অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২২
রিদিতা চৌধুরী
গভীর রাত। সৌহার্দ্যকে রিদিকে কোলে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে রিভা থমকে দাঁড়াল। অবাক হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, ভাবিকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?”
সৌহার্দ্য রিভার দিকে ইশারা করে চুপ থাকতে বলল, যাতে রিদির ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। এরপর খুব নিচু স্বরে, ধীর গলায় উত্তর দিল, “বাড়ি যাচ্ছি। তুই কাল সকালে চলে আসিস।”
রিভা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৌহার্দ্য রিদিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। রিভা বিস্ময় আর আক্ষেপ নিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। কত স্বপ্ন ছিল মনে—এখানে আরও কিছুদিন থেকে শাহবীরের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ মিলবে। কিন্তু তার সেই পরিকল্পনা সবটাই যেন ভাইয়া টা ধূলিসাৎ করে দিলো!
রিভার এই মন খারাপের মাঝেই শাহবীর এসে তার মাথায় একটা মৃদু টোকা দিয়ে বলল, “কী ব্যাপার? না ঘুমিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে কী করছো?”
মনটা আগে থেকেই খারাপ ছিল, তার ওপর শাহবীরের এই উদাসীনতা রিভাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলল। সে মুখটা ভার করে বলল, “ভাইয়া, তো ভাবিকে নিয়ে চলে গেল!”
শাহবীর খানিকটা বিরক্ত হয়ে কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, “তো? ওর বউ, ও নিয়ে যাবে না তো কে নেবে?” এতে তোমার সমস্যা কি?
রিভার মেজাজ যেন সপ্তমে চড়ল। রাগে আর অভিমানে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বলল, “আমার সমস্যা যে কি, তা বোঝাতে বোঝাতে আমার চুল পাকিয়ে বুড়ি হয়ে যাওয়ার দশা হবে, তবুও আপনি বুঝবে না! আপনি আসলে আস্ত একটা কানা লোক!”
কথাটা বলেই রিভা রাগে গজগজ করতে করতে দপাদপ পা ফেলে ওই জায়গা থেকে চলে গেল।
শাহবীর নির্বিকার ভঙ্গিতে রিভার যাওয়ার দিকে
তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল, “বেয়াদব মেয়ে একটা!”
গাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধতা।সৌহার্দ্য রিদিকে নিজের কোলে আলতো করে টেনে বসিয়ে রিদির অবশ মুখটা নিজের বুকের উষ্ণতায় গুঁজিয়ে দিয়ে এক হাতে পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে ধরল সে। রিদির অবাধ্য চুলে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে ধীরগতিতে গাড়ি স্টার্ট দিল সৌহার্দ্য। ঘুমের অতল গহীনে ডুবে থাকা রিদি বাইরের জগত সম্পর্কে বেখবর, সৌহার্দ্যের বুকের উষ্ণতায় সে যেন আরও পরম নিশ্চিন্তে ঘুমের আবেশে এলিয়ে পড়ল।
গাড়ি যখন চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে থামল, তখনও রিদির ভাঙেনি। সৌহার্দ্য সাথে সাথে আরবান ফোন করে আমেনা খালাকে নির্দেশ দিয়ে রিদির রুমটা যেন তড়িঘড়ি করে গুছিয়ে রাখা হয়।
এরপর, খুব সাবধানে রিদিকে কোলে তুলে নিয়ে সে সোজা নিয়ে গেল রিদির রুমে। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে এসিটা কিছুটা কমিয়ে দিল, যাতে রিদির আরাম হয়। গায়ের ওপর পরম যত্নে কাঁথাটা টেনে দিয়ে সে কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার ঘুমের শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এক তৃপ্তি নিয়ে এরপর সে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
সকালের মিষ্টি রোদ আর পাখির কলকাকলিতে রিদির ঘুম ভাঙল। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হলো সে। বিরক্তি নিয়ে পিটপিট করে চোখ মেলতেই তার গা ছমছম করে উঠল। ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি, অথচ চারপাশের পরিবেশটা বড় অদ্ভুত—এটা তো অবিকল চৌধুরী বাড়ির তার রুমটা!
