উন্মাদনা পর্ব ৩১
কায়নাত খান কবিতা
“আনব্লক করবি না-কি গোটা দশেক সাপ পাঠামু? এবার কিন্তু বিষে ভরপুর থাকবো।”
মেসেজটা দেখেই আনন্দী বুঝে যায়।এটা অভীর কাজ। তাকে সব জায়গা থেকে ব্লক করেছিল বলেই এতদূর গেছে সে। সরাসরি বাড়িতে সাপ পাঠিয়েছে।অভীর ভাষ্যমতে সাপগুলোতে বিষ ছিল না।কিন্তু যদি থাকত?ভাবতেই বুকের ভেতরটা ঠাণ্ডা হয়ে আসে আনন্দীর। মানুষটা ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিল সে।তবুও অদ্ভুতভাবে এবার তার ভয় কমে আসে।কারণ সে নিশ্চিত হয়ে গেছে।এটা অভীর কাজ। আর অভী চাইলে তাকে ভয় দেখাবে, কিন্তু এখনই মেরে ফেলবে না।এই বিশ্বাস থেকেই হয়তো সাহস ফিরে পায় আনন্দী।
চুপচাপ নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে। তারপর একে একে জানালা, বারান্দার দরজা সব আটকে দেয়। যেন পুরো পৃথিবী থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলতে চাইছিল।এরপর ফোন হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে।শেষমেশ হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে অভীকে আনব্লক করে।আনব্লক করেই প্রথম মেসেজ পাঠায়,
“জানো’য়ার!”
মেসেজটা পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই আসতে শুরু করে।স্ক্রিনে ভেসে ওঠেপশু is typing। মূলত অভীর নাম্বারটা আনন্দী পশু নামেই সেভ করে রেখেছিলো। কারণ অভীর ফোনে সে দেখেছিলো, অভী তার নাম্বার কাল নাগিনি দিয়ে সেভ করে রেখেছে। তাই সে ও পশু দিয়ে সেভ করে রেখেছে। কয়েক সেকেন্ড পর রিপ্লাই আসে,
“বেশি কথা কইলে, এবার কিন্তু নিজের অজগর নিয়া হাজির হমু বা’ন্দী।”
মেসেজটা পড়ে কপাল কুঁচকে যায় আনন্দীর। বিরক্তি নিয়ে টাইপ করে,
“তুই নিজেই তো একটা কালসাপ। আবার অজগর পালতে গেলি কেন?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর আসে,
“এই অজগর সেই অজগর না সোনামণি।লাইভ দেখামু দাঁড়া।”
কথার ইঙ্গিত বুঝতেই বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলে আনন্দী।
“জা’নোয়ার!”
লিখে আবার ব্লক করে দেয় অভীকে।গত রাত থেকে একফোঁটা ঘুম হয়নি তার। চোখ জ্বলছিল ক্লান্তিতে। মাথাটাও ভারী লাগছিল ভীষণ। তাই ফোনটা পাশে রেখে ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ে আনন্দী।এবার অন্তত একটু ঘুম দরকার।
অন্যদিকে, আনন্দীর রিপ্লাই পেয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে অভীর। আবার মেসেজ পাঠাতে যায় সে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারে।আবার ব্লক করে দিয়েছে তাকে।
কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ হেসে ওঠে অভী।দুপুরের গরমে গ্যারেজের ভেতর উদোম গায়ে শুধু মুন্ডু পরে বসে ছিল সে। হাতে জ্বলন্ত সিগার। চুলগুলো আগের মতোই পিছনে বাঁধা।এই ভরদুপুরেও তার মুখে অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি।সামনে বসে থাকা সাঙ্গোপাঙ্গরা বারবার একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। অভীর এই হাসির কারণ কেউ বুঝতে পারছিল না।তাই শেষমেশ সবাই চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে শুধু তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। কিন্তু এতো গরমে কীভাবে হাসছে সে?
গ্যারেজের ভেতরটা তখন ধোঁয়া আর গরমে ভারী হয়ে আছে। পুরোনো ফ্যানটা কটকট শব্দ তুলে ঘুরছিল মাথার উপর, কিন্তু তাতে গরম কমার বদলে যেন বিরক্তিই বাড়ছিল আরও। অভী মাচাতে আধশোয়া হয়ে বসে ফোন স্ক্রল করছিল। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক চাপা হাসি।ঠিক তখনই পাশ থেকে কবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাটকীয় গলায় বলে ওঠে,
“প্রেম প্রেম ভাব… প্রেমিকার অভাব!”
