রিয়া করলোনা। আয়দানকে থামানোর উদ্যোগও নিলোনা। চুপটি করে বসে রইলো শুধু। শনশন হাওয়া খেলে যাচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আয়দানের কণ্ঠের আর্তনাদ।
“সেই সবকিছু আমার মনের ভেতর আজ অবধি গেঁথে আছে। আমি স্কুলে যেতাম, স্ফূর্তি করতাম, স্বাধীনতা পেতাম, যা ইচ্ছা তাই করতাম। আমাকে বাঁধা দেয়ার কেউ ছিলনা। বন্ধুরা মাঝে মাঝে বলতো, আম্মু দেবে না, আব্বু দেবে না। অথচ আমার মাম্মি কোনোদিন আমাকে রোখেনি। যদি আমি বলতাম মরতে যাচ্ছি, তাও হয়ত কোনোদিন রুখতো না, বলতো, আচ্ছা সাবধানে ফিরে আসিস! আমি আমার মাম্মির চোখের মণি ছিলাম, আর ড্যাডির আদর। কারণ আমার উপর কোনো আঁচ আসলে মাম্মি সহ্য করতে পারতো না। অতিরিক্ত আদরে নাকি ছেলেমেয়ে বাঁদর হয়? যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে আমিই সেই বাঁদর। আমার সবকিছুই ছিল, শুধু একটুখানি শিক্ষা দেয়ার মানুষ ছিলোনা।”

একটি ঢোক গিললো আয়দান। নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে আজ কথাগুলো উচ্চারণ করতে তার বুকে বাঁধছে, অথচ এই রমণী যেন আপন মায়াজালে তাকে বশ করে ফেলেছে। থামতে পারছেনা সে কিছুতেই।
“আমার কাছে সবকিছু স্বাভাবিক ছিল, মীরা! জীবনে যখন প্রথমবার গার্লফ্রেন্ড হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে, তখন নাচতে নাচতে আমি ওই মেয়েকে নিজের বাড়ির রুম অবধি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার মাম্মি দেখেছে, অথচ কিচ্ছু বলেনি। আমি পার্টিতে যেতাম, ড্রাগস নিতাম, বন্ধুদের সাথে স্পিডিং করতাম, নাইট আউটে থাকতাম, বিষয়গুলো আমার পরিবারে ছিল সাধারণ! আরেফিন পরিবার অভিজাত এবং ভদ্র হিসাবেই পরিচিত, অথচ সেখানে পুরুষের কাজের উপর প্রশ্ন তোলার কেউ নেই। আমি কি করছি না করছি একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। পুরুষ মানুষ নাকি তরুণ বয়সে একটু আধটু অমন করেই থাকে! এমন কথা শুনে আমি কিভাবে বুঝতাম যে এসবকিছু আসলে অস্বাভাবিক? আমি আমার বন্ধু বান্ধবদের করতে দেখেছি, নিজেও তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করেছি, কেউ আমাকে রুখতে আসেনি, কেউ জানতে চায়নি আমি কি করি, কোথায় যাই! দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছি, বিদেশী ডিগ্রি নিয়েছি, অথচ কেউ কোনোদিন আমায় ন্যায় অন্যায়ের পাঠ শেখায়নি! আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি, আমার ধনী, প্রভাবশালী পরিবার আমায় বাঁচিয়ে নেবে এটাই আমি মনে প্রাণে জেনেছি আর বিশ্বাস করেছি। তুমি কি বলতে পারো, এর দায় কার মীরা?”