রিদি ধড়ফড় করে উঠে বসল। হৃদপিণ্ডটা তখন ধকধক করছে। এটা কি স্বপ্ন? সে এখানে এল কীভাবে? মস্তিষ্কটা তখন অস্পষ্ট স্মৃতি হাতড়াচ্ছিল। আবছা মনে পড়ছে, গভীর রাতে সৌহার্দ্যের একটা ফোন এসেছিল। কিন্তু ঘুমের ঘোরে সে কী কথা বলেছিল, আর সৌহার্দ্যই বা কী বলেছিল—সবটাই ধোঁয়াশা।
”অসভ্য, বেয়াদব লোকটার কাজ!” বিরবির করে নিজের ওপরই রাগ ঝাড়ল রিদি। তার দৃঢ় বিশ্বাস, এই কাণ্ড ওই সৌহার্দ্যেরই। নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হতেই সামনে পড়ল রিমা চৌধুরী। ভদ্রতার খাতিরে রিদি কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু রিমা চৌধুরী মুখটা বাঁকিয়ে কোনো শব্দ না করেই পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।
রিদির মনে একটু বিরক্ত হলো,। এই মহিলার সমস্যাটা কী? কেন তার সাথে এমন করে সে বুঝে উঠতে পারেনা! কিছুদিন আগে যখন এখানে এসেছিল, তখন তো ভালো ব্যবহারই করছে এখন আবার কোন ভূতে ধরছে!
বেলা তখন প্রায় নয়টা। রিদি মনের ভেতর জমানো হাজারো প্রশ্নের তোয়াক্কা না করে নিচে নেমে এলো। বসার ঘরের সোফায় শাহেদা চৌধুরীকে বসে থাকতে দেখে সে একটু থমকে দাঁড়াল। শাহেদা চৌধুরীর চেহারায় কোনো বিস্ময় নেই; আমেনা খালার কাছে তার সেই ‘গুণধর’ ছেলের কীর্তিকলাপ আগেই শুনে ফেলেছেন তিনি।
রিদিকে দেখেই শাহেদা চৌধুরী স্নেহের হাত বাড়িয়ে দিতে, রিদি তার পাশে গিয়ে বসে আলতো করে মাথাটা গুঁজে দিল তার কোলে। যেন কত বছর পর মায়ের কোল খুঁজে পেল! শাহেদা চৌধুরী পরম মমতায় রিদির চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কিছু খেয়ে নে মা।”
রিদি ধীরে ধীরে মাথা তুলে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, “আমি এখানে থাকতে চাই না, আম্মু।”
শাহেদা চৌধুরী মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো জোর নেই, আছে অদ্ভুত এক শান্ত স্নিগ্ধতা। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, “ঠিক আছে, কিন্তু দুদিন পরই তো আমরা সবাই সৌহার্দ্যর মামার বাড়িতে যাচ্ছি—ফাহানের বিয়েতে। ওখান থেকে ফিরে চলে যাস, কেমন?
রিদির চোখদুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। এই চার বছরে চৌধুরী বাড়িতে সৌহার্দ্যের মামাবাড়ির লোকজনের আনাগোনা বা কোনো সম্পর্কের নজির সে দেখেনি। রিদি ভিষম অবাক হলো, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলল না! শাহেদা চৌধুরী রিদির বিভ্রান্তি আঁচ করতে পেরে মাথায় হাত বুলিয়ে আবার বললেন, “তোর মামা নিজে এসে দাওয়াত দিয়ে গেছেন, সবাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাই যাচ্ছি।”
রিদি আর কোনো প্রতিউত্তর করল না। চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। শাহেদা চৌধুরীর কথা নিরবে মেনে নিলো!
