উন্মাদনা পর্ব ৩০
কায়নাত খান কবিতা
” খাইয়া খাসির মতো শরীর বানাইছে কয়দিনে! ব্যাপার না, আবার নিয়মিত ব্যায়াম করাইয়া ফিট বানানো।’
বাইক থামিয়ে কয়েকবার আনন্দীকে ঝাঁকাতে থাকে অভী। কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না তার। মাথাটা একদিকে হেলে পড়ে থাকে আনন্দীর। নিঃশ্বাস চলছে ঠিকই, কিন্তু জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ নেই।অভী বিরক্তিতে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।এভাবে বাইকে করে তাকে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছিলো তার পক্ষে । তার উপরে অচেতন শরীরের পুরো ভার এসে পড়ছে অভীর উপর। আগের চেয়ে আরও ভারী লাগছিল আনন্দীকে।অভী বিরক্ত মুখে আবারও তাকে ঝাঁকায়।
“ আমার বান্দী !”
কোনো উত্তর মেলে না ।তারপর গালে হালকা চাপড়ের মতো দিতে দিতে বলে ওঠে,
“এ মুটকি… মুটকি রে… উঠ রে মুটকি!”
আনন্দী নিস্তেজই পড়ে থাকে।অভী এবার হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“তোর মতো খাসিকে কোলে নিলে আমার দম বাইর হইয়া যাইবো। তার উপরে কয়েকদিন ধরে ব্যায়াম করি নাই ”
তবুও কোনো নড়াচড়া নেই।কয়েক সেকেন্ড বিরক্ত চোখে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ বাইকের পাশে রাখা পানির বোতলটা হাতে নেয় অভী।তারপর কোনো রকম চিন্তা না করেই পুরো বোতলের পানি ঢেলে দেয় আনন্দীর মুখে।ঠাণ্ডা পানিতে ভিজে কেঁপে ওঠে আনন্দীর শরীর।ধীরে ধীরে চোখ খুলতে থাকে আনন্দী। মাথার ভেতর কেমন ঝাপসা ব্যথা। চারপাশের সবকিছু দুলে দুলে উঠছে। কয়েক সেকেন্ড লাগে বাস্তবে ফিরতে তার।তারপরই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।অভী।রাস্তার হালকা আলোয় তাকে অদ্ভুত ভয়ংকর লাগে। কালো টি-শার্ট, এলোমেলো চুল, ঠাণ্ডা চোখ। যেন মানুষ না, কোনো বিপদ দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
অভীকে দেখামাত্র ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে আনন্দী। আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে গিয়ে প্রায় বাইক থেকে পড়ে যাচ্ছিল সে। কিন্তু পড়ার আগেই অভী দ্রুত হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলে।এক ঝটকায় আবার নিজের সামনে টেনে আনে।বিরক্ত গলায় বলে,
“আমারে কী চোখে পড়ে না তোর? এত পালাই পালাই করস ক্যান?”