কথাটা শুনেও ফোন থেকে চোখ তোলে না অভী। আঙুল চালাতেই চালাতে নির্লিপ্ত স্বরে বলে,
“আর কয়টা প্রেম করবি তুই?”
তার কথা শেষ হতেই ডিজে শহিদুল গলা খাঁকারি দিয়ে সামনে ঝুঁকে আসে। চোখেমুখে দুষ্টু হাসি।
“ওর প্রেম আর পাদ।দুইটাই এক ভাই।”
গ্যারেজের সবাই কৌতূহলী হয়ে তাকায় তার দিকে।শহিদুল এবার সিগারে টান দিয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
“হুট কইরা আসে… ফুট কইরা চইলা যায়।”
এক সেকেন্ডের নীরবতা।তারপর পুরো গ্যারেজ ফেটে পড়ে হাসিতে।অস্ত্র মামুন হাসতে হাসতে মাথা নিচু করে ফেলে। নোবেল হাঁটুতে চাপড় মারে। ঘাতক সুমন তো দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে হাসছিলো।কিন্তু কবির মুখ মুহূর্তেই কালো হয়ে যায়।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোমরে হাত রেখে বিরক্ত চোখে তাকায় ডিজে শহিদুলের দিকে।
“উফ! জাউ’রো ছেলে একটা!”
তার কণ্ঠে সেই চিরচেনা মেয়েলি টান।
“এত জ্বালায় এরা… উফ বাবা! মরে যাই! মরে যাই!”
বলতে বলতে নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের বুক চেপে ধরে কবি।আর তাতেই আবারও হাসির রোল ওঠে চারপাশে।কবির এই স্বভাবটা সিন্ডিকেটের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই বিরক্তিকর। বিশেষ করে স্মার্ট নোবেলের কাছে। নোবেলের মাঝে মাঝে সত্যিই ইচ্ছে করে কবিকে ধরে ঝাঁকিয়ে তার এই মেয়েলি ভাবটা বের করে দিতে।কিন্তু পারে না।কারণ একটাই,কবি অভীর পছন্দের মানুষ।আর অভীর পছন্দের কাউকে অপমান করার সাহস এই দলে কারও নেই।তাই সবাই বিরক্তি চেপে তাকে সহ্য করে যায়।অভী অবশ্য এসব দেখে শুধু চুপচাপ হাসে। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখেই সিগারে ধোঁয়া ছাড়ে ধীরে ধীরে।গ্যারেজের এই বিশৃঙ্খল, পাগলাটে পরিবেশটাই যেন তার সবচেয়ে আপন জায়গা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে অভী। ফোনের স্ক্রিনে চোখ থাকলেও মাথার ভেতর অন্য কিছু চলছিল স্পষ্ট। তারপর হঠাৎই সোজা হয়ে বসে নিচু গলায় বলে ওঠে,
“আমার বিশটা নতুন সিম লাগবো।আর কয়টা ফোনও। এখনই।”
কথাটা শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকায়। কেউ ঠিক বুঝতে পারে না হঠাৎ এতগুলো ফোন আর সিম দিয়ে কী করবে অভী। তবে একটা বিষয় সবাই ভালো করেই জানে,অভী যখন শান্ত গলায় কিছু চায়, তখন ব্যাপারটা জরুরি হয়।খুব জরুরি।তাই আর কেউ প্রশ্ন করে না।
যার যার ফোন বের করে সামনে এগিয়ে দেয় সবাই। কারও ফোনে দুটো সিম, কারওটায় একটা। নোবেল তো তড়িঘড়ি করে গ্যারেজের বাইরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে পাশের চায়ের দোকানদার রহিম কাকা আর তেলে ভাজার সমরেশ দাদার ফোন নিয়ে।মুহূর্তের মধ্যে সামনে ছোটখাটো মোবাইলের স্তূপ জমে যায়।অভী একবার চারপাশে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানে।তারপর একটার পর একটা ফোন হাতে তুলে নিতে শুরু করে।