নির্বাক হয়ে রইলো মীরা। আয়দান নিজেই জবাবটা দিলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
“এর দায় আমারই মীরা। আমি হয়ত আমার ব্যবহারের জন্য এক্সকিউজ দিচ্ছি, বাট ডিপ ডাউন, আই নো আই কান্ট এসকেপ রেসপনসিবিলিটি।”
সূক্ষ্ম এক হাসি ফুটলো মীরার ঠোঁটজুড়ে। বললো,
“আমি অবাক না হয়ে পারছিনা এটা ভেবে যে একটা বিষয়ে এসে সত্যিই আমাদের মতামত মিললো। ভিকটিম কার্ড প্লে করে লাভ নেই, আয়দান। তুমি বলছো এক্সকিউজ দিচ্ছ না, অথচ তোমার প্রত্যেকটা কথাই একেকটা এক্সকিউজ। তুমি নিজের আচরণের জন্য তোমার পারিবারিক শিক্ষাকে দায়ী করছো। তোমার পরিবার তোমাকে কোনো শিক্ষা দেয়নি ঠিক, অঢেল স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু কখনো তোমাকে খারাপ সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য করেনি! তুমি নিজেই খারাপ দিকটা বেছে নিয়েছ! এর দায় তোমার!”
আয়দান প্রসারিত দৃষ্টিতে মীরাকে দেখলো। রমণী অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় বসে আছে।
“তুমি নিজের প্রতি সিমপ্যাথি আদায় করতে চাইছ। এদিক দিয়ে দোষ দিচ্ছিনা তোমাকে। মানুষের জাতটাই তো এমন! তোমার অতীতের কথা বলে বলে আমার ব্রেইন ওয়াশ করতে চাইছে তোমার মস্তিষ্ক, অথচ এটা তুমি বুঝতে পারছনা কারণ নিজেকে তোমার সঠিক মনে হচ্ছে। তোমার বাবা মায়ের ব্যর্থতা আছে তোমাকে একজন সুশিক্ষিত মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে, অস্বীকার করা যায়না। তবে একটা কথা বলো তো সত্যি করে, তুমি কি আদও নিজে থেকে কোনোদিন চেষ্টা করেছ? পারিবারিক শিক্ষা হয়ত পাওনি, তবে স্বশিক্ষিত হতে চেয়েছ কি?”

স্তব্ধ আয়দান। ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলেও প্রতিবাদ করতে পারলোনা সে। রমণীর দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলো সে। যেন কথা নয়, মন্ত্রের জাদুতে সে আচ্ছন্ন করে ফেলছে চারপাশ। মীরা সামান্য ঝুঁকে এলো, আয়দানের চোখে চোখ রেখে ব্যক্ত করলো,
“আমি বাইরে যাবো না, তোমার ঘরের ভেতর থেকেই উদাহরণ টানছি। জায়দান আরেফিন, রাইট? তোমার বড় ভাই। তুমি নিজের মুখেই বললে, তোমার ঘরে তার পরিচয় ছিল ‘মনস্টার!’ তোমার ঘৃণা পেয়েছে, তোমার মায়ের ঘৃণা পেয়েছে একেবারে বিনা দোষে। তার তো উচ্ছন্নে যাওয়ার কথা ছিল আয়দান! সে যদি আজ গল্পের মতন ভিলেন হয়ে যেত, তাহলে তাকে কোনো দোষই দেয়া যেতনা। সে চাইলেই বিপথে যেতে পারতো। তোমার মতন ক্লাব, পার্টি, ড্রাগস, বন্ধু বান্ধব, মেয়েতে সুখ খুঁজে নিতে পারত। কেউ কেয়ার করতো না। অথচ সে কি করেছে আয়দান?”

একটু বিরতি দিলো মীরা। তার জোরালো কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো সমস্ত কক্ষজুড়ে।
“সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে! স্বশিক্ষিত করে তুলেছে নিজেকে! পরিবারের আদর, ভালোবাসা, সাপোর্ট না পেয়েও নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছে যে তার নামের সঙ্গে জিনিয়াস তকমা সেঁটে গিয়েছে। পি এইচ করার কয়েক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সে সোজা প্রফেসর হয়েছে। হাজার হাজার তরুণ তার মতন হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তুমি জানো, ঢাকা ভার্সিটিতে কত বড় সেমিনারের আয়োজন করে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল? কত বিশাল সম্মান তাকে দেয়া হয়েছে? তার একটা পাবলিক লেকচারে কত হাজার স্টুডেন্ট অ্যাটেন্ড করে তুমি জানো? বোঝো এসব? বুঝবে কিভাবে? তুমি তো আশ্রয় খুঁজে নিয়েছ অসামাজিকদের কাতারে। অথচ তোমার ভাই এত প্রতিকূলতার মাঝেও সব ছেড়ে নিজের নৈতিকতা, মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরে বেঁচেছে। হি কুড হ্যাভ বিন দ্যা ইভিল, বাট ইট ওয়ায হিজ চয়েয টু বি দ্যা গুড!”
আয়দানের মুখজুরে থমথমে এক ছায়া নেমে এলো। নয়নজোড়া প্রসারিত। যেন সহস্র উপলব্ধি একসঙ্গে তার অস্তিত্বে ভর করেছে।