আনন্দী উত্তর দেয় না। তার বুক দ্রুত উঠানামা করতে থাকে। চোখে তখন কেবল ভয় আর ঘৃণা জমে আছে।হঠাৎই ঝুঁকে পড়ে অভীর হাতে শক্ত করে কামড় বসায় সে।একদম হিংস্রভাবে।নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আনন্দী।কিন্তু অভী হাত সরায় না।না চিৎকার করে, না রাগ দেখায়।শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। যেন এই ব্যথা তার কাছে কিছুই না।কয়েক সেকেন্ড পর হাঁপাতে হাঁপাতে কামড় দেওয়া ছেড়ে দেয় আনন্দী। চোখ লাল হয়ে গেছে তার। শ্বাস কাঁপছে।সেদিনের সবকিছু আবার মাথার ভেতর ফিরে আসে।সেই ঘর,সেই ভয়।যে মানুষটা তাকে একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, তাকে কীভাবে সহ্য করবে সে?কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
“আমি ঘৃণা করি আপনাকে।”
অভীর চোখের পলকও পড়ে না।খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,
“সমস্যা নাই।”
এই উদাসীন উত্তরটাই যেন আরও বেশি ভেঙে দেয় আনন্দীকে। অভী আসলে কী চায় সেটা একমাত্র অভীই ভালো জানে।তার চোখ আবার ভিজে ওঠে।
“আমাকে ছাড়ুন… আমি বাড়ি যাবো…”
আনন্দী আবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। শরীর কাঁপছিল তখনও।অভী কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে।তারপর ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দেয়।মুহূর্তের জন্য থমকে যায় আনন্দী। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।এত সহজে ছেড়ে দিয়েছে তাকে।সন্ধ্যার ফাঁকা রাস্তায় দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে মুখোমুখি।একজনের চোখে ভয়।আরেকজনের চোখে এমন এক নেশা, যেটা ভয়ংকরভাবে শান্ত।নিচে পড়ে থাকা ব্যাগটা কাঁধে তুলে দ্রুত সামনে পা বাড়ায় আনন্দী। তার একটাই চিন্তা।এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে যেতে হবে।কিন্তু দুই কদম যেতেই আচমকা পেছন থেকে হাত টেনে ধরে অভী।
এক ঝটকায় তাকে পুরোনো ভাঙাচোরা দেয়ালের সাথে চেপে ধরে।আনন্দী ব্যথায় কেঁপে ওঠে। দেয়ালের রুক্ষ অংশ গায়ে বিঁধতে থাকে। আর অভীর মুখে ধীরে ধীরে তৃপ্তির একটা হাসি ফুটে ওঠে।খুব ধীরে আনন্দীর এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দেয় সে। তারপর ঝুঁকে এসে নিচু গলায় কানে কানে বলে,
“ Edhu Enna Pudhu Vitah Mayaam.. En Nenjil En Thanda Kaayam..!”
” মানে?”
” বাড়িতে গিয়া চ্যাটজিপিটি মারিস বোকাচন্দ্র। ”
আনন্দী কিছুই বুঝতে পারে না প্রথমে। বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকে অভীর দিকে। এ কোন ভাষায় কথা বলছে সে? না-কি গান গাইলো? না-কি অন্য ভাষায় তার ক্ষতি করবে এটা বোঝালো?আনন্দীর বুক ধীরে ধীরে কাঁপতে থাকে। মনে হতে থাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আজ অন্যরকম।অভীর চোখে তখন অদ্ভুত এক ঘোর লাগা নেশা।সে ধীরে ধীরে আরও কাছে ঝুঁকে আসে। এতটাই কাছে, আনন্দী তার গরম নিঃশ্বাস পর্যন্ত অনুভব করতে পারে।কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে।
তারপর নিচু, কর্কশ গলায় বলে,
“তোরে মন ভইরা দেখতে চাই আমি…”
কপাল কুঁচকে মুখ ঘুরিয়ে নেয় আনন্দী। স্পষ্ট বিরক্তি আর অস্বস্তি জমে ওঠে তার চোখেমুখে। যেন অভীর দিকে তাকাতেও ঘৃণা লাগছে।অভী কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে এক হাত দেয়ালের উপরে তুলে আনন্দীকে আটকে ফেলে। আরেক হাত দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে তার গাল ধরে আবার নিজের দিকে ফিরিয়ে আনে।আনন্দীর শ্বাস কেঁপে ওঠে।অভী খুব কাছে ঝুঁকে নিচু গলায় বলে,
“তোর শরীরের প্রতিটা ভাজ দেখার ইচ্ছা আমার।”
আনন্দীর চোখ মুহূর্তেই ঘৃণায় ভরে ওঠে।কর্কশ গলায় বলে,
“ধ’র্ষণ করার সময় দেখেন নাই?”
কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে যায় অভী।
তারপর ধীরে ধীরে আনন্দীর গাল চেপে ধরে মুখটা নিজের দিকে তোলে। এলোমেলো চুল সরাতে সরাতে নিচু স্বরে বলে,
“আনব্লক কর।”
“অসম্ভব।”
“করবি না?”