ওদিকে, দীর্ঘ ক্লান্তির পর সবে মাত্র ঘুমের ভেতর ডুবে যাচ্ছিল আনন্দী। চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল ধীরে ধীরে। ঠিক তখনই ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোনে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে সে।বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকায়।অচেনা নাম্বার।কিছুক্ষণ দ্বিধা করে কল রিসিভ করতেই বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।অভী।ওপাশ থেকে সেই কর্কশ, পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে।
“আনব্লক কর।”
কল কেটে যায়।কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোন বাজে।আরেকটা নতুন নাম্বার।রিসিভ করতেই আবার,
“জলদি কর। আনব্লক কর।”
আবার কল কেটে যায়।তারপর আবার।আরেকটা নাম্বার।
“ফোন অফ করবি না। খবর আছে।”
একটার পর একটা কল আসতেই থাকে। প্রতিটা কলে অভীর একই গলা। একই চাপা হুমকি।
“আনব্লক কর।নাহলে বাসায় আসমু।ফোন অফ করলে ভালো হইবো না।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরক্তি আর ক্লান্তিতে মাথা ধরে যায় আনন্দীর। মনে হচ্ছিল লোকটা ইচ্ছা করেই তাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে।শেষমেশ বিরক্তিতে দাঁত চেপে সব জায়গা থেকে আনব্লক করে দেয় অভীকে।
আর আশ্চর্যজনকভাবে,তারপরই সব শান্ত।আর কোনো কল আসে না।আনন্দী হাঁফ ছেড়ে বালিশে মাথা রাখতে যাবে, ঠিক তখনই ফোনে ভিডিও কল ভেসে ওঠে।অভী।
স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে যায় তার। প্রথমে ধরবে না ভেবেছিল। আঙুল কয়েকবার রিজেক্ট বাটনের উপর গিয়েও থেমে যায়।শেষমেশ বিরক্তি নিয়েই কল রিসিভ করে আনন্দী।
ভিডিও কল রিসিভ করতেই স্ক্রিনজুড়ে ভেসে ওঠে অভীর মুখ। অল্প আলোয় তার চোখদুটো আরও গভীর লাগছিল। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি।
“বান্দী… একটু ভালোবাসার কথা ক না। শুনতে মন চাইতাছে।”
কণ্ঠে অদ্ভুত কোমলতা। যেন এই মানুষটাই বছরের পর বছর তাকে ভয় দেখায়নি, ভেঙে দেয়নি।আনন্দী সঙ্গে সঙ্গে কিছু বলে না। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে, খুব শান্ত গলায় বলে,
“এভাবে ফোনে বললে হবে?আপনি আসুন। সামনে দাড়িয়ে বলব।”
কথাগুলো শুনে যেন শরীরের ভেতর বিদ্যুৎ খেলে যায় অভীর। এতক্ষণ এলিয়ে থাকা মানুষটা মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসে পড়ে। চোখে চাপা উন্মাদনার ঝিলিক।
“এখনই আসতাছি!”
হঠাৎ আবার কপাল কুঁচকে যায় তার।
“কিন্তু এই রেহমান ডাকাত?”
আনন্দী ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দেয়,
“বাসায় কোনো পুলিশ নাই। সবাই কোথায় যেন গেছে।”
এই একটুকু আশ্বাসই যথেষ্ট ছিল।অভী আর এক মুহূর্তও নষ্ট করে না। ফোন কেটে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ায়। মুন্ডুর গিট শক্ত করে বেঁধে বাইকের চাবি তুলে নেয়। কয়েক সেকেন্ড পরই রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তার বাইকের শব্দ মিলিয়ে যায় দূরে।আজ তার বান্দী নাকি তাকে ভালোবাসার কথা বলবে।
অন্যদিকে, ফোনটা নামিয়ে দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে আনন্দী। ঘরের বাতাসটা কেমন ভারী লাগছিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি জমছিল ধীরে ধীরে।কাল থেকে অভীর আচরণে অস্বাভাবিক একটা পরিবর্তন।যে মানুষটা এত বছর ধরে তাকে ভয় দেখিয়েছে, অপমান করেছে, নিজের রাগ আর বিকৃত আসক্তি দিয়ে তিলে তিলে তাকে শেষ করে দিয়েছে, সে হঠাৎ এত নরম কেন?এত শান্ত কেন?অভীর মতো মানুষ কি সত্যিই বদলায়?নাকি এই কোমলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর কিছু?প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতেই আচমকা মনে পড়ে যায় পুরোনো সেই ঘটনার কথা।
