Home উন্মাদনা উন্মাদনা পর্ব ৩৭

উন্মাদনা পর্ব ৩৭

উন্মাদনা পর্ব ৩৭
কায়নাত খান কবিতা

‘এটা তুমি কী করলে, আনন্দী? এতটা বোকামি কেউ করে?’
রেহমানের কণ্ঠে রাগের চেয়ে হতাশাই বেশি ছিল।ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই আনন্দীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। একটার পর একটা ছবি। কোথাও অভীর কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে, কোথাও অভী তার হাত ধরে আছে, কোথাও দু’জনকে দেখে মনে হচ্ছে বহুদিনের প্রেমিক-প্রেমিকা।যে কেউ ভুল বুঝবে।যে কেউ বিশ্বাস করবে তাদের সম্পর্ক ছিল।কিন্তু সত্যিটা তো ছবির ভেতরে নেই।ছবির বাইরে লুকিয়ে আছে ভয়, হুমকি, আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব।চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আনন্দীর। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু ততক্ষণে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছে।রেহমান নিজের ফোনটি হাতে নিয়ে স্ক্রিন অফ করে বলে,

‘ তুমি ভয়কে যতদিন না জয় করতে পারবে। ততদিন আমি কেন! প্রধানমন্ত্রী ও তোমার হয়ে লড়ে কিছু করতে পারবে না। তোমরা কিশোর বয়সী মেয়েরা বড্ড বোকা!’
আনন্দী তাকায় রেহমানের দিকে। যেন কথা গুলো কাচের মতো বিধছে তার শরীরে।
‘ ইট’স ট্রু। তোমরা কম বয়সী মেয়েরা মনে করো চুপ থাকলে সব সমাধান হয়ে যাবে।কেউ কিছু জানবে না। বাবা-মাকে বলতে ভয় পাও।কিন্তু একটি বার কী ভেবে দেখেছো চুপ থাকার ফল তোমার মতো আরো কতটা আনন্দী এদেশের দোয়ারে দোয়ারে ঘুরবে বিচারের জন্য। কিন্তু বিচার তো হবে না! কারণ ওই যে এক আনন্দী চুপ।তাকে দেখে বাকিরা ও চুপ।

‘ বিচার? হুমম! বিচারের কথা বলছেন স্যার? আমি নিজের ধ*র্ষ*ণ হওয়ার ভিডিও নিয়ে গেছিলাম থানাতে। ওখানে আমাকে কেউ বিচার পাইয়ে দেয়নি। বরং আমাকে নোং*রা মেয়েদের সাথে তোলনা করা হয়েছে। আপনি কোন আইনের কথা বলছেন? যে আইন পঁচে গেছে? যে আইন আমার চোখের সামনে আমারই ধ*র্ষ*ণকারীর পক্ষ নিলো সেই আইনের কথা বলছেন? ধিক্কার জানাই আপনার আইনিকে।’
রেহমন চুপসে যায়। কারণ আনন্দীর মতো মিডেল ক্লাস কম বয়সী মেয়ে কী করবে? যেখানে প্রমাণ নেই। বাবার ক্ষম’তা নেই। সেখানে কীভাবে কী করবে সে? মুখে বলা খুব সহজ। উপন্যাসের পাতায় লেখা ও সহজ।কিন্তু বাস্তবে কত আনন্দী ম*রে যায়। তাদের হয়ে কেউ লড়ে না। তারা ধ*র্ষ*ণ হয় একবার। এরপর আইন, উকুল, জনতা, পুলিশ তাদের কথার মাধ্যমে ধ*র্ষ*ণ করে বার বার। কেন একজন ধ*র্ষি*তা এ কোর্ট থেকে সেই কোর্ট দৌড়াবে? এটা কেমন আইন?
রেহমান দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকে।তার বহু বছরের চাকরি জীবনে অসংখ্য মামলা দেখেছে সে। অসংখ্য কান্না শুনেছে। কিন্তু কিছু কিছু কান্নার কোনো উত্তর হয় না।সে ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকায়।বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।আর ভেতরে, একটা মেয়ের ভরসা অনেক আগেই অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।রেহমান শুধু দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলল।এই মুহূর্তে তার কাছে কোনো উপদেশ নেই।কোনো সান্ত্বনাও নেই।শুধু একরাশ নীরবতা।