“এখানেই তোমার আর তোমার ভাইয়ের মাঝে পার্থক্য, আয়দান আরেফিন। ইউ চোয টু বি আ ভিলেন, অ্যান্ড হি চোয টু বি আ হিরো!”
মীরার অন্তিম বাক্যটি শুনে না চাইতেও অন্তর কাঁপলো আয়দানের। ঠিকই তো! তার কাছে তো অনেক উপায় ছিল! সে যা যা করেছে তাতে তার পরিবার কিংবা অসৎ বন্ধুদের দায় কতটুকু? কেউই তো তার সঙ্গে জোরজবরদস্তি করেনি। সে নিজের ইচ্ছায় অমন জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়েছে। কারণ তার ভালো লেগেছিল! এই ভালো লাগার অনুভূতিই তাকে আসক্ত করে ফেলেছিল। অসৎ পথে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেখানে, তার থেকে শতগুণ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা জায়দান কোনোদিন অসৎ চিন্তাটুকু অবধি করেনি। সে তো পারতো! সত্যিই পারতো সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে নিজের মতন করে বাঁচতে। কিন্তু সে তেমনটা করেনি। দিনশেষে সবকিছুই মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ।
মীরা নিস্তব্ধ। মেয়েটা সুদূরে তাকিয়ে আছে। জানালা বেয়ে ধেয়ে আসা বায়ু তার ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। যেন নদীতে ঢেউ উঠেছে। আয়দান অসীম মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে রইলো। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করে উঠলো অনুভূতি। আজ অনেক উপলব্ধি হচ্ছে তার। নতুন করে এক মায়া তাকে গ্রাস করে ফেললো সম্পূর্ণ। অন্তরাত্মা চেঁচিয়ে উঠলো,
—তুই প্রেমে পড়েছিস আয়দান! সত্যিকারের বিশুদ্ধ প্রেম!
চোখ জ্বালা করলো। নিজের কর্মফল এবং পরিণতির কথা ভেবেই কেমন অশ্রুপাত হতে ইচ্ছা করলো। অথচ আয়দান নিজেকে সামলে নিলো। সে নিজে যে পথ বেছে নিয়েছে, সেই পথে চলার ভারটুকু তাকেই গ্রহণ করতে হবে।

মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো আয়দান। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলো মীরার দিকে। তার অগ্রসর পদক্ষেপ খেয়াল করে রমণী মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে উঠলো। ছু*রিটা তুলে ধরলো আক্রমণের ভঙ্গিতে। দৃশ্যটা ব্যথা দিলো আয়দানকে। অসহনীয় ব্যথা! প্রেমের ব্যথা সহ্য করে কিভাবে মানুষ? অবাক হয়ে ভাবলো আয়দান। মেয়েটা তাকে এতটাই অবিশ্বাস করে যে সামান্য কাছাকাছি দাঁড়ানো অবধি সহ্য করতে পারছেনা? অথচ এককালে ওই হরিণী চোখে কতই না আবেগ ছিল তার জন্য! হেলায় হারিয়েছে সবকিছু সে।
মীরার থেকে এক হাত দূরেই থেমে গেলো আয়দান। অতঃপর তাকে হতবাক করে দিয়ে মেঝেতে এক হাঁটু গেড়ে উবু হলো। কিছুক্ষণ আগেই যেখানে মীরার পা দুটো রাখা ছিল, মেঝের সেই স্থানে নিজের হাত ছুঁয়ে ঝুঁকলো সে। সরাসরি স্পর্শ না করা সত্ত্বেও ওই ছোঁয়ার শিহরণ স্পষ্ট টের পেলো মীরা।
“আমি ছুঁয়ে দিলে তুমি অপবিত্র হয়ে যাবে। তবুও বুঝে নিও আমার অবস্থান তোমার পদতলে। ক্ষমা করো এই অধমকে, ভিক্ষা দাও নিজের মহানুভবতা। তোমার ক্ষমার আশায় আমি আমার সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে প্রস্তুত, হে সম্মানিত নারী!”