২০২২ সাল।যে বছরটা তাদের দুজনের জীবনকেই অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।সেদিন দূপুরে ক্লাস শেষ করে ম্যাডিকেলে গেছিলো সে এবং তার বেস্ট ফ্রেন্ড স্নেহা। এরপর স্নেহা ভিতরে চলে যায়। আধঘন্টা পর স্নেহা বাইরে আসে। মাথায় বিশাল স্ক্রাপ পড়া। কাঁপা হাতে একটা ভিডিও দেখায় আনন্দীকে। ভিডিওটা রেকর্ড করা হয়েছিল আনন্দীর মায়ের ফোনে। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।একজন মেয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, আর সামনে থাকা একজন পুরুষ তাকে প্রচণ্ড চড় মারছে।ভিডিওটা ঝাপসা ছিল, কিন্তু একটা জায়গা একদম পরিষ্কার।সাদা অ্যাপ্রনের সঙ্গে ঝুলে থাকা আইডি কার্ড।ডা. অভী ফারসি।ভিডিওটা দেখে প্রথমেই থানায় যেতে চেয়েছিল আনন্দী। কিন্তু স্নেহা তাকে থামিয়ে দেয়।সে বলেছিল,
“পুলিশে গেলে আমার প্রেগন্যান্সির কথাও বের হয়ে যাবে। মানুষ আমাকে দোষ দিবে। ওকে না।”
তখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল আনন্দী। মাথা কাজ করছিল না ঠিকমতো। কী ঠিক, কী ভুল, বুঝে ওঠার অবস্থায় ছিল না সে।সেই সুযোগেই স্নেহা তার হাত থেকে ফোন নিয়ে নেয়। নিজের মুখ ব্লার করে, আনন্দীর ব্যবহৃত ফেসবুক আইডি থেকেই ভিডিওটা পোস্ট করে দেয়। ক্যাপশনও লিখে দেয় নিজে।ক্যাপশনটা ছিল ছোট।কিন্তু ভয়ংকর।
“ডাক্তার নামের পশুদের বিচার হবে না?”
তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে আনন্দীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে স্নেহা। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দুজনে ফুচকা খেয়ে খায় সেদিন।আর ঠিক সেই সময়েই ইন্টারনেটে আগুন ধরে যায়।দেশের নামকরা মেডিক্যাল কলেজের হবু ডাক্তার জড়িত।এই খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটা ভাইরাল হয়ে যায়। বিভিন্ন নারী অধিকার সংগঠনের কর্মীরা মেডিক্যালে চলে আসে। তাদের মধ্যে অনেকেই সত্যিকার অর্থে নির্যাতিত নারীদের জন্য কাজ করত, আবার কিছু মানুষ ছিল শুধুই ক্যামেরার সামনে স্লোগান দেওয়ার জন্য।কিন্তু তখন পরিস্থিতি আর কারও নিয়ন্ত্রণে ছিল না।
বিকেলের পর কোচিং শেষে স্নেহা আবারও আনন্দীকে নিয়ে যায় মেডিক্যালের সামনে।আর ঠিক তখনই সবকিছু ঘটে যায়।চারপাশে সাংবাদিক, ক্যামেরা, লাইভ, মানুষের ভিড়।হঠাৎ করেই ভিড়ের মাঝখান থেকে অভীকে টেনে বের করা হয়। তার শার্টের কলার ছিঁড়ে গিয়েছিল। কয়েকজন তাকে ধাক্কা দিচ্ছিল, কেউ কেউ জুতো ছুঁড়ে মারছিল।অভী বারবার শুধু একটা কথাই বলছিল,
“এইটা আমার কাজ না।”
কিন্তু উত্তেজিত জনতা তখন শুনতে রাজি নয়।সাংবাদিকদের একজন আনন্দীর প্রোফাইল ছবি দেখে তাকে চিনে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে মাইক্রোফোন তাক করা হয় তার মুখের সামনে।
“ভিডিওতে থাকা মেয়েটা আপনি?ডাক্তার অভী কি আপনার উপর অত্যাচার করেছে?”