রিদি রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই দেখলো সাথী নাস্তা বানাচ্ছে। রিদিকে দেখে সাথী একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে মজা করে বলল, “বাহ! জামাইয়ের কোল চড়ে রাত দুটোর সময় বাড়ি ফেরা হচ্ছে! ভালোবাসা দেখছি জমে ক্ষীর!”
সাথীর কথায় রিদির মেজাজ মুহূর্তেই চড়ে গেল। সে মুখ বাঁকিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বলল, “ভালোবাসা না ছাই! দুদিন যাক, তারপরই দেখবে তোমার ওই অসভ্য দেবর বলবে—আমার বাড়িতে তোমার কী চাই?তারপর সৌহার্দ্যকে নকল করে ভেঙিয়ে বলল, গেইট আউট ফ্রম মাই হাউস! ইংরেজের বাচ্চা একটা! গিরগিটিও এত দ্রুত রং বদলাতে পারে না, যতটা ওই লোকটা পারে।”
সাথী কোনো উত্তর দিল না, নিরবে একটু হাসলো। সে নিজেও তো জানে না সৌহার্দ্য আসলে কী চায়! মনের ভেতর একরাশ দীর্ঘশ্বাস চেপে সে চুপচাপ নিজের কাজে মন দিল। রিদি তার পাশে বসে টুকটাক কিছু খেতে খেতে এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা মনের সব অভিমান, সব কথা উজাড় করে দিচ্ছে।
সকাল এগারোটার স্নিগ্ধ আলো ড্রয়িং রুমের জানলা দিয়ে এসে পড়েছে, কিন্তু ঘরের পরিবেশটা বেশ থমথমে। রিদি সোফায় বসে আছে, কোলে যোহা। বাচ্চার সাথে খুনসুটিতে মেতে আছে সে, যদিও মনের ভেতরটা অশান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো সৌহার্দ্য—পরনে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি তার চোখে, মুখটা অস্বাভাবিক রকমের গম্ভীর।
রিদি একবার আড়চোখে তার দিকে তাকিয়েই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। সৌহার্দ্যের উপস্থিতিতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। হঠাৎ কোনো কথা না বলে, নিশব্দে এসে সৌহার্দ্য ঠিক রিদির গা ঘেঁষে দপ করে বসে পড়ল। তার এই নৈকট্য রিদির অস্বস্তি যেন আরও বাড়িয়ে দিল।
রিদি দ্রুত একটু সরে গিয়ে ফোঁস করে উঠল, তিরতিরে মেজাজে বলল , “অসভ্য লোক! আমাকে কেন এখানে নিয়ে এসেছেন?”
সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত উদাসীনতা। গম্ভীর কণ্ঠে সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল, “আমি কেন তোমাকে নিয়ে আসব?”
রিদির মাথা গরম হয়ে গেল সৌহার্দ্যর এমন কথা শুনে। বিড়বিড় করে বলল, ‘কী অসভ্য লোক! কথার এমন পিঠ চাপড়ানো পাল্টিবাজ লোক আমি জীবনে দেখিনি। আল্লাহ এটারে কী মাটি দিয়ে বানাইছে, আল্লাহই জানে!’
রাগ সংবরণ করতে না পেরে দাঁতে দাঁত চেপে সে আবার বলল, “তাহলে আমি কীভাবে এলাম এখানে? আকাশ থেকে পড়েছি?”
সৌহার্দ্য এবার একদম নিশ্চল হয়ে বসে রইল। ক্ষণিকের নীরবতা ভেঙে, গমগমে অথচ নির্লিপ্ত গলায় সে বলল, “আমি কীভাবে বলব? মেবি ভূত!”
রিদির গায়ের ভেতরটা রাগে যেন জ্বলছে। ঘুমের ঘোরেই ওকে ডাকাতি করে তুলে এনেছে, এখন অসভ্য লোকটা কী নির্লজ্জের মতো নাটক করছে! একেই বলে বেহায়া!