মস্তিষ্কে বুঝি বিদ্যুৎ খেলে গেলো। মীরার হাত থেকে ছুরি ঝনঝন করে শব্দ তুলে মেঝেতে পরে গেলো। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে, আয়দানের নত মুখে অশ্রুজল। অথচ ছেলেটা তার দিকে আর তাকালো না, উঠে পড়লো চটপট। দ্রুত চলে গেলো দরজার কাছে। তবে শেষ মুহূর্তে কি যেন ভেবে থমকে গেলো। মাথা কাত করে পিছনে ঘুরে তাকালো। তবে মীরার মুখের দিকে তাকানোর সাহস হলোনা, যেন অধিকার হারিয়েছে সে।
“এতদিন মনে করতাম এক অপ্রয়োজনীয় বস্তুকে নষ্ট করতে চাইছি। অথচ আজ বুঝলাম, বস্তু নয় সে, শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসার মতন পবিত্র নূর সে। হয়ত তুমি আমায় কোনোদিন মাফ করবেনা, অথচ আজ তুমি আমায় যে উপলব্ধি উপহার দিলে, তা পুনর্জন্ম সত্যি ধরলে ১০ বার জন্মগ্রহণ করেও অর্জন সম্ভব না।”
“কি উপলব্ধি করেছ তুমি?”

মৃদু গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লো মীরা। আয়দান মোলায়েম হাসলো। ওই হাসির মাঝে কোনো অশুভ লক্ষণ নেই। আছে শুধুই স্নিগ্ধতা। অবশেষে মীরার চোখে চোখে তাকানোর সাহস করে সে উচ্চারণ করলো,
“দ্যাট দেয়ার্স নাথিং গ্লোরিফায়িং অ্যাবাউট বিইং আ ভিলেন জাস্ট বিকজ ইউ ডিড নট হ্যাভ আ চয়েয। বিইং আ হিরো ওর আ ভিলেন, ইয অলওয়েয ইওর চয়েয!”
একটুখানি থামলো আয়দান। অতঃপর ঘোষণা করলো,
“ভিলেনকে গ্লোরিফাই করার কিছু নেই। যদি ভিলেন শখের রমণীর জন্য গোটা পৃথিবী উৎসর্গ করতে পারে, তবে হিরো শখের রমণীর জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে দ্বিধান্বিত হয়না!”
আর দাঁড়ালোনা আয়দান। চলে গেলো। দরজাটা বাতাসের ঝাঁপটায় সশব্দে বাড়ি খেয়ে লক হয়ে গেলো। স্থির চেয়ে রইলো মীরা আয়দানের চলে যাওয়ার পথের দিকে।