“নাহ।”
পরক্ষণেই পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ভিডিও চালু করে অভী।ভিডিওতে দূর থেকে দেখা যায়।আনন্দীর বাবার দিকে তাক করা একটা রিভলভার।দৃশ্যটা দেখেই আনন্দীর বুকের ভেতরটা জমে যায়। চোখ বড়ো বড়ো হয়ে ওঠে।পরের মুহূর্তেই ঘৃণায় থুথু ছুঁড়ে মারে অভীর মুখে।
“তুই কী মানুষ?”
অভী খুব ধীরে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। তারপর হালকা হাসে।
“পয়দা হওয়ার সময় তো ডাক্তার কইছিল মানুষই।ক্যান? তুই কী জিন দেখতাছোস?”
আনন্দীর চোখ ভিজে ওঠে রাগে।
“একশোটা শয়তান মরে তোর মতো একটা অভী তৈরি হয়।”
অভীর ঠোঁটের হাসিটা আরও গভীর হয়।
“তাতে কোনো সন্দেহ নাই।”
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,
“এখন বল… বাপের মরা মুখ কবে দেখবি?”
কথাটা শুনেই আনন্দীর বুক কেঁপে ওঠে। চোখ ভরে পানি চলে আসে। সে জানে না এই মানুষটা ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে।অভী হাসতে হাসতেই আবার বলে,
“যেই শরীর আমি দেখছি… ওই শরীর দুনিয়ার আর কেউ দেখবো না।”
অভীর হাত চলে যায় আনন্দীর কোমরে।তাকে শক্ত করে ধরে বলে,
“তোর জন্য মানুষ ম,রবো অনেক। নিজে না মারলেও লোক ভাড়া কইরা মারামু।”
“ আপনার কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশা ও করি নাহ!”
“ তুই কী চাস নিজে মারি? ওটা ও পারবো। আজ অব্দি আমি কাউরে মারি নাই। তুই বললে একশোটা খু’ন ও করতে পারবো।”
কপাল কুঁচকে সন্দেহভরা চোখে তাকায় আনন্দী। তার চোখেমুখে স্পষ্ট অবিশ্বাস।কয়েক সেকেন্ড অভীর দিকে স্থির তাকিয়ে থেকে ঠাণ্ডা গলায় বলে,
“সত্যি আমি বললে মারবেন?”
অভীর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে ওঠে।
“একবার বইলা তো দেখ।”
আনন্দীর চোখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে যায়।ঠাণ্ডা গলায় দাঁত চেপে বলে ওঠে,
“নিজেকে মারুন।এইটা পারবেন?”
আনন্দীর গালটা শক্ত করে ধরে হঠাৎই চুমু খায় অভী। আচমকা এমন আচরণে কেঁপে ওঠে আনন্দী। সে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই অভী আরও কাছে টেনে নেয় তাকে।তারপর কপাল ঠেকিয়ে রাখে আনন্দীর কপালে।দুজনের নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যেতে থাকে।অভীর চোখে তখন অদ্ভুত এক উন্মাদনা। যেন ভালোবাসা আর ভয়ংকর অধিকারবোধ একসাথে জড়িয়ে আছে সেখানে।খুব নিচু গলায় বলে ওঠে,
“আমি মইরা গেলে… তোর বাচ্চা বাপ ডাক ডাকবো কারে?”
কথাটা শুনেই জমে যায় আনন্দী।তার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। চোখ কাঁপতে থাকে। যেন কেউ হঠাৎ তার সবচেয়ে ভয়ংকর দুঃস্বপ্নটার নাম উচ্চারণ করে ফেলেছে।অভী স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।আর আনন্দী নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য।
“এখন চিন্তা কইরা দেখ, কী করবি।”
আনন্দী কিছুক্ষণ কাঁপতে কাঁপতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ভাঙা গলায় বলে,
“কী চান আপনি?”