ভয়ে জমে গিয়েছিল আনন্দী। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয়নি।ঠিক তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায় স্নেহার দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নেড়েছিল সে।সেই একটুকু নীরব সম্মতিকেই সত্যি ধরে নেয় সবাই।মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ধিক্কার শুরু হয়।কেউ অভীকে নারী নির্যাতনকারী বলছিল, কেউ সাইকোপ্যাথ।তার মেডিক্যাল লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়। প্রশাসনিক তদন্ত শুরু হয়।আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেও পুলিশ ভ্যানে তোলার আগে একবার মাথা তুলে তাকিয়েছিল অভী।সরাসরি আনন্দীর দিকে।সেই চোখে রাগ ছিল না।ছিল ভয়ংকর এক প্রতিজ্ঞা।দুইদিন পর জামিনে ছাড়া পায় অভী।
মূলত কৃষ্ণ দাস তাকে বের করে আনে। কয়েক বছর আগে অভী একবার তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। সেই ঋণ শোধ করতেই কোটি টাকার লবিং শুরু হয়। ধীরে ধীরে ঘটনাটা ভুয়া অভিযোগ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।ইন্টারনেটও নতুন খবরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।মানুষ ভুলে যায়।কিন্তু অভী ভুলেনি।এক মুহূর্তের জন্যও না।সেদিনের অপমান, মানুষের থুতু, জুতোর আঘাত, লাইসেন্স হারানো।সবকিছুর দায় সে চাপিয়েছিল আনন্দীর উপর।তারপর থেকেই যেন ছায়ার মতো লেগে যায় তার জীবনে।ভয় দেখানো, অপমান করা, মানসিক নির্যাতন, নিয়ন্ত্রণ।সবকিছু দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের প্রতিশোধ নিতে থাকে সে।কিন্তু আজ?আজ হঠাৎ এত কোমল কেন অভী?সত্যিই কি বদলে গেছে সে?নাকি এই শান্ত আচরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও ভয়ংকর কোনো অন্ধকার?
হাজারটা ভাবনা তখনও জট বেঁধে ঘুরছিল আনন্দীর মাথার ভেতর। অভীর আচরণের পরিবর্তনটা তাকে অস্বস্তি দিচ্ছিল ভীষণ। মানুষটা কি সত্যিই বদলেছে, নাকি আবারও নতুন কোনো খেলা খেলছে।কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না সে।ঠিক তখনই ফোনটা কেঁপে ওঠে।স্ক্রিনে ভেসে ওঠে অভীর নাম।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে আনন্দী। তারপর ধীরে কল রিসিভ করে।ওপাশ থেকে অভীর কণ্ঠ ভেসে আসে অদ্ভুত কোমলতায়।
“আইসা গেছি।”
শব্দ দুটো এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে মুহূর্তের জন্য মানুষটাকে অন্যরকম মনে হচ্ছিল।আনন্দী ধীরে বেলকনিতে চলে যায়। বিকেলের বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছিল হালকা করে। নিচের রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা।সে নিচে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,
“পশ্চিম দিকের বেলকনির সামনে আসেন।”
অভী আর কিছু বলে না। কয়েক সেকেন্ড পরই বাইকের শব্দ শোনা যায়। নিচে এসে থামে সে।কালো বাইকের উপর বসে উপরের দিকে তাকায় অভী। আনন্দীকে দেখতেই ধীরে চোখ থেকে কালো চশমাটা খুলে ফেলে। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“জলদি কও ভালোবাসার কথা।”
উপরে দাঁড়িয়ে আনন্দী কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।তারপরএকগাল হাসে।ঠিক পরের মুহূর্তেই উপর থেকে ঝপ করে এক বালতি ময়লা পানি এসে পড়ে তার শরীরের উপর।সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে প্রথম কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝে উঠতে পারে না অভী।
নোংরা পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে তার চুল বেয়ে, মুখ বেয়ে, সাদা পাঞ্জাবি বেয়ে। মুহূর্তের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভিজে যায় সে।রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা কুকুর পর্যন্ত চমকে সরে যায়।অভী ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায় উপরের দিকে।আর বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসছিল আনন্দী।চোখেমুখে অদ্ভুত তৃপ্তি।
উন্মাদনা পর্ব ৩০
“হইছে?”
মাথা কাত করে বলে সে।
“না-কি আরো বলবো ভালোবাসার কথা?”
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে অভী। তারপর ভেজা চুল থেকে পানি ঝরতে ঝরতেই শান্ত গলায় বলে,
“ভালোবাসোস না এইটা বললেই পারতি।এমনে ময়লা পানি ফেলার কোনো দরকার ছিলো না।”