রেহমানের চুপ করে থাকা দেখে আনন্দী আর কিছু বলে না।বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো বলার পরও তার ভেতরের ভারটা কমেনি। বরং আরও তীব্র হয়েছে।ধীরে ধীরে স্কুল ব্যাগটা কাঁধে তুলে নেয় সে। ওড়নাটা ঠিক করে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। কোচিং শেষ করে সরাসরি এখানে এসেছিল রেহমানের ডাকে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আসাটা বৃথাই ছিল।যেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও রেহমান প্রমাণ, সাক্ষ্য আর আইনি জটিলতার কাছে অসহায়, সেখানে সে কীভাবে তাকে ন্যায়বিচার এনে দেবে?
দরজার কাছে গিয়ে থামে আনন্দী।পেছন ফিরে তাকায় না।শুধু শান্ত কণ্ঠে বলে,
‘আপনার আইন যেদিন টাকার কাছে বিক্রি হবে না, সেদিন আমিও ভয় পাবো না, স্যার। সেদিন আর মানুষ কী বলবে, সমাজ কী বলবে, সেসব ভাববো না।’
কথাটা বলেই বেরিয়ে যায় সে।দরজার উপরে ঝোলানো ঘণ্টাটা মৃদু শব্দে বেজে ওঠে।তারপর আবার নেমে আসে নীরবতা।রেহমান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে।তার চোখ গিয়ে থামে টেবিলের উপর রাখা ফাইলটার দিকে।গত চব্বিশ ঘণ্টার ঘটনাগুলো মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে।অভীকে গ্রেফতারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রায় শেষ ছিলো। কিন্তু মাঝে এতো কিছু কীভাবে হয়ে গেলো?
তখন সকাল ১১:৩০ মিনিট।

পুরান ঢাকার কোলাহল থেকে দূরে সেই পূরানো দোতলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো রেহমান। চারপাশে সাধারণ ব্যস্ত শহরের মতোই সবকিছু চলছিলো। একটু দূর হতে রিকশার শব্দ, , মানুষের ভিড়ের শব্দ ভেসে আসছিলো।কিন্তু রেহমানের ভেতরে ছিল আলাদা চাপা সতর্কতা।আজ অভী চাঁদকে হেফা’জতে নেওয়ার দিন।তার কাছে থাকা ফাইল অনুযায়ী।প্রাথমিক অভিযোগ, সাক্ষ্য এবং ডিজিটাল যোগাযোগের কিছু তথ্য মিলিয়ে একটি জিজ্ঞাসাবাদ-ভিত্তিক গ্রেফতারি পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত ছিল।
তার সঙ্গে ছিলো তিনজন পুলিশ সদস্য।তারা সোজা বাড়ির নিচে অভীর গ্যারেজে ঢুকে পড়ে।
অভী চাঁদ তখন কাঠের চেয়ারে বসে ছিলো।যেন ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই সে অপেক্ষা করে এসেছে।রেহমান ভেতরে প্রবেশ করতেই স্পষ্ট কণ্ঠে বলে,

‘অভী চাঁদ?’
অভী ধীরে মাথা তুলে বলে,
‘ আরেহ! রেহমান ডাকাত যে। ওয়াটস অ্যাপ ব্যাডি?আজকে আবার কোন ভুয়া তথ্য নিয়ে আসা হলো সক্কাল সক্কাল?’
দুনিয়াতে দুটো জিনিস বড়োই বিড়ল।এক হচ্ছে পাড়ার কাকিমাদের কুটনামি না করে থাকা।এবং দুই হচ্ছে অভীর শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা। ডাক্তার হিসেবে ও সে শুদ্ধ ভাষাতেই কথা বলতো।কিন্তু এই কয়েক বছরের তার ভাষা শুনলে যে কেউ তওবা কাটবে। রেহমান নিজের রাগ কন্ট্রোল করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
‘আপনার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ রয়েছে। আপনাকে আমাদের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যেতে হবে।’
অভী পাশের টেবিলে রাখা ফোনটা সরিয়ে রাখে।আর ঠিক তখনই কোণার চেয়ারে বসা একজন ব্যক্তি উঠে দাঁড়ালেন।কালো কোট, হাতে ব্রিফকেস।
‘আমি অ্যাডভোকেট রাশেদ করিম। আমার মক্কেলের পক্ষে উপস্থিত আছি।’
রেহমানের চোখ কুঁচকে যায়।এটা আগে রিপোর্টে ছিল না।আইনজীবী ধীরে ধীরে একটি ফাইল খুললে বলেন,
‘আজ সকাল ৯টা ০৫ মিনিটে মাননীয় আদালত আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি কার্যক্রমে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