“মিসির? তুমি তোমার গাড়ি এনেছ?”
আমার প্রশ্ন শুনে চমকে গেলো মিসির। কিছুক্ষণ আগেই হাসপাতালে আমাকে দেখতে এসেছে সে। হঠাৎ করে এমন প্রশ্নে যারপরনাই অবাক বান্দা। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে সে উত্তর করলো,
“হ্যাঁ। কেন?”
তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম। দ্রুত তাকালাম ঘড়ির দিকে। মীরা একটা ব্যাগ গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছে আমায়। সেখান থেকে নিজের একটা জামা এবং হুডি বের করে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মিসির তখনো আহাম্মকের মতন বসে আছে। আমি বেরিয়ে এসেই ব্যস্ত গলায় বললাম,
“তোমার গাড়ির চাবিটা দাও, জলদি।”
“অ্যাহ? কি সমস্যা সাবিন? বাইরের পোশাক পড়েছ কেন? তুমি অসুস্থ। হাসপাতাল ছেড়ে…”
“ঠিক ধরেছ। আমি হাসপাতাল থেকে বাইরে যাচ্ছি। ডক্টর চেকআপের জন্য আসবে নয়টা বাজে। ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ খেয়াল করবেনা। এবার দাও, গাড়ির চাবিটা দাও।”

“মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে তোমার? কোথায় যাবে? উত্তর ছাড়া আমি চাবি দেবো না!”
মিসির গর্জে উঠতে চাইছিল। তবে আমার মতন নাছোড়বান্দার সঙ্গে সে পারবে ভেবেছে? খানিকটা ধস্তাধস্তি করেই গাড়ির চাবি আদায় করে ছাঁড়লাম আমি। মিসির শঙ্কা নিয়ে আমাকে পাকড়াও করতে চাইলো,
“সাবিন! এভাবে পাগলামি করোনা! আমি জায়দানকে কল করছি এক্ষুণি। প্লীজ!”
“তোমার অসহ্যকর বন্ধুটা আমার কাঁচকলা করবে!”
বলেই মিসির প্রতিক্রিয়া করার আগেই দ্রুত কেবিনের বাইরে চলে এলাম। মিসির নিশ্চিত অনুসরণ করবে। সেটা বুঝেই উপস্থিত বুদ্ধিতে খট করে দরজ লক করে দিলাম। ভাগ্যিস আশেপাশে কোনো নার্স নেই! সিসিটিভি দেখে আসার আগেই সরে পড়া জরুরী।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। পিছনে মিসিরের দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ কানে এলেও আর শুনলাম না। দ্রুত হেঁটে বেরিয়ে এলাম বাইরে। স্বাভাবিক পোশাক পরে থাকায় কেউ তেমন সন্দেহই করলোনা। পার্কিং লটে মিসিরের গাড়িটা খুঁজে চেপে বসলাম। কেবিন থেকে বেরোনোর মিনিটের মাথায় আমার গাড়ি নেমে এলো সড়কে।

বিশেষ কোনো গন্তব্যে যাচ্ছি আমি? উঁহু! আমার নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই আজ। হয়ত মিসিরকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বললে সে আমায় না করতো না। তবে এত বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যাবে কে? তাছাড়া স্যাভেজ সাবিন সবকিছুই তেড়ছাভাবে করতে পছন্দ করে। আমি আজ মূলত এমন হঠাৎ সিদ্ধান্তে জোরপূর্বক বাইরে এসেছি স্পিডিং করতে।
ড্যাড থাকতে আমার বিশেষ এক বাতিক ছিল। মানুষ কোনোকিছু ভাবতে হলে বা সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজন পড়লে চুপচাপ হয়ে যায়, ঘরে নিজেকে বন্দী করে ফেলে একমনে ভাবে। অথচ আমি ছিলাম সম্পূর্ণ উল্টো স্বভাবের। রগচটা এবং অহংকারী কিনা! আমার কিছু ভাবতে হলে আমি ওভারস্পিডে নিজের ল্যাম্বরগিনি ছুটিয়ে চলতাম রাস্তায় রাস্তায়। গতি, দ্রুততা আমায় দিত শান্তি। ভয়ানক সব বাঁক কাটলে শরীরে কেমন উত্তেজনা ভর করতো, জানালা বেয়ে আসা তীব্র বাতাসের ঝাঁপটা আমার তপ্ত মস্তিষ্ককে প্রশান্তিতে ছেয়ে ফেলত। অতঃপর নিজে থেকেই আসত অমোঘ সিদ্ধান্ত।