অভীর চোখে সঙ্গে সঙ্গে তৃপ্তির ঝিলিক দেখা যায়।
“এই তো লাইনে আসছোস। আজকে থেকে তুই আমার প্রেমিকা”
“ অসম্ভব!”
“ এখন কী শরীরে সিল মারলে সম্ভব হইবো?’’
“ আপনি কারো প্রেমিক হওয়ার যোগ্য নন। রে’পিস্ট আপনি!”
আনন্দীর কথা শেষ হওয়ার পর আচমকাই আনন্দীর মাথার পাশের দেয়ালে সজোরে ঘুষি মারে অভী।ধপ করে শব্দ হতেই কেঁপে ওঠে আনন্দী। দেয়াল পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল যেন। ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে সে মুহূর্তের জন্য।অভীর শ্বাস তখন ভারী হয়ে উঠছিল।পরক্ষণেই দুহাতে আনন্দীর কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলে ওঠে,
“আমি তোর অনুমতি চাইতাছি না।জানাইতাছি।”
আরও কাছে ঝুঁকে আসে সে।
“ডিসিশন ফাইনাল।”
আনন্দীর বুক কাঁপতে থাকে। কিন্তু এবারও চোখ নামায় না সে।অভী দাঁত চেপে আবার বলে,
“আজকে সারারাত ভাববি।কালকে উত্তর দিবি।”
কথাগুলো বলে হঠাৎই তাকে ছেড়ে দেয় সে। তারপর বাইকের দিকে এগিয়ে যায়।ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার আগে আবার একবার ঘুরে তাকায় আনন্দীর দিকে।কঠিন গলায় বলে,
“বাসায় গিয়া আনব্লক করবি।আর আমাকে প্রেমিক হিসেবে গ্রহণ করবি।”
পরের মুহূর্তেই বাইকের তীব্র শব্দ তুলে রাস্তা কেটে চলে যায় অভী।ধোঁয়া আর শব্দ মিলিয়ে যেতেই ফাঁকা রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে থাকে আনন্দী।কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে সে।তারপর ধীরে ধীরে কপাল কুঁচকে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
“প্রেমিক?”
তার চোখে তখন ঘৃণা জমে আছে।
“একটা ধর্ষণকারী কখনো প্রেমিক হতে পারে না।”
শ্বাস কেঁপে ওঠে তার।
“নরপিশাচ… পশু।তোর জায়গা জেলে।”
কোনোরকমে একটা রিকশা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয় আনন্দী। ফিরতে ফিরতে রাত বেশ গভীর হয়ে আসে। শহরের কোন অলিগলি পেরিয়ে, কোন অচেনা অন্ধকার গলিতে অভী তাকে নিয়ে গিয়েছিল।সেটার সামান্য ধারণাও নেই তার। মাথার ভেতর এখনও সবকিছু কেমনএলোমেলো লাগছিল।রিকশার কাঁপুনির সাথে সাথে একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেতে থাকে তার মনে,একটা মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কীভাবে?