রেহমান দ্রুত কাগজ হাতে নেয়।প্রথম পাতা পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।আদালতের সিল,রেজিস্ট্রি নম্বর,স্বাক্ষর।পরবর্তী পাতায় আগাম জামিন-সদৃশ সুরক্ষার শর্তাবলি।সবকিছু নিয়মমাফিক।সবকিছু বৈধ।কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা তখনও বাকি,
এই আদেশ এত দ্রুত এল কীভাবে?রেহমান শান্ত গলায় বলল,
‘আমরা যাচাই করবো।’
আইনজীবী মাথা নাড়লেন।
‘অবশ্যই। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত আমার মক্কেলকে গ্রেফতার বা বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ে যাওয়া আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।’
গ্যারেজের ভেতর ভারী নীরবতা নেমে আসে।রেহমান জানে।আইনের সামনে তার ক্ষমতা সীমিত।সে চাইলে এখনই জোর করতে পারে না।কারণ এতে পুরো তদন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে।সে একবার অভীর দিকে তাকায়।
অভী নির্বিকার।যেন পুরো পরিস্থিতি তার হাতে লেখা স্ক্রিপ্ট।পরবর্তী প্রায় দুই ঘণ্টা যাচাই চলে।আদালতের রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ।আদেশের সত্যতা নিশ্চিতকরণ।ডিজিটাল কপি যাচাই।সব দিক থেকে একই উত্তর, আদেশ বৈধ।

তখন প্রায় বিকেলের ধার ধার।রেহমান গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে আসে। তার মুখ শক্ত।কিন্তু ভেতরে অস্থিরতা।কারণ তার কাছে স্পষ্ট।এই ঘটনা শুধু আইন নয়, টাইমিং নিয়েও খেলা।সে জানে গ্রেফতারের পরিকল্পনা গোপন ছিল।হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ জানত না।তাহলে তথ্য গেল কোথায়?বাইরে এসে সবাই গাড়ির দিকে এগোতেই পিছন থেকে দরজা খোলার শব্দ আসে।অভী বেরিয়ে আসে।ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে।তার হাঁটায় কোনো তাড়া নেই।গাড়ির কাছে এসে এক মুহূর্ত থামে।রেহমানের দিকে তাকায়।দুজনের চোখে চোখ পড়ে।একদিকে আইন, দায়িত্ব, অসহায়তা।অন্যদিকে আত্মবিশ্বাস, প্রস্তুতি, অজানা শক্তি।অভী হালকা হাসে তারপর তার মিডেল ফি’ঙ্গার বের করে চুল ঠিক করার মতো ভঙ্গি করে।রেহমান ও চুপচাপ চলে আসে। সে আর অভীকে গ্রেফতার করতে পারেনি!!
কফিশপ থেকে বের হওয়ার পর আনন্দী একা রিকশায় ওঠে।শহরের বিকেলের শব্দ তখনও থামেনি। রাস্তায় গাড়ির ভিড়, হর্নের শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা।সবকিছু মিলিয়ে
চারপাশটা স্বাভাবিকই লাগছিল। কিন্তু আনন্দীর ভেতরে চলছিল অদ্ভুত এক অস্থিরতা।হাজারটা প্রশ্ন একসাথে মাথার ভেতর ঘুরছে।ঠিক তখনই রিকশাটা সামনে এগোতেই হঠাৎ একটি গাড়ি এসে সামনে দাঁড়ায়।

রিকশাচালক চমকে গিয়ে থেমে যায়।পরের মুহূর্তেই গাড়ির দরজা খুলে যায়।অভী নেমে আসে।আনন্দী এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে।তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু স্থিরতা।
যেন সে জানত, এই দৃশ্যটা একসময় আসবেই।অভী কোনো কথা না বলে তার হাত টা ধরে টে’নে গাড়ির ভেত রে বসিয়ে দেয়।আনন্দী কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না।না ভয়, না বাধা।
শুধু নীরবতা।গাড়ির দরজা বন্ধ হয়।ভেতরে নেমে আসে ভারী এক নিস্তব্ধতা।কেউ কথা বলে না।শুধু ইঞ্জিনের শব্দ আর চলার গতি।আনন্দী জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে।

উন্মাদনা পর্ব ৩৬

অভী কয়েকবার তার দিকে তাকায়, কিন্তু কিছু বলে না।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে অভীর বাড়ির সামনে।
অভী আনন্দীকে নিয়ে সোজা দোতলায় চলে যায়। দরজা লক করে আনন্দীর সামনে এসে বলে,
‘তোর জা নের ভ য় নাই?আরেকজনের লগে কফি খাইতে গেছিলি? কয়টা লাগে তোর ?’

উন্মাদনা পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here