—সাবিন তোর এটা করা উচিৎ! সাবিন, তোর এটা করা উচিৎ না!
ড্যাড যখন আমার সঙ্গে জায়দানের বিয়ের প্রস্তাব রেখেছিলেন, তখন রাজী হওয়ার সিদ্ধান্তটা আমি এভাবেই নিয়েছিলাম। বিয়ে করব, নিজের মায়ের দেখা পাবো। সবকিছু আমি ভেবেছিলাম নিজের গাড়িকে হিংস্র জন্তুর মতন ছুটিয়ে ছুটিয়ে। হয়ত এই গতি আমার কমফোর্ট জোন। তাই বছর পেরিয়ে আমি আরো একবার একই পদ্ধতি বেছে নিয়েছি। সিদ্ধান্তটা আমার এক্ষুণি নেয়া জরুরী। কারণ বুকের ভেতর কষ্টের ভার আমি আর বইতে পারছিনা।
ক্রমশ গাড়ির স্পিড বাড়াতে থাকলাম। সড়ক ছেড়ে নির্জন এক পথে এসে পড়লাম। দুপাশে শুধুই গাছপালা, অদূরে সড়কের ওপাশে কিছু কারখানার উপস্থিতি। কোনো মানুষজন নেই। যেন হঠাৎ করেই শহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি। নির্জনতা আমায় পেয়ে বসলো। গতি আরো বাড়ালাম আমি। স্টিয়ারিংয়ে চেপে বসলো আমার হাত। অন্য হাত গিয়ারে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সামনের দিকে আবদ্ধ। একটা ভাবনা সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে।
—জায়দানকে নিয়ে আমার কি করা উচিত?

ঠিক যেমন করে প্রাক্তন আমায় বারংবার ফিরিয়ে দিয়েছে, প্রতিশোধ তুলতে আমিও তেমন করেই তাকে ঠেলে দেবো? সেক্ষেত্রে আমার আর তার মাঝে পার্থক্য থাকলো কোথায়? ভালোবাসার মর্ম রইলো কোথায়? কিন্তু তাই বলে কি আমি তার বাহুডোরে নির্লজ্জের মতন ছুটে যাবো? আমার অহংবোধ? আমার আত্মমর্যাদা? আমার সম্মান? ওই পরিবারের সঙ্গে আরও একটাবার তুমুল যুদ্ধ লড়তে পারবো কি? সম্ভব হবে আদও আমার দ্বারা?
সমাপ্তির ওপাড়ে মিলন আদও সম্ভব?
সত্তর কিলোমিটার গতিতে ছুটিয়ে যাচ্ছি গাড়ি। শনশন করে সবকিছু পেরিয়ে যাচ্ছে আশেপাশে। মাথায় কোনোকিছু নেই শুধুমাত্র দ্রুততা ছাড়া। মনে শুধুমাত্র ওই একটি প্রশ্নের তোলপাড়।

ভয়ানক সব বাঁক কাটিয়ে যখন এগোলাম, তখন একেবারে হঠাৎ করেই মেঘের ভেতর থেকে চমকে ওঠা বিদ্যুতের মতন আবির্ভুত হলো একটি ছায়া। রিয়ারভিউ মিররে প্রতিফলিত ডুকাটি বাইকের প্রতিচ্ছবি। তীব্র গতিতে বায়ুঘূর্ণি তুলে ছুটে আসছে হরিণকে তাড়া করা বাঘের মতন। ক্ষীপ্র জন্তু যেন।
হতবাক হয়ে গেলাম। বাইকটা কয়েক সেকেন্ডের ভেতর আমার গাড়ির পাশাপাশি এসে পড়ল। হেলমেটের ওপাশ থেকে আমার দিকে সুগভীর ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো নিগূঢ় বাদামী জহরতজোড়া। কোনো চশমা নেই, বিধায় সেই দৃষ্টির পারদ সকল দূর্বারতাকে ছাড়িয়ে গেলো। তীব্র কর্কশ টায়ারের আওয়াজ, বায়ুর ঝাঁপটা উপেক্ষা করে তার অশরীরী কন্ঠস্বর গুঞ্জরিত হলো আমার কানে, সমস্ত রোমকূপে ছড়িয়ে দিলো শিহরণ।
“ইউ থিংক ইউ ক্যান রান ফ্রম মি? ওয়াইফ অব ড. জায়দান আরেফিন?”
বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বুকের ভেতর তড়িৎ খেলে গেলো বুঝি। স্টিয়ারিং রীতিমত খামচে ধরলাম। মাথা কাত করে পাল্টা চেঁচিয়ে উঠলাম,