ওর ভাবনার মধ্য সৌহার্দ্য যোহার মিষ্টি গাল দুটো টেনে আদর করতে করতে রিদির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর কন্ঠে বলল, “ইউ লাইক, বেবি?”
রিদি তখনো নিজের বিরক্তির ঘোরে ডুবে আছে। সৌহার্দ্যের কথার গভীরতা না বুঝেই আনমনে মাথা নাড়ল সে, “হুম!”
মুহূর্তের মধ্যে সৌহার্দ্য ঝুঁকে যোহার গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে সোজা উঠে দাঁড়াল। এরপর রিদির দিকে এক পলক তাকিয়ে, গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বলল, “রুমে এসো, দেন ওটার মতো এমন একটা কিউট বেবি পাবে।”
কথাটা বলেই সে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। রিদি প্রথমে থতমত খেয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। পরক্ষণেই যখন সৌহার্দ্যের কথার আসল মানেটা তার মস্তিষ্কে আঘাত করল, তার গাল দুটো লজ্জায় আর ক্ষোভে রাঙা হয়ে উঠল। রাগে গজগজ করতে করতে সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “অসভ্য! লুচ্চা ডাক্তার একটা!”
শাহবীর সবেমাত্র রিভাকে পৌঁছে দিয়ে এসে বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়েছে। ঠিক তখনই আকিব শিকদার এক জোড়া জ্বলন্ত চোখে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। রাগে কাঁপতে থাকা গলায় তিনি গর্জে উঠলেন, “বীর! ওই বেয়াদব ছেলেটার সাথে তুমি রিদিকে যেতে দিলে? আজকাল কি আমার কথার কোনো দামই নেই তোমার কাছে?”
শাহবীর শান্ত কিন্তু দৃঢ় দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল। কোনো উত্তাপ না দেখিয়ে ধীর স্বরে বলল, “ফাফা, বিষয়টাকে ওভাবে দেখছ কেন? ও তো নিজের স্ত্রীকে নিয়ে গেছে, এতে আমার কী করার ছিল? তাছাড়া… সৌহার্দ্যের চোখে আমি রিদির জন্য গভীর ভালোবাসা দেখেছি। রিদি যদি ওর সাথে সুখী হতে চায়, তবে আমার আর কোনো আপত্তি নেই।”
ছেলের মুখে এমন অবাধ্য কথা শুনে আকিব শিকদারের ক্রোধ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন আগুন। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “তোমার মাথা ঠিক আছে তো? তুমি কি জানোনা সৌহার্দ্য কী করেছে? সেই ছেলেটার হাতে তুমি নিজের বোনকে তুলে দিতে চাইছো? আর ওই ছেলের জন্য আজ তুমি আমার মুখের ওপর কথা বলছো?”
বাবার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা আর অন্ধ ভালোবাসা শাহবীরের অস্থিমজ্জায়। সে কখনো বাবার কথার ওপর কথা বলে না। বাবার তীব্র ভর্ৎসনায় সে মাথা নত করল, আর তর্কে জড়াল না। শাহবীর যখন নিস্তব্ধ হয়ে চলে যেতে চাইল, তখন আকিব শিকদার আচমকাই গলার স্বর নামিয়ে ফেললেন। এক অদ্ভুত শীতল গলায় বললেন, “বীর, তুমি চাইলেই এখন আর তোমার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারো না। তোমার ওই বন্ধুত্বের জন্য আমি আমাদের মেয়ের জীবনটা নষ্ট হতে দিতে পারি না। আর ওর এত নিকৃষ্ট কাজ নিজের চোখে দেখার পর কিভাবে ওর সাথে বন্ধুত্ব রাখো? দ্রুত ডিভোর্সের ব্যবস্থা করো। ডিভোর্সটা হয়ে গেলে আমি রিদিকে তাজওয়ানের হাতে তুলে দেব।” ক্ষণিকের জন্য তার কণ্ঠস্বর কিছুটা করুণ হলো, “আকরাম ভাইজানের শেষ ইচ্ছা ছিল তাজওয়ানকে তার মেয়ে জামাই করা। আমি সেই ইচ্ছাটা পূরণ করতে চাই বীর।”
শাহবীর আর কোনো কথা বাড়াল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ধীর পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
শাহবীরের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আকিব শিকদার পাশে থাকা আরিফা খানের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “তোমাকে বারবার বলেছিলাম মেয়েটাকে আমেরিকা নিয়ে যেতে! দেখলে তো, সারহান চৌধুরী কত বড় ধুরন্ধর! সম্পদের লোভে আমাদের না জানিয়েই নিজের ওই বেয়াদব ছেলের সাথে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিল!”