বাড়িতে ঢুকতেই শুরু হয় প্রশ্নের পর প্রশ্ন। মা উৎকণ্ঠিত চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কোথায় ছিল, ফোন ধরছিল না কেন, ঠিক আছে কি না।একনাগাড়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে। বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুধু মেয়ের মুখটা পড়ার চেষ্টা করেন।
সব মিলিয়ে ভীষণ ক্লান্ত আর বিরক্ত লাগে আনন্দীর।
তবুও নিজেকে সামলে নেয় সে। কোনো রকমে মাকে বুঝিয়ে বলে কোচিংয়ে একটু ঝামেলা হয়েছিল। এরপর রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বাবার পাশে বসে গল্প করে। সেই মুহূর্তগুলোতে যেন নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকে আনন্দী।এর মাঝেই অভীর হুমকির কথাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে।মনে হচ্ছিল,আজ আর কিছু হবে না।
ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিতেই ধীরে ধীরে ঘুম নেমে আসে তার চোখে।রাত তখন গভীর,নিস্তব্ধ।
হঠাৎ করেই পায়ের কাছে বরফশীতল কিছুর স্পর্শ অনুভব করে ঘুম ভাঙে আনন্দীর। প্রথমে আধো ঘুমে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। কপাল কুঁচকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা খুঁজে নেয়। তারপর কাঁপা হাতে ফ্ল্যাশলাইট অন করে।
আর পরের মুহূর্তেই বুক ফাটানো চিৎকার বেরিয়ে আসে তার গলা থেকে।
বিছানার উপর বিশাল একটা সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে ছিল।
আরেকটা ধীরে ধীরে বালিশের পাশ বেয়ে এগোচ্ছিল।
মুহূর্তের মধ্যে শরীরের সমস্ত রক্ত যেন হিম হয়ে যায় আনন্দীর। গলা শুকিয়ে আসে। নিঃশ্বাস আটকে যেতে থাকে। চিৎকার করতে করতে বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে নেমে দরজা খুলে বাইরে ছুটে যায় সে।
তার সেই আতঙ্কভরা চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায় পুরো বাড়ির।
আকরাম শেখ আর আয়েশা শেখ দৌড়ে বেরিয়ে আসেন। আনন্দী কাঁপতে কাঁপতে শুধু নিজের রুমের দিকে আঙুল তুলে দেখাতে থাকে।বাবা সাহস করে ঘরে ঢুকতেই স্তব্ধ হয়ে যান।আনন্দীর বিছানার উপর কয়েকটা বিশাল সাপ ধীরে ধীরে নড়ছিল।
দৃশ্যটা দেখেই আয়েশা শেখের মুখ দিয়ে চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। আকরাম শেখের বুক পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। মেয়ে যে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে।এটাই তখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
মুহূর্তের মধ্যে বাড়িতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।তড়িঘড়ি করে পেস্ট কন্ট্রোলকে ফোন করা হয়। খবর দেওয়া হয় দমকল বাহিনীতেও। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাড়িজুড়ে শুরু হয় ছোটাছুটি, আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা।
সারা রাত বাড়ির প্রতিটা কোণা খুঁজে খুঁজে সাপ বের করতে থাকে লোকজন। একটা, দুটো, তিনটা। যেন অন্ধকারের ভেতর থেকে বিষাক্ত আতঙ্ক বেরিয়ে আসছিল একের পর এক।পুরো বাড়ি পরিষ্কার করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়।তবুও ভয় কাটে না আনন্দীর।
এর মাঝে কয়েকবার নিজের পা ধুয়ে ফেলে সে। তবুও মনে হচ্ছিল এখনও যেন ঠাণ্ডা আঁশওয়ালা কিছু তার গা ঘেঁষে আছে। ভেতরের আতঙ্কটা যেন চামড়ার নিচে ঢুকে বসে থাকে।
পেস্ট কন্ট্রোলের লোকেরা চলে যাওয়ার পরও আবার পুরো বাড়ি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে সবাই। অবশেষে নিশ্চিত হওয়া যায়।আর কোনো সাপ নেই।কিন্তু আনন্দী আর নিজের রুমে ফিরতে পারে না।সেই বিছানার দিকে তাকানোর সাহস পর্যন্ত হচ্ছিল না তার।তাই চুপচাপ গেস্ট রুমে গিয়ে বসে পড়ে সে। হাঁটু জড়িয়ে বিছানার এক কোণে বসে থাকে
অনেকক্ষণ। বাইরে সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে, আর ভেতরে ভেতরে তাকে কুরে কুরে খেতে থাকে এক অদৃশ্য ভয়।
উন্মাদনা পর্ব ২৯
ঠিক তখনই ফোনে টুং করে একটা শব্দ হয়।আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ।কাঁপা হাতে ফোনটা তুলে নেয় আনন্দী।
মেসেজটা ওপেন করতেই বুকের ভেতরটা আবার ঠাণ্ডা হয়ে আসে।
“আনব্লক করবি?না-কি গোটা দশেক সাপ পাঠামু আরো?এইবার কিন্তু বিষে ভরপুর থাকবো।”