“দ্যা হেল?”
জায়দান বাইক নিয়ে আমার পাশাপাশি চলছে সমানে সমানে। সন্নিকটে সরে এলো সে বিপদজনকভাবে। গাড়িটা সামান্য কেঁপে উঠলো আমার। তড়িঘড়ি করে সামনে তাকালাম।
“গাড়ি থামাও, সাবিন।”
“কেন? তোমার কথা আমি শুনবো কেন? তুমি আমার আব্বু লাগো?”
শয়তানি করে বললাম আমিও। এত সহজে এই বান্দার জালে ধরা দিয়ে ফেললে সাবিন হুসেইনের মান সম্মান থাকবে না। জায়দান যে ভীষণ ক্ষেপেছে সেটা বোঝা গেলো তার পরবর্তী কথায়ই। বাতাস কেটে ভেসে এলো তার হুংকার,
“আই সেইড স্টপ দ্যা ফাকিং কার! রাইট নাউ!”
ব্যাস! ট্রিগার চেপে দিয়েছে আমার লোকটা! নাক ফুলিয়ে গিয়ার ধরলাম। অ্যাক্সিলারেটর চাপতেই তরতর করে বেড়ে গেলো গাড়ির গতি। পিছিয়ে গেলো জায়দান আমার কাছ থেকে। বাঁকা হাসি হাসলাম রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে। কেমন লাগে এখন আরেফিনের বাচ্চা?
জায়দানও আজ নাছোড়বান্দা। সে হয়ত ভেবেছে আমি কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি। তাই এমন ডেসপারেট রূপ। বেশ ভালই লাগছে একে নাচাতে। সড়ক ধরে আমরা দুজন যেন একে অপরের সঙ্গে রেসে নেমেছি। কখনো এগিয়ে যাচ্ছে জায়দানের বাইক আবার কখনো আমার গাড়ি। এর মাঝেই জায়দান খুব কাছাকাছি এসে পড়ল। পরনের জ্যাকেট ভীষণ বাতাসে উড়ছে। মুখ হেলমেটে ঢাকা না থাকলে এই গতিতে কখনোই শ্বাস নিতে পারতোনা ঠিকমত।

“আমার সাথে পারবেনা তুমি! হেহ! ছেড়ে দাও।”
টিটকারী মারলাম আমি। বনবন করে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাঁক কাটলাম। জায়দানের বাইক পিছিয়ে পড়ে পরক্ষণেই আবার এগিয়ে এলো। এতটাই কাছে যে আমি ভড়কে গেলাম। এক হাতে বাইকের হ্যান্ডেল চেপে অত্যন্ত বিপদজনকভাবে অপর হাতটি বাড়িয়ে আমার গাড়ির খোলা জানালা আঁকড়ে ধরল জায়দান। তাকালো আমার দিকে সরাসরি। ক্ষণিকের জন্য মুখ ঘুরিয়ে আমিও তাকালাম। ওই বাদামী চোখের মাঝে ভাসা টলটলে তাড়না আমায় হতবিহ্বল করে দিলো।