স্বামীর মুখে সারহান চৌধুরীর প্রতি এমন ঘৃণা আর অর্থহীন অভিযোগ শুনে আরিফা খান বিরক্ত হলেন। তার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। তিনি কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরেই বললেন, “এসব কী আজেবাজে কথা বলছেন আপনি? সারহান ভাইজানের যা সম্পদ, তা দিয়ে খান বাড়ি আর শিকদার বাড়ি—দুটোই তিনি অনায়াসে কিনে নিতে পারেন! সম্পদের লোভ তার নেই।”
আকিব শিকদার স্ত্রীর কথায় কান না দিয়ে বরং আরও বিরক্ত হলেন। চোয়াল শক্ত করে বললেন, “তুমি এসবের কিছুই বোঝো না। বেশি কথা না বলে তোমার ছেলেকে বলো, দ্রুত যেন ওদের ডিভোর্সের ব্যবস্থাটা করে!”
রাত প্রায় দুটো। রিদির দুচোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। অস্থিরতায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ বিছানায় হাতড়ে নিজের ফোনটা খুঁজে নিল সে। রিভা আসার সময় ফোনটা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। রিদি নিজের একটা ফেইক আইডি থেকে কৌতূহলী হয়ে সৌহার্দ্যের প্রোফাইলে ঢুকল। তবে সেখানে আহামরি কিছু নেই—লন্ডনের কোনো এক রাস্তায় দাঁড়িয়ে তোলা একটা ছবি, আর ডাক্তারি সব জটিল সব টিপস।
আইডিটা অনলাইন দেখে রিদির ভেতরটা দুষ্টুমিতে নেচে উঠল। সে চটপট একটা মেসেজ টাইপ করে পাঠিয়ে দিল: “হাই হ্যান্ডসাম! কী করছ?”
মেসেজটা ওপাশ থেকে সাথে সাথেই ‘সিন’ হলো, কিন্তু কোনো উত্তর এল না। রিদি নাছোড়বান্দা। পরক্ষণেই আবার লিখল: “ইউ আর সো হট!”
এবারও মেসেজটা চোখের পলকে সিন হলো, কিন্তু সৌহার্দ্য কোনো টু-শব্দ করল না। মেসেজ সিন করছে অথচ উত্তর দিচ্ছে না—এই ব্যাপারটাই রিদির বেশ মজার মনে হলো। সে এবার আরেকটু সাহসী হয়ে লিখল: “বেবি, আই মিস ইউ!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ২১
এবার আর মেসেজটা সিন হলো না। রিদি ভেবেই নিল সে এখন আর রিপ্লাই দেবে না। হতাশ হয়ে ফোনটা বালিশের পাশে রেখে ঘুমানোর জন্য চোখ বুজল, ঠিক তখনই মোবাইলের স্ক্রিনটা টুংটাং করে কেঁপে উঠল। রিদি দ্রুত হাতে ফোনটা তুলতেই তার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা উত্তরটা পড়ে তার গাল দুটো লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল:
”ইউ আর টু মাচ হট, বেবি। বউয়ের সাথে ‘টি-টোয়েন্টি ম্যাচ’ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আই’ল টেল ইউ দ্য রেস্ট হোয়েন আই গেট হোম! ওয়েট ফর মি, বেবি।”