“গোটা জগৎটাই আমায় ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু তুমি ছেড়ে গেলে আমি যে সইতে পারবনা মাই ওয়াইফ….”
বাক্যটা স্পষ্টত শুনতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কানে এলো ভয়ানক এক হর্ণের আওয়াজ। চকিতে সামনে তাকিয়ে দেখলাম বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসছে একটি ট্রাক! কয়েক সেকেন্ডের মাথায় কি হলো বুঝলামই না। প্রচন্ড জোরে স্টিয়ারিং ঘোরালাম। গাড়িটা একপাশে বাঁক কেটে গেলো। জায়দানের বাইক টলে উঠলো শুধু। ওইটুকুই দেখা সম্ভব হলো আমার পক্ষে।
ট্রাক হর্ন বাজাতে বাজাতে তীব্র বেগে ছুটে গেলো। ড্রাইভার যে নেশা করে চালাচ্ছে স্পষ্ট বুঝলাম ভয়ানক হেলদোলে। আমার জগৎটা বুঝি থমকে গেলো। তার সঙ্গে গাড়িটাও সড়কের একপাশে এসে থেমে গেলো ব্রেক কষে। সিটবেল্টের টান খেলাম অথচ অন্তরটা ফাঁপা। অজান্তেই গলা চিরে চিৎকার বেরিয়ে এলো আমার,

“জায়দান!”
উন্মাদের মতন সিটবেল্ট খুলে লাফিয়ে নামলাম গাড়ির বাইরে। আমার রীতিমত উড়ে যাওয়া প্রাণপাখিটা ফিরে এলো অদূরে সড়কের ভিন্ন পাশে জায়দানের বাইকটা দেখে। অন্তিম মুহূর্তে সরে যেতে পেরেছে সে। বাইক থামিয়ে পিছনে চেয়ে ছুটে যাওয়া ট্রাকটাকে মনে মনে মন্ত্রপূত অভিশাপ দিচ্ছে বোধ হয়। নিজেকে রুখতে পারলাম না। ছুটে গেলাম ঊর্ধ্বশ্বাসে,
“সাইকো ম্যান!”
গর্জে উঠলাম ভীষণ ক্রোধে। জায়দান সবে বাইক থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। আমি মুহূর্তমাঝে ঝাঁপিয়ে পড়লাম তার উপর। প্রস্তুত বাহুডোর আমায় বেঁধে ফেললো নিজের সঙ্গে।
“আমি পালাচ্ছিলাম না!”

ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে উঠতেই এক ঝটকায় নিজের হেলমেট খুলে ফেললো জায়দান। অতঃপর অবিশ্বাস্য দ্রুততায় আমায় ঠেলে ফেললো বাইকের অয়েল ট্যাংকারের উপর। ধাতব স্পর্শ পিঠে ঠেকতেই শিউরে উঠলাম। অথচ আমি কোনো প্রতিক্রিয়া করার আগেই জায়দানের ঠোঁটজোড়া আছড়ে পড়ল আমার ঠোঁটের উপর। সাগরে ফুলেফেঁপে ওঠা সুনামি যেন! জমে গেলাম খানিকটা সময়ের জন্য। অথচ পাল্টা সায় না জানিয়ে পারলোনা আমার অন্তর। আঁকড়ে ধরলাম তার পিঠ। জ্যাকেট মুঠ করে ধরলো আমার দুহাত।

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৭

জায়দানের ঠোঁট তীব্র শক্তিতে বুঝি আমার অধরের মাঝ থেকে শুষে নিচ্ছে দেহের ভেতরের সকল শক্তিকে। এক হাতে আমার চুল মুঠো পাকিয়ে ধরেছে সে, অপর হাতে আঁকড়ে ধরা আমার চিবুক। পাগলের ন্যায় আচরণ, উন্মাদ অনুভূতি বিনিময়। যেন জনম জনমের ক্ষুধার্ত কোনো পশু হামলে পড়েছে আমার উপর। মাথাটা বনবন করে ঘুরছে ভালোবাসার তীব্রতায়। এতটাও শক্তিশালী কারো চাহিদা হয়?
দাঁতের মাঝে আমার ঠোঁট কামড়ে টেনে ধরে জায়দান গভীর কন্ঠে ফিসফিস করলো,
“পালাবে আর কোথায়? তুমি যে মৃত্যুর ওপাড়েও আমায় অপেক্ষমাণ পাবে, বউ আমার!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